বড়ো গদাই আর ছোটো গদাই

অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়

এক গ্রামে একই নামে আর একটু হাঁদা গোছের দুইজন লোক ছিল, দুইজনই গৃহস্থ৷ একজনের ছিল চারটা গোরু আর একজনের ছিল একটা গোরু৷ তাই গ্রামের সকলে চারটা গোরুওয়ালাকে বড়ো গদাই আর একটা গোরুওয়ালাকে ছোটো গদাই বলে ডাকত৷ বেচারা ছোটো গদাই আর কী করে, একটা গোরু দিয়ে তো আর চাষ করা চলে না৷ তাই সে সপ্তাহের ছয়টা দিন বড়ো গদাইকে তার গোরুটি ধার দিত আর তার পুরস্কারস্বরূপ রবিবার দিনটা সে নিজের কাজের জন্য বড়ো গদাইয়ের চারটা গোরুই পেত৷ এই ভাবে সপ্তাহে এক দিন করে সে পাঁচটা গোরু দিয়ে তার জমি চষত৷

সেদিন রবিবার, আকাশটা ছিল খুব পরিষ্কার৷ ছোটো গদাই তার গোরুটি আর বড়ো গদাইয়ের চারটা গোরু নিয়ে নিজের জমি চষছে আর মনের আনন্দে গুনগুন করে গান গাইছে, আবার মাঝে মাঝে চিৎকার করে বলছে, 'কী মজা! আমার পাঁচ-পাঁচটা গোরু কেমন হাল টানছে!' বড়ো গদাই ঠিক সেই সময় সে পথ দিয়ে যাচ্ছিল৷ সে শুনে রেগে আগুন হয়ে দৌড়ে এসে ছোটো গদাইকে বলল, 'খবরদার! আর কখনো বোলো না যে, পাঁচটা গোরুই তোমার, তাহলে কিন্তু লাঠি দিয়ে তোমার গোরুটাকে এক্ষুনি মেরে ফেলব৷'

ভয়ে ছোটো গদাই তখন চুপ করে রইল, কিন্তু খানিক পরেই সব ভুলে গিয়ে, আবার চেঁচিয়ে উঠেছে, 'কী মজা! আমার পাঁচটা গোরু কেমন হাল টানছে!' যেই না বলেছে অমনি বড়ো গদাই কোথা থেকে একটা বাঁশ নিয়ে এসে ছোটো গদাইয়ের গোরুর মাথায় মেরেছে এক ঘা, সঙ্গেসঙ্গে গোরুটাও মাটিতে পড়ে তক্ষুনি মরে গেল৷

বেচারা ছোটো গদাই কী আর করে, কাঁদতে কাঁদতে মরা গোরুটাকে নিয়ে বাড়িতে ফিরে এসে, গোরুটার ছাল ছাড়িয়ে সেটা রোদে শুকিয়ে নিল৷ তারপর একদিন সে একটা ছালায় করে সেই গোরুর শুকনো চামড়া নিয়ে, শহরে চলল বিক্রি করতে৷ শহরটা ছিল অনেকখানি দূরে, পথে আবার একটা মস্ত বন পার হয়ে যেতে হবে-আকাশও খুব মেঘলা করেছে৷ তাই ছোটো গদাই খানিক দূর গেলে পর প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এসেছে দেখে, পথের ধারেই এক গৃহস্থের বাড়ি দেখতে পেয়ে দরজায় ঘা দিল৷

গৃহস্থ বাড়ি ছিল না, তার স্ত্রী দরজা খুলে যখন জানতে পারল যে, ছোটো গদাই রাত্রিটা তাদের বাড়িতে থাকতে চায় তখন সে বলল, 'কর্তা বাড়িতে নাই, তুমি অন্যত্র চেষ্টা দেখো৷ আমি অচেনা লোককে বাড়িতে জায়গা দিতে পারব না,' বলে দরজা বন্ধ করে দিল৷

ছোটো গদাই আর কোনো কথা না বলে, গৃহস্থের বাড়ির লাগাই একটা কাঁচা ঘর ছিল, সেটা ছিল খড়ে বোঝাই, সেই খড়ের উপর শুয়ে থাকবার বন্দোবস্ত করল৷ যেখানে সে শুয়ে ছিল, সেখান থেকে চালের ফাঁক দিয়ে গৃহস্থের ঘরের ভিতরটা দেখা যায়৷ ছোটো গদাই দেখল যে, ঘরের ভিতর গৃহস্থের স্ত্রী আর পাদ্রি সাহেব বসে খাচ্ছে৷ টেবিলের উপরে কত রকমের ভালো ভালো সব খাবার রয়েছে৷ এমন সময়ে বাইরে ঘোড়ার পায়ের শব্দ শোনা গেল৷ এটা গৃহস্থের ঘোড়ার পায়েরই শব্দ, সে বাড়ি ফিরছে৷ গৃহস্থ ছিল খুব ভালো মানুষ, কিন্তু তার কেমন একটা খেয়াল ছিল যে, সে পাদ্রি-টাদ্রি দু-চক্ষে দেখতে পারত না৷ তাই পাদ্রি গৃহস্থ পত্নীর সঙ্গে দেখা করতে আসতেন, যখন গৃহস্থ বাড়ি থাকত না তখন; সেদিনও তাই এসেছিলেন৷ যাহোক হঠাৎ গৃহস্থের ঘোড়ার পায়ের শব্দ শুনে তার স্ত্রী করল কী, ভয়ে পাদ্রিকে মস্ত একটা সিন্ধুকের ভিতর লুকিয়ে রেখে, খাবারগুলো চটপট সরিয়ে ফেলে গৃহস্থকে দরজা খুলে দিল৷

এমন সময় ছোটো গদাই খুব জোরে একটা নিশ্বাস ফেলেছে, অমনি গৃহস্থ বলল, 'কে ও, খড়ের গাদায় শুয়ে?' তখন সে নেমে এসে সব কথা বলল পর, গৃহস্থ তাকে খুব আদর-যত্ন করে ভিতরে ডেকে নিয়ে দু-জনে মিলে খেতে বসল৷ কিন্তু এবারের খাবার ছিল শুধু সুজির পায়েস-গৃহস্থ পেটের জ্বালায় তাই কপাকপ খেতে লাগল৷ এদিকে ছোটো গদাইয়ের মন পড়ে আছে সেই সব লুকানো খাবারের দিকে, তার কি আর সুজির পায়েস ভালো লাগে? শেষে কিছুতেই লোভ সামলাতে না পেরে সে করল কী, টেবিলের তলায় যে তার থলেটা ছিল সেইটাকে পা দিয়ে চাপতে আরম্ভ করল, আর ভেতরের শুকনো চামড়াতে মচমচ আওয়াজ হতে লাগল৷ গৃহস্থ বেচারা ভয়ে অস্থির হয়ে বলল, 'এই, তোমার থলিতে কী আছে? কামড়াবে না তো?' ছোটো গদাই একটু হেসে বলল, 'ও কিছুই নয়; আমার থলিতে এক জাদুকর আছে৷ সে সুজির পায়েস খেতে বারণ করছে আর বলছে, সে নাকি জাদু করে উনুনের তলায় অনেকরকম খাবার রেখেছে৷' গৃহস্থ উনুনের কাছে গিয়ে দেখে জাদুকর যা বলেছে সব সত্যি; তখন একে একে সব খাবার এনে টেবিলের উপর রাখল৷ ছোটো গদাইয়ের ফুর্তি দেখে কে, সে টপাটপ সব খেতে লাগল৷ গৃহস্থ-পত্নী ভয়ে কিছু বলতেও পারছে না৷ এই সময়ে ছোটো গদাই আবার থলে মাড়িয়েছে আর মচমচ শব্দ শুনে গৃহস্থ বলল, 'তোমার জাদুকর আবার কী বলছে হে?' ছোটো গদাই বলল, 'এবার সে বলছে যে, সে নাকি জাদু-মন্ত্র বলে এক ভূত বানিয়ে তোমার ওই সিন্ধুকে রেখেছে৷' গৃহস্থও উঠে গিয়ে বাক্সের তলাটা একটু ফাঁক করেই 'বাপরে, মারে' বলে ধরাস করে আবার ডালাটা চাপা দিয়ে দিল৷ সে তো আর জানত না যে বাক্সের ভিতর পাদ্রিসাহেব আছেন; সে ভাবল বুঝি সত্যি সত্যিই ভূত৷

Cov40

জাদুকরের গুণ দেখে সে অবাক! ছোটো গদাইকে বলল, 'তোমাকে এক থলে মোহর দেব, তার বদলে এই জাদুকরটিকে আমায় দিতেই হবে৷' ছোটো গদাই অনেক আপত্তি করে শেষে রাজি হল৷ পরদিন গৃহস্থ তাকে এক থলি মোহর দিয়ে বলল, 'ভাই! ওই ভূতের বাক্সটাও কিন্তু তোমাকে নিয়ে যেতে হবে, এটাকে আমি কিছুতেই বাড়িতে রাখতে পারব না৷ তোমাকে একটা ঠেলাগাড়ি দিচ্ছি, তাতে করে তুমি তোমার মোহর আর এই ভূতের বাক্সটা নিয়ে যাও৷'

গাড়িতে মোহর আর সিন্ধুক বোঝাই করে ছোটো গদাই চলেছে৷ খানিক দূর গিয়েই একটা নদী, তাতে ভীষণ স্রোত আবার উপরে একটা পোলও আছে৷ সে পোলের মাঝামাঝি এসে বেশ জোরে জোরেই বলতে লাগল, 'বাবা! সিন্ধুকটা যা ভারী, এটাসুদ্ধ গাড়ি ঠেলা কি কম কথা? যাক, এইবারে নদীর জলে ফেলে দিলেই সব আপদ দূর হবে৷' এই বলে সে বাক্সটাকে ফেলবার জন্য যেই একটু তুলেছে, অমনি পাদ্রিমশাই তার মধ্যে থেকে চেঁচামেচি করে উঠেছেন, 'লক্ষ্মী বাবা আমার! তোমাকে এক থলে মোহর দেব, তুমি আমাকে জলে ফেলো না; আমাকে বার করে দাও৷'

ছোটো গদাই যেন ভারি আশ্চর্য হয়েছে এরূপ ভাবে বলল, 'তাই তো! পাদ্রিমশাই এখনও বাক্সের ভিতর আছেন দেখছি!' বলে সে বাক্সের ডালা খুলে তাঁকে বের করে দিল৷ পাদ্রি বাইরে এসে খালি বাক্সটা তখনই জলে ফেলে দিলেন আর ছোটো গদাইকে নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে এক থলে মোহর দিয়ে বিদায় করলেন৷

বাড়ি গিয়ে ছোটো গদাই দুই থলি মোহর মাটিতে ঢেলে দেখল যে, এই বড়ো এক স্তূপ মোহর হয়েছে৷ তখন তার আহ্লাদ দেখে কে? ভাবল, 'বড়ো গদাই আমার মোহরের কথা শুনে নিশ্চয়ই হিংসায় জ্বলে যাবে কিন্তু এখন ওকে কিছু জানানো হবে না৷' এই ভেবে সে তার চাকরকে নিকতি আনবার জন্য বড়ো গদাইয়ের বাড়িতে পাঠিয়ে দিল৷ বড়ো গদাই আশ্চর্য হয়ে গেল৷ নিকতি চায় কেন, কী মাপবে? তখন করল কী, নিকতির তলায় আঠা মাখিয়ে দিল৷ যখন সে নিকতিটা ফিরিয়ে পেল তখন দেখল যে, তার তলায় একটা মোহর লেগে আছে৷ তক্ষুনি সে ছোটো গদাইয়ের বাড়ি গিয়ে হাজির৷ বলল, 'হ্যাঁরে তুই এত মোহর পেলি কোথায়?' ছোটো গদাই বলল, 'আমার গোরুটা তুমি মেরে ফেললে৷ তখন তার চামড়াটা ছাড়িয়ে নিয়ে গিয়ে বাজারে বিক্রি করেছি৷'

একথা শুনে বড়ো গদাই বলল, 'বাঃ! একটা গোরুর চামড়া বিক্রি করে তো কম টাকা পাওনি?' এই বলে সে তখনই বাড়ি গিয়ে, তার চারটা গোরুই মেরে ফেলল আর তাদের চামড়া ছাড়িয়ে নিয়ে পরের দিনই চলল বাজারে বিক্রি করতে৷ কিন্তু কেউ আর এক থলে মোহর দিয়ে তার গোরুর চামড়া কিনতে রাজি হল না; তার উপর আবার সকলে তাকে পাগল বলে আর একটু হলে মার দিয়েছিল আর কি, ভাগ্যিস সে তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে এল৷ বাড়ি ফিরে এসে ছোটোর উপর যা রাগ! কেবলই ভাবছে-'হতভাগা ছোটোকে এবার সাবাড় না করে ছাড়ছি না৷'

এদিকে ছোটো গদাইয়ের বাড়িতে তার বুড়ি ঠাকুরমা মারা গিয়াছেন৷ বুড়ি ছোটোকে বড্ড গাল মন্দ করতেন, তবু তিনি মারা যাওয়াতে ছোটোর বড়ো দুঃখ হল৷ সে তাঁর মৃত দেহটাকে তার নিজের সুন্দর গরম বিছানাটিতে লেপ চাপা দিয়ে শুইয়ে দিল৷ ভাবল-যদি ঠাকুরমা গরম হয়ে আবার বেঁচে উঠেন৷ রাত্রি বেলা ছোটো ঘরের এক কোণে চেয়ারে বসে ঝিমোচ্ছে, এমন সময় রাত দুপুরে বড়ো গদাই কুড়ুল হাতে করে ঘরে ঢুকেছে৷ ঢুকেই ছোটোর বিছানার কাছে গিয়ে লেপের উপর দিয়েই তার ঠাকুরমার মাথায় ভীষণ এক ঘা! আর ভাবল, সে ছোটোকেই মেরেছে৷ তারপর, 'এখন কেমন লাগে? আমার সঙ্গে শয়তানি করবি?' এই বলে বাড়ি চলে এল৷

ছোটো সবই দেখছিল, সে ভাবল, 'বেটা তো ভারি বদ! ভাগ্যিস ঠাকুরমা আগেই মরেছিলেন, নইলে তো তাঁকে আজ বেটা খুনই করেছিল৷'

সকালে ছোটো গদাই প্রতিবেশীর একটা ঘোড়া চেয়ে এনে তার গাড়িতে জুতল৷ তারপর ঠাকুরমাকে কাপড়চোপড় পরিয়ে গাড়ির পিছনের গদিতে বেশ করে বসিয়ে দিল, যাতে গাড়ি চালালে পড়ে না যায়৷ এই করে সে নিজে গাড়ি হাঁকিয়ে চলল শহরের দিকে৷ তখন বেশ রোদ উঠেছে, একটা হোটেলের সামনে গাড়ি রেখে ভিতরে গেল জল খেতে৷ হোটেলওয়ালার সঙ্গে তাঁর জানাশোনা ছিল৷ লোকটি বেশ ভালো, তার অগাধ টাকা কিন্তু মেজাজটা একটু খিটখিটে৷ ছোটোকে দেখেই বলল, 'কী গদাই! সকাল বেলা কোথা যাওয়া হচ্ছে?' ছোটো বলল, 'ঠাকুরমাকে নিয়ে শহরে যাচ্ছি৷ তিনি বাইরে গাড়িতে আছেন৷ ভাই! অনুগ্রহ করে তাঁকে এক গেলাস জল দিয়ে আসবে? দেখো তাঁর সঙ্গে একটু জোরে কথা কয়ো, তিনি কিন্তু বড্ড কালা৷'

হোটেলওয়ালা এক গেলাস জল নিয়ে গিয়ে অনেকক্ষণ ধরে চেঁচামেচি করল কিন্তু বুড়ি কিছুতেই শুনতে পেল না৷ শেষকালে রেগে গিয়ে জলের গেলাসটা ছুড়ে মেরেছে বুড়ির মুখে আর সঙ্গেসঙ্গে বুড়িও ধপ করে মাটিতে পড়ে গিয়েছে৷ ছোটো গদাই সবই দেখছিল৷ সে তখনই 'কী সর্বনাশ! ঠাকুরমাকে খুন করলে?' বলে চেঁচিয়ে উঠল৷ হোটেলওয়ালা বেগতিক দেখে এক থলে মোহর এনে ছোটো গদাইয়ের হাতেপায়ে ধরে অনেক কষ্টে তাকে ঠান্ডা করল৷ ছোটো গদাইয়ের তো লাভই হল৷ সে আর কিছু না বলে এবং হোটেলওয়ালারই সাহায্যে ঠাকুরমার সৎকার করে বাড়ি ফিরে এল৷

তারপর দিন বড়ো গদাই দেখল ছোটো দিব্যি বেঁচে আছে৷ দেখে তো সে একেবারে অবাক! তার উপর আবার আরও এক থলে মোহর পেয়েছে শুনে, হিংসায় জ্বলেপুড়ে মরে৷ যাহোক, ছোটোর কাছে যখন সমস্ত কথা শুনল, তখন দৌড়ে বাড়ি ফিরে এসে, নিজের ঠাকুরমাকে মেরে থলেতে ভরে নিয়ে সেও চলল বিক্রি করতে৷ এবারেও সকলে তাকে বদ্ধ পাগল মনে করে তাড়িয়ে দিল৷

বাড়ি ফিরে এসে, কিছুতেই আর সহ্য করতে না পেরে বড়ো গদাই করল কী, রেগে ছোটো গদাইয়ের বাড়ি গিয়ে উপস্থিত৷ তাকে জোর করে ধরে, হাত-পা বেঁধে ছালায় পুরল আর নদীতে ফেলে দেবে বলে নিজে মাথায় করে নিয়ে চলল৷ ছোটো গদাই মাথায় চড়ে মনে মনে ভাবছে, কোনোরকমে বাঁচতে পারে কি না৷ এত বড়ো বোঝাটা মাথায় করে নিয়ে হাঁটা তো আর কম নয়! কাজেই একটুখানি পথ চলেই বেচারা বড়ো গদাই ক্লান্ত হয়ে, থলে নামিয়ে রেখে জল খেতে গিয়েছে৷

এদিকে এক বুড়ো চাষা সারাদিন খেতে কাজ করে, সন্ধ্যার সময় তার গোরু ক-টা নিয়ে বাড়ি ফিরছিল৷ চারদিক নির্জন, রাস্তাঘাটও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না৷ অস্পষ্ট আলোয় দেখতে পেল, একটা থলে তার দিকে গড়িয়ে গড়িয়ে আসছে! চাষা তো ভয়ে হাঁ করে সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে! এমন সময় শুনতে পেল, কে যেন তার ভিতর থেকে কী বলছে৷ চাষা তখন সাহস পেয়ে কাছে এসে জিজ্ঞাসা করল, 'কে তুমি থলের ভিতর-ব্যাপার কী?' ছোটো গদাই সময় বুঝে মাঝে মাঝে হঠাৎ চালাক হয়ে উঠত৷ সে সমস্ত কথা লুকিয়ে শুধু বলল, 'আরে ভাই, আমি সশরীরে স্বর্গে যাচ্ছিলাম৷ কিন্তু আমার অল্প বয়স, এত শিগগির পৃথিবী ছাড়তে কষ্ট হচ্ছে৷' চাষা বলল, 'এই কথা! তবে এক কাজ করো না-তোমার বদলে আমাকে কেন স্বর্গে পাঠিয়ে দাও না? আমি বুড়ো হয়েছি, আর বেঁচে থাকতে একটুও ইচ্ছে হচ্ছে না৷' ছোটো বলল, 'বেশ, বেশ-তাহলে আমাকে বার করে দাও৷' চাষা তাকে মুক্ত করে দিলে পর, ছোটো তাকে থলেতে ভরে থলের মুখ বেঁধে দিল৷ তারপর চাষার গোরু ক-টি নিয়ে সেখানে আর একটুও দেরি করল না৷

কিছুক্ষণ পরেই বড়ো গদাই ফিরে এসে আবার সেই থলে মাথায় করে চলতে আরম্ভ করল৷ কিন্তু এবার থলেটা হালকা লাগছে কেন? ভাবল-জল খেয়ে শরীর ঠান্ডা হয়েছে আর গায়ে জোর বেড়েছে-তাই৷ কিছু দূর গিয়ে একটা মস্ত নদীতে থলেটা ফেলে দিয়ে নিশ্চিন্ত মনে বাড়ি যেতে যেতে ভাবছে-'এবার ছোটো গদাইকে জলে ডুবে মরতে হবে; বাছাধন আর এবার পালাতে পারল না৷' এমন সময় হঠাৎ চেয়ে দেখে, একটু দূরেই ছোটো গদাই কতগুলো গোরু নিয়ে, মনের আনন্দে গান গাইতে গাইতে যাচ্ছে৷ বড়ো গদাই ছুটে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল, 'ছোটো গদাই, আমি নিজের হাতে তোমাকে একটু আগে নদীতে ফেলে দিয়ে এলাম আর এক্ষুনি তুমি এখানে কেমন করে এলে?' ছোটো গদাই একটু মুচকি হেসে বলল, 'ভাগ্যিস দাদা তুমি আমাকে জলে ফেলে দিয়েছিলে, তাই এতগুলো গোরু পেলাম৷' আরও অবাক হয়ে বড়ো গদাই জিজ্ঞাসা করল, 'সে কীরকম?' তখন ছোটো গদাই বলল, 'আমাকে যখন তুমি জলে ফেলে দিলে, তখন একজন জলের দেবতা এসে আমাকে একেবারে জলের তলায় নিয়ে গেলেন৷ সেখানে এইরকমই সবুজ ঘাস আছে, ঝিনুক শামুক ইত্যাদি দিয়ে মস্ত ঘর-বাড়ি সব তৈরি আর সব মণি-মুক্তা দিয়ে সাজানো৷ জলদেবতা আমাকে খুব আদর-যত্ন করলেন, তারপর ফিরে আসবার সময় এই গোরুগুলো দিলেন৷ তখন তোমার কথা বড্ড মনে হচ্ছিল দাদা৷ তুমিও কি যাবে?' এসব কথা শুনে বড়ো গদাইয়ের আহ্লাদের আর সীমা নাই; সে তক্ষুনি একটা ছালা এনে শুড়শুড় করে তার মধ্যে গিয়ে ঢুকেছে৷ ছোটো গদাইও সুযোগ বুঝে থলের মুখটা খুব কষে বেঁধে একটা মস্ত বড়ো পাথরসুদ্ধ ছুড়ে জলে ফেলে দিল৷ বড়ো গদাই ছালার মধ্যে বসে ভাবছে কখন জলের দেবতা আসবেন; বেচারা জানে না যে আর একটু পরেই তার অবস্থা কী হবে৷ এদিকে ছোটো গদাই নাচতে নাচতে বুড়ো চাষার সব গোরু নিয়ে মনের আনন্দে বাড়িতে ফিরে এল৷

(উপকথা)

মাঘ ১৩২৯

সকল অধ্যায়
১.
চাং
২.
হাবুর বাবুগিরি
৩.
ভবম হাজাম
৪.
হুড়ুকবাজ সিং
৫.
হাতির ভয়
৬.
বোকা তাঁতি
৭.
ঝানু চোর চানু
৮.
বাঘ মামা
৯.
শ্বেতব্রাহ্মণের উপাখ্যান
১০.
এক হল দুই
১১.
রামভজনের ঘোড়া কেনা
১২.
দাশুর কীর্তি
১৩.
বুনো মোষ পোষমানা
১৪.
ষর্ণশের্ণ
১৫.
নেড়ুর ভয়
১৬.
হেঁড়ে-গর্জন দৈত্য
১৭.
চোর আর ঠগ
১৮.
আলি ভুলির দেশে
১৯.
বড়ো গদাই আর ছোটো গদাই
২০.
পুরস্কার
২১.
হেশোরাম হুঁশিয়ারের ডায়েরি
২২.
ঠেকে শেখা
২৩.
যুদ্ধের গল্প
২৪.
বন্ধুর দান
২৫.
মানুষের ইতিহাস
২৬.
সূর্যমুখীর কথা
২৭.
ন্যাপলা
২৮.
খেয়ালহারা
২৯.
পরিবর্তন
৩০.
আচ্ছা জব্দ
৩১.
সে
৩২.
মিষ্টি মুখ
৩৩.
চিচিং ফাঁক
৩৪.
অপরূপ রাজ্য
৩৫.
গরিবের দান
৩৬.
চোর ধরা
৩৭.
ময়ূরপঙ্খি
৩৮.
সম্পাদকের সমস্যা
৩৯.
তাইতো
৪০.
লাঠি-সমস্যা
৪১.
খুকির নাম
৪২.
স্বপ্নাদ্য ঔষধ
৪৩.
অজানা কুটুম
৪৪.
রায় মহাশয়ের গল্প
৪৫.
সমরের ষড়যন্ত্র
৪৬.
সুধাং-অ্যাং
৪৭.
ফাঁকিবাজের শিক্ষা
৪৮.
ঘঙ্গোপাধ্যায়
৪৯.
নিশুর বিপদ
৫০.
ফুটবল ম্যাচ
৫১.
এক ভাল্লুকের গল্প
৫২.
কৃপাময়
৫৩.
সেজমামার চন্দ্রযাত্রা
৫৪.
রূপসায়রী
৫৫.
দুই পড়শি
৫৬.
সন্দেশের চিঠি
৫৭.
সদাশিবের ঘোড়া-ঘোড়া কাণ্ড
৫৮.
ভবানন্দের কাশীযাত্রা
৫৯.
প্রথম পুরস্কার
৬০.
কালো মানিক
৬১.
চেঙ্গিস আর হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালা
৬২.
গোবিন্দ গোয়েন্দা
৬৩.
দুগ্যো সদ্দার
৬৪.
ক্যাপ্টেন মুকুন্দরাম
৬৫.
অসমঞ্জবাবুর কুকুর
৬৬.
পিপীলিকা আতঙ্ক
৬৭.
মরুপ্রাসাদের রহস্য
৬৮.
সাতজনের তিনজন
৬৯.
গোরুর বিচার
৭০.
সংস্কার
৭১.
গঙ্গোত্রীর মহাপুরুষ
৭২.
মিনিয়েচারের বোম্বাই যাত্রা
৭৩.
চিতা কাহিনি
৭৪.
বটুকেশ্বরের আবির্ভাব
৭৫.
নিবারণের সমস্যা
৭৬.
ফোর্থ টেস্ট
৭৭.
টাক এবং ছড়ি রহস্য
৭৮.
কলাবতীর ময়দান রিপোর্টিং
৭৯.
ভোটরঙ্গ
৮০.
ঢেউয়ের পরে ঢেউ
৮১.
পাগলা গণেশ
৮২.
সেতু বন্ধন
৮৩.
চিপুরি বিলের মহাশোল
৮৪.
রামেশ্বরের অসমাপ্ত কাজ
৮৫.
বলো তো কে এসেছিল ডিনারে
৮৬.
বোকা রাজার বুদ্ধিমতী রানি
৮৭.
টিপলুর ইতিহাস চর্চা
৮৮.
সোনার মেডেল উধাও
৮৯.
তুতানের বন্ধু
৯০.
ভূত মরলে কী হয়
৯১.
কথারা সব বেরিয়ে পড়েছিল
৯২.
বড়দার কবে ভালো লাগবে
৯৩.
শিবের অসাধ্যি
৯৪.
জয়রামের সিন্দুক
৯৫.
সংবাদের নেপথ্যে
৯৬.
নাড়কান্ডার নানাকাণ্ড
৯৭.
করণপুরার টাঁড়
৯৮.
সাঁঝবাতি
৯৯.
ক্রিকেট খেলার উপকারিতা
১০০.
অলক্ষ্যে হাসে মহাকাল
১০১.
লেখক-পরিচিতি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%