শৈলেন ঘোষ

একটা ছিল চড়াই। তার বাসা ছিল খোকনদের বাড়ির বাইরের ঘরে। একটা ঘুলঘুলির ভেতর। খুব সকালে সেদিন চড়াইটার ঘুম ভেঙে গেছিল। ঘুম থেকে উঠেই সে শুরু করে দিল নাচন-কোঁদন ঘরের ভেতর। জুড়ে দিল গান। কিচির-মিচির। এ তো তার নিত্যদিনের কাজ। একটু পরেই ফুড়ুত। উড়ে যাবে ঘর ছেড়ে বাইরে। তারপরেই এটা-ওটা পোকা খোঁটা। খিদে মেটা।
কিন্তু না, সেদিন তার বাইরে যাওয়া হল না।
কেন?
হয়েছে কী, আগের দিন খোকনের ছোটকাকু একটা এত্তো বড় ছবি কিনে এনেছে। এনে, দেওয়ালে টাঙিয়ে রেখেছে। সেটা যে কীসের ছবি সেটি আর চড়াই জানবে কেমন করে! আমরাও এখন জানি না। সেটা বাঁদর, না বনমানুষ। বনমানুষ, না ভালুক। তো, চড়াইটা যেমন নাচছিল, তেমনই নাচছে। যেমন গাইছিল, তেমনই গাইছে। গাইতে গাইতে আর নাচতে নাচতে একবার ফুড়ুত, দরজার ফাঁকে। একবার উড়ুত, জানলার গরাদে। না-হয় বইয়ের র্যাকে। নয়তো জামা ঝোলানো আলনায়। এমন সময় হঠাৎ—কী হল?
চড়াইটার চোখ পড়ে গেল ছবিটার ওপর।
ওমা! কী ওটা? ছবি-সাঁটা?
ফুড়ুত। অমনি সে উড়ে গেল। গিয়ে বসল, ছবিটার নতুন নতুন ফ্রেমে। যেই না বসা, অমনি দুলে উঠল ফ্রেমটা! বেড়ে মজা তো! মজা বলেই সে ফ্রেমের ওপর বসে দোল খেতে লাগল। আর মনে মনে ভাবতে লাগল, বা রে! দোলনটা তো ভারী মজার! তাই সে দুলতে দুলতে গান গেয়ে উঠল আনন্দে!
দোল, দোল, দোল খাই
আগু যাই, পিছু যাই,
গান গাই কিচি মিচি,
মজা বটে মাছি পিছি।
গাইতে গাইতে হঠাৎ থমকে গেল চড়াইটা। চোখ তার ধাঁধিয়ে গেল।

কেন? কেন?
ফ্রেমের মধ্যে ওটা কী রে হোঁতকা মতো! হাই তুলছে! মুখখানা কী বিচ্ছিরি! হাঁ-মুখে ছিঃ গন্ধ! ভাল করে ঠাওর করার জন্যে চড়াইটা যেই না মাথা হেঁট করেছে, অমনি সেটা সটান চার পা তুলে মারলে একটা ডিগবাজি! ওপরবাগে ঠ্যাং, নীচের বাগে মুন্ডু! ধরে আছে একটা গাছের কাণ্ড। ধরে দুলতে লাগল।
আরও ভাল করে দেখার জন্যে চড়াইটা যেই আরও একটু হেঁট হয়েছে, অমনি ফ্রেমের ভেতর সেটা, মানে সেই আজব-আজব হোঁতকাটা গাঁক-গাঁক করে চেঁচিয়ে উঠল:
চড়াই না তো চচ্চড়ি
নেই কো প্রাণে ডর ডরি!
মারব পেটে এক ঘুসো,
গুঁড়িয়ে হবি কয়লা ভুসো!
বলেই সেটা বিচ্ছিরি সুরে হেসে উঠল। হেসেই কষিয়ে দিল ঘুসো! আর সঙ্গে সঙ্গে হল কী, ছবির কাচ, কাচের ফ্রেম ভেঙে-ভুঙে ঝনঝন ঝনাৎকার! দেওয়ালে ঝোলানো দড়ি ছিঁড়ে ফড়াৎ! মাটিতে গড়াত!
তাই না দেখে, চড়াই দে লম্বা! এক্কেবারে বাইরে, শূন্য আকাশের নীলচে আলোয়! আর ঢোকে বাইরের ঘরে কোনও দিন! মাথা খারাপ!
আর-কোনও দিন সে বাইরের ঘরে ঢুকল না বলে, জানতেই পারল না, তারপর কী হল। জানতে পারল না, সেটা বাঁদর, না বনমানুষ। বনমানুষ, না ভালুক।
বলা যায় না, সেটা একটা গাবদা-গাবুস ভালুকও হতে পারে! ছিঃ! ভালুকের মুখে এমন বিচ্ছিরি গন্ধ হয়। ইস! কী ঘেন্না!

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন