শৈলেন ঘোষ

আমার নাম সায়র। এই পৃথিবীতে আমি একা। তাই আমি জানি না, ‘সায়র’ নামে কে আমায় প্রথম ডেকেছে। আমার মনে নেই আমার মাকে! জানি না কে আমার বাবা। আশ্চর্য, কে আমায় এত বড় করেছে তোমার মতো? কেমন করে কেটে গেল আমার এত বর্ষার রাত, আর শীতের সকাল? কার কোলের দোলনায় দুলে দুলে আমি গান শুনেছি, নয়তো গল্প? কিছুই জানি না। শুধু জানি, গানের সুরে আমার মন দুলে ওঠে। আমি গান গাইতে পারি।
হ্যাঁ, আমি গান গাই পথে পথে। এই আকাশের নীচে একটু একটু করে বড় হয়েছি যত, একটু একটু চিনতে শিখেছি আকাশটাকে। এই আকাশই আমার বন্ধু। আমি গান গাইলে আকাশ আমায় আদর করে। আকাশের আদর ওই ছোট্ট ছোট্ট তারার আলোর বিন্দু। টুপটাপ গড়িয়ে পড়ে আমার চোখে। আমি ঘুমিয়ে পড়ি।
গান আমি গাই ঠিকই, তবে কী আর তেমন গাইতে পারি। অনেকে কেমন বাজনা বাজিয়ে গান গায়। আমার বাজনাও নেই, কিচ্ছুই নেই। থাকলেই বা কে শিখিয়ে দিত! কেউ না! গানও আমায় কেউ শেখায়নি। কেউ গান গাইলে শুনি। শুনতে শুনতে আমার সুরও গুনগুনিয়ে ওঠে। আমি শিখে ফেলি। তারপর পথের ছেলে পথে পথে পাড়ি দিই, গান গাইতে গাইতে। কখনও নদীর ছলাতকার আমায় হাতছানি দেয়। আমি ছুটে যাই নদীর কিনারে। কখনও বনের সবুজ যেন বলে, “এসো আমার কাছে।” আমি বনের আলোছায়ায় হারিয়ে যাই। সেখানে কত পাখি! যত পাখি, তত রং, তত গান! আমি বলি, “ও পাখি, আমায় তুমি গান শেখাবে?” পাখি উড়ে পালায়। আমি দাঁড়িয়ে থাকি একা। তারপর চমকে উঠি, যখন কানে আসে ঘণ্টার শব্দ। বন ডিঙিয়ে আমি আবার ছুটি। ছুটতে ছুটতে দেখতে পাই কত বলদ চলেছে দলে দলে। তাদের গলায় ঘন্টা। তাদের পিঠে টাটকা আনাজ। নয়তো মশলাপাতি বস্তা-বাঁধা। কত মানুষ আগুপিছু। হাঁটছে। কারও মাথায় চুপড়ি-ঝুড়ি। গুড়ের কলসি। কারও কাঁধে মন্ডা-মিঠাই, দইয়ের হাঁড়ি। ধুতি-শাড়ি, রং-বাহারি। ওরা হাটে চলেছে। আমিও ছুটি ওদের দলে। যাই হাটে। যেদিনই হাট যে-গাঁয়ে, সেদিনই যাই সেই গাঁয়ে। গান গাই। এমনই এক হাটের দিন।
আমি আনমনে গান গাইছিলুম গাছের গায়ে হেলান দিয়ে। কে এক ভদ্দরলোক, কখন যে থমকে দাঁড়িয়ে আমার গান শুনছিল আমি খেয়াল করিনি। কিন্তু হঠাৎ যখন সে ডাকল, “ও খোকা,” আমি থতমত খেয়ে গান থামিয়েছি। চেয়ে দেখি, একজন ধোপদুরস্ত ভদ্দরলোক আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আমি কিছু বলার আগেই লোকটি জিজ্ঞেস করল, “তুই কোথা থাকিস?”
আমি বললুম, “আমায় চেনো না? আমার নাম সায়র। আমি তো এইখানেই থাকি।”
“এইখানে!” অবাক হল লোকটি, গাছের দিকে তাকিয়ে। তারপর আবার জিজ্ঞেস করল, “তোর মা-বাবা নেই? ঘরদোর?”
আমি হাসলুম। হাসতে হাসতে বললুম, “থাকলে আমি এখানে থাকব কেন!” বলতে গিয়ে দৃষ্টি আমার আকাশে পড়ল। মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল, “আকাশ আমায় ভালবাসে।”
লোকটি চমকে তাকাল আকাশের দিকে নিমেষের জন্যে। তারপর আবার আমার মুখের দিকে চোখ নামাল। আমি শুনতে পেলুম, সে অস্ফুট স্বরে বলল, “এমন মিষ্টি গলা তোকে কে দিল! কে শেখাল গান!”
আমি হেসে উঠলুম। লোকটি চুপ করে গেল। আমি হাসতে হাসতে উঠে দাঁড়ালুম। লোকটি ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কোথা যাচ্ছিস?”
আমি বললুম, “দেখি।”
“আর-একটা গান শোনাবি আমাকে?”
আমি উত্তর দিলুম, “আর আমার গান গাইবার ক্ষমতা নেই। আমার খিদে পেয়েছে।” বলতে বলতে আমি পা বাড়ালুম।
“দাঁড়া।”
তার পিছু-ডাক শুনে দাঁড়াতেই হল।
“আমার সঙ্গে যাবি?” লোকটি আমার সামনে এসে জিজ্ঞেস করল।
“কোথায়?”
সে বলল, “আমার বাড়িতে। আমি তোর গান শুনব।”
আমার আবার হাসি পেয়ে গেল। বললুম, “তুমি তো বেশ লোক। পেটে খিদে নিয়ে তোমায় গান শোনাব আমি?”
লোকটি বলল, “তোকে পেটভরে খাওয়াব আমি?”
আমার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। জিজ্ঞেস করলুম, “তোমার বুঝি আমাকে দেখে দয়া হচ্ছে?”
সঙ্গে সঙ্গে লোকটি উত্তর দিল, “ছিঃ ছিঃ, ও-কথা কেন বলছিস! তোকে আমার ভাল লাগছে।”
আমার বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল। কেন না, আমার নিজেরই যে নিজেকে কোনওদিন ভাল লাগে না। আমার গায়ের এই জামা-কাপড়টা দ্যাখো, যেমন ছেঁড়া, তেমনই ময়লা। আমার মুখের ছিরি, যে কতটা সুচ্ছিরি, আমি জানি না। নিজের মুখ তো আর নিজে কেউ দেখতে পায় না। অবশ্য আয়না থাকলে অন্য কথা। তবে আমার মুখের ছায়া আমি জলে দেখেছি অনেক। তাতে ছিরিবিচ্ছিরির কী বুঝবে মানুষ! কিন্তু আমার পা দুটো দ্যাখো, ধুলোয় ভর্তি। আর মাথার চুলে যে কোন জন্মে তেল পড়েছে, সে এক ভগবান ছাড়া কেউ জানে না। তাই, এই ভদ্দরলোকটির আমাকে দেখে যে কেমন করে ভাল লাগল, ভেবে আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি। তার মুখের দিকে হতবাক হয়ে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলুম। হয়তো আমায় অমন করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেই লোকটি আবার জিজ্ঞেস করল, “যাবি না?”
সত্যি বলতে কী, তার মুখখানা দেখে লোকটিকে সন্দেহ করতে আমার কষ্ট হল। তবু তাকে জিজ্ঞেস করলুম, “আচ্ছা ধরো, তোমার বাড়িতে একপেট খেয়ে আমি যদি তোমাকে গান না শোনাই?”
লোকটি হেসে উঠল। হাসতে হাসতে বলল, “না শোনালে আমি আর কী করব!”
“আমাকে মারবে না?”
তোমাকে কী বলব, আমার মুখে এমন একটা কথা শুনে লোকটি আমায় জড়িয়ে ধরল। আমার এই ময়লা পোশাক আর নোংরা চেহারা দেখে তার একটুও ঘেন্না হল না। আমার মাথায় সে হাত রাখল। আদর করল। আমার চোখে জল এসে গেল। আমি চিৎকার করে উঠলম, “আমি যাব, তোমার সঙ্গে যাব। আমি তোমায় গান শোনাব।” তারপর আর কিছুই বলতে পারিনি। আনমনে হাঁটতে হাঁটতে তার বাড়ি পৌঁছে গেলুম। তখন বেলা পড়ছে।
বাড়ির সামনেই গেট। ঠেলা দিয়ে গেট খুলে লোকটি আমায় ডাকল, “আয়!”
বাড়ির ভেতর ঢুকেই আমি ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেছি। বাড়িটা মস্ত একটা প্রাসাদ যেন। আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলুম, “এইটাই তোমার বাড়ি?”
“হ্যাঁ।”
আমি ফ্যালফ্যাল করে চারদিক দেখছি। বাড়িটা—দোতলা। ঘরগুলো যেন এক-একটা হলঘর। পেল্লাই। অথচ, আশ্চর্য, সব খালি! এতবড় বাড়িতে একটুও হইচই নেই। এমন খাঁ-খাঁ করছে, মনে হচ্ছে, লোকটি বুঝি একাই থাকে বাড়িতে।
লোকটি একতলার দরদালান পেরিয়ে একটি ঘরে আমায় নিয়ে এল। বলল, “বাড়িটা আমার ঠিক নয়। আমার বাবার।”
আমি চকিতে তার মুখের দিকে তাকালুম। আমায় কিছু বলতে না দিয়ে লোকটি বলল, “এইখানে বোস।”
কী চমৎকার সাজানো-গোছানো ঘরটা। কাঠের আসবাব। রঙিন ছবি। খাট, বিছানা ঝকঝকে। বসতে গিয়ে নিজের চেহারা দেখে আমারই কেমন বাধো-বাধো ঠেকল।
“বোস!” ভদ্দরলোক আবার বলল।
আমি নিজের পায়ের দিকে তাকালুম।
“পায়ে ধুলো!” লোকটি হাসল। বলল, “আয় আমার সঙ্গে।”
সে আমায় কলঘরে নিয়ে এল। আমি পা ধুতে ঢুকলুম। অঢেল জল কলঘরে।
বেরিয়ে এসে আবার আমিই বললুম, “কাপড়-জামাও তো নোংরা।”
সে বলল, “তুই বোস। আমি দেখি তোর গায়ের একটা জামা পাই কি না।” বলতে বলতে ভদ্দরলোকটি ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
আমি এখন একা এই ঘরে। সবই কেমন যেন অদ্ভুত লাগছে। ভাবলুম, সত্যি কি এত বড় বাড়িটায় ভদ্দরলোক একা থাকে! আর কেউ নেই? ভাল করে সেটা জানবার জন্যে আমার মন ছটফট করতে লাগল। কিন্তু দেখা হল না। ঘরের মধ্যে হঠাৎ একজন বউ ঢুকে পড়ল। ঢুকেই থমকে দাঁড়াল। আমাকে দেখে একমুখ হাসি উছলে উঠল তার। হাসতে হাসতেই বলল, “ওমা, কী সুন্দর ছেলে!”
ভদ্দরলোকটি একেবারে সঙ্গে সঙ্গে ঘরে ঢুকে বলে উঠল, “ছেলেটিকে দেখেই তুমি সুন্দর বলছ বউ, তা হলে ছেলেটির গান শুনে তুমি কী বলবে?”
“তাই নাকি, গান জানে বুঝি!”
“তবে কী বলছি!” বলে লোকটি বউয়ের হাতে একটা জামা আর কাপড় দিয়ে বলল, “দ্যাখো, ওর হয় কি না।”
আমার আর বুঝতে বাকি রইল না এই বউটি ভদ্দরলোকেরই বউ। জামাটা হাতে নিয়ে ভদ্দরলোকের বউ আমার কাছে এগিয়ে এল। আমার নোংরা জামাটা আমি নিজেই টানামানি করে খুলে ফেললুম। নতুন জামাটা গায়ে দিতেই আমি কেমন জানি নতুন হয়ে গেলুম নিমেষের মধ্যে। তারপর নোংরা কাপড়টাও যখন পালটে ফেললুম, তখন আমিই আমাকে চিনতে পারছিলুম না।
“বাহ্, ঠিক হয়েছে। একেবারে ধোপদুরস্ত বাবুটি!” বলে হা-হা করে হেসে উঠল ভদ্দরলোক। হাসল তার বউও। সেই লম্বা-চওড়া ঘরটা হাসির শব্দে গমগম করে উঠল। খুশিতে আমারও হেসে উঠতে ইচ্ছা করছিল। কিন্তু পারলুম না। কেন না তার বউ হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করল, “তোর নাম কী?”
“সায়র!”
“বাঃ! যেমন সুন্দর ছেলে, তেমনই সুন্দর নাম। কে রেখেছে?”
আমি বলতে পারলুম না। ভদ্দরলোক তার বউকে বলল, “সায়রের কেউ নেই।”
ভদ্দরলোকের মুখে আমার নামটা শুনে আমি চমকে উঠলুম। পরক্ষণেই ভাবলুম, বলি, না-না, আছে। আমি এতদিনে খুঁজে পেয়েছি তোমাদের। তোমরাই আমার আপনজন। কিন্তু না, সে-কথা বলার সাহস হল না আমার। বললে যদি অন্য কিছু ভেবে বসে! ভাবে, রাস্তার ছেলের আস্পর্দ্দা তো কম নয়! কিন্তু হঠাৎ আমার ভয় ভেঙে দিয়ে ভদ্দরলোকের বউ যখন বলল, “আহা, তা হলে যে বড্ড কষ্ট রে তোর। তুই একা থাকিস? না, আজ থেকে আর তোকে একা থাকতে হবে না। তুই আমাদের কাছে থাকবি। চ, এখন খেয়ে নিবি চ।” তখনও কিন্তু কোনও কথা বলতে পারলুম না আমি। আমি হতভম্ব। তাদের সঙ্গে চুপচাপ ক’-পা হেঁটে খাবার ঘরে ঢুকে পড়লুম।
কী ছিমছাম খাবার ঘরটা। পরিষ্কার তকতকে। মখমলের আসন পাতা। ঝকঝকে থালাভর্তি কতরকমের যে খাবার! আমি নামই জানি না অর্ধেকের। তা, নাম না জানলেই বা কী! তখন খিদেয় পেট চুঁইচুঁই করছে। রাক্ষসের মতো গপগপ করে গিলে চেটে থালা সাফ করে ফেললুম। আহা, কী সোয়াদ! অমন রান্না আমি আজ পর্যন্ত মুখে দিইনি!
খাওয়া-দাওয়া শেষ হল। বেলা আরও পড়ল। আমি ফিরে এলুম আবার সেই ঘরেই। ভদ্দরলোকটি বলল, “আজ থেকে তোকে আর গাছের নীচে থাকতে হবে না। তুই এই ঘরেই থাকবি। আজ থেকে তোকে আর পথে পথে গান গাইতে হবে না, তুই এই ঘরেই গান গাইবি। আজ থেকে তুই আমাদের ছেলে।”
ভদ্দরলোকের বউ তার কথায় সায় দিয়ে আমার চিবুক ধরল। আমার বুকটা আনন্দে শিরশির করে উঠল।
একটু পরেই আমি গান গাইতে শুরু করলুম। একটু পরেই সন্ধের ছায়ায় আকাশ তার গায়ে ওড়না জড়াল। আমি দেখলুম, ভদ্দরলোকের বউ ঘরের শেজবাতি জ্বেলে দিল। তার শিখা ঝিলমিল করছে হাওয়ায়। আমিও দুলছি গানের সুরে। আমার সুর প্রতিধ্বনি তোলে ঘরের এ-কোণে ও-কোণে। আমি বিভোর হয়ে যাই গাইতে গাইতে।
আচমকা আমার বুকটা ধড়ফড় করে উঠল। আমার গান থামল। আমি বিষম খেয়েছি। ও কে দাঁড়িয়ে! ঠিক আমার সামনের ওই জানলাটার বাইরে! ভদ্দরলোক আর তার বউ ব্যস্ত হয়ে আমার কাছে ছুটে এল। জিজ্ঞেস করল, “কী হল?”
আমি তখনও কাশছি। উত্তর দিতে পারলুম না।
ভদ্দরলোক তার বউকে বলল, “যাও যাও, শিগগির এক গেলাস জল নিয়ে এসো।”
প্রায় পড়িমরি করে ছুটে তার বউ আমার জন্য জল নিয়ে এল। আমি ঢকঢক করে খেয়ে ফেললুম। কাশি থামল। আমার বুকের ধড়ফড়ানিটাও শান্ত হল। আমি আবার সামনের জানলাটার দিকে তাকালুম। কাউকে দেখতে পেলুম না। ইস, আমি একটা আস্ত গাধা! একটা বুড়োমানুষকে জানলার ওধারে উঁকি মারতে দেখে ভয় পেয়ে গেলুম!
ভয় পাবই তো! এই সন্ধেরাতের আলোছায়ায় তুমিও যদি সে-মুখ দেখতে, আমি হলপ করে বলতে পারি তোমারও বুক কেঁপে উঠত। কী বিচ্ছিরি চোখদুটো। কোটরে ঢাকা। ভাঙা চোয়াল। শুঁটকো, হাড়-গিলগিলে। তা নয়-নয় করে বয়েসও যে অনেক হয়েছে, এক ঝলক দেখলেই বোঝা যায়। আমার দেখেশুনে আর গান গাইবার মতো অবস্থা নেই। আমি শুয়ে পড়লুম। ভদ্দরলোক আর তার বউ দুজনেই বলল, “না, এখন আর গান গাইবার দরকার নেই। এখন একটু আরাম করে নে।”
এমন নরম বিছানায় আমি জন্মে শুইনি। কাজেই এরকম বিছানায় শুয়ে আমার অস্বস্তি হওয়ারই কথা। হলও তাই। বেশ কিছুক্ষণ এ-পাশ ও-পাশ করলুম। ওই জানলাটার দিকে থেকে থেকে চেয়েও থাকলুম। তারপর কখন যে ঘুমিয়ে পড়লুম, নিজেও জানি না।
অনেক রাত্তিরে আমার ঘুম ভাঙল হঠাৎ। আমি ধড়ফড়িয়ে উঠে পড়েছি। দেখি, চারদিক অন্ধকার। নিস্তব্ধ। আমার ঘরে কেউ নেই। আমি একা। শেজবাতিটাও নেই। শেজবাতির বদলে বাতিদানে একটা মোমবাতি জ্বলছে। তার ছায়াটা ঘরের দেওয়ালে যতই কাঁপছে, ততই কতরকমের ছবি ফুটে উঠছে এধারে-ওধারে। হঠাৎ আমার দৃষ্টি পড়ল, সেই জানলাটার দিকে। আমি বিছানা ছেড়ে সেই জানলাটার দিকেই এগিয়ে এলুম আলতো পায়ে। কিছুই দেখতে পেলুম না। থমথম করছে অন্ধকার। বুঝতে পারলুম, এখন রাত গভীর। তা হলে এখন কী করব আমি! তবে কী এবার শুয়ে পড়ব! না, আর ঘুম পাচ্ছে না। বোধহয়, বাকি রাতটুকু একাই জেগে বসে থাকতে হবে। সেই ভদ্দরলোক আর তার বউও এখন নিশ্চয়ই অঘোরে ঘুমোচ্ছে। কিন্তু তাদের শোবার ঘর কি এই একতলায়, না ওপরে! আর সেই বুড়োটা? সেই-বা কোথায় এখন! তবে কি সেই শুঁটকো হাড্ডিসার বুড়োই এই ভদ্দরলোকের বাবা! লোকটিকে দেখতে এমন, অথচ, বুড়োকে দেখতে কী বিচ্ছিরি! আমি আনমনে বাতিদানের সামনে এসে দাঁড়ালুম। আগুনের ছোঁয়ায় মোম গলে গলে গড়িয়ে পড়ছে বাতির গা বেয়ে। দেখে মনে হল, খুব দামি এই বাতিদানটা। হাত বাড়ালুম। তুলে নিলুম বাতিদান, নিজের হাতে। তারপর নিজের খেয়ালেই ঘরের দরজাটা আলতো ঠেলে খুলে ফেললুম। ভাবলুম এই সুযোগে দেখে ফেলি বাড়ির চেহারাটা। আমি পা বাড়ালুম। মোমের আবছা আলোয় পথ ঠাওর করতে আমার খুব একটা কষ্ট হচ্ছিল না। অজানা বাড়িতে ঢুকে মানুষ যেমন তল্লাশি-দৃষ্টিতে সবকিছু দেখার চেষ্টা করে, আমিও মোমের আবছা আলোয় সেই চেষ্টাই করছিলুম। দেখছি ঘরগুলো সবই প্রায় বন্ধ। শুধু এক-আধটার জানলা খোলা। জানলায় উঁকি মারছি। কিন্তু মনের মতো কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। তবে দরদালানে দু’-একটা পাথরের মূর্তি নজরে পড়ল। দেয়ালে টাঙানো ছালের সঙ্গে বাঘের মাথা, তাও দেখতে পেলুম। দেখতে পেলুম, বড়-বড় ছবিও। বোঝা যায়, ধুলো পড়েছে। দু’-একখানা বেঁকে ঝুলে আছে। সেইসব ছবির গায়ে যতই মোমের আলো ছড়িয়ে পড়ছে, ততই কী অদ্ভুত দেখতে লাগছে। মূর্তিগুলোর ঠাটবাট দেখলে তোমার মনে হবেই, এরা যেন সেই কোন মান্ধাতার আমলের মানুষ। আমার জন্মের যে কত বছর আগে, সে কী আর আমি বলতে পারি! আমি তো নিরেট মুখ্যু!

হঠাৎ একটা সাংঘাতিক কাণ্ড ঘটে গেল। আমার হাতের বাতিসমেত বাতিদানটা ছিটকে গেল। কে যেন আমায় ধাক্কা মারল! নিমেষে সব অন্ধকার। জমাট অন্ধকার! আমি ভয়ে আঁতকে চিৎকার করে উঠলুম, “কে-এ-এ-এ!” পিছু ফিরতেই আমার বুকের রক্ত শুকিয়ে গেছে। দেখলুম, অন্ধকারে কেবলই দুটো চোখ। জ্বলজ্বল করে জ্বলছে আমার দিকে চেয়ে! আমি তার চেহারাটা দেখতে পাচ্ছি না, কিন্তু তার নিশ্বাসের শব্দ স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি। আমি অন্ধকারেই পালাতে গেলুম। চোখের পলকে আমার পথ আটকে দাঁড়িয়ে পড়ল সেই জ্বলন্ত চোখদুটো। আমি আর্তনাদ করে উঠলুম, “বাঁচাও-ও-ও!” সারা দরদালান আমার আর্তনাদে গমগম করে উঠল। কারও সাড়া পেলুম না। কিন্তু যার সেই জ্বলন্ত চোখ, সে ধমকে উঠল, “চুপ!” আমি বুঝতে পারলুম এ কোনও বুড়ো লোকের গলা। সঙ্গে সঙ্গে আমার চমক ভাঙল। আমি অন্ধকারের আবছা ছায়ায় তাকে চিনতে পেরেছি। এই লোকটাই তখন জানলার ফাঁক দিয়ে উঁকি মারছিল। সে তার বিতিকিচ্ছিরি মুখখানা আমার মুখের ওপর ঝুলিয়ে জিজ্ঞেস করল, “তুই কে?” তার গলার স্বরটা কী ভয়ংকর খসখসে!
আমার আর উত্তর না দিয়ে নিস্তার নেই। আমি ভয়ে কুঁকড়ে উত্তর দিলুম, “সায়র।”
“এ-বাড়িতে ঢুকেছিস কেন?”
“একজন ভদ্দরলোক আমায় নিয়ে এল। আমি নিজে ঢুকিনি।”
“কেন নিয়ে এল?”
“আমার গান শুনবে বলে।”
লোকটা এবার দাবড়ে উঠল, “কেন তুই গান গাইলি?”
আমি ভয়ে-ময়ে বলে ফেললুম, “গান জানি বলে।”
বুড়ো আমার উত্তর শুনে কর্কশ গলায় খেঁকিয়ে উঠল, “জানিস, এটা আমার বাড়ি। জানিস, আমি গান পছন্দ করি না। এই বয়সে গান! আমি বুঝতে পেরেছি, গানের নাম করে এই বাড়িতে ঢুকে চুরি করবার মতলব এঁটেছিস তুই! শুনে রাখ, আমি সারারাত জেগে থাকি। জেগে জেগে বাড়ি পাহারা দিই। আজ তুই ধরা পড়েছিস আমার হাতে। চোর ছেলে, চাবকে তোর পিঠের ছাল-চামড়া ছাড়িয়ে নেব।”
তার কথা শুনে ভয়ে আমার পেটের মধ্যে হাত-পা সেঁধিয়ে গেল। আমি বলবার চেষ্টা করলুম, আমি চোর নই। কিন্তু আমার গলা ভয়ে এমন শুকিয়ে গেছে, গলা দিয়ে স্বর বেরোল না।
লোকটা আবার খ্যাঁক খ্যাঁক করে উঠল, “আমার হাতে চোরের শাস্তি কী জানিস? গলা টিপব আর মেরে ফেলব।” বলে, লোকটা রেগে এমন একটা নিশ্বাস ফেলল যে, তার গরম হাওয়াটা আমার গায়ে ছিটকে লাগল। আমি ঝট করে সরে গেলুম। কিন্তু সরে যাব আর কোথায়! সে আবার আমার দিকে এগিয়ে আসছে। এখন কোনদিকে গেলে যে এই বুড়োটার হাত থেকে নিষ্কৃতি পাব, বুঝতে পারছি না। অথচ, বুঝতে পারছি, এখানে দাঁড়িয়ে থাকলে লোকটা নির্ঘাত আমার গলাটা টিপে আমাকে মেরে ফেলবে। সেই ভদ্দরলোকের ওপর ভয়ানক রাগ হল। তার টিকিটি পর্যন্ত আমার নজরে পড়ছে না আর। তারও না, তার বউয়েরও না। কী আক্কেল লোকটার। এইরকম সাংঘাতিক একটা বিপদে ফেলে নিজেরা দিব্যি ঘুমোচ্ছে! কে জানে এটা সেই ভদ্রলোকেরই কারসাজি কি না! গান শোনার নাম করে আমায় ভুলিয়ে-ভালিয়ে ধরে এনেছে মারবে বলে! না, এখানে আর দাঁড়ানো নয়! আচমকা আমি ছুট মারলুম। কিন্তু পথ কোনদিকে? খুঁজে পাই না। সুতরাং বুড়োটাও তেড়ে এল। বুড়োটার তাড়া খেয়ে খাঁচায় বন্দি পাখির মতো হাঁকপাক করতে লাগলুম সেই দরদালানের ভেতরে। অন্ধকারে কখনও দেওয়ালে ধাক্কা খাই, নয়তো হাতড়ে বেড়াই। আমি যদি বাঁদিকে যাই, সেও যায় বাঁয়ে। আমি যদি ডাইনে পালাই, সেও ঘোরে ডাইনে। ধরা আমি পড়বই।
না, খুব বেঁচে গেছি। একটা দরজায় হুড়মুড়িয়ে ধাক্কা খেয়েছি। একেবারে সটান হাট হয়ে খুলে গেল দরজাটা। দরজা ডিঙিয়ে মার ছুট। অন্ধকারে ছুটলে যে আমি কোন দিকে যাব, আমি জানি না। এখন যদি এটা অন্ধকার রাত না হয়ে রোদ-ঝলমল দিন হত, তা হলেও এই বাড়ির ভেতর থেকে বেরিয়ে পথ খুঁজে পেতুম কি না বলা খুবই শক্ত। তবে লুকোবার জায়গার অভাব যে নেই, সেটা বাড়িতে প্রথম ঢুকেই আমি বুঝতে পেরেছিলুম। কিছু না হোক লুকিয়ে পড়তে পারলেও, বাঁচতে পারি। সুতরাং অন্ধকারেই ছুটতে ছুটতে লুকিয়ে পড়ার ঘুপচি খুঁজতে লাগলুম। হ্যাঁ, আমার পিছু নিয়েছে সেই বুড়ো লোকটাও। সে আমার চেয়েও জোরে ছুটছে! আশ্চর্য! বুড়োর এত শক্তি এল কোত্থেকে! আমি কি সত্যিই ধরা পড়ব! উফ! কী ভাগ্য! হঠাৎ আমার চোখে পড়ে গেল বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার সেই ফটকটা। মানে, আমি ঠিক রাস্তাতেই ছুটে এসেছি। ফটকটা খোলা নেই। ভাগ্যিস খুব উঁচু নয়। মারলুম লাফ। এক লাফেই ফটক পার। কী অদ্ভুত কাণ্ড! মনে হল, বুড়োও লাফ মেরেছে! সে-ও নিশ্চয়ই ফটকটা ডিঙোতে পেরেছে। কেন না, আমার পায়ের কাছেই তার পায়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছি। তারপরই তার গলার শব্দ শোনা গেল। সে চেঁচাল, “ওরে হতচ্ছাড়া চোর ছেলে, পালাবি কোথায়? কেউ আর তোকে বাঁচাতে পারবে না। তোর মরণ আমার হাতে।”
আমি মরব কি না জানি না। কিন্তু রাস্তা ধরে ছুটতে ছুটতে সামনেই দেখি নদী। নদীর ওপর সাঁকো। সাঁকোর ওপর যেই উঠেছি, অমনই সেই বুড়ো, হাড্ডিসার লোকটা আমার পিঠে এমন জোরে এক ঠেলা মারল, আমি সটান নদীর জলে ঝপাং! ডুব-জলে উপুড়-ঝুপুর। হাবুডুবু। সাঁতার না জানলে মানুষের যা হয়। তারপর যে কী হল, আমার একদম খেয়াল নেই।
অনেকক্ষণ পর আমার হুঁশ হয়েছে মনে হল, আমি নদীর তীরে উঠে এসেছি। তখনও আকাশ ছেয়ে আছে রাতের অন্ধকারে। নিজেকে দেখতে দেখতে আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি। ভাবছি, কেমন করে তীরে এলুম! কে আমায় তীরে টেনে আনল। তবে কি নদীর ঢেউয়ে দুলতে দুলতে আমি তীরে এসেছি? ঠিক তখনই আমার সেই বুড়োর কথা মনে পড়ে গেল। তার সেই ভয়ংকর চোখদুটো আমার চোখের ওপর ভেসে উঠল। রাগে আমার সারা শরীর রি-রি করে উঠছে। আমি নিজেই নিজেকে ছিঃ ছিঃ করে মনে মনে বলে উঠলুম, একটা হাড়-গিলগিলে বুড়ো আমায় এমন করে নাকাল করল! বুড়োকে দেখে আমি ভয় পাই কী বলে! একটা ভীষণ রোখ চাপল আমার মাথায়। মন বলল, নদীর জলে ঠেলে ফেলে দেওয়ার প্রতিশোধ আমায় নিতেই হবে। বুড়োকে আমি দেখে নেব! আর সেইসঙ্গে দেখে নেব সেই ভদ্দরলোক আর তার বউকেও! সবক’টা শয়তান! বুড়োকে আমার পেছনে লেলিয়ে দিয়ে নিজেরা ঘুমোচ্ছে! ছিঃ! আমি আবার ছুটলুম বুড়োর খোঁজে, মস্ত বাড়িতে।
যত জোরে ছুটে এসেছিলুম এই নদীর তীরে, তারও আগে পৌঁছে গেলুম সেই মস্ত বাড়িতে আবার। চিনতে আমার ভুল হয়নি। এবারও একদানে ফটকটা লাফ মেরে ডিঙিয়েছি আমি। এক ছুটে পৌঁছে গেছি সেই দরদালানে। তারপর ঘরের দোরে-দোরে ধাক্কা মেরে চিৎকার করতে লাগলুম, “আয়, বেরিয়ে আয়! দেখি, তোদের কত ক্ষমতা!” কিন্তু কোনও ঘরেই সাড়া পাই না। একতলা থেকে আমি দোতলায় ছুটলুম। আমি গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে ঘরে ঘরে ধাক্কা মারতে লাগলুম। কেউ ঘরও খোলে না। কারও সাড়াও পাই না। তবে কি কেউ নেই বাড়িতে! নেই সেই ভদ্দরলোক, কিংবা তার বউও! আমার যেন কেমন সব ধাঁধা মনে হল। আমি আরও জোরে চিৎকার করি। আরও জোরে ধাক্কা লাগাই। হঠাৎই হাট হয়ে একটা দরজা খুলে গেল। আমার চোখের সামনেই বুড়ো জবুথবু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমি হেসে উঠলুম, হা-হা-হা! হি-হি-হি! হাসতে হাসতে বললুম, “শুঁটকো বুড়ো, আমাকে জলে ডুবিয়ে মারতে চেয়েছিলি তুই। এবার আমি তোর ঘাড় মটকাব!”
বুড়ো মুখখানা তেমনই বিচ্ছিরি করে বলে উঠল, “কে তুই?”
“আমি, আমি। দেখতে পাচ্ছিস না? এগিয়ে আয়!”
বুড়ো ভয়ে আঁতকে উঠল। আমি আবার হা-হা-হা করে হেসে উঠলুম। বুড়ো এবার চিৎকার করে উঠল, “কে-এ-এ-এ?”
আমি তার গলাটা ধরব বলে হাত বাড়িয়ে হাসতে হাসতে এগিয়ে যাই, হা-হা-হা! হি-হি-হি! আমার মনে হল বুড়ো আমাকে এখনও দেখতে পাচ্ছে না। কিন্তু বোধহয় আমার হাসিটা শুনতে পাচ্ছে। সে এদিক-ওদিক দেখছে। আমি তবুও হি-হি-হি করে হাসছি। এমন সময় সে চিৎকার করে উঠল, “ভূত! ভূত!” আমি থতমত খেয়ে থমকে গেলুম।
কিন্তু সে চিৎকার থামাল না। সে চেঁচাচ্ছে গলা ফাটিয়ে। ঠিক সেই সময়ে পড়িমরি করে ছুটতে ছুটতে এগিয়ে এল সেই ভদ্দরলোক আর তার বউ। দু’জনের হাতেই মোমের বাতি। ভদ্দরলোক ব্যস্ত হয়ে চিৎকার করে উঠল, “কী হল বাবা?”
সেই বুড়ো চেঁচাল, “ঘরে ভূত ঢুকেছে!”
“কই?” ছেলের গলাতেও আতঙ্ক।
আমি বললুম, “চেয়ে দ্যাখো আমাকে। তোমার বাবা আমাকে নদীর জলে ঠেলে ফেলে দিয়ে এখন আমাকে ‘ভূত’ বলে বদনাম দিচ্ছে। আমাকে দ্যাখো ভাল করে! তোমার কি মনে হচ্ছে আমি ভূত?”
“কে কথা বলছে?” সেই ভদ্দরলোক অবাক গলায় জিজ্ঞেস করল।
“কেন, দেখতে পাচ্ছ না আমাকে? আমি সায়র।”
“কই তুই?”
“এই তো আমি।”
“দেখতে পাচ্ছি না কেন?”
“তোমার মোমের বাতিটা আরও একটু তুলে ধরো!”
ভদ্দরলোক বাতি তুলে ধরল। তুলে ধরল তার বউও। আমি তাদের স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি।
“কই?”
“এই তো তোমাদের চোখের সামনে।” আমি গলায় জোর দিলুম।
ভদ্দরলোকও আঁতকে উঠল, “তুই ভূত! ভূত!” তার হাতের বাতি হাতেই নিভে গেল। বুড়ো ঢুকে পড়ল নিজের ঘরে। চোখের পলকে ভদ্দরলোকের বউ ভদ্দরলোকের হাত ধরে টান মারল। তারাও হুড়মুড় করে বুড়োর ঘরেই ঢুকে পড়ল। ঢুকে দরজা বন্ধ করে হুড়কো এঁটে দিল।
আমি চিৎকার করে উঠলুম, “আমি ভূত নই, সায়র! দরজা খোলো! দরজা খোলো!” আমি দরজায় জোরে জোরে ধাক্কা দিলুম। আরও জোরে। গায়ে আমার যত জোর আছে, তার চেয়েও জোরে। তবু দরজা খুলল না তারা। তখন আমার নিজেরও কেমন ভয় হয়ে গেল। আমি তখন নিজেকেই নিজে দেখবার চেষ্টা করলুম। দেখতে পেলুম না। আমি গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠলুম, “আমি সায়র-র-র। আমি গান গাই। তোমরা আমাকে ছেলে বলেছ।”
কিন্তু বন্ধ ঘরের ভেতর থেকে গলায় শব্দ উঠল, “তুই ভূত! তুই ভূত!”
আমি আর থাকতে পারলুম না। আমি কেঁদে ফেললুম। কেউ আমার কথা কেন বিশ্বাস করছে না? আমি কি তবে সত্যিই ভূত! আমি কি তবে নদীর জলে ডুবে গেছি। আমি কি মরে গেছি! না, না, না, আমি মরিনি। আমি ভূত নই। আমি সায়র! আমার নাম সায়র। কিন্তু আমার কথা কেউ শুনল না। আমি ছুটতে ছুটতে বেরিয়ে এলুম সেই মস্ত বাড়ির ভেতর থেকে। কাঁদছি। সকাল হয়ে আসছে। একটি-দুটি পাখি ডাকছে। আমি কেঁদে কেঁদে চেঁচাচ্ছি, “আমি সায়র, আমি সায়র।” কিন্তু আমাকে কেউ দেখছে না। আমার কথা কেউ শুনছে না! এমনকী, আমার ভালবাসার আকাশ সেও আমায় চিনতে পারছে না! আমি চিৎকার করি, “ও আমার আকাশ, তুমি আমায় ভালবাসো, ভালবাসো, ভালবাসো!”

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন