স্বপ্নাদ্য ঔষধ

অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়

মাধবপুর টি.এন.জি. ইনস্টিটিউশনে, এবং তৎসংলগ্ন হোস্টেলে উৎসবের সাড়া পড়িয়া গেছে; একসঙ্গে পনেরো দিন ছুটি; এ অসম্ভব কখনোই সম্ভব হইত না, যদি না সেবার বাংলার মন্ত্রীমহাশয়কে পুরস্কার বিতরণ করিতে রাজি করানো যাইত৷

পুরস্কার-বিতরণ সভায় মন্ত্রীমহাশয় বক্তৃতাচ্ছলে বলিয়াছিলেন, 'শিক্ষার একটা বিশেষ প্রয়োজনীয় দিকে আমি আজ আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই৷ আজকাল চারদিক থেকেই একটা নালিশের সুর উঠছে যে আমরা আমাদের ছেলেপেলেদের কেবল পুঁথিগত বিদ্যাই শিখিয়ে আসছি-হাতে-কলমে কাজ শেখবার সুযোগ তাদের দিচ্ছি না৷ এ স্কুলের কর্তৃপক্ষ যাঁরা তাঁদের কাছে আমার বিশেষ অনুরোধ কথাটাকে তাঁরা যেন একটু তলিয়ে ভেবে দেখেন৷' এই কথাগুলি হোস্টেলের অ্যাসিস্ট্যান্ট সুপারিনটেন্ডেন্ট প্রতাপবাবুর মনে বড়োই ধরিয়াছে৷

সভা ভঙ্গের পরই দেখা গেল প্রতাপবাবু হেডমাস্টার মশাইয়ের ঘরে বসিয়া তাঁর সঙ্গে কী একটা বিষয় আলোচনা করিতেছেন৷ মাঝে মাঝে তাঁর ডান হাতের মুঠো প্রবল বেগে বাঁ-হাতের তেলোকে প্রহার করিতেছিল৷ যুক্তির সারবত্তা প্রমাণ করিতে হইলেই প্রতাপবাবু এই রকম করিয়া থাকেন৷ সেই ঘরে আর একজন ভদ্রলোক চুপ করিয়া বসিয়া উভয়ের কথাবার্তা শুনিতেছিলেন; তিনি ধ্রুবপদবাবু, হোস্টেলের নতুন সুপারিনটেন্ডেন্ট৷

ঘণ্টাখানেক বাদে হোস্টেলের ছেলেরা দেখিতে পাইল নোটিশবোর্ডে একটি নূতন নোটিশ ঝুলিতেছে-তার মর্মার্থ এই যে, রাত্রে খাওয়া-দাওয়ার পর সাড়ে নয়টার সময় 'কমন রুমে' একটি জরুরি বিষয়ের পরামর্শের জন্য মিটিং বসিবে৷ প্রতাপবাবু সভাপতির পদ গ্রহণ করিবেন৷ প্রত্যেক বোর্ডার যেন ওই সময় 'কমন রুমে' উপস্থিত থাকে৷

যথা সময়ে মিটিঙে উপস্থিত হইয়া প্রতাপবাবু তাঁর বক্তব্য বিষয় ছেলেদের বুঝাইয়া বলিলেন-বাস্তবিক মন্ত্রীমহাশয় আজ তাঁরই মনের কথাটি খুলিয়া বলিয়াছেন৷ কেবল বই মুখস্থ করিলেই প্রকৃত শিক্ষা হয় না, হাতে-কলমে কাজ করিতে শেখা চাই৷ হেডমাস্টার মশাইয়ের সঙ্গে আজ তাঁর এবিষয়ে কথাবার্তা হইয়াছে৷ তাঁরা পনেরো দিন ছুটি পাইতেছেন, এ ক-টা দিন ছেলেরা যদি হোস্টেলেই থাকিয়া যাইতে রাজি হয়, তবে তাদের জন্য চমৎকার একটি জিনিসের বন্দোবস্ত তিনি করিতে পারেন৷ হোস্টেলের সংলগ্ন যে বারো-চোদ্দো বিঘা জমি আছে অনায়াসেই সেখানে নানারকম ফসল উৎপাদনের ব্যবস্থা করা চলে৷ এই পনেরো দিন প্রত্যেকে সকালে তিন ঘণ্টা, বিকালে দু-ঘণ্টা এবং স্কুল খুলিলে প্রত্যহ বিকালে এক ঘণ্টা করিয়া খেতের কাজ করিলেই ব্যাপারটা খুব সহজ হইয়া যায়৷ এক দিকে তাদের যেমন হয় স্বাবলম্বন শিক্ষা, অপরদিকে তেমনি আলু, কুমড়ো, বেগুন, কপি, মটরশুঁটি প্রভৃতি তরকারি নিজেদেরই খেতে উৎপন্ন হওয়ায় 'বোর্ডিং চার্জ'ও অনেক কম পড়ে৷ এ বিষয়ে ছেলেদের কী মত?'

প্রতাপবাবুর বক্তৃতা শুনিয়া ছেলেরা অতিমাত্রায় উৎসাহিত হইয়া উঠিয়াছিল, ভোট নিয়া তিনি দেখিলেন সকলেরই এ প্রস্তাবে সম্মতি আছে৷ তিনি অতিশয় সন্তুষ্ট হইয়া কহিলেন, 'আমার প্রস্তাব তবে এ মিটিং গ্রহণ করছে-কী বলো?'

সকলেই এক বাক্যে বলিয়া উঠিল, 'হ্যাঁ স্যার, হ্যাঁ হ্যাঁ৷'

সেই রাত্রেই অ্যাসিস্ট্যান্ট সুপারিনটেন্ডেন্ট প্রতাপবাবু কাজের খসড়া, শ্রেণি-বিভাগ প্রভৃতি সমাধা করিয়া ফেলিলেন৷ স্কুলের অন্যান্য মাস্টারমশায়দের তিনি কথাটা জানাইয়া রাখিয়াছিলেন, পরদিন প্রত্যুষেই দেখা গেল তাঁদের বাড়ি হইতে প্রচুর পরিমাণে কোদাল, শাবল, খোন্তা, ঝুড়ি প্রভৃতি আসিয়া হাজির হইয়াছে৷ সর্বপ্রথম হেডপণ্ডিত মশায় একটি মন্ত্র পাঠ করিলেন; তারপর হারমোনিয়াম সহযোগে গান আরম্ভ হইল, আর সেই গানের তালে তালে পা ফেলিতে ফেলিতে ছেলের দল কোদাল, শাবল প্রভৃতি হাতে নিয়া মাঠে নামিয়া পড়িল৷

মিনিট পনেরো তারা খুবই উৎসাহে কোদাল চালাইয়াছিল, কিন্তু তারপরই শুরু হইল ঘন ঘন ঘড়ির প্রতি দৃষ্টিপাত-তিন ঘণ্টা হইতে আর কত বাকি আছে৷

বিকাল বেলা গান আর তেমন জমিল না, অনেকেরই নাকি ইতিমধ্যে মাথা ধরিয়া গেছে৷

দ্বিতীয় দিন দেখা গেল খেতের কাজে খুব কম ছেলেরই উৎসাহ টিকিয়া আছে, তৃতীয় দিনে এক জনেরও আছে কি না সন্দেহ৷ অ্যাসিস্ট্যান্ট সুপারিনটেন্ডেন্টের দরবারে প্রায় ডজন খানেক দরখাস্ত পেশ হইল-ছেলেদের অনেকেই একবার বাড়ি ঘুরিয়া আসিতে চায়৷ বর্ষাকালের আকাশের মতো মুখ নিয়া প্রতাপবাবু কোনো দরখাস্তের উপর লিখিলেন, No (না), কোনোখানার উপর Rejected (না-মঞ্জুর), কোনোখানার উপর Impossible (অসম্ভব)৷

দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর ভীমসেনের ঘরে কতগুলি ছেলে জটলা পাকাইতেছিল৷ ঘরের মালিকের আসল নাম ভীমসেন নয়, গোপাল গাঙ্গুলি; মহাভারতোক্ত ভীমের মতো গায়ের জোর এবং চেহারার বহর দেখিয়া হোস্টেলের ছেলেরা ওই নাম দিয়াছে৷ ভীমসেনের মানসিক অবস্থা বর্তমানে মোটেই সুবিধাজনক নয়; কী কুক্ষণে বেচারা প্রতাপবাবুর প্রস্তাবে ঘাড় নাড়িয়াছিল-তার বলীবর্দের মতো বপুখানা দিয়া তিনি খেতের বারো আনা মাটি কোপাইয়া লইতেছেন৷ আজ সকাল হইতেই ভীমের অন্তরাত্মা পালাই পালাই করিতেছিল, হরিহরকে উদ্দেশ করিয়া সে কহিল, 'কাল থেকে তোমরাই বাপু খেতের কাজ করো, স্বাবলম্বন-শিক্ষা এবং দৈহিক উন্নতি লাভ হবে৷ আমি আজকেই সটকাচ্ছি৷ উঁহুহু, খেপিনি আমি; প্রতাপবাবুর কাছে নয়, খোদ সুপারিনটেন্ডেন্টের কাছে আমার আর্জি পড়বে৷ তারপর প্রতাপবাবুও একটু চোখের আড়াল হয়েছেন, আর আমিও সুড়ুৎ৷' এই শেষের কাজটি কেমন ধাঁ করিয়া সুসম্পন্ন হইবে বোধ করি সেইটেই বুঝাইবার জন্য ভীমসেন ভীমরবে একটি তুড়ি মারিল৷

সুরসিক বলিয়া হরিহরের হোস্টেলে একটু সুনাম আছে; সে কহিল, 'সুড়ুৎ বলে তুড়ি মারলেই তো আর সুড়ুৎ করা চলে না৷ বলি যাবে যে, একখণ্ড 'মেটিরিয়া মেডিকা' জোগাড় হয়েছে? সুপারিনটেন্ডেন্টের কাছে গেলেই তো তিনি বলবেন, বাড়ি যাবে যাও, কিন্তু বন্ধের ভেতর 'মেটিরিয়া মেডিকা'খানা মুখস্থ করে এসো৷'

উপস্থিত সব কয়টি ছেলেই হা-হা করিয়া হাসিয়া উঠিল৷ হাসিবার বাস্তবিকই একটা কারণ আছে৷ নূতন সুপারিনটেন্ডেন্ট ধ্রুবপদবাবু যেন একটু বাতিকগ্রস্ত-ডাক্তারি করিবার তাঁর উৎকট রকমের শখ এবং ডাক্তারিবিদ্যায় নিজের গভীর ব্যুৎপত্তি আছে বলিয়া তাঁর আন্তরিক ধারণা৷ চার্জ নিয়া হোস্টেলে আসিবার দিন তিনি যে কেবল তিন বাক্স ওষুধই সঙ্গে আনিয়াছিলেন তা নয়, বোর্ডারদের স্বাস্থ্য হোস্টেলের আবহাওয়া প্রভৃতি সম্বন্ধে অনেক খুঁটিনাটি অনুসন্ধানও করিয়াছিলেন৷ কলতলার একটা জায়গা শ্যাওলা পড়িয়া অনেক দিন হইতেই বেজায়রকম পিছল হইয়াছিল, প্রত্যেককে তিনি বার বার সতর্ক করিয়া দিলেন কেউ যেন ভুলক্রমেও ওদিক না মাড়ায় কেননা আছাড় পড়িয়া হাত পায়ে 'কম্পাউন্ড ফ্র্যাকচার' হইলে সে বড়ো বিপদের কথা৷ কিন্তু তা সত্ত্বেও একদিন তাড়াতাড়ি ওই জায়গাটিতেই আঁচাইতে গিয়া রামপদ ঠ্যাং ভাঙিয়া বসিল৷ সুপারিনটেন্ডেন্টের কাছে খবর পৌঁছিতে তিনি ব্যস্তসমস্ত হইয়া ছুটিয়া আসিয়া, রামপদর পা পরীক্ষা করিয়া বলিলেন, 'আমি বাপু তোমাদের এত করে বারণ করে দিলাম ওখানটাতে যেয়ো না, তবু কেন ওখানে গেলে?'

রামপদ অপ্রতিভের মতো আমতা-আমতা করিয়া বলিল, 'ভুলে গিয়েছিলাম স্যার, কথাটা মনে ছিল না৷'

'আঁ্যাঁ' বলিয়া সুপারিনটেন্ডেন্ট মনে মনে কী একটু ভাবিলেন, তারপর রামপদর জন্য দুইটি ওষুধের ব্যবস্থা হইল; একটি টিংচার আয়োডিন-পায়ে মালিশ করিবার জন্য, অপরটি ব্রাহ্মীঘৃত-খাইবার জন্য৷ প্রতাপবাবু সাশ্চর্যে তাঁর মুখের দিকে তাকাইয়া আছেন দেখিয়া ধ্রুববাবু কহিলেন, 'আপনি অবাক হচ্ছেন কেন প্রতাপবাবু? ওর আসল অসুখ তো আর পায়ের ব্যথা নয়, স্মরণশক্তির অভাব-তাই হয়েছে বলেই তো পেছল জায়গায় গিয়ে পায়ে চোট খেয়েছে৷ কাজেই দুটো রোগেরই ওষুধ দিতে হবে না? স্মরণশক্তির অভাব হলে আমাদের কবরেজি ব্রাহ্মীঘৃতটাতে বেশ কাজ হয়, তাই ওটাই প্রেসক্রিপশন করে দিলাম৷'

এই অভিনব প্রেসক্রিপশনে ছেলেরা সকলে এ উহার মুখের দিকে তাকাইয়া ছিল; প্রতাপবাবু মুখ ফিরাইয়া হাসি গোপন করিয়াছিলেন৷ সেই হইতে হোস্টেলে সুপারিনটেন্ডেন্টের চিকিৎসা একটা হাসির ব্যাপার হইয়া দাঁড়াইয়াছে৷

হরিহরের রসিকতা শুনিয়া ভীমসেন মনে মনে কী একটু চিন্তা করিল, তারপর সোল্লাসে হরিহরের পিঠ চাপড়াইয়া বলিয়া উঠিল, 'ব্র্যাভো ব্রাদার, তোফা কথাটা মনে করিয়ে দিয়েছিস! ও আর্জি-ফার্জি কিছু নয়, সম্পূর্ণ একটা নতুন মতলব মাথায় এসেছে৷ দেখিস ওবেলা থেকে আর আমায় খেতের কাজে নামতে হবে না, তোরাই খেটে খেটে মরবি৷'

ঠিক সেই সময় সুপারিনটেন্ডেন্টের গলার আওয়াজ শোনা গেল, বোর্ডাররা কে কেমন আছে খোঁজ নিতে তিনি উপরে উঠিয়াছেন৷ অমনি ভীমসেন তড়াক করিয়া একলাফে বিছানার উপর চিত হইয়া পড়িল, সে বড়ো বপুর ভারে পুরাতন তক্তপোষ জবাব দেয় আর কি! তারপরেই শুরু হইল তার কাশি-ভীষণ কাশি, কড়িবরগা-ফাটানো কাশি!

'ওকী! ওভাবে কাশছে কে?' বলিতে বলিতে উদবিগ্ন সুপারিনটেন্ডেন্ট ধ্রুববাবু ভীমের ঘরে আসিয়া ঢুকিলেন৷ ভীমসেনের কাশি তখন চরমে উঠিয়াছে, প্রায় দম বন্ধ হইবার গতিক৷ সে একটু থামিলে পর ধ্রুববাবু বলিলেন, 'এমন একখানা কাশি বাধিয়ে বসেছ অথচ আমায় একবারও খবর দাওনি৷'

বহুকষ্টে কাশির ধমক সামলাইয়া ভীমসেন বলিল, 'কাশিতে আমি ভয় খাইনে স্যার, কিন্তু নিশ্বাস নিতে বুকে যে ব্যথাটা উঠছে তাইতেই আমায় বড়ো কাবু করে ফেলেছে৷'

'বল কী, সঙ্গে সঙ্গে বুকে বেদনারও সৃষ্টি হয়েছে?' ত্রস্ত সুপারিনটেন্ডেন্ট তাড়াতাড়ি ভীমের বুকের উপর নিজের ডান কানটা লাগাইলেন, তারপর বুকে দুইটি টোকা এবং পিঠে দুইটি টোকা মারিয়া কহিলেন, 'হুঁ, যা ভেবেছি তাই৷'

'আপনি স্যার যতটা গুরুতর ভাবছেন ততটা বোধ করি নয়৷ গলা দিয়ে রক্ত তো কই আগের মতো তত পড়ে না! কেবল কালকে খেতের কাজে মাটি কোপাবার পরই যা আধ কাপটাক পড়েছিল৷ আজকে তাও কমে গেছে, বোধ করি সিকি কাপটাক পড়েছে৷'

ভয়ে নীল হইয়া ধ্রুববাবু কহিলেন, 'গলা দিয়ে রক্তও পড়ে নাকি আবার? অথচ তুমি বলছ ভাববার কারণ নেই? খেতে কাজ-টাজ তোমার করা চলবে না বাপু, ওসব একদম ছেড়ে দিতে হবে৷ আমার কথামতো দিন কতক ওষুধ খেলেই তোমায় আমি আরাম করে দেব, ভয় নেই৷ সকাল-বিকেল তোমায় দু-বেলা খোলা মাঠে বেড়াতে হবে৷ ভালো কথা, খাচ্ছ কী আজকাল?'

'ভাত, চচ্চড়ি, ডাল-সবই তো খাই স্যার৷'

'আরে ভাত চচ্চড়ির ভেতর কি আর কোনো সার বস্তু আছে? তোমার চাই পুষ্টিকর খাবার-একবেলা মাংস আর একবেলা ডিম না হলেই নয়৷ রোসো, হোস্টেল থেকেই তোমার জন্য ওসবের আলাদা বন্দোবস্ত করে দিচ্ছি আমি৷'

'খেতের কাজ কি তবে একটুও করতে পারব না স্যার? সামান্য একটুও না?'

'পাগল! আস্ত পাগল! এ অবস্থায় খেতের কাজ করতে কোনো ডাক্তার তার রোগীকে অনুমতি দিতে পারে?'

ধ্রুববাবু ঘরের বাহির হইতেই ভীমসেন খবরের কাগজ খুলিয়া দেখিল আজ সিনেমায় তিনটার শোতে কী ফিলম আছে৷ তারপর খানিকবাদেই চুল ফিরাইয়া সিল্কের পাঞ্জাবি গায়ে সে 'মাঠের খোলা বাতাস খাইতে' বাহির হইয়া পড়িল৷ যাইবার সময় হরিহরকে উদ্দেশ্য করিয়া একটু মুচকি হাসিতে ভুলিল না৷

পরদিন প্রাতে সুপারিনটেন্ডেন্ট সিঁড়ি দিয়া নীচে নামিতেছিলেন, পাশের বারান্দার দিকে নজর পড়ায় লক্ষ করিলেন কে একজন সেখানে বসিয়া হি-হি করিয়া কাঁপিতেছে৷ ব্যস্ত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, 'ওখানে বসে কাঁপছে ও কে?'

'আজ্ঞে আমি হরিহর৷ কাল রাত্রে বড়ো জ্বর হয়েছিল, এখনও শরীরটায় কাঁপুনি দিচ্ছে৷'

'হুঁ, ম্যালেরিয়া৷ বেশ বুঝতে পারছি৷ এদিকে এসো তো নাড়িটা দেখি৷'

হরিহর কহিল, 'জ্বর এখন নেই স্যার, শুধু শরীরটা বড়ো দুর্বল৷'

'ওই তো দোষ তোমাদের! জ্বর নেই, আসতে কতক্ষণ? . . . তাই তো নাড়ি তো বিশেষ সুবিধের নয়৷ তোমায় বাপু কিন্তু এখন কিছুদিন একেবারে বিশ্রাম নিতে হবে, আজকের দিনটা শুধু দুধ খেয়েই থাকো৷ দুধে অরুচি? আচ্ছা, কিছু বেদানা আঙুরেরও বন্দোবস্ত করে দেব৷'

'বিকেলে বোধ হয় একটু খেতের কাজ করতে পারি-কী-ই বা খেতি তাতে?'

'দেখো বাপু, তুমি, রুগি, রুগির মতোই থাকো, ডাক্তারিটা আমাকেই করতে দাও৷ খেতের কাজ-টাজ এখন তোমায় বেশ কিছুদিন বন্ধ রাখতে হবে৷'

হরিহর কোনোমতে আনন্দের হাসি গোপন করিয়া বলিল, 'আজ্ঞে, আপনি যখন নিষেধ করছেন তখন তো আর কোনো কথাই হতে পারে না৷'

বেলা সাড়ে ন-টার সময় রান্নাঘরের দিকে একটা গোলমালের শব্দ শুনিয়া ধ্রুববাবু সেই দিকে আগাইয়া গেলেন৷ দেখেন, প্রতাপবাবু রাগে গজরাইতেছেন৷ সুপারিনটেন্ডেন্টকে দেখিয়া তিনি রাগতস্বরে বলিলেন, 'শুনেছেন মশাই, হরিহর ছোঁড়ার কাণ্ড? আপনাকে ভাঁওতা দিয়ে এসেছে জ্বর হয়েছে, এদিকে রান্নাঘরে এসে বনমালী ঠাকুরকে দুই দাবড়ান দিয়ে এক থালা ভাত আদায় করে ওই আড়ালে খেতে বসেছিল৷ আমায় দেখেই পালিয়েছে৷'

সুপারিনটেন্ডেন্ট বললেন, 'ছেলেটার অসুখ নিশ্চয়ই তবে খুব বেড়ে গেছে প্রতাপবাবু৷ বেশি অসুখের সময়েতেই এ ধরনের দুষ্টু খিদেটা বাড়ে৷ ও তো একরত্তি ছেলে, বুড়ো মানুষদের পর্যন্ত এভাবে খেতে দেখা গেছে৷' প্রতাপবাবু দাঁতে দাঁত চাপিয়া সেস্থান পরিত্যাগ করিলেন৷

তারপর একদিনের মধ্যেই হোস্টেলে সে যেন এক সংক্রামক ব্যাধির উৎপত্তি হইল৷ ধ্রুববাবুর আর কামাই নাই, এঘর হইতে ওঘরে তিনি ডাক্তারি করিয়া ফিরিতেছেন৷ বিকাল বেলা অসুখ হইয়া পড়ায় পাঁচ-সাত জন বোর্ডার খেতের কাজে উপস্থিত হইতে পারিল না, পরদিন সকালে আরও জনা দশেক৷

প্রতাপবাবু সুপারিনটেন্ডেন্টকে আড়ালে ডাকিয়া নিয়া বলিলেন, 'দেখুন ধ্রুববাবু, অসুখবিসুখ সমস্তই ছোঁড়াদের কারসাজি৷ আমার খুব বিশ্বাস খেতের কাজ ওদের আর ভালো লাগছে না, তাই সব মিথ্যে অসুখের ভাঁওতা দিচ্ছে৷ আর তা ছাড়া ওদের খাওয়ার এবং বিশ্রামের আপনি যেরকম রাজসিক ব্যবস্থা করছেন তাতে ভবিষ্যতে শিগগির যে ওদের অসুখ সারবে তাও আমার মনে হচ্ছে না৷'

ধ্রুববাবু বিশেষ ক্ষুণ্ণ হইয়া বলিলেন, 'বড়োই দুঃখিত হলাম আপনার কথা শুনে প্রতাপবাবু! কোনটা আসল অসুখ আর কোনটা তা নয়, এ বোঝবার ক্ষমতাও আমার নেই নাকি! আপনি কি বলতে চান আমি হাতুড়ে ডাক্তার?'

একথার পর আর কথা চলে না, প্রতাপবাবু চুপ করিয়া রহিলেন৷

দেখিতে দেখিতে রোগীর সংখ্যা হু-হু করিয়া বাড়িয়া চলিল, প্রতাপবাবু প্রমাদ গণিলেন৷ দু-দিন পরে আবার তিনি সুপারিনটেন্ডেন্টকে আড়ালে ডাকিয়া বলিলেন, 'দেখুন ধ্রুববাবু, আমার ঠাকুরদা মরবার আগে একটা স্বপ্নাদ্য ওষুধের কথা বলে গিয়েছিলেন৷ যেমন-তেমন ক্ষেত্রে সে ওষুধ ব্যবহার করবার বারণ আছে বলেই এ ক-দিন তার সম্বন্ধে কোনো উচ্চবাচ্য করিনি৷ কিন্তু আমার বিশ্বাস এখন সেটা কাজে লাগাবার সময় হয়েছে-দেখছেন না হোস্টেলে প্রায় এপিডেমিকের অবস্থা৷ অনুমতি করেন তো সেটা একবার পরখ করে দেখি৷'

ধ্রুববাবু চক্ষু কপালে তুলিয়া কহিলেন, 'সে কখনো হতে পারে? ছেলেরা রয়েছে আমার চিকিৎসাধীনে, আর আপনি করবেন ওষুধের ব্যবস্থা! চিকিৎসা বিভ্রাট হবে যে-সে বড়ো ভয়ানক জিনিস৷'

'আহা হা, আপনি ভুলে যাচ্ছেন এটা যে স্বপ্নাদ্য ওষুধ৷ এতে কাজ দেবেই, দিতে বাধ্য- বহু 'কেসে' দিয়েছে৷ আমি জোর করে বলতে পারি এ ওষুধে আমি ছেলেদের আরাম করে তুলতে পারবই পারব৷' প্রতাপবাবু বাঁ-হাতের তেলোয় ডান হাতের মুঠোর আঘাত করিলেন৷

অনেক বাগবিতণ্ডার পর সুপারিনটেন্ডেন্ট অবশেষে রাজি হইলেন; প্রতাপবাবু তখন রান্নাঘরে গিয়া খিল দিলেন স্বপ্নাদ্য ওষুধ তৈরির উদ্দেশ্যে৷

স্বাস্থ্যের পক্ষে অহিতকারী নয়, অথচ সব চাইতে তেতো, সব চাইতে বিস্বাদ এবং সব চাইতে দুর্গন্ধ যে কয়টি জিনিস তাঁর জানা ছিল গাঁদাল পাতার রসে সেগুলিকে গুলিয়া প্রথমে তিনি কয়েকটি জাগ ভরতি করিলেন৷ তার পর ডান হাতে তারই একটি জাগ এবং বাঁ-হাতে মেজারগ্লাস নিয়া সুপারিনটেন্ডেন্টের কাছে আসিয়া তিনি জানাইলেন ওষুধ প্রস্তুত হইয়াছে৷

প্রথমেই ঢুকিলেন তাঁরা ভীমসেনের ঘরে৷ রয়াল সিনেমা হাউসের 'মুক্ত বায়ু'তে এতক্ষণ 'কিং কং' দেখিয়া আসিয়া এইবার সে একমনে স্পেশাল ডায়েট মাংসের ধ্যান করিতেছিল, হঠাৎ দেখিল মূর্তিমান বিভীষিকার মতো জাগহস্তে প্রতাপবাবু ঘরে ঢুকিলেন, সঙ্গে ধ্রুববাবু৷ ধ্রুববাবুই তাঁদের আগমনের উদ্দেশ্য জানাইলেন, বলিলেন, 'বাবা গোপাল, প্রতাপবাবুর ঠাকুরদার দেওয়া একটি স্বপ্নাদ্য ওষুধ আছে সেটা আজ আমরা একবার পরীক্ষা করব৷ এক ডোজ খেলেই নাকি তুমি সদ্য উপকার পাবে৷'

এই ভয়াবহ প্রস্তাবে সেই কুরুক্ষেত্র-বিধ্বংসী বীরবরের মুখ এক নিমেষে জিয়োমেট্রির বিন্দুর মতো এতটুকু হইয়া গেল৷ কোনোমতে ঢোঁক গিলিয়া সে বলিল, 'কেন স্যার, আপনার ওষুধেই তো দিব্যি ফল পাচ্ছি৷'

একটু গর্বের সহিত ধ্রুববাবু বলিলেন, 'পাচ্ছ নিশ্চয়ই সন্দেহ নাই, কিন্তু তাতে কাজ হচ্ছে ধীরে ধীরে, এ ওষুধটাতে নাকি কাজ হবে সঙ্গেসঙ্গে৷'

প্রতাপবাবু একটু মৃদু হাসিয়া বলিলেন, 'নিজের মুখে গর্ব করতে চাই না, ফলেন পরিচীয়তে৷' মেজার গ্লাসটি পূর্ণ করিয়া সেটি তিনি ভীমের দিকে বাড়াইয়া দিলেন৷

হায়রে, আসল দুর্যোধন আসিয়া আমাদের ভীমসেনকে এক ঘা গদার বাড়ি মারিল না কেন? তাতেও সে ততখানি কাহিল হইত না যতখানি হইল সে এক ডোজ ওষুধ সেবন করিয়া৷ অন্নপ্রাশনের ভাতকেও যে ঠেকাইয়া রাখা যায় না, ঠেলিয়া বাহির হইতে চায়৷

ধ্রুববাবু সোৎকন্ঠে জিজ্ঞাসা করিলেন, 'কী গোপাল, কেমন ঠেকছে?'

'অত্যন্ত খারাপ স্যার৷ এতক্ষণ শুধু বুকের এক পাশটাই ব্যথা করছিল, ওষুধ খাওয়া মাত্র দু-পাশেই ব্যথা শুরু হয়েছে৷'

ধ্রুববাবু একেবারে নিবিয়া গেলেন, বলিলেন, 'তাই তো প্রতাপবাবু, হিতে বিপরীত করে বসলেন নাকি?'

প্রতাপবাবু বলিলেন, 'কোনো ভাবনা নেই, নির্ভয়ে থাকুন৷ প্রথম এগারো ডোজ ওই রকমই মনে হবে বটে, কিন্তু বারো ডোজের পর থেকেই আসল উপকার স্পষ্ট বোঝা যাবে৷ দশ মিনিট বাদে বাদে এক-এক ডোজ পড়বে৷'

ভীমসেন মুখ কালি করিয়া করিল, 'বা-রো ডো-জ! দ-শ-মি-নি-ট বা-দে-বা-দে?'

'হাঁ, সেইরকমই নিয়ম কিনা, ঠাকুরদা বলে গেছেন৷ তোমার রিস্ট ওয়াচটা বার করো- সময়টা নোট করতে হবে তো!'

দ্বিতীয় ডোজ ওষুধ খাইবার পর ভীমসেন একেবারে লাফাইয়া উঠিল, 'আশ্চর্য ওষুধ স্যার, এ যে আমি কল্পনাও করতে পারিনি৷ বুকের ব্যথা আমার সম্পূর্ণ উবে গেছে৷ গত এক বচ্ছরে একদিনের তরেও আমি এতখানি সুস্থ বোধ করিনি৷ আর ওষুধে দরকার হবে না৷' নবলব্ধ স্বাস্থ্যের আনন্দে ভীমসেন ভীমবেগে ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল৷

ধ্রুববাবু একেবারে আত্মহারা হইয়া গেলেন, আনন্দের আবেগে প্রতাপবাবুর দুই হাত চাপিয়া ধরিয়া বলিলেন, 'এ ওষুধের ফরমুলাটা আমায় লিখে দিতেই হবে প্রতাপবাবু, না দিলেই চলবে না৷'

'হাঁ, তা দেব বই কী! আগে চলুন, আপনার অন্যান্য রোগীদের দেখে আসি৷'

স্বপ্নাদ্য ওষুধের আশাতীত ফল-একরাত্রের মধ্যেই হোস্টেল হইতে সমস্ত রকমের অসুখ কর্পূরের মতো উবিয়া গেল৷ পরদিন সকালে খেতের কাজে আর একটি বোর্ডারও অনুপস্থিত নাই৷

ওষুধের ফরমুলা দিতে কিন্তু প্রতাপবাবু আজ কাল বড়োই গড়িমসি লাগাইলেন৷ শেষটায় ধ্রুবপদবাবু ভাবিলেন-স্বপ্নাদ্য ওষুধ কিনা কাজেই ভিতরকার রহস্য ভাঙিবার ইচ্ছা প্রতাপবাবুর আদবেই নাই৷

(একটা ইংরেজি গল্পের ছায়া আছে)

মাঘ ১৩৪০

Cov88
সকল অধ্যায়
১.
চাং
২.
হাবুর বাবুগিরি
৩.
ভবম হাজাম
৪.
হুড়ুকবাজ সিং
৫.
হাতির ভয়
৬.
বোকা তাঁতি
৭.
ঝানু চোর চানু
৮.
বাঘ মামা
৯.
শ্বেতব্রাহ্মণের উপাখ্যান
১০.
এক হল দুই
১১.
রামভজনের ঘোড়া কেনা
১২.
দাশুর কীর্তি
১৩.
বুনো মোষ পোষমানা
১৪.
ষর্ণশের্ণ
১৫.
নেড়ুর ভয়
১৬.
হেঁড়ে-গর্জন দৈত্য
১৭.
চোর আর ঠগ
১৮.
আলি ভুলির দেশে
১৯.
বড়ো গদাই আর ছোটো গদাই
২০.
পুরস্কার
২১.
হেশোরাম হুঁশিয়ারের ডায়েরি
২২.
ঠেকে শেখা
২৩.
যুদ্ধের গল্প
২৪.
বন্ধুর দান
২৫.
মানুষের ইতিহাস
২৬.
সূর্যমুখীর কথা
২৭.
ন্যাপলা
২৮.
খেয়ালহারা
২৯.
পরিবর্তন
৩০.
আচ্ছা জব্দ
৩১.
সে
৩২.
মিষ্টি মুখ
৩৩.
চিচিং ফাঁক
৩৪.
অপরূপ রাজ্য
৩৫.
গরিবের দান
৩৬.
চোর ধরা
৩৭.
ময়ূরপঙ্খি
৩৮.
সম্পাদকের সমস্যা
৩৯.
তাইতো
৪০.
লাঠি-সমস্যা
৪১.
খুকির নাম
৪২.
স্বপ্নাদ্য ঔষধ
৪৩.
অজানা কুটুম
৪৪.
রায় মহাশয়ের গল্প
৪৫.
সমরের ষড়যন্ত্র
৪৬.
সুধাং-অ্যাং
৪৭.
ফাঁকিবাজের শিক্ষা
৪৮.
ঘঙ্গোপাধ্যায়
৪৯.
নিশুর বিপদ
৫০.
ফুটবল ম্যাচ
৫১.
এক ভাল্লুকের গল্প
৫২.
কৃপাময়
৫৩.
সেজমামার চন্দ্রযাত্রা
৫৪.
রূপসায়রী
৫৫.
দুই পড়শি
৫৬.
সন্দেশের চিঠি
৫৭.
সদাশিবের ঘোড়া-ঘোড়া কাণ্ড
৫৮.
ভবানন্দের কাশীযাত্রা
৫৯.
প্রথম পুরস্কার
৬০.
কালো মানিক
৬১.
চেঙ্গিস আর হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালা
৬২.
গোবিন্দ গোয়েন্দা
৬৩.
দুগ্যো সদ্দার
৬৪.
ক্যাপ্টেন মুকুন্দরাম
৬৫.
অসমঞ্জবাবুর কুকুর
৬৬.
পিপীলিকা আতঙ্ক
৬৭.
মরুপ্রাসাদের রহস্য
৬৮.
সাতজনের তিনজন
৬৯.
গোরুর বিচার
৭০.
সংস্কার
৭১.
গঙ্গোত্রীর মহাপুরুষ
৭২.
মিনিয়েচারের বোম্বাই যাত্রা
৭৩.
চিতা কাহিনি
৭৪.
বটুকেশ্বরের আবির্ভাব
৭৫.
নিবারণের সমস্যা
৭৬.
ফোর্থ টেস্ট
৭৭.
টাক এবং ছড়ি রহস্য
৭৮.
কলাবতীর ময়দান রিপোর্টিং
৭৯.
ভোটরঙ্গ
৮০.
ঢেউয়ের পরে ঢেউ
৮১.
পাগলা গণেশ
৮২.
সেতু বন্ধন
৮৩.
চিপুরি বিলের মহাশোল
৮৪.
রামেশ্বরের অসমাপ্ত কাজ
৮৫.
বলো তো কে এসেছিল ডিনারে
৮৬.
বোকা রাজার বুদ্ধিমতী রানি
৮৭.
টিপলুর ইতিহাস চর্চা
৮৮.
সোনার মেডেল উধাও
৮৯.
তুতানের বন্ধু
৯০.
ভূত মরলে কী হয়
৯১.
কথারা সব বেরিয়ে পড়েছিল
৯২.
বড়দার কবে ভালো লাগবে
৯৩.
শিবের অসাধ্যি
৯৪.
জয়রামের সিন্দুক
৯৫.
সংবাদের নেপথ্যে
৯৬.
নাড়কান্ডার নানাকাণ্ড
৯৭.
করণপুরার টাঁড়
৯৮.
সাঁঝবাতি
৯৯.
ক্রিকেট খেলার উপকারিতা
১০০.
অলক্ষ্যে হাসে মহাকাল
১০১.
লেখক-পরিচিতি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%