হেশোরাম হুঁশিয়ারের ডায়েরি

অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়

প্রফেসর হুঁশিয়ার আমাদের উপর ভারি রাগ করেছেন৷ আমরা সেকালের জীবজন্তু সম্বন্ধে নানাকথা ছাপিয়েছি; কিন্তু কোথাও তাঁর অদ্ভুত শিকার কাহিনির কোনো উল্লেখ করিনি৷ সত্যি এ আমাদের ভারি অন্যায়৷ আমরা সেসব কাহিনি কিছুই জানতাম না৷ কিন্তু প্রফেসর হুঁশিয়ার তাঁর শিকারের ডায়েরি থেকে কিছু কিছু উদ্ধার করে আমাদের পাঠিয়েছেন৷ আমরা তারই কিছু কিছু ছাপিয়ে দিলাম৷ এসব সত্যি কি মিথ্যা তা তোমরা বিচার করে নিয়ো৷

'২৬ জুন, ১৯২২-কারাকোরাম, বন্দাকুশ পাহাড়ের দশ মাইল উত্তর৷ আমরা এখন সবসুদ্ধ দশজন-আমি, আমার ভাগনে চন্দ্রখাই, দুইজন শিকারি (ছক্কড় সিং আর লক্কড় সিং) আর ছয়জন কুলি৷ আমার কুকুরটাও সঙ্গে সঙ্গেই চলেছে৷

'নদীর ধারে তাঁবু খাটিয়ে জিনিসপত্র সব কুলিদের জিম্মায় দিয়ে, আমি, চন্দ্রখাই আর শিকারি দু-জনকে সঙ্গে করে বেরিয়ে পড়লাম৷ সঙ্গে বন্দুক, ম্যাপ আর একটা মস্ত বাক্স, তাতে আমাদের যন্ত্রপাতি আর খাবার জিনিস৷ দু-ঘণ্টা পথ চলে আমরা একজায়গায় এলাম, সেখানকার সবই কেমন অদ্ভুতরকম৷ বড়ো বড়ো গাছ, তার একটারও নাম আমরা জানি না৷ একটা গাছে প্রকাণ্ড বেলের মতো মস্ত মস্ত লাল রঙের ফল ঝুলছে; একটা ফুলের গাছ দেখলাম, তাতে হলদে সাদা ফুল হয়েছে, এক-একটা দেড় হাত লম্বা৷ আরেকটা গাছে ঝিঙের মতো কী সব ঝুলছে, পঁচিশ হাত দূর থেকে তার ঝাঁঝালো গন্ধ পাওয়া যায়৷ আমরা অবাক হয়ে এইসব দেখছি, এমন সময় হঠাৎ হুপহাপ গুবগাপ শব্দে পাহাড়ের উপর থেকে ভয়ানক একটা কোলাহল শোনা গেল৷

'আমি আর শিকারি দু-জন তৎক্ষণাৎ বন্দুক নিয়ে খাড়া; কিন্তু চন্দ্রখাই বাক্স থেকে দুই টিন জ্যাম বের করে নিশ্চিন্তে বসে খেতে লাগল৷ ওইটে তার একটা মস্ত দোষ; খাওয়া পেলে তার আর বিপদ-আপদ কিছুই জ্ঞান থাকে না৷ এইভাবে প্রায় মিনিট দুই দাঁড়িয়ে থাকবার পর লক্কড় সিং হঠাৎ দেখতে পেল হাতির চাইতেও বড়ো কী একটা জন্তু গাছের উপর থেকে তার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে হাসছে৷ প্রথমে দেখে মনে হল একটা প্রকাণ্ড মানুষ, তার পর মনে হল মানুষ নয় বাঁদর, তার পর দেখি মানুষও নয়, বাঁদরও নয়-একেবারে নতুন রকমের জন্তু৷ সে লাল লাল ফলগুলোর খোসা ছাড়িয়ে খাচ্ছে আর আমাদের দিকে ফিরে ফিরে ঠিক মানুষের মতো হাসছে৷ দেখতে দেখতে পঁচিশ-ত্রিশটা ফল সে টপাটপ খেয়ে শেষ করল৷ আমরা এই সুযোগে তার কয়েকখানা ছবি তুলে ফেললাম৷ তার পর চন্দ্রখাই ভরসা করে এগিয়ে গিয়ে তাকে কিছু খাবার দিয়ে আসল৷ জন্তুটা মহা খুশি হয়ে এক গ্রাসে আস্ত একখানা পাঁউরুটি আর প্রায় আধসের গুড় শেষ করে, তার পর পাঁচ-সাতটা সিদ্ধ ডিম খোলাসুদ্ধ কড়মড়িয়ে খেয়ে ফেলল৷ একটা টিনে করে গুড় দেওয়া হয়েছিল, সেই টিনটাও সে খাবার মতলব করেছিল, কিন্তু খানিকক্ষণ চিবিয়ে হঠাৎ বিশ্রী মুখ করে সে কান্নার সুরে গাঁও গাঁও শব্দে বিকট চিৎকার করে জঙ্গলের মধ্যে কোথায় যেন মিলিয়ে গেল৷ আমি জন্তুটার নাম দিয়েছি হ্যাংলাথেরিয়াম৷

Cov43

'২৪ জুলাই, ১৯২২-বন্দাকুশ পাহাড়ের একুশ মাইল উত্তর৷ এখানে এত দেখবার জিনিস আছে, নতুন নতুন এতসব গাছপালা জীবজন্তু, যে তারই সন্ধান করতে আর নমুনা সংগ্রহ করতে আমাদের সময় কেটে যাচ্ছে৷ দু-শোরকম পোকা আর প্রজাপতি আর পাঁচ-শোরকম গাছপালা ফুলফল সংগ্রহ করেছি; আর ছবি যে কত তুলেছি তার সংখ্যাই হয় না৷ একটা কোনো জ্যান্ত জানোয়ার ধরে সঙ্গে নেওয়ার ইচ্ছা আছে, দেখা যাক কতদূর কী হয়৷ সেবার যখন কটক টোডন আমায় তাড়া করেছিল, তখন সে কথা কেউ বিশ্বাস করেনি৷ এবার তাই জলজ্যান্ত প্রমাণ সংগ্রহ করে নিচ্ছি৷

'আমরা যখন বন্দাকুশ পাহাড়ে উঠেছিলাম, তখন পাহাড়টা কত উঁচু তা মাপা হয়নি৷ সেদিন জরিপের যন্ত্র দিয়ে আমি আর চন্দ্রখাই পাহাড়টাকে মেপে দেখলাম৷ আমার হিসাবে হল ষোলো হাজার ফুট৷ কিন্তু চন্দ্রখাই হিসাব করল বেয়ালি×শ হাজার৷ তাই আজ আবার সাবধানে দু-জনে মিলে মেপে দেখলাম, এবার হল মোটে দু-হাজার সাত-শো ফুট৷ বোধ হয় আমাদের যন্ত্রে কোনো দোষ হয়ে থাকবে! যাহোক এটা নিশ্চয় যে এ পর্যন্ত ওই পাহাড়ের চুড়োয় আর কেউ ওঠেনি৷ এ-এক সম্পূর্ণ অজানা দেশ, কোথাও জনমানুষের চিহ্নমাত্র নাই, নিজেদের ম্যাপ নিজেরা তৈরি করে পথ চলতে হয়৷

'আজ সকালে এক কাণ্ড হয়ে গেছে৷ লক্কড় সিং একটা গাছে হলদে রঙের ফল ফলেছে দেখে তারই একটুখানি খেতে গিয়েছিল৷ এক কামড় খেতেই হঠাৎ হাত-পা খিঁচিয়ে সে আর্তনাদ করে মাটিতে পড়ে ছটফট করতে লাগল৷ তাই দেখে ছক্কড় সিং 'ভাইয়া রে, ভাইয়া' বলে কেঁদে অস্থির৷ যাহোক মিনিট দশেক ওইরকম হাত-পা ছুড়ে লক্কড় সিং একটু ঠান্ডা হয়ে উঠে বসল৷ তখন আমাদের চোখে পড়ল যে একটা জন্তু কাছেই ঝোপের আড়াল থেকে অত্যন্ত বিরক্ত মতন মুখ করে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে৷ তার চেহারা দেখলে মনে হয় যে, সংসারে তার কোনো সুখ নেই, এসব গোলমাল কান্নাকাটি কিছুই তার পছন্দ হচ্ছে না৷ আমি তার নাম দিয়েছি গোমড়াথেরিয়াম৷ এমন খিটখিটে খুঁতখুঁতে গোমরা মেজাজের জন্তু আর আমরা দ্বিতীয় দেখিনি৷ আমরা তাকে তোয়াজ-টোয়াজ করে খাবার দিয়ে ভোলাবার চেষ্টা করেছিলাম৷ সে অত্যন্ত বিশ্রী মতো মুখ করে, ফোঁস ফোঁস ঘোঁৎ ঘোঁৎ করে অনেক আপত্তি জানিয়ে, আধখানা পাঁউরুটি আর দুটো কলা খেয়ে তার পর একটুখানি পেয়ারার জেলি মুখে দিতেই এমন চটে গেল যে রেগে সারা গায়ে জেলি আর মাখন মাখিয়ে আমাদের দিকে পিছন ফিরে মাটিতে মাথা ঠুকতে লাগল৷

'১৪ আগস্ট, বন্দাকুশ পাহাড়ের পঁচিশ মাইল উত্তর-ট্যাপ ট্যাপ থ্যাপ থ্যাপ ঝুপ ঝাপ- সকাল বেলায় খেতে বসেছি, এমন সময় এইরকম একটা শব্দ শোনা গেল৷ একটুখানি উঁকি মেরে দেখি আমাদের তাঁবুর কাছে প্রায় উটপাখির মতন বড়ো একটা অদ্ভুতরকম পাখি অদ্ভুত ভঙ্গিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে৷ সে কোন দিকে চলবে তার কিছুই যেন ঠিক-ঠিকানা নাই৷ ডান পা এদিকে যায় তো বাঁ-পা ওদিকে; সামনে চলবে তো পিছনভাগে চায়, দশ পা না যেতেই পায়ে পায়ে জড়িয়ে হোঁচট খেয়ে পড়ে৷ তার বোধ হয় ইচ্ছা ছিল তাঁবুটা ভালো করে দেখে, কিন্তু হঠাৎ আমায় দেখতে পেয়ে সে এমন ভড়কে গেল যে তক্ষুনি হুমড়ি খেয়ে হুড়মুড় করে পড়ে গেল৷ তার পর এক ঠ্যাঙে লাফাতে লাফাতে প্রায় হাত দশেক গিয়ে আবার হেলেদুলে ঘাড় বাঁকিয়ে আমাদের দেখতে লাগল৷ চন্দ্রখাই বলল, 'ঠিক হয়েছে, এইটাকে ধরে আমাদের সঙ্গে নিয়ে যাওয়া যাক৷' তখন সকলের উৎসাহ দেখে কে! আমি ছক্কড় সিংকে বললাম, 'তুমি বন্দুকের আওয়াজ করো, তাহলে পাখিটা নিশ্চয়ই চমকে পড়ে যাবে আর সেই সুযোগে আমরা চার-পাঁচজন তাকে চেপে ধরব!' ছক্কড় সিং বন্দুক নিয়ে আওয়াজ করতেই পাখিটা ঠ্যাং মুড়ে মাটির উপর বসে পড়ল, আর আমাদের দিকে তাকিয়ে ক্যাট ক্যাট শব্দ করে ভয়ানক জোরে ডানা ঝাপটাতে লাগল৷ তাই দেখে আমাদের আর এগোতে সাহস হল না৷ কিন্তু লক্কড় সিং হাজার হোক তেজি লোক, সে দৌড়ে গিয়ে পাখিটার বুকে ধাঁই করে এক ছাতার বাড়ি বসিয়ে দিল৷ ছাতার বাড়ি খেয়ে পাখিটা তৎক্ষণাৎ দুই পা ফাঁক করে উঠে দাঁড়াল৷ তার পর লক্কড় সিঙের দাড়িতে কামড়ে ধরে তার ঘাড়ের উপর দুই পা দিয়ে ঝুলে পড়ল৷ ভাইয়ের বিপদ দেখে ছক্কড় সিং বন্দুকের বাঁট দিয়ে পাখিটার মাথাটা থেঁতলে দেবার আয়োজন করেছিল৷ কিন্তু সে আঘাতটা পাখিটার মাথায় লাগল না, লাগল গিয়ে লক্কড় সিঙের বুকে৷ তাতে পাখিটা ভয় পেয়ে লক্কড় সিংকে ছেড়ে দিল বটে, কিন্তু দুই ভাইয়ে এমন মারামারি বেধে উঠল যে, আমরা ভাবলাম দুটোই এবার মরে বুঝি৷ দু-জনের তেজ কী তখন! আমি আর দু-জন কুলি ছক্কড় সিঙের জামা ধরে টেনে রাখছি, সে আমাদেরসুদ্ধ হিঁচড়ে নিয়ে ভাইয়ের নাকে ঘুসি চালাচ্ছে৷ চন্দ্রখাই রীতিমতো ভারিক্কে মানুষ; সে ছক্কড় সিঙের কোমর ধরে লটকে আছে, ছক্কড় সিং তাইসুদ্ধ মাটির থেকে তিন হাত লাফিয়ে উঠে বনবন করে বন্দুক ঘোরাচ্ছে৷ হাজার হোক পাঞ্জাবের লোক কিনা৷ মারামারি থামাতে গিয়ে সেই ফাঁকে পাখিটা যে কখন পালাল তা আমরা টেরই পেলাম না৷ যাহোক এই ল্যাগব্যাগে পাখি বা ল্যাগ-ব্যাগর্নিসের কতকগুলো পালক আর কয়েকটা ফটোগ্রাফ সংগ্রহ হয়েছিল৷ তাতেই যথেষ্ট প্রমাণ হবে৷

Cov44

'১ সেপ্টেম্বর, কাঁকড়ামতী নদীর ধারে-আমাদের সঙ্গে খাবার ইত্যাদি ক্রমেই ফুরিয়ে আসছে৷ তরিতরকারি যা ছিল, তা তো আগেই ফুরিয়েছে৷ টাটকা জিনিসের মধ্যে সঙ্গে কতগুলো হাঁস আর মুরগি আছে, তারা রোজ কয়েকটা করে ডিম দেয়, তা ছাড়া খালি বিস্কুট, জ্যাম, টিনের দুধ আর ফল, টিনের মাছ আর মাংস৷ এইসব কয়েক সপ্তাহের মতো আছে, সুতরাং এই কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আমাদের ফিরতে হবে৷ আমরা এইসব জিনিস গুনছি আর সাজিয়ে-গুছিয়ে রাখছি, এমন সময় ছক্কড় সিং বলল যে, লক্কড় সিং ভোর বেলা কোথায় বেরিয়েছে, এখন পর্যন্ত ফেরেনি৷ আমরা বললাম, 'ব্যস্ত কেন, সে আসবে এখন৷ যাবে আবার কোথায়?' কিন্তু তার পরেও দুই-তিন ঘণ্টা গেল অথচ লক্কড় সিঙের দেখা পাওয়া গেল না৷ আমরা তাকে খুঁজতে বেরোবার পরামর্শ করছি, এমন সময় হঠাৎ একটা ঝোপের উপর দিয়ে একটা প্রকাণ্ড জানোয়ারের মাথা দেখা গেল৷ মাথাটা উঠছে নামছে আর মাতালের মতো টলছে৷ দেখেই আমরা সুড়সুড় করে তাঁবুর আড়ালে পালাতে যাচ্ছি, এমন সময় শুনলাম লক্কড় সিং চেঁচিয়ে বলছে, 'পালিয়ো না, পালিয়ো না, ও কিছু বলবে না৷' তার পরের মুহূর্তেই দেখি লক্কড় সিং বুক ফুলিয়ে সেই ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল৷ তার পাগড়ির কাপড় দিয়ে সে ওই অত বড়ো জানোয়ারটাকে বেঁধে নিয়ে এসেছে৷ আমাদের প্রশ্নের উত্তরে লক্কড় সিং বলল যে, সে সকাল বেলায় কুঁজো নিয়ে নদী থেকে জল আনতে গিয়েছিল৷ ফিরবার সময় এই জন্তুটার সঙ্গে তার দেখা৷ তাকে দেখেই জন্তুটা মাটিতে শুয়ে কোঁ কোঁ শব্দ করতে লাগল৷ সে দেখল জন্তুটার পায়ে কাঁটা ফুটেছে আর তাই দিয়ে দরদর করে রক্ত পড়ছে৷ লক্কড় সিং খুব সাহস করে তার পায়ের কাঁটাটি তুলে, বেশ করে মুছে, নিজের রুমাল দিয়ে বেঁধে দিল৷ তার পর জানোয়ারটা তার সঙ্গে সঙ্গে আসছে দেখে সে তাকে পাগড়ি দিয়ে বেঁধে নিয়ে এসেছে৷ আমরা সবাই বললাম, 'তাহলে ওটা ওইরকম বাঁধাই থাক, দেখি ওটাকে সঙ্গে করে দেশে নিয়ে যাওয়া যায় কি না৷' জন্তুটার নাম রাখা গেল ল্যাংড়াথেরিয়াম৷

Cov45

'সকালে তো এই কাণ্ড হল; বিকেল বেলা আর এক ফ্যাসাদ উপস্থিত৷ তখন আমরা সবেমাত্র তাঁবুতে ফিরেছি৷ হঠাৎ আমাদের তাঁবুর বেশ কাছেই একটা বিকট চিৎকারের শব্দ শোনা গেল৷ অনেকগুলো চিল আর পেঁচা একসঙ্গে চেঁচালে যেরকম আওয়াজ হয়, কতকটা সেইরকম৷ ল্যাংড়াথেরিয়ামটা ঘাসের উপর শুয়ে শুয়ে একটা গাছের লম্বা লম্বা পাতা ছিঁড়ে খাচ্ছিল; চিৎকার শুনবামাত্র সে, ঠিক শেয়াল যেমন করে ফেউ ডাকে সেইরকম ধরনের একটা বিকট শব্দ করে, বাঁধন-টাধন ছিঁড়ে, কতক লাফিয়ে, কতক দৌড়িয়ে, এক মুহূর্তের মধ্যে গভীর জঙ্গলের ভিতর মিলিয়ে গেল৷ আমরা ব্যাপারটা কিছুই বুঝতে না পেরে ভয়ে ভয়ে খুব সাবধানে এগিয়ে গিয়ে দেখি, একটা প্রকাণ্ড জন্তু-সেটা কুমিরও নয়, সাপও নয়, মাছও নয়, অথচ তিনটেরই কিছু কিছু আদল আছে৷ সে এক হাত মস্ত হাঁ করে প্রাণপণে চেঁচাচ্ছে; আর একটা ছোটো নিরীহগোছের কী যেন জানোয়ার হাত-পা এলিয়ে ঠিক তার মুখের সামনে আড়ষ্ট হয়ে বসে আছে৷ আমরা মনে করলাম যে এইবার বেচারাকে খাবে বুঝি, কিন্তু পাঁচ মিনিট গেল, দশ মিনিট গেল, কেবল চিৎকারই চলতে লাগল; খাবার কোনো চেষ্টাই দেখা গেল না৷ লক্কড় সিং বলল, 'আমি ওটাকে গুলি করি৷' আমি বললাম, 'কাজ নেই, গুলি যদি ঠিকমতো না লাগে, তাহলে জন্তুটা খেপে গিয়ে কী জানি করে বসবে, তা কে জানে?' এই বলতে বলতেই ধেড়ে জন্তুটা চিৎকার থামিয়ে সাপের মতো এঁকে বেঁকে নদীর দিকে চলে গেল৷ চন্দ্রখাই বলল, 'জন্তুটার নাম দেওয়া যাক চিল্লানোসোরাস৷' ছক্কড় সিং বলল, 'উ বাচ্চাকো নাম দেও বেচারাথেরিয়াম৷'

Cov46

৭ সেপ্টেম্বর, কাঁকড়ামতী নদীর ধারে৷-নদীর বাঁক ধরে হাঁটতে হাঁটতে আমরা পাহাড়ের একেবারে শেষ কিনারায় এসে পৌঁছেছি৷ আর কোনোদিকে এগোবার জো নেই৷ দেওয়ালের মতো খাড়া পাহাড়; সোজা দুশো-তিনশো হাত নীচে সমতল জমি পর্যন্ত নেমে গিয়েছে৷ যেদিকে তাকাই, সেইদিকেই এরকম৷ নীচের যে সমতল জমি সে একেবারে মরুভূমির মতো; কোথাও গাছপালা, জনপ্রাণীর চিহ্নমাত্র নাই৷ আমরা একেবারে পাহাড়ের কিনারায় ঝুঁকে এইসব দেখছি, এমন সময় আমাদের ঠিক হাত পঞ্চাশেক নীচেই কী যেন একটা ধড়ফড় করে উঠল৷ দেখলাম, বেশ একটা মাঝারি গোছের তিমি গাছের মতো মস্ত কী একটা জন্তু পাহাড়ের গায়ে আঁকড়ে ধরে বাদুড়ের মতো মাথা নিচু করে ঘুমোচ্ছে৷ তখন এদিক-ওদিক তাকিয়ে এইরকম আরও পাঁচ-সাতটা জন্তু দেখতে পেলাম৷ কোনোটা ঘাড় গুঁজে ঘুমোচ্ছে, কোনোটা লম্বা গলা ঝুলিয়ে দোল খাচ্ছে, আর অনেক দূরে একটা পাহাড়ের ফাটলের মধ্যে ঠোঁট ঢুকিয়ে কী যেন খুঁটে খুঁটে বের করে খাচ্ছে৷ এইরকম দেখছি, এমন সময় হঠাৎ কটকটাৎ-কট শব্দ করে প্রথম জন্তুটা হুড়ুৎ করে ডানা মেলে একেবারে সোজা আমাদের দিকে উড়ে আসতে লাগল৷ ভয়ে আমাদের হাত-পাগুলো গুটিয়ে আসতে লাগল৷ এমন বিপদের সময় যে পালানো দরকার, তা পর্যন্ত আমরা ভুলে গেলাম৷ জন্তুটা মুহূর্তের মধ্যে একেবারে আমাদের মাথার উপরে এসে পড়ল৷ তারপর যে কী হল আমার ভালো করে মনে নেই-খালি একটু একটু মনে পড়ে, একটা অসম্ভব বিটকেল গন্ধের সঙ্গে ঝড়ের মতো ডানা ঝাপটানো আর জন্তুটার ভয়ানক কটকাটাং আওয়াজ৷ একটুখানি ডানার ঝাপটা আমার গায়ে লেগেছিল, তাতেই আমার দম বেরিয়ে প্রাণ বের হবার জোগাড় করেছিল৷ অন্য সকলের অবস্থাও সেইরকম অথবা তার চাইতেও খারাপ৷ যখন আমার হুঁশ হল তখন দেখি সকলেরই গা বেয়ে রক্ত পড়ছে৷ ছক্কড় সিঙের একটা চোখ ফুলে প্রায় বন্ধ হবার জোগাড় হয়েছে; লক্কড় সিঙের বাঁ-হাতটা এমন মচকে গিয়েছে যে সে যন্ত্রণায় আর্তনাদ করছে, আমারও সমস্ত বুকে পিঠে বেদনা ধরে গিয়েছে; কেবল চন্দ্রখাই এক হাতে রুমাল দিয়ে কপালের আর ঘাড়ের রক্ত মুছছে, আরেক হাতে একমুঠো বিস্কুট নিয়ে খুব মন দিয়ে খাচ্ছে৷ আমরা তখনই আর বেশি আলোচনা না করে জিনিসপত্র গুটিয়ে বন্দাকুশ পাহাড়ের দিকে ফিরে চললাম৷'

[প্রফেসর হুঁশিয়ারের ডায়েরি এইখানেই শেষ৷ কিন্তু আমরা আরও খবর জানবার জন্য তাঁকে চিঠি লিখেছিলাম৷ তার উত্তরে তিনি তাঁর ভাগনেকে পাঠিয়ে দিয়ে লিখলেন, 'এর কাছেই সব খবর পাবে৷' চন্দ্রখাইয়ের সঙ্গে আমাদের যে কথাবার্তা হয় খুব সংক্ষেপে তা হচ্ছে এই-

আমরা৷ আপনারা যেসমস্ত নমুনা সংগ্রহ করেছিলেন সেসব কোথায় গেলে দেখতে পাওয়া যায়?

চন্দ্র৷ সেসব হারিয়ে গেছে৷

আমরা৷ বলেন কী! হারিয়ে গেল? এমন সব জিনিস হারিয়ে ফেললেন!

চন্দ্র৷ হ্যাঁ, প্রাণটুকু যে হারায়নি তাই যথেষ্ট৷ সে-দেশের ঝড় তো আপনারা দেখেননি৷ তার এক এক ঝাপটায় আমাদের যন্ত্রপাতি, বড়ো বড়ো তাঁবু আর নমুনার বাক্স, সব কাগজের মতো হুস করে উড়িয়ে নেয়৷ আমাকেই তো পাঁচ-সাতবার উড়িয়ে নিয়েছিল৷ একবার তো ভাবলাম মরেই গেছি৷ কুকুরটাকে যে কোথায় উড়িয়ে নিল, সে তো আর খুঁজেই পেলাম না৷ সে যা বিপদ! কাঁটা কম্পাস, প্ল্যান, ম্যাপ, খাতাপত্র, কিছুই আর বাকি রাখেনি৷ কী করে যে ফিরলাম, তা শুনলে আপনার ওই চুল দাড়ি সব শজারুর কাঁটার মতো খাড়া হয়ে উঠবে৷ আধপেটা খেয়ে, কোনোদিন না খেয়ে, আন্দাজে পথ চলে, দুই সপ্তাহের রাস্তা পার হতে আমাদের পুরো তিন মাস লেগেছিল৷

আমরা৷ তাহলে আপনাদের প্রমাণ-টমান যা কিছু ছিল সব নষ্ট হয়েছে?

চন্দ্র৷ এই তো আমি রয়েছি, মামা রয়েছেন, আবার কী প্রমাণ চাই, আর এই আপনাদের জন্য কতকগুলো ছবি এঁকে এনেছি; এতেও অনেকটা প্রমাণ হবে৷

আমাদের ছাপাখানার একটা ছোকরা ঠাট্টা করে বলল, 'আপনি কোন থেরিয়াম?' আর-একজন বলল, 'উনি হচ্ছেন গপ্পথেরিয়াম-বসে বসে গপ্প মারছেন!' শুনে চন্দ্রখাই ভীষণ রেগে আমাদের টেবিল থেকে একমুঠো চীনেবাদাম আর গোটা আষ্টেক পান উঠিয়ে নিয়ে গজগজ করতে করতে বেরিয়ে গেল৷ ব্যাপার তো এই৷ এখন তোমরা কেউ যদি আরও জানতে চাও, তাহলে আমাদের ঠিকানায় প্রফেসর হুঁশিয়ারকে চিঠি লিখলে আমরা তার জবাব আনিয়ে দিতে পারি৷]

বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ১৩৩০

Cov47
সকল অধ্যায়
১.
চাং
২.
হাবুর বাবুগিরি
৩.
ভবম হাজাম
৪.
হুড়ুকবাজ সিং
৫.
হাতির ভয়
৬.
বোকা তাঁতি
৭.
ঝানু চোর চানু
৮.
বাঘ মামা
৯.
শ্বেতব্রাহ্মণের উপাখ্যান
১০.
এক হল দুই
১১.
রামভজনের ঘোড়া কেনা
১২.
দাশুর কীর্তি
১৩.
বুনো মোষ পোষমানা
১৪.
ষর্ণশের্ণ
১৫.
নেড়ুর ভয়
১৬.
হেঁড়ে-গর্জন দৈত্য
১৭.
চোর আর ঠগ
১৮.
আলি ভুলির দেশে
১৯.
বড়ো গদাই আর ছোটো গদাই
২০.
পুরস্কার
২১.
হেশোরাম হুঁশিয়ারের ডায়েরি
২২.
ঠেকে শেখা
২৩.
যুদ্ধের গল্প
২৪.
বন্ধুর দান
২৫.
মানুষের ইতিহাস
২৬.
সূর্যমুখীর কথা
২৭.
ন্যাপলা
২৮.
খেয়ালহারা
২৯.
পরিবর্তন
৩০.
আচ্ছা জব্দ
৩১.
সে
৩২.
মিষ্টি মুখ
৩৩.
চিচিং ফাঁক
৩৪.
অপরূপ রাজ্য
৩৫.
গরিবের দান
৩৬.
চোর ধরা
৩৭.
ময়ূরপঙ্খি
৩৮.
সম্পাদকের সমস্যা
৩৯.
তাইতো
৪০.
লাঠি-সমস্যা
৪১.
খুকির নাম
৪২.
স্বপ্নাদ্য ঔষধ
৪৩.
অজানা কুটুম
৪৪.
রায় মহাশয়ের গল্প
৪৫.
সমরের ষড়যন্ত্র
৪৬.
সুধাং-অ্যাং
৪৭.
ফাঁকিবাজের শিক্ষা
৪৮.
ঘঙ্গোপাধ্যায়
৪৯.
নিশুর বিপদ
৫০.
ফুটবল ম্যাচ
৫১.
এক ভাল্লুকের গল্প
৫২.
কৃপাময়
৫৩.
সেজমামার চন্দ্রযাত্রা
৫৪.
রূপসায়রী
৫৫.
দুই পড়শি
৫৬.
সন্দেশের চিঠি
৫৭.
সদাশিবের ঘোড়া-ঘোড়া কাণ্ড
৫৮.
ভবানন্দের কাশীযাত্রা
৫৯.
প্রথম পুরস্কার
৬০.
কালো মানিক
৬১.
চেঙ্গিস আর হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালা
৬২.
গোবিন্দ গোয়েন্দা
৬৩.
দুগ্যো সদ্দার
৬৪.
ক্যাপ্টেন মুকুন্দরাম
৬৫.
অসমঞ্জবাবুর কুকুর
৬৬.
পিপীলিকা আতঙ্ক
৬৭.
মরুপ্রাসাদের রহস্য
৬৮.
সাতজনের তিনজন
৬৯.
গোরুর বিচার
৭০.
সংস্কার
৭১.
গঙ্গোত্রীর মহাপুরুষ
৭২.
মিনিয়েচারের বোম্বাই যাত্রা
৭৩.
চিতা কাহিনি
৭৪.
বটুকেশ্বরের আবির্ভাব
৭৫.
নিবারণের সমস্যা
৭৬.
ফোর্থ টেস্ট
৭৭.
টাক এবং ছড়ি রহস্য
৭৮.
কলাবতীর ময়দান রিপোর্টিং
৭৯.
ভোটরঙ্গ
৮০.
ঢেউয়ের পরে ঢেউ
৮১.
পাগলা গণেশ
৮২.
সেতু বন্ধন
৮৩.
চিপুরি বিলের মহাশোল
৮৪.
রামেশ্বরের অসমাপ্ত কাজ
৮৫.
বলো তো কে এসেছিল ডিনারে
৮৬.
বোকা রাজার বুদ্ধিমতী রানি
৮৭.
টিপলুর ইতিহাস চর্চা
৮৮.
সোনার মেডেল উধাও
৮৯.
তুতানের বন্ধু
৯০.
ভূত মরলে কী হয়
৯১.
কথারা সব বেরিয়ে পড়েছিল
৯২.
বড়দার কবে ভালো লাগবে
৯৩.
শিবের অসাধ্যি
৯৪.
জয়রামের সিন্দুক
৯৫.
সংবাদের নেপথ্যে
৯৬.
নাড়কান্ডার নানাকাণ্ড
৯৭.
করণপুরার টাঁড়
৯৮.
সাঁঝবাতি
৯৯.
ক্রিকেট খেলার উপকারিতা
১০০.
অলক্ষ্যে হাসে মহাকাল
১০১.
লেখক-পরিচিতি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%