অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়
অনেকদিন আগে আবু বলে একটি মেয়ে ছিল৷ মেয়েটির তিন বছর বয়েস, কপালটা উঁচু, নাকটা খ্যাঁদা, বড়ো বড়ো চোখের মণি দুটোয় পেতলের রং আর গালে টোল পড়ে৷ চুলগুলো যেন একঝুড়ি বাদামি বট ফল৷ আর গায়ের রং রাগলে লাল, ভয় পেলে নীল আর হাসলে মিঠে আলোর মতো৷
এহেন আবু থাকত সিঙ্গাপুর শহরে আর সে শহরটা ছিল মালয়ে৷ আর মালয় হল-এ-ই-ই পাঁচ দিনের পথ৷
এখন হয়েছে কী, আবু যে কোথা থেকে এসেছে কেউ জানে না৷ সবাই বলছে, 'আহা, এমন পুতুলটি যে আবার জ্যান্ত!'
পথে কত যে মানুষ! চীনে, মালাই, সায়েব, বাঙালি, অবাঙালি-হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান৷ সবাই জিজ্ঞেস করল, 'হ্যাঁ মেয়ে, তোমার দেশ কোথায় গো?'
আবু বলল, 'এখেনে৷' বলে ঘট হয়ে বসে চেয়ে রইল৷
'তোমার মা কোথায়?'
'এখেনে৷'
'মাকে হারিয়ে ফেলেছ?'
'উঁহু৷'
'তবে?'
'মা যে আমায় খুঁজেই পায়নি৷'
বলে আবু তার বড়ো বড়ো চোখ দুটো মেলে সক্কলের মুখের দিকে চেয়ে চেয়ে দেখতে লাগল৷ তার পর হাসল৷ আর তার টোল-খাওয়া গালে মিষ্টি মিষ্টি রং ফুটে উঠতেই একজন ছুটে এসে ওকে কোলে নিয়ে বললেন, 'ওমা, তোকেই যে আমি সারাজীবন খুঁজছি৷'
আর আবুও চেয়ে থেকে বলে উঠল, 'তাহলে তুমিই আমার মা৷'
কাজেই আবুর মা পাওয়া গিয়েছে দেখে ভিড়ের লোকেরা খুশি হয়ে যে যার চলে গেল৷
আর আবুর মা সারাজীবন ধরে হাঁটাহাঁটি করে করে শেষে এমন আবুকে পেয়ে সমুদ্রের ধারে তার কুঁড়েঘরে গিয়ে খুশিতে একেবারে অস্থির হয়ে পড়লেন৷
সন্ধ্যে হলে আবু যখন তার কচি আধো গলায় গান ধরে তখন সেই গানের সুর শুনে আবুর মার দু-চোখ বেয়ে জল পড়ে-এ গান ও মেয়ে কোথায় শিখল! কেননা এ গান গাইলেই দূরের চর পেরিয়ে দেখা যায় আবুর সাইরেন আর মারমেডদিদি এসে হাজির হয়েছে৷ দেখা যায় আবুর খুদে রাজপুত্তুর সাগরদাদা আর দূর, আরও দূরের মাথাপাগল কালাপানিদাদা শান্ত মুখে ছলছল করছে৷ আরও দূরে, আরও আরও দূরে, সাতসমুদ্দুর পেরিয়ে, এপাশে-ওপাশে, কারা সব বসে গেছে গান শুনতে৷ কচি গলার গান৷
আবুর মা সব দেখতে পান৷ ভাবেন এ মেয়ে কোথার থেকে এল?
কিন্তু! জানাই আছে যে একটা কিন্তু এসে হাজির হবেই৷ বিশেষ করে এমন একজন নাম-না-জানা মার কোলে যদি আসে এমন একটি মেয়ে৷
সুলতানের পেয়াদারা লাঠি ঠুকে জানাল এ মেয়ে রাজার ঘরেই মানায়৷
মা কেঁদে বলেন, 'এতদিন তো বাছা রাস্তার ধুলোতেই গড়াচ্ছিল৷ কই তখন তো ওকে দেখতে পাওনি!'

কিন্তু ওরা তো কথা শুনতে আসেনি-বলতে এসেছে৷ আর এসেছে আবুকে ছিনিয়ে নিয়ে যেতে৷
তাই কোনো কিচ্ছু কানে না তুলে আবুকে জরির-ঝালর-দেওয়া গাড়িতে তুলে নিয়ে ওরা চলে গেল৷ মেয়ের গায়ে উঠল মখমলের জামা, গয়না৷ দেখতে দেখতে আবুর মিঠে আলোর মতো গায়ের রং বদলে নীল হয়ে উঠল৷
সুলতান সাহেব আবুকে দু-হাতে তুলে বললেন, 'জিনিসটা বেশ৷ পোষ মানবে তো?'
মন্ত্রী বললেন, 'ওর ঘাড় মানবে৷'
ভেতর মহলে নিয়ে যাওয়া হল 'জিনিস'টাকে৷ সুলতানের বেগমেরা জড়োয়ার গহনা আর পেসওয়াজের ভারে তেমন নড়তেচড়তে পারেন না৷ তবু তাঁরা হাঁপাতে হাঁপাতে আবুর চারধারে জড়ো হলেন৷ বাঁদিরা অবাক হয়ে আবুকে দেখতে লাগল৷ একজন বাঁদি আবুকে ছুঁয়ে বলল, 'ও মাগো-জ্যান্ত যে!'
শুনে বড়ো বেগমসাহেবা মেজোর গায়ে ঢলে পড়ে বললেন, 'ওমা দেখ দেখ ভাই, সত্যিই জ্যান্ত! ডাইনিদের মেয়ে বলে মনে হয়৷ দেখছিস না গায়ের রং কেমন পালটে যাচ্ছে!'
মেজো বেগমের মনটা ছিল নরম৷ তিনি জিভে চুক চুক করে আহা শব্দ তুলে বললেন, 'আহা মরে যাই, ভয় পেয়েছে দেখছ না?'
শুনে আবুর দু-চোখে দু-ফোঁটা জল দেখতে দেখতে গড়িয়ে পড়ার সময় মুক্তো হয়ে গেল৷
আর যাবে কোথায়! সুলতানের বেগমরা সব ভুলে বাঁদিদের সঙ্গে গুঁতোগুঁতি করে সেই চোখের জলের মুক্তো পাবার জন্যে চুল-ছেঁড়াছিঁড়ি ঝগড়া বাধালেন৷
এমন তুলকালাম কাণ্ড বাধল যে কেউ লক্ষই করল না যে আবুর রং এবার টকটকে লাল দেখাচ্ছে৷ ধাক্কাধাক্কির ঝোঁকে এটাও কারোর খেয়াল হল না যে আবুর চোখের জলের মুক্তো দুটো শুকিয়ে দুটো দাগ হয়ে মেঝেতে পড়ে চোখ মটকে হাসছে৷
ঠিক এমনি সময়ে-যখন আবুর গালের আভাটা গনগন করে উঠেছে-আকাশ রেগে টং হয়ে, মাথা ঝাঁকিয়ে, মেঘ ফুলিয়ে, বাজ বাগিয়ে ছুটে এল-ছি ছি, ছি, ছি, বলে চেঁচাতে চেঁচাতে৷ খুদে রাজপুত্তুর সাগরদাদা খেপে খুন হয়ে কালাপানিদাদাকে সঙ্গে করে ঘোড়া ছুটিয়ে খোলা তরোয়াল হাতে এগিয়ে এল৷ কালাপানিদাদার গলার সঙ্গে সাইরেনদিদি যখন তার চড়া গলার সুর মেলাল তখন সাতসমুদ্দুর তেরো দেশে সব থরহরি কম্প! আরও জুজু হয়ে গেল সবাই যখন মারমেডদিদি নিজের রূপের কথা ভুলে ল্যাজ আছড়ে প্রলয় বাধাল৷
কী যে লড়াই হল-তা কী বলব!
সুলতানসাহেব ভাবলেন-এই মওকায় তিনি বেগমদের ফেলে রেখেই নিজেকে জানে বাঁচাবেন৷ তাই চুপিচুপি রোলস রয়েস গাড়িখানা চড়ে পাড়িও দিয়েছিলেন৷ কিন্ত একী-এ কে!
কালাপানির চোখ এড়ায় না কিছুই৷ ভাইটির হাতে সে পাঠিয়েছে বান৷ সেই বান আসছে এগিয়ে-রোলস রয়েসটাকে লক্ষ করে৷ সুলতান কাঁপতে কাঁপতে বললেন, 'জিনিসটা চাই না-নিয়ে নাও, নিয়ে নাও! আমার জানের দরে ওটাকে নিয়ে নাও৷'
কিন্তু ততক্ষণে বান আকাশে উঠেছে৷ উঁচু থেকে সে দেখছে-ওটা কী! তাই বলো! এ যে সুলতানসাহেব, ভয়ে কেঁচো বনে গেছেন!
বানের জল পাড়ে আছড়ে পড়ল৷
তখন যত সোনামুক্তো হিরে জহরত সুলতানের প্রাসাদের খাঁজে খাঁজে আর বেগমসাহেবাদের গায়ে পায়ে জমা হয়েছিল তা খুদে রাজপুত্তুর সাগরদাদা কালাপানিরও হাতে পৌঁছে দিয়ে তবে দম নিল৷ আর সঙ্গেসঙ্গে ছোট্ট আবুকে ভাসিয়ে দিল ভেলায়৷
আবুকে দেখে সবাই হেসে উঠল৷ কী আনন্দ, কী আনন্দ! সাগরদাদা ছলাত করে উঠে আবুর মিঠে আলোরঙের গালে গাল ছুঁয়ে বলল, 'কীরে পাগলি, ফিরে এলি?'
মারমেডদিদিকে জল থেকে ভেলায় উঠে আসতে দেখে আবু হেসে হাততালি দিয়ে তার গলা জড়িয়ে ধরল, 'রাঙাদি, রাঙাদি, তুমি কি আমার কাছেই থাকবে?'
মারমেডদিদি আস্তে আস্তে ঘাড় নাড়ল৷ তার কালো লম্বা চুল মুখ থেকে সরিয়ে দিয়ে প্রবালের ঠোঁট আবুর টোল-খাওয়া গালের মিঠে রঙের ওপর ছুঁইয়ে সে শুধু ইশারা করল৷ মারমেডদিদির ঠোঁটে হাসি৷ চোখে জল৷ আবুর কচি হাত দুটো গলা থেকে খুলে নিয়ে ভেলা থেকে সে লেজ নামিয়ে জলে নেমে এল৷ তারপর আবার একবার দূরের দিকে চেয়ে ইশারা করে সে অতল জলে তলিয়ে গেল৷
মারমেডদিদির ভাষা ফোটেনি৷ তার সমস্ত কিছুই ইশারায় ফুটে ওঠে৷ তাই বাবা সাত-সমুদ্দুরের সে আদুরে মেয়ে৷
আবু ইশারা বোঝে৷ আবু বোঝে তার মারমেডদিদি তাকে কী বলে গেল৷ তাই তার আরও ভালোবাসতে ইচ্ছে করে এই বোবা দিদিটাকে৷
এবার আবু দূরের দিকে চোখ ফেরাল৷ সুর করে ডাকল সাইরেনদিদিকে-
'দি-ই-ইদি! দি-দি!'
সাইরেনদিদি সব সময় গা ঢাকা দিয়ে থাকে৷ হয়তো সাতসমুদ্দুর বলতে পারেন কোথায় থাকে তাঁর মেয়ে৷ শুধু শোনা যায় তার গলার সুর৷ এমন সুর যা প্রত্যেকবারেই নতুন৷ আর প্রত্যেকটা সুর সে আবুকে শুনিয়ে দেয়৷
এখন আবুর দিদি ডাকের প্রতিধ্বনির সুরকে নিজের গলায় বেঁধে নিয়ে করুণ গলায় ডাকে-
আবু সোনা
চাঁদের কোনা
আবু ময়না
কোলে আয় না-
আবুর চোখের জলে কূল ভেসে যায়৷ সে সুর তোলে-
মা যে ডাকে-
চায় আমাকে-
তবু সাইরেনদিদি, কী টানে, কে জানে, গেয়ে চলে-
তবু আয় না
আবু ময়না
মন মানে না-
এবার আবুর চোখের জলে ভিজে গিয়ে সাগরদাদা বলে, 'আর কাঁদিসনে আবু, আমার সর্দি হয়ে যাবে৷'
শুনে কালাপানিদাদার হোঃ হোঃ হোঃ হাসি, সারা তল্লাট কাঁপিয়ে তোলে৷ সে এমন হাসতে থাকে যে রোদ উঠে যায়৷ তখন সে আবুকে বলে, 'এবার তুই মার কাছে যা আবু৷'
আবু হাসে৷ ভেলা দোলে৷ আবু চেয়ে দেখে একটা সামপানে চড়ে ওই তো তার বাবা! ঠিক চিনেছে৷
সাগরদাদা ভেলায় দোল দেয়৷ আবু ঝুপ করে গিয়ে পড়ে তার বাবার সামপানে৷ ভেলাটা ভাসতে ভাসতে আপন মনে দিগন্তে মিশে যায়৷
আবুকে লুফে নিয়ে বাবা বলেন-
রূপসায়রী
দোদুল দুলি
পড়ে গেলি-
মা দাঁড়িয়ে ছিলেন ওদের কুঁড়েঘরের দোরগোড়ায়৷ মা হাসলেন আর কাঁদলেন৷ আর ওকে কোলে বসিয়ে মুখখানা ভালো করে দেখে নিয়ে বললেন, 'আহা, এমন মেয়ে শেষে আমার কুঁড়েতে এল!'
বাবাও ওর মুখখানা দেখলেন৷ চোখটা হাসি হাসি করে বললেন, 'মেয়ের কী রূপ, কী রূপ!' বলে ওর কপালে আঙুল ছুঁইয়ে গাইলেন-
ঢিল-কপালি
পেতল-চোখি
খ্যাঁদা-নাকি মেয়ে-
আবুও হাসল৷ তারপর মুখখানা পাকা বুড়ির মতো করে বলল, 'কুঁড়েঘরে থাক কেন বাবা?'
'কুঁড়েঘরে না থাকলেই যে প্রাসাদে থাকতে হবে!'
'তা তো হবেই৷'
'ওই দেখ!' বলে বাবা বানের জলে ভেসে যাওয়া সুলতানের প্রাসাদটা দেখিয়ে দিলেন৷
আবু আসলে তিন বছরের মেয়ে হলেও তিন-শো বছরের পাকা বুদ্ধি ওর ঘটে৷ তাই ও ব্যাপারটা বুঝে নেয়৷
আর বোঝে বলেই ও কুঁড়েঘর আলো করে বড়ো হয়৷
অনেক অনেকদিন পরে কালাপানিতে আবার তাইফুন ঝড় উঠেছে৷ সাইরেনদিদির গলা আকাশ ফাটাচ্ছে৷ ইশারা করছে মারমেডদিদি৷ আর ওই খুদে রাজপুত্তুর সাগর যত হিরে, জহরত আর তাল-পাকানো সোনা বানের জলে ভাসিয়ে নিয়ে সাতসমুদ্দুরের পায়ে ফেলে দিচ্ছে৷
আবু এখন অনেক দূরে থাকে৷ এত দূরে যে এ ঝড়টা সেখানে পৌঁছোয় না৷ তবু আবুর বুকের মধ্যেটা কীরকম করে ওঠে৷ আবুর গায়ে যে সহজ হাওয়া লাগে সে হাওয়াই ওকে বলে দিয়ে যায়৷ তাই মনে পড়ে৷
আবুর ছোট্ট ছেলেটা আর মেয়েটা ওর দু-হাত ধরে ডাকে-'মা, মা!'
আবু তাদের কোলে তুলে নিয়ে আরব সাগরের ওপারটার দিকে চেয়ে শোনে-তাকেই কে করুণ সুরে ডাকছে-
আবু সোনা
চাঁদের কোনা
আবু ময়না
বুকে আয় না৷
আশ্বিন ১৩৬৮
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন