শৈলেন ঘোষ

এইমাত্র আমি ইয়াসিনের চিঠি পেলুম। সে তো প্রায় নয় নয় করে পঁয়ত্রিশ বছর আগের কথা। তখন আমার তরুণ বয়েস। বেড়াতে গেছি কাশ্মীর। সেখানেই আমার বন্ধুত্ব হয়েছিল ছোট্ট ইয়াসিনের সঙ্গে। আমি কাশ্মীরে যে হাউসবোটে আস্তানা নিয়েছিলুম, সেটি ছিল ঝিলাম নদীর ওপর। ইয়াসিন ছিল সেই হাউসবোটের মালিকের ছেলে। তখন তার বয়েস খুব বেশি হলে আট। ভারী ফুটফুটে দেখতে ছিল তাকে। নীলচে আভায় চোখের মণি চকচক করছে। গোলাপি গালদুটো হাসলেই টোল খাচ্ছে। মাথায় একরাশ সোনালি চুল। এলোমেলো, কপালে ছড়ানো। ফেটে পড়ছে গায়ের রং। দেখলেই মনে হয় আদর করি। হাউসবোটে প্রথম পা রাখতেই অদ্ভুত একটা সোনাঝরা গলায় সে আমাকে আপ্যায়ন করল, “সালাম সাব।”
আমি তার গলার স্বর শুনে চমকে উঠেছি। তার চোখের ওপর চোখ পড়তেই আমি থমকে গেছি। টুকটুকে লাল ঠোঁট উপচে হাসি গড়িয়ে পড়ছে তার। নিমেষে অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে আমার মুখ দিয়ে আচমকা বেরিয়ে এল পালটা উত্তর, “সালাম।”
ঝলমল করে উঠল মুখখানা তার খুশিতে। সে প্রায় ছুটেই এল আমার কাছে। আমার হাত থেকে ছোট্ট স্যুটকেসটা কেড়ে নিল। ছুটল সেই ঘরটায় যে-ঘরে থাকব আমি। জম্মু থেকে শ্রীনগর আসার পথে যেমন হতবাক হয়ে দেখছিলুম প্রকৃতির সৌন্দর্য, তেমনই এখন হতবাক হয়ে দেখছি এই ছোট্ট ছেলেটিকে। ভাল লাগছিল এইকথা ভেবে, যে-ক’টা দিন কাশ্মীরে থাকব, ছেলেটিকে বারবার দেখতে পাব। আর সত্যি তা-ই। ক’দিনে সে আমার আপন হয়ে গেল বন্ধুর মতো।
হাউসবোটের যে ঘরটায় আমার জায়গা হল, সে ঘরটি ভারী চমৎকার। না বললেও কে না জানে, জলে দোল দোল এইসব হাউসবোট ইট-পাথরে গাঁথা নয়। খুব শক্তপোক্ত কাঠে তৈরি। কাঠের তৈরি আমার ঘরের মেঝেটা আগাগোড়া কার্পেটে ঢাকা। রংটা তার আকাশরঙা নীল। আর সারা ঘরখানা সাদা ধবধব দুধের রঙে ঝলমলে। ঘরের চার দেওয়ালে বড় বড় জানলা। রেশমি কাপড়ের পর্দা উড়ে উড়ে সরে যায়। ঠান্ডা বাতাসের সঙ্গে চাঁদের নরম আলো কখনও ছড়িয়ে পড়ছে, কখনও লুকিয়ে পড়ছে উঁকি দিয়ে। চাঁদের কথা উঠল যখন, তখন বোঝাই যায় এখন সন্ধে পেরিয়ে রাত নেমেছে আকাশে। আমিও হাউসবোটে আশ্রয় নিয়েছি এই রাতেই। বেশ ঠান্ডা। ভেতরে ভেতরে কাঁপছি। ঘরের সেজবাতিটাও কেঁপে উঠছে।
ছেলেটি স্যুটকেসটা এককোণে রাখল। নিজেই জানলার পাল্লাগুলো বন্ধ করতে লাগল। করতে করতে বলে উঠল, “আংকল, বহুত ঠান্ডা আছে। আপনাকো কষ্ট হোবে। হামি সোব বন্ধ কোরে দিব।”
আরে! খুদেটা ভাঙা ভাঙা বাংলা জানে দেখি! আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করি, “তুমি বাংলা জানো?”
সে উত্তর দিল, “থোড়া থোড়া।” বলেই হেসে উঠল।
আমি তেমনই অবাক গলায় আবার জিজ্ঞেস করলুম, “কেমন করে শিখলে?”
সে জবাব দিল, “কলকাত্তা সে কত বাঙালিসাব কাশ্মীরে ঘুমনে আসেন। হামি তাঁদের কথা শুনিয়া শুনিয়া শিখিয়াছি।”
আমি আপন মনেই বলে ফেললুম, “বাহ্!”
সে আনন্দে উচ্ছল হয়ে হেসে উঠল।
জিজ্ঞেস করলুম, “তোমার নাম কী?”
উত্তর পেলুম, “ইয়াসিন।”
হ্যাঁ, এই সেই ইয়াসিন। তারই চিঠি আজ পেয়েছি। পঁয়ত্রিশ বছর পরে। আশ্চর্য!
এই পঁয়ত্রিশ বছরে সেই আট বছরের ছোট্ট ছেলেটা তখন রোজ সকালে আমার ঘরের দরজায় টোকা মেরে আমার ঘুম ভাঙাত, যতদিন আমি কাশ্মীরে ছিলুম। রোজ সকালে আমার ঘরে ঢুকে জানলার পর্দা সরিয়ে সে আমায় দেখাত হিমালয়ের বরফঢাকা চুড়োর দৃশ্য। দেখাত বরফ-গলা জলে পাহাড়ের ঢালে কেমন ফসলের চাষ হচ্ছে। কেমন করে বেড়াচ্ছে সাদা লোমের ভেড়া দল বেঁধে।
কোনও কোনও দিন সে আমার হাত ধরে নিয়ে যেত ঝিলামের ধারে, অনেক দূরে। দূরে দূরে জলাভূমির ওপর জন্মেছে কত তৃণ-গুল্ম। এদিকে ওদিকে ধানখেত। থই থই জলে ফুটেছে পদ্ম, না-হয় লিলিফুল। ফুল দুলছে চতুর্দিকে মাথা তুলে।
আশ্চর্য, ইয়াসিন ক’দিনের মধ্যেই হয়ে উঠল আমার সবসময়ের সঙ্গী। সে আমায় নিয়ে যায় শিকারায়। ডাললেকের জলে শিকারায় ভেসে তার সঙ্গে দেখি ফুলবাগিচা, শালিমারবাগ, নিশাতবাগ, শাহিবাগ। তিন-চারশো বছর আগে মোগল সম্রাটরা ডাললেকের তীর ছোঁয়া গায়ে গায়ে গড়ে তুলেছিলেন এইসব চোখ-ধাঁধানো বাগিচা। সময় পেলেই তাঁরা বেড়াতে আসতেন কাশ্মীরে। তাঁরা বলতেন, এ দেশ যেন মুক্তোর ওপর সবুজ পান্না। মোগল সম্রাট জাহাঙ্গির বলতেন, ‘মানুষের জগতে স্বর্গের মায়া’।
ইয়াসিন এই ডাললেকে শিকারায় ঘুরতে ঘুরতে সেদিন আমায় যে-গল্প বলেছিল, তার মুখে সে-গল্প শুনে আমি হতবাক হয়ে যাই। সে শোনাল, হিন্দুদের একটি উপাখ্যানের গল্প। বলল, এককালে একটা খুব বড় হ্রদের জলের তলায় ডুবেছিল এই কাশ্মীর দেশটা। এই ডুবন্ত জলের নীচে লুকিয়ে ছিল জলদভব নামে একটা পাজি দানব। সে যে কত অনিষ্ট করেছে মানুষের, বলে শেষ করা যায় না। স্বর্গের দেবতারাও তার সঙ্গে পেরে উঠত না। শেষমেশ ব্রহ্মার নাতি করল এক কাণ্ড। করল কী, তার তরোয়াল দিয়ে পাহাড়ের গায়ে জোরসে মারল এক কোপ! এক কোপেই পাহাড়ের গায়ে সৃষ্টি হল একটা মস্ত গর্ত। আর অমনই সঙ্গে সঙ্গে সেই গর্ত দিয়ে হুড়হুড় করে বেরিয়ে গেল রাজ্যের জল। ধরা পড়ে গেল দানবটা। সে মরল। আর সেই সঙ্গে জলের তলা থেকে বেরিয়ে এল এই চোখ ঝলমল কাশ্মীর।
ভাঙা ভাঙা বাংলায় ইয়াসিনের মুখে এই গল্প শুনে আমি অবাক হয়ে যাই। জিজ্ঞেস করি, “এ গল্প তুমি কেমন করে জানলে?”
সে উত্তর দিল, “হামার মাস্টারজি বলেছেন।”
পঁয়ত্রিশ বছর কেটে গেছে। সেই মাস্টারজি এখন কেমন আছেন জানি না। জানি না, আজও তিনি হিন্দুদের এমন উপাখ্যানের গল্প তাঁর ছাত্রদের শোনাতে পারেন কি না। বোধ হয় পারেন না। কেন না, সময় পালটে গেছে। সময় কেড়ে নেয় কত কী। আজ ইয়াসিনের চিঠিখানা পড়তে পড়তে এই কথাটাই বার বার মনে হচ্ছে।
হ্যাঁ, এখন আমার মনে পড়েছে, ঠিক বটে সেই পঁয়ত্রিশ বছর আগে কাশ্মীর থেকে ফিরে আসার সময় আমার সেই ছোট্ট বন্ধু ইয়াসিনকে আমার ঠিকানাটা দিয়ে আসি। সেই সময়ে ইয়াসিনের বাবা দু’-একখানা চিঠিও লিখেছিলেন। আমি উত্তরও দিয়েছি। তার পরে আপনা-আপনি চিঠি লেখার রেওয়াজটাও হারিয়ে গেল। এও সেই সময়। সে যত বয়ে যায়, মনও যেন ততই ঝাপসা হয়ে আসে। তাই আজ এই হঠাৎ ইয়াসিনের চিঠি পেয়ে মন যদি চমকে ওঠে, তবে সেটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু স্বাভাবিক যা নয়, তা হল, সেই চিঠিতে সে যা লিখেছে, সেই বিষয়টা। সে গায়ে কাঁটা দেওয়া এক ঘটনা। ইয়াসিন সে-ঘটনা তার চিঠিতে ইংরেজিতে লিখেছে। আমি তোমাদের শোনাই বাংলা তর্জমা করে। সে লিখেছে:
সালাম আংকল,
আমি বুঝতে পারছি, এতক্ষণে আমার এই চিঠির খামখানা আপনি আঁকুপাকু করে খুলে ফেলেছেন। এ চিঠি কে লিখেছে সেটা জানার জন্যে আপনি শেষ পাতাটা আঁতিপাতি করে হাতড়াচ্ছেন। শেষ পাতার শেষ লাইনে আপনার দৃষ্টি থমকে থামতেই আপনি পড়ে ফেললেন একটি নাম— ইয়াসিন। আপনি নিশ্চয়ই থামলেন। ভাবলেন, কে ইয়াসিন। তারপর আবার প্রথম পাতায় ফিরে এলেন। এসে, চিঠির ওপরের ডানদিকে চোখ রেখে পড়ে ফেললেন আমার ঠিকানা। হঠাৎই চমকে উঠলেন। হয়তো, হঠাৎই আপনার মনে পড়ে গেল পঁয়ত্রিশ বছর আগের কথা। মনে পড়ে গেল, কাশ্মীরে বেড়াতে এসে ইয়াসিন নামে একটি আট বছরের ছেলের সঙ্গে আপনার বন্ধুত্ব হয়েছিল। হ্যাঁ, আমি সেই ইয়াসিন। আমাকে আপনার মনে রাখার কথা নয়। হয়তো, এই চিঠিখানা পেয়ে খুব আবছা সেই আট বছরের ছোট্ট ইয়াসিনের মুখখানা ভেসে উঠবে আপনার চোখে। কিন্তু তখনকার সেই ইয়াসিন আর আজকের এই ইয়াসিনে কত তফাত!
আংকল, এখন আমার বয়েস চল্লিশ পেরিয়ে গেছে। খুঁজলে আমার মাথায় দু’-একটা পাকাচুলও দেখা যাবে। আমি এখন একটি ছোট্ট মেয়ের বাবা। লেখাপড়া শিখেছি। ইস্কুলের মাস্টারজি হয়েছি। আমার বাবা-মা দু’জনেই গত হয়েছেন। হাউসবোটটা এখনও আছে। আমাদের বয়েস বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তারও বয়েস বেড়েছে। জৌলুসও কমেছে।
আসলে জৌলুস তো কমেছে সারা কাশ্মীরের। সেই আলো-ঝলমল মরসুমের সময় দেশ-বিদেশের কত মানুষ কাশ্মীরে বেড়াতে আসতেন। কাশ্মীর জমজমাট হয়ে উঠত মানুষের মিলন-আনন্দে। এখন তার এককণাও চোখে পড়বে না। এখন এখানে নিত্যদিন ফাটছে বোমা, ছুটছে গুলি। কে আসবে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে এমন দুর্ভাগা দেশে। অন্যের প্রাণের কথা ছেড়ে দিন, শুনলে হয়তো আঁতকে উঠবেন, এখন আমার নিজের প্রাণই বুঝি রাখা দায়! ভাবছেন কেন? আংকল, সেই ভয়াবহ গল্প শোনাতেই আপনাকে আমার এই চিঠি লেখা।
আপনার মনে আছে কি না জানি না, কিন্তু আমার স্পষ্ট মনে আছে, যেদিন আপনি গুলমার্গে বেড়াতে যান, সেদিন আমাকেও সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন। গুলমার্গে থাকতেন আমার কাকা। কাকারও ছিল একটি ছেলে। আমার বয়সি। খুব বেশি হলে, আমার চেয়ে চার-পাঁচ মাসের বড় হবে। সে আমার নাম ধরে ডাকত। আমি তাকে ‘ভাই’ বলতুম। আপনার সঙ্গে গিয়ে অনেকদিন পরে তাকে দেখার সুযোগ হয়েছিল আমার। কাকার বাড়িতে আপনিও গিয়েছিলেন। আমার ভাইকে আপনিও দেখেছেন। মনে আছে কি না জানি না, কিন্তু আমার মনে আছে, সেদিন আমরা খুব আনন্দ করেছিলুম। কত গল্প, কত হল্লা।

আংকল, আমার আজকের সেই গায়ে কাঁটা দেওয়া গল্পটা আমার সেই ভাইকে নিয়েই। সে আর আমি দু’জনেই এখন যেমন শক্তিমান, তেমনই সুপুরুষ। খাটতেও পারি দু’জনে সমান। আমি যেমন ইস্কুলে ছাত্র পড়াই, ও তেমন শালের গায়ে নকশা বোনে। ওর হাতের কাজ খুব ভাল। তাই খাতিরও খুব। আসলে সে এখন একজন নামকরা শিল্পী। কালেভদ্রে সে আমাদের হাউসবোটে আসে। আমিও কখনও-সখনও ওদের বাড়িতে যাই।
কালেভদ্রে বললুম এই কারণে, আমার ওই ভাইকে এখন দিনরাত কাজ করতে হয়। যখন কাশ্মীরে রক্তগঙ্গা বয়ে যায়নি, তখন দুটো পয়সা রোজগারের জন্যে আমাদের হাপিত্যেশ করতে হত না। কত রকমের হাতের কাজ করতে পারেন এদেশের মানুষ। তখন আপনারাও কাশ্মীরে দলে দলে আসতেন। এইসব জিনিস কিনতেন। ব্যবসা চলত রমরম করে। এখন দিনরাত খেটেও পেট ভরে না মানুষের। এখন কী যে দুঃসময় চলছে। বেঘোরে প্রতিদিন প্রাণ যাচ্ছে নিরীহ মানুষের। বাদ যাচ্ছে না মা, বোন, শিশু, বৃদ্ধ কেউ। তাই, কী আতঙ্কেই না দিন কাটছে আমাদের।
ঠিক এমনই সময়ে আমার জীবনে ঘটল সেই মারাত্মক ঘটনা। আমাকে হতে হল ঘাতক। শুনলে অবাক হয়ে যাবেন, আজ আমার হাতে উঠেছে রাইফেল। আমাকেও নিতে হচ্ছে নিরীহ মানুষের প্রাণ। আমার হাতের নিশানা থেকে বাদ নেই শিশু, নারী, বৃদ্ধ কেউ। হুকুম হলেই আমার রাইফেল শব্দ তুলছে, গুড়ুম-ম-ম! গুড়ুম-ম-ম! দিনের বেলা আমি ইস্কুলের শিক্ষক। ছাত্রদের শেখাই, কারা তাদের বন্ধু, কারা শত্রু। আর, রাতের অন্ধকারে আমি একজন ঘাতক। খুন করি শত্রুদের হাতের বোমা ছুড়ে, না-হয় রাইফেলের গুলিতে।
আংকল, আপনি নিশ্চয়ই ভাবছেন, আমি কেমন করে এমন নৃশংস হলুম!
কে করল আমায় এমন? কে? আজ আপনাকে সেই কথাই বলতে লিখছি এই চিঠি। হ্যাঁ আংকল, আপনাকেই। কেন না, আমার সেই ছোট্টবেলার এমন ভালবাসার বন্ধু আর কাউকে মনে করতে পারছি না, যাকে বিশ্বাস করে একথা বলা যায়। বলা যায়, আমি সুযোগ পেয়েও একজনের বুকে রাইফেল ছুড়তে পারিনি। ছুড়তে গিয়ে কেঁপে উঠেছিল আমার হাত। ছলছল করে উঠেছিল আমার চোখ। কেন? লিখছি সেই কথাই। তা হলে বলি, কেমন করে আমি ঘাতক হলুম সেই ঘটনা গোড়া থেকেই।
একদিন দুপুরে হঠাৎ গুলমার্গ থেকে আমার সেই ভাই হাজির হল আমাদের হাউসবোটে। অনেকদিন পরে তাকে দেখলুম। সেই কারণেই কি না কে জানে, তার চেহারাটা কেমন অন্যরকম লাগল। গায়ের রংটা যেমন চাপা চাপা মনে হল, তেমনই মুখখানাও কেমন যেন রুক্ষ হয়ে গেছে। দেখলে কেমন যেন সন্দেহ লাগে।
তা, সে যাই হোক, অনেকদিন পরে বাড়িতে আত্মীয়স্বজন এলে ভালমন্দ খাওয়াদাওয়া, যথাসাধ্য যত্নআত্তি এসব তো আছেই। সেইসঙ্গে এর খবর নেওয়া, তার খবর জানা, খুঁটিনাটি কত গল্পই না হয়! তো, আমার ভায়ের সঙ্গে এইসব নিয়ে অনেকক্ষণ ধানাই-পানাই হল। তারপর একফাঁকে হঠাৎ ভাই বলল, “তোর সঙ্গে আমার কিছু দরকারি কথা আছে। সেই কারণেই আমি এসেছি। চ, কোথাও নিরিবিলিতে গিয়ে বসি।”
তার কথা শুনে বুকের ভেতরটা কেমন ছ্যাঁত করে উঠল। ভাবি, নিরিবিলিতে যেতে বলছে কেন? কী এমন কথা যে সবার সামনে বলা যায় না! তবে কি টাকা-পয়সা চাইবে!
হয়তো বা! সুতরাং আমি আর কথা না বাড়িয়ে বললুম, “চ।” তার পরে ঝিলামের একটা নিরিবিলি তীরে দু’জনে বসলুম। জিজ্ঞেস করলুম, “বল, কী বলছিলি?”
আমি দেখলুম, সে চারপাশটা ভাল করে চোখ বুলিয়ে নিল। হ্যাঁ, জায়গাটা যে খুবই নির্জন, সেটা বুঝতে তার অসুবিধে হল না। তবুও গলার স্বর যতদূর সম্ভব চেপে সে ফিসফিস করে বলল, “কথাটা কিন্তু খুব গোপনীয়। ফাঁস হয়ে গেলে তোরও বিপদ, আমারও। দু’জনের প্রাণ যেতে পারে।”
আমি ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেছি। মুহূর্তের মধ্যে আমি বুঝতে পেরেছি আমার ভাই কী বলতে চায়। বুঝতে পেরেছি, আমার ভাইও রক্তঝরানো খেলায় মেতেছে। আমারও আর রক্ষা নেই। আমাকেও তাদের দলের সঙ্গী করতে চায়। আমাকেও ঘাতক করবে সে। ভয়ে থরথর করে কাঁপতে লাগল আমার সারাশরীর। গলা শুকিয়ে এল। তবুও ভয়টাকে অনেক কষ্টে বুকের মধ্যে চেপে রেখে জিজ্ঞেস করলুম, “এমন কী কথা, যে জানাজানি হয়ে গেলে প্রাণ যাবে?”
সে বলল, “তোকে রাইফেল চালানো শিখতে হবে।”
ধক করে উঠল আমার বুকের ভেতরটা। ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলুম, “কেন?”
ভাই উত্তর দিল, “কারা রাইফেল চালায়, কেন চালায় জানিস না তুই?”
যে-সন্দেহ এতক্ষণ আমার মনে গেড়ে বসেছিল, তা সত্যি হয়ে গেল। আমার ভাইয়ের এই একটা কথায়। আমি ভয়ে কুঁকড়ে গেলুম। আমার গলায় যেন কথা আসতে চায় না। তবু অনেক কষ্টে জিজ্ঞেস করলুম, “তুইও কি রাইফেল চালাতে পারিস?”
“হ্যাঁ।”
“তুইও কি নিরীহ মানুষের প্রাণ নিস?”
“শত্রুর প্রাণ নিই। শত্রু সে শত্রুই। কে নিরীহ, আর কে নয়, সে নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না।”
আমি আবার জিজ্ঞেস করলুম, “তোর যদি বিপদ হয়?”
ভাই সোজাসাপটা উত্তর দিল, “হবে।”
“বাড়িতে যে তোর মুখ চেয়ে বসে আছেন, তোর বাবা, তোর মা, তোর বউ?”
“যে যুদ্ধ করে, তাকে এসব কথা ভাবতে নেই।”
“তোর যে একটি ছোট্ট ছেলে আছে?”
“থাকতে পারে। কিন্তু আমার এখন বন্ধু একটি রাইফেল।”
“আমি যদি বলি আমার দ্বারা এ কাজ হবে না।”
“আমার রাইফেলের নল তোর বুকের ওপর গর্জে উঠবে।”
আমি থমকে গেলুম। স্থির হয়ে গেল আমার চোখের দৃষ্টি তার মুখের দিকে চেয়ে। বুঝতে পারলুম, আমার ভাই এখন হিংসার আগুনে জ্বলছে। ওকে আর রোখা যাবে না। আমাকেও সে ছাড়বে না। হয় তার মতো হিংস্র হতে হবে, না-হয় তারই হাতে আমাকে মরতে হবে। নইলে এই অপকাজ করতে গিয়ে পড়তে পারি সেনাদের হাতেও। না, কোনও দিকেই আমার নিস্তার নেই। আমার সংসার বলতে আমার মেয়ে আর বউ। তাদের কথা মনে পড়তেই আমার চোখে অন্ধকার নেমে এল। কী করি!
“শোন ইয়াসিন”, সে হঠাৎ আবার বলতে শুরু করল, “এটা আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। এই যুদ্ধে তোর নাম যখন একবার বাছাই করা হয়েছে, তখন তোকে যোগ দিতেই হবে আমাদের সঙ্গে। আর কোনও রাস্তা খোলা নেই। দ্যাখ ভেবে কী করবি।”
আংকল, আর আমার ভাববার কিছু ছিল না। শুধু আমার ছোট্ট মেয়েটার মুখখানা যতবার মনে পড়ে যাচ্ছে, ততবারই আমার চোখ ঝাপসা হয়ে উঠছে। আমি নিতান্তই অসহায়ের মতো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে দেখতে লাগলুম দূরে, বরফ-ঢাকা পাহাড়টা। তারপর আমার মুখ ফুটে অস্ফুট স্বরে বেরিয়ে এল, “তুই যা ভাল বুঝিস!”
আংকল, এখন আমি ঘাতক। মানুষের বুকে রাইফেল ছুড়ে প্রাণ নিতে এখন আর আমার হাত কাঁপে না। পঁয়ত্রিশ বছর আগে আপনার দেখা সেই ছোট্ট ইয়াসিন, এখন একটা আস্ত কসাই। সে রাতের অন্ধকারে মানুষ মারে, আর দিনের আলোয় মেয়েকে আদর করে! বাহ্!
এবার চিঠি শেষ করব আংকল। শেষ করার আগে, শেষ গল্পটাই তো এবার শোনাতে হবে আপনাকে। নইলে এত কথা বলা যে সব মিথ্যে হয়ে যায়!
আংকল, শত্রুকে আক্রমণ করার আমাদের কোনও বাঁধাধরা সময় ছিল না। পরিকল্পনা মতো আচমকা আক্রমণ করা হত হয় গভীর রাতে, না হয় ভোর রাতে। বা অন্য কোনও বে-আন্দাজ সময়ে। সেদিন আমাদের লক্ষ্য ছিল যে বাড়িটা, হুকুম ছিল সে-বাড়ির কেউ না প্রাণে বেঁচে থাকে। আমরা ঘাঁটি গেড়েছিলুম একটা পাহাড়ের আড়ালে। গভীর থমথমে রাত। নিঃশব্দে খানিকটা পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছে গেলুম বাড়িটার কাছাকাছি।
প্রথমটা আড়ালে একটু লুকিয়ে থাকতেই হয়। দেখে নিতে হয়, বিপদের কোনও ভয় আছে কি না। যখন নিশ্চিত হওয়া গেল, তেমন ভয় নেই, তখনই আচমকা বাড়িটার ওপর চড়াও হলুম। আমরা ছিলুম দলে তিনজন। তিনজনের হাতেই রাইফেল। তিনজনে একসঙ্গে ধাক্কা দিতেই বাড়িতে ঢোকার দরজাটা ভেঙে হাট হয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে গেল আমাদের গুলিবর্ষণ। বাড়িতে মানুষের টুঁ শব্দ করারও সুযোগ থাকল না। বারুদের গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে গেল।
এবার শুরু হল খোঁজ-তল্লাশ। আমরা হানা দিই এক-একজন এক-একটা ঘরে। কোনও ঘরে আমার ওই দুই সঙ্গী কোনও শত্রুর খোঁজ পেল কি না আমি জানি না। কিন্তু আমি যে-ঘরে ঢুকলুম, সে-ঘরে দেখতে পেলুম সাক্ষাৎ এক শত্রুর!
হয়তো এই শত্ৰুটি এই গভীর রাতে ঘুমে অচেতন ছিল এতক্ষণ। রাইফেলের আওয়াজে তার ঘুম ছুটে গেছে। দেখা গেল, সে এখনও বেঁচে আছে। সুতরাং তাকে নিকেশ করে ফেলার জন্যে রাইফেল উঁচিয়ে আমি গুলি ছুড়তে গেছি, সে হেসে উঠল খিল খিল করে। শুয়ে শুয়েই। সে হাত-পা ছুড়তে লাগল হাসতে হাসতেই। সে উঠতে পারল না বিছানা ছেড়ে। কেন না, সে একটি শিশু। নেহাতই কচি। এখন মা-ই তার সহায়সম্বল। কিন্তু কোথায় তার মা? আমাদের রাইফেলের গুলি নিশ্চয়ই তাঁকে রেহাই দেয়নি।
আমার বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল। কেমন যেন হারিয়ে গেল আমার মনের তেজ। এমন দুর্বল হয়ে পড়লুম, যেন হাত-পা নড়ে না।
অবশ্য, এই অবস্থাটা হল আমার কয়েক মুহূর্তের জন্যে। মনের দুর্বলতা পলকে দূরে ঠেলে আবার তাক করলুম রাইফেলে তার দিকে।
আমার দিকে তাকিয়ে সে আরও জোরে খিল খিল করে উঠল। তার হাসি শুনে আমার চোখের ওপর বিদ্যুতের মতো ঝলসে উঠল আমার নিজের মেয়ের মুখখানা। নিমেষে আমার সমস্ত রবরবা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। মনে হল, কে যেন দূর থেকে প্রতিধ্বনি তুলে চেঁচিয়ে উঠেছে, “এ কী করছিস ইয়াসিন? একটা নিরীহ শিশুকে অমন করে মারছিস? ছিঃ! অমন করে তোর মেয়েকে যদি কেউ মারে? কিংবা তোর মাকে? ইয়াসিন ছুড়ে ফেলে দে তোর রাইফেল। বুকে তুলে নে ওই হতভাগ্য শিশুটিকে। ও আজ মাকে হারিয়েছে। তোরাই ওর মাকে মেরেছিস।”
আংকল, আমি পারলুম না তাকে বুকে তুলে নিতে। মনস্তাপে আমার চোখ উপচে জল গড়িয়ে পড়ল। মনে হল, পৃথিবীতে আমার বেঁচে থাকার আর কোনও অধিকার নেই। আমি আর কিছুই ভাবতে পারলুম না। আমার রাইফেলের নলটা আমারই বুকে তুলে আমি মরতে উদ্যত হলুম।
কী আশ্চর্য, যে-শিশু এতক্ষণ খিলখিল করে হাসছিল, সেই শিশুই এখন আমাকে দেখে ককিয়ে কেঁদে উঠল। আমি চমকে উঠলুম। আমার হাত থেকে পড়ে গেল রাইফেল। আমি ছুটে গেলুম শিশুটির কাছে। তাকে আমার বুকে তুলে নিলুম। অতি দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে এলুম। ভেবেছিলুম, বাইরে বুঝি সঙ্গী দু’জন আমার জন্যে অপেক্ষা করছে। না, তারা নেই। আমাকে ফেলেই তারা পালিয়েছে। ভালই হয়েছে। আমিও তাদের ফেলে পালালুম। শিশুটিকে বুকে নিয়ে পালালুম। আমার নিজের আস্তানায়, সেই হাউসবোটে।
আংকল, শীতের সেই রাতে শিশুটিকে নিয়ে, ছুটতে ছুটতে যখন আমার হাউসবোটে পৌঁছলুম, তখন পুব আকাশে আবছা আলো উঁকি দিচ্ছে। শিশুটি ঘুমে অচেতন। আমি দরজায় টোকা দিতেই আমার বউ ধড়ফড় করে ছুটে এল। দরজা খুলে দিল। আমার বুকের শিশুটিকে দেখে খুব ব্যস্ত হয়ে আলতো স্বরে জিজ্ঞেস করল, “এ কে?”
আমি হাঁপাতে হাঁপাতে বললুম, “তোমার আর এক সন্তান।”
“কোত্থেকে আনলে?” সে ভীষণ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
“পরে বলব। এখন কোলে নাও!”
আংকল, সে এখন আমাদের কাছে। আমার মেয়ের সঙ্গে সেও বড় হচ্ছে। আমাদের আপন হয়ে। নিজের মাকে হারিয়ে সে নতুন মাকে খুঁজে পেয়েছে।
আংকল, আমার সেই ভাইটি মিলিটারির গুলিতে একটা পা খুইয়ে এখন বিছানায়। আমি আর ও-মুখো হইনি। তবু ভয় পাই, সে ভাল হয়ে উঠলে আবার যদি আমার পিছু নেয়! আবার যদি আমাকে রাইফেল নিতে বলে!
হ্যাঁ, আংকল, এবার যদি সত্যিই রাইফেল হাতে নিতে হয়, তবে আমার রাইফেলের প্রথম গুলির নিশান হবে আমার ভাই। হ্যাঁ, আমার ভাই। আংকল আশীর্বাদ করুন আমাকে, যেন তা করতে না হয়। আমি যেন শান্তিতে থাকতে পারি আমার ছেলেমেয়ে আর তাদের মাকে নিয়ে। শান্তি তো মানুষকে মহৎ হওয়ার চিন্তা যোগায়।
এবার চিঠি শেষ করি। আমার সালাম নেবেন আংকল। ভাল থাকবেন।
আপনার ইয়াসিন
ইয়াসিনের চিঠিটা পড়ে সেই রাতে আমার ঘুম আসেনি। তার মুখখানা বারবার চোখে ভেসে উঠছিল। মন বলছিল, হায় রে পৃথিবীতে যদি এমন হাজারে হাজারে ইয়াসিন থাকত, অমনই বুকভরা ভালবাসায় গড়া মানুষ, তবে বলো, পৃথিবীটা কত সুন্দর হত!

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন