অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়
আমাদের পাড়াতে এক বুড়ি ছিল-আর তার ছিল অনেক টাকা৷ রাজ্যের যত চোর তারা বুড়ির টাকা চুরি করবার জন্য না করেছে এমন কিছু নেই৷ কিন্তু সেয়ানা বুড়ির টাকায় হাত দেয় এমন সাধ্য কারও হয়নি৷ সে দেশের সব চোরই দু-একবার চেষ্টা করে নাকালের একশেষ হয়ে জেল খেটেছে, অথবা কোনোমতে পালিয়ে বাড়ি ফিরেছে৷
বুড়ি সেকেলে মানুষ, ব্যাঙ্কে টাকা রাখা সে মোটেই পছন্দ করত না৷ আর তা ছাড়া নিত্য টাকাগুলিকে নেড়ে নেড়ে যে সুখ তা তো আর ব্যাঙ্কে রাখলে হবার জো নেই৷ তাই সে নিজের শোবার ঘরেই টাকাগুলিকে লুকিয়ে রাখত৷ কোথায় রাখত কেউ জানত না৷
সংসারে বুড়ির এক নাতি ছাড়া আর কেউ ছিল না৷ নাতিকে সে আদর করত খুবই, কিন্তু পয়সা খরচ করবার বেলা নাতিকে সে একটুও প্রশ্রয় দিত না৷
যাক, সুখে দুঃখে এমনি করে তাদের দিন কাটছিল৷ একে বুড়ি তাতে অনেক টাকার মালিক; কাজেই বুড়ির রাত্রে ঘুম হত না৷ বয়সের দোষে রাত্রে একটু চোখেও দেখত কম৷ কিন্তু নাতির কাঁচা চোখের দৃষ্টিতে সে অভাব পুষিয়ে নিত৷ এমনি করে চোরের আশায় ছাই দিয়ে তাদের দিন একরকম কেটে যাচ্ছিল৷
এমনি সময় সে-দেশে ধাড়িওয়াল থেকে এক দাড়িওয়ালা প্রবীণ চোর এসে হাজির হল-বুড়ির টাকার লোভে৷ সে-দেশে পৌঁছেই সে ওখানকার সমস্ত চোরদের এক গোপন সভায় নিমন্ত্রণ করল এবং এক-এক করে সবাইয়ের নাকাল হওয়ার কাহিনি শুনে নিল৷
পরের দিন বুড়ির বাড়ি এক সন্ন্যাসী এসে হাজির হল-সর্বাঙ্গে তার বিভূতি মাখা, মাথায় প্রকাণ্ড জটা, হাতে কমণ্ডলু আর মুখে ঘন ঘন রাম নাম৷
চতুর বুড়ি বাইরের লোক কাকেও বিশ্বাস করত না-সে সন্ন্যাসীই হউক আর যেই হউক৷ সন্ন্যাসী বাড়ির ভিতর ঢুকতে যাচ্ছে এমন সময় বুড়ি চেঁচিয়ে বলল, 'বাড়ির ভিতর ঢুকো না ঠাকুর-ওখানেই দাঁড়াও, ভিক্ষে দিয়ে দিচ্ছি৷' সন্ন্যাসী থমকে দাঁড়িয়ে গেল৷ বুড়ি নাতিকে বলল, 'চারটি চাল দিয়ে দে তো৷' নাতি চাল দিতে গেল৷ সন্ন্যাসী তার মুখের দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল, 'তোমাদের বাড়িতে বুঝি খুব চোরের উপদ্রব? নেও, একটি মাদুলি তোমাকে দিলাম৷ হাতে করে রেখো, চোরের ভয় কেটে যাবে৷' এই বলে একটি তামার মাদুলি সে নাতিটির হাতে দিল৷ কথাগুলি বুড়ির কানে যেতেই সে উঠে এসে বলল, 'কী বললে বাবা, চোরের মাদুলি! তা ওতে আমাদের দরকার নেই, ফিরিয়ে নিয়ে যাও৷' বুড়ির কথা শুনে সন্ন্যাসী হেসে বলল, 'আমার কথা তোর বিশ্বাস হচ্ছে না বুঝি! তবে এই দেখ!' বলেই নাতির হাতের মাদুলিটা এক বার হাতে করে আবার তার হাতে ফিরিয়ে দিল-দেখা গেল তামার মাদুলিটা সোনার হয়ে গেছে৷ এবার বুড়ির সন্ন্যাসীর উপর কিছু ভক্তি হল৷ তার নাতি তো ভক্তিতে একেবারে গলে জল৷ সে সন্ন্যাসীর সঙ্গে গল্প জমিয়ে তুলল এবং নিজেদের প্রতিদিনকার সব সুখদুঃখের খবর দিয়ে সন্ন্যাসীর কাছে তামা থেকে সোনা করবার কায়দাটা জেনে নেবার জন্যে অনেক কাকুতিমিনতি করতে লাগল৷ সন্ন্যাসী বলল, 'আমি তোকে মন্ত্র দেব, আর সোনা করবার কৌশলটাও শিখিয়ে দেব; কিন্তু আজ নয়, ঠিক এক মাস পর আসব৷' এই বলে সন্ন্যাসী ভিক্ষা নিয়ে প্রস্থান করল৷ কয়দিন কেটে গেল৷ নাতিটি সন্ন্যাসীর অনেক খোঁজ করেও তাকে আর পেল না৷
সাত দিন পরের কথা৷ শহরে এক সার্কাসের দল এসেছে এবং তারা খেলাও দেখাচ্ছে অতি চমৎকার৷ শহরের ছেলে বুড়ো সার্কাস দেখতে দলে দলে হাজির৷ দিনে তিন বার করে খেলা দেখানো হয় কিন্তু প্রত্যেকবারই বসবার জায়গা সব ভরে যায়! এমন সার্কাস কেউ দেখেনি-শহরে একটা হইচই পড়ে গেছে৷
বুড়ির নাতি বুড়িকে ধরে পড়ল সার্কাস দেখতে যাবে৷ চার আনা পয়সা লাগবে, কিন্তু বুড়ির কাছে তো অনেক পয়সা, সে কিছুতেই দেবে না৷ অনেক সাধ্যসাধনার পর ঠিক হল- চার আনা পয়সা বুড়ি দেবে বটে, কিন্তু নাতিটিকে সার্কাস দেখে সন্ধ্যার আগেই ফিরতে হবে৷ নাতিটি তাতেই রাজি হয়ে তিনটার খেলা দেখতে বেরিয়ে পড়ল৷
তিনটার বড়ো বেশি বাকি ছিল না, নাতিটি হনহন করে হেঁটে চলেছে; এমন সময় সার্কাসের তাঁবুর দিকে রাস্তার একটা মোড় ফিরেই দেখে সেই সন্ন্যাসীটি একেবারে সামনে দাঁড়িয়ে৷ নাতিটি তাকে দেখেই ভক্তিভরে প্রণাম করে বলল, 'বাবা, আজ আমি সার্কাস দেখতে যাচ্ছি, কাল অবশ্য দয়া করে কি আমাদের বাড়ি একবার যাবেন না?' সন্ন্যাসী রাজি হয়ে ভিড়ের মধ্যে মিলিয়ে গেল৷
বুড়ির নাতি অনেক ঠেলেঠুলে টিকিট ঘরের কাছে গিয়ে শুনল সব 'সিট' ভরতি হয়ে গেছে, ৬টার খেলা ছাড়া আর উপায় নাই৷ বুড়ির মেজাজমর্জি তার জানা ছিল; সে ভাবল আজ না দেখে গেলে তার ভাগ্যে আর সার্কাস দেখা হবে না৷ তাই সে ৬টার খেলার জন্য অপেক্ষা করতে লাগল৷
৬টা বেজে গেল, ৬.৩০টাও বাজল, ক্রমে ৭টা হল-শীতের রাত্রি, চারিদিকে অন্ধকার ঘনিয়ে এল, অথচ নাতির দেখা নাই৷ বুড়ি নিতান্ত চঞ্চল হয়ে টাকার হাঁড়িটি আঁচলের তলায় করে বসে রইল, নাতির ফিরবার অপেক্ষায়৷ খানিকক্ষণ যায়, এমন সময় দরজায় কড়া নড়ে উঠল এবং সঙ্গেসঙ্গে ঠিক নাতির গলার স্বরে ডাক এল, 'ঠাকুরমা দরজা খোলো, ঠাকুরমা দরজা খোলো৷' ঠাকুরমা বকতে বকতে উঠে দোর খুলে দিলেন-আর মাথা নীচু করে তার বেঁটে নাতিটি বাড়ির ভিতর ঢুকে পড়ল৷ বুড়ি ভালো করে দরজা এঁটে দিয়ে নাতিকে নিয়ে ঘরে এল৷ কিন্তু যাকে নিয়ে এল সে বুড়ির নাতি মোটেই নয়-রাতকানা বুড়ি গলার স্বর শুনেই তাকে নাতি বলে ভেবেছে৷ কান-মাথা ঢাকবার ছলে নকল নাতিটি তার লম্বা লম্বা দাড়িগুলিও কাপড় দিয়ে জড়িয়েছে, বুড়ি তা ধরতে পারে নাই৷ নকল নাতি আসল নাতির গলার স্বর অনুকরণ করে বলল, 'ঠাকুরমা, বড়ো খিদে পেয়েছে, শিগগির ভাত দাও৷' বুড়ি এক ধমক দিয়ে খেঁকিয়ে উঠল, 'পোড়ারমুখো, এত দেরি করে বাড়ি ফিরলি! আমি টাকা আগলাব না ভাত রাঁধব? নে, টাকার হাঁড়িটা নিয়ে সাবধানে বসে থাক, ঘুমিয়ে পড়িস না যেন৷ আমি দু-টি ভাত ফুটিয়ে আনি৷' এই বলে বুড়ি টাকার হাঁড়িটি নকল নাতির হাতে দিয়ে ভাত রাঁধতে রান্নাঘরে চলে গেল৷
ঘরে লোহার সিন্ধুক রয়েছে৷ নকল নাতিটি মনে করেছিল-টাকাপয়সা সব তাতেই থাকে৷ কিন্তু এমনি করে টাকার হাঁড়িটি হাতে পেয়ে প্রথমত সে আনন্দে একেবারে হতভম্ব হয়ে পড়ল৷ তারপর পা টিপে টিপে বাইরে এসে দেয়াল টপকে গলির ভিতর নেমে পড়ে চলতে লাগল৷ সদর দরজা খুলে গেল না, পাছে হুঁশিয়ার বুড়ি টের পায়৷ এদিকে ঠিক সেই সময় গাছের ছায়ার অন্ধকারে একজন পুলিশ দাঁড়িয়ে ছিল৷ সে দেখল বুড়ির বাড়ি থেকে দেয়াল টপকে একটা কালো দাড়িওয়ালা লোক একটা হাঁড়ি নিয়ে নেমে এল৷ পুলিশ তার পিছু নিল-তার সন্দেহ রইল না যে দাড়িওয়ালা হাঁড়িওয়ালা নিশ্চয় চোর৷
চোর ভাবল, বিধি আজ তার প্রতি সুপ্রসন্ন-আজ এই শুভরাত্রে সুযোগ নিয়ে সে যতগুলি বাড়িতে পারে চুরি করে রাতারাতি বড়োলোক হবে৷ মনের আনন্দে সে দুই-তিনটা গলি পেরিয়ে গিয়ে আর একটা বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল এবং হাঁড়িটা রাস্তার এক পাশে একটা ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে রেখে বাড়ির ভিতর ঢুকে পড়ল৷
এদিকে পুলিশ ভায়া গোঁফ মুচড়ে হাতে খইনি টিপছে আর গলির মুখে ওত পেতে বসে আছে-'বমাল' চোর ধরবার আশায়৷ সেও ভাবছে, আজ রাত্রের চোর ধরার সফলতায় তার বরাত ফিরে যাবে৷ মুহূর্তে তার মনে কত কথাই না খেলে যেতে লাগল-তার মাইনে বাড়বে, ইনাম পাবে, আরও কত কী!
এদিকে সার্কাস শেষ হয়েছে৷ বুড়ির নাতি আলোয়ান মুড়ি দিয়ে পথে বাড়ি ফিরছে৷ হঠাৎ তার কাশি আসায় থুথু ফেলতে গিয়ে দেখে ঝোপের আড়ালে ঠিক তার ঠাকুরমার টাকার হাঁড়ির মতো একটা হাঁড়ি৷ বুড়িরই তো নাতি! সে আস্তে আস্তে হাঁড়িটি খুলে দেখে, সেটিকে তুলে আলোয়ানের তলায় করে পুলিশের সামনে দিয়েই বাড়ির দিকে চলে গেল৷ খানিক পরেই বাড়ির ভিতরে একটা শোরগোল উঠল 'চোর'-'চোর'-'চোর', এবং নিমেষ মধ্যে সেই দাড়িওয়ালা চোর রাস্তায় ছুটে বেরিয়ে এল৷ কাছেই গলির পাশে আর একটা মুখ-ঢাকা হাঁড়ি পড়ে ছিল, চোর তাড়াতাড়ি সেটাকেই মাথায় করে দে ছুট!
পুলিশ ভায়া তৈরিই ছিল৷ চোর গলির মোড়ে আসতেই সে তার প্রকাণ্ড শরীরটা দিয়ে গলি আটকে চোরকে সাপটে ধরে ফেলল৷ তার পর হাঁড়ি সমেত হিড়হিড় করে তাকে টেনে থানায় নিয়ে গেল৷
তখনও রাত্রি আটটা হয়নি৷ থানার ঘরে ইনস্পেকটর সাহেব, দারোগা প্রভৃতি সব কর্মচারীই আছেন৷ এমন সময় পুলিশ ভায়া 'বমাল' চোর নিয়ে হাজির হল৷ থানার ডাইরিতে চোর ধরার সব বিবরণ লেখা শেষ করে ইনস্পেকটর, দারোগা প্রভৃতি সবাই এগিয়ে এলেন চোরাই মাল দেখতে৷ হাঁড়ির ঢাকনা খোলা হল, কিন্তু খুলতেই কী একটা বিকট তীব্র দুর্গন্ধ বের হল হাঁড়ির ভিতর থেকে৷ ভিতরের জিনিস ঢেলে ফেলা হল৷ তা থেকে বেরোল-টাকা নয়, পয়সা নয়, সোনা নয়, গয়না নয়, কতকগুলি পুরানো চাল ও একটা প্রকাণ্ড পচা ইঁদুর-গায়ে থুকথুকে পোকাপড়া৷
তদন্তের জন্য বুড়ির নাতিকে থানায় ডাকা হল৷ সে থানায় এসে চোরকে দেখে এক প্রণাম করে বলল, 'সন্ন্যাসী ঠাকুর, আপনি এখানে যে?'
বাকিটুকু আর সবিস্তারে বলে কাজ নেই৷ শুধু এইটুকু বললেই যথেষ্ট যে, পচা ইঁদুর চুরির জন্য ধাড়িওয়ালের দাড়িওয়ালা চোরের জেল হয়নি বটে, তবে থানা থেকে পেট ভরে কিল গুঁতো লাথি খেয়ে, সে সেদিনই দাড়ি কামিয়ে ধাড়িওয়াল চলে গিয়েছিল-যাবার সময় আমাদের দেশের চোরদের সঙ্গে আর দেখাও করেনি৷
কার্তিক ১৩৩৯

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন