ফিকির ভাবনা

শৈলেন ঘোষ

ছেলেটা যেমন ছোট্ট, তেমনই তার নামটাও এইটুকুনি—ফিকি। নাম জিজ্ঞেস করলে সে শুধু ফিকিই বলবে। আর কিচ্ছু না। তুমি যদি জিজ্ঞেস কর, “এই ফিকি, কত বয়েস রে তোর?” সে বলতে পারে না। ফ্যালফ্যাল করে তোমার মুখের দিকে চেয়ে থাকবে। তারপর ফিক করে হেসে ছুট দেবে। তবু তার মুখখানা দেখে তুমি ঠিক আন্দাজ করতে পারবে, বয়েস তার নয়ের বেশি কিছুতেই হবে না। এই পৃথিবীতে সে ন’বছর বেঁচে আছে। তবুও এই ন’বছরে একদিনও তার মনে হয়নি, এই পৃথিবীটার নাম কেন পৃথিবী। এই পৃথিবীর মাথার ওপর ওই যে আকাশ, ওটা যে কার, সে নিয়েও মাথা ঘামায়নি ফিকি একদিনও। এমনকী, সূর্য কেন ওঠে আকাশে রোজ সকালবেলা, আর, কেনই-বা দিনের শেষে আকাশেই ডুবে যায়, কেনই-বা সেই আকাশে অত তারার আলো ফুটে ওঠে সন্ধেরাতে, এ-ভাবনা কোনওদিন তাকে পেয়ে বসেনি। সে শুধু জানে, এই যে ছেঁড়া পাতলুনটা পরে আছে, এটা তার। একেবারে নিজের। তার ডোরাকাটা এই জামাটার পকেটে যে পয়সাগুলো বেজে উঠছে মাঝে-মাঝে এই পয়সাও তার। এত পয়সা সে পেল কোথায়? ফিকির সাজপোশাক দেখলে তোমার সন্দেহ হতেই পারে, ছেলেটা বুঝি হাত পেতে পয়সা চেয়ে বেড়ায় পথে পথে। নয়তো চুরি। না, মোটেই না। কে বলেছে সে চোর? আর কেনই-বা সে চুরি করতে যাবে? ফিকি কম যায় কীসে? সে গান গায়। আমি জোর গলায় বলতে পারি, তার একটি গান শুনলে তোমার আরও গান শুনতে ইচ্ছে হবে। আবার আরও গান শুনতে শুনতে তোমার অনেক গান শুনতে ইচ্ছে হবেই-হবে। তারপর অনেক গান শুনে তুমি যদি তাকে ক’টা পয়সা দাও, কিংবা একটা ডোরাকাটা জামা, তবে তুমি কি তাকে হাত-পাতা বলবে? তা হলে তো যাঁরা, বড় বড় জলসায় গান শোনান, অনেক অ-নে-ক টাকা পান তাকেও হাত-পাতা বলতে হয়! কক্ষনও না। যে মানুষ আনন্দ দেন, তাঁকে শুকনো মুখে ফিরিয়ে দিতে আছে কি?

সত্যি, কী মিষ্টি গলা ফিকির। তার গান শুনলে, তুমি নিশ্চয়ই অবাক হয়ে ভাববে, কে দিল এমন সুর গলায়! অবিশ্যি ফিকি এমন গান যে গাইতে পারে সে নিজেও জানে না। কেউ তাকে গান শেখায়নি কোনওদিন। একদিনের কথা প্রায় তার মনে পড়ে যায়। সেদিন ও দাঁড়িয়েছিল এই সাঁকোটার ওপর একা। দূরে আকাশটা যেখানে মাঠের সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে গেছে, সেই দূরের দিকেই একদৃষ্টে চেয়েছিল ফিকি। এমনই করে সে তো রোজই চেয়ে থাকে। রোজই দেখে, আকাশের গা বেয়ে সূর্যটা নেমে যায় মাটির নীচে। সাঁকোর নীচে খাল। বয়ে চলেছে স্রোত। বড়-গাঙের ফিকে হলুদ জলের স্রোত এই খালের দু’পাশ উপচিয়ে বইতে বইতে ধেয়ে যাচ্ছে। সাগরের দিকে। ফিকি জানে না, এখান থেকে সাগর কতদূর। তবে ও শুনেছে, সে অনেকদূর। কে জানে, সাগর তার কোনওদিন দেখা হবে কি না! ও শুনেছে, সাগরের ঢেউ নাকি অনেক উঁচু। মস্ত-মস্ত। হাতির মতো। সেই ঢেউ যখন পাক খেতে খেতে ডাঙার ওপর আছড়ে পড়ে, তখন নাকি হাতিও হার মেনে যায়। ফিকি এসব কথা যতই শোনে, বুকটা তার ততই শিউরে ওঠে। কারণ, সাগর না দেখলেও ফিকি হাতি তো দেখেছে। একবার নয়, অনেকবার। সেই কথাই তার মনে পড়ে যায়। হ্যাঁ, সেই একদিনের কথা। সেবার যখন সার্কাস-পার্টি এসেছিল, তারা তাবু ফেলেছিল সামনের মাঠটায়। তখন তাদের সঙ্গে ন’টা হাতি এসেছিল। রোজ এই খালের জলে চান করতে নামত হাতিগুলো। আর ফিকি সাঁকোয় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখত। সে ভারী মজার চান। শুঁড় ডুবিয়ে জল নিয়ে তাদের সে কী খেলার ধুম! তাদের শুঁড়গুলো ঠিক যেন পিচকিরি। শুঁড়ে জল টেনে নিচ্ছে আর ছ্যার-রা-রা-রা করে এর গায়ে, তার গায়ে ছিটিয়ে দিচ্ছে। কী মজাই না লাগছিল ফিকির। ফিকি দেখতে দেখতে একেবারে হেসে গড়িয়ে যায় আর-কী। ওমা! এমন সময় হয়েছে কী, একটা হাতি শুঁড়ভর্তি জল দিয়েছে ফিকির গায়েই ছুড়ে! ব্যাস! জলের তোড়ে ফিকির একেবারে নাকানি-চোবানি। এমন আচমকা ঘটে গেল ব্যাপারটা যে, ফিকি একদম হতভম্ব। তারপর যেই না তার হুঁশ হয়েছে, ফিকি একেবারে হেসে কুটোকুটি। সে ভারী মজার কাণ্ড। তারপর কী মনে হয়েছিল ফিকির, এই সাঁকো থেকে ছুটতে ছুটতে হাতির দিকেই ধেয়ে গেল। ভাবল, এই জলের সঙ্গে, আর হাতির সঙ্গে সে-ও খেলা করবে। কিন্তু ওরে বাব্বা! কী পেল্লাই এক-একটা হাতি! ফিকি হাতির সামনে দাঁড়াতেই, দ্যাখো, মনে হচ্ছে না, ঠিক যেন কুমিরের পাশে টিকটিকি। এখন যদি একটা হাতি ফিকিকে গুঁড়ে জাপটে ধরে ছুড়ে দেয় তো পটকা-ফটাশ! তাই অবাক হয়ে সেদিন ভেবেছিল ফিকি, সাগরের ঢেউ যদি সত্যিই হাতির মতো হয়, তবে না-জানি সে কী সাংঘাতিক দেখতে!

সাংঘাতিক মনে হতেই ফিকির মনটা সেদিন অস্থির হয়ে উঠেছিল। আহা রে! সাগরের ঢেউ যদি এখনই সে দেখতে পায়! না, ঢেউ তার এখনও দেখা হয়নি। তবে এই সাঁকোয় দাঁড়িয়ে রোজই সে সূর্য দেখে এই সাঁঝের বেলায়। যদি মেঘ না থাকে, তবে টকটকে লাল সূর্যটা টুক করে কেমন মাটির নীচে লুকিয়ে পড়ে। তার পরেও অনেকক্ষণ রং ছড়িয়ে থাকে। আকাশটা টকটক করে। তবে, যদি শেষ বর্ষার টুকরো-টুকরো মেঘ থাকে আকাশে, আর একটুকরো মেঘ যদি ওই ডুবন্ত সূর্যের মুখখানি ঢেকে দেয়, তখন যে কী ভাল লাগে ফিকির! ওই মেঘের আড়াল ভেঙে সূর্যের ছটাগুলি এমন ছড়িয়ে পড়ে আকাশ-জুড়ে যে, তাই দেখলেই ফিকির মনে হয়। সে ছুটে যায় ওই আকাশে। তখন তার মন বলে, আহা রে! এই সাঁকোটা যদি অনেক উঁচু হত। তার হাতদুটি যদি ছুঁতে পেত আকাশটাকে, তবে সে এক দারুণ মজা হত! নিদেন, ফিকির যদি দুটো ডানা থাকত পাখির মতো! তবে উড়তে উড়তে ফিকি চলে যেত ওই মেঘের রাজ্যে। মেঘ-ভাঙা ওই আলোর সঙ্গে সে-ও লুকোচুরি খেলত। কিন্তু তা তো আর হবার নয়। মানুষ কী আর পাখি হয়! আকাশটা যে পাখির। তুমি যদি সেই আকাশ দখল কর, পাখিরা থাকবে কোথায়?

ফিকি এই কথা ভাবে আর ভাবে। আর মাঝে মাঝে শোনে, মানুষ চাদটা নাকি দখল করে নিয়েছে। এবার নাকি আকাশটাও দখল করে নেবে। তা যদি হয় তবে পাখিরা সত্যিই থাকবে কোন আকাশে?

সকল অধ্যায়
১.
কাক্কাবোক্কার বিয়ের পদ্য
২.
ইতিমিচিসাহেবের স্বপ্নের গাধা
৩.
কাক্কাবোক্কার টোক্কা ফক্কা
৪.
কাক্কাবোক্কার কান্নাকাটি
৫.
কাক্কাবোক্কার গানের জলসা
৬.
ইতিমিচিসাহেবের ছাগলি-মা
৭.
কাক্কাবোক্কার বায়নাক্কা
৮.
কাক্কাবোক্কার ঘাড়ে ভূত
৯.
পিঠ নিয়ে পিঠোপিঠি
১০.
কাক্কাবোক্কার কাণ্ড বটে
১১.
গল্পের নাম ফিক
১২.
কাক্কাবোক্কার ভুতুড়ে কাণ্ড
১৩.
ইতিমিচিসাহেবের ঘোড়া
১৪.
রাজা বাপ্পাহুহুর দাড়ি
১৫.
ছি ছি, এ কী কাণ্ড
১৬.
ইতিমিচিসাহেবের নাচানাচি কাণ্ড
১৭.
আচ্ছা আজব ইচ্ছে বটে
১৮.
রগড় নিয়ে কাণ্ড জবর
১৯.
ইতিমিচিসাহেবের আম্মা বিল্লি
২০.
ভগবানের হাত
২১.
তাক্কাদুম
২২.
চ্যাং ঝোলা
২৩.
স্বপ্ন দেখি রূপকথায়
২৪.
দস্যি সেই ছেলেটি
২৫.
পাখিমের আকাশ
২৬.
সোনা-ঝুরঝুর হাসি
২৭.
ছুম আর ছবি
২৮.
টুক্‌কির ফুলবাগানে
২৯.
চাঁদ আর পাপুই
৩০.
কালো বেড়ালের গুপ্তধন
৩১.
মায়ের সোনা ছেলে আফজল
৩২.
এক বুড়ো আর একটি পাখি
৩৩.
আজবদেশের নাচন-পাখি
৩৪.
একলা ডিঙি যখন একা
৩৫.
সেই যে আলো নীল
৩৬.
আকাশের দুই বন্ধু
৩৭.
তিনটে বুড়োর গল্প
৩৮.
ভেলকির নাম ঘোড়া
৩৯.
বন্ধুর নাম কাকের ছানা
৪০.
টুং-এর বন্ধু ঝুমঝুমি
৪১.
উড়ুক্কু ভূত
৪২.
ঘণ্টা বাজে টুংটাং
৪৩.
সময়ের জাদুখেলা
৪৪.
আমি শূন্য
৪৫.
কেউ জানে না কে চোর
৪৬.
একটি মেয়ের গল্প
৪৭.
শুধুই গল্প অদ্ভুতুড়ে
৪৮.
আলোর সন্ধান
৪৯.
সোনার ঘণ্টা
৫০.
সে এক ভেলকি
৫১.
সুন্দর যাকে বলি
৫২.
সর্দার
৫৩.
বেড়াল-বাঁদর-গাধা আর লোকটা
৫৪.
রুমঝুম নূপুরের রূপকথা
৫৫.
হো-বুড়োর খুদে বন্ধু
৫৬.
ভালবাসি পশুপাখি
৫৭.
বুক্কুটা তা বলে বোক্কা নয়
৫৮.
ছোট্ট পাখি আর কেঁদো বাঘ
৫৯.
যার যা সাজে না
৬০.
কানকাটা বাঘ
৬১.
একটা গান শেখাবে
৬২.
হ্যাংলা
৬৩.
কুক্কু আর হাঁসছানা
৬৪.
ছোট্ট পাখি টুনটুন
৬৫.
ছাগল-বুড়োর মামা
৬৬.
চাচার গানে নাচানাচি
৬৭.
একটা ছিল নেংটিছানা
৬৮.
টুক্কুর হাসি
৬৯.
হুম-চক্‌কা
৭০.
কাণ্ড বটে আজব
৭১.
পিড়িং-পিড়িং গঙ্গাফড়িং
৭২.
একটা বুদ্ধু নেংটি
৭৩.
বনমানুষ না ভালুক
৭৪.
তিড়িং-তিড়িং পাখিটা
৭৫.
কীসের থেকে কী
৭৬.
গল্পের রং রকম রকম
৭৭.
দাদু ভুলে গেছে
৭৮.
মুক্তো আছে কোন ঝিনুকে
৭৯.
নীল গোলাপের গল্প
৮০.
ডাকু
৮১.
অদ্ভুত সেই ঘোড়ার গল্প
৮২.
সে কী আনন্দের দিন
৮৩.
আলোর ভোর
৮৪.
রাংতা
৮৫.
মুক্তো-আঁকা
৮৬.
ইয়াসিনের চিঠি
৮৭.
গুড়িয়া
৮৮.
ছই একটি মেয়ের নাম
৮৯.
মায়ের জন্য একটি গোলাপ
৯০.
এই সুন্দর পৃথিবীতে
৯১.
স্বপ্নের ঝলমলে আলো
৯২.
সাগরের বন্ধু জানলা
৯৩.
রহস্য
৯৪.
ফিকির ভাবনা
৯৫.
নির্দোষ দুই বন্দি
৯৬.
রতন
৯৭.
রোদ ঝিলমিল
৯৮.
রহস্যের নাম সুন্দরী
৯৯.
ঝড়ের বনে আতঙ্ক
১০০.
কুয়াশার তিন সঙ্গী
১০১.
মায়ের ডাকা নামটি
১০২.
ভোরের আলো ফুটছে
১০৩.
ভালবাসার পৃথিবী
১০৪.
এ সময়ের গল্প
১০৫.
উত্তর পাইনি এখনও
১০৬.
অরুর বিকেল হারিয়ে গেল
১০৭.
মিষ্টি হাসির খেলনা
১০৮.
ম্যাজিক
১০৯.
বন্ধ ঘরে কান্নার শব্দ
১১০.
পাকা ধানের গন্ধ
১১১.
সেতুপারের বন্ধুরা
১১২.
সুলতান
১১৩.
তুসি জাদু জানে
১১৪.
তিত্তি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%