অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়
এক যে ছিলেন রাজা৷ কী? তোমরা ওরকম পচা গল্প ঢের জান? না, জান না; এ গল্পে যুদ্ধ আছে, সন্ধি আছে, আরও নানা কথা আছে৷
সেই যে ছিলেন রাজা, তাঁহার নাম ছিল বীর রাজা৷ বীর রাজা একদিন মন্ত্রীকে বলিলেন, 'তাঁহার মনটা উশখুশ করিতেছে, আর হাত নিশপিশ করিতেছে; তিনি দিগবিজয় করিবেন, আর প্রথমেই যুদ্ধ করিবেন তাঁহার পড়শি ধীর রাজার সঙ্গে৷'
লোকলশকর হাতি ঘোড়া সাজানো হইল, যুদ্ধযাত্রার দিন ঠিক হইল, আর মন্দিরে মন্দিরে বীর রাজার জয়ের জন্য ও ধীর রাজার ক্ষয়ের জন্য পূজাপাঠ হইয়া গেল৷ সৈন্যাধ্যক্ষ রাজাকে এত্তেলা দিলেন-'সব প্রস্তুত'৷
বীর রাজা ঘোড়ায় চড়িতে ভালোবাসিতেন; তিনি ঘোড়া আনিতে বলিলেন৷ রাজা বাজে ঘোড়ায় চড়িতেন না-তাঁহার চড়িবার জন্য দুইটি পছন্দসই ঘোড়া ছিল; একটি ঘোড়া ভালোবাসিত নীল রং দেখিতে, ও আরেকটি ভালোবাসিত সবুজ রং দেখিতে৷ জয়ডঙ্কা বাজিল, শাঁখ বাজিল, সংস্কৃতে মন্ত্র পড়া হইল, আর রাজার ঘোড়া দুইটি সাজাইয়া আনা হইল৷ ঘোড়াদের গলায় ঘুঙুর, মাথায় জরির ঝালর ও পিঠে সোনালি জরির কাজ করা নানা চিত্রে ছককাটা গদি৷
রাজা প্রথমে চড়িলেন নীল-প্রিয় ঘোড়ায়; শাঁখ ও ভেরি বাজিয়া উঠিতেই সে ঘোড়া নীল আকাশের দিকে তাকাইয়া শির-পা করিয়া দাঁড়াইল-যেন সে মাটিতে পা না দিয়া আকাশে উড়িতে চায়৷ রাজার স্বর্গে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল না-তিনি বহু কষ্টে সে ঘোড়া থেকে নামিয়া সবুজ-প্রিয় ঘোড়ায় চড়িলেন; সে ঘোড়া ইট-পাথরে বাঁধা রাস্তা ছাড়িয়া, সবুজ মাঠের পথে অতি সবুজ বনের দিকে ছুটিল৷ সে পথে বিষম খানাখন্দ; সহিসেরা দৌড়াইয়া গিয়া ঘোড়া ধরিল৷ রাজার স্বর্গে যাওয়া হয় নাই; খানাখন্দের পাতালে যাওয়াও হইল না৷ তাঁহার ঘোড়ায় চড়া হইল না; তিনি মন্ত্রীর পরামর্শে পালকিতে উঠিলেন৷ যুদ্ধক্ষেত্রে নিরস্ত্র কাহারেরা মারা পড়িলে, ধপাস করিয়া পালকি পড়িতে পারে; বীর রাজা সে ভয়ের কথা বলিলেন৷ যে ছিল কাহারদের দলের সর্দার-অর্থাৎ কিনা বেহারা*, সে রাজাকে অষ্টাঙ্গে প্রণাম করিয়া বলিল, 'তাহারা মারা পড়িবে না, কারণ তাহাদিগকে মারিলে অন্য রাজা-বড়োলোকদের বহিবার লোক থাকিবে না৷' রাজা পালকিতে চড়িলেন; আবার শাঁখ ও জয়ডঙ্কা বাজিল, ও ভাটেরা বীর রাজার বীর কীর্তির ছড়া আওড়াইতে লাগিল৷
বীর রাজার সৈন্যেরা রাতারাতি তাহাদের রাজ্যের সীমানার পাহাড় পার হইয়া ধীর রাজার রাজ্য দিয়া চলিল৷ কোথাও প্রতিদ্বন্দ্বী সৈন্য নাই-চাষারা নিরুদবেগে খেতে কাজ করিতেছে, রাখালেরা গান গাইতেছে৷ বীর রাজার সৈন্যেরা চটিয়া জগঝম্প বাজাইল; চাষারা কাজ ফেলিয়া সৈন্যদল দেখিল, রাখালেরা ছুটিয়া কাছে আসিল, গোরুরা ছুটিয়া পলাইল, আর গ্রামের ছেলে মেয়ে ঝি-বউয়েরা মজা দেখিতে লাগিল৷ কেহ বলিল পালকিতে বউ যাইতেছে, কেহ বলিল বর বিবাহ করিতে যাইতেছে৷ রাজা চটিয়া ভাটকে আদেশ দিলেন যে, সে চেঁচাইয়া বলিবে-বীর রাজাই এরাজ্যের মালিক৷ ভাট চেঁচাইল, কিন্তু সে রাজ্যের কেহ উচ্চবাচ্য করিল না৷
বেলা এক প্রহর গড়াইবার পর বীর রাজা সসৈন্যে ধীর রাজার সিংহদ্বারে গিয়া তূরী ভেরি বাজাইলেন৷ প্রহরীরা সসম্মানে ফটক খুলিয়া দিল, আর 'আসতে আজ্ঞা হউক-আজ আমার সুপ্রভাত' ইত্যাদি বলিয়া ধীর রাজা বীর রাজাকে অভ্যর্থনা করিলেন৷ বীর রাজা পালকি থেকে নামিয়াই মহা দর্পে বলিলেন যে, 'সে রাজ্যটা তাঁহার৷' ধীর রাজা বীর রাজাকে হাত ধরিয়া নিজের সভায় লইয়া বলিলেন, 'এ বাড়িঘর সবই আপনার; আপনি এখন বিশ্রাম করুন, স্নানাহার করুন এবং আপনার সঙ্গের লোকেরাও করুক৷' বীর রাজা ভ্যাবাচ্যাকা খাইয়া সভায় বসিলেন; আর তাহার পর সকলেরই স্নানাহার শেষ হইল৷
অপরাহ্নে বীর রাজা বলিলেন, 'আমি বীর, আমি জয়ী; এখন আমার সৈন্যেরা এখানে আসিয়া জয়ধ্বনি করুক৷' ধীর রাজার মন্ত্রী তাঁহাকে শুনাইলেন যে তাঁহার সৈন্যেরা একটা বড়ো চাবি দেওয়া ঘরে বিশ্রাম করিতেছে, আর অস্ত্রশস্ত্র রাজগুদামে বন্ধ আছে; তিনি যদি ইচ্ছা করেন তবে ধীর রাজার সৈন্যেরাই তাঁহাকে জয়ধ্বনি শুনাইতে পারে৷ বীর রাজা চটিয়া ফটকের দিকে ছুটিলেন-কিন্তু দেখিলেন ফটক বন্ধ৷
বীর রাজা চটিয়া ধীর রাজাকে বলিলেন, 'আমি এই রাজ্য জয় করিয়াছি, তুমি অধীনতা স্বীকার করো, এবং প্রথা অনুসারে তোমার মেয়েকে আমার সঙ্গে বিবাহ দাও৷' ধীর রাজা জানাইলেন যে বীর রাজার মতো সুপাত্রকে কন্যা দান করিতে তাঁহার অত্যন্ত ইচ্ছা, কিন্তু এখনও তাঁহার মেয়ে হয় নাই, এবং তাঁহার পক্ষে সসম্মানে ফিরিয়া যাইবার পথেও বাধা হইবে না; কারণ ধীর রাজার দূতেরা বীর রাজার রানির কাছে-রাজ-খালাশি টাকা লইয়া শীঘ্রই ফিরিবে৷ বীর রাজা বুঝিলেন, সর্বনাশ হইয়াছে-তিনি বন্দি৷ ধীর রাজা বলিলেন, 'আমার সুপ্রভাত, আপনি এখানে পায়ের ধূলা দিয়াছেন; আপনার রানি যে টাকা পাঠাইবেন, তাহা দিয়া অনেক টোল পাঠশালা ও চিকিৎসালয় করা যাইবে এবং তাহাতে এ-রাজ্যে আপনার নাম থাকিবে; আর আপনার নাম চিরস্থায়ী করিবার জন্য ঠিক করা গিয়াছে যে আপনার রাজ্যের সীমার পাহাড়টি এ-রাজ্যকে দান করিবেন বলিয়া সন্ধিপত্রে লিখিয়া দিবেন৷' মন্ত্রী আনিয়া বীর রাজাকে সন্ধির কাগজ দিলেন এবং বীর রাজা যেমন করিয়া হউক দস্তখত দিলেন৷
রানি যে টাকা পাঠাইয়াছিলেন, তাহা পৌঁছিল; বীর রাজার সৈন্যেরা বিনা হাতিয়ারে ফিরিল এবং ধীর রাজার সৈন্যেরা পাহাড় দখল লইতে সঙ্গে সঙ্গে চলিল৷
রাজা পালকিতে চড়িলেন, কিন্তু মাথার পাগড়ি খুঁজিয়া পাইলেন না; খালি মাথায় গেলে পথের লোকেরা তাঁহাকে পরাজিত রাজা মনে করিবে ভাবিয়া লজ্জিত হইলেন৷ ধীর রাজা বলিলেন, 'আপনি যাইবেন পালকিতে, কাজেই উষ্ণ তাপ নিবারণের জন্য উষ্ণীষের প্রয়োজন নাই এবং কেহ যুদ্ধ করিতে আসিবেন না বলিয়া শিরের ত্রাণের জন্য-অর্থাৎ মাথা বাঁচাইবার জন্য শিরস্ত্রাণের প্রয়োজন নাই৷' বীর রাজা বুঝিলেন, এখন অন্য টুপি মাথায় দিলে গাধার টুপি পরা হইবে৷ বীরে ধীরে এই রকমেই যুদ্ধ হয়৷
আষাঢ় ১৩৩০

* 'বেহারা' শব্দের একালের ব্যবহারের কথা বলি৷ সকল রকম কাজ করিবার দলের সর্দারকেই সে কালে বেহারা বলিত; হয়তো সকল কাহারকেই খুশি করিবার জন্য সকলকেই বেহারা বলিতে বলিতে কাহারের নাম হইয়াছে বেহারা৷ ইংরেজদের বাড়ির সকল চাকরই চাকর দলের সর্দার নয়; তবুও তাহাদের নাম বেহারা৷ ওড়িশায় নানা জাতির দলের মোড়লকেই বেহারা বলে; ব্রাহ্মণদেরও এই জন্য বেহারা উপাধি আছে৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন