শৈলেন ঘোষ

নৌকোটা একদম ছোট্ট। আসলে ছোট্ট একটা ডিঙি। দড়ি দিয়ে বাঁধা, একটা গাছের গোড়ায়। ডিঙি এখন শুধু দোলে নদীর জলে। ভেসে যায় না এপার-ওপার। করতে পারে না এদিক-ওদিক। কেননা, সে এখন বন্দি।
নদীর এই দিকে, এই তীরে অনেক গাছপালা। তারই ফাঁকে ডিঙিটা বন্দি হয়ে আছে। কতকাল বন্দি হয়ে আছে কেউ জানে না। জানার কথাও নয়। কেননা, সেদিকে কারও নজরই পড়ে না। কে জানে ডিঙিটা কার! রোদে-জলে পড়ে পড়ে দ্যাখো না কী দশা হয়েছে। কোনদিন না টুপ করে ডুবে যায়। ডুবে গেলে কেউ জানতেও পারবে না। জানলেই বা কী! জানলে হয়তো শুধুই বলবে “যাঃ! ডিঙিটা ডুবে গেল।” কেউ তো আর তার জন্যে কাঁদবে না।
কিন্তু কাঁদে। ওই বন্দি ডিঙিটা নিজেই কাঁদে। এখন সে একা, বড্ডই একা। কিন্তু যেদিন প্রথম সে নদীতে ভেসেছিল, সেদিন কত লোক। কত আনন্দ। সেদিন সে হেসেছিল মনে মনে। আজ যেমন কেউ তার কান্না দেখতে পায় না, তেমনই, সেদিন কেউ তার হাসিও শুনতে পায়নি। কেউ হয়তো বলতেই পারে ডিঙি কি হাসতে পারে? না, কাঁদে? ডিঙি তো শুধু জলেই ভাসে।
কে উত্তর দেবে সে-কথার? সত্যিই তো, তুমিও যখন দুঃখ পাও, একলাটি লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদো, তখনও তো কেউ জানতে পারে না। তেমনই ধরো, গাছের গায়ে কুড়ুল দিয়ে আঘাত করলে, গাছও হয়তো কাঁদে, আমরা বুঝতে পারি না। এ তো হামেশাই হচ্ছে।
হ্যাঁ, একা-একা পড়ে আছে ডিঙিটা সবার চোখের আড়ালে, কেউ তার আপনজন নেই। ভাবলে কষ্ট হয়। মনে হয়, হায় রে, ওর যদি কেউ বন্ধু থাকত।
একদিন তো ওর সত্যিই বন্ধু ছিল। তাকে বন্ধুও বলতে পারো, আবার বলতে পারো মনিবও। সে এক বুড়ো মাঝি। ডিঙিটা যেমন ছোট্ট, তেমনই সেই বুড়ো মাঝি। ডিঙিতে হালকা-হালকা লটবহর নিয়ে হাটের ঘাটে পৌঁছে দিত। যেদিন-যেদিন পাঁচটা-ছ’টা ছাগল যেত চড়ে এপার থেকে ওপারে, সেদিন কী ভালই না লাগত ডিঙিটার। মনে হত, অনেকক্ষণ থাকুক ছাগলগুলো তার কোলের ভেতর। অনেকক্ষণ তারা ডাকুক “ব্যা-ব্যা” করে। আর ডিঙি হাসুক মনে মনে।
না, এখন আর সেসব হয় না। এখন সে বন্দি। এখন সে শুধু জলে ঠায় দাঁড়িয়ে দোল খায় আকাশের দিকে তাকিয়ে। আর ভাবে, বুড়ো মাঝি আর আসে না কেন?
না, সে জানে না, বুড়ো মাঝি আর আসবে না। কোনওদিনই না। কেননা, এখন ছোট ডিঙি সারা দিন, সারারাত যে-আকাশটা দেখে, বুড়ো মাঝির প্রাণও যে এখন হাওয়ার মতো ওই আকাশেই ঘুরছে! সব্বার প্রাণ ওই আকাশেই চলে যায় তার কাজ ফুরোলে। আর ফেরে না!
তাই যদি সত্যি হয়, তবে ডিঙিরও তো কাজ শেষ হয়ে গেছে সেদিন থেকে! তবে, সে কেন এখনও ভাসছে। কাজ শেষ হলেও তার বুঝি দিন শেষ হয়নি এখনও? তাই বুঝি সে বন্দি হয়ে আছে?
এমনই সময়ে, হঠাৎ একদিন এক অদ্ভুত কাণ্ড ঘটে গেল। কোত্থেকে এসে একটা কাঠবিড়ালি ডিঙি-বাঁধা দড়িটার ওপর লম্ফঝম্ফ শুরু করে দিলে। ওইটুকু একটা কাঠবিড়ালির চাপে দড়ির ওপর কতটুকুই বা টান পড়ে। কিন্তু হঠাৎ যেন কে চেঁচিয়ে উঠল, “এই কাঠবিড়ালি, আমার দড়ির ওপর অমন করে লাফাচ্ছিস ক্যানরে, আমার লাগছে।”
কাঠবিড়ালি চমকে উঠেছে। চমকে উঠেই, দড়ি ছেড়ে তরতর করে দে ছুট! ছুটেই মেরেছে লাফ। একেবারে দড়িবাঁধা গাছের ওপর। ঝটপট একগোছা পাতার আড়ালে লুকিয়ে পড়ল। তারপর চুপি দিয়ে দেখতে লাগল।
তাই তো! কাউকেই তো সে দেখতে পাচ্ছে না! তা হলে কে অমন ধমক দিয়ে কথা কইল?
ধমক দিয়ে কথা কইল যে ডিঙিটা, সে তো আর কাঠবিড়ালি ঠাওর করতে পারেনি। ধমক শুনেই সে চোঁচা ছুট দিয়েছে আগু-পিছু কিছু না দেখেই। আর বলব কী, তাকে অমন করে ছুটতে দেখে, এত দুঃখেও ডিঙিটা খিলখিল করে হেসে উঠেছে। হাসতে হাসতে বলে উঠল, “কী ঘেন্না! কী ঘেন্না! একটা বন্দি ডিঙির কথা শুনেই তুই ভয়ে পালালি? কী বাহাদুর কাঠবিড়ালিরে তুই! তবে যে শুনি, তোদের বাহাদুরিতে তুষ্ট হয়ে রামচন্দ্র আদর করে তোদের পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়েছিলেন। তোদের পিঠের ওপর ওই যে কালো দাগ, সবাই বলে ওই দাগ নাকি রামচন্দ্রের হাতের আঙুলের ছাপ! তোর পালানোর বহর দেখে তো মনে হচ্ছে, রামচন্দ্রের গল্পটা একদম সত্যি নয়! সেটা গপ্পোই!”
এ্যাই! এবার বুঝতে পেরেছে কাঠবিড়ালি গলাটি কার! এটি যে ওই দড়ি-বাঁধা ডিঙির কণ্ঠস্বর, সে আর কে না বুঝতে পারে! এবার বেশ সাহসে ল্যাজ ফুলিয়ে সে বেরিয়ে এল পাতার আড়াল থেকে। রামচন্দ্রের কথাটা যে একদম সত্যি নয়, সেটা গল্প, একথা শুনলে কোন কাঠবিড়ালি না রেগে যায়! সে রেগে তড়বড় করে গাছের ওপর থেকে নীচে নেমে এল। তার ফিনফিনে গলার স্বরটা রাগে ঘিনঘিন করে বলে উঠল, “তুই রামচন্দ্রের কথা তুলে তাঁকে অপমান করছিস কেন রে! জানিস, তিনি ইচ্ছে করলে পেট ফুটো করে তোর জন্মের মতো কম্ম সারা করে দিতে পারেন। ভগবানকে নিয়ে ঠাট্টা!” বলে কাঠবিড়ালি ডিঙিটাকে মুখ ঝামটা দিল।
ডিঙি কিন্তু কাঠবিড়ালির রাগারাগি দেখে আর কথা কাটাকাটি করল না। নরম গলায় বলল, “দুর বোকা, আমি ভগবানকে নিয়ে ঠাট্টা করতে যাব কোন দুঃখে। ভয়ে ছুটে পালাতে দেখে আমি তোকেই অত কথা বলেছি। রাগ করিস না আয়, দড়ি বেয়ে আমার কাছে আয়, দু’জনে গল্প করি। তোকে দেখে আমার হিংসে হচ্ছে। তুই কেমন নিজের মনে খেলে ছুটে বেড়াচ্ছিস। যেখানে মন চায় চলে যাচ্ছিস। তুই কেমন স্বাধীন। আর এই দ্যাখ, আমি কেমন বন্দি। কিছু করারও উপায় নেই, কোথাও যাবারও জো নেই। কারও সঙ্গে দুটো কথা বলব, তেমনও কাউকে দেখি না।”
এবার ডিঙির কথা শুনে কাঠবিড়ালির মন কেমন যেন দুঃখ-দুঃখ পেতে লাগল। সেও আর রামচন্দ্রের কথা তুলে কথা বাড়াল না। তবে সঙ্গে সঙ্গে তার কাছেও গেল না। দূর থেকেই জিজ্ঞেস করল, “কে তোমাকে বন্দি করেছে অমন করে?”
কাঠবিড়ালির কথা শুনে ডিঙি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর বলল, “বন্দি করেছে আমার বুড়ো মনিব। আমায় বড় ভালবাসত। খুব যত্ন করত আমায়। ক’দিন ধরে মানুষটার শরীর ভাল যাচ্ছিল না। শেষ যেদিন আমায় বেঁধে রেখে গেল, সেদিন তার গায়ে জ্বর। পরের দিন এল না। তারপরের দিনও না। তারপর অনেকগুলো দিন এল গেল, কিন্তু আমার মনিব আর এলও না, গেলও না, আমি বন্দি হয়েই রইলুম।”
কাঠবিড়ালি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। সে এবার সত্যি-সত্যি ডিঙি বাঁধা দড়ি বেয়ে একেবারে ডিঙির গায়ে উঠে এল।
ডিঙি এবার একটা খুশির আওয়াজ তুলে দুলে উঠল, “আঃ!”
কাঠবিড়ালিটাও দোল খেয়ে লাফিয়ে উঠল, “আউ।”
ডিঙি আনন্দে আকুল হয়ে বলে উঠল, “ওরে কাঠবিড়ালি তুই আমার সারা গায়ে অমন করে লাফিয়ে লাফিয়ে ছোট। আমি তোকে কোলে নিয়ে আনন্দে দোল খাই। তোর মতো বন্ধু পেয়েছি কত দিন পরে। তোর পায়ের ছোঁয়ায় কত দিন পরে আমার মনে হচ্ছে, আমি এখন আর একা নই। আমার দুঃখ ঘোচানোর সঙ্গী পেয়েছি আমি। আর আমি কাকে ভয় পাই!”
ঠিক এই সময় এক ঝাঁক পাখি উড়ে গেল আকাশ দিয়ে। তাদের ডানার শব্দ বাতাসে ভেসে যায়। কুহর কানে আসে।
ডিঙি বলে, “ওদের কত আনন্দ! কেউ বেঁধেও রাখে না ওদের, কেউ বাধাও দেয় না। তোর পাখি হতে ইচ্ছে করে না কাঠবিড়ালি?”
“না।” উত্তর দিল কাঠবিড়ালি।
“কেন রে?” অবাক গলায় জিজ্ঞেস করল ডিঙি।
“আমি পাখি হলে আমার মাকে কে দেখবে? আমায় কত ভালবাসে মা!” জবাব দিল কাঠবিড়ালি।
ডিঙি কাঠবিড়ালির কথা শুনে থমকে গেল। কেমন যেন নিরাশ গলায় বলে উঠল, “আমার যদি মা থাকত!”
এবার হেসে ফেলল কাঠবিড়ালি। বলল, “তুমি তো ডিঙি-নৌকো। নৌকোর আবার মা হয় নাকি?”
কাঠবিড়ালির কথা শুনে কোনও উত্তর দিতে পারল না ডিঙি। মনে কষ্ট হলে মানুষ যেমন চুপ করে থাকে, ডিঙিও তেমনই চুপ করে রইল।
কাঠবিড়ালি হয়তো ডিঙির কষ্টটা বুঝতে পারল। তাই ডিঙিকে সান্ত্বনা দেবার জন্যে বলল, “বুঝতে পেরেছি, আমার কথা শুনে তুমি কষ্ট পেলে। ঠিক আছে, আমার মাকে বলব তোমারও মা হবার জন্যে।”
“সত্যি বলবি?” আনন্দে যেন উথাল-পাথাল করে উঠল ডিঙি। চিৎকার করে বলে উঠল, “ওরে আমার ভাই, আমার যদি দুটো হাত থাকত, তবে তোকে এখনই বুকে জড়িয়ে ধরতুম। দু’জনায় নদীর স্রোতে ভেসে ভেসে যেখানে খুশি চলে যেতুম। তারপর ফিরে আসতুম দু’জনায় মায়ের কাছে। বলতুম, মা, আমাদের আদর করো। কিন্তু তা তো হবার নয়। আমি যে বন্দি।”
“ও ডিঙি, তোমার যদি ওই বন্দি-বাঁধন আমি খুলে দিই?”
ডিঙি বলল, “তুই কেমন করে পারবি? এ যে ভীষণ শক্ত দড়ি!”
কাঠবিড়ালি উত্তর দিল, “ও ডিঙি, আমারও দাঁত কম শক্ত নয়। এই দাঁত দিয়ে ভেঙে ভেঙে আমি বাদাম খাই। আমার শক্ত দাঁত দিয়ে আমি এই শক্ত দড়ি ঠিক কেটে ফেলতে পারব। দ্যাখো না!” বলে কাঠবিড়ালি ডিঙির ওপর বসে বসেই দড়িতে দাঁত বসাল। দড়ি সত্যি-সত্যিই কাটতে লাগল। বাহাদুর বটে কাঠবিড়ালি। বাবা, কী ধার তার দাঁতে।
দড়ি যতই কাটে, তার টুকরোগুলো জলে পড়ে। ভেসে যায়। আর ডিঙির ততই আনন্দে মন উছলে ওঠে।
দ্যাখো দ্যাখো, কাঠবিড়ালি সত্যি-সত্যিই কেটে ফেলেছে দড়ি! দ্যাখো দ্যাখো, কাঠবিড়ালিকে নিয়ে ডিঙি সত্যি-সত্যি ভেসে চলেছে নদীর স্রোতে। শুনতে পাচ্ছ, দু’জনেই আনন্দে কেমন চিৎকার করছে!
আনন্দে চিৎকার তো করছে ঠিকই, কিন্তু ভাবছে কি ওরা কোথায় ভেসে চলেছে? কেমন করে থামবে?
না, তাদের এখন সেসব কথা ভাবার সময় নেই। ডিঙি এখন মুক্তি পেয়েছে সেই তার আনন্দ। খুঁজে পেয়েছে এক ভাইকে। সে এক কাঠবিড়ালি। তাকে নিয়ে সে এখন ভেসে যাবে যেখানে খুশি সেখানে। আর তাকে পায় কে!

ভাসছে ডিঙি। দেখছে কাঠবিড়ালি এদিক-ওদিক। কোথাও গাঁ, কোথাও গঞ্জ। কোথাও ঘাট, কোথাও বন। নদীর দু’পাশ জুড়ে যেন ছবির মেলা।
দেখতে দেখতে কোথায় যে চলে এসেছে তার ঠিক-ঠিকানা নিয়ে একদম মাথা ঘামায়নি ডিঙি। হাসতে হাসতে কখন যে কাঠবিড়ালি হাসি হারিয়ে ফেলেছে, সেটাও খেয়াল করেনি সে! ভেবেছে, কাঠবিড়ালি অবাক হয়ে দেখছে, শুধুই দেখছে।
না, এখন কাঠবিড়ালি ভাবছে, শুধুই ভাবছে।
কী ভাবছে? কে জানে!
এমন সময় ডিঙি হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, “আমরা যদি এমনই করে ভাসতে ভাসতে সমুদ্দুরে চলে যাই, তখন কেমন মজা হয় বল?”
কাঠবিড়ালি কেমন যেন কাঁদো কাঁদো গলায় উত্তর দিল, “না, আমি সমুদ্দুরে যাব না!”
“কেন?”
“আমি মায়ের কাছে যাব। তুমি ফিরে চলো!”
ডিঙি চমকে উঠেছে কাঠবিড়ালির কথা শুনে। তাই তো, সে স্রোতের তোড়ে ভেসেই যাচ্ছে সামনে। সে তো জানে না, কেমন করে ফিরে যাবে পেছনে। সে জানত বুড়োমাঝি। জানত, কেমন করে বইঠা টেনে স্রোত কাটিয়ে বাইতে হয় ডিঙি। যেতে হয় সামনে, কিংবা পেছনে। কী হবে এবার? বইঠা তো তার সঙ্গেই আছে। কে টানবে এখন?
কাঠবিড়ালি আর যেতে চায় না কোথাও। সে ঘ্যানঘ্যানানি শুরু করল, “আমায় নামিয়ে দাও! আমি মায়ের কাছে যাব!”
ডিঙি পড়ল ফাঁপরে। বলল, “ওরে কাঠবিড়ালি, আমি স্রোতের টানে ভেসে যেতে পারি। কিন্তু জানি না তো, স্রোত কাটিয়ে কেমন করে পেছনে যেতে হয়।”
ডিঙির কথা শুনে এবার কাঠবিড়ালি সত্যিই কেঁদে ফেলল। চেঁচিয়ে উঠল, “আমি মায়ের কাছে যাব।”
চেঁচালে আর কী হবে। ওই তো ফিনফিনে গলা! কে শুনতে পাবে! ডিঙিরও চোখে জল এসে গেল কাঠবিড়ালির কান্না দেখে! কিন্তু তার কিছুই করার নেই। একেবারেই অসহায় সে। তাকে স্রোতের টানে ভাসতেই হবে। ভাসতে ভাসতে সে যে কোথায় যাবে নিজেও জানে না। সুতরাং কান্না ছাড়া তাদের এখন আর কিছু করারও নেই। যাঃ! তাদের বুঝি দিন শেষ হয়ে গেল। বুঝি দুটিতেই ডুবে মরে!
না, তারা মরল না। পড়ল আর এক বিপদে। ঠিক সেই সময়ে নদীর স্রোত কাটিয়ে ভেসে যাচ্ছিল একটা জাহাজ। জলে ঢেউ উঠছিল একটার পর একটা। সেই ঢেউ গিয়ে মারল ধাক্কা ডিঙির গায়ে। ডিঙি টালমাটাল। এই বুঝি যায় ডুবে! আঁতকে চেঁচিয়ে উঠল কাঠবিড়ালি। আর ঠিক তখনই ছোট্ট ডিঙি নদীর তীরে ছিটকে গেল। মারল ধাক্কা। আটকে গেল পাড়ে।
চোখের পলকে কাঠবিড়ালিও মারল লাফ নদীর পাড়ে। দুড়দাঁড়িয়ে দিল ছুট যেদিকে চোখ যায় সেদিকে। পেছন ফিরে একবারও দেখল না ছোট্ট ডিঙির কী হল! কাঠবিড়ালিটা কী বেআক্কেলে দেখেছ!
পেছন ফিরে কাঠবিড়ালি তাকে না দেখলেও, সামনে থেকে একটা ছোট্ট ছেলে ডিঙিটাকে দেখতে পেল। দেখতে পেল মানে, তার চোখে পড়ে গেল! আসলে, কাছেপিঠে কোথাও বোধহয় মেলা বসেছে। মাইক বাজছে। মাইকে গান বাজছে। কথা ভাসছে। সঙ্গে সঙ্গে হই-হল্লার শব্দ শোনা যাচ্ছে। ছেলেটা বোধহয় মেলার থেকেই ফিরছে। নদীর ধারের রাস্তা ধরে ঘরে যাচ্ছে বোধহয়। গাঁ-গঞ্জের মেলায় যেমন পাওয়া যায়, তার হাতে তেমনই একটা তালপাতার বাঁশি। মুখে ফুঁ দিচ্ছে, পোঁ পোঁ করে বাঁশি বাজছে। কিন্তু ডিঙিটাকে দেখেই ছেলেটা বাঁশি থামিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে!
দূর থেকে ডিঙিটাকে দেখতে দেখতে কাছে এগিয়ে গেল সে। ডিঙি খানিকটা আটকে আছে নদীর চরে। খানিকটা দুলছে নদীর জলে। তার মনে হল, এটা নিশ্চয়ই নদীর স্রোতের টানে দড়ি ছিঁড়ে এখানে ভেসে এসেছে। যার ডিঙি সে না জানি এখন কত খোঁজাখুঁজি করছে! তাই, সেইখানে দাঁড়িয়েই ছেলেটা হাঁক পাড়ল, “এখানে। ভেসে এসেছে এ কার ডিঙি?”
একবার নয়, দু’বার নয়, অনেকবার সে এমনই করে হাঁক দিল। কিন্তু কেউ এল না, কেউ সাড়াও দিল না। অগত্যা তার কী মনে হল, ডিঙিটা জলে ঠেলে সে নিজেই তাতে উঠে পড়ল। উঠেই দেখে কী, ডিঙির ভেতর একটা বইঠা। তালপাতার বাঁশিটা কাপড়ের কোঁচার খুঁটে আটকে ছেলেটা বইঠা টেনে স্রোত কাটায়। পেছনে এগিয়ে যায় আর চেঁচায়, “কার ডিঙি ভেসে গেছে? কোন পাড়ে ডিঙির মাঝি আছে?”
তার ডাকাই সার। ডাকতে ডাকতে তার গলা ভাঙল। কেউ সাড়াই দিল না। ছেলেটা আপন মনেই বলে উঠল, “এ তো ভারী আশ্চয্যি ঘটনা! ডিঙিটার কি তবে মনিব নেই! একাই ভেসে বেড়ায় নদীর জলে!”
ছেলেটার কথা শুনে ডিঙির মন ছটফট করে উঠল উত্তর দেবার জন্যে। কিন্তু মুখ ফুটে কথা বেরোল না। হ্যাঁ, ছেলেটার সঙ্গে কথা বলা যেত, যদি সে মানুষের ছেলে হয়ে একটা কাঠবিড়ালির ছেলে হত। নিদেন একটা ব্যাঙের ছেলে হলেও তার সঙ্গে কথা কইতে ডিঙির আপত্তি ছিল না। কিন্তু মানুষের ছেলের সঙ্গে কথা কইতে গেলেই ঠাউরাত ভূতে কথা কইছে! পালাত ভয়ে। তার চে বরং চুপ থাকাই ভাল। তাই ডিঙি চুপ করেই রইল।
আর, এদিকে ছেলেটা সারাক্ষণ ডিঙি টানে আর হাঁক পাড়ে। হাঁক পাড়তে পাড়তে যখন সত্যি-সত্যি কারও ডাক পেল না, তখন সে চেঁচিয়ে উঠল, “তবে ডিঙি তুই আমার সঙ্গে চ। আজ থেকে তুই আমার। আজ থেকে তুই আমার কাছে থাকবি। আমি তোর কোলে উঠে বইঠা টানব। তুই আমার নতুন বন্ধু।” বলতে বলতে সে বইঠা রেখে, তালপাতার বাঁশিটা কোঁচার খুঁট থেকে বার করল। বাঁশিতে ফুঁ দিল। বাঁশি বেজে উঠল, পোঁ-ও-ও! পোঁ-ও-ও!
ছোট্ট ডিঙি আনন্দে শিউরে ওঠে। দোল খায় নদীর স্রোতে। আর ভাবে, পৃথিবীটা কী সুন্দর!

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন