অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়
বেলা দুপুর৷ উৎপলাক্ষী ছেলের খোঁজে সমুদ্রের ধারে এসে দেখলেন সেতুবন্ধনের কাজ প্রায় শেষ৷ ভিড়ের মধ্যে স্বামী উল্লম্ফককেও দেখতে পেলেন৷ ঘর্মাক্ত শরীরে আর সবার সঙ্গে পাথরের চাঁই নিয়ে জলে ফেলছেন৷ নিশ্বাস ফেলারও সময় নেই কারও৷ মনে হয় কাজ শেষ না করে আজ আর কেউ বাড়ি ফিরবেন না৷
কিন্তু ঝম্পক কোথায়? ছেলেমানুষ বলে তাকে বয়োজ্যেষ্ঠ বানরেরা কাছে ঘেঁষতে না দিলেও সে আশেপাশেই থাকে অন্যদিন৷ হঠাৎ খিলিখিলি কিচিমিচি হাসির শব্দে উৎপলাক্ষী ঘাড় ফেরালেন৷ কিছু দূরে একটা ফাঁকা জায়গায় ঝম্পক আরও দু-টি কিশোর বয়স্ক বানরের সঙ্গে খেলায় মত্ত৷ একে অন্যের লেজ ধরে ত্রিভুজাকৃতি হয়ে ছড়া বলতে বলতে বাঁই বাঁই করে ঘুরছে৷ শিশু বানরদের খুব প্রিয় খেলা এটি৷ নিজের শৈশবের কথা মনে পড়ায় উৎপলাক্ষীর মুখে মৃদু হাসি ফুটে উঠল৷ ছড়াটা তাঁর এখনও মনে আছে-
লেজে লেজে বেন্ধে নাও
হুপ হাপ লম্ফ দাও৷
ক্ষুদ্র বৃহৎ লাঙ্গুলে
লাঙ্গুলে আর আঙ্গুলে৷
আম্রফলার চাটপোট
আমরা সবাই একজোট৷৷
উৎপলাক্ষী তাকিয়ে দেখলেন, অন্য বানর দু-টি হেসে গড়িয়ে পড়ছে৷ তিনি একটু গলা চড়িয়ে ডাকলেন, 'ঝম্পক! বেলা হল, বাড়ি আসবি না?' ঝম্পক মাকে দেখে তিন লাফে কাছে এসে বলল, 'মা, ওই ওরাও আজ আমাদের সঙ্গে খাবে৷' উৎপলাক্ষী বললেন, 'বেশ তো, কিন্তু ওদের মা ভাববেন না?'
'না, মা, ওদের মা-বাবা তো এখানে নেই৷ ওরা এখানকার নয়৷ বাইরে থেকে এসেছে সেতুবন্ধন দেখতে৷'
'ও, ঠিক আছে৷ পাকা কলা, পেয়ারা, বদরী, অনেক আছে৷ ওদের ডেকে নিয়ে আয়৷'
ঝম্পক মহা উল্লাসে হুপ করে একটা লাফ দিয়ে বলল, 'তুমি যাও মা, আমরা এক্ষুনি আসছি৷'
বাড়ি ফিরে উৎপলাক্ষী খাবার গুছিয়ে রাখছেন, এমন সময় কিচিমিচি হুপহাপ করে শোরগোল তুলে ঝম্পক দুই বন্ধু নিয়ে এসে পড়ল৷ চোখ তুলে উৎপলাক্ষী অবাক৷ এরা কারা ঝম্পকের সঙ্গে? বানর নয় তো! প্রচণ্ড বলশালী সুগঠিতদেহ দুই কিশোর৷ আকৃতি মানুষের মতো হলেও দৈর্ঘ্য-প্রস্থ দেখলে ঠিক মানুষ বলেও মনে হয় না৷ তিনি আশ্চর্য হয়ে ঝম্পকের দিকে তাকাতে সে হ্যা-হ্যা করে হেসে বলল, 'কী, মা? কেমন ঠকিয়েছি? খুব চমকে গেছ তো? ওরা কে শুনলে আরও চমকাবে৷' তারপর বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে বলল, 'এই বল না৷'
কিশোর দু-টি হাত জোড় করে বলল, 'খুড়িমা, আমরা রাক্ষসবংশীয়৷ লঙ্কা থেকে এসেছি সেতুবন্ধন দেখতে৷'
খুড়িমা সম্বোধনেই উৎপলাক্ষীর মন গলে গিয়েছিল৷ তিনি সস্নেহে বললেন, 'বসো বাবা৷ কিন্তু লঙ্কা থেকে এখানে কোন সাহসে এলে তোমরা? ভয় করল না?'

'খুড়িমা, আমরা তো বানরের ছদ্মবেশে এসেছি৷ মা বলেছেন যুদ্ধ শুরু হলে লঙ্কা ধ্বংস হয়ে যাবে৷ আমরাও আর থাকব না হয়তো৷ তাই ভাবলাম এই বেলা সেতুবন্ধনটা দেখে নিই, নইলে একটা আফশোস থেকে যাবে৷'
ছেলে দু-টির কথায় উৎপলাক্ষী চোখে জল এসে গিয়েছিল৷ তিনি সজল চোখে বললেন, 'ছদ্মবেশ ছেড়ে ভালো করনি বাছারা, কে কোথা থেকে দেখতে পাবে৷' ছোটো ছেলেটি বলল, 'এই ঝম্পকটা আমাদের আসল চেহারা দেখতে চাইল৷' বড়োটি হেসে বলল, 'নিজেদের চেহারায় এসে আমরা হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছি৷ বেশিক্ষণ ছদ্মবেশে থাকতে গেলে হাঁসফাঁস লাগে বড্ড৷'
'তোমাদের নাম কী বাবা?'
'আমার নাম ব্যূঢ়োরস্ক, আর আমার ছোটো ভাইয়ের নাম বৃষস্কন্ধ৷'
'বাপরে! দারুণ খটোমটো নাম তো! আমি বরং তোমাদের বুড়ো আর বিশু বলে ডাকব৷' দুই কিশোর রাক্ষস একগাল হেসে বলল, 'আমাদের বাবা-মাও তাই ডাকেন৷'
তিন বন্ধু আর মা মিলে গল্পগুজব করে খাওয়া-দাওয়া চলছে, এমন সময় দরজায় ছায়া পড়ল৷ চারজন তাকিয়ে দেখে উল্লম্ফক৷ উৎপলাক্ষীর মুখ শুকিয়ে গিয়েছিল, তবু স্বাভাবিক হবার চেষ্টা করে বললেন, 'সেতু বাঁধা শেষ?' উল্লম্ফক ভেতরে এসে বসতে বসতে বললেন, 'হ্যাঁ, একেবারে সম্পূর্ণ৷ তারপর দুই নবাগত কিশোরকে দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, 'এরা?'
দুইজনেই নত হয়ে প্রণাম জানিয়ে বলল, 'পিতৃব্য, আমরা রাক্ষস৷ লঙ্কা থেকে এসেছি৷ সেতুবন্ধন দেখতে ভারি ইচ্ছে করছিল, তাই৷'
উল্লম্ফক ভ্রূকুঞ্চিত করে বললেন, 'রাক্ষস? গুপ্তচর?'
ঝম্পক তাড়াতাড়ি বলল, 'বাবা, ওরা আমার বন্ধু৷' উৎপলাক্ষী বললেন,
'গুপ্তচর হলে কি ওরা প্রথমেই নিজের পরিচয় দিত? ওরা ছেলেমানুষ, ওসব ছলাকলা জানে না?'
উল্লম্ফক গম্ভীর হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, 'তোমাদের নাম?'
'আমার নাম ব্যূঢ়োরস্ক আর ও বৃষস্কন্ধ৷'
বৃষস্কন্ধ হেসে বলল, 'বাবা-মা আমাদের বুড়ো আর বিশু বলে ডাকেন৷ খুড়িমা আর ঝম্পকও তাই৷'
'বিশু?' উল্লম্ফক একটু অন্যমনস্ক হয়ে বললেন, 'অনেকদিন আগে বিশু নামে আর একজন রাক্ষসের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়েছিল৷ যুবরাজ বালীর আদেশে আমি একবার লঙ্কায় গিয়েছিলাম লঙ্কাধিপতির কাছে দূত হয়ে৷ সেই সময় আলাপ হয়েছিল৷ তার নাম ছিল বিশঙ্কট৷'
বুড়ো আর বিশু একটু মুখ চাওয়াচাওয়ি করে বলল, 'তিনি তো আমাদের বাবা৷'
'বল কী? প্রভঞ্জন রাক্ষসের ছেলে বিশঙ্কট?'
'হ্যাঁ, প্রভঞ্জন তো আমাদের ঠাকুরদাদার নাম৷'
'তোমরা তো তাহলে আমার বন্ধুপুত্র৷ বাঃ বাঃ, ভারি খুশি হলাম তোমাদের দেখে৷'
উৎপলাক্ষী এতক্ষণে একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন৷
'প্রভঞ্জন তো খুব বুড়ো হয়েছেন বোধ হয়?'
বুড়ো বলল, 'হ্যাঁ তা হয়েছেন৷' বিশু ওকে বাধা দিয়ে বলল, 'তবে গায়ে এখনও যা জোর না৷ এখনও একাই এক-শোটা বা-'
উল্লম্ফক হেসে বললেন, 'বলো বলো, থামলে কেন? আমি দেখেছি তোমার দাদা তোমাকে চিমটি কেটে থামিয়ে দিয়েছে৷ ভয় নেই, আমি কিছু মনে করব না৷ তুমি বলতে যাচ্ছিলে, এখনও একাই এক-শোটা বানর খেতে পারেন৷ তাই তো?'
বিশু লজ্জিত হয়ে বলল, 'না, না, আমি বলছিলাম ঠাকুরদা এখনও একাই এক-শো জন বানরের সঙ্গে লড়তে পারেন৷'
'আরে এদিকেও অনেক বানর আছেন যাঁরা একাই এক-শো জন রাক্ষসকে ঘায়েল করতে পারেন৷ দু-পক্ষেই মহাবীরও যেমন আছেন, আবার আমার মতো ভিরু কাপুরুষও আছেন৷ আমার আবার যুদ্ধ-টুদ্ধ একদম ভালো লাগে না বুঝলে? কী জানি, তবু হয়তো সেই যুদ্ধেই এবার প্রাণটা দিতে হবে৷'
কিছুক্ষণ সবাই স্তব্ধ হয়ে বসে রইল৷ তারপর বুড়ো বলল, 'কাকা, মা আমাদের সূর্যাস্তের আগেই ফিরে যেতে বলেছেন৷'
উল্লম্ফক আর উৎপলাক্ষী দু-জনেই ব্যস্ত হয়ে পড়লেন, 'হ্যাঁ হ্যাঁ নিশ্চয়ই৷ বিকেল হয়ে গেল, আর দেরি নয়৷ তোমরা ছদ্মবেশ ধরে নাও৷'
মুহূর্তেই দু-জনে দুই কিশোর বানরে রূপান্তরিত হল৷ ঝম্পক তার বাবা-মার সঙ্গে ওদের এগিয়ে দিতে এল সমুদ্রের ধারে৷ বিশু বলল, 'চলি রে ঝম্পক৷ মনে রাখিস, যুদ্ধে যে পক্ষই জিতুক, আমরা কিন্তু বন্ধু৷' ঝম্পক বলল, 'তোরাও মনে রাখিস৷'
কয়েকদিন পরের কথা৷ যুদ্ধ শেষ হয়েছে৷ উল্লম্ফক ঘরে ঢুকে বললেন, 'একী, মায়ে-পোয়ে চুপচাপ বসে আছ? বিজয়োৎসবে যাওনি?' তারপর একটু উৎকর্ণ হয়ে বললেন, 'কাঁদে কে?'
উৎপলাক্ষী বিষণ্ণ গলায় বললেন, 'পাশের বাড়ির শিলাঙ্গী কাঁদছে৷ ওর স্বামী আর ছেলে দু-জনেই যুদ্ধে মারা গিয়েছে৷'
ঝম্পক করুণ কন্ঠে বলল, 'বুড়ো আর বিশু কেমন আছে কে জানে! আচ্ছা বাবা, ওরা তো আমাদের বন্ধু৷ ওদের সঙ্গে তো আমাদের কোনো ঝগড়া নেই৷ তবে?'
উল্লম্ফক প্রথমে উত্তর দিতে পারলেন না৷ একটু চুপ করে থেকে বললেন, 'ওরা বালক, নিশ্চয়ই বেঁচে আছে৷ কিন্তু ওদের বাবা, আমার বন্ধু বিশঙ্কট হয়তো বীরের মতো প্রাণ দিয়েছে৷'
ঝম্পক হঠাৎ লাফিয়ে উঠে বলল, 'আমি চললাম৷ যুদ্ধ শেষ এখন তো আর কোনো ভয় নেই৷ আমি লঙ্কায় চললাম৷'
উৎপলাক্ষী আর্ত স্বরে বললেন, 'ওরে যাস না৷'
উল্লম্ফক ধীর স্বরে বললেন, 'একটু দাঁড়া, আমিও আসছি৷'
অনেক রাত৷ রাক্ষস বিশঙ্কটের বাড়ির দরজায় কড়া নাড়ার শব্দের সঙ্গে কিচিমিচি গলায় শোনা গেল, 'বুড়ো, বিশু দরজা খোল৷' বিশুর সঙ্গে সঙ্গে ক্ষতবিক্ষতদেহ বিশঙ্কট এসে দরজা খুলে দিলেন৷ উল্লম্ফক আর ঝম্পক ঢুকল, পিছন পিছন উৎপলাক্ষী৷ ঝম্পক বিশুর দিকে চেয়ে বলল, 'মাও এসেছেন জোর করে৷ বুড়ো কই?' বিশঙ্কট রুদ্ধ স্বরে বললেন, 'বুড়ো বোধ হয় আর বাঁচবে না৷'
'সেকী?'
'বুড়ো কাল কৌতূহলী হয়ে একটা গাছের উপর চড়ে যুদ্ধ দেখছিল৷ একটা ত্রিশূল কোথা থেকে এসে ওর বুকে বিঁধে যায়৷ সেটা টেনে তুলে ফেলেছি৷ কিন্তু আজ বিকেল থেকে ও আর কথা বলছে না৷ নিশ্বাসও একটু আগে বন্ধ হয়ে গেল৷'
'কই দেখি!' তিন বানর মিলে খাটে শুয়ে থাকা বুড়োর কাছে এগিয়ে গেল৷ মাথার কাছে বসা বুড়োর মা হাউহাউ করে কেঁদে বললেন, 'কতবার যেতে বারণ করেছিলাম৷'
হঠাৎ বুড়োর মুখ থেকে একটা অস্ফুট কাতরোক্তি শুনে ঝম্পক লাফিয়ে উঠে বলল, 'এই তো বুড়ো বেঁচে আছে৷ এই যে, নিশ্বাস পড়ছে৷' বিশঙ্কট, বিশু আর ওর মা ব্যগ্র হয়ে বুড়োর মুখের দিকে চাইলেন৷ ঝম্পক উদ্ভাসিত মুখে চেঁচিয়ে বলল, 'মা, আমাদের মৃতসঞ্জীবনীতে কাজ হয়েছে৷ তার মানে বিশল্যকরণীতেও হবে৷ মৃতসঞ্জীবনীর গন্ধেই বুড়োর নিশ্বাস বইছে৷ জ্ঞানও আসবে৷'
উৎপলাক্ষীর মুখে এইবার হাসি ফুটল৷ বিশঙ্কটের স্ত্রী রাক্ষসী কৃশোদরীর দিকে চেয়ে হেসে বললেন, 'দিদি আর ভয় নেই৷ হনুমানদাদা যখন গন্ধমাদন নিয়ে এসেছিলেন, তখন আমরা অনেকেই চুপিচুপি মৃতসঞ্জীবনী আর বিশল্যকরণীর চারা সেখান থেকে নিয়ে বাড়িতে লাগিয়েছিলাম৷ অনেক চারা হয়েছে বাড়িতে৷ তাই, নিয়েই এসেছিলাম সঙ্গে করে৷ একটু ভয় ছিল, কী জানি কাজ হয় কি না! যান, শিগগির খল-নুড়ি নিয়ে আসুন৷'
তিন বানর আর তিন রাক্ষস-রাক্ষসী মিলে দারুণ ব্যস্ত হয়ে মৃতসঞ্জীবনী আর বিশল্যকরণীর রস করতে লেগে গেল৷
শারদীয়া ১৩৯৬
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন