অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়
ডাকনামটা তার ভোলা হলে কী হবে, ভালো নামটা কিন্তু দিব্যি জমকালো৷ দাদু অনেক খুঁজে-পেতে সাধের নাতির নাম রেখেছিলেন-সারস্বত! বোধ হয় ভেবেছিলেন একদিন সরস্বতীর বরপুত্র-টুত্র হবে তাঁর নাতি!
মা কোথায় এতে খুশি হবেন, তা না! উলটে তিনি চোখ কপালে তুলে জিজ্ঞেস করেছিলেন, 'নিজের নামটা নিজে উচ্চারণ করতে পারবে তো?'
বাবাও সমান তালে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন, 'নামের বানানটা ঠিকমতো লিখতে পারবে কি না কে জানে৷'
দাদু মুচকি হেসে বলেছিলেন, 'সে তোমাদের দায়িত্ব!'
কিন্তু সে দায়িত্বটা কত কঠিন, তখন বোঝা যায়নি৷ ছেলে যত বড়ো হতে লাগল, বাবা-মা তত হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছিলেন৷ নামে সারস্বত হলেও সরস্বতীর ধারে-কাছেই ভিড়তে চায় না ছেলে৷ বাংলা আর ইংরেজি বর্ণমালা শেখাতে শেখাতেই মার হাঁপানি ধরে গেল, আর বাবার চোখের পাওয়ার বেড়ে গেল৷ বরং ওই ভোলা নামটাই ঠিক ছিল৷ আজ যা লেখে, কাল দিব্যি ভুলে যায়৷ কত কষ্টে যে ভোলাবাবু এখন ক্লাস সেভেন অবধি উঠেছে, তা শুধু সে ছাড়া আর সবাই জানে৷
তবে আর বোধ হয় উঠবে না৷ বাড়ির মাস্টারমশাই বাবা-মাকে স্পষ্ট বলে দিয়েছেন, 'আমি ছাত্র পড়াই৷ ছাগল চরাই না৷ গালভরা নাম রাখলেই ছেলে বিদ্যের জাহাজ হবে মনে করবেন না৷'
বাবা রাগ করে ভেবেছিলেন, ইশকুলে গিয়ে ছেলের নাম কেটে হাঁদা-ভোঁদা গোছের একটা নতুন নাম দিয়ে দেবেন৷ শুধু লজ্জার বশে পারেননি৷ তা ছাড়া দাদুর দেওয়া নাম তো! মা তাই খুব আপত্তি করেছিলেন৷
কিন্তু এত কাণ্ড যাকে নিয়ে, তার কোনো বিকার নেই৷ দিব্যি ফুর্তিতে আছে সে৷ খেলাধুলা দুষ্টুমি বাঁদরামি কোনো কিছু বাদ যায় না৷ বাদ শুধু লেখাপড়াটা৷ ওটা ওর ধাতে নেই৷ ইশকুলে যায় শুধু টিফিন খেতে আর বন্ধুদের সঙ্গে লাফালাফি করতে৷ বাড়ি ফিরেই নানান বায়নাক্কা আর বাঁদরামি৷ লেখাপড়াটা করবে কখন? বাবা নাহয় অফিস গিয়ে বেঁচে যান ছেলের হাত থেকে৷ মাকে তো ছেলে সামলাতে হয় কিনা সারাদিন! মা হওয়ার সুখটা তিনি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন এখন!
এদিকে যত বড়ো হচ্ছে ছেলে, তত গুণও বাড়ছে দিন দিন৷ মাকে বিশ্রাম দেওয়ার জন্যেই বোধ হয় বেশিক্ষণ বাড়িতে থাকে না আজকাল৷ ইশকুল থেকে ফিরেই রাস্তায়-টাস্তায় খেলতে-টেলতে বেরিয়ে পড়ে৷ মার বারণ শুনতে তার বয়ে গেছে!
সন্ধ্যে বেলা মাস্টারমশাই যখন পড়াতে আসেন, বেশির ভাগ দিনই রাস্তা থেকে তিনি ধরে আনেন গুণধর ছাত্তরটিকে৷ একদিন তো সোজা তিনি বলেই বসলেন, 'আমার ফিসটা এবার একটু বাড়িয়ে দিতে হবে কিন্তু৷'
বাবা তখনও অফিস থেকে ফেরেননি৷ মা ঘাবড়ে গিয়ে বললেন, 'কেন মাস্টারমশাই? আপনি যা বলেছেন, তাই তো দিচ্ছি আমরা৷'
'তা ঠিক৷' মাস্টারমশাই বললেন, 'কিন্তু তখন আমার শুধু পড়ানোর কথা ছিল৷ রোজ রোজ খুঁজেপেতে ধরে আনবার কথা ছিল না তো!'
মার মুখে আর কথা জোগায়নি৷
কিন্তু পয়সা দিয়ে কি সব হয়? মাস্টারমশাই রাখলেই কি লেখাপড়া শেখা যায়? তাঁরা তো অসাধ্য সাধন করতে পারেন না৷ স্বয়ং সরস্বতীকেই যদি শ্রীমান সারস্বতবাবুর লেখাপড়া শেখানোর ভার দেওয়া হত, তিনিও শেষ অবধি ফেল মেরে যেতেন বোধ হয়!
একটা অঙ্ক আগে আঠারো বার করিয়েছেন, সেই অঙ্কটাই পরের দিন আবার ভুল করে বসল ভোলাবাবু-মানে আমাদের সারস্বত৷ মাস্টারমশাই খাতা-কলম ফেলে উঠে পড়লেন৷ দমকা হাওয়ার মতো একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে গেলেন, 'তোকে লেখাপড়া শেখানো, পাশ করানো শিবেরও অসাধ্যি!'
ভোলা শুধু একটু মুচকি হাসি হেসে দিল৷ ভাবটা এই যে, তাতে তার কী! কে ঝুলোঝুলি করছে বিদ্যা-দিগগজ পণ্ডিত হবার জন্য!
এখন হল কী, ভোলার পড়ার টেবিলের পাশে একটা বাংলা ক্যালেন্ডার ঝুলছিল৷ তাতে ধ্যানে বসা শিবঠাকুরের ছবি আঁকা৷ ছবিটা হঠাৎ কেমন দুলে উঠল৷ মাস্টারমশাইর কথাটা কানে গেছে শিবঠাকুরের৷ ধ্যান-ট্যান ভেঙে তাই নড়েচড়ে বসলেন তিনি৷ তাঁর নামে কিনা এমন একটা বদনাম দিয়ে গেলেন মাস্টারমশাই! আজ পর্যন্ত কতরকম দারুণ দারুণ কাণ্ড করেছেন তিনি! কত বাঘা বাঘা ঠাকুরদেবতার কতরকম উপকার করেছেন, কত শত দত্যি-দানোদের জব্দ করেছেন, কতবার জগৎসংসার লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছেন! আর এই একটা পুঁচকে ছেলেকে পরীক্ষায় পাশ করাতে পারবেন না তিনি! ফুঃ! বললেই হল আর কি!
ক্যালেন্ডারের ছবি থেকেই তিনি একবার কটমট করে তাকালেন ভোলার দিকে৷ পড়ার ঘরে ভোলা এখন একলা৷ ওর মা বোধ হয় রান্নাঘরে৷ বাবাকেও আশেপাশে কোথাও দেখা যাচ্ছে না৷ মাস্টারমশাই চলে যাওয়ায় ভোলা ফুর্তিতে টেবিলের ড্রয়ার থেকে কয়েকটা নারকোল নাড়ু বার করে ফেলেছে, নির্ঘাত মা-র রান্নাঘর থেকে চুরি করা৷ সবে বিকেল বেলা মা বানিয়েছিলেন৷ এখনও হাতে গরম আছে বোধ হয়৷ আর কী ভুরভুরে গন্ধ ছড়াচ্ছে কপ্পুর আর এলাচদানার৷
ক্যালেন্ডারের ছবিতে আর সেঁটে থাকতে পারলেন না শিবঠাকুর৷ সড়াৎ করে সোজা নীচে নেমে পড়লেন৷ জিজ্ঞেস করলেন, 'অ্যাই ভোলা, নারকোল নাড়ু কোথায় পেলে শুনি? রান্নাঘর থেকে চুরি করে নিশ্চয়ই!'
'করেছি তো বেশ করেছি৷' ঘাড় ফিরিয়ে ট্যারা চোখে শিবঠাকুরকে একবার দেখে নিল ভোলা৷ জলজ্যান্ত অমন আস্ত শিব দেখেও সে এতটুকু ঘাবড়াল না৷ সিনেমা-টিভিতে অমন শিবঠাকুর সে ঢের দেখেছে৷ ব্যস্ত হয়ে গোটা দুয়েক নাড়ু তাড়াতাড়ি মুখে পুরতে পুরতে বলল, 'তাতে তোমার কী শুনি?'
শুকনো ঢোক গিলতে গিলতে শিবঠাকুর বললেন, 'না-আমার কিচ্ছু না৷ তবে তোমার গলায় আটকে যেতে পারে, এই আর কি৷ তাই বলছি একা খেয়ো না অতগুলো৷'
'অতগুলো আবার কোথায়? মাত্র তো পাঁচটা!' বলতে বলতে আর একটা নাড়ু মুখের মধ্যে দিব্যি চালান করে দিল ভোলা৷ হাঁ করে দেখতে দেখতে শিবঠাকুর বললেন, 'বেশ নরম নরম আর মিহি হয়েছে মনে হচ্ছে! সাইজগুলোও তো বেশ বড়ো বড়ো দেখছি৷ মিষ্টি হয়েছে তো ঠিকমতো?'
'কেন হবে না? আমার মার হাতের নাড়ু তো খাওনি কখনো৷' বলতে বলতে ভোলা বেশ আয়েস করে নাড়ু চিবোতে লাগল৷
শুকনো মুখে শিবঠাকুর বললেন, 'দিলে কোথায় যে খাব! সব তো একাই মেরে দিচ্ছ দেখছি৷'
ভোলা চটে গিয়ে বলল, 'বড্ড হ্যাংলা তো তুমি! খালি খাই খাই করছ তখন থেকে৷'
শিবঠাকুরও খুব খেপে গেলেন এবার৷ বললেন, 'আস্ত পেটুক একটা কোথাকার! এই জন্যেই তো তোমার লেখাপড়া কিসসু হয় না৷'
'হয় না তো হয় না, তাতে তোমার কী! ইসস, কোত্থেকে আমার গুরুঠাকুর এলেন রে!' বলেই শিবঠাকুরের দিকে একটি ভেংচি কেটে দিল ভোলা৷
'খুব যে ভেংচাচ্ছ আমাকে! এক্ষুনি কী বলে গেলেন তোমার গুরুঠাকুর? কানে যায়নি কথাটা?' শিবঠাকুর এবার রীতিমতো ধমক লাগালেন৷
'কী বলে গেলেন?' ঘাবড়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল ভোলা৷
'বললেন না, তোমাকে পাশ করানো শিবের অসাধ্যি!'
'তাতে কী!' একগাল হেসে ভোলা বলে উঠল, 'ওসব কথায় কান দিতে নেই৷'
'সে তুমি নাহয় নাই দিলে৷ কিন্তু দোষটা যে আমার ঘাড়ে এসে পড়ল, সে খেয়াল আছে?' ব্যাজার মুখে শিবঠাকুর বলতে লাগলেন, 'এসব কথা লোকের কানে গেলে আর কেউ আমার পুজো করবে? কেউ ভক্তি করবে? কোনো মান-সম্মান থাকবে আমার?'
বলতে বলতে মাস্টারমশাইর খালি চেয়ারটাতেই বসে পড়লেন শিবঠাকুর৷ নাড়ু চিবোনো থামিয়ে ভোলা খানিক ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল তাঁর দিকে৷ তারপর হঠৎ হো-হো করে হেসে উঠল৷ হাতের ত্রিশূলটা ঠক ঠক করে মেজেতে ঠুকতে ঠুকতে ঠিক মাস্টারমশাইর মতো ধমকে উঠলেন শিবঠাকুর, 'কী হল? অসভ্যের মতো হাসছ যে?'
হাসির ধমক আরও বেড়ে গেল ভোলার৷ হাসির চোটে বিষম খেতে সে বলতে লাগল, 'তোমার মতো চেয়ারে বসা শিবঠাকুর কখনো দেখিনি৷ বোসো, মাকে ডেকে এনে দেখাই৷'
সত্যি সত্যি ভোলা মাকে ডাকতে ছোটে আর কি৷ শিবঠাকুর ওই ত্রিশূল উঁচিয়ে কোনো রকমে দরজা আটকালেন৷ বললেন, 'থাক আর পাকামো মারতে হবে না৷ চেয়ার ছাড়া তোমাদের বাড়িতে সিংহাসন আর পাব কোথায়? পুজো-আচ্চার পাট বলে তো কিছু রাখেননি তোমার মা৷ ওই ক্যালেন্ডারের ছবিতে তো ফাঁসির আসামির মতো ঝুলে আছি অ্যাদ্দিন৷ নেহাত তোমার নামটার সঙ্গেই যা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক!'
রেগে-মেগে চেয়ারটায় একটু নড়েচড়ে বসলেন শিবঠাকুর৷ ত্রিশূলটা সামনের টেবিলে ঠেস দিয়ে রাখলেন৷ ভোলা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, 'আমার নামের সঙ্গে আবার কী সম্পর্ক তোমার?'
'বারে!' তিন চোখে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে শিবঠাকুর বললেন, 'তুমিও ভোলা, আর আমিও ভোলা, এই ভোলাবাবাই শেষপর্যন্ত তোমাকে পার করেগা! বুঝলে, ভোলাকান্ত!'
মুখ গোমড়া করে ভোলা বলল, 'অমন ভোলা ভোলা করবে না তো৷ আমার ভালো নাম সারস্বত৷'
ফিক করে অমনি হেসে ফেললেন শিবঠাকুর৷ মাথায় জটা চুলকোতে চুলকোতে বললেন, 'সেটাই তো হয়েছে মুশকিল! কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন৷ ছোটো খুকিটা প্রায়ই দুঃখ করে বলত-'
'ছোটো খুকি?' আর একটা নাড়ু প্রায় মুখে পুরে ফেলেছিল ভোলা৷ বিষম খাওয়ার মতো হঠাৎ যেন তার দম আটকে গেল৷ কীরকম ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, 'কে ছোটো খুকি?'
শিবঠাকুর ভেংচি কাটলেন, 'কে ছোটো খুকি৷ তা চিনবে কেন? তার সঙ্গে তো আড়ি তোমার৷ আরে ছোটো খুকি মানে আমার ছোটো মেয়ে সরস্বতী! বুঝলে হাঁদারাম৷'
'কে হাঁদা! খবরদার আমাকে গাল দেবে না বলছি?' রেগে-মেগে কচকচ করে নাড়ু চিবোতে শুরু করলে ভোলা৷
'গাল আবার দিলাম কোথায়?' বলতে বলতে শিবঠাকুর বোধ হয় জিভ দিয়ে একবার ঠোঁট চাটলেন৷ ভোলার নাড়ু চিবোনোর সঙ্গে সঙ্গে তাঁরও ঠোঁট যেন একটু একটু নড়তে লাগল৷ তখনও একটা আস্ত নাড়ু ভোলার হাতে৷ সেদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে শিবঠাকুর বলতে লাগলেন, 'লেখাপড়ার নামগন্ধ নেই, কচকচ করে নাড়ু চিবোতে তোমার লজ্জা করে না? আমার মেয়ের নাম ভাঙিয়ে নিজের গালভরা নাম জাহির করছ, আমাকে একটা নাড়ু দিতে পার না? কিন্তু এই ভোলাবাবাই তোমাকে পার করাবে, মনে রেখো৷'

'অ্যাঁ! তুমি আমাকে পার করাবে মানে?' ভোলা ব্যাপার-স্যাপার কিছু বুঝতে না পেরে হাঁ করে তাকিয়ে রইল৷ তার মুখের ভেতরে নাড়ুর খানিকটা অংশ তখনও দেখা যাচ্ছে৷
সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে শিবঠাকুর বললেন, 'পার করাব-মানে পাশ করাব আর কি! আমার অসাধ্যি বলে কিছু নেই, বুঝেছ বোকচন্দর! পরীক্ষায় এবার ফার্স্ট হবে তুমি!'
এত অবাক হয়েছিল ভোলা যে, তার হাঁ-করা মুখটা আরও হাঁ হয়ে গেল৷ এমন আজগুবি কথা জন্মেও সে ভাবেনি৷ খানিক বাদে কোনোরকমে বলতে পারল, 'আমাকে পাশ করাবে মানে? আমাকে তুমি প্রাইভেট পড়াবে নাকি?'
'ও সব প্রাইভেট টিউশনি-ফিউশনি আমি করি না৷ আমি বর দান করি৷ আমার বরে তুমি'-বলতে বলতে শিবঠাকুর বোধ হয় চেয়ার ছেড়ে উঠেছিলেন, বোধ হয় ভোলার মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করতে যাচ্ছিলেন, এমন সময় ফস করে লোডশেডিং হয়ে গেল৷ ঘরের মধ্যে ঘুরঘুট্টি অন্ধকার৷ ভোলা বলে উঠল, 'একদম নড়বে না, শিবুদাদু৷ আমি একটা মোমবাতি নিয়ে আসি৷'
'কিছুটি লাগবে না৷ মোমবাতির ঠাকুরদা আছে আমার কাছে৷' বলতে বলতে শিবঠাকুর খুট করে কী একটা শব্দ করলেন, অমনি সারা ঘরটা ভারি নরম একটা ঝলমলে আলোয় ভরে গেল৷ ভোলা তাকিয়ে দেখে, শিবঠাকুরের জটার কাছের একফালি চাঁদ থেকে ধবধবে আলো ঠিকরে বেরোচ্ছে৷ ঠিক একখানা এমার্জেন্সি লাইটের মতো!
কাণ্ড দেখে ভোলা তো একেবারে হাঁ৷ খুশিতে সে চেঁচিয়ে উঠল, 'বাহ! দারুণ তো?'
'তোমার পছন্দ হয়েছে? তাহলে এটা দিয়ে দেব তোমাকে৷ লোডশেডিং হলে এটা জ্বেলে দিব্বি লেখাপড়া করতে পারবে৷ যা লোডশেডিং তোমাদের শহরে৷'
'লেখাপড়া! ধুস!' শিবঠাকুরের কথা শুনে ঠোঁট বাঁকালো ভোলা৷ মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে বলল, 'ওসব আমার দ্বারা হবে না৷'
শিবঠাকুর তাকে বোঝাতে চেষ্টা করলেন, 'কেন হবে না? খুব হবে৷ ছোটো খুকিকেও আমি বলে দেব, বাপ-বেটি মিলে তোমাকে টপাটপ পাশ করিয়ে ছাড়ব৷ শুধু পাশ নয়, বছর বছর ফার্স্ট একেবারে-'
'কে চায় ফার্স্ট হতে!' শিবঠাকুরকে একদম পাত্তাই দিল না ভোলা৷ বলল, 'আমাদের ক্লাসের ফার্স্টবয়টা এক্কেবারে হাঁদা! গাছে চড়তে পারে না, সাঁতার কাটতে জানে না, ক্যারাম খেলায় খালি হেরে যায়, ভূতকে বেজায় ভয় পায়-'
'তুমি ভূতকে ভয় পাও না?' মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করলেন শিবঠাকুর৷ 'কিচ্ছুতে ভয় পাই না৷ শুধু-' বলতে বলতে ভোলার মুখটা কেমন কাঁচুমাচু হয়ে গেল৷
শিবঠাকুরও একটু অবাক হলেন৷ জিজ্ঞেস করলেন, 'শুধু কী?'
ভোলা আর কিছু বলে না৷ শুধু কচর কচর নাড়ু চিবোতে থাকে৷ তবে শিবঠাকুর সবজান্তা তো! তিন চোখ একটুখানি কপালে তুলেই তক্ষুনি হেসে ফেললেন৷ বললেন, 'ওহ বুঝেছি! লেখাপড়াকেই তোমার যত ভয়৷ আরে-অত ভয় কীসের? আমি আছি তবে কী করতে? কত হাবিজাবি লোককে কেমন রাজা-গজা বানিয়ে দিলাম, আর তোমাকে সামান্য পাশ করাতে পারব না? নাড়ু দিলে না তো দিলে না, তাই বলে-'
একটা নাড়ু তখনও ভোলার হাতে৷ হঠাৎ ভোলার কী হল, নাড়ুটা শিবঠাকুরের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, 'এই নাও৷ খাও৷ তখন থেকে যা নজর দিচ্ছ, খেলে নির্ঘাত পেট খারাপ হবে আমার৷'
নাড়ুটা নিয়ে অমনি টপ করে মুখে পুরে দিলেন শিবঠাকুর৷ সেটা চিবোতে চিবোতে বললেন, 'ভারি লক্ষ্মী ছেলে! সবাই আমার প্রসাদ পায়, আজ আমি তোমার প্রসাদ পেলাম৷ এই নাও আমার রুদ্রাক্ষের মালা৷ সবসময় গলায় পরে থাকবে এটা৷ দেখি, কার সাধ্যি তোমাকে ফেল করায়!'
'ধ্যাত!' ভোলা প্রায় ঠিকরে উঠল৷ মুখ ভেটকে বলল, 'আমি কি তোমার মতো বুড়ো যে, রুদ্রাক্ষের মালা পরব! বরং তোমার ত্রিশূলটা আমাকে দিয়ে যাও৷ ওটা খুঁচিয়ে গাছ থেকে পেয়ারা পাড়তে সুবিধে হবে৷'
দেওয়ালে ঠেস দেওয়া ত্রিশূলটার দিকে সবে ভোলা হাত বাড়িয়েছে তক্ষুনি দরজার বাইরে মার গলা শোনা গেল, 'ঘরে কী জ্বালিয়েছিস রে ভোলা? এত আলো কীসের?'
'ব্যাস, ফস করে অমনি আবার ঘর অন্ধকার৷ শিবঠাকুরের চাঁদ নিভে গেল৷ মা একটা মোমবাতি নিয়ে ঘরে ঢুকলেন৷ ভোলা চেঁচিয়ে উঠল, 'দিলে তো সব মাটি করে! ত্রিশূলটা প্রায় বাগিয়ে এনেছিলাম-'
'ত্রিশূল!' অবাক হয়ে মা জিজ্ঞেস করলেন, 'কার ত্রিশূল?'
'কার আবার! তোমাদের শিবঠাকুরের!' বলতে বলতে দেওয়ালের ছবিটার দিকে তাকাল ভোলা৷ ছবিতে শিবঠাকুরের ঠোঁটটা তখন নড়ে যাচ্ছে৷ ভোলার নাড়ুটা তখনও চিবোচ্ছেন বোধ হয়!
শারদীয়া ১৪০৯
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন