অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়
সদাশিব কুঙ্কুকে নিয়ে গ্রাম থেকে পালিয়ে এসেছিল এবং কুঙ্কুকে জিজাবাইয়ের হাতে সঁপে দিয়েছিল, সে কাহিনি আগে বলেছি৷ সদাশিবের মাথায় বুদ্ধি ছিল অনেক, কিন্তু অহংকার এক ফোঁটা ছিল না; নিজের চেয়ে পরের কথাই সে বেশি ভাবত৷ তার নিজের যে কোনো যোগ্যতা আছে এ কথা তার মনেই আসত না৷ তাই শিবাজি থেকে আরম্ভ করে সবাই তাকে এত ভালোবাসতেন৷
ওদিকে শিবাজি চাকন দুর্গ দখল করেছেন বটে, কিন্তু সে কতটুকু? সারা মহারাষ্ট্র দেশে অসংখ্য দুর্গ আছে; প্রত্যেক দুর্গের মালিক স্বাধীনভাবে থাকেন৷ কেউ-বা বিজাপুর রাজ্যের অধীনে থেকে দুর্গ রক্ষা করেন৷ শিবাজির উদ্দেশ্য মহারাষ্ট্র দেশে যত দুর্গ আছে সব নিজের দখলে এনে, একচ্ছত্র রাজ্য স্থাপন করবেন; সমস্ত মারাঠা জাতি এক হবে, স্বাধীন হবে৷ বাইরের শত্রুর উপদ্রব থেকে মুক্ত হবে৷ কিন্তু এ কাজ তো সোজা কাজ নয়, একদিনের কাজও নয়৷ শিবাজি কখনো ছল-চাতুরি দ্বারা, কখনো লড়াই করে একটির পর একটি দুর্গ অধিকার করেছেন৷ কিন্তু এখনও অনেক দুর্গ বাকি৷
বলা বাহুল্য সদাশিব সর্বদা তাঁর সঙ্গে সঙ্গে আছে৷ এতদিন সে একটু মনমরা হয়ে ছিল, কারণ তার গোঁফ ছিল না; যুদ্ধক্ষেত্রে লড়াই করতে গিয়ে যদি গোঁফ না থাকে সে বড়ো লজ্জার কথা৷ কিন্তু এখন তার প্রাণে আর দুঃখ নেই, তার নাকের নীচে কুরকুরে এক জোড়া গোঁফ গজিয়েছে৷ কেউ আর তাকে ছেলেমানুষ বলে অবজ্ঞা করে না, সে এখন জোয়ান মর্দ, জঙ্গিবাহাদুর৷
কিন্তু সম্প্রতি মহারাষ্ট্র দেশে এক মহাদুর্যোগ উপস্থিত হয়েছে; ঘোড়ার মড়ক এসে দেশের প্রায় অর্ধেক ঘোড়া শেষ করে দিয়ে গেছে৷ অথচ ঘোড়া না হলে যুদ্ধ হয় না, পাহাড়ি দেশে এখান থেকে ওখানে যাওয়া যায় না৷ শিবাজি ভারি মুশকিলে পড়েছেন৷ তাঁর নিজের এবং অধীন সৈন্যদের মিলিয়ে আন্দাজ পাঁচ হাজার ঘোড়া ছিল, তার অধিকাংশ মড়কে মারা গেছে৷ এখন তিনি শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবেন কী করে? ভরসা শুধু এই যে শত্রুদেরও ঘোড়া মরেছে; কেউ আর এগিয়ে এসে যুদ্ধ করতে পারছে না৷ সবাই প্রাণপণে ঘোড়া সংগ্রহ করবার চেষ্টা করছে৷ কিন্তু ঘোড়া কোথায়? বিদেশ থেকে যেসব ঘোড়ার সওদাগর ঘোড়া বিক্রি করতে আসত তারা মড়কের ভয়ে আর আসে না৷
সারা মহারাষ্ট্র দেশে কেবল একটি লোকের কাছে ঘোড়া আছে, তিনি হচ্ছেন চন্দ্রগড় দুর্গের অধিপতি বলবন্ত রাও৷ চন্দ্রগড় দুর্গ পুনা থেকে বেশি দূর নয়, ঘোড়ার পিঠে এক বেলার রাস্তা৷ কিন্তু পথ বড়ো দুর্গম, কৎরজ গিরিসংকটের গোলকধাঁধার মধ্যে নিরালা দুর্গটি চুপচাপ বসে আছে৷ বাইরের সঙ্গে যোগাযোগ কম বলেই বোধ হয় চন্দ্রগড় দুর্গে ঘোড়া-মড়কের ছোঁয়াচ লাগেনি৷ বলবন্ত রাওয়ের দু-হাজার ঘোড়া সব জ্যান্ত আছে৷
বলবন্ত রাওয়ের অনেক বয়স হয়েছে; লোকটি যেমন ধূর্ত তেমনি কৃপণ৷ তিনি দূর সম্পর্কে শিবাজির মামা হন৷ শোনা যায়, ছ-সাত বছর আগে তিনি একবার ভগিনী জিজাবাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে পুনায় এসেছিলেন৷ শিবাজির তখন কিশোর বয়স, কিন্তু বলবন্ত রাও তাঁকে দেখেশুনে বুঝলেন, এ ছেলে সামান্য নয়; একদিন এ ছেলে সমস্ত মহারাষ্ট্র দেশ নিজের কবলে আনবে৷ তিনি মধুর হেসে বললেন, 'বাবা শিব, তোমার কপালে রাজতিলক দেখতে পাচ্ছি৷ আশীর্বাদ করি তুমি দিগবিজয়ী হও৷'
শিবাজি চুপ করে রইলেন৷ বলবন্ত রাও তখন তাঁর পিঠে হাত বুলিয়ে বললেন, 'তুমি আমার বোন জিজার ছেলে, আমার পরমাত্মীয়৷ দেখো বাবা, তুমি যেন বড়ো হয়ে আমার দুর্গের পানে নজর দিয়ো না৷'
শিবাজি সবিনয়ে বললেন, 'না না, সে কী কথা!'
জিজাবাই সেখানে উপস্থিত ছিলেন, বলবন্ত রাও তাঁর পায়ের দিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন, 'তাহলে মায়ের পা ছুঁয়ে দিব্যি করো৷'
শিবাজি নিরুপায় হয়ে মায়ের পা ছুঁয়ে শপথ করলেন যে তিনি কোনোদিন ছলে বলে কৌশলে চন্দ্রগড় দুর্গ দখল করবার চেষ্টা করবেন না৷ বলবন্ত রাও খুশি হয়ে নিজের দুর্গে ফিরে গেলেন৷
এই তো গেল আগের কথা৷ বর্তমানে অবস্থা দাঁড়িয়েছে এই যে, বলবন্ত রাও নিজের দুর্গে দু-হাজার ঘোড়া নিয়ে বসে আছেন৷ তাঁর দুর্গে যত সৈন্য আছে ঘোড়া তার চারগুণ৷ বলবন্ত রাও মনের আনন্দে ঘোড়া বিক্রি করছেন; মড়কের পর তিনি ঘোড়ার দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন-একটা ঘোড়ার দাম দশ আশরফি, ইচ্ছে হয় কেনো না হয় কিনো না৷
গরজ বড়ো বালাই৷ যাদের গরজ বেশি তারা দু-চারটে ঘোড়া কিনছে, কিন্তু এত দাম দিয়ে বেশি ঘোড়া কেনার ক্ষমতা ক-জনের আছে? শিবাজি একবার বলবন্ত রাওয়ের কাছে দূত পাঠিয়েছিলেন, কিন্তু বলবন্ত রাও অটল৷ নিজের ভাগনের প্রতি তিনি তো আর পক্ষপাত দেখাতে পারেন না, লোকে বলবে কী! যে ঘোড়া কিনতে চায় তাকেই দশ আশরফি দিতে হবে, এক কানাকড়ি কম হবে না৷
শিবাজি ভারি প্যাঁচে পড়ে গিয়েছেন৷ মায়ের পা ছুঁয়ে প্রতিজ্ঞা করেছেন, প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করতে পারেন না৷ দুর্গটা ইচ্ছে করলেই তিনি জয় করতে পারেন, কিন্তু চন্দ্রগড় দুর্গের প্রতি তাঁর লোভ নেই৷ তাঁর চাই ঘোড়া৷ তিনি মনে মনে নানারকম ফন্দি আঁটছেন, কী করে বলবন্ত রাওয়ের ঘোড়াগুলো হস্তগত করা যায়, অথচ প্রতিজ্ঞাভঙ্গ না হয়৷ বলবন্ত রাও কেবল নামেই শিবাজির মামা, কাজের বেলা কেউ নয়৷ বুড়োকে জব্দ করতে না পারলে জীবনই বৃথা!
এই সব নানা চিন্তায় মগ্ন শিবাজি একদিন বিকেল বেলা প্রাসাদের ছাদে উঠলেন৷ ছাদে কুঙ্কু আর জিজাবাই ছিলেন, কুঙ্কু জিজাবাইয়ের চুল আঁচড়ে দিচ্ছিল৷ শিবাজিকে দেখে জিজাবাই ভুরু তুলে চাইলেন, 'কী রে?'
শিবাজি বললেন, 'কিছু নয় মা, ছাদে একটু বেড়াতে এলাম৷'
জিজাবাই আর কিছু বললেন না; শিবাজি চিন্তিত মুখে ছাদে পায়চারি করতে লাগলেন৷ ছাদের কিনারা থেকে পুনার ঘরবাড়ি দেখা যাচ্ছে, দূরে মুথা নদী দেখা যাচ্ছে কিন্তু সেদিকে শিবাজির দৃষ্টি নেই, তাঁর মন চিন্তায় মগ্ন৷
ওদিকে জিজাবাই কুঙ্কুর সঙ্গে গল্প করছেন৷ দু-একটা কথা শিবাজির কানে যাচ্ছে, কিন্তু তাঁর মন অন্য দিকে; তিনি ভাবছেন কোন উপায়ে মামা বলবন্ত রাওয়ের ঘোড়াগুলো হাত করা যায়৷ ভাবতে ভাবতে তিনি এক সময় জিজাবাইয়ের কয়েকটা কথা শুনতে পেলেন, শুনেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন৷ জিজাবাই বলছেন, '. . . সামনের পূর্ণিমা তিথিতে আমার ব্রত উদযাপন; ব্রাহ্মণভোজন করাতে হবে . . . জ্ঞাতিগোষ্ঠীদের নেমন্তন্ন করতে পারলে ভালো হত, কিন্তু পুনায় জ্ঞাতিগোষ্ঠী ক-জনই বা আছে . . .'
শিবাজি কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন, তারপর নিঃশব্দে ছাদ থেকে নেমে গেলেন৷
সিঁড়ির নীচে সদাশিব দাঁড়িয়ে ছিল, শিবাজি তাকে বললেন, 'দেখ তো তানাজি কোথায়৷ তাকে ডেকে নিয়ে আয়, পরামর্শ আছে৷'
শিবাজি গুপ্ত মন্ত্রণাকক্ষে গিয়ে বসলেন৷ ছোটো ঘর, মেঝের ওপর জাজিম পাতা, কয়েকটা মোটা তাকিয়া ছড়ানো রয়েছে৷ শিবাজি একটি তাকিয়ায় হেলান দিয়ে বসে আপন মনে মৃদু মৃদু হাসতে লাগলেন৷ চমৎকার বুদ্ধি মাথায় এসেছে!
কিছুক্ষণ পরে তানাজিকে নিয়ে সদাশিব এল৷ তখন তিনজনে মুখোমুখি বসে মন্ত্রণা আরম্ভ করলেন৷ শিবাজি দু-চার কথায় তাঁর মতলব খুলে বললেন, 'আগামী পূর্ণিমার দিন মায়ের ব্রত উদযাপন হবে৷ মায়ের ভারি দুঃখ জ্ঞাতিগোষ্ঠী বেশি পুনায় নেই; তা আমি ঠিক করেছি চন্দ্রগড় দুর্গে লোক পাঠিয়ে মামা বলবন্ত রাওকে নেমন্তন্ন করব, দুর্গের সবাইকে নেমন্তন্ন করব৷ তারা অন্তত তিন-চারশো লোক আসবে; ঘোড়ায় চড়ে আসবে৷ তার মানে তিন-চারশো ঘোড়া৷ বুঝেছ? ওরা দুপুর বেলা এসে পৌঁছোবে, সারা দিন খাওয়া-দাওয়া হইহহল্লা চলবে৷ সে রাত্রে ওরা ফিরে যেতে পারবে না, এখানেই রাত কাটাতে হবে৷ পরদিন সকাল বেলা বলবন্ত রাও ঘুম থেকে উঠে দেখবেন সব ঘোড়া চুরি হয়ে গেছে৷ কেমন?'
তানাজি মহানন্দে হাঁটু চাপড়ে বললেন, 'বাহবা! খাসা বুদ্ধি বার করেছ৷ যদি তিন-চারশো ঘোড়া পাওয়া যায় তাই বা মন্দ কী৷ তা, কাকে নেমন্তন্ন করতে পাঠাচ্ছ?'
শিবাজি বললেন, 'সদাশিবকে৷ সঙ্গে পুরুতমশাই যাবেন৷'
শিবাজি জিজাবাইকে বললেন, 'মা, এবার খুব ঘটা করে তোমার ব্রত উদযাপন হবে৷'
মা খুশি হলেন, বললেন, 'বেশ তো, তুই যা করবি তাই হবে৷'
শিবাজি বললেন, 'চন্দ্রগড় দুর্গের সবাইকে নেমন্তন্ন করব৷ হাজার হোক বলবন্ত রাও তোমার দাদা৷ আমার মামা৷ তাঁকে এবং তাঁর দুর্গের লোকদের নেমন্তন্ন না করলে ভালো দেখায় না৷'
জিজাবাই মনে মনে হাসলেন, বললেন, 'তা ভালো৷ কিন্তু দাদার দুর্গের পানে যেন নজর দিস নে, পা ছুঁয়ে দিব্যি করেছিস৷'
শিবাজি জিভ কেটে বললেন, 'ছি ছি, সে কী কথা!'
দুপুর রাত্রে সদাশিব গোরুর গাড়িতে চড়ে যাত্রা করল৷ তার সঙ্গে বৃদ্ধ পুরোহিত রামদেও এবং এক বস্তা সুপুরি৷ কাউকে নেমন্তন্ন করার সময় তার হাতে সুপুরি দিতে হয়৷
শুক্লা দশমীর রাত্রি, আকাশে চাঁদ আছে৷ সদাশিব নিজেই গোরুর গাড়ি হাঁকিয়ে চলল৷ ঘোড়ায় না গিয়ে গোরুর গাড়িতে যাওয়ার কারণ, প্রথমত, সঙ্গে বৃদ্ধ রামদেও আছেন৷ মহারাষ্ট্র দেশে যদিও সকলেই ঘোড়ায় চড়তে জানে, তবু পুরোহিত মশাইয়ের বয়স হয়েছে৷ এতদূর রাস্তা ঘোড়ার পিঠে যেতে তাঁর কষ্ট হবে৷ দ্বিতীয়ত, মাত্র দু-জন লোকের পক্ষে ঘোড়ায় চড়ে বাইরে যাওয়া নিরাপদ নয়; আজকাল চারিদিকে রাহাজানের দল ঘুরে বেড়াচ্ছে, সুবিধে পেলেই অসহায় পথিকের ঘোড়া কেড়ে নিচ্ছে৷ মহারাষ্ট্র দেশে ঘোড়া সবচেয়ে দুর্মূল্য বস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে৷
সারা রাত সদাশিব উঁচু-নীচু পাথুরে পথ দিয়ে গোরুর গাড়ি চালাল; রামদেও গাড়িতে শুয়ে নিদ্রা দিলেন৷ রাত্রি শেষ হবার আগেই চাঁদ অস্ত গেল৷ সদাশিব তখন গাড়ি দাঁড় করাল৷ তারপর ভোর হবার সঙ্গেসঙ্গে আবার চলল৷
তারা যখন চন্দ্রগড় দুর্গের সামনে উপস্থিত হল তখন বেলা প্রথম প্রহর পার হয়ে গেছে৷
চন্দ্রগড় দুর্গটি খুব পুরোনো, বোধ হয় তিন-চারশো বছর আগে তৈরি হয়েছিল৷ মস্ত বড়ো দুর্গ, বড়ো বড়ো পাথরের বিশ হাত উঁচু প্রাকার দিয়ে ঘেরা৷ বলবন্ত রাও দুর্গটিকে অটুট রেখেছেন, সর্বদা তার দেখাশোনা করেন, কোথাও প্রাকারের পাথর খসে গেলে তৎক্ষণাৎ মেরামত করান৷ তবু প্রাকারের পাথরের খাঁজে খাঁজে গাছ গছিয়েছে; প্রাচীনতার চিহ্ন দুর্গটির গায়ে ছাপ মারা রয়েছে৷ সদাশিব দেখেশুনে নিজের মনে মন্তব্য করল, 'শিবাজির পক্ষে এ দুর্গ দখল করা মোটেই শক্ত নয়৷ কিন্তু রাজা যে মায়ের পা ছুঁয়ে দিব্যি করেছেন-' সে একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলল৷
দুর্গের তোরণদ্বার খোলা ছিল৷ সদাশিবের গোরুর গাড়ি সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই তিন-চারজন লশকর বেরিয়ে এল, একজন জিজ্ঞেস করল, 'কী চাই?'
রামদেও গাড়ি থেকে নামলেন, সদাশিব সুপুরির বস্তা নিয়ে তাঁর পাশে দাঁড়াল৷ রামদেও বললেন, 'আমরা পুনা থেকে আসছি৷ আমি শিবাজির কুলপুরোহিত৷ কিল×াদার বলবন্ত রাওয়ের সঙ্গে দেখা করতে চাই৷'
শিবাজির নাম এখন সকলেই জানে, লশকরদের চোখে সম্ভ্রম ফুটে উঠল৷ একজন বলল, 'একটু দাঁড়ান, রাওকে খবর দিচ্ছি৷'
লশকর দুর্গের ভিতর চলে গেল৷ কিছুক্ষণ পরে ফিরে এসে বলল, 'আসতে আজ্ঞা হোক৷'
রামদেও এবং সদাশিবকে নিয়ে লশকরেরা দুর্গে প্রবেশ করল৷
দুর্গের একটি চাতালের ওপর গদি পাতা, তার ওপর বলবন্ত রাও বসে আছেন৷ কয়েকজন অনুচর তাঁকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে; একজন তালপাতার প্রকাণ্ড পাখা দিয়ে বাতাস করছে৷ বলবন্ত রাওয়ের মুখখানি তাল-তোবড়া বেগুন-পোড়া গোছের; মাথার চুল কামানো৷ কিন্তু চোখ দুটি ভারি তীক্ষ্ণ৷ তিনি সন্দেহভরা চোখে রামদেওয়ের পানে চাইলেন৷
রামদেও হাত তুলে তাঁকে আশীর্বাদ জানালেন, তারপর সদাশিবের ঝোলা থেকে পাঁচটি সুপুরি নিয়ে বলবন্ত রাওয়ের সামনে রাখলেন, বললেন, 'আগামী পূর্ণিমা তিথিতে জিজাবাইয়ের ব্রত উদযাপন হবে৷ আপনি তাঁর পরমাত্মীয়; তাই তিনি আপনাকে এবং আপনার দুর্গের সকলকে নিমন্ত্রণ করেছেন৷ পূর্ণিমার দিন আপনারা সকলে পুনায় গিয়ে তাঁর ব্রত উদযাপনে অন্ন গ্রহণ করলে তিনি কৃতার্থ হবেন৷'
বলবন্ত রাওয়ের পাশে গদির ওপর তাঁর বাঁধা-পাগড়ি রাখা ছিল, তিনি সেটি মাথায় পরে নিয়ে সুপুরিগুলি তুলে নিলেন; মাথায় পাগড়ি না পরে নিমন্ত্রণ গ্রহণ করা নিয়ম নয়৷ রামদেওয়ের পানে একটু হেসে বললেন, 'আসন গ্রহণ করুন৷'
রামদেও গদির পাশে বসলেন৷ সদাশিব সুপুরির ঝোলা নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল৷ সে গোরুর গাড়ির গাড়োয়ান, তাকে কেউ বসতে বলল না৷
বলবন্ত রাও মুখে মেকি হাসি এবং চোখে সন্দেহ নিয়ে রামদেওকে নানা প্রশ্ন করলেন৷ প্রথমে কুশল প্রশ্ন, তারপর নানা কথা৷ কীসের ব্রত, কত দিনের ব্রত, অন্য কে কে নিমন্ত্রিত হয়েছে, এই সব৷ রামদেও সরল ব্রাহ্মণ, ভিতরের কথা কিছু জানতেন না, তিনি সরলভাবে উত্তর দিলেন৷ শেষে বলবন্ত রাও বললেন, 'বেশ বেশ, শিব্বা মায়ের ব্রত উপলক্ষে খুব ঘটা করছে দেখছি৷'
রামদেও বললেন, 'জানেন তো শিবাজি কীরকম মাতৃভক্ত ছেলে৷ মায়ের ব্রত উদযাপনে সে ঘটা করবে না তো কে করবে!'
'তা বটে-তা বটে৷' বলবন্ত রাও একটু ইতস্তত করে বললেন, 'খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা কীরকম হয়েছে?'
রামদেও লম্বা ফিরিস্তি দিলেন : আম্বা মৌর চালের ভাত, আমটি সম্বর কোশাম্বি, পুরণপুরী লাড্ডু পেঁড়া জিলিপি, দই দুধ-পাক দহি বড়া আরও কত কী; বলবন্ত রাও কিপটে মানুষ, নিজের মাতৃশ্রাদ্ধে পাঁচজন ব্রাহ্মণ খাইয়েছিলেন, ফিরিস্তি শুনে তিনি প্রকাণ্ড হাঁ করলেন, 'এত খরচ করবে শিবাজি মায়ের ব্রত উদযাপনে৷ আমার দুর্গেই তো পাঁচ-শো জোয়ান আছে, সবাইকে এত খাওয়াবে?'
রামদেও হেসে বললেন, 'তা খাওয়াবে বই কী৷ এ তো আর সামান্য ব্যাপার নয়, মায়ের ব্রত উদযাপন৷'
ইতিমধ্যে দুর্গের অনেক লোক এসে চারদিক থেকে ঘিরে দাঁড়িয়েছিল; ভোজের ফিরিস্তি শুনে তাদের জিভে জল এল৷ তারা সাধারণ সৈনিক, তাদের দৈনিক রসদ জোয়ারের রুটি আর ধনে পাতার চাটনি; এর বেশি তাদের ভাগ্যে বড়ো একটা জোটে না৷ শিবাজি তাদের নেমন্তন্ন করেছেন এবং রকমারি অন্নব্যঞ্জন দধি দুগ্ধ মিষ্টান্ন খাওয়াবেন জেনে তারা উল×সিত হয়ে উঠল৷
রামদেও বললেন, 'তাহলে আমি সকলকে নিমন্ত্রণ করি?'
'করুন৷' বলবন্ত রাও হাসিমুখে কথা বললেন বটে কিন্তু তাঁর মনটা সংশয়ে আচ্ছন্ন হয়ে রইল৷ শিবাজি অবশ্য শপথ-ভঙ্গ করবে না, কিন্তু তার মতলবটা কী? নিশ্চয় অন্য কোনো মতলব আছে৷ নইলে এত লোককে কেউ কখনো নেমন্তন্ন করে খাওয়ায়!
রামদেও উঠলেন, চারদিকে ঘুরে ঘুরে সকলের হাতে সুপুরি দিয়ে নেমন্তন্ন করলেন৷ দুর্গের ভিতরটা ছোটোখাটো একটি শহরের মতন; রাস্তা আছে, বাজার আছে, পুকুর আছে৷ দুর্গের উত্তর দিকে ঘোড়াশালা, তার পাশে গোশালা৷ রামদেও যেমন ঘুরে ঘুরে নেমন্তন্ন করছেন, সদাশিবও সুপুরির ঝোলা নিয়ে সঙ্গে আছে৷ সদাশিব বোকার মতন এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে, যেন এমন দৃশ্য সে আগে কখনো দেখেনি৷ তার দিকে কারোর দৃষ্টি নেই, কিন্তু সে সবকিছু দেখে নিচ্ছে৷
নিমন্ত্রণ সারা হতে বেলা দুপুর কেটে গেল৷ অপরাহ্নে রামদেও বলবন্ত রাওকে বললেন, 'আমার কাজ শেষ হয়েছে, আমি তাহলে বিদায় নিই৷ জিজাবাইকে জানাব যে পূর্ণিমার দিন মধ্যাহ্নে আপনি সদলবলে পুনায় উপস্থিত হবেন৷'
'হ্যাঁ, হ্যাঁ, নিশ্চয় নিশ্চয়৷'
গোরুর গাড়ি চলে যাবার পর বলবন্ত রাও গদির ওপর বসে অনেকক্ষণ আপন মনে মৃদু মৃদু হাসতে লাগলেন৷ হাজার হোক তিনি শিবাজির মামা, বাঁশের চেয়ে কি কঞ্চি দড় হয়? শিবাজির মতলব তিনি বুঝে নিয়েছেন৷
শুক্লা একাদশীর রাত্রি তিন প্রহরে, চাঁদ তখন অস্ত যাচ্ছে, সদাশিবের গোরুর গাড়ি পুনায় ফিরে এল৷ শিবাজি তাদের জন্যে রাত জেগে বসে ছিলেন, রামদেওকে বললেন, 'আপনি বুড়ো মানুষ, ক্লান্ত হয়েছেন৷ শুয়ে পড়ুন গিয়ে৷'
তিনি চলে গেলেন৷ শিবাজি তখন সদাশিবকে সঙ্গে নিয়ে মন্ত্রণাকক্ষে গিয়ে বসলেন, প্রদীপের আলোয় খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব খবর নিলেন৷ তাঁর মুখে হাসি ফুটে উঠল৷ তিনি বললেন, 'জয় ভবানী৷ লক্ষণ ভালোই মনে হচ্ছে৷-কিন্তু তুই দু-রাত্রি জেগে গোরুর গাড়ি চালিয়েছিস, যা, লম্বা এক-ঘুম ঘুমিয়ে নে৷ কাল থেকে ভোজের আয়োজন শুরু করতে হবে৷ মাঝে মাত্র তিনটি দিন বাকি৷'
পরদিন সকাল থেকে কাজের ধুম পড়ে গেল৷ শিবাজি এবং তাঁর আশেপাশে যাঁরা আছেন সকলেই নানা কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন৷ পুনায় যত গণ্যমান্য লোক আছেন সকলকে নিমন্ত্রণ করতে হবে; শিবাজির প্রায় পাঁচ হাজার সিপাহি পুনায় উপস্থিত আছে, তারাও খাবে; তা ছাড়া চন্দ্রগড় দুর্গের পাঁচ-শো লোক৷ সব মিলিয়ে দশ হাজার আসবে৷ প্রকাণ্ড প্রাসাদের প্রকাণ্ড রসুইঘরে ভিয়েন বসে গেল৷ মা জিজাবাইয়ের আনন্দের সীমা নেই, তিনি চারদিকে কাজকর্ম তদারক করে বেড়াচ্ছেন৷ কুঙ্কু সর্বদা তাঁর সঙ্গে আছে৷
শিবাজির মনে অন্য চিন্তাও রয়েছে৷ উৎসবের সময় শত্রুরা সুযোগ পায়; শিবাজির শত্রুর অভাব নেই৷ তাই তিনি চারিদিকে সতর্ক দৃষ্টি রেখেছেন৷ শিবাজির বন্ধু যেসাজির অধীনে কয়েক দল লশকর পুনার চারিধারে টহল দিয়ে বেড়াচ্ছে; তা ছাড়া গুপ্তচরের দল চুপিচুপি সুলুকসন্ধান নিচ্ছে৷ শত্রু যে আচমকা আক্রমণ করবে তার উপায় নেই৷
এইভাবে তিন দিন কেটে গেল, পূর্ণিমা তিথি উপস্থিত৷ উদ্যোগ-আয়োজন সব শেষ হয়েছে, এখন অতিথিরা এলেই হয়৷ বিশেষত শিবাজির মন পড়ে আছে চন্দ্রগড়ের অতিথিদের দিকে৷ তারা ঘোড়ায় চড়ে কখন আসবে!
বেলা প্রথম প্রহর পার হবার পর পুনার অতিথিরা আসতে আরম্ভ করলেন৷ ন্যাড়া মাথায় বাঁধা-পাগড়ি-পরা ব্রাহ্মণ, কোমরে তলোয়ার-বাঁধা মারাঠা৷ সবাই সভামণ্ডপে গিয়ে বসলেন; আতর গোলাপ মাখলেন৷ সভা গমগম করতে লাগল৷
শিবাজি এবং তাঁর বন্ধুরা অতিথিদের অভ্যর্থনা করছেন, সকলের সঙ্গে মিষ্টালাপ করছেন৷ শিবাজি সদাশিবকে ছাদে পাঠিয়ে দিয়েছেন; যেদিক থেকে চন্দ্রগড়ের অতিথিরা আসবে সদাশিব সেইদিকে চোখ মেলে দাঁড়িয়ে আছে, তাদের আসতে দেখলেই শিবাজিকে গিয়ে খবর দেবে৷ শিবাজিও একটু ফুরসত পেলে ছাদে গিয়ে দেখে আসছেন৷ কিন্তু চন্দ্রগড় দুর্গের অতিথিদের এখনও দেখা নেই৷
বেলা বাড়ছে৷ একদল ব্রাহ্মণ মহোদয় ভোজনে বসলেন৷ চর্ব্যচূষ্য এত খেলেন যে নড়বার ক্ষমতা নেই; কোনোমতে আসন থেকে উঠে ঢেকুর তুলতে তুলতে দক্ষিণা নিয়ে প্রস্থান করলেন৷ তারপর অব্রাহ্মণের দল বসলেন৷ এঁরাও কম নন৷ প্রচণ্ড বেগে চর্ব্যচূষ্য চলতে লাগল৷
কিন্তু শিবাজির মন ক্রমেই উদবিগ্ন হয়ে উঠছে৷ বেলা দুপুর অতীত হয়ে গেছে, এখনও মামা আসে না কেন? সূর্যোদয়ের সময় ঘোড়ায় চড়ে বেরুলে অনেক আগেই পৌঁছোনোর কথা৷ তবে কি মামা আসবে না? যদি না আসে তাহলে এত উদ্যোগ-আয়োজন সব মাটি৷
আরও এক-ঘড়ি কেটে গেল৷ শিবাজি অতিথি-ভোজনের দেখাশোনা করছেন আর মনে মনে ছটফট করছেন এমন সময় দেখতে পেলেন সদাশিব সিঁড়ি দিয়ে হুড়মুড় করে নেমে আসছে৷ দূর থেকে চোখাচোখি হতেই সদাশিব দাঁড়িয়ে পড়ল৷ শিবাজি দেখলেন সদাশিবের চোখ গোল গোল হয়ে আছে, মুখে হাসি নেই৷ তিনি ভুরু তুলে নীরবে প্রশ্ন করলেন, সদাশিব ঘাড় নেড়ে নীরবে উত্তর দিল; কিন্তু তার চোখ গোল হয়ে রইল, মুখে হাসি ফুটল না৷ শিবাজি তখন অতিথিদের এড়িয়ে তার কাছে গেলেন, খাটো গলায় বললেন, 'কী রে!'
সদাশিব চুপিচুপি বলল, 'ওরা আসছে, কিন্তু-'
'কিন্তু কী-?'
সদাশিব বলল, 'তুমি নিজের চোখে দেখবে এসো রাজা৷'
শিবাজি সদাশিবের সঙ্গে ছাদে গেলেন৷ ছাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে কৎরজ ঘাটের দিকে তাকিয়ে তাঁর চক্ষুস্থির৷ মামা বলবন্ত রাও দলবল নিয়ে নেমন্তন্ন খেতে আসছেন বটে, কিন্তু ঘোড়ায় চড়ে নয়৷ লম্বা এক সারি গোরুর গাড়ি আসছে, সবসুদ্ধ বোধ হয় এক-শোখানা গোরুর গাড়ি৷ তাইতে চেপে মামার দল নেমন্তন্ন খেতে আসছে৷
শিবাজি হতাশ চোখে সদাশিবের পানে তাকালেন৷ সদাশিব বলল, 'রাজা, এখন উপায়?'
শিবাজি বললেন, 'উপায় কিছু নেই৷ সব ভেস্তে গেল৷' তিনি ছাদ থেকে নেমে গেলেন৷
সদাশিব একা দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগল৷ উঃ , কী সাংঘাতিক মামা! মতলব বুঝে নিয়েছে! কিন্তু-কোনো উপায় কি নেই? ঘোড়া যে আমাদের চাই! কোনো উপায় কি নেই?
প্রাসাদের সামনে গোরুর গাড়ির সারি এসে দাঁড়িয়েছে৷ শিবাজি মুখে হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন৷ প্রথম গাড়ি থেকে বলবন্ত রাও নামলেন; শিবাজি তাঁর পদবন্দনা করলেন৷ বলবন্ত রাও দাঁত ছিরকুটে হেসে বললেন, 'বেঁচে থাকো বাবা৷ উদ্যোগ-আয়োজন তো ভালোই করেছ, অনেক লোক নেমন্তন্ন করেছ দেখছি!'
শিবাজি বললেন, 'আজ্ঞে৷ আপনি সবাইকে এনেছেন তো?'
বলবন্ত রাও হাত উলটে বললেন, 'সবাইকে আনতে পারলাম কই৷ দুর্গ পাহারা দেবার জন্য এক-শো জোয়ানকে রেখে এসেছি৷'
শিবাজি বললেন, 'দুর্গ পাহারার জন্যে এত লোক রেখে এলেন!'
বলবন্ত রাও বললেন, 'হেঁ হেঁ, তা রাখতে হয় বই কী বাবাজি৷ তুমি নাহয় মায়ের পা ছুঁয়ে দিব্যি করেছ আমার দুর্গের পানে হাত বাড়াবে না, কিন্তু অন্য শত্রু তো আছে-হেঁ হেঁ হেঁ-'
সেয়ানে সেয়ানে কোলাকুলি৷ শিবাজি হেসে বললেন, 'তা বটে৷' তিনি মামাকে এবং তাঁর দলবলকে নিয়ে গিয়ে সভায় বসলেন; আদর আপ্যায়ন আতর গোলাপ চলতে লাগল৷ তারপর মামা অনুচরদের নিয়ে আহারে বসলেন৷ দীয়তাং ভুজ্যতাং আরম্ভ হল৷ শিবাজির মুখ দেখে কেউ ঘুণাক্ষরে তাঁর মনের অবস্থা জানতে পারল না৷
সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়ল৷ চারদিকে হইহই চলেছে, কিন্তু সদাশিব সিঁড়ির ওপর গালে হাত দিয়ে ভাবছে৷ কাজকর্মের দিকে তার মন নেই; আসল কাজই যখন হল না তখন বাজে কাজ করে লাভ কী!
চুপটি করে বসে ভাবতে ভাবতে সদাশিব একবার চিড়িক মেরে উঠল, যেন তার মাথার ভিতর দিয়ে বিদ্যুৎ খেলে গিয়েছে৷ কিছুক্ষণ সে শরীর শক্ত করে বসে রইল, তারপর পা টিপে টিপে নীচে নেমে গেল৷
শিবাজির সঙ্গে তার দেখা হল মহলের একটা নিরিবিলি অংশে৷ সে আস্তে আস্তে বলল, 'রাজা, একটা বুদ্ধি মাথায় এসেছে৷'
শিবাজি চকিতে তার পানে চাইলেন, তারপর তার হাত ধরে আবার ছাদে উঠে গেলেন৷
ছাদ নির্জন৷ সদাশিব শিবাজিকে তার মতলবের কথা বলল৷ শুনে শিবাজির দুই চোখ উত্তেজনায় জ্বলজ্বল করে উঠল৷ তিনি উত্তেজনা দমন করে বললেন, 'দুর্গে কিন্তু এক-শো রক্ষী আছে৷'
সদাশিব বলল, 'রাজা, তুমি আমাকে বাছা বাছা পঞ্চাশটি মাওলা দাও, আমি পারব৷'
শিবাজি সদাশিবের দুই কাঁধে হাত রেখে কম্পিত স্বরে বললেন, 'যদি পারিস সদাশিব, তাহলে-তাহলে কুঙ্কুর সঙ্গে তোর বিয়ে দেব৷'
সূর্যাস্ত হতে দেরি নেই৷ বলবন্ত রাও এবং তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গরা এমন খাওয়া খেয়েছেন যে হাত-পা ঢিলে হয়ে গেছে, আজই গোরুর গাড়ি চড়ে দুর্গে ফিরে যাওয়া অসম্ভব৷ বলবন্ত রাও ঠিক করলেন আজ রাত্রিটা পুনায় বিশ্রাম করে কাল ভোরে দুর্গে ফিরে যাবেন৷
ওদিকে মহলের পিছন দিকে চুপিচুপি যে ব্যাপার ঘটছিল তা কারুর দৃষ্টি আকর্ষণ করল না৷ সদাশিব ঘোড়ায় চড়ে রসুইঘরের বাইরে এসে দাঁড়াল, শিবাজি দু-টি খাবার-ভরা ছালা ঘোড়ার পিঠের দু-দিকে ঝুলিয়ে দিলেন৷ সদাশিব কদম চালে ঘোড়া চালিয়ে চলে গেল, যেন তার কোনোই তাড়া নেই৷
সদাশিব চলে যাবার পর আর একজন ঘোড়সওয়ার এল, শিবাজি তার ঘোড়ার পিঠেও দু-টি খাবারের ছালা ঝুলিয়ে দিলেন, সে চলে গেল৷ তার পরে আর একজন এল৷ এইভাবে পঞ্চাশজন সওয়ার যখন খাবারের ছালা নিয়ে চলে গেল তখন সূর্য অস্ত গিয়েছে৷
শিবাজির মহলের ছাদে দাঁড়িয়ে কেউ যদি কৎরজ ঘাটের দিকে তাকিয়ে থাকত তাহলে দেখতে পেত অশ্বারোহীরা একে একে সেই রাস্তা ধরেছে৷ তাদের গন্তব্য স্থান চন্দ্রগড় দুর্গ৷
পুব দিকে পাহাড়ের আড়াল ছাড়িয়ে পূর্ণিমার চাঁদ উঠল৷ তখন পঞ্চাশজন ঘোড়সওয়ার 'জয় ভবানী' বলে একসঙ্গে ঘোড়া চালাল৷ ঘোড়ার খুরের সমবেত খটাখট শব্দ পাহাড় থেকে পাহাড়ের গায়ে ধাক্কা খেয়ে বেড়াতে লাগল৷
দলের আগে আগে চলেছে সদাশিব৷ বয়স কম বটে, কিন্তু সে এই দলের নায়ক৷ যে কাজ তারা করতে চলেছে তাতে বিপদ আছে, সাহস এবং বুদ্ধি দরকার৷ সদাশিব কাজের কথাই ভাবতে ভাবতে চলেছে, কিন্তু তার বুকের মধ্যে থেকে থেকে চমকে উঠছে শিবাজির কথা-'কুঙ্কুর সঙ্গে তোর বিয়ে দেব৷'
আশ্চর্য মানুষ শিবাজি৷ সত্যি কি মানুষ, না অন্তর্যামী দেবতা৷ নিজের মনের যে কথাটি সদাশিব নিজেই জানত না, তিনি কেমন করে জানলেন?
চন্দ্রগড় দুর্গ থেকে দু-শো গজ দূরে একটা টিলার আড়ালে সদাশিবের দল এসে দাঁড়াল৷ চাঁদ তখন মাথার ওপর উঠেছে, জ্যোৎস্নায় চারদিক ঝিমঝিম করছে৷ দুর্গ থেকে মানুষের সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না, দুর্গটা নিষ্প্রাণ একটা স্তূপের মতন দাঁড়িয়ে আছে৷
সদাশিব ঘোড়া থেকে নামল, অন্য সকলেও নামল৷ সদাশিব কয়েকজনের সঙ্গে চুপিচুপি পরামর্শ করল, তারপর হুকুম দিল, 'সব খাবারের ঝোলা দশটা ঘোড়ার পিঠে চাপাও৷'
নিঃশব্দে কাজ হল; সদাশিব আর দশজন সওয়ার ঘোড়ার পিঠে উঠে বসল, তারপর দুর্গতোরণের দিকে অগ্রসর হল; বাকি চল্লিশজন টিলার আড়ালে লুকিয়ে রইল৷
দুর্গের তোরণদ্বার বন্ধ৷ সদাশিবের দল তোরণের সামনে গিয়ে দাঁড়াল, সদাশিব মুখ উঁচু করে হাঁক দিল, 'হো ফাটকদার হো!'
কিছুক্ষণ পরে তোরণের ডগার ওপর থেকে কয়েকটি মুণ্ডু উঁকি মারল, একজন ভারী গলায় বলল, 'কে তোমরা?'
সদাশিব বলল, 'আমরা শিবাজির লোক, পুনা থেকে আসছি৷'
প্রশ্ন হল, 'কী চাও?'
সদাশিব বলল, 'বলবন্ত রাও পুনায় পৌঁছেছেন, কিন্তু নিমন্ত্রিতদের মধ্যে এক-শো জন পুনায় যায়নি, তাই শিবাজি তাদের জন্যে খাবার পাঠিয়েছেন৷ আমরা খাবার এনেছি৷'
কিছুক্ষণ চুপচাপ৷ তারপর তোরণশীর্ষ থেকে আবার প্রশ্ন হল, 'তোমরা ক-জন?'
'এগারোজন৷ ফাটক খুলে দাও৷'
মুণ্ডুগুলি অদৃশ্য হয়ে গেল৷ তোরণরক্ষীরা বোধ হয় নিজেদের মধ্যে শলাপরামর্শ করছে৷ খানিক পরে আবার মুণ্ডুগুলি উঁকি মারল, আওয়াজ হল, 'তোরণ খোলবার হুকুম নেই৷ আমরা দড়ি ফেলছি, দড়িতে খাবার বেঁধে দাও৷'
সদাশিব হেসে উঠল, 'এত ভয়! আচ্ছা, দড়ি ফেলো, খাবারের ছালা বেঁধে দিচ্ছি!'
কয়েকটি দড়ি তোরণের মাথা থেকে নেমে এল; সদাশিবের দল খাবারের ছালাগুলি দড়িতে বেঁধে দিতে লাগল৷ কিছুক্ষণের মধ্যে ছালাগুলি দড়ির সাহায্যে দুর্গের মাথায় অদৃশ্য হয়ে গেল৷
সদাশিব বলল, 'আচ্ছা, তাহলে চললাম৷ তোমরা তো দুর্গে ঢুকতে দিলে না, পুনায় ফিরে যাই৷'
ওপর থেকে সাড়াশব্দ এল না৷ সদাশিব তার সঙ্গীদের নিয়ে ঘোড়ার খুরের আওয়াজে চারদিকে প্রতিধ্বনি তুলে চলে গেল৷ দুর্গের রক্ষীরা শুনল অনেক দূরে গিয়ে খুরের শব্দ মিলিয়ে গেল৷ তারা জানতে পারল না যে সদাশিবের দল টিলার পিছনে গিয়ে বাকি চলি×শজনের সঙ্গে যোগ দিয়েছে৷
দলে ফিরে গিয়ে সদাশিব সকলকে নিজের কাছে ডাকল৷ সবাই ঘোড়া ছেড়ে দিয়ে তাকে ঘিরে দাঁড়াল৷ সদাশিব তখন সকলকে আসল কথা বলল; কাকে কী করতে হবে, কীভাবে কাজ করতে হবে, সব বুঝিয়ে দিল৷ চাঁদের আলোয় পঞ্চাশজন জোয়ানের চোখ উৎসাহে চকচক করে উঠল৷ জয় ভবানী! এই তো জীবন৷
তারপর আরম্ভ হল দীর্ঘ প্রতীক্ষা৷ এখনও সময় হয়নি৷
এক-ঘড়ি কেটে গেল৷ চারদিক নিস্তব্ধ, দুর্গ থেকে কোনো শব্দ আসছে না৷ কদাচিৎ নিশাচর পাখি মাথার ওপর দিয়ে চ্যাঁ-চ্যাঁ শব্দ করে উড়ে চলে যাচ্ছে৷ একবার একদল শেয়াল টিলার পাশ দিয়ে যেতে যেতে হঠাৎ অনেকগুলো মানুষকে বসে থাকতে দেখে ক্যা হুয়া ক্যা হুয়া করে ছুটে পালাল৷
দু-ঘড়ি কেটে গেল৷ চাঁদ দুর্গের পরপারে ঢলে পড়ল; দুর্গের প্রকাণ্ড ছায়া সামনের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল৷
তারপর দুর্গের ছায়া যখন টিলার গায়ে এসে লাগল তখন সদাশিব উঠে দাঁড়িয়ে হাত তুলে ইশারা করল৷ সবাই উঠে দাঁড়াল, ঘোড়ার পিঠ থেকে লম্বা দড়ি নিয়ে কোমরে জড়িয়ে নিল, তলোয়ার আঁট করে বাঁধল৷ সদাশিব বলল, 'আমি আগে যাচ্ছি, তোমরা একে একে আমার পিছনে এসো৷'
একে একে তারা দুর্গের ছায়ার মধ্যে মিলিয়ে গেল; কেবল ঘোড়াগুলো টিলার আড়ালে দাঁড়িয়ে রইল৷ দুর্গচ্ছায়ার অন্ধকারে মানুষ দেখা যায় না, প্রাকারের ওপর থেকে যদি কেউ এদিকে তাকায় কিছুই দেখতে পাবে না৷
সদাশিব কিন্তু তোরণের দিকে গেল না৷ উলটো দিকে চলল৷ সুপুরির বস্তা নিয়ে যেদিন নেমন্তন্ন করতে এসেছিল সেদিন সে দুর্গের অন্দর-বাহির সব ভালো করে দেখে নিয়েছে, প্রাকারের গায়ে কোথায় কী আছে সে জানে৷
দুর্গ-প্রাকারের গা ঘেঁষে তারা চলল৷ প্রাকার চাকার মতন গোল, বিশ-বাইশ হাত উঁচু৷ সদাশিব আগে আগে যাচ্ছে আর মাঝে মাঝে ঘাড় তুলে দেখছে৷ একজায়গায় এসে সে থামল৷
পনেরো-ষোলো হাত উঁচুতে প্রাকারের গায়ে গাছ গজিয়েছে৷ বেশি বড়ো নয়৷ কিন্তু পাথরের খাঁজে শিকড় গেড়ে শক্তভাবে প্রাকারকে আঁকড়ে আছে৷
সদাশিবের ঠিক পিছনে যে লোকটি ছিল তার নাম গজানন৷ সদাশিব ফিসফিস করে তার সঙ্গে কথা বলল; গজানন নিজের কোমর থেকে দড়ি খুলে সদাশিবকে দিল৷ সদাশিব দড়ি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ওপর দিকে ছুড়ে দিল৷ দু-তিন বার ছোড়ার পর দড়ির আগা গাছের গায়ে আটকে গেল৷
তখন ভবানীর নাম স্মরণ করে সদাশিব দড়ি ধরে ধরে ওপরে উঠে গেল৷ সে গাছের ওপর পৌঁছোতেই গজাননও দড়ি ধরে উঠে এল৷ প্রাকারের গায়ে গাছের ডাল ধরে দাঁড়িয়ে আর একবার চুপিচুপি পরামর্শ হল৷ এখান থেকে প্রাকারের মাথা বেশি দূর নয়, কিন্তু হাতের নাগালের বাইরে৷ গজানন লম্বা মানুষ, সে গাছের ডালে পা রেখে প্রাকারে ভর দিয়ে দাঁড়াল, সদাশিব সাবধানে তার কাঁধে উঠল, উঁচু দিকে হাত বাড়াল; কিন্তু তবু প্রাকারের কিনারার নাগাল পেল না৷ আর একটু বাকি, আধ হাতেরও কম৷ সদাশিব তখন গজাননের মাথায় পা দিয়ে ডিঙি মেরে উপর দিকে হাত বাড়াল৷ এবার প্রাকারের কিনারা তার নাগালের মধ্যে এসেছে৷
দুই বাহুর বলে শরীরটাকে ওপর দিকে টেনে তুলে সদাশিব প্রাকারের ওপর উঠে বসল৷
প্রাকারের ওপরে বসে সদাশিব সন্তর্পণে চার দিকে চাইল, কোথাও মানুষ নেই৷ কান খাড়া করে শুনল, আস্তাবলের দিক থেকে মাঝে মাঝে ঘোড়ার খুরের খটখট শব্দ আসছে৷ অন্য কোনো শব্দ নেই৷
সদাশিব তখন নীচের দিকে মুখ বাড়িয়ে হাত নেড়ে ইশারা করল; নিজের কোমর থেকে দড়ি খুলে নীচে ঝুলিয়ে দিল৷ অল্পক্ষণের মধ্যে সদাশিবের অনুচরেরা একে একে দড়ি ধরে ওপরে উঠে এল৷ দুর্গের কেউ জানতে পারল না৷
পশ্চিম আকাশে চাঁদের মুখ ম্লান হয়ে গিয়েছে, চাঁদ অস্ত যেতে বেশি দেরি নেই৷ তবে একটা সুবিধা এই যে চাঁদ অস্ত যাবার প্রায় সঙ্গেসঙ্গে সূর্যোদয় হবে৷
সদাশিব সঙ্গীদের বলল, 'এইবার আসল কাজ আরম্ভ৷ তোমরা এখানে বসে থাকো, আমি চট করে একবার দুর্গের হালচাল দেখে আসি৷'
কোমর থেকে তলোয়ার বের করে সদাশিব হাতে নিল, তারপর ছায়ার মতন নিঃশব্দে অদৃশ্য হয়ে গেল৷
সঙ্গীরা বসে রইল, নড়নচড়ন নেই৷ অস্তমান চাঁদের আবছায়া আলোয় তাদের দেখে বোঝা যায় না এতগুলো মানুষ পাশাপাশি বসে আছে, মনে হয় একসারি কলসী প্রাকারের আলসের ধারে সাজানো রয়েছে৷
সে রাত্রে দুর্গের লোকেরা যখন অনেক খাবার পেল তখন তাদের মনে একটু সন্দেহ হয়েছিল; কী জানি শিবাজি যদি খাবারে বিষ মিশিয়ে দিয়ে থাকে৷ কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা লোভ সামলাতে পারেনি৷ এত ভালো খাবার তারা অনেকদিন খায়নি৷ একটু একটু করে চাখতে চাখতে তারা শেষ বরাবর সমস্ত খাবার সাবাড় করে দিয়েছিল৷
খাবারে অবশ্য বিষ-টিষ কিছু ছিল না৷ কিন্তু গুরুভোজন করলে শরীরে আলস্য আসে; ওরা পেট ভরে খেয়ে কিছুক্ষণ নিজেদের মধ্যে গালগল্প করেছিল, তারপর হাই তুলতে তুলতে ঘুমিয়ে পড়েছিল৷
সদাশিব পরিদর্শন করে ফিরে এসে সঙ্গীদের বলল, 'সবাই ঘুমোচ্ছে, কেউ জেগে নেই৷ এখন কী করতে হবে শোনো৷ বেশির ভাগ লোক যে-যার কুঠুরিতে শুয়ে ঘুমোচ্ছে; আর দুর্গের মাঝখানে 'ওটা'*র ওপর শুয়ে ঘুমোচ্ছে পঁচিশ-ত্রিশ জন৷ গজানন, তোমরা বিশজন ওটায় গিয়ে তাদের ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকো, যদি কারুর ঘুম ভাঙে, দেখো যেন সে চিৎকার করতে না পারে৷ টিকারাম, তুমি দশজন লোক নিয়ে যাও, কুঠুরিগুলোর বাইরে থেকে দোরের শিকল তুলে দাও, যারা ভেতরে আছে তারা যেন বেরোতে না পারে৷ আমি বাকি লোক নিয়ে যাচ্ছি দুর্গের তোরণ খুলে দিতে৷ হুঁশিয়ার, নিঃশব্দে কাজ হওয়া চাই৷ সবাই তলোয়ার বার করো৷'
তলোয়ার হাতে নিয়ে তিন দল তিন দিকে চলল৷ কারোর মুখে কথা নেই, কারোর পায়ে শব্দ নেই; যেন ছায়াবাজির খেলা৷
সদাশিব তার দল নিয়ে তোরণে গিয়ে দেখল চারজন তোরণ-প্রহরী কপাটে ঠেস দিয়ে দিব্যি আরামে ঘুমোচ্ছে৷ তারা মধ্যরাত্রি পর্যন্ত জেগে ছিল; কিন্তু শিবাজির দল পুনায় ফিরে গিয়েছে, অন্য কোনো শত্রুও কাছাকাছি নেই, সুতরাং জেগে থাকার কোনো মানে হয় না; তাই তারা নিশ্চিন্ত মনে ঘুমিয়ে পড়েছিল৷
মুহূর্তমধ্যে চারজন প্রহরীর মুখ এবং হাত-পা বেঁধে ফেলা হল৷ তারা একটা কথাও বলতে পারল না, কেবল ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল৷ তাদের এক পাশে শুইয়ে রেখে সদাশিবের দল দুর্গের কপাট খুলতে আরম্ভ করল৷ প্রকাণ্ড ভারী হুড়কো খুলে আস্তে আস্তে কপাট খুলতে হবে৷ বেশি শব্দ করা চলবে না, কপাট খোলার ঘড়ঘড় শব্দে ঘুমন্ত ব্যক্তিদের ঘুম ভেঙে যেতে পারে৷
শেষ পর্যন্ত কপাট খুলল৷ বেশি শব্দ হল না৷
তবু, ওটায় যারা শুয়ে ছিল তাদের মধ্যে একজনের ঘুম ভেঙে গিয়েছিল৷ সে চোখ রগড়ে উঠে বসল, সঙ্গেসঙ্গে তার বুকে তলোয়ারের নখ বিঁধল, কানের কাছে শব্দ হল-'চুপ! কথা বলেছ কি মরেছ৷' লোকটা কিছুক্ষণ হাঁ করে রইল, তারপর আবার শুয়ে পড়ল৷
যন্ত্রের মতন কাজ হচ্ছে, শব্দহীন যন্ত্র৷ যারা কুঠুরিগুলো বন্ধ করতে গিয়েছিল তারা সমস্ত কুঠুরির দোরে শিকল তুলে দিয়েছে, ভিতরে যারা ছিল তারা জানতেও পারেনি৷ তাদের যখন ঘুম ভাঙবে, তারা যখন বাইরে আসতে চাইবে তখন দেখবে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ৷
তোরণদ্বার খুলে দিয়ে সদাশিব সেখানে পাঁচজন পাহারাদার দাঁড় করিয়ে বাকি লোকজন নিয়ে আস্তাবলের দিকে চলল৷ এবার আসল কাজ, ঘোড়া পাচার করতে হবে৷
ওদিক থেকে টিকারামের দল কাজ শেষ করে আস্তাবলে হাজির হয়েছে৷ কেবল গজাননের দল ওটার ওপর ঘুমন্ত লোকগুলোকে আগলে আছে৷
প্রকাণ্ড ছাউনির মতন আস্তাবল৷ তাতে দু-হাজার ঘোড়া৷ ঘেরা জায়গায় ঘোড়াগুলো ছাড়া রয়েছে; কেউ বসে আছে, কেউ বা দাঁড়িয়ে আছে৷ মানুষ দেখে তাদের মধ্যে কেউ কেউ গলার মধ্যে মিহি সুরে চিঁহিঁহিঁ করল৷
অবিলম্বে কাজ আরম্ভ হয়ে গেল৷ সদাশিব দাঁড়িয়ে তদারক করতে লাগল, বাকি লোক প্রত্যেকে দুটো ঘোড়ার গলায় দড়ি পরিয়ে দুর্গের বাইরে রেখে ফিরে আসতে লাগল৷ এ কাজ অবশ্য নিঃশব্দে হয় না; ঘোড়ার খুরের শব্দ বন্ধ করা অসম্ভব৷ ওটায় যারা ঘুমোচ্ছিল তারা জেগে উঠল৷ কিন্তু তারা নিরস্ত্র, তাদের ঘিরে খোলা তলোয়ার হাতে শত্রু দাঁড়িয়ে আছে৷ এ অবস্থায় বুক চাপড়ানো ছাড়া আর কিছু করবার নেই৷ যারা কুঠুরির মধ্যে বন্ধ হয়েছিল তারা দোরে ধাক্কা দিয়ে চেঁচামেচি করছিল৷ কিন্তু বেরোবে কী করে?
দু-হাজার ঘোড়া চন্দ্রগড় দুর্গের বাইরে চালান দিয়ে সদাশিবের দল যখন দুর্গ থেকে বেরোল তখন পুবের আকাশ ফরসা হয়ে গেছে৷
টিলার কাছে ফিরে গিয়ে তারা নিজের নিজের ঘোড়ায় চড়ল, তারপর চোরাই ঘোড়াগুলোকে ঘিরে পুনার দিকে তাড়িয়ে নিয়ে চলল৷
সদাশিব বুক-ভরা আনন্দ নিয়ে ভাবতে লাগল-শিবাজি যে কাজের ভার দিয়েছিলেন তা সিদ্ধ হয়েছে; তাঁর শপথ ভঙ্গ হয়নি, এক ফোঁটা রক্তপাত হয়নি, অথচ কাজ হাসিল হয়েছে৷ জয় মা ভবানী! শিবাজি দু-হাজার ঘোড়া পেয়ে নিশ্চয় খুব খুশি হবেন৷ আর কুঙ্কু-
কিছু দূর চলবার পর সূর্যোদয় হল৷ সদাশিব গজাননকে বলল, 'মামা বলবন্ত রাও এতক্ষণে পুনা থেকে যাত্রা করেছেন৷ তিনি এই পথেই ফিরবেন; তাঁর সঙ্গে আমাদের দেখা-সাক্ষাৎ বাঞ্ছনীয় নয়৷ এসো, আমরা অন্য রাস্তা ধরি৷'
পুনায় যাবার সিধা রাস্তা ছেড়ে তারা বাঁ-দিকে মোড় ঘুরল৷ এদিকে একটা সরু উপত্যকা আছে৷ সেদিক দিয়ে গেলে পুনায় পৌঁছোতে দেরি হবে বটে, কিন্তু মামার দলের সঙ্গে দেখা হওয়ার ভয় নেই৷ মামা সিধা পথেই দুর্গে ফিরবেন৷ তারপর তাঁর কী অবস্থা হবে তা না ভাবাই ভালো৷
পুনায় মহলের ছাদে উঠে শিবাজি একলা পায়চারি করছেন৷ তাঁর কপালে উদবেগের ভ্রূকুটি৷ দিন শেষ হয়ে এল, এখনও সদাশিবের দেখা নেই৷
তানাজি এসে শিবাজির সঙ্গে যোগ দিলেন৷ শিবাজির মুখ দেখে বললেন, 'ভাবছ কেন? সদাশিব খলিফা ছেলে, সে কাজ ফতে না করে ফিরবে না৷'
শিবাজি বললেন, 'তা তো জানি৷ আজ পর্যন্ত কোনো কাজে সে নিষ্ফল হয়নি৷ কিন্তু হাজার হোক ছেলেমানুষ তো-'
মা জিজাবাই ছাদে এলেন, সঙ্গে কুঙ্কু৷ জিজাবাই বললেন, 'কোথায় পাঠালি তুই ছেলেটাকে! বলেছিলি আজ বেলা দুপুরের আগেই ফিরবে৷ তা এখনও ফিরল না৷'
শিবাজি বললেন, 'সূর্যাস্তের আগে যদি সদাশিব না ফেরে, আমাকে দলবল নিয়ে বেরোতে হবে৷'
কৎরজ ঘাটের দিকে কারোর নজর ছিল না; এই সময় কুঙ্কু আঙুল তুলে সেই দিকে দেখাল৷ সে সকলের আগে দেখতে পেয়েছে৷
সকলে একসঙ্গে সেই দিকে ফিরলেন৷ দেখলেন কৎরজ ঘাটের সংকীর্ণ ঢালু সংকটপথে পিলপিল করে ঘোড়ার পাল নেমে আসছে৷ দূর থেকে মনে হচ্ছে যেন প্রকাণ্ড একপাল ভেড়া৷
তানাজি নাচতে শুরু করে দিলেন-'দু-হাজার ঘোড়া! দু-হাজার ঘোড়া! জয় ভবানী৷'
শিবাজি দু-হাত তুলে লাফিয়ে উঠলেন-'পেরেছে-সদাশিব পেরেছে৷ মা, তোমার কোলের ছেলেটা সবাইকে হারিয়ে দিয়েছে৷'
তানাজির হাত ধরে তাড়াতাড়ি সিঁড়ির দিকে যেতে যেতে শিবাজি ফিরে দাঁড়ালেন, বললেন, 'মা, কুঙ্কুর জন্যে আমি পাত্র ঠিক করেছি৷ ওকে জিজ্ঞেস করো সদাশিবকে ওর পছন্দ কি না৷'
এই বলে একটু হেসে শিবাজি সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেলেন৷
আশ্বিন ১৩৬৯

* ওটা-উঠোন
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন