সে এক ভেলকি

শৈলেন ঘোষ

এ শহরটা তুমি বলতে পারবে না তেমন মস্ত শহর। এখানে তেমন লম্বা-চওড়া রাস্তাও নেই, গন্ডায়-গন্ডায় গাড়ি-ঘোড়াও ছোটাছুটি করে না। হট্টমেলার হট্টগোলে কারও কানও হয় না ঝালাপালা। শহরটা ভারী শান্ত। চারদিকে সবুজ গাছ-গাছালি। ছোট্ট ছোট্ট ঘর-বাড়ি, রংবাহারি। বেশ খানিকটা হাঁটলে তোমার চোখে পড়বে একটা সমুদ্র। গভীর রাতে কে আর জেগে বসে থাকে। সব নিস্তব্ধ হয়ে গেলে সমুদ্রের উথাল-পাথাল ঢেউয়ের শব্দ ভেসে আসে চারদিক ছাপিয়ে।

সেই শহরে থাকত একটি ছোট্ট ছেলে। থাকত তার মা আর বাবার সঙ্গে। তার একটি ছোট্ট বোনও ছিল। ভারী ভালবাসত বোনটিকে ছোট্ট ছেলেটি। ইস্কুলেও যেত ছেলেটি। যত না ইস্কুলের বই পড়ত সে, তার চেয়ে বেশি দেখত রাতের আকাশ। দেখতে দেখতে অবাক হয়ে ভাবত ওই আকাশ কার আকাশ। এক-একদিন গভীর রাতে ঘুম ভেঙে গেলে ঘরের অন্ধকার ডিঙিয়ে সে পৌঁছে যেত জানলার ধারে। চেয়ে চেয়ে দেখত আকাশটা। শুনত সমুদ্রের শব্দ। ভেসে আসছে রাত নির্জন অন্ধকার ভেঙে ভেঙে। ভাবত, সবাই ঘুমোয়, অথচ সমুদ্র কেন ঘুমোয় না?

কে আর কবে সমুদ্রের ঘুমের কথা ভাবে। নদীও তো বয়ে চলে সারাদিন সারারাত। পাহাড়ের গা-উছলে ঝরে-পড়া জলের ধারা তারও তো ঘুম নেই একফোঁটা। কে জানে, হয়তো হাজার হাজার বছর ধরে তারা জেগেই আছে এমনই করে। বাতাসও কি ঘুমোয় কোনও দিন? সে যেদিন ঘুমিয়ে পড়বে, কে না জানে সেদিন আমরাও চিরদিনের মতো ঘুমিয়ে পড়ব।

একদিন ছেলেটি, অন্য আরও অনেক দিনের মতো দাঁড়িয়েছিল জানলার ধারে, রাতের অন্ধকারে। সেদিন ছিল আকাশভর্তি চাঁদের আলো। আকাশ উথলে সেই আলো ছড়িয়ে পড়েছে মাটিতে। ঘাসে ঘাসে গাছে গাছে। এমনকী জানলা গলে, তার মুখেও। আঃ! কী সুন্দর দেখতে লাগছে।

দেখতে দেখতে হঠাৎ চমকে ওঠে ছেলেটি। হঠাৎ যেন সমুদ্রের উথাল-পাথাল ঢেউয়ের অস্পষ্ট শব্দ জলতরঙ্গের মতো বেজে উঠেছে তার কানে। চনমন করে উঠল তার মন। ভাবে, কে বাজায় বাজনা এমন মিষ্টি সুরে। ভাবতে না ভাবতেই আর এক কাণ্ড, হঠাৎ যেন কে গান গেয়ে ওঠে! এ যে একটি ছোট্ট মেয়ের গলা। সেই চাঁদ, সেই আকাশ, সেই আলো, সেই সুর একাকার হয়ে তাকে যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে। মনে হয়, এখনই ঘরের দরজা খুলে সে ছুট দেয়। পা যেন তার বাগ মানে না।

না। নিঝুম রাতের নির্জনে সেদিন ছেলেটি ঘরের দরজা খুলে ছুট দিল না। অনেকক্ষণ জানলায় মুখ ঠেকিয়ে সে শুনল সেই বাজনা। সেই গান। শুনতে শুনতে সে শুয়ে পড়ল। তারপর জড়িয়ে এল তার চোখ ঘুমে।

পরের দিন খুব সকাল সকাল তার ঘুম ভেঙে গেছল। ঘুম থেকে উঠে মুখ-চোখ ধুয়ে, দুটো মিষ্টি আর দু’খানা রুটি মুখে দিয়ে সে ছুটল।

মা ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কোথা যাস রে খোকা, কোথা যাস?”

ছেলে বললে, “বেশি দূরে যাচ্ছি না। এক্ষুনি আসছি।”

বাবা গলা চড়িয়ে বলে উঠলেন, “ছুটিস না, ছুটিস না, হোঁচট খাবি।”

ছেলে বললে, “ভয় নেই বাবা, পড়ব না।”

ছেলেটি ছুটতে ছুটতে পৌঁছে গেল সমুদ্রের তীরে। কই বাজে জলতরঙ্গ? কই শুনি গান? এ তো শুধু ঢেউ আর ঢেউ। শোনা যায় ঢেউয়ের শব্দ আর জলের ছলাতকার। আর তো কিছুই নয়! দেখতে দেখতে কেমন যেন শুকিয়ে গেল ছেলেটির মুখখানি। তবে কি কাল রাতে সে যা শুনেছে তা সত্যি নয়! সেই বাজনা, সেই ছোট্ট মেয়ের গান তবে কি মিথ্যে!

সমুদ্রের বালুচরে সে দাঁড়িয়ে রইল অনেকক্ষণ। তন্নতন্ন করে খুঁজতে লাগল, যে গান গাইল, তাকে। না, দেখতে পেল না। দেখতে পেল শুধু, ওই-ই-ই আকাশটা সমুদ্রের জলে ডুব দিয়ে তলিয়ে আছে জলের তলায়। আর সূর্য জলের বুকে চুনি-পান্নার জলুস ছড়িয়ে ঢেউয়ের খেলা দেখছে।

ছেলেটিও দেখল সেই খেলা। খানিকক্ষণ। তারপর বাড়ির দিকে পা বাড়াল।

চলতে চলতে সে দেখতে পেল তার খুব চেনা-জানা ফুলদিদিকে। ফুলদিদি ফুলের ডালা হাতে নিয়ে ফুল বেচতে যায় রোজ। যেদিন সব ফুল বেচে একটি-দুটি পড়ে থাকে ডালায়, সেদিন দেখা হলে, ছেলেটির হাতে সেই ফুল তুলে দিয়ে বলবে, “ও ছেলে, এ ফুল তোর।” তা, সেদিন ডালায় কোনও ফুল ছিল না। তাই ফুল দেবার কথাও ছিল না। ছেলেটিকে দেখে ফুলদিদি সেদিন তাই শুধু হাসল। হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করল, “কোথায় গেছলি রে তুই?”

ছেলেটি বলল, “সমুদ্দুরে।”

“কেন?”

“গান শুনতে।”

ছেলেটির কথা শুনে ফুলদিদি অবাক হল। জিজ্ঞেস করল, “সমুদ্দুরে আবার কে গান গায়?”

ছেলেটি বলল, “কেন তুমি শোননি? আমি তো শুনেছি, সমুদ্দুরে জলতরঙ্গ বাজছে। একটি মেয়ে গান গাইছে।”

ফুলদিদি এবার হেসে ফেলল, বলল, “না, না, গানও নয়, বাজনাও নয়। তুই বোধহয় ভুল শুনেছিস। বোধহয় স্বপ্ন দেখেছিস।” বলে ফুলদিদি তার খোঁপায় সাজানো যে-ফুলটি, সেটি তুলে নিল মাথা থেকে। তারপর ছেলেটির হাতে দিয়ে বলল, “যা, ঘরে যা। রোদে রোদে ঘুরিস না, অসুখ করবে।” বলতে বলতে ফুলদিদি চলে গেল।

ফুলদিদি চলে গেল বটে, কিন্তু ছেলেটি দু’পা ফেলতেই দেখা হয়ে গেল গল্প-বলা দাদুর সঙ্গে। কত মজার মজার গল্প জানে দাদু। তা, এখন তো আর গল্প বলার কথা নয়। তাই অন্য কথা বলতে হয়। দাদু জিজ্ঞেস করল, “কী রে ছেলে, কোথায় গেছলি?”

ছেলে বললে, “সমুদ্দুরে।”

“কেন?”

“গান শুনতে।”

ছেলেটির কথা শুনে দাদু অবাক হল। জিজ্ঞেস করল, “সমুদ্দুরে আবার কে গান গায়?”

ছেলেটি বলল “কেন, তুমি শোননি? আমি তো শুনেছি, সমুদ্দুরে জলতরঙ্গ বাজছে। একটি মেয়ে গান গাইছে।”

দাদু হেসে ফেলল, বলল, “না রে ছেলে, ওটা বাজনার সুর নয়। জলের ছলাতকারের শব্দ। আর যেটা তুই গান বলছিস, সেটা বাতাসের ঝংকার।” তারপর বলল, “যা, যা, ঘরে যা। রোদের তেজ বাড়ছে। খামোকা ঘুরিস না রোদে রোদে, কষ্ট হবে।” বলতে বলতে দাদু হাঁটা দিল।

ছেলেটি হতভম্ব হয়ে খানিক দাঁড়াল। দেখল, দাদু ঠুকঠুক করে হাঁটতে হাঁটতে চলেছে। তারপর উলটো পথে ঘরের দিকে সে-ও হাঁটল। হাঁটল বটে, কিন্তু দাদুর কথা বিশ্বাস করতে পারল না। না-পারলেও সে ‘হ্যাঁ শুনেছি, ঠিক শুনেছি’ বলে তক্কোবিতক্কোও করল না। সোজা ঘরে ফিরে এল। মনে মনে ভাবল, রাত তো আর রাগ করে ঘরে বসে থাকে না, তাকে রোজ আসতেই হয়। আজও আসবে। দেখি, আজ রাতে কী হয়! দেখি, সত্যি বাজনা বাজে কি না! দেখি, ছোট্ট মেয়ের গান শুনি, না, হাওয়ার ঝংকার কানে আসে!

ছেলেটির মন স্থির হয় না কিছুতেই, সেদিন। কখন আসবে রাত! সময় যেন কাটতেই চায় না।

তা, তুমি যতই ছটফট করো, সময় ঠিকই কাটছে। ঠিক সময়েই রাত আসছে। বলতে বলতে সত্যিই রাত এসে পড়ল। রাত আসার সঙ্গে সঙ্গেই তো আর ঘুমিয়ে পড়ে না সবাই। চোখ-ঘুমঘুম রাত না এলে তো ঘুম পায় না মানুষের। কাজেই এখন সময় গোনো।

অবশ্য, বেশিক্ষণ সময় গুনতে হল না। খানিক পরেই ঘুমঘুম-রাত সারা শহর ছেয়ে ফেলল। নিশ্চুপ হয়ে গেল চারদিক। মানুষের চোখে ঘুম নামল। ঘুমিয়ে পড়ল ছেলেটির মা, বাবা আর ছোট্ট বোনটিও। শুধু জেগে রইল একলা সে। বিছানায় শুয়ে রইল চোখ বুজে চুপটি করে।

খানিক পরেই সমুদ্দুরের সেই উথাল-পাথাল জলের শব্দ কেমন যেন টুংটাং করে বেজে উঠল। তার সেই বাজনার সঙ্গে গলা মিলিয়ে কে যেন গেয়ে উঠল গান। ছেলেটি থাকতে পারল না। বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল। জানলার ধারে গিয়ে দাঁড়াল। কান পেতে রইল নিমেষ। তারপর নিঃশব্দে ঘরের দরজা খুলে ফেলল। চুপিসারে ঘর থেকে বেরিয়ে ছুট দিল। ছুটল সে সমুদ্রের দিকে। নিশুতি রাতের এই গা-ছমছম মূর্তি দেখে তার বুক কাঁপল না। আকাশ থেকে উছলে পড়েছে চাঁদের আলো। ছড়িয়ে আছে দিক্‌বিদিকে। সে ছুটছে। সেদিকে তার খেয়াল নেই। যতই সে ছুটছে, ততই সেই গানের সুর যেন একটু একটু করে স্পষ্ট হয়ে উঠছে তার কানে।

শেষমেশ সে সত্যিই পৌঁছে গেল সমুদ্রের তীরে। হ্যাঁ, সত্যিই সে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে গান আর বাজনার সুর। ছোট্ট মেয়ের গলায় কী মিষ্টি সেই গান। আশ্চর্য হয়ে শুনছে ছেলেটি। অবাক চোখে দেখছে এদিক ওদিক। কিন্তু দেখতে পাচ্ছে না কাউকে! কই সেই মেয়ে!

হঠাৎ তার মনে হল, সার-সার ওই ঝাউগাছের বন পেরিয়ে সেই গান যেন ভেসে আসে। চাঁদের আলোয় পথ চিনে সে ছুটে যায় ঝাউবনের দিকে। কিন্তু কই? এখানে কেউ নেই তো! সে ঝাউবনের আনাচে-কানাচে উঁকি দেয়। না, মিথ্যে খোঁজা। অথচ গানের ক্ষান্তি নেই। সমস্ত ঝাউবন উতল করে ভেসে আসে একটি ছোট্ট মেয়ের মিষ্টি সুর। আহা!

ছেলেটি অস্থির হয়ে উঠল। উত্তেজনায়। চোখের পলক পড়ে না তার। এদিকে দেখে, ওদিকে দেখে। কেউ নেই। সে আর থাকতে পারল না। আচমকা চিৎকার করে উঠল, “কে-এ-এ-এ!”

তার সেই চিৎকারে কে ভয় পায়! না, না, আকাশের চাঁদ ভয় পেয়ে মেঘের আড়ালে লুকোল না। উথাল-পাথাল সমুদ্রের ঢেউ একটুও শান্ত হল না। কিন্তু থমকে গেল বাজনার শব্দ। চমকে থামল সেই মেয়ের গান।

ছেলেটি থতমত খেয়ে গেল। এ কী হল, নিস্তব্ধ হয়ে গেল কেন এমন গানের সুর। না, আর সে চিৎকার করল না। এবার সে আলতো পায়ে ঘুরে ঘুরে চাঁদের আলোছায়ায় তাকে খুঁজতে লাগল। কোথায় যায়, জানে না সে। তবু সে থামে না। অনেকক্ষণ অনেকটা খুঁজে সে যখন কিছুই পেল না, তখন হঠাৎই তার চমক ভাঙল। সত্যিই তো, এমন দিশেহারা হয়ে সে কোথায় যায়। মনে পড়ে গেল তার বাড়ির কথা। মনে পড়ে গেল মায়ের কথা, বাবার কথা। মনে পড়ে গেল, ছোট্ট বোনের কথা। তাকে দেখতে না-পেয়ে তাদের যদি ঘুম ভেঙে যায়!

ছেলেটি পিছু ফিরল। আকুল হয়ে উঠল তার মন। দরকার নেই আর। এবার সে ঘরে ফিরবে। সমুদ্রের কূল ছড়ানো বালি ডিঙিয়ে সে এগিয়ে চলল পথ দেখে দেখে।

কিন্তু এ কোন পথ! এ পথ তো তার চেনা লাগছে না। তবে কি সে ভুল পথে হাঁটছে। তবে কি সে হারিয়ে গেল ভুল পথে। ভয় পেল ছেলেটি। তাই তো কী হবে এখন? সে যে কাউকে চিৎকার করে ডাকবে, তাতেই বা কী লাভ। এখানে কোনও ঘর নেই, বাড়ি নেই, একটি মানুষও নেই। হাঁক পাড়লে কে আসবে? অগত্যা ছেলেটি ছুটতে আরম্ভ করল।

ছোটে। হাঁপায়। একটু দাঁড়ায়। আবার ছোটে।

“হা-হা-হা!” হঠাৎ যেন বাজ পড়ল। কে হেসে উঠল অমন করে? সমুদ্রের ঢেউ উছলানো গর্জনের চেয়ে হাসির এ শব্দ যেন আরও তীব্র।

ছেলেটি আঁতকে উঠল। চিৎকার করতে গেল। পারল না। কাঁপা কাঁপা গলায় অস্পষ্ট স্বরে সে বলে ফেলল, “কে!”

যে হাসল সে বোধহয় শুনতে পেল ছেলেটির গলার স্বর। তাই সে উত্তর দিল, “আমায় তুই দেখতে পাবি না। কিন্তু আমি তোকে দেখতে পাচ্ছি। এই নিশুতিরাতে যার গান শুনে ছুটে ছুটে যাকে খুঁজছিস, আমি তার কাছ থেকে এসেছি। তোকে নিয়ে যাব তার কাছে। তোর মতো একটি ছোট্ট বন্ধু সে খুঁজে বেড়াচ্ছে। জানিস সে কে?”

“কে?”

“সমুদ্রকন্যা।”

“কোথায় থাকে সে?”

“সমুদ্রের অতল জলে। নানা রং প্রবালের রাজপ্রাসাদে।”

“আমায় তবে নিয়ে চলো তার কাছে। আমি তার গান শুনব।”

“হা-হা-হা!” আবার শোনা গেল সেই অদৃশ্য হাসি। ছেলেটির কানে আবার ভেসে এল তার কথা। বলল, “মনে মনে আকাশকে প্রণাম কর। আকাশের চাঁদকে প্রণাম কর। আকাশের অসংখ্য তারাকে প্রণাম কর। পৃথিবীর মাটিকে প্রণাম কর। গাছপালা, পশুপাখি, মানুষজন সবাইকে প্রণাম কর। আর শেষবারের মতো তোর ছোট্ট বোনের মুখখানি মনে করে প্রণাম কর তোর মাকে, বাবাকে।”

“কেন?” ভীষণ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল ছেলেটি।

“কারণ, সেখানেই তোকে থাকতে হবে চিরদিন। তুই হবি তার খেলার সঙ্গী। আর কোনও দিন পৃথিবীর মাটিতে তোর ফেরা হবে না। ভুলে যেতে হবে সবাইকে।”

“না-আ-আ-আ!” গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল ছেলেটি।

আবার শোনা গেল সেই অদৃশ্য স্বর। সে বলল, “এখন তুই না বললেও আমার কিচ্ছু করার নেই। সমুদ্রকন্যার আবদার অমান্য করার ক্ষমতা নেই আমার।”

ছেলেটি এবার দৃঢ় গলায় বলল, “পৃথিবীর মাটি ছেড়ে আমি কোথাও যাব না। এখানে আমার মা আছেন, বাবা আছেন, আমার ছোট্ট বোন আছে। পারো তো সমুদ্রকন্যাকেই আমার কাছে নিয়ে এসো।”

সেই অদৃশ্য স্বর তখন ধমক দিয়ে গর্জে উঠল, “ওরে ছেলে, তোর স্পর্ধা তো কম নয়। বলিস সমুদ্রকন্যাকে তোর কাছে নিয়ে আসতে! শুনে রাখ, সে কারও কাছে যায় না। তার কাছেই সবাইকে যেতে হয়। সমুদ্রকন্যা যাকে ডাকে, সে যদি যেতে না চায়, তবে তাকে জোর করে নিয়ে যাই আমি। আমি তার দূত। তুই ভালয় ভালয় না গেলে তোকে আমি পাকড়িয়ে নিয়ে যাব।”

অদৃশ্য স্বরের এমন বদমেজাজি কথা শুনে একটুও ভয় পেল না ছেলেটি। সে-ও মেজাজ দেখিয়ে বলল, “ভয় দ্যাখাও কাকে? তুমি তো অদৃশ্য! ফক্কা! তোমার সাধ্যি কী আমায় পাকড়াও করো।”

এবার সেই অদৃশ্য স্বর তর্জন-গর্জন শুরু করে দিলে, “কী, আমায় তুই ‘ফক্কা’ বলিস! তবে এই দ্যাখ আমার মূর্তি।” বলতে না-বলতেই সমুদ্র উত্তাল হয়ে ফুঁসে উঠল। বাতাস বইতে লাগল ঝড়ের বেগে। ছেলেটির সামনে চোখের পলকে দেখা দিল এক ভয়ংকর নীল তিমি। কী পেল্লায়! শোনা গেল সেই হাসি, “হা-হা-হা।” ঝড়ের ঝাপটায় সে-হাসি কাঁপিয়ে তোলে চতুর্দিক।

তাকে দেখে ছেলেটি চিৎকার করে ওঠে “খবরদার!”

সঙ্গে সঙ্গে আকাশ মেঘে ঢেকে গেল। হারিয়ে গেল চাঁদের আলো। ঝিলিক দিয়ে উঠল বিদ্যুৎ। গর্জে উঠল মেঘ। হেসে উঠল আবার সেই ভয়ংকর নীল তিমি। অমনই বৃষ্টি নামল আকাশ ভেঙে।

ছেলেটি মুহূর্তের মধ্যে একমুঠো বালি তুলে নিল সমুদ্রের তীর থেকে। ছুড়ে মারল নীল তিমির চোখে। তার হাসি থমকে গেল। ছেলেটি ছুট দিল। সে চেঁচিয়ে উঠল, “মা-আ-আ-আ!”

বিদ্যুৎ উঠল দ্বিগুণ জোরে চমকে। মেঘ ডাকল বুক কাঁপিয়ে কড়কড়কড়াত! ঝড় বইল তীব্র বেগে ছেলেটিকে ধাওয়া করে।

ছেলেটি তবুও ছোটে। কোনও কিছুই আর তাকে রুখতে পারে না। তার ছোট্ট বোনের মুখখানি যত তার চোখের ওপর ভেসে ওঠে, ততই যেন তুচ্ছ হয়ে যায় ঝড়-জল-বিদ্যুতের তাণ্ডব।

বোধহয় জিতে গেল ছেলেটি। ঠিক এই মুহূর্তে সে দু’হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল একটি গাছের গুঁড়ি। আর পারে না কেউ তাকে কাবু করতে। যতই ঝাপটা মারে ঝড়, ততই সে জোরে, আরও জোরে আঁকড়ে ধরে গাছের গা। বুঝি বা মিথ্যে হয়ে গেল ঝড়ের তাণ্ডব। পারল না ঝড়, বৃষ্টি, বিদ্যুৎ একটি ছোট্ট ছেলের সঙ্গে। হেরে গেল তারা। ক্লান্ত হয়ে ঝড় ঝিমিয়ে পড়ল। কেটে গেল মেঘ। থামল বৃষ্টি।

তারপর?

রাতের আঁধার কেটে সূর্য উঠেছিল ভোরের আকাশে। যুদ্ধজয়ী ছেলেটি খুঁজে পেয়েছিল পথ। ফিরে এসেছিল ঘরে। আর কোনওদিন শোনেনি সে কারও গান। অন্ধকার রাতে কিংবা জ্যোৎস্নার আলোয়। মনে হয় যেন সে এক ভেলকি!

সকল অধ্যায়
১.
কাক্কাবোক্কার বিয়ের পদ্য
২.
ইতিমিচিসাহেবের স্বপ্নের গাধা
৩.
কাক্কাবোক্কার টোক্কা ফক্কা
৪.
কাক্কাবোক্কার কান্নাকাটি
৫.
কাক্কাবোক্কার গানের জলসা
৬.
ইতিমিচিসাহেবের ছাগলি-মা
৭.
কাক্কাবোক্কার বায়নাক্কা
৮.
কাক্কাবোক্কার ঘাড়ে ভূত
৯.
পিঠ নিয়ে পিঠোপিঠি
১০.
কাক্কাবোক্কার কাণ্ড বটে
১১.
গল্পের নাম ফিক
১২.
কাক্কাবোক্কার ভুতুড়ে কাণ্ড
১৩.
ইতিমিচিসাহেবের ঘোড়া
১৪.
রাজা বাপ্পাহুহুর দাড়ি
১৫.
ছি ছি, এ কী কাণ্ড
১৬.
ইতিমিচিসাহেবের নাচানাচি কাণ্ড
১৭.
আচ্ছা আজব ইচ্ছে বটে
১৮.
রগড় নিয়ে কাণ্ড জবর
১৯.
ইতিমিচিসাহেবের আম্মা বিল্লি
২০.
ভগবানের হাত
২১.
তাক্কাদুম
২২.
চ্যাং ঝোলা
২৩.
স্বপ্ন দেখি রূপকথায়
২৪.
দস্যি সেই ছেলেটি
২৫.
পাখিমের আকাশ
২৬.
সোনা-ঝুরঝুর হাসি
২৭.
ছুম আর ছবি
২৮.
টুক্‌কির ফুলবাগানে
২৯.
চাঁদ আর পাপুই
৩০.
কালো বেড়ালের গুপ্তধন
৩১.
মায়ের সোনা ছেলে আফজল
৩২.
এক বুড়ো আর একটি পাখি
৩৩.
আজবদেশের নাচন-পাখি
৩৪.
একলা ডিঙি যখন একা
৩৫.
সেই যে আলো নীল
৩৬.
আকাশের দুই বন্ধু
৩৭.
তিনটে বুড়োর গল্প
৩৮.
ভেলকির নাম ঘোড়া
৩৯.
বন্ধুর নাম কাকের ছানা
৪০.
টুং-এর বন্ধু ঝুমঝুমি
৪১.
উড়ুক্কু ভূত
৪২.
ঘণ্টা বাজে টুংটাং
৪৩.
সময়ের জাদুখেলা
৪৪.
আমি শূন্য
৪৫.
কেউ জানে না কে চোর
৪৬.
একটি মেয়ের গল্প
৪৭.
শুধুই গল্প অদ্ভুতুড়ে
৪৮.
আলোর সন্ধান
৪৯.
সোনার ঘণ্টা
৫০.
সে এক ভেলকি
৫১.
সুন্দর যাকে বলি
৫২.
সর্দার
৫৩.
বেড়াল-বাঁদর-গাধা আর লোকটা
৫৪.
রুমঝুম নূপুরের রূপকথা
৫৫.
হো-বুড়োর খুদে বন্ধু
৫৬.
ভালবাসি পশুপাখি
৫৭.
বুক্কুটা তা বলে বোক্কা নয়
৫৮.
ছোট্ট পাখি আর কেঁদো বাঘ
৫৯.
যার যা সাজে না
৬০.
কানকাটা বাঘ
৬১.
একটা গান শেখাবে
৬২.
হ্যাংলা
৬৩.
কুক্কু আর হাঁসছানা
৬৪.
ছোট্ট পাখি টুনটুন
৬৫.
ছাগল-বুড়োর মামা
৬৬.
চাচার গানে নাচানাচি
৬৭.
একটা ছিল নেংটিছানা
৬৮.
টুক্কুর হাসি
৬৯.
হুম-চক্‌কা
৭০.
কাণ্ড বটে আজব
৭১.
পিড়িং-পিড়িং গঙ্গাফড়িং
৭২.
একটা বুদ্ধু নেংটি
৭৩.
বনমানুষ না ভালুক
৭৪.
তিড়িং-তিড়িং পাখিটা
৭৫.
কীসের থেকে কী
৭৬.
গল্পের রং রকম রকম
৭৭.
দাদু ভুলে গেছে
৭৮.
মুক্তো আছে কোন ঝিনুকে
৭৯.
নীল গোলাপের গল্প
৮০.
ডাকু
৮১.
অদ্ভুত সেই ঘোড়ার গল্প
৮২.
সে কী আনন্দের দিন
৮৩.
আলোর ভোর
৮৪.
রাংতা
৮৫.
মুক্তো-আঁকা
৮৬.
ইয়াসিনের চিঠি
৮৭.
গুড়িয়া
৮৮.
ছই একটি মেয়ের নাম
৮৯.
মায়ের জন্য একটি গোলাপ
৯০.
এই সুন্দর পৃথিবীতে
৯১.
স্বপ্নের ঝলমলে আলো
৯২.
সাগরের বন্ধু জানলা
৯৩.
রহস্য
৯৪.
ফিকির ভাবনা
৯৫.
নির্দোষ দুই বন্দি
৯৬.
রতন
৯৭.
রোদ ঝিলমিল
৯৮.
রহস্যের নাম সুন্দরী
৯৯.
ঝড়ের বনে আতঙ্ক
১০০.
কুয়াশার তিন সঙ্গী
১০১.
মায়ের ডাকা নামটি
১০২.
ভোরের আলো ফুটছে
১০৩.
ভালবাসার পৃথিবী
১০৪.
এ সময়ের গল্প
১০৫.
উত্তর পাইনি এখনও
১০৬.
অরুর বিকেল হারিয়ে গেল
১০৭.
মিষ্টি হাসির খেলনা
১০৮.
ম্যাজিক
১০৯.
বন্ধ ঘরে কান্নার শব্দ
১১০.
পাকা ধানের গন্ধ
১১১.
সেতুপারের বন্ধুরা
১১২.
সুলতান
১১৩.
তুসি জাদু জানে
১১৪.
তিত্তি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%