অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়
এক রাজার ছিল দুই পালোয়ান, 'দুড়ুমপটাশ সিং' আর 'হুড়ুকবাজ সিং'৷
দুড়ুমপটাশ সিং সাড়ে পাঁচ হাত লম্বা, আর জোয়ানও তেমনি৷ সে একদিন রাজার আস্তাবলে হেঁচে ফেলেছিল, সেই হাঁচির চোটে রাজার পক্ষীরাজ ঘোড়া পাঁচ মাইল দূরে ঠিকরে পড়ে মারা গেল৷
হুড়ুকবাজ সিং ছিল মোটে তিন হাত লম্বা, কিন্তু তার মাথার পাগড়িটা ছিল সাত হাত উঁচু, আর তার বর্শাখানি ছিল একটি আস্ত বাঁশ৷ আর সে কথা কইত ভারি লম্বা-চওড়া৷ আর আর পালোয়ানরা বলছিল, তারা ভারী ভারী জোয়ানের সঙ্গে কুস্তি লড়েছে, তা শুনে অমনি হুড়ুকবাজ বলে উঠল, 'মানুষের সঙ্গে কুস্তি লড়া তো ভারি একটা কথা! তোরা কেউ ভূতের সঙ্গে কুস্তি লড়েছিস?'

পালোয়ানরা তা শুনে বড়োই বোকা বনে গেল-তাদের কেউ কখনো ভূতের সঙ্গে কুস্তি লড়েনি! তা শুনে হুড়ুকবাজ বলল, তবে শোন৷-
'আগে আমি ছ-হাত উঁচু এয়া বড়ো জোয়ান ছিলাম৷ তখন বাঘের লেজ ধরে ঘুরিয়ে আছাড় মেরেছি, আর লাথি মেরে হাতি তাড়িয়েছি৷ পালোয়ানরা কেউ আমার সঙ্গে লড়তে চাইত না, বাঘ ভালুক আমায় দেখলেই ছুটে পালাত৷ আমি দেশে-বিদেশে কত জায়গায় ঘুরে বেড়ালাম; যেখানে যাই, সব পালোয়ান ভাগে-আমি খালি বলি কার সাথে লড়ব? শেষে শিরখুল্লাদের (যাদের মাথা খালি, অর্থাৎ বাঙালি) দেশে একজন বলল, লড়তে চাও? ওই কালীমাইর মন্দিরে রাত্রে যেয়ো, তা হলেই লড়তে পাবে৷ আমি কি তাতে ডরাই? ঠিক সেই রাত্রেই আমি গিয়ে সেখানে হাজির৷ গিয়ে দেখি সেখানে মস্ত এক ভূত বসে আছে, তার টেড়া টেড়া (বাঁকা বাঁকা) পা, বড়ো বড়ো কান আর লাল লাল সাড়ে তিনটা চোখ! সেটা আমায় দেখেই খেঁকিয়ে এল, আমিও অমনি তাল ঠুকে তার সঙ্গে লড়াই দিলাম৷ সে লড়াই চলল সতেরো দিন সতেরো রাত, তারপর ভূতের পুত কেঁউ কেঁউ করে ভেগে গেল৷ কিন্তু বেটা কী ভারীই ছিল! তার চাপনে আমি ছ-হাত জোয়ান তিন হাত হয়ে গেলাম৷'
একথা শুনে তো পালোয়ানদের ভারি তাক লেগে গেল; তখন থেকে তারা হুড়ুকবাজ সিংকে বড্ডই মানে৷ এর মধ্যে হয়েছে কী, পাঠান-বাদশার মুলুক থেকে 'ঝুররল হুল্লোড় খাঁ' বলে এক পালোয়ান এসেছে, সে সকালে উঠে সতেরো সের দই আর এগারো সের পেঁড়া দিয়ে জল খায়! সে এসেই রাজাকে সেলাম ঠুকে বলল, 'আপনার পালোয়ানদের সাথে লড়াই করব৷'
রাজার কুস্তিগিরদের সর্দার ছিল দুড়ুমপটাশ সিং; লড়তে হলে সেই আগে ঝুররল হুল্লোড় খাঁর সঙ্গে লড়বে৷ দুড়ুমপটাশ সিং কিন্তু খাঁ সাহেবকে দেখেই বিকট মুখ সিটকিয়ে দু-হাতে পেট চেপে ধরে মাটিতে গড়াগড়ি দিতে লাগল, বলল, 'উঃ , উঃ ! আমার পেটে বড্ড দরদ হয়েছে৷' সকাল গেল, দুপুর গেল, বিকাল গেল, তবু দুড়ুমপটাশের পেটের দরদ সারেই না৷
রাজা বললেন, 'আমার মান তো যায় যায়, শিগগির আর কাউকে ডাক৷' তা শুনে সবাই বলল, 'মহারাজ! হুড়ুকবাজ সিং আছে বেজায় জোয়ান, তাকে ডাকুন৷' অমনি হুড়ুকবাজকে ডেকে আনা হল; রাজা তাকে বললেন, 'এই পাঠানের সঙ্গে তোমাকে লড়তে হবে৷'
হুড়ুকবাজ বলল, 'এ আর কি বেশি কথা, কাল সকালেই আমি লড়ব৷ আজ আমার বরত (ব্রত) আছে, মুসলমানকে ছুঁলে নষ্ট হবে৷'
রাজা বললেন, 'সেই বেশ; কালকে লড়াই হবে৷'
তারপর রাজার কাছ থেকে ঘরে এসেই হুড়ুকবাজ বলল, 'বাপ রে! আর না; এই বেলা পালাই৷ ও বেটার সঙ্গে লড়তে গেলে আমাকে দু আঙুলে ধরে তক্ষুনি নস্যি করে ফেলবে৷' বলে, চুপিচুপি ঘোড়ায় চড়ে কসে চাবুক মেরে চম্পট৷
সেই ঘোড়া তাকে নিয়ে গিয়ে থামল এক মন্দিরের সামনে৷ সেই মন্দিরে বাবা চিলম তোড় বলে বড়ো ভারি এক সন্ন্যাসী থাকতেন, হুড়ুকবাজ তাঁর সামনে গিয়েই লম্বা হয়ে মাটিতে পড়ে মস্ত এক প্রণাম করে ফেলল৷
সন্ন্যাসী তাতে যারপরনাই খুশি হয়ে বললেন, 'তুই কী চাস বাপু?' হুড়ুকবাজ বলল, 'বাবা, এক পালোয়ানের ভয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে এসেছি৷ যদি বাবা দয়া করেন, তবে তাকে গিয়ে হারাই৷' সন্ন্যাসী বললেন, 'আচ্ছা তুই ফিরে যা৷ তুই যখন লড়বি, আমি নিজে তোর হয়ে 'পহিলি হাঁথ' মারব৷'
'পহিলি হাঁথ' মানে প্রথম যে থাপ্পড়টা মারবে সেইটে৷ হুড়ুকবাজ সন্ন্যাসীর কথা শুনে খুশি হয়ে সেই রাত্রেই ফিরে এল৷
তারপর সকাল বেলায় তো কুস্তি আরম্ভ হয়েছে৷ হুড়ুকবাজের মনে এখন খুবই ভরসা, সে জানে সন্ন্যাসী তার হয়ে 'পহিলি হাঁথ' মারবে৷ পাঠান পালোয়ান ভালো করে তার সামনে আসতে-না-আসতেই অমনি সে 'জয় বাবা চিলম তোড়' বলে লাফিয়ে উঠে তার ঘাড়ে এক 'রদ্দা' (থাপ্পড়) বসিয়েছে৷ সে কি যে সে রদ্দা? স্বয়ং বাবা চিলম তোড় তাতে জোর দিয়েছিলেন৷ তার চোটে পাঠান বেচারা সাতষট্টি পাক ঘুরে, তেতাল্লিশটা ডিগবাজি খেয়ে, রাজা প্রজা সবাইকে উলটিয়ে ঠিকরে ভিড়ের বাইরে গিয়ে পড়ে, দাঁতে দাঁতে লেগে মূর্ছা গেল৷ তারপর সে অনেক কষ্টে সেখান থেকে উঠে সেই যে ছুট দিল, আর নিজের দেশে না গিয়ে থামল না৷
তখন তো আর হুড়ুকবাজের আদরের সীমাই রইল না, রাজা সেইখানেই তাকে সেনাপতি করে দিলেন৷ আরও ঢের বেশি দিন বেঁচে থাকলে হয়তো সে রাজার মেয়ে বিয়ে করতেও পারত, কিন্তু সেটি আর বেচারার কপালে ঘটল না৷
একদিন রাত্রে রাজবাড়ি থেকে বেরোতে গিয়ে অন্ধকারে না দেখতে পেয়ে হুড়ুকবাজ এক বেড়ালের লেজ মাড়িয়ে দেয়, তাতে বেড়াল রেগে চোঁ বোঁ করে তাকে তিন চড় লাগায়৷ তা খেয়ে দু-দিনের ভিতরে সে মরে গেল৷
মরবার আগে সকলে জিজ্ঞেস করল যে, 'বেড়ালটাকে এক চড় দিয়ে মেরে ফেললে না কেন?' তাতে হুড়ুকবাজ বলল,
'শের মারা থাপ্পড় সে ময় ফির হাথিকা তোড়া দাঁত,
অওর ভগায়া মিয়াঁ হুল্লোড় খাঁকো মারকে এক হি হাঁথ৷
লড়া বঙ্গাল মুল্ক মে জাকর ভূত সে সত্রাহ দিন,
অওর লড়াইমে মারা এতনা আদমি, কোই ন সকই গিন৷
সারে জনম ভর কিয়া ময়নে প্যেহলোয়ানি অ্যায় সে,
অব বিল্লি মারকে নাম বদনামি বোল ময় করুঁ ক্যায়সে?'
অর্থাৎ
'ভেঙেছি বুনো হাতির দাঁত আর বাঘ মেরেছি চড়ে,
তাড়িয়েছি মিয়াঁ হুল্লোড় খাঁকে একটিই থাপ্পড়ে৷
হারল লড়ে বাংলা দেশের ভূত, সতেরো দিন অন্তে,
আর মেরেছি যুদ্ধে এত লোক যে কেউ পারেনি গুনতে৷
করে এমনতর পালোয়ানি সারা জনম ধরে,
বল শেষে বেড়াল মেরে নামটা খারাপ করি কেমন করে?'
অগ্রহায়ণ ১৩২০
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন