শৈলেন ঘোষ

শাম্মিল আর সানমা। দু’জনের দুটি ডাকনাম। দুই ভাইবোনের। অমন নাম তোমরা এর আগে শুনেছ কি না, সে তোমরাই বলতে পারো। আমি অবশ্য নতুন শুনেছি। শুনে আশ্চর্য হইনি। কেন না, ডাকনাম তো নানান রকম হতেই পারে। কিন্তু আমার আশ্চর্য লেগেছে অন্য একটি নামে। সে নামটি তাদের ঘোড়ার। ঘোড়ার নাম ‘শাসা’। টাট্টু-ঘোড়া। ভাইয়ের নাম শাম্মিল আর বোনের নাম সানমা। দু’জনের দুটি নামের প্রথম দুটি শব্দ যোগ করে ঘোড়ার নাম হয়েছে ‘শাসা’। তাদের ডাকা আদরের নাম।
এবার তোমরা জিজ্ঞেস করতেই পারো, শাম্মিল আর সানমা কে? কোথায় থাকে তারা? আমিই বা তাদের নাম জানলুম কেমন করে? আর কে-ই বা বলেছে তাদের ঘোড়ার কথা?
অন্য কেউ বলেনি। এসব জেনেছি আমি শাম্মিল আর সানমার নিজের মুখ থেকে। শুনেছি, ছোট্ট দুটি ভাইবোনের জীবনের গল্প। সে ভারী আশ্চর্য আর রোমাঞ্চ ভরা। তাদের কথা ভাবলে আজও আমি অবাক হয়ে যাই। মন কেমন করে শাম্মিল আর সানমার জন্যে, তেমনই তাদের মায়ের জন্যে। কাশ্মীরের জন্যেও।
তা, হয়ে গেল সে অনেকদিনের কথা। যখনকার কথা বলছি, তখন শাম্মিলের বয়স খুব বেশি হলে দশ-এগারো হবে। সানমা হয়তো আট। ফুটফুটে দুটি ছেলেমেয়ে। পাখির মতো ছটফটে চাউনি তাদের। গোলাপরাঙা টুকটুকে ঠোঁট। আপেলরঙা টকটকে গাল। মনে হয় গালটা যদি এখনই ফুট করে ফেটে যায়, ছড়িয়ে পড়বে আপেলের টুসটুসে রসের ফোঁটা।
কলেজের পাঠ চুকিয়ে আমরা তিন বন্ধু মিলে যখন কাশ্মীরে যাই, কাশ্মীর তখন শান্ত। সেখানে তখন মানুষ এমন করে প্রাণ নিত না মানুষের। জঙ্গি কাকে বলে জানা ছিল না। বারুদ তখন গন্ধ ছড়ায়নি। শব্দ শোনা যায়নি প্রাণঘাতী রাইফেলের। তখন চলো যেখানে ইচ্ছে নির্ভয়ে। দাঁড়িয়ে পড়ো যেখানে খুশি। চারদিকটা দেখে নাও আশ মিটিয়ে। দেখে নাও ফুটন্ত ফুলের বাহার। ঝাউবন। চিনার আর রেশমসাদা বরফ-ঢাকা ঝলমলে পাহাড়-চুড়ো। দেখে নাও ঝিলমের নরম স্রোতের ছলাতকার। তার কূলে কূলে পাইনগাছের সারি। ডাললেকের জলে ভাসন্ত আখরোটের তৈরি হাউসবোট। ভেসে যায় শিকারা। তখন ভয় ছিল না। হিংসা ছিল না। ছিল বন্ধুত্ব আর ভালবাসা।
এমনই সুখের সময়ে যখন আমরা কাশ্মীরে বেড়াতে যাই, তখন আমাদের এখানে পুজোর বাদ্যি বেজে উঠেছে। তখনই বরফে সাজতে শুরু করেছে কাশ্মীর। আর কদিন পরে বরফে ঢেকে যাবে দেশটা। পাহাড়, লেক, আর বনে বনে যত সবুজ আছে সব। এমনকী, শাম্মিল আর সানমাদের ছোট্ট বাড়িটাও রেহাই পাবে না।
শাম্মিল আর সানমাদের আমি দেখা পাই সোনমার্গে। সোনমার্গ থেকে আমরা খাজিয়ার হিমবাহ দেখতে যাব। সোনমার্গে বরফ পড়েছে চারদিকে। সবাই মিলে সেই ঝুরঝুরে বরফ ছুড়ে ছুড়ে খেলা করছি। ঠিক সেই সময়েই পরিচয় হল শাম্মিল আর সানমার সঙ্গে। খানিক দূরে দেখা গেল একটা ছোট্ট টাট্টুঘোড়া নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তারা। অবশ্য আরও অনেকে আছে ঘোড়া নিয়ে দাঁড়িয়ে। হাঁক পাড়ছে, “খাজিয়ার, খাজিয়ার”। আসলে খাজিয়ার যেতে হলে ঘোড়া ছাড়া গত্যন্তর নেই।
ওই ছোট্ট দুটি ছেলেমেয়েকে দেখে চমকে উঠল আমার দৃষ্টি। ছটফট করে উঠল মন। আমি বন্ধুদের ফেলে এগিয়ে গেলুম তাদের কাছে। সামনে গিয়ে দাঁড়ালুম। দু’জনের চোখ ছুঁয়ে টলমল করছে নীল আভা। গায়ে তাদের শীত ঠেকাবার পোশাক পায়ে গামবুট। মেয়েটি আমায় দেখে মুচকি হাসল। বলল, “আমার নাম সানমা।” ছেলেটি বলল, “আমি শাম্মিল। সানমা আমার বোন।” তারপর ঘোড়াটার গায়ে হাত ঠেকিয়ে বলল, “আমাদের ঘোড়া। এর নাম শাসা। ঘোড়াটা খুশিতে যেন চনমন করে উঠে, মাটিতে পা ঠুকল। ছেলেটি জিজ্ঞেস করল, “গ্লেসিয়ার দেখতে যাবেন?” মেয়েটি আমার উত্তরের আশায় আমার মুখের দিকে উৎসুক চোখে তাকাল।
আসলে, খাজিয়ার গ্লেসিয়ার দেখতে যাওয়ার ছক করেই তো আমরা সোনমার্গ এসেছি। গ্লেসিয়ারকেই আমরা বাংলায় বলি হিমবাহ। মস্ত বরফের চাঁই। এই বুঝি ভয়ংকর শব্দ তুলে পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়ে!
হ্যাঁ, তিন বন্ধু মিলে সোনমার্গ থেকে তিনটে ঘোড়া ভাড়া করে আমাদের শুরু হয়ে গেল পাহাড় পাড়ি দেওয়া। আমার আর যে দু’ বন্ধু তারা নিল দুটো সাদা ঘোড়া। নিয়েই তারা হাঁকপাক করে এগিয়ে চলল আমাকে পেছনে ফেলেই। আমার পছন্দের ঘোড়া শাম্মিল আর সানমার টাট্টু শাসা। বলতে ভুলে গেছি শাসার গায়ের রংটা ছিল কালচে নীল। চোখ ধাঁধানো।
যেতে দাও আমার দু’ বন্ধুকে আগে। আমার অত তাড়া নেই। ভাল লেগে গেছে আমার শাম্মিল আর সানমাকে। ভাইবোনে ঘোড়ার দু’পাশে হাঁটছে। আমি ঘোড়ার পিঠে বসে ওদের সঙ্গে গল্প করতে করতে যাই। যেমন মিষ্টি দেখতে দুটিকে তেমনই তাদের কথার মিষ্টি শব্দগুলি। তার ওপর তারা যখন ভাঙা ভাঙা বাংলা বলছিল, কী অদ্ভুত শুনতে লাগছিল। আমি অবশ্য হিন্দি বলার চেষ্টা করছিলুম। কিন্তু সে যা হিন্দি! কহতব্য নয়।
এমনই করে এটা-সেটা কথা বলতে বলতে, আচমকা ওদের জীবনের এক ভয়ংকর গল্পের মধ্য ঢুকে পড়ি। জানতে পারি ওদের বাবা নেই। মা আছেন। সে-ও যেন না-থাকার মতো। মায়ের দুটো পা-ই অচল।
এই সেদিন পর্যন্ত শাম্মিল আর সানমা ইস্কুলে পড়ত। বাবা আর মা দু’জনেই একসঙ্গে খেতিতে চাষ করতেন। একদিন হঠাৎ পাহাড়ের ঢালুতে বাবা যেন কেমন করে পা পিছলে গড়িয়ে পড়েন। তাই দেখে, বাবাকে বাঁচাতে গিয়ে মা-ও পড়লেন পিছলে। বাবা বাঁচলেন না। মা বাঁচলেন বটে, কিন্তু পা হারালেন। আর, সেই থেকে শাম্মিল আর সানমার ইস্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। দু’বেলা দু’মুঠো খাবার যে এখন তাদেরই জোগাড় করতে হবে!
শ্রীনগর থেকে সোনমাৰ্গ আসতে হয়েছে বাসে। যেদিকে তাকাই, পাহাড় আর পাহাড়। সঙ্গে সিন্ধু নদ। দুরন্ত তার স্রোত। পাথর টপকে লাফিয়ে ছুটছে সে। বাসও ছুটছে সতর্ক গতিতে ফার-পাইন-এ সাজানো আঁকাবাঁকা পথ ধরে সোনমার্গের দিকে। এতক্ষণ মন আনন্দে উচ্ছল হয়ে দেখেছে প্রকৃতির শোভা। কিন্তু এখন শুনছি শাসার পিঠে চেপে শাম্মিল আর সানমার গল্প। চোখ এখন আর আমার প্রকৃতির দিকে নয়। হতভাগ্য দুটি শিশুর মুখের দিকে। সেই মুখের দিকে তাকিয়ে আমি বিষন্ন গলায় জিজ্ঞেস না-করে পারলুম না, “এরপর তোমরা কী করলে?”
“এরপর সব মানুষ যা করে আমরাও তা-ই করলুম। চোখের জলে ভাসলুম”, উত্তর দিল শাম্মিল। তারপর সানমাকে দেখিয়ে বলল, “নিজের চোখের জলকে সামলে রেখে আমার সাহসী ছোট বোন সানমা আমার চোখের জল মুছিয়ে দিল। বলল, ‘কাঁদিস না দাদা। তুই কাঁদছিস, মা-ও কাঁদছে। আমারও চোখে কান্না। সবাই মিলে যদি কাঁদতেই থাকি, আমাদের খাবার জুটবে কী করে? তার চেয়ে বরং চ, আমরা নিজেরা চেষ্টা করে দেখি, কেমন করে দুটো পয়সা রোজগার করা যায়।’ সানমার কথা শুনে, আমি সত্যিই নিজের চোখের জল মুছে ফেললুম। তারপর আমরা দুই ভাইবোনে একসঙ্গে ভাবতে বসলুম, কী করা যায়!”
এবার আমি সানমার মুখের দিকে তাকালুম। দাদার কথা শুনে তখন তার মুখে লুকনো হাসির মিষ্টি আভাস। আমার চোখের দিকে তাকিয়ে সে যেন লজ্জা পেল। লজ্জা ঢাকবার জন্যেই বোধ হয় শাসাকে ছোট্ট একটা বকা দিল। বলল, “দেখে চল, সামনে খন্দ। হোঁচট খেলেই পড়বি!”
আমি তাকে ডাকলাম, “সানমা!”
আমার আচমকা ডাক শুনে সানমা চকিতে আমার মুখের দিকে তাকাল।
আমি জিজ্ঞেস করলুম, “তোমার মা এখন কেমন আছেন?”
“ভাল।” মিষ্টি গলায় স্পষ্ট জবাব।
আমি জিজ্ঞেস করি, “মায়ের পা?”
সে উত্তর দেয়, “হাঁটতে পারেন না তেমন আর।”
আবার জিজ্ঞেস করি, “বসে থাকেন সারাদিন?”
“না, না,” ব্যস্ত গলায় উত্তর দিল সানমা, “মা এখন টুকটাক ঘরকন্নার কাজ করতে পারেন। রান্নাও করেন। তা, সে-ও ওই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এঘর-ওঘর করে।”
“তোমাদের আর ইস্কুলে যাওয়া হয় না?” আমি জিজ্ঞেস করি।
“ইস্কুলে গেলে খাবারের পয়সা আসবে কোত্থেকে?”
জিজ্ঞেস করি, “ঘোড়াটা কি তোমরা কিনেছ?”
“পয়সা পাব কোথায়?”
“তবে?”
“ভাগ্যের জোরে পেয়েছি।”
“কীরকম?” আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলুম।
আমার প্রশ্ন শুনে শাম্মিল যা উত্তর দিল, সে যেন এক আজব গল্প। সে বলল, “আমাদের যখন এই বিপদ, বাবা নেই। মা-ও কাহিল। আমরা ভাইবোনে তখন কী করব, ভেবে কূল পাচ্ছি না। রাস্তায় ঘুরে বেড়াই। ক্লান্ত হয়ে পড়লে বসে পড়ি যেখানে-সেখানে। এমনই সময় একদিন আমার বন্ধু ইশিকের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। দেখা হয়ে গেল আচমকা। আমরা বসেছিলুম পাহাড়ের এক কোণে। ঠিক তার ওপরেই সে ভেড়া চরাচ্ছিল। সেখান থেকেই আমাদের দেখতে পেয়েছে সে। চুপচাপ আমাদের পাশে এসে বসল। ইশিক আমার কাঁধে হাত রাখল। আমাদের দুঃখে সে-ও যে দুঃখী। খুব নরম গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘কী করছিস এখানে?’
“কোনও উত্তর দিতে পারলুম না। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলুম তার চোখের দিকে।
“সে এবার আমার আর সানমার হাত ধরল। উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘আয় আমার সঙ্গে।
“আমি জিজ্ঞেস করলুম, কোথায়?”
“ইশিক বলল, ‘আয় না!’
“ওর ভেড়াগুলো যেখানে চরছে, ইশিকের হাত ধরে আমরা সেখানে গেলুম।
“ইশিক বলল, ‘বস!’
“আমরা বসে পড়লুম। তারপর অবাক হয়ে দেখলাম, ইশিক রোজ ভেড়া চরাতে যাবার সময় নিজের জন্যে যে খাবার নিয়ে যায়, সেই খাবারের পুঁটলিটা খুলল। তার ভেতর রুটি আর তরকারি। বলল, ‘আয়, তিনজনে ভাগ করে খাই।’
“আমি হতভম্ব হয়ে গেছি। সানমা কেঁদে ফেলল।
“আমি বললুম, না ইশিক, এ কী বলছিস তুই! তুই সারাদিন খাটবি। এ-খাবার তোর। তোর খিদের খাবার আমাদের খেতে বলিস না!

“সে শুনল না আমার কথা। সে সানমার চোখে জল দেখে বকা দিল। বলল, ‘একদম কাঁদবি না। আমি জানি কেন তুই কাঁদছিস! মায়ের জন্যে তো? না, মা-ও উপোস করে থাকবেন না। আমরা সবাই ভাগ করে খাব। মায়ের জন্যেও একটা ভাগ নিয়ে যাবি তোরা। একদিন যদি আমি পেট ভরে না-খাই, কিছু হবে না আমার। বাড়ি গেলেই খাবার পাব। তোদের পেটে তো কিছু পড়বে।’
“তার এমন দরদভরা কথা শুনে, আমারও চোখে জল এসে গেল। আমি তাকে বললাম, এটা না-হয় আজকে হল। এমনটা তো আর রোজ হয় না। আসলে আমরা অগাধ জলে ভাসছি।
“আমার এ-কথা শুনে এবার ইশিক যে-কথা বলল, সে-কথা শুনে আমার মাথা হেঁটে হয়ে গেল। মনে হল, এমন ভালবাসার বন্ধু পৃথিবীতে ক’টা পাওয়া যায়! কার না মনে হয় এ-বন্ধুকে আকুল হয়ে জড়িয়ে ধরি। সে বলল, ‘আয় না শাম্মিল আমার ভেড়া চরানোর কাজটা দু’জনে ভাগাভাগি করে নিই। আমার জিম্মায় তিরিশটা ভেড়া আছে। তুই পনেরোটার ভার নে, আমি পনেরোটার ভার নিই। যা মজুরি মিলবে দু’জনে ভাগ করে নেব। কিছুটা সুরাহা তো তোদের হবে।’
“ইশিকের কথা শুনে আমি কথা বলতে পারি না। আর সানমা দু’চোখ ভর্তি কান্না নিয়ে থমকে তাকায়। এই মুহূর্তে সে-ও যেন আমারই মতো বোবা।”
শাম্মিলের কথা শুনতে শুনতে, শাসার পিঠে বসে, অনেক চড়াই-উৎরাই করতে করতে, অনেকটা পথ পার হয়ে এসেছি। আমার বন্ধু দু’জন এগিয়ে গেছে অনেক দূরে, আমাদের নাগালের বাইরে। আমি দূর-দূরান্তের চমৎকার দৃশ্য দেখছি যত, শাম্মিল আর সানমার জীবনের গল্প শুনছি তত। রোমাঞ্চিত হয়ে জিজ্ঞেস করি, “তারপর কী হল?”
শাম্মিল উত্তর দিল, “দুটো পয়সা উপায় করার জন্যে ইশিকের কথা অগ্রাহ্য করতে পারলুম না। ইশিকের পনেরোটা ভেড়ার ভার আমরা দু’ভাইবোনে নিলুম।”
আমি জিজ্ঞেস করলুম, “তা হলে কি ভেড়া চরিয়ে, পয়সা জমিয়ে তোমরা শাসাকে কিনেছ?”
শাম্মিল উত্তর দিল, “না। সে অন্য ঘটনা।”
“কী সেই ঘটনা?” আমি জিজ্ঞেস করি।
শাম্মিল সেই ঘটনা বলতে শুরু করল, “আমি আর সামমা যেখানে ভেড়া চড়াই, সেটা বেশ উঁচু একটা পাহাড়ের চুড়ো। সেই চুড়োর গায়ে গায়ে যেমন ছড়ানো অঢেল সবুজ ঘাস, তেমনই পাইন আর বার্চের ছড়াছড়ি। এরই ফাঁক দিয়ে একটা রাস্তা চলে গেছে হাটের দিকে। আমাদেরই বাড়ির কাছাকাছি থাকেন রকশুমভাই। তিনি ভেড়ার লোমের কারবারি। এই লোম দিয়ে তৈরি হয় পশম। আর সেই পশম দিয়েই বোনা হয় কাশ্মীরি শাল। তাই যেদিনই হাট বসে, সেই দিনেই রকশুমভাই হাটে ছোটেন। নিজের ঘাড়ে বস্তা বস্তা ভেড়ার লোম নিয়ে পাহাড় টপকে হাটে যাওয়া তো আর সহজ কাজ নয়! তাই রকশুমভাই একটা ঘোড়া কিনেছিলেন। মাল বয়ে নিয়ে যাবার জন্যে। এখন আপনি যার পিঠে বসে আছেন, এটি সেই ঘোড়া।”
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলুম, “তোমরা পেলে কেমন করে?”
কেমন করে পেল, সেই কথা এবার বলতে শুরু করল শাম্মিল, “দেখতেই তো পাচ্ছেন, এখানে থেকে থেকে আকাশের রং পালটায়। কখনও মেঘে ঢেকে যাচ্ছে, আবার কখনও মেঘের ফাঁক দিয়ে উঁকি দিচ্ছে আকাশ। এই বৃষ্টি নামছে, আবার এই রোদে ঝলসে উঠছে পাহাড়।
“তেমনই সেদিন হয়েছে কী, খুব বৃষ্টি হয়েছে। পরের দিনে হাট। বৃষ্টির দিনে তো আর ভেড়া নিয়ে পাহাড়ে যাওয়া যায় না। তাই যেদিন হাট, সেইদিনই ঘটনাটা ঘটল।”
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কী ঘটনা?”
এতক্ষণে সানমার মুখে কথা ফুটল। সারাক্ষণ সে দাদার কথা শুনেছে। এবার সে নিজের কথা বলল। বলল, “আমরা ভেড়াগুলোকে ছেড়ে রেখেছি। তারা তো ঘাস খাচ্ছে। এদিক-ওদিক চলে যাচ্ছে। আর মাঝে মাঝেই আমরা তাদের মাথা গুনছি। এমন সময় হয়েছে কী, গুনতে গিয়ে দেখি, একটা ভেড়া গুনতিতে কম। মানে, দলছুট হয়ে হারিয়ে গেছে। খোঁজাখুঁজি শুরু হয়ে গেল। যাবে আর কোথায়! একটু এধার-ওধার করতেই আমার হাতে ধরা পড়ে গেল বাছাধন। তারপরেই অবাক কাণ্ড! সেইখানেই দেখি, একটা টাট্টুঘোড়া চিতপাত হয়ে পড়ে পড়ে পা ছুড়ছে। আমি চিৎকার করে দাদাকে ডাক দিলুম। দাদা ছুটে এল। ঘোড়াটাকে দেখে অবাক হয়ে গেল। দাদা আপনমনেই বলে উঠল, ‘এ তো রকশুমভায়ের ঘোড়া!’
“আমি ব্যস্ত হয়ে দাদাকে জিজ্ঞেস করলুম, কী হয়েছে? ঘোড়াটার অসুখ করেছে না কি?
“দাদা ঘোড়াটার গায়ে-মাথায় হাত বোলাল। আমিও। বুঝতে পারলুম ঘোড়াটার খুব কষ্ট হচ্ছে। ভারী ছটফট করছে। আমি আকুল হয়ে দাদাকে বললুম, একটা কিছু কর দাদা!
“দাদা একমুহূর্ত কিছু ভাবল। তারপর আমাকে বলল, ‘তুই এখানে থাক। ভেড়াগুলোর উপর নজর রাখ। আমি এক্ষুনি আসছি।’ বলে দাদা তরতর করে পাহাড় থেকে নামতে নামতে কোথায় ছুটল আমি ঠাওর করতে পারলুম না। আমি ভেড়াগুলোকে সামলাতে লাগলুম।”
“আসলে আমি ছুটলুম রকশুমভাইয়ের বাড়ি”, সানমার কথা শেষ হবার আগেই শাম্মিল শুরু করল তার কথা। বলল, “রকশুমভাইকে ঘোড়ার কথা বলতেই, তিনি বললেন, ‘ঘোড়াটাকে রোগে ধরেছে। এ রোগ সারবে না। হাট থেকে ফেরার সময় পাহাড়ে আচমকা হোঁচট খেয়ে পড়ল। বমি করল। সেই যে পড়ল, আর উঠল না। আমি জানি ক’দিন পরেই মরবে। তাই আর গা করিনি পাহাড় থেকে নীচে নিয়ে আসার। ওইখানেই পড়ে থাক। মরবেই যখন, ওইখানেই মরুক। শেয়াল-কুকুরে খেয়ে ফেলবে।
“আমি অবাক হলুম তাঁর এমন নিষ্ঠুর কথাবার্তা শুনে। বললুম, আপনি তো বাঁচাবার চেষ্টা করতে পারতেন! বেচারা পড়ে পড়ে কাতরাচ্ছে। আমার সঙ্গে গেলেই দেখতে পাবেন।”
“রকশুমভাই বললেন, ‘তুই ছেলেমানুষ। যে মরবে, তার জন্যে কেউ পয়সা খরচ করে? তার ওপর রোগে ধরা ঘোড়াকে পাহাড়ের ওপর থেকে নীচে নামিয়ে আনা, সে-ও কি মুখের কথা? একটা আধমরা ঘোড়ার জন্যে অত হুজ্জুতি পোষাবে? অত দয়া দেখিয়ে লাভ কী আমার? ঘোড়াটার জন্যে তোর যদি অতই দরদ, তবে যা, তুই যা পারিস কর গে যা! আমি কিছু বলতে যাব না।’
“অগত্যা আমি আবার ছুট দিলুম পাহাড়ে। গিয়ে দেখলুম ঘোড়াটার একই অবস্থা। আমি আর সানমা দু’জনেই ঠিক করলুম, ঘোড়াটার রোগ যদি ভাল না-হয় তবে তো মরবেই। কিন্তু যতক্ষণ প্রাণ আছে ততক্ষণ চেষ্টা করতে দোষ কী! কথা বলতে পারে না যে প্রাণী, সে বেঘোরে মরে যাবে, আর আমরা চুপচাপ দেখব! না, তা হতে পারে না। তাই অন্য আর কিছু না-ভেবে, লেগে পড়লুম ঘোড়াটার শুশ্রূষায়। সানমা ছুটল ঝরনার জল আনতে। আমি ঘোড়ার গায়ে দলাই-মলাই করতে লাগলুম। আর নজর রাখলাম ভেড়াগুলোর ওপর। সানমা জল নিয়ে এল। আমি ছিঁড়ে ছিঁড়ে ঘাস আনলুম। সবুজ টাটকা ঘাস মুখের কাছে ধরতেই ঘোড়া চিবোতে লাগল। সানমা ঘোড়ার মুখে মাথায় জল দিল। ঘোড়া জল খেল। আরও জল খাবে সে। সানমা আবার ছুটল। আরও ঘাস খাবে সে, খিদে পেয়েছে। আমি ছুটলুম ঘাস আনতে। ঘোড়া আশ মিটিয়ে জল খেল। পেট ভরে ঘাস খেল। মনে হল, দু’তিন দিন তার পেটে কিছু পড়েনি। আর সত্যি বলতে কী, ঘোড়ার পেটে ঘাস-জল পড়তে আমাদের মনে হল, ঘোড়াটা একটু চাঙ্গা হয়েছে। কিন্তু হলে কী হবে, পড়েই রইল সে পাথরের ওপর। উঠে দাঁড়াবার ক্ষমতা নেই।
“এতক্ষণ ঘোড়া নিয়েই আমরা হুটোপাটি করেছি। ভাল বলতে হয় ভেড়াগুলোকে। যতক্ষণ আমরা ঘোড়া নিয়ে ব্যস্ত থেকেছি, ততক্ষণ তারা নিজের মনে চরেছে। কিন্তু এবার যে সূর্য ঢলে পড়ছে। সন্ধে নামছে। আমাদেরও যে নামতে হবে! ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে হবে ভেড়া। সুতরাং আর তো দেরি করা যায় না। ঘোড়াটাকে ওই অবস্থায় ফেলেই আমাদের নেমে আসতে হল। আহা রে! ফিরছি বটে, কিন্তু মন চায় না!
“ঠিক এমনই সময়ে সানমা বলে উঠল, ‘মানুষ কত নিষ্ঠুর হয় দেখলি তো! যতদিন পাহাড় ভেঙে মাল বয়েছে ঘোড়া, ততদিন সে তোমার বন্ধু। আর যখনই তার অসুখ করল, যখন সে মর মর, সে হয়ে গেল জঞ্জাল। সে পড়ে থাক পাহাড়ে। মরুক পড়ে পড়ে। ভাবলে চোখে জল আসে, না রে দাদা?’”
সানমা আর শাম্মিলের মুখে পিশাচ লোকটার এই নৃশংস গল্প শুনতে শুনতে আমার রাগে গা রিরি করে ওঠে। আমি উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করি, “তারপরে কী হল? তোমরা কী করলে শাম্মিল? সানমা?”
শাম্মিল উত্তর দিল, “ঘরে ফিরে মা’কে বললুম সব কথা। সত্যি বলতে কী, সে-রাত্রে চোখে ঘুম এল না। সারা রাত আমরা ভাইবোনে জেগেই কাটালুম। আমাদের চোখে কেবলই ভেসে উঠছে ঘোড়ার সেই কষ্টের ছটফটানির ছবিটা। ঘুম হল না বলেই, খুব ভোর ভোর আমরা উঠে পড়লুম। অন্য কোনও চিন্তা এখন আমাদের মাথায় নেই। ঘোড়াটা কেমন আছে দেখার জন্যেই এখন আমাদের মন আনচান করছে। সানমা বলল, ‘কিন্তু দাদা, আমাদের তো ভেড়া চরাতেই হবে। শুধু ঘোড়ার কথা ভাবলে তো হবে না। তুই বরং এক কাজ কর বাড়ি বাড়ি ভেড়া জোগাড় করে নিয়ে আয়। আমি এগিয়ে গিয়ে দেখি ঘোড়াটার কী হল!’
“আমি রাজি হলুম। সানমা ছুটল পাহাড়ে ঘোড়া দেখতে। আমি ছুটলুম বাড়ি বাড়ি ভেড়া জোগাড় করতে।
“আপনি শুনলে অবাক হয়ে যাবেন, আমি যখন ভেড়া নিয়ে পাহাড়ে উঠলুম, তখন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারি না, দেখি ঘোড়াটা উঠে দাঁড়িয়েছে! আর সানমা তাকে ঘাস খাওয়াচ্ছে! আমি আনন্দে চিৎকার করে উঠেছি। আমাকে দেখে আনন্দে চিৎকার করে উঠল সানমাও। আমরা দু’জনেই ঘোড়ার মুখের সামনে দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়ে লাফালাফি করতে লাগলুম। সঙ্গে সঙ্গে ঘোড়াটাও ঘাড় নেড়ে মাথাটা নিচু করল। আমরা জড়িয়ে ধরে প্রাণপণে আদর করলুম।
“সেদিনটা পাহাড়ের ওপরে কী আনন্দে কাটল। সন্ধে হবার আগেই সেদিন ভেড়ার সঙ্গে ঘোড়াটাকে আমরা পাহাড় থেকে নামিয়ে আনলুম। আমি গেলুম বাড়ি বাড়ি ভেড়া পৌঁছে দিতে। সানমা গেল ঘোড়াটাকে নিয়ে আমাদের বাড়িতে। রক্ষে এই, ঘোড়ার থাকার মতো আমাদের বাড়ির লাগোয়া একটু জায়গাও ছিল। সেখানেই সে থাকল।
“এ খবর কি চাপা থাকে? রকশুমভায়ের কানে ঠিক পৌঁছে গেল। পরের দিনই এসে হাজির। চেয়ে বসলেন ঘোড়া। আমরা বেঁকে বসলুম। বললুম, আপনার ঘোড়া তো মরে গেছে! এ ঘোড়া এখন আমাদের। আমরা দেব না।
“রকশুমভাই কি দাবি ছাড়েন!
“আমরা বললুম, আপনি তো বলেছিলেন, ঘোড়াটা মরে যাবে। জঞ্জাল বলে পাহাড়ে ফেলে নেমে এসেছিলেন। আমরা বাঁচিয়ে তাকে ঘরে এনেছি। এ ঘোড়া এখন আমাদের।
“এই দেওয়া-নেওয়া নিয়ে অনেক কথা কাটাকাটি হল। রকশুমভায়ের সঙ্গে। শেষ পর্যন্ত আমরা যখন কিছুতেই রাজি হলুম না, তখন রকশুমভাই গাঁয়ের সর্দারের কাছে ছুটলেন। অনেক লোকজনের সামনে সর্দার অনেক জেরা করলেন। আমরা কিন্তু জিদ ধরেই থাকলুম। শেষ পর্যন্ত সর্দার বললেন, ‘ঠিক আছে, তোমরা যখন কেউ নিজেদের দাবি ছাড়তে চাইছ না, তখন এক কাজ করা হোক। ঘোড়াটাকে পাহাড়ে ছেড়ে দিয়ে আসা হোক। ঘোড়া যদি ফিরে আসে, আর ফিরে এসে যার কাছে যাবে, মনে করতে হবে ঘোড়া তার।’
“এ বাবা সর্দারের রায়। অমান্য করে কার সাধ্যি। কাজেই আমরা যেমন রাজি হলুম, রকশুমভাইকেও রাজি হতে হল। ঘোড়া নিয়ে সর্দারের লোক পাহাড়ে ছেড়ে দিয়ে এল। আমাদের মন খারাপ হয়ে গেল।
“ও মা, বলব কী, সকালে সর্দারের লোকেরা ঘোড়াকে পাহাড়ে ছেড়ে দিয়ে এল, বিকেলেই সে হাজির হল আমাদের বাড়িতে। আমরা ঘোড়া নিয়ে ছুটলুম সর্দারের ডেরায়। পাড়ার পাঁচজন লোকও দেখল ঘটনাটা। অগত্যা সর্দারকে বলতে হল, ঘোড়া আমাদেরই। আমরা ঘোড়া নিয়ে ঘরে ফিরলুম।”
আমি জিজ্ঞেস করলুম, “তারপর?”
“এবার শেষ কথা বললেন আমাদের মা। বললেন, ‘শাম্মিল, সানমা, তোরা আমার সোনার টুকরো ছেলেমেয়ে। আমি তোদের দয়ামায়ার জয় দেখতে চেলেছিলুম বলে আমার মনের কথাটা এতদিন বলিনি। সে কাজে তোরা জয়ী হয়েছিস। তোদের সেবাযত্নে একটা অবলা প্রাণী প্রাণ ফিরে পেয়ে তোদের কাছেই ফিরে এসেছে। কিন্তু বাবা, আসলে ঘোড়া তো তোদের নয়! ঘোড়া তো রকশুমভায়ের। তা-ই আমি বলি কী, তোরা ঘোড়া নিয়ে এখন মাথা উঁচু করে রকশুমভায়ের কাছে যা। ঘোড়া তাকে ফেরত দিয়ে আয়। আর বলে আয়, আমরা গরিব হতে পারি, কিন্তু লোভী নই। অন্যের জিনিস নিজের বলা অপরাধ।’
“আমরা বুঝতে পারি, যা বললেন মা ঠিকই বললেন। আমরা ঘোড়া নিয়ে মাথা উঁচু করে রকশুমভায়ের কাছে গেলুম। তার ঘোড়া তার হাতে পৌঁছে দিয়ে বললুম, রকশুমভাই এ-ঘোড়া আপনার। তাই আপনাকেই দিয়ে গেলুম। আমার মা বলেছেন, আমরা গরিব গতে পারি, কিন্তু লোভী নই। অন্যের জিনিস নিজের বলা অপরাধ।
“আপনাকে বলব কী, রকশুমভাই আমাদের কথা শুনে আচমকা আমাদের জড়িয়ে ধরলেন। তাঁর চোখ ছলছল করে উঠল। তিনি কান্নাভেজা গলায় বলে উঠলেন, ‘তোর মা ঠিক কথাই বলেছেন। তোরা নয়, অপরাধী আমিই। আমি এমনই নিষ্ঠুর, একটা অসহায়, অসুস্থ প্রাণীকে সেবাযত্ন না-করে জঞ্জাল বলে ফেলে আসি পাহাড়ে। আমি পিশাচ। তোরা তাকে বাঁচিয়েছিস। এ ঘোড়া এখন আর আমার নয়। এর মালিক তোরা। আমি ফিরিয়ে নিতে পারি না। নিয়ে যা তোরা।’
“আমরা শত চেষ্টা করেও রকশুমভাইকে রাজি করাতে পারলুম না। অগত্যা আমরাই ফিরিয়ে আনলুম ঘোড়াকে আমাদের বাড়িতে। নাম রাখলুম শাসা। সেই থেকে শাসা আমাদের।”
শাম্মিল আর সানমার গল্প শেষ হল। আমারও শেষ হল খাজিয়ার চোখ ধাঁধানো হিমবাহ দেখার। শুধু আফসোস থেকে গেল আমার সেই দুই বন্ধুর জন্যে। তাররা শুনতে পেল না শাম্মিল আর সানমার এই অদ্ভুত গল্পটা। এত তাড়াহুড়ো করে তারা এগিয়ে গেল! তাড়াহুড়ো করলে অনেক সময় অনেক গল্পই আমাদের মন ছুঁতে পায় না এমন করে!

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন