শৈলেন ঘোষ

কথাটা এমন কিছু সাংঘাতিক নয়। কী, না মন্ত্রীমশাই আজকাল পদ্য লিখতে শুরু করেছেন। তা করতেই পারেন। হঠাৎ যদি কারও মাথার ভেতর পদ্যের ঝনাৎকার ঝনঝন করে বেজে ওঠে, তবে, তিনি চাঁদের দিকে চেয়ে দু’-চার লাইন পদ্য লিখে ফেললে তাতে আমাদের বলার কিছু নেই। বরং সেই দু’-চার লাইন শুনতে শুনতে আমাদের চোখে যদি দু’-চার ফোঁটা জল টসকায়, তবে না জানি সে আরও কত আনন্দের। অবশ্য, আমাদের জানা নেই, মন্ত্রীমশায়ের পদ্য শুনে আমাদের চোখে জল টসকাবে কি না। কিন্তু যে মুহূর্তে রাজজ্যোতিষীর মুখ ফসকাল, ব্যাপারটা তখন থেকেই সাংঘাতিক হয়ে দাঁড়াল। কী দরকার ছিল জ্যোতিষমশায়ের কথাটা রাজা কাক্কাবোক্কার কানে তোলা। তোলা মানেই জলঘোলা। আরে মশাই আপনি পদ্য লিখতে পারেন না বলে অন্যে পারবে না, এমন কথা ভূ-ভারতে কে ভেবেছে কোনওদিন? একে হিংসে ছাড়া আর কী বলা যায়। বুড়ো বুড়ো লোকগুলোও যখন একে অন্যকে হিংসে করে কানভাঙায়, তখন কার না গা রি-রি করে ওঠে বলো। আরে বাবা রাজা কাক্কাবোক্কার কানভাঙিয়ে তোমার লাভটা কী? তোমার দুটো হাত তো আর চারটে হচ্ছে না। দুটো হাত চারটে না হলে একটা মস্ত ল্যাজও গজাচ্ছে না। তোমাকে সেই নিয়মমাফিক পাঁজিও ঘাঁটতে হবে, আকাশের তারাও গুনতে হবে। কারণ তুমি জ্যোতিষী। যার যা কাজ।
অবশ্য তর্কের খাতিরে জিজ্ঞেস করা যেতেই পারে, মন্ত্রীরও কি মশাই পদ্য লেখা কাজের মধ্যে পড়ে? না, নিশ্চয়ই পড়ে না। কে না জানে রাজার কানে গুজগুজ ফুসফুস করে মন্ত্রণা দেওয়াই মন্ত্রীর কাজ। কিন্তু কী করা যাবে! আসলে মন্ত্রীমশাইকে দোষ দিয়ে কী লাভ? দোষ যদি দিতে হয়, দাও ফুরফুরে বাতাসকে। এ বাতাস একবার গা ছুঁলে আর নিস্তার নেই। এমন সুড়সুড়িয়ে উঠবে। তবে সবারই কি আর সুড়সুড়ি লাগে? না, তা লাগে না। যার লাগে তার লাগে। অনেকটা ঠিক ঠান্ডা লাগার মতো। হঠাৎ যে কার লেগে গিয়ে ফ্যাঁচফ্যাঁচানি শুরু হয়ে যাবে, কেউ জানে না। তা যেমন বরাত। লাগল তো লাগল মন্ত্রীমশায়েরই লাগল। শুরু হয়ে গেল, ফ্যাঁচফ্যাঁচানি নয়, খচখচানি—চাঁদ দ্যাখো, আর খচখচ করে লিখে ফেলো।
শোনা যাচ্ছে, ইতিমধ্যে মন্ত্রীমশাই পুরো একখানা খাতা শেষ করে ফেলেছেন। শোনা যাচ্ছে মানে, সেই জ্যোতিষমশায়ের মারফতেই শোনা। সুতরাং খবরটা শোনা মাত্রই রাজা কাক্কাবোক্কার কপাল জুড়ে কয়েক জোড়া ভাবনার থাক পড়ে গেল। অবশ্য কাক্কাবোক্কার কপাল দেখে বলা মুশকিল, এ ভাবনা কীসের ভাবনা। এমনকী তাঁর মুখ দেখেও কে বলবে, তিনি কী ভাবছেন। অত কী, তিনি কী ভাবছেন, সেটা তিনি নিজেও জানেন কি না, এমন ভাবনাও যদি কারও মনে উঁকিঝুঁকি দেয়, তবে তাকে দোষ দেওয়া যায় না। তো, সে যাই হোক, এবার যে মন্ত্রীমশাইকে তলব করা হবে, এটা সবাই জানে। সুতরাং সত্যি-সত্যি যখন কাক্কাবোক্কা গর্জে উঠলেন, “মন্ত্রীমশাইকে বোলাও,” তখন সে গর্জনে কেউ চমকাল না। কিন্তু রাজামশায়ের হুকুম শুনে মন্ত্রীমশায়ের যে বুড়ো হাড় ঠকঠক করে কেঁপে উঠবে, সে সবাই জানে। কেননা, তাঁর ডাক পড়ল অসময়ে। ভরদুপুরে। এ সময়ে রাজকাজের কোনও তাড়া থাকে না। ঘুমোও, না হয় ঝিমোও। সাদাসাপটা ছুটি। অবশ্য মন্ত্রীমশায়ের চোখে এখন ওসব ঘুমটুমের বালাই নেই। তাঁর চোখে এখন পদ্য লেখার রঙিন সব ছবি ঘুরঘুর করছে। কী লিখি, কী লিখি করে তাঁর মনটা যখন ভীষণ আকুলি-বিকুলি করছে, তখনই তাঁর কাছে খবর পৌঁছল, রাজার ডাক পড়েছে।
এই ভরদুপুরে এমনই একটা ডাক শুনে হতভম্ব হয়ে যাওয়ারই কথা। এবং মন্ত্রীমশাই হতভম্ব তো হলেনই, সেই সঙ্গে পদ্য লেখাও তাঁর মাথায় উঠল। তিনি কাগজ-কলম ফেলে রেখে ছুটলেন রাজার কাছে।
“এই যে আসুন।” রাজার সামনে হাজির হতেই রাজা হাসিমুখে মন্ত্রীকে আপ্যায়ন করলেন।
রাজার মুখে হাসি! হঠাৎ! খুবই আজব ঘটনা। সুতরাং মন্ত্রীমশাই ঘাবড়ে যেতেই পারেন। এবং তিনি ঘাবড়ে গেলেনও। আর, এমন ঘাবড়ে গেলেন, তাঁর মুখ ফুটে একটি কথাও বেরোল না। তিনি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন রাজার মুখের দিকে চেয়ে।
মন্ত্রীর অবস্থা দেখে রাজা কাক্কাবোক্কা আরও জোরে হেসে উঠলেন। হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করলেন, “কবে থেকে শুরু করলেন?”
“আজ্ঞে?” মন্ত্রীর মুখ ফসকে গেল।
“আরে মশাই, আপনি এত ভয় পাচ্ছেন কেন? কাজটা তো আপনি খারাপ করছেন না।” হাসতে হাসতেই রাজা বললেন।
সত্যিই তো, রাজা কাক্কাবোক্কা যখন দিল খুলে হাসছেন, তখন মন্ত্রীমশাই অমন ভয়ে মুষড়ে পড়ছেন কেন? তিনিও তো হাসতে পারেন।
না, মন্ত্রীমশাই হাসলেন না। তিনি খুবই সন্তর্পণে বললেন, “আজ্ঞে আপনি শুরুর কথা কী বলছিলেন?”
রাজা কাক্কাবোক্কা আবার একচোট হেসে উঠলেন। হাসতে হাসতেই দুম করে বলে উঠলেন, “আপনাকে আমার ভীষণ হিংসে হচ্ছে। আমি মশাই দেশের রাজা। আমি রাজা হয়ে যা পারলুম না, আপনি মন্ত্রী হয়ে বেমালুম সে কাজটা করে ফেললেন।”

“আজ্ঞে আপনি কোন কাজটার কথা বলছেন আমি কিছুই বুঝতে পারছি না,” মন্ত্রীমশাই রাজার মুখে এমন হাসি দেখেও নিজের মুখে হাসি ফোটাতে পারলেন না একফোঁটাও। ভয়ে ভয়েই জিজ্ঞেস করলেন।
রাজা কাক্কাবোক্কা বললেন, “শুনলুম, আপনি নাকি আজকাল পদ্য লিখতে শুরু করেছেন।”
ব্যাস! রাজার হাসিমুখে এই কথা যেই না শোনা, অমনই মন্ত্রীর মুখটিও হাসিতে হিহি করে উঠল। এবং তিনি যারপরনাই লজ্জায় নেতিয়ে পড়লেন।
রাজা আবার বললেন, “শুনলুম, আপনি নাকি একখানা গোটা খাতা শেষ করে ফেলেছেন।”
মন্ত্রীর মুখের লজ্জা-মাখা হাসিটা এবার আরও একটু ঝলসে বলে উঠল, “আজ্ঞে আপনার আশীর্বাদে।”
রাজা বললেন, “যাচ্চলে, আমি আবার কবে রাজকাজ ছেড়ে আপনাকে পদ্য লেখার জন্য আশীর্বাদ করলুম।”
মন্ত্রীমশাই এবার সাহসে বুক বেঁধে, গলার স্বর উচ্চে তুলে বলে উঠলেন, “আজ্ঞে আপনার আশীর্বাদ না-থাকলে আমি কি লিখতে পারতুম :
হাঁড়ি আছে তাই আছে সরা
তাল আছে খাই তালবড়া
ডাল আছে তাই আছে বড়ি
খাই-দাই আর গড়াগড়ি
কান আছে তাই কানে শুনি
গান আছে তাই গুনগুনি
মুখ আছে তাই কাটি ফুট
ছুটি পেলে আমি দেব ছুট
“বাহ্! বাহ্! পদ্য কাকে বলে!” রাজা তারিফ করে উঠলেন।
রাজার তারিফ শুনে মন্ত্রী গদগদ হয়ে ঠোঁট টিপে হাসতে লাগলেন।
হঠাৎ রাজা কাক্কাবোক্কার সেই হাস্যমুখ যেন ঢিমে তেতালে গোমড়া হতে লাগল।
সেই মুখের দিকে নজর পড়তেই গদগদ মন্ত্রীর পিলে শুকোতে লাগল।
রাজা হুংকার ছাড়লেন, “হুম-ম-ম”, তারপর বললেন, “তা এই হাঁড়ি, সরা, তালের বড়া নিয়ে তো আপনি খাসা আছেন মশাই।”
“আজ্ঞে,” মন্ত্রী ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেলেন।
রাজা উঠলেন খেপে। দিলেন ধমক, “আজ্ঞে! আপনাকে তালের বড়া নিয়ে পদ্য লেখার জন্যে মন্ত্রীর পদে রাখা হয়েছে?”
“আজ্ঞে আমি তো রাজকাজে ফাঁকি দিই না।” মন্ত্রী ভয়ে ভয়ে উত্তর দিলেন।
“দেখুন, আপনি মিথ্যে তর্ক করবেন না। তর্ক করা আপনার অভ্যেসে দাঁড়িয়ে গেছে।” রাজা কড়কে উঠলেন। “এবার আপনাকে সত্যি-সত্যি আমি ছুটি দেব। এবার আপনাকে রাজকাজ ছেড়ে পদ্যের দিকে ছোটার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।”
“আজ্ঞে মহারাজ, আপনি অমন কথা বলবেন না,” মন্ত্রী কাকুতি-মিনতি করলেন, “আজ্ঞে আপনার যদি মনে হয় আমি রাজকাজে ফাঁকি দিচ্ছি, তবে আমি কথা দিচ্ছি, আপনি যা বলবেন আমি এখন থেকেই তা-ই পালন করব।”
“এ-কথা আপনি অনেকবার বলেছেন,” রাজা গর্জে উঠলেন। “আর আমি কোনও কথা শুনব না।”
“ঠিক আছে মহারাজ,” উত্তর দিলেন মন্ত্রী, “আপনি শেষবারের মতো যে কোনও কাজ দিয়ে দেখুন আমি কথা রাখি কি না। দয়া করে চাকরিটা আজ্ঞে খাবেন না। আমি মরে যাব।”
আচমকা রাজা কাক্কাবোক্কা জিজ্ঞেস করে বসলেন, “আপনি বিয়ের পদ্য লিখতে পারবেন?”
“আজ্ঞে চেষ্টা করব।”
“লিখেছেন আগে?”
“আজ্ঞে দরকার পড়েনি।”
“আপনি মশাই হাঁড়ি-সরার পদ্য লিখছেন, অথচ একটাও বিয়ের পদ্য লেখেননি? বিয়ের পদ্য না-লিখলে জাতে উঠবেন কেমন করে?” রাজা তাচ্ছিল্যের চোখে মন্ত্রীর মুখের দিকে তাকালেন।
“আজ্ঞে এবার আমি নিশ্চয়ই লিখব। আপনি বললেই লিখব।” আস্তব্যস্ত হয়ে উত্তর দিলেন মন্ত্রী।
“ঠিক আছে আপনি আমাকে একটা বিয়ের পদ্য লিখে দিন। দেখি আপনি কেমন পারেন।”
“আজ্ঞে কার নামে লিখতে হবে, পাত্র না পাত্রীর?” মন্ত্রী জিজ্ঞেস করলেন।
রাজা কাক্কাবোক্কা চট করে মন্ত্রীর মুখের দিকে তাকালেন একবার। তারপর গম্ভীর গলায় বললেন, “আমার নামে লিখতে হবে।”
চমকে উঠলেন মন্ত্রী রাজার কথা শুনে। তারপর আমতা আমতা করে বললেন, “আজ্ঞে আপনি? আপনার তো... যাঃ! আপনি আমার সঙ্গে ঠাট্টা করছেন।”
“আপনার সঙ্গে ঠাট্টা করতে যাব কোন দুঃখে,” রাজা উত্তর দিলেন। “আমি রাজা। একটার জায়গায় পাঁচটা বিয়ে তো করতেই পারি। তাতে কার কী বলার আছে।”
“আজ্ঞে কেন করবেন? রানিমার মতো মানুষ থাকতে আপনি আবার একটা…”
রাজা কাক্কাবোক্কার মেজাজ গেল বিগড়ে। খুবই তিরিক্ষি গলায় তিনি মন্ত্রীকে কড়কে উঠলেন, “আপনি আবার মুখে মুখে তর্ক করছেন? আপনি তো আচ্ছা বেয়াড়া লোক মশাই। আপনাকে যা বলছি, তা-ই যদি পারেন করুন। না-হয় চাকরি ছাড়ুন।”
মন্ত্রীর মুখখানা চুপসে এইটুকু হয়ে গেল। অবশ্য চাকরির ভয়ে নয়, রানিমার কথা ভেবে। হায়! হায়! অমন হাসিখুশি রানিমার শেষকালে দুয়োরানির দশা হবে! না না, চাকরি যায় যাক তো ভি আচ্ছা, এ বিয়ে কিছুতেই হতে পারে না। এ ক্ষেত্রে রাজার হুকুম তিনি কিছুতেই মানতে পারবেন না। এ অন্যায় হুকুম। তাই এবার তিনি একটুও ভয় পেলেন না। বুক চিতিয়ে রাজার মুখের ওপর বলে দিলেন, “এ পদ্য আমি লিখতে পারব না।”
“পারব না! মানে? আপনি রাজাকে অমান্য করেন?”
“বুড়ো রাজার বিয়ে, তার আবার পদ্য। আমার দ্বারা হবে না।” বলেই মন্ত্রী সেখান থেকে হুড়মুড় করে বেরিয়ে এসে চেঁচিয়ে উঠলেন, “আমি এক্ষুনি যাচ্ছি রানিমার কাছে। সব কথা ফাঁস করে দেব।”
রাজা চিলচেঁচিয়ে মন্ত্রীকে শাসিয়ে উঠলেন, “খবরদার, রানির কানে যদি এ-কথা তোলেন, তবে আমার একদিন কি আপনার একদিন!”
কিন্তু রাজার এ শাসানি মন্ত্রীর কানে ওঠার আগেই তিনি সটান রানির কাছে। রানির ঘরে তাঁর সঙ্গে মন্ত্রীমশায়ের ফিসফিসিয়ে যত কথা হল, তার একবর্ণও কেউ জানতে পারল না। কিন্তু কানে না-শুনলেও রাজা কাক্কাবোক্কার তো বুঝতে বাকি রইল না। মনে মনে মন্ত্রীর ওপর ভীষণ চটলেন তিনি, কিন্তু ভেতরে ভেতরে ঠিকই ঠাহর করতে পারলেন, মন্ত্রীর কথাটা মোটেই ফেলনা নয়। তাঁর রানির মতো রানি দুটি হয়? মুখ ফসকে বিয়ের কথাটা উচ্চারণ করা মোটেই উচিত হয়নি। রানির কানে উঠলে তিনি মুখ দেখাবেন কেমন করে? ছিঃ!
মুখ তাঁকে দেখাতেই হয়েছিল। কিন্তু রানির সঙ্গে তাঁর কী কথা হয়েছিল কেউ জানে না। তবে পরের দিন মন্ত্রীকে মুখ দেখাতে রাজা কাক্কাবোক্কা যে খুবই লজ্জা পাচ্ছিলেন সে আর বলতে!

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন