তিনটে বুড়োর গল্প

শৈলেন ঘোষ

কতদিন, কত বছরে এমন গভীর হয়েছে এই জঙ্গল, কেউ জানে না। কেউ জানে না, কতদিন কত বছরে মানুষের অজান্তে তার এমন বাড়-বাড়ন্ত। এ কি পাহাড়? না কি মস্ত একটা টিলার গায়ে-গায়ে ছড়িয়ে পড়েছে জঙ্গলের অগুনতি গাছ-গাছালি? সে নিয়ে কেউ খোঁজখবর করেনি কোনও দিন। এ জঙ্গলের কোথায় শুরু, কোথায় শেষ, কেউ ব্যস্ত হয়নি তা জানার জন্যেও। তা হবে হয়তো পাঁচ হাজার কি ছ’ হাজার বছর আগে এ জঙ্গল ছিলই না এখানে। ছিল এক মহানগর। অথবা কোনও শক্তিমান রাজার রাজধানী। এখন সেই রাজাও নেই, নেই সেই রাজধানী। আছে শুধু জঙ্গল। আর জঙ্গলের নীচে মাটির তলায় আছে তার ধ্বংস্তূপ। সেই ধ্বংসস্তূপ হতে পারে রাজপ্রাসাদ। নয়তো দেবতার মন্দির! প্রার্থনাসভা! ঘর-বাড়ি! রাস্তা-ঘাট! আর মানুষের শেষ আশ্রয় কবরস্থান! এই ধ্বংসস্তূপেই শুনতে পেয়েছি এক গল্প। তিনটে বুড়োর গল্প। এ-গল্প হাজার বছর আগের হতে পারে। হতে পারে দুশো-তিনশো বছর আগেরও।

তিনটে বুড়োর বয়সের কেউ জানে না হিসেব। কে যেন তাদের একদিন ঠাট্টা করে বলেছিল, “আর কেন, তিনকাল কেটে এককালে ঠেকেছে। এবার তো কেটে পড়লেই পারো।”

মানুষ তো তিনজন। সেই তিন বুড়োমানুষের মন তো আর একসুরে বাঁধা নয়। তাই, সেই ঠাট্টা শুনে একজন মনে খুব দুঃখ পেয়েছিল। একজন খুব রেগে গেছল। আর একজন হেসেছিল। সে হয়তো হাসতে হাসতে ভেবেছিল, কেউ চিরকাল জোয়ান থাকে না। যে বেঁচে থাকে অনেকদিন, তাকেও একদিন বয়সের ভারে নুয়ে পড়তে হয়। তারও কোমর ভাঙে।

যে রেগে গেছল সে হয়তো ভেবেছিল যে-মুখ্য বুড়োমানুষের মনে আঘাত দিয়ে এমন কথা বলে, তার জানা নেই, ওই পাহাড়টা হাজার হাজার বছরের বুড়ো। ওর চুড়োয় তুষারের মুকুট। ওই তুষার গলে গলে ঝরনাধারায় নেমে আসে পাথর ডিঙিয়ে। সে ঝরনা নদী হয়ে বয়ে যায়। গিয়ে পড়ে সমুদ্রে। তাদেরও বয়স হাজার হাজার বছর। এরা আছে বলেই পৃথিবী এত সুন্দর। এত জীবন্ত। কেউ তো বলে না তাদের, পৃথিবী থেকে বিদেয় হতে।

কিন্তু যে-মানুষটি দুঃখ পেয়েছিল, শুধু সে-ই বলেছিল, “আমাদের আর দরকার নেই লোকের গঞ্জনা শোনার। আমরা যে ক’টা দিন বেঁচে থাকব, চলো সবার চোখের আড়ালে চলে যাই। চলো ওই ঘন জঙ্গলে ঢুকে পড়ি। কেউ নেই ওখানে। কেউ ওখানে বুড়ো বলে আমাদের হেনস্থা করবে না। যে ক’টা দিন বাঁচব, শান্তিতে থাকব।”

শেষ পর্যন্ত সেই দুঃখী বুড়োর কথাই মেনে নিল আর দু’ বুড়ো। তারা চলল জঙ্গলে লোটাকম্বল পিঠে নিয়ে। লোটাকম্বলই যে তাদের শেষ সম্বল।

এমন ঘনজঙ্গলে কেউ কোনও দিন ঢুকতে সাহস পায়নি। কোনও পথের চিহ্ন নেই সেখানে। চারদিক ঢেকে আছে ঝোপঝাড়ে। আর আছে অসংখ্য গাছের গায়ে অগুনতি গাছের হেলদোল। সেই অসংখ্য গাছের ফাঁক-ফোকর খুঁজে-খুঁজে তারা এগিয়ে চলল। তারা যতই ভেতরে এগিয়ে যায়, জঙ্গল ততই আকাশ ঢেকে ফেলে। ছায়া নেমে আসে। তিন বুড়ো হাঁপায়, ঘামে, আর থেকে থেকে থামে। দম নেয়। সে নয় ভাল, এখন দিন। ছিটেফোঁটা আলোর তবু আভাস পাওয়া যায়। কিন্তু রাতে, নিকষকালো অন্ধকারে কী করবে তারা? অবশ্যি তিনজনের তিনটে লণ্ঠন আছে। সঙ্গে খাবারও। কিন্তু লণ্ঠন তো আর তাদের জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত জ্বলবে না। খাবার শেষ হয়ে যাবে। তারপর? তারপর অন্ধকারে ঘাসপাতা খেয়ে থাকতে হবে যে! তখন?

তখন যা হবার হবে। এখন তারা টিলার গা ছুঁয়ে অনেকটা ওঠা-নামা করে বেশ খানিকটা জঙ্গলের গহনে ঢুকে পড়েছে। এবার বোধহয় তারা একটু বসবে। একটু জিরিয়ে নেবে। একটানা অনেকটা ঝোপঝাড় ডিঙিয়ে থমকে গেছে মানুষ তিনটে। হ্যাঁ, সত্যি তা-ই। তারা দাঁড়াল। ঘনঘন নিশ্বেস পড়ছে। এদিক ওদিক দেখছে। কোথায় বসবে তারা! ঝোপঝাড়ের ওপর বসা তো যায় না। কাজেই একটু বসার জন্যে ঝোপ ডিঙিয়ে এধার-ওধার করতে লাগল।

এমন সময়ে, খানিকটা আচমকাই টিলার একটা ঝোপঢাকা পাথরে হোঁচট খেল সেই দুঃখী বুড়োমানুষটা। হুমড়ি খেয়ে পড়েও গেল। অবিশ্যি লাগল না তেমন। আর দুই বুড়োমানুষ তার দিকে সাহায্যের হাত বাড়াবার আগেই সে নিজেকে সামলে নিয়েছে। উঠে পড়েছে। কিন্তু তার নজরে পড়ে গেছে, ইতস্তত ছড়ানো ভাঙা ইটের স্তূপ। যেখানে এতক্ষণ জঙ্গল হাঁটকে-হাঁটকে তারা হাল্লাক হয়ে গেছে একটু বসবার জায়গার জন্যে, সেখানে হঠাৎ এমন ইটের স্তূপ দেখলে কে না আশ্চর্য হয়ে থমকে যায়! এখন এই ইট সাজিয়ে আরামসে বসা যায়। চাই কী, ইটের ওপর গাছের নরম পাতা বিছিয়ে গড়াগড়িও দেওয়া যায়!

সুতরাং সেই তিন বুড়ো এই মুহূর্তে গড়াগড়ির কথা না-ভেবে ইট সাজাল একটু বসবার জন্যে। বসলও তারা। তারপর নিশ্চিন্তে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। সেই রাগি বুড়োমানুষটি বলল, “বাঁচা গেল, এখানে আর কেউ আমাদের হেয় করবার নেই। যে ক’টা দিন বাঁচব অন্তত শান্তিতে থাকতে পারব।”

সেই দুঃখী বুড়োমানুষটি উত্তর দিল, “আমি তো সেই কথাই তোমাদের বলেছিলুম।”

তখন সেই হাসিখুশি বুড়োমানুষটি বলল, “এ জঙ্গলে কেউ কোনও দিন ঢোকে না। অনাদরে পড়েই আছে। এখন আমরা তো বলতেই পারি এ জঙ্গল আমাদের।”

এবার সেই রাগি মানুষটি হেসে ফেলল। হাসতে হাসতে বলল, “এ জঙ্গলটা আমাদের, একথাটা বলতে পারলে ভালই হত। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, এত বড় জঙ্গল নিয়ে আমরা করবটা কী? সামলাব কেমন করে? তার চে বরং বলো, যেটুকু জায়গায় এখন আমরা আশ্রয় পেয়েছি, সেটুকু জায়গাই আমাদের শেষ দিন পর্যন্ত থাক। এসো, এই জায়গাটাই আমরা হাত লাগিয়ে পরিষ্কার করে ফেলি। আর এই যে ইটের স্তূপ ছড়িয়ে আছে চারদিকে, এই ইট সাজিয়ে একখানা ঘর বানিয়ে ফেলি তিনজনে। বলা তো যায় না, বাঘ-ভালুকও তো থাকতে পারে এই জঙ্গলে। আমরা তো বেঘোরে মরার জন্যে এই জঙ্গলে আসিনি। এসেছি, যে-ক’টা দিন বাঁচব শান্তিতে থাকব বলে।”

কথাটা মন্দ বলেনি রাগি মানুষটি। মেনে নিতে কোনও আপত্তিই করল না দুঃখী আর হাসিখুশি মানুষ দু’জন। বলতে কী, একটু জিরিয়ে নিয়ে তখনই তারা জঙ্গল সাফ করতে লেগে পড়ল।

বয়সে বুড়ো হলে কী হবে, আশ্চর্য দুরন্ত গতিতে হাত চালাল তারা। বেশ খানিকটা জায়গা সাফা করে ফেলল কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই। তারপরেই তাদের চমক ভাঙল। থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। কেননা ওই ভাঙা ইটের স্তূপ সরাতেই তারা দেখতে পেল, ইটের আড়ালে একটা ভাঙা সিঁড়ি। এবড়ো-খেবড়ো। পাতালে নেমে গেছে।

তিনজনেই ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেছে সেই দৃশ্য দেখে। তিনজনেই অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল নিমেষে। তারপর তারা এর-ওর মুখের দিকে তাকাতে লাগল। তাদের হঠাৎ হুঁশ হল। হাসিখুশি মানুষটি বলে উঠল, “এই সিঁড়িটা কি তবে সত্যিই পাতালে নেমে গেছে?”

রাগি মানুষটি উত্তর দিল, “ওপর থেকে নীচের খবর জানা যায় না। আমার কাছে ব্যাপারটা খুব রহস্য লাগছে। এ-রহস্যের কিনারা সিঁড়িতে পা রেখে পাতালে না নামলে করা যাবে না।”

সেই দুঃখী মানুষটি তখন খুবই আগ্রহের সঙ্গে বলে উঠল, “চলো না, নামি! দেখি না কী আছে! কোন রহস্য লুকিয়ে আছে মাটির তলায়!”

সিঁড়ি বেয়ে নীচে নামার আগ্রহ কেবল সেই দুঃখী মানুষটির একারই নয়, সবারই। তবু তারা হুট করে সিঁড়িতে পা রাখল না। তারা কিছুক্ষণ নীচে নামার কুফল-সুফল নিয়ে সলা-পরামর্শ করল। পরামর্শ সেরে তারা নীচে নামাই স্থির করল। আর সেই রাগি মানুষটিই সিঁড়িতে পা রাখল প্রথমে। দুঃখী মানুষটি আর হাসিখুশি মানুষটি তাকে অনুসরণ করল।

না, এ সিঁড়ি পাতাল অবধি যায়নি। বেশ কটা ধাপ নেমে আসতেই তারা গভীর অন্ধকারে ঢাকা পড়ে গেল। বুঝতে পারল তারা, জায়গাটা যদিও দেখা যাচ্ছে না, তবে পা রেখে মনে হচ্ছে খাবলাখুবলো নয়, সমতল।

হাসিখুশি মানুষটি বলল, “আমার লণ্ঠনটা জ্বালি।”

হ্যাঁ, আমরা তো জানি, তাদের তিনজনের লটবহরের মধ্যে একটা করে লণ্ঠনও ছিল। ছিল দেশলাইও। দুঃখী মানুষটি বলল, “না, তিনটে লণ্ঠন অবশ্য একসঙ্গে জ্বালানোটা ঠিক হবে না। একটাই জ্বলুক। একটার তেল ফুরোলে তখন আর একটা জ্বালা যাবে। একসঙ্গে তিনটের তেল ফুরিয়ে গেলে, তখন তিনজনকেই একসঙ্গে অন্ধকারে হাঁকপাক করতে হবে।”

হক কথা। ঠিকই বলেছে দুঃখী সেই বুড়োমানুষটি। সুতরাং হাসিখুশি মানুষটিই প্রথম লণ্ঠন জ্বালল। ফস করে দেশলাইয়ের জ্বলন্ত কাঠির ছোঁয়ায় লণ্ঠন জ্বলে উঠতেই ঝলসে উঠল চারদিক। তিনজনেই থতমত খেয়ে গেছে! কেননা, তখন তারা যেদিকেই তাকায়, সেইদিকেই চোখে পড়ে মানুষের মূর্তি। দাঁড়িয়ে আছে। আলোয় ঝলমল করছে। নড়ে না, স্থির।

তিনটে বুড়োমানুষও স্থির। দাঁড়িয়েছিল থমকে। মুখে কথা ছিল না। অথবা বলা যায় সেই দৃশ্য দেখে তারা যেন ভুলে গেছল কথা বলতে। সেই রাগি মানুষটিও অবাক স্বরে আপন মনেই যেন বলে উঠল, “সোনা! ওই মূর্তিগুলো সোনার।”

হাসিখুশি মানুষটি আনন্দে চিৎকার করে উঠল, “সোনা-আ-আ!” দুঃখী মানুষটি কোনও কথা বলল না। তার চোখ জ্বলজ্বল করছে। একটা মূর্তির কাছে সে এগিয়ে গেল। মূর্তির গায়ে সে হাত দিয়ে দেখতে লাগল সত্যিই সোনা কি না। তারপর দুঃখী মুখখানা তার ধীরে ধীরে আনন্দে উছলে উঠল। সে চিৎকার করল না। ফিসফিস করে বলে উঠল, “এত সোনা কার?”

সেই রাগি মানুষটি রাগটাগ ভুলে উল্লাসে আত্মহারা হয়ে বলে উঠল, “আমাদের।” “আমাদের,” বলে উঠল সেই হাসিখুশি মানুষটিও।

দুঃখী মানুষটি দিশেহারার মতো মূর্তিগুলোর দিকে তাকায়, আর বলে, “এত সোনা নিয়ে কী করব আমরা!”

হাসিখুশি মানুষটি বলে, “আমরা প্রাসাদ তৈরি করব, সোনার প্রাসাদ।”

রাগি মানুষটি বলল, “ঠিক বলছ, আমাদের তখন আর এই লোটা-কম্বল কাঁধে নিয়ে চরকির মতো পথে পথে ঘুরে বেড়াতে হবে না। সোনার সম্পদে আমাদের প্রাসাদ ঝলমল করবে। মানুষে-মানুষে গমগম করবে। এ আসবে, সে আসবে। এ বলবে এটা দাও, সে বলবে ওটা দাও! তখন আর কেউ হেনস্থা করতে সাহস পাবে না। কে করবে তুচ্ছতাচ্ছিল্য তখন আমাদের! কে বলবে আমাদের ‘তিনকাল কেটে এককালে ঠেকেছে’!”

দুঃখী মানুষটি যদিও এখন দুঃখ ভুলে আত্মহারা, তবু সে বলতে ভুলল না, “আমাদের যে ‘তিনকাল কেটে এককালে ঠেকেছে’—এ কথাটা তো মিথ্যে না।”

রাগি মানুষটি তখন দুঃখী মানুষটিকে জিজ্ঞেস করল, “অসংখ্য এই সোনার মূর্তি দেখে তোমার কি মনে হচ্ছে না, তুমি নতুন জীবন ফিরে পেয়েছ।”

দুঃখী মানুষটি উত্তর দেওয়ার আগেই সেই জ্বলন্ত লণ্ঠন হাতে হাসিখুশি মানুষ উত্তর দিল, “আমার মনে হচ্ছে, আমি ফিরে পেয়েছি নতুন জীবন।”

দুঃখী মানুষটি বলল, “এসো তবে, একটা একটা করে এই মূর্তি আমরা এই গহ্বর থেকে ওপরে তুলে নিয়ে যাই।”

রাগি মানুষটি উত্তর দিল, “হ্যাঁ ঠিক কথা, এসো হাত লাগাই।”

ব্যাস! সঙ্গে সঙ্গে বাধা। হাসিখুশি মানুষের হাতের লণ্ঠনটা ঠিক এই মুহূর্তে ঝট করে নিভে গেল। তেল ফুরিয়েছে। আবার ঘোর অন্ধকারে ডুবে গেল তারা।

দুঃখী মানুষটি বলল, “একটার তেল শেষ হয়েছে। এবার আমারটা জ্বালছি।” বলে সে-ও দেশলাই জ্বেলে লণ্ঠনের আলোয় ঘর উছলে দিল। লেগে পড়ল তিনজনে সোনার মূর্তি নীচের গহ্বর থেকে ওপরে নিয়ে আসার কাজে।

কিন্তু এ কী! মূর্তি যে নড়ে না। সরে না। এ যে পাথরের সঙ্গে শক্ত করে সাঁটা।

তিনজনে টান মারে, ঠেলা দেয়।

একচুলও হেলাতে পারে না।

তবে দেখা যাক তো আর-একটা মূর্তি।

সেটাও তাই, পাথরে সাঁটা।

আর একটা।

আরও দুটো।

আরও পাঁচটা-ছ’টা-দশটা।

কোনওটাই নড়ল না। হাঁফিয়ে গেল তিনটে মানুষ মূর্তি টানাটানি করতে করতে। ঘেমে-নেয়ে একশা।

তখন রাগি মানুষটি বলল, “চলো, দেখি, এখানে কোথাও কোদাল কিংবা গাঁইতি পাই কি না।”

ঘরখানা তো একটুখানি না। যথেষ্ট বড়। সুতরাং তারা এ-মুড়ো থেকে ও-মুড়ো কোদাল কিংবা গাঁইতি খুঁজতে লাগল। খুঁজতে খুঁজতে হয়রান হয়ে গেল, পেল না। কিন্তু তাদের নজরে পড়ে গেল একটা সোনার সিংহাসন। হাসিখুশি মানুষটি দেখতে পেয়েছে প্রথম। সে আচমকা চিৎকার করে উঠেছে, “একটা সিংহাসন!” তার চিৎকারের প্রতিধ্বনি মিলিয়ে যাবার আগেই সে সেই সিংহাসনে বসে পড়ল। তারপরেই ঘটে গেল সেই অদ্ভুত কাণ্ড! হল কী, দুঃখী মানুষটিরও হাতের লণ্ঠন নিভে গেল। তেল ফুরিয়ে গেল এটারও। আবার ঝপ করে অন্ধকার নেমে এল সেই পাতালঘরে।

রাগি মানুষটি বলে উঠল, “ঘাবড়াবার কিছু নেই। তোমরা যে যেখানে যেমন আছ তেমন থাকো। আমার লণ্ঠনটা আমি এক্ষুনি জ্বালছি।” তার বলাও শেষ হয়েছে সঙ্গে সঙ্গে তার হাতের আলোও জ্বলে উঠেছে। তারপরেই সেই রাগি মানুষ আর দুঃখী মানুষের চক্ষুস্থির। তারা দেখে সোনার সিংহাসনে-বসা সেই হাসিখুশি মানুষটির চেহারার আদলই পালটে গেছে! মানুষটিকে আর চেনাই যাচ্ছে না। মানুষটি এখন দস্তুর মতো শক্তসমর্থ জোয়ান পুরুষ।

সেই দুঃখী আর রাগি মানুষ দুটি তার দিকে তাকিয়েই ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেছে! তারা কি স্বপ্ন দেখছে?

তারা কিছু বলার আগেই সেই সোনার সিংহাসনে-বসা জোয়ান মানুষটি হাসতে হাসতে বলল, “কী দেখছ আমার দিকে অমন হাঁ করে? বুঝতে পারছ না, এখন এই সিংহাসন আমার? আসলে, এখন আমি রাজা। দেখছ না, আমি কেমন পালটে গেছি! আমার যৌবন আবার আমি ফিরে পেয়েছি।”

রাগি মানুষটি অবাক চোখে তার দিকে তাকিয়ে ক’পা এগিয়ে গেল।

হাসিখুশি মানুষটি রাজার মতো গম্ভীর স্বরে তাকে আদেশ করে বলল, “না, আমার কাছে আসবে না তুমি। স্থির হয়ে দাঁড়াও! আমার আদেশ অমান্য করলে, তোমায় শাস্তি পেতে হবে।”

রাগি মানুষটি উত্তর দিল, “সিংহাসন তোমার, কে বলেছে?”

হাসিখুশি মানুষটি বলল, “আমার, কারণ আমি প্রথম দেখেছি।”

রাগিমানুষটি জবাবে বলল, “এমন তো কথা ছিল না। কথা ছিল বেয়াড়া মানুষের অসম্মানের হাত থেকে বাঁচার জন্যে আমরা এই জঙ্গলে আসব, শান্তিতে জীবনের শেষ ক’টাদিন কাটাব। এখন, ভাগ্যক্রমে আমরা এই পাতালঘরের সন্ধান পেয়ে যাই। এখন তুমি একা ওই সিংহাসন অধিকার করে, যৌবন ফিরে পেয়ে, রাজা হয়ে বসবে এ তো হতে পারে না! ওই সিংহাসন তুমি আগে দেখেছ বলেই তোমার হয়ে যাবে? এ কেমন কথা! ওই সিংহাসন এখন আমাদের তিনজনের। ওই সিংহাসনে বসে আমরাও যৌবন ফিরে পেতে চাই। আমরাও রাজা হব।”

রাগি মানুষটির কথায় দুঃখী মানুষটিও সায় দিল। কিন্তু হাসিখুশি মানুষটি হাসতে হাসতে উত্তর দিল, “কী বলছ তোমরা! সিংহাসন একটা। রাজা তিনজন! এ আবার হয় নাকি! তার চেয়ে বরং এসো, আমরা আপসে একটা মিটমাট করে ফেলি। আমি যেমন এই সিংহাসনে বসেছি, তেমনই আমায় থাকতে দাও! তোমরা বরং ওই সোনার মূর্তিগুলো নিয়ে সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে থাকো।”

এতক্ষণ দুঃখী মানুষটি চুপ করেছিল। এবার সে কথা বলল। জিজ্ঞেস করল, “তোমার কি মনে হয় না, ওই সিংহাসনে বসার পরেই তুমি যৌবন ফিরে পেয়েছ? তোমার কি মনে হয় না, ওই সোনার মূর্তিগুলির চেয়ে যৌবন আমাদের কাছে অনেক বেশি লোভনীয়? সেই যৌবন তুমি পাবে, আমরা পাব না কেন? আমরা তো একই পথের পথিক। আমরা বন্ধু। কাজেই ওই সিংহাসনে আমাদেরও অধিকার আছে। অধিকার আছে তোমার মতো যৌবন ফিরে পাওয়ারও। সুতরাং তুমি নেমে এসো সিংহাসন থেকে। আমাদেরও যৌবন ফিরে পাওয়ার সুযোগ দাও তুমি!”

সেই হাসিখুশি মানুষটি এবার হাসি ভুলে গেল। দুর্মতি তার সারা মুখ ছেয়ে ফেলল। সে বেশ কঠিন গলায় কড়কে উঠল দুঃখী মানুষটিকে, বলল, “তোমার তো দুঃসাহস কম নয়, রাজার সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতাতে চাইছ। ফুঃ! রাজা কারও বন্ধু হয় না। রাজা নিজেই নিজের বন্ধু।”

রাগি মানুষটির হাতে লণ্ঠন। সেই লণ্ঠনের শিখা যতই তার মুখের ওপর আলো-ছায়ায় ভেসে উঠছে, ততই বোঝা যাচ্ছে রাগে অগ্নিশর্মা হচ্ছে মানুষটা। চোখের পলকে এমন যে একটা উদ্ভট ঘটনা ঘটে যাবে, সেটা যেমন সে ভাবেনি, তেমনই হাসিখুশি মানুষটাও যে তাদের এতদিনের বন্ধুত্ব ভুলে এমন লোভী আর স্বার্থপর হয়ে উঠবে, এটাও মনে হয়নি। এখন যেটা তার মনে হচ্ছে, মানুষটাকে এক্ষুনি শায়েস্তা করতে হবে। এবং এই কথা ভাবার সঙ্গে সঙ্গেই সে হাসিখুশি মানুষটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তার একহাতে লণ্ঠন, আর একটা হাত সেই হাসিখুশি মানুষটার গলায়। সেই সঙ্গে তাকে টেনে নামিয়ে আনল সিংহাসন থেকে। আর বলব কী, তার মাটিতে পা পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই মানুষটার আবার সেই আগের মতো বুড়ো থুত্থুরো হয়ে গেল। তাজ্জব ব্যাপার!

এবার শুরু হয়ে গেল সেই তিনবুড়োর মধ্যে সিংহাসন অধিকারের লড়াই। আর ঠিক তখনই রাগি মানুষের হাতের সেই শেষ লণ্ঠনটিও নিভে গেল ফুস করে। নেমে এল ঘোর অন্ধকার আবার সেই পাতালঘরে। কেউ কাউকে দেখতে পায় না। তারা শুধু সেই অন্ধকারে হাঁকপাক করে। চেঁচায় আর বলে “সিংহাসন আমার! সিংহাসন আমার!” প্রতিধ্বনি ওঠে তাদের চিৎকারের। কিন্তু সিংহাসনটা যে কোথায়, খুঁজে পায় না তারা।

চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে তাদের গলা ভাঙল। খুঁজতে খুঁজতে তারা হয়রান হয়ে গেল। কোথায় যে ছিঁড়েখুঁড়ে ছড়িয়ে পড়ল তাদের লোটাকম্বল, তারও হদিস পেল না তারা। এমনকী খুঁজে পেল না সেই সিঁড়িটাও, যে-সিঁড়ি দিয়ে তারা নেমেছিল এই নীচে, এই অন্ধকারে।

তা হলে?

তা হলে কী হল, কে বলবে সে কথা! কেননা সেই জঙ্গল যে এখনও জঙ্গল হয়ে আছে। কেউ-ই যায় না সেখানে! কেউ যদি কোনও দিন যায় সেখানে, যদি খুঁজে পায় সেই পাতালঘর, তবে হয়তো আমরা জানতে পারব কী হল সেই তিন বুড়োর! তার আগে নয়। তার আগে সব অন্ধকার।

সকল অধ্যায়
১.
কাক্কাবোক্কার বিয়ের পদ্য
২.
ইতিমিচিসাহেবের স্বপ্নের গাধা
৩.
কাক্কাবোক্কার টোক্কা ফক্কা
৪.
কাক্কাবোক্কার কান্নাকাটি
৫.
কাক্কাবোক্কার গানের জলসা
৬.
ইতিমিচিসাহেবের ছাগলি-মা
৭.
কাক্কাবোক্কার বায়নাক্কা
৮.
কাক্কাবোক্কার ঘাড়ে ভূত
৯.
পিঠ নিয়ে পিঠোপিঠি
১০.
কাক্কাবোক্কার কাণ্ড বটে
১১.
গল্পের নাম ফিক
১২.
কাক্কাবোক্কার ভুতুড়ে কাণ্ড
১৩.
ইতিমিচিসাহেবের ঘোড়া
১৪.
রাজা বাপ্পাহুহুর দাড়ি
১৫.
ছি ছি, এ কী কাণ্ড
১৬.
ইতিমিচিসাহেবের নাচানাচি কাণ্ড
১৭.
আচ্ছা আজব ইচ্ছে বটে
১৮.
রগড় নিয়ে কাণ্ড জবর
১৯.
ইতিমিচিসাহেবের আম্মা বিল্লি
২০.
ভগবানের হাত
২১.
তাক্কাদুম
২২.
চ্যাং ঝোলা
২৩.
স্বপ্ন দেখি রূপকথায়
২৪.
দস্যি সেই ছেলেটি
২৫.
পাখিমের আকাশ
২৬.
সোনা-ঝুরঝুর হাসি
২৭.
ছুম আর ছবি
২৮.
টুক্‌কির ফুলবাগানে
২৯.
চাঁদ আর পাপুই
৩০.
কালো বেড়ালের গুপ্তধন
৩১.
মায়ের সোনা ছেলে আফজল
৩২.
এক বুড়ো আর একটি পাখি
৩৩.
আজবদেশের নাচন-পাখি
৩৪.
একলা ডিঙি যখন একা
৩৫.
সেই যে আলো নীল
৩৬.
আকাশের দুই বন্ধু
৩৭.
তিনটে বুড়োর গল্প
৩৮.
ভেলকির নাম ঘোড়া
৩৯.
বন্ধুর নাম কাকের ছানা
৪০.
টুং-এর বন্ধু ঝুমঝুমি
৪১.
উড়ুক্কু ভূত
৪২.
ঘণ্টা বাজে টুংটাং
৪৩.
সময়ের জাদুখেলা
৪৪.
আমি শূন্য
৪৫.
কেউ জানে না কে চোর
৪৬.
একটি মেয়ের গল্প
৪৭.
শুধুই গল্প অদ্ভুতুড়ে
৪৮.
আলোর সন্ধান
৪৯.
সোনার ঘণ্টা
৫০.
সে এক ভেলকি
৫১.
সুন্দর যাকে বলি
৫২.
সর্দার
৫৩.
বেড়াল-বাঁদর-গাধা আর লোকটা
৫৪.
রুমঝুম নূপুরের রূপকথা
৫৫.
হো-বুড়োর খুদে বন্ধু
৫৬.
ভালবাসি পশুপাখি
৫৭.
বুক্কুটা তা বলে বোক্কা নয়
৫৮.
ছোট্ট পাখি আর কেঁদো বাঘ
৫৯.
যার যা সাজে না
৬০.
কানকাটা বাঘ
৬১.
একটা গান শেখাবে
৬২.
হ্যাংলা
৬৩.
কুক্কু আর হাঁসছানা
৬৪.
ছোট্ট পাখি টুনটুন
৬৫.
ছাগল-বুড়োর মামা
৬৬.
চাচার গানে নাচানাচি
৬৭.
একটা ছিল নেংটিছানা
৬৮.
টুক্কুর হাসি
৬৯.
হুম-চক্‌কা
৭০.
কাণ্ড বটে আজব
৭১.
পিড়িং-পিড়িং গঙ্গাফড়িং
৭২.
একটা বুদ্ধু নেংটি
৭৩.
বনমানুষ না ভালুক
৭৪.
তিড়িং-তিড়িং পাখিটা
৭৫.
কীসের থেকে কী
৭৬.
গল্পের রং রকম রকম
৭৭.
দাদু ভুলে গেছে
৭৮.
মুক্তো আছে কোন ঝিনুকে
৭৯.
নীল গোলাপের গল্প
৮০.
ডাকু
৮১.
অদ্ভুত সেই ঘোড়ার গল্প
৮২.
সে কী আনন্দের দিন
৮৩.
আলোর ভোর
৮৪.
রাংতা
৮৫.
মুক্তো-আঁকা
৮৬.
ইয়াসিনের চিঠি
৮৭.
গুড়িয়া
৮৮.
ছই একটি মেয়ের নাম
৮৯.
মায়ের জন্য একটি গোলাপ
৯০.
এই সুন্দর পৃথিবীতে
৯১.
স্বপ্নের ঝলমলে আলো
৯২.
সাগরের বন্ধু জানলা
৯৩.
রহস্য
৯৪.
ফিকির ভাবনা
৯৫.
নির্দোষ দুই বন্দি
৯৬.
রতন
৯৭.
রোদ ঝিলমিল
৯৮.
রহস্যের নাম সুন্দরী
৯৯.
ঝড়ের বনে আতঙ্ক
১০০.
কুয়াশার তিন সঙ্গী
১০১.
মায়ের ডাকা নামটি
১০২.
ভোরের আলো ফুটছে
১০৩.
ভালবাসার পৃথিবী
১০৪.
এ সময়ের গল্প
১০৫.
উত্তর পাইনি এখনও
১০৬.
অরুর বিকেল হারিয়ে গেল
১০৭.
মিষ্টি হাসির খেলনা
১০৮.
ম্যাজিক
১০৯.
বন্ধ ঘরে কান্নার শব্দ
১১০.
পাকা ধানের গন্ধ
১১১.
সেতুপারের বন্ধুরা
১১২.
সুলতান
১১৩.
তুসি জাদু জানে
১১৪.
তিত্তি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%