শৈলেন ঘোষ

একটা ছিল ছাগলছানা। একদিন তার মনটা খুব খারাপ লাগছিল। পাশের বাড়ির মেয়েটা কী সুন্দর গান গায়। আহা! সে-ও যদি গাইতে পারত! তাই, মনটাকে ভাল করবার জন্যে সে একলাটি বেরিয়ে পড়ল ঘর থেকে বাইরে। বেরিয়ে হাঁটছে তো হাঁটছেই। হাঁটতে হাঁটতে কতদূর যে চলে গেল, তা সে নিজেও জানে না। যাঃ! তারপরেই পথ গেল হারিয়ে! পথ হারিয়ে হাজির হল সে একটা আধা-বন, আধা-জঙ্গল মতো জায়গায়! জায়গাটা যেমন নির্জন, তেমনি নিঃঝুম। থমথম করছে। শুধু গাছের ডালে কী যেন একটা ‘গুপ-গুপ’ করে ডাকছে থেকে থেকে। ছাগলছানার কিন্তু একটুও ভয় করছে না। সে একটা গাছের নীচে দাঁড়িয়ে, টেরিয়ে টেরিয়ে এদিক ওদিক দেখতে লাগল। হঠাৎ, এমন সময় কে যেন ডাক দিল, “ও ছাগলছানা, ছাগলছানা ভাই, একা-একা কী করছ বনে-জঙ্গলে?”
আচমকা অচেনা গলার ডাক শুনে প্রথমটা একটু থতমত খেয়ে গেছল ছাগলছানা। তারপর চটপট নিজেকে সামলে নিয়ে ছাগুলে-ছাগুলে গলায় ডেকে উঠল, “ক্যা-এ্যা-এ্যা, কে ডাকে?”
“আমি ডাকি, ওপর দিকে।”
বলতেই ছাগলছানাটা ওপর দিকে তাকিয়েছে! ওমা! তাকাতেই দেখে কী, একটা বাঁদর গাছের ডালে ঠ্যাং জড়িয়ে দুলছে আর হাসছে। তার ইয়া লম্বা ল্যাজটা একেবারে ছাগলছানার নাকের ডগায় লুটোপুটি খাচ্ছে।
দেখেশুনে যেমন রাগ হচ্ছে, তেমনি হাসিও পাচ্ছে ছাগলছানাটার। পাবি তো পা, হাসিটা ফেটে পড়তে চাইছে। খুব কষ্টেসৃষ্টে হাসিটাকে গলার মধ্যে আটকে রেখে সে গম্ভীর গলায় বললে, “কেরে তুই, আমার নাকে ল্যাজ বুলোচ্ছিস? দেব এক্ষুনি কান চেটে।”
অমনি সেই বাঁদরটা হি-হি করে হেসে উঠে মারলে এক ডিগবাজি। মেরেই ছাগলছানার মুখের সামনে লাফিয়ে পড়ল। পড়ে বলল, “আহা, আহা, রাগ করো কেন ভাই? আমি কি তোমার শত্তুর? তুমি ছাগলছানা, আমি বাঁদরছানা। আমি তোমার বন্ধু।”
ছাগলছানাটা বললে, “আহা রে, দরদ দেখে মরে যাই। ওসব বন্ধুটন্ধু রাখো তো। তুমি আমায় গান শেখাতে পারবে কি না তাই বলো দেখি।”
ছাগলছানার কথা শুনে তো বাঁদরছানা হেসে গড়াগড়ি। বললে, “গান শিখবে, সে কেমন কথা?”
হাসি শুনে ছাগলের হাড়পিত্তি জ্বলে গেল। চেঁচিয়ে-মেচিয়ে ছাগল বললে, “হাসছিস কেন রে বাঁদর! শিখবই তো। জানিস, আমাদের পাশের বাড়ির মেয়েটা কেমন বিলিতি বিলিতি গান গায়! আমি বিলিতি গান শিখব।”
তার কথা শুনে হাসতে হাসতেই বাঁদরছানাটা বলল, “ছাগল আবার গান গাইতে পারে নাকি।”
“আলবত পারে।” বলে ছাগলছানাটা রেগেমেগে গলায় সুর টেনেছে। আরে ছ্যা-ছ্যা সেই সুরের কী বিচ্ছিরি আওয়াজ! ম্যা—।
আর যায় কোথায়, বাঁদরছানা চ্যাঁ-চ্যাঁ করে চেঁচিয়ে উঠল হাসতে হাসতে।
তার হাসি শুনে ছাগলছানার তো রাগে বুকের ভেতরটা ভয়ানক তোলপাড় শুরু করে দিল। সে আর কথা না বাড়িয়ে গটমট করে হাঁটা দিল।
সঙ্গে সঙ্গে বাঁদরছানাটা চেঁচিয়ে উঠল, “যাসনি ছাগলছানা, বনের ভেতর যাসনি, বাঘে খাবে।”
কে কার কথা শোনে। দৌড় দিল ছাগলটা বনের ভেতরে।
ছাগলছানাটা বনের ভেতরে একটু যেতেই দেখতে পেল, একটা মস্ত বড় ঝিল। ঝিলের চকচকে জল দেখে তার মনটাও কেমন জানি ‘জল খাই, জল খাই’, করে উঠেছে। জল খাই করে উঠতেই সে খুঁজে খুঁজে ঝিলের ধারে একটা উঁচু পাথরের ওপর উঠে দাঁড়াল জলে চুমুক দেবার জন্যে যেই হেঁট হয়েছে, অমনি জুড়িয়ে গেল তার চোখ। আহা! কত মাছ! ঝিলের জলে সাঁতার কাটছে। নাচছে। খেলা করছে। এইসব দেখতে দেখতে ছাগলছানাটা জল খেতে ভুলেই গেল। মনে মনে ভাবতে লাগল, আহা রে সে-ও যদি জলের মধ্যে নাচতে পারত! এই কথা ভাবতে ভাবতেই সে একটা রুপোলি মাছকে ডাক দিল, “ও রুপোলি মাছ, রুপোলি মাছ, আমাকে তোমাদের সঙ্গে খেলতে নেবে, আমি তোমাদের সঙ্গে নাচব!”
রুপোলি মাছ বললে, “তোমরা নাচো ডাঙায়, আমরা নাচি জলে।”
ছাগলছানাটা বললে, “ডাঙার চেয়ে জল ভাল।”
মাছ বললে, “জলের তলায় বিপদ।”
ছাগল বলল, “বিপদকে আমি ভয় পাই না।”
“বেশ তবে এসো।” বলে মাছ যেই তাকে ডাক দিয়েছে অমনি ছাগলছানা মেরেছে এক ঝাঁপ।
কিন্তু এ কী হল?
কী হল?
কোথায় ছিল সেই বাঁদরছানাটা, যেই ছাগলছানাটা জলে ঝাঁপ দিয়েছে অমনি সে তাকে জাপটে ধরে চেঁচিয়ে উঠেছে, “ওরে যাসনি, জলে ডুবে মরবি।”

কে কার কথা শোনে। ছাগল চেঁচামেচি লাগিয়ে দিলে, “ছেড়ে দে, ছেড়ে দে।”
চেঁচালে কী হবে! বাঁদর ছাড়ে না। বেধে গেল ঝটাপটি। টানামানি করতে করতে হয়েছে কী, ছাগলটা বাঁদরের পেটে মেরেছে এক ঢুঁ। মেরেই জলের ওপর ঝপাং। ব্যাস! আর দেখতে হয়, ছাগল বাছাধন একেবারে জলের তলায়। একবার তলিয়ে যায়, আবার ভেসে ওঠে। ঢক ঢক করে জল খায় আর আঁকপাকিয়ে ঘাঁই মারে। এবার মরল বোধহয় ছাগলটা।
এমন সময় হঠাৎ বাঁদরছানাটার মাথায় চট করে একটা বুদ্ধি এসে গেল। ঘাঁই মারতে মারতে ছাগলছানাটা যেই একবার জলের ওপর মাথা তুলেছে, অমনি বাঁদরছানাটা ল্যাজ দিয়ে তার গলাটা জাপটে ধরেছে। ধরেই মেরেছে টান। টানতে টানতে ছাগলছানাটাকে ডাঙায় তুলে তবে দম ফেলল। কিন্তু এদিকে তো ছাগলের কম্ম শেষ। এক পেট জল খেয়ে মাটিতে পেট উলটে সে কোঁকাতে লাগল আর চিঁ-চিঁ করে কাঁদতে লাগল, “মরে গেলুম, মরে গেলুম।”
বাঁদরটা তখন করল, কী ছাগলের পেটে ঝাঁকানি দিতে শুরু করলে। একটু করে ঝাঁকানি দেয় আর অমনি মুখ দিয়ে হুস হুস করে জল বেরোয়। যখন সব জলটা বেরিয়ে গেল, তখন ছাগলের ধড়ে যেন প্রাণ এল। প্রাণ এলে কী হবে। এমন কাহিল হয়ে গেল যে, আর হাঁটতেই পারে না। হাঁটার কথা ছেড়ে দাও, দাঁড়াতেই পারে না। তখন বাঁদরছানাটা বললে, “ছাগলছানা আমার পিঠে বস।”
ছাগলটা প্রাণপণে চেষ্টা করে বাঁদরের পিঠে বসে গলা জড়িয়ে ধরল। বাঁদরটা ছাগলকে পিঠে নিয়ে এ-গাছে ও-গাছে লাফ মেরে বন থেকে বেরিয়ে রওনা দিল তার বাড়ির দিকে।
বাড়ির কাছাকাছি এসে বাঁদর জিজ্ঞেস করল, “কী রে ছাগলছানা আর জলের ভেতর নাচবি?”
ছাগল বলল, “ভুল করেছি ভাই। আর কক্ষনও ও-কাজ করব না।”
বাঁদর বলল, “যার যা সাজে না, তার কি তা করা ভাল?”
ছাগল লজ্জায় চুপ করে রইল।
সেই থেকে বাঁদরছানার সঙ্গে ছাগলছানার খুব বন্ধুত্ব।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন