শৈলেন ঘোষ

টুক্কু থাকে একটা বনে। পাহাড়টার গা বেয়ে নেমে এসেছে সেই বন। টুক্কু একটা খরগোশ।
একদিন খুব সকালে টুক্কু টুক করে তার বনের গর্ত-ঘরের ভেতর থেকে মাথা বাড়াল। ইয়া লম্বা কানদুটো একবার চট করে ইদিক ঘোরাল, আর-একবার উদিক ঘোরাল। কেউ আসছে না কি? ভালুকটা? কি শ্যালটা?
না, না, এখন ভালুকও নেই, শ্যালও নেই!
তুড়ুক করে বেরিয়ে পড়ল টুক্কু তার গর্ত থেকে। তারপর তিড়ি-তিড়ি তুক-তুক করে লাফিয়ে চলল পাহাড়ের হু-ই-ই ওপর বাগে। আঃ। পাহাড়ের ওপরে উঠে, কচিপাতা খেয়ে আজ সকালটা দিব্যি কাটানো যাবে। তাই সে চলল ওপরে, আরও ওপরে।
কী যেন একটা শব্দ শোনা যাচ্ছে! খস-স-স! খস-স-স! একটা হেলে-পড়া গাছের ওপর টুক্কু লাফিয়ে উঠে পড়ল। একবার ইদিক দেখল, একবার উদিক শুনল। না! তেমন কিছু নয়। একটা গিরগিটি।
আবার সে চলল, তাড়াতুক, তিড়িতুক। চলতে চলতে হঠাৎ টুক্কু দাঁড়ায় কেন? আয়ি ব্যাস! একটা ইয়া বড় পাথর কেমন পাহাড়ের গা বেয়ে গড়িয়ে আসছে! টুক্কু থমকে দাঁড়াল। এদিক-ওদিক দেখতে লাগল। ভয়ে ভয়ে।
ধ্যাত, ওটা পাথর নাকি! ওটা তো একটা ভালুক। তাই বলি পাথরটা অমন কালো কুচকুচে কেন। ভালুকটা হা-উ-উ করে মুখ উঁচিয়ে হাই তুলল। সামনের ঠ্যাংদুটো সামনে ছড়িয়ে, পেছনের ঠ্যাংদুটো পেছনে ঠেলে গা ভাঙল। নাহ্ খিদে পেয়েছে ভালুকভায়ার! এইসময় একটা নাদুস-নুদুস খরগোশ পাওয়া যায় তো পেট ভরে খাওয়া যায়!
ভালুক চলল খরগোশের খোঁজে। থুপ থুপ। এপাশ-ওপাশ নাক ঘুরিয়ে শুঁকছে উঁস-স-স! শুঁকছে গাছের গুঁড়ি, ঘাসের পাতা। ব্যাস! এমন সময়ে হয়েছে কী, একটা পাতা ভালুকের নাকে ঢুকে গেছে, হ্যাঁচ্চো-ও-ও।
আবার হাঁটা দিল ভালুকভায়া। পাহাড়ের গা বেয়ে ঝরনার জল নেমেছে। এক জায়গায় জল জমে পুকুর হয়ে গেছে। পুকুরের ধারে একটু বসল ভালুকটা। একটু জিরোতে হবে। এ কী রে! জলের ভেতরে মাছ! আরে, আরে! এ যে দেখি অনেক মাছ! মাছ খেতে খুব মিষ্টি। একটা ঠ্যাং জলে ডোবাল। ইচ্ছে ছিল, জলে নেমে মাছ ধরবে। উঃ! কী ঠান্ডা জল। এই শীতে ঠান্ডা জলে কী মাছ ধরা যায়! তার চেয়ে খরগোশই ভাল। তাই মাছ ছেড়ে খরগোশ ধরতে পাহাড়ের ওপর দিকে হাঁটল।

ওদিকে শ্যালের গর্তে শ্যালেরও ঘুম ভেঙেছে। সে হুপ-প-প করে হাই তুলল। মাস্টারমশায়ের হাতের ছড়িটার মতো সিধে হয়ে গা ভাঙল। একবার ইদিক দেখল, আর-একবার উদিক দেখল। না, তারও খিদে পেয়েছে। তারও মনে হল, এই সময়ে একটা মোটকা-মটুস খরগোশ পেলে মন্দ হয় না। তাই শ্যালদাদাও চলল, খরগোশের খোঁজে।
হঠাৎ কী একটা শব্দ কানে এল না? ধ্যাত! ওটা একটা টুনটুনি। উড়ে এসে গাছের ডালে বসল। সেই গাছের নীচ দিয়ে জলদি পায়ে হাঁটল শ্যালদাদা।
ওদিকে এতক্ষণে টুক্কুও উঠে গেছে পাহাড়ের হুই-ই-ই ওপরে। চুপটি করে বসে বসে দেখছে আর শুনছে। ভালুক আসছে, শ্যাল আসছে। কিন্তু ভালুকও জানে না শ্যালের কথা, শ্যালও জানে না ভালুকের কথা। এমন সময় হঠাৎ ভালুকভায়ার পাহাড়ের ওপর দিকে চোখ পড়ে গেল। ওটা যেন কী একটা ওপরে! কানদুটো লটপট করে একবার ইদিক বেঁকছে, একবার উদিক হেলছে! ওই তো, ওটা একটা খরগোশ! অমনি ভালুকভায়া নড়বড় করে পা চালিয়ে, তড়বড় করে ছুটল।
ঠিক সেই সময়ে ওদিক থেকে শ্যালদাদাও ওপর দিকে তাক কষল। কী ওটা রে! ঘাপটি মেরে বসে আছে! খাড়া কান হেলছে, দুলছে। ওই তো, ওটা একটা খরগোশ! অমনি শ্যালটা টপাস-টপাস করে ওপরবাগে লাফ মেরে উঠতে লাগল।
টুক্কুটা এদিক চাইল। আয়ি ব্যাস! একটা ভালুক তেড়ে আসছে। ওদিক চাইল। উরি ব্যাস! একটা শ্যাল লাফিয়ে আসছে!
ছুটতে ছুটতে খরগোশের কাছাকাছি এসে পড়েছে ভালুক।
লাফাতে লাফাতে শ্যালটাও পৌঁছে গেছে খরগোশের একদম কাছে।
ভালুক চোখ-কান বুজে মারল লাফ খরগোশকে তাক করে।
ওদিকে শ্যালও ল্যাজ গুটিয়ে মারল ঝাঁপ একেবারে একই সঙ্গে চোখ বুজিয়ে খরগোশের দিকে।
ঠিক সেই তক্কে টুক্কুটা শূন্যে মেরেছে এক ডিগবাজি। মেরেই ছুট ঘরের দিকে। তিড়ি-তুক, তাড়া-তিক। যত জোরে পারল লাফ মারল।
আর যাবে কোথায়! ভালুকেরও চোখ বোজা, শ্যালেরও চোখ বন্ধ। দু’জনেই দু’জনকে দেখতে পায়নি। টুক্কুকে তাক করে লাফ মারতেই দুম-ম। মাথায় মাথায় ঠোকাঠুকি। এদিকে শ্যালটা গোঁত্তা মেরে চিতপটাং। আর ওদিকে ভালুকটাা, মুখ থুবড়ে মাথা ফটাং!
ভালুক ভাবছে, তাই তো মাথায় কী পড়ল!
ভালুক উঠে দাঁড়াল। গা ঝাড়া দিল। পেছনে ফিরে দেখল। মনে মনে ভাবল, কেউ দেখে ফেলেনি তো। না বাবা, আজ আর খরগোশ খেয়ে কাজ নেই। বরঞ্চ আর একদিন দেখা যাবে। এইকথা ভাবতে ভাবতে ভালুক রাস্তা দেখল।
শ্যালটাও উঠে বসল। তার শিরদাঁড়ায় খিল ধরে গেছে। ভয়ে ভয়ে এদিক ওদিক দেখল। মনে মনে ভাবল, খেতে গেলুম খরগোশ, খেতে গিয়ে মাথায় যেন বাজ পড়ল। দরকার নেই বাবা খরগোশ খেয়ে। মানে মানে ঘরের ছেলে ঘরে যেতে পারলেই বাঁচি। এই ভেবে ঘরের ছেলে ঘরে চলল।
আর টুক্কুটা? সে তো কখন ঘরে চলে এসেছে। এসে চুপটি করে লুকিয়ে পড়েছে। একটু পরে খুব সাবধানে গর্ত থেকে মাথাটা বার করে উঁকি মারল। লম্বা লম্বা কানদুটো ইদিক-ওদিক ঘোরাল। না, আর কিছু শোনা যাচ্ছে না। মনে হল বিপদ কেটেছে, কেউ কোথাও নেই। তখন কী জোরে হেসে উঠল টুক্কুটা হ্যা-হ্যা-উ-উ! ঠিক যেমন খরগোশ হাসে, হাসিটা ঠিক তেমনি!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন