অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়
বীণা যখন প্রথম স্কুলে এল তখন তার সংস্কৃতে অনভিজ্ঞতা দেখে শিক্ষয়িত্রী বললেন, 'অন্য সব বিষয়ই তো তুমি বেশ ভালো জান; কিন্তু সংস্কৃত দেখছি তুমি একেবারেই শেখনি-না হলে তোমায় ফোর্থ ক্লাসে ভরতি করে দিতে পারতাম৷ আচ্ছা এখন তুমি ফিফথ ক্লাসেই পড়ো-হাফ-ইয়ারলিতে সংস্কৃতে যদি ভালো নম্বর পাও, তাহলে তোমাকে ফোর্থ ক্লাসে উঠিয়ে দেব এখন৷'
বীণা ফিফথ ক্লাসেই পড়তে লাগল৷ সে পড়ায় খুব ভালো ছিল; সব বিষয়েই প্রথম হতে লাগল; কিন্তু ক্লাসের মেয়েরা তার উপর যে খুশি হল তা নয়৷ বীণা পরীক্ষায় প্রথম হলে তারা বলত, 'ফোর্থ ক্লাসের মেয়ে ফিফথ ক্লাসে পড়লে তো হবেই, তাতে বাহাদুরির কী আছে?' বীণা প্রথম যেদিন ক্লাসে এল সেদিন মেয়েরা বলল, 'আটটা মোটে ডেস্কে এত মেয়ের কুলান অসম্ভব, বরং এই নূতন মেয়েটিকে আর কোথাও বসানো যেতে পারে৷'
শিক্ষয়িত্রী বললেন, 'তবে তোমরা সবাই সিক্সথ ক্লাসে গিয়ে বসো৷ সে ঘরটাও বড়ো, আর তাতে ডেস্কও বেশি আছে-সিক্সথ ক্লাসে মেয়ে কম আছে, তারা এ-ঘরটা নিতে পারে৷'
সে প্রস্তাবে মেয়েরা রাজি হল না-মীরা চট করে পাশের বেঞ্চে চলে গিয়ে নিজেরটা খালি করে দিল; পাশের বেঞ্চে দু-টি মেয়ে আগে থেকেই ছিল; মীরাকে নিয়ে তিনটি হল৷ মীরা ফিসফিস করে বীণাকে শুনিয়ে শুনিয়ে পাশের মেয়েটিকে বলতে লাগল, 'বাপরে কী ভিড়! এর মধ্যে আমার কোমর ব্যথা হয়ে গিয়েছে-ওই নতুন মেয়েটির জন্যই তো এরকম হল৷' বীণা সবই শুনতে পেয়েছিল-সে আস্তে আস্তে বলল, 'আমার বেঞ্চেতে আর এক জনের জায়গা আছে, তোমরা কেউ এলেই পার-অত ঠেসাঠেসি করবার দরকার কী?' মীরা যেন ওর কথা শুনতেই পায়নি এমনি ভাব দেখিয়ে বলতে লাগল, 'ওই মেয়েটি আর সব বিষয়েই ফোর্থ ক্লাসের মতন জানে, কেবল সংস্কৃত জানে না-ও স্বচ্ছন্দে ফোর্থ ক্লাসে পড়তে পারে- কেবল ন্যাকামি করে পড়ে না৷'
শিক্ষয়িত্রী কিন্তু সবই দেখতে পাচ্ছিলেন-তিনি এক ধমক দিয়ে বীণা আর মীরাকে এক বেঞ্চে বসিয়ে দিলেন, কিন্তু বীণা সেদিন যা চিমটি খেয়েছিল-সে কথা সে সহজে ভুলতে পারেনি৷
তাকে সবচেয়ে বেশি জ্বালাতন করত মীরা৷ বীণা আসবার আগে সেই ক্লাসে প্রথম হত; এখন বীণার প্রথম হওয়াটা তার অসহ্য হয়েছিল৷
সে দিন রবিবার বীণা বসে বসে পড়ছিল, হঠাৎ মীরা এসে বলল, 'জান, ওই মাঠে একটা মস্ত সার্কাস এসেছে; বোর্ডিং-এর ছাত থেকে তাঁবুটা দেখা যায়৷ ওদের হাতি, ঘোড়া, বাঘ, সিংহ এইসব অনেক জন্তু আছে-আবার নাকি অনেকগুলো সং আছে, তারা ভয়ানক হাসায়৷ মিস মজুমদারকে কত করে বললাম আমাদের নিয়ে যেতে, কিন্তু কিছুতেই শুনলেন না৷ এই বর্ষাকালে সন্ধ্যা বেলায় যদি বাড়ি থেকে বেরোই তাহলে নাকি হয় জ্বর, নয় সর্দি-কাশি নাহয় আরেকটা কিছু হবেই হবে৷ তা ছাড়া সেখানে নাকি এমন ভিড় যে আমরা কিছুতেই ভিতরে ঢুকতে পারব না৷
'আচ্ছা তোমাকে তো উনি খুব ভালোবাসেন-তুমি একবার বলে দেখো না-তাহলে হয়তো নিয়ে যেতে পারেন৷'
বীণা বলল, 'তোমরা সবাই বললে, রাজি হলেন না-আর আমি একলা বললেই বুঝি রাজি হবেন?'
মীরা, 'নিশ্চয়ই হবেন৷'
বীণা, 'কিন্তু আমার মনে হয় হবেন না৷ মাঝখান থেকে আমাকে বকুনি খেতে হবে৷'
'তার চেয়ে বললেই হয়, তুমি বলবে না৷'
'বাঃ একবার 'না' বলে দিয়েছেন, আবার জ্বালাতন করতে গেলে বকবেন না!'
মীরা রাগ করে চলে গেল-বীণা টের পেল যে দরজার বাইরে আরও কয়েকটি মেয়ে দাঁড়িয়েছিল আর তারা যে তাকেই জব্দ করবার পরামর্শ করতে করতে চলে গেল, সে বিষয়েও তার কোনো সন্দেহ রইল না৷
তার পরদিন ক্লাসে বীণাকে দাঁড়িয়েই থাকতে হত যদি না মিস রায় এসে প্রচণ্ড এক ধমকের চোটে তার জন্য জায়গা করে দিতেন৷
তারপর আরও একটা সপ্তাহ কেটে গিয়ে আবার রবিবার এসেছে৷ বিকাল বেলা মেয়েরা খেলা করছিল৷ বীণাকে কেউ ডাকেনি; তাই সে বাগানে ঘুরে বেড়াচ্ছিল৷ সামনে দু-একটা বাড়ির পর সার্কাসের তাঁবু একটুখানি দেখা যাচ্ছে-আজ রবিবার, ছুটির দিন-নিশ্চয়ই ঢের লোক যাচ্ছে-তারা যদি যেতে পেত তাহলে কী মজাই না হত! আর একটু ভালো করে দেখবার জন্য বীণা এগিয়ে গিয়ে সামনে রান্নাঘরের ছাতে উঠল-সেখান থেকে সার্কাসের মাঠটা বেশ ভালো করে দেখা যাচ্ছে৷ ওই যে একদল ছোটো ছোটো মেয়ে এসে দাঁড়াল- নিশ্চয় ওরা তারই ইশকুলের কোনো মেয়ে-ওদের টিচার নিশ্চয়ই টিকিট কিনতে গিয়েছেন, তাই ওরা অপেক্ষা করছে৷ হঠাৎ নীচের দিকে তাকিয়ে বীণা দেখতে পেল-ঘন ঘাসের মধ্যে দিয়ে কী একটা জন্তু এগিয়ে আসছে-দেখতে দেখতে সেটা বেরিয়ে এসে সামনে দাঁড়াল৷ ও বাবা! এ যে একটা চিতাবাঘ! নিশ্চয় ওই সার্কাসের বাঘ, কোনোরকমে ছাড়া পেয়েছে৷ বাঘটা বীণাকে দেখতে পেল না-রান্নাঘরের দরজা খোলা পেয়ে আস্তে আস্তে ভিতরে ঢুকে পড়ল- বামুন ঠাকুর একগামলা কাঁচা মাংস আঢাকা ফেলে বাসন-মাজা ঝিকে তাড়া দিতে গিয়েছিল- বাঘ সামনে এই খাদ্য সম্ভার দেখে মনের আনন্দে জলযোগ করতে আরম্ভ করল৷ বীণা এতক্ষণ ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়েছিল-বাঘটাকে অন্যমনস্ক দেখে দৌড়িয়ে পালাতে যাচ্ছে এমন সময়ে ঠাকুর একগাদা মাজা বাসন হাতে নিয়ে ঝিকে গাল দিতে দিতে এসে উপস্থিত৷ হঠাৎ বাঘের উপর চোখ পড়বামাত্র সে এক চিৎকার দিয়ে মাটিতে পড়ে গেল, সঙ্গেসঙ্গে বাসনগুলো ভীষণ ঝনঝন শব্দ করে মাটিতে পড়ে গেল; এই গোলমালে চমকে উঠে বাঘটা নিশ্চয়ই ঠাকুরকে আক্রমণ করত-কিন্তু বীণা তাড়াতাড়ি দরজাটা বন্ধ করে শিকল তুলে দিল৷
ততক্ষণে ঠাকুরের চিৎকার শুনে শিক্ষয়িত্রীরা সব ছুটে এলেন; ইশকুলের দরোয়ান ভুঁড়ি দোলাতে দোলাতে, টিকি ওড়াতে ওড়াতে লাঠি বাগিয়ে তেড়ে এল, স্কুলের বেয়ারা দোয়াতে কালি ভরছিল, 'বাঘ এসেছে' শুনে সে কালির দোয়াত, ব্লাকবোর্ড উলটে, শার্সি ভেঙে, দেওয়ালময় কালির ছাপ লাগিয়ে গেটের দিকে ছুটল, মেয়েরা সব কেউ লেপের তলায়, কেউ আলমারির পিছনে, কেউ ট্রাঙ্কের মধ্যে লুকিয়ে পড়ল-কেবল বীণা যেখানে ছিল সেই খানেই দাঁড়িয়ে রইল৷
খানিক হাঁকডাক চেঁচামেচির পরে দরোয়ান একখানা চিঠি হাতে করে, হাঁপাতে হাঁপাতে সার্কাসের তাঁবুর দিকে ছুটল৷
সে যখন ফিরে এল তখন তার সঙ্গে একটি খাঁচা ও কয়েকটি লোক নিয়ে স্বয়ং সার্কাসের মালিক মহাশয় এসে উপস্থিত৷ রান্নাঘরের দরজা খুলে খাঁচার দরজাটা তার সামনে রাখা হল; তারপর মালিক মহাশয় নাম ধরে ডাকতেই বাঘটা অত্যন্ত ভালোমানুষের মতন এসে খাঁচায় ঢুকে পড়ল৷
তারপর দিন যখন সার্কাসের মালিক আবার এলেন ও প্রধানা শিক্ষয়িত্রীর হাতে একগোছা টিকিট দিয়ে গেলেন-তখন আর মেয়েদের সার্কাস দেখাতে তাঁর কোনো আপত্তি রইল না৷ সেদিন সন্ধ্যা বেলায় সার্কাসের তাঁবুতে কে বীণার পাশে বসবে, সেই নিয়ে ফিফথ ক্লাসের মেয়েদের মধ্যে খুব একচোট ঝগড়া হয়ে গেল৷
এখন বীণা আর মীরার মতন অন্তরঙ্গ বন্ধু খুব কমই দেখা যায়৷
চৈত্র ১৩৩২
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন