শৈলেন ঘোষ

ওই সেই ছেলেটা। ছেলেটার নাম জানত না কেউ। সবার যেমন একটা করে সুন্দর নাম থাকে, তেমন কোনও নাম ছিল কি না, কেউ জানে না তা। হয়তো ছিল। কিন্তু সে-নাম সে বলেনি কাউকে কোনওদিন। হয়তো সেই সুন্দর নামটা তার নিজেরই জানা ছিল না। দোষ দেওয়া যায় না তাকে। কেননা, দশ বছর ধরে সে নিজেকে ছাড়া নিজের আর কাউকে চেনে না। দশ বছর এই পৃথিবীতে সে একা একা বড় হয়েছে। কে যে তাকে বলেছিল ওই আকাশটার নাম ‘আকাশ’, মনে করতে পারে না সে। কে শিখিয়েছিল চাঁদের আলোর নাম ‘জ্যোৎস্না’, তাও মনে নেই তার। শুধু মনে আছে, অনেক, অ-নে-ক দিন আগে এই জ্যোৎস্নার আলোয় কে যেন তার চোখের পাতায় ঘুমের স্বপ্ন ছড়িয়ে দিয়ে গান গেয়েছিল। সে বুঝি তার মা! কে জানে!
তারপর সে বড় হয়েছে একটু একটু করে। কোনওদিন কেউ তাকে দুটো খেতে দিয়েছে, কেউ তাকে একটা-দুটো রাত থাকতে দিয়েছে। হঠাৎ একদিন তার মনে হল, পরের দয়ায় বাঁচাটা বাঁচা নয়। সেদিন থেকে সে নিজের কথা নিজে ভাবতে শিখল। ভাবতে শিখল, সবাই কাজ করে, সে-ও করবে। সবার মতো সে-ও ঝলমলে পোশাক পরবে। পায়ে জুতো দেবে। আর খিদে পেলে পেট ভরে খাবে। ঠিক বটে, এখন তার সাজ-পোশাকের ছিরি দেখলে তোমারও গা রি-রি করবে। কামিজটা ছেঁড়া, পাতলুনটা ঢলঢলে। ময়লা চিরকুট। নিজেও তেমনই। পায়ে জুতো নেই! ধুলো-কাদার পলস্তারা পড়ে পড়ে পাদুটোর কেমন ছাঁদ, বোঝাই যায় না। মাথায় এককাঁড়ি চুল। উশকো-খুশকো। তার ওপর যদি গায়ের জামাটি তুলে দ্যাখো, দেখবে, বুকের পাঁজরগুলি জিরজির করছে ফিনফিনে চামড়ার নীচে। অথচ মুখখানি কী মিষ্টি। দেখলেই মনে হয়, কাছে ডেকে দুটো কথা বলি। মনটিও তার ভারী দরদ মাখানো। গাছে ফুল দেখলে সে চোখ মেলে চেয়ে থাকে। ভাবে, থাক, থাক, ওই ফুল গাছেই থাক। গাছ তো ফুলের মা। খাঁচায় পাখি দেখলে, মন বলে, উড়িয়ে দিই! হয়তো নিজেরও উড়তে ইচ্ছে করে আকাশে, ওই মেঘের মতন।
একদিন একটা কাণ্ড হল। তখন বোধহয় শিউলি ফোটার শরৎকাল! আকাশ নীল। বাতাসে বাদল শেষের দোলা লেগেছে। সেই বাতাসে দুলতে দুলতে নীল আকাশে মেঘ উড়ে যায়। চোখ পড়ে যায় ছেলেটার। আকাশের সেই মেঘ দেখে সে ছুটে চলে মাটিতে মেঘের সঙ্গে! লাফায়। খুশিতে চেঁচায়:
সাদা মেঘ ঝলমল
কোথা যাস উড়ে,
কোন সে অচিন-দেশে
কোথা কদ্দূরে?
ছুটতে ছুটতে হঠাৎ থমকে যায় ছেলেটা! কেন? কী হল?
তার সামনে কী যেন পড়ল! ঝপাং! চোখের দৃষ্টি যেন আবছিয়ে ওঠে। একটা আহত বক। ডানা ঝাপটাচ্ছে! পলকে সে ছুটে গেল। রক্ত! দু’ হাত বাড়িয়ে তুলে নিল। কে মারল তাকে এমন করে! ব্যস্ত চোখে সে এদিক ওদিক দেখে। এক্ষুনি একটু জল চাই তার। পাখির মুখে দেবে। কিন্তু এখানে কোথাও সে জল দেখতে পেল না। দেখতে পেল, একজন মানুষকে। তার হাতে তির-ধনুক। সে বলল, “পাখিটা আমার। আমি শিকার করেছি। দে!”
ছেলেটা কোনও উত্তর দিল না। ওই শিকারির হাতের ফাঁক গলে সে ছুটল। থতমত খেয়ে গেল সেই শিকারি লোকটা। ঝটপট নিজেকে সামলে নিয়ে সে কড়কে উঠল, “এই বিটলে শয়তান, দে, নইলে তোকেও তির মারব।”
ছেলেটা দাঁড়াল না। ছুটতে ছুটতে চেঁচিয়ে উঠল, “দেব না-না-না।”
শিকারিও তার পিছু নিল। কিন্তু ধরতে আর হচ্ছে না। ততক্ষণে ছেলেটা পগার পার।
অনেকটা ছুটে হঠাৎ চমকে থামে ছেলেটা। সামনে উঁচু ওটা কী! পথ আগলে দাঁড়িয়ে আছে!
একটা পাঁচিল। উঁচু। তার চেয়েও অনেক উঁচু। পাখিটা হাঁফাচ্ছে, ছেলেটা অস্থির পায়ে একটু জলের জন্যে ছটফট করছে। হাত দেয় পাঁচিলের গায়ে। একচিলতেও ফাঁক নেই কোথাও। তা হলে কোনখান দিয়ে যাবে সে পাঁচিলের ওপারে! কোথায় পাবে সে একটু জল!
না, আর দরকার হল না। কেননা, পাখির বুকের প্রাণটি নিথর হয়ে গেল এইমাত্তর। সে তাকিয়ে থাকে মৃত পাখিটার মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে। দেখতেও পায় না, কে দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে, একটু দূরে। না, এ তো সেই শিকারি নয়। তবে?
লোকটা আচম্বিতে কথা বলল, “ওই বকটা আমার।” তার গলার স্বর ভয়ংকর।
ছেলেটা উত্তর দিতে পারল না। কী বিদঘুটে তার মুখখানা। কী ভয়াবহ চোখের দৃষ্টি! হিংস্র!
সে আবার গর্জে উঠল,“আমার পাখিটাকে তুই মেরেছিস কেন?”
ছেলেটার মুখে কথা নেই। শুধু দেখে। একদৃষ্টে।
লোকটা এগিয়ে আসে। আবার চিৎকার করে হেঁকে ওঠে। “আমার পাখিকে তুই মেরেছিস কেন?”
এবার সে কথা বলে, “না, আমি মারিনি।”
লোকটা রাগে জ্বলে ওঠে, “তোর হাতে পাখি, মারতে যাবে কে?”
ছেলেটা বলল, “যে মেরেছে তাকে আমি দেখেছি। তার হাতে তির-ধনুক।”
লোকটা তবু গোঁ ছাড়ল না। বলল, “আমি কোনও কথা শুনতে চাই না। তোকে ছাড়া আমি কাউকে জানি না। অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে তুই বাঁচতে চাস! তুই যে মিথ্যে বলছিস না তার কী প্রমাণ?”
“কী প্রমাণ চাও তুমি?”
“যে মেরেছে তাকে আমার সামনে হাজির করতে পারবি?”
“সে আমার চেয়ে অনেক বড়। আমার কথা শুনবে কেন?”
“সেসব আমি জানি না। তাকে আনতে না পারলে আমি জানব, তুই-ই আমার পাখি মেরেছিস। তখন পার নেই তোর। হ্যাঁ, পার পেতে পারিস এক শর্তে। যদি আমার জীবন্ত বক তুই আমাকে ফিরিয়ে দিস।”
ছেলেটা উত্তর দিল, “যা হয় না, তা আমি কেমন করে পারব? মরে গেলে কেউ বাঁচে নাকি আর?”
লোকটা বলল, “অত কথা আমার শোনার দরকার নেই। এই তোর বাঁচার শর্ত।” বলতে বলতে লোকটা একটা ধমক মারল। তারপর আবার বলল, “কাল এই সময়ে এইখানেই আমি আবার আসব। দেখতে চাই, হয় আমার জীবন্ত বক, না হয় সেই শিকারি।” বলতে বলতে লোকটা চোখ রাঙিয়ে চলে গেল।
আর সেই ছেলেটা মরা বকটার দিকে হাঁদার মতো তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মনে মনে ভাবতে লাগল, কী দুঃসাধ্য কাজ। কী করবে এখন সে? কোথায় যাবে? কাকে তার দুঃখের কথা বলবে?
“হি-হি-হি!” এমন সময় হঠাৎ কে যেন হেসে উঠল।
চমকে ওঠে ছেলেটা। চকিতে চোখ তুলে দেখে একটি মেয়ে। তার চেয়েও বড়।
মেয়েটি হাসতে হাসতেই বলল, “খুব বিপদে পড়েছ, তাই না?”
ছেলেটা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল তার মুখের দিকে। ভাবতে লাগল, তার বিপদের কথা মেয়েটি জানল কী করে!
মেয়েটি এবার তার কাছে এগিয়ে এল। ছেলেটার হাতের ওই মরা বকটার দিকে একঝলক দেখে নিয়ে বলল, “তুমি যে বকটাকে মারোনি, তা আমি জানি।”
এই একটি কথা শুনেই ছেলেটার কেমন যেন ভয় ভেঙে গেল। সে হয়তো কিছু বলতেই যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই মেয়েটি বলল, “লোকটা কিন্তু ভাল নয়। দেখলে না, মুখ-চোখের কী চেহারা! ও কিন্তু তোমাকে ছেড়ে দেবে না।”
এবার ছেলেটা মুখ খুলল। জিজ্ঞেস করল, “তা হলে আমি কী করি বলো তো?”
মেয়েটি বলল, “তোমাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করার চেষ্টা আমি করতে পারি, কিন্তু তোমাকে আমার সঙ্গে যেতে হবে।”
“কোথায়?”
“এই পাঁচিলের ওপারে।”
এই কথা শুনেই ছেলেটা চনমন করে উঠল। ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল, “ওপারে যাবার রাস্তা কোনদিকে তুমি জানো নাকি?”
“জানি।”
“সত্যি?” আনন্দে উছলে উঠল ছেলেটা। বলল, “ওপারে গেলে ওই লোকটার হাত থেকে নিশ্চয়ই বাঁচব, তাই না?”
মেয়েটি বলল, “যদি যেতে চাও, আর দেরি কোরো না। চলো। কথা বাড়ালে, ওদিকে বেলা বাড়বে।”
ছেলেটা আর কথা বাড়াল না। মরা বকটা হাতে নিয়ে তার সঙ্গে হাঁটতে শুরু করল। হাঁটতে হাঁটতে পাঁচিলের গা ঘেঁষে অনেকটা পথ তারা পেরিয়ে এল। যেখানে এসে দাঁড়াল, সেখানটা ভারী নির্জন। গাছ-গাছালির পাতায় শুধু বাতাসের শব্দ! মেয়েটি গলা নামিয়ে ফিসফিস করে বলল, “কথা বোলো না। এসো।”
মেয়েটি গাছ-গাছালি ডিঙিয়ে অনেকটা ভেতরে এসে দাঁড়াল।
ছেলেটাও দাঁড়াল।
মেয়েটি ইশারা করল তাকে। তারপর একটা মস্ত গাছের গুঁড়ির নীচে হাঁটু গেড়ে বসল। চোখ বুজল। হাতদুটো আকাশে তুলে চেঁচিয়ে উঠল:
স্কন্ধকাটা ভূতের পুত
ঘুম ভেঙেছে কি?
এই দ্যাখো না, বাইরে তোমার
দাঁড়িয়ে আছে ঝি!
দোর খুলে দাও, সঙ্গে দ্যাখো
কাকে এনেছি!
বলতে-না-বলতেই হঠাৎ দেখা গেল, গাছের গুঁড়ির মধ্যে একটা মস্ত গর্তের ডালা খুলে গেল। ভেতরে একটা গহ্বর। অন্ধকার। খাঁ-খাঁ করছে।
মেয়েটি বললে, “এসো।” হাত বাড়াল।
ছেলেটা তার হাত ধরল, হাত ধরে সেই মস্ত গর্তের গহ্বরে নেমে গেল। যেই নামল, অমনই ডালা বন্ধ হয়ে গেল!
ওমা! এতক্ষণ যে-গহ্বর মনে হচ্ছিল অন্ধকার, ডালা বন্ধ হতেই সঙ্গে সঙ্গে সেই গহ্বরে আলো ফুটে উঠেছে। মেয়েটি এবার আর ফিসফিস করে কথা বলল না। বেশ জোরেই জিজ্ঞেস করল, “কী দেখছ?”

ছেলেটা উত্তর দিল, “সব দেখছি। ঘর-বাড়ি, গাছ-গাছালি, রাস্তা-সড়ক, কুসুম-কানন। কিন্তু কোনও প্রাণী দেখছি না। জনমানুষ কই?”
মেয়েটি হাসল। বলল, “আছে। চলো আমার সঙ্গে।”
ছেলেটি আবার হাঁটতে লাগল মেয়েটির সঙ্গে। হাঁটতে লাগল আর এদিক ওদিক দেখতে লাগল। সত্যি, কোথাও একটি প্রাণীও দেখতে পেল না সে। চারদিক সুনসান। থমথমে।
দেখতে দেখতে একটা মন্দিরের সামনে এসে দাঁড়াল মেয়েটি। মন্দিরের মাথায় একটা মস্ত উঁচু ধ্বজা-চুড়ো। আর মন্দিরে ঢুকতেই একটা এই এত্তবড় ঘণ্টা। সোনার। দেখলেই চোখে ধাঁধা লেগে যায়। আরও আশ্চর্য, মন্দিরে সোনার বেদি আছে অথচ, তাতে কোনও দেবও নেই, দেবীও নেই। ছেলেটা জিজ্ঞেস করল, “ঠাকুর কই?”
মেয়েটি তার মুখের দিকে তাকিয়ে হাসল। সে কথার কোনও উত্তর না দিয়ে জিজ্ঞেস করল, “ওই সোনার ঘণ্টাটা বাজাতে পারবে?”
ছেলেটা দেখল ঘাড় হেলিয়ে। তারপর বলল, “ঘণ্টাটা কী পেল্লাই!”
মেয়েটি বলল, “দ্যাখো না বাজাতে পারো কি না।”
“দেখি চেষ্টা করে।”
বলে ছেলেটা এগিয়ে গেল।
মেয়েটি বলল, “তোমার হাতের ওই মরা বকটা আমায় দাও।”
ছেলেটা উত্তর দিল, “না, না, আমার কোনও অসুবিধে হচ্ছে না।” বলে, ছেলেটা হাত বাড়াল। সোনার ঘণ্টার সঙ্গে বাঁধা সোনার শিকলটি ধরল। দ্যাখো, দ্যাখো, একটানেই ওই ঢাপ্পুস ঘণ্টা কেমন বেজে উঠল, ঢং-ঢং-ঢং। উঃ! কী ভীষণ শব্দ! কেঁপে ওঠে চারদিক। কান ফেটে যায়!
ওমা! হঠাৎ এ কী হল! ছেলেটার হাতের ওই মরা বকটা যে ফুড়ুত করে উড়ে পালাল। আরে এ কী! এ কী! তার ডানাদুটো যে সোনা হয়ে গেছে!
ছেলেটা চেঁচিয়ে উঠল, “বকটা যে বেঁচে সোনা হয়ে গেছে! এ কী আজব কাণ্ড! ও যে আকাশে উড়ে পালাল!”
মেয়েটি বলল, “যাবেই তো। আকাশে যে ওর খেলার বন্ধু আছে।”
ছেলেটা ঘণ্টার শিকল ছেড়ে দিয়ে বলল, “আমি পাখির খেলা দেখব।”
“এসো” বলে, মেয়েটি তাকে টানতে টানতে মন্দিরের চুড়োর ওপর নিয়ে গেল।
চুড়োর ওপর উঠে ছেলেটা অবাক। সে চেঁচিয়ে উঠল, “এ কী!”
“কেন, কী হল?” মেয়েটি জিজ্ঞেস করল।
“এত মানুষজন কোত্থেকে এল?”
মেয়েটি বলল, “এ মানুষেরা ঘুমিয়ে পড়েছিল। তুমি ঘণ্টা বাজাতেই ওদের ঘুম ভেঙে গেছে।”
“তাই বুঝি!” উত্তর দিল ছেলেটা।
মেয়েটি জিজ্ঞেস করল, “তোমার সেই সোনার বকটাকে দেখতে পাচ্ছ না?”
“কই, না। আমি সেই উঁচু পাঁচিলটা দেখতে পাচ্ছি।”
“পাঁচিলের ওপাশে কিছু দেখতে পাচ্ছ না?”
যেন চমকে উঠল ছেলেটা। চিৎকার করে উঠল, “উরি বাবা, সেই শিকারিটা। তার হাতে তির-ধনুক। ওই তো আমার সেই সোনার বক আকাশে উড়ছে। শিকারিটা তির-ধনুক নিয়ে তাকে মারবার জন্যে তাক কষছে। ওই তো তির ছুড়ল। হ্যাঁ, হ্যাঁ, লেগেছে। বকটা আকাশ থেকে মাটিতে পড়ছে। কী হবে?” বলতে বলতে উত্তেজনায় ছেলেটা যেন হাঁফাচ্ছে।
মেয়েটি শান্তস্বরে বলল, “এখানে চুপটি করে বসে এবার দ্যাখো কী হয়।”
বলতে না-বলতেই সেই সোনার বক মাটিতে ছিটকে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গেল শিকারি, সে তার তির-ধনুক ছুড়ে ফেলে দিল। বকটা হাতে নিয়েই চেঁচিয়ে উঠল, “সোনা-আ-আ। আমার।”
“তোর না, আমার।”
এই রে! সেই ভয়ংকর চেহারার লোকটা! কোত্থেকে এল হঠাৎ! সে হুংকার দিল, “আমার বকটাকে তুই মেরেছিস।”
শিকারি একটু পিছু হটে উত্তর দিল, “এটা সোনার বক, তোমার নয়, আমার।” বলে শিকারি ছুট দিল।
সেই ভয়ংকর চেহারার লোকটা ছেড়ে দেবার বান্দা নয়। সেও তাকে তাড়া করল। একটু ছুটেই ধরে ফেলল। লাফিয়ে পড়ল তার ঘাড়ে। তারপর দু’জনের লেগে গেল তুলকালাম লড়াই। শিকারির হাত থেকে ছিটকে গেল সোনার বকটা। কে সেটা নেবে, তাই নিয়ে হাড্ডাহাড্ডি মারামারি।
তুমুল মারামারি হল দুটো লোভী হিংস্র মানুষের মধ্যে। দুটো মানুষই লড়াই করতে করতে নিস্তেজ হয়ে লুটিয়ে পড়ল মাটিতে। হাঁফাতে লাগল। তাদের লড়াই দেখতে যেসব মানুষ এতক্ষণ এদিকের ফাঁক, ওদিকের ফোকর থেকে উঁকি মারছিল, এবার তারা বেরিয়ে এল। দুটো মানুষকে আধমরা দেখে তারা এগিয়ে এল সেই সোনার বকটার দিকে। লোভে ধকধক করে কাঁপছে তাদের বুকের ভেতরটা। সোনার রোশনাই তাদের চোখের ওপর জ্বলজ্বল করছে। একজন আর সামলাতে পারল না, ছুটে গেল। হাত বাড়িয়ে যেই না বকটা ধরতে গেল, অমনই ফুড়ুত। সোনার বক আবার আকাশে ডানা মেলে উড়ে গেল।
এতক্ষণ যে-মানুষগুলোর মুখে রা ছিল না ভয়ে, সেই মানুষগুলোই পাগলের মতো চেঁচিয়ে উঠল এখন। “পালাল, পালাল” বলে আকাশে হাত ছুড়ে পাখিকে ধাওয়া করল। হায় রে! যদি সেই মানুষগুলোর ডানা থাকত! তবে, হয়তো, সোনা নিয়ে মানুষে মানুষে আকাশেই তুলকালাম শুরু হয়ে যেত। কিন্তু না, তেমন কিছুই হল না। হঠাৎ যেন থমকে গেল মানুষগুলো। কেননা, পাখি যে উড়তে উড়তে ওই মস্ত পাঁচিলের ওপারে চলে যায়! পাঁচিল-ঘেরা ওপারে যে কী আছে, কেউ জানে না। কিন্তু ওই সোনার বক দেখেই সবার যেন টনক নড়ল। ভাবল, তবে কি পাঁচিলের ওপারে সোনার দেশ! আর কি থাকতে পারে? তারা খুঁজতে লাগল পথ। নীচে মানুষ চিৎকার করে পথ খুঁজছে, আর পাঁচিলের ওপারে, আকাশের পাখি সোনার ডানায় ঢেউ তুলে উড়ে বেড়াচ্ছে।
না, পেল না তারা কোনও পথ। পথ না-পেয়ে সেই মানুষের দঙ্গল ঝাঁপিয়ে পড়ল পাঁচিলের ওপর। আজ তারা ভেঙেই ফেলবে পাঁচিল! কিন্তু পাথর-গাঁথা সেই পাঁচিল নড়ে না, সরেও না। অথচ পাঁচিলের ওপর ধস্তাধস্তি করতে করতে সেই মানুষের দঙ্গল ক্লান্ত হয়ে ঝিমিয়ে পড়ল ধীরে ধীরে। তারা আর পারল না। পাঁচিলের গায়ে গায়ে কেউ বা ছিটকে পড়ল, কেউ কেউ হুমড়ি খেল। তারা হাঁফাতে লাগল। তারপর তারাও নিস্তেজ হয়ে হাঁসফাঁস করতে লাগল। তারা জানতেও পারল না, পাঁচিলের ওপারে আছে এক শূন্য মন্দির। আছে শুধু একটি সোনার ঘণ্টা। সেই শূন্য মন্দিরে একটি ছেলের গলা জড়িয়ে সেই সোনার বক গান গাইছে:
যার মনে দয়া আছে, ভালবাসা, মায়া,
তার সাথে ঘোরে ফেরে দেবতার ছায়া।
আর ছেলেটি সেই সোনার ঘণ্টায় সোনার শিকল ধরে টানছে। ঘণ্টা বাজছে গানের তালে ঢং ঢং।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন