অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়
ডিগবাজি খাঁ ডোবায় জল খেতে এসে দেখে, কাদাখোঁচা পাখিরা ডোবার জল বিলকুল নোংরা করে আবার কাদা করে দিয়েছে!
ডিগবাজি খাঁ রাগ করে বলল, 'তোদের কি আক্কেল গেছে? ভদ্রলোকেরা জল খাবে আর তোরা কিনা সব জল নোংরা করে কাদা করে দিলি? সারাদিন কাদা ঘেঁটে তোদের বুদ্ধিটাও তেমনি হয়েছে৷'
এই কথায় কাদাখোঁচা পাখিরা শেয়ালকে গরম গরম আচ্ছা দু-কথা শুনিয়ে দিল৷
সারস পাখিরা পাশেই ছিল; ঝগড়ার ফাঁক পেলে তাদের তো পোয়াবারো; শুধু একটা অছিলা চাই৷ চেঁচামেচিতেও তাঁদের সঙ্গে কেউ বড়ো পেরে উঠে না৷ তারা সবাই একসঙ্গে চেঁচিয়ে বলল, 'জানোয়ার আবার ভদ্রলোক নাকি! ছোটো জাতের স্পর্ধা দেখো না! যত বড়ো মুখ নয় তত বড়ো কথা৷'
বাচ্চু (ওয়াক পাখি) উপর থেকে মাথা নেড়ে বলল, 'হক কথা, হক কথা!'
হাঁড়িচাঁচা পাখিটা দূর থেকে শুনে হি-হি করে হেসে উঠলে৷
ডিগবাজি খাঁ গাল খেয়ে মুখ লাল করে বাড়ি ফিরে এল৷ সে সারস, বাচ্চু ও হাঁড়িচাঁচার কথাগুলি বনের সবাইকে বলে বেড়াল৷
সকলে একবাক্যে বলল, 'কী জানোয়ারদের নিয়ে ঠাট্টা আর গালাগালি? জানোয়ার হয়ে আমরা এই অপমান কিছুতেই বরদাস্ত করব না৷'
তখন সকলে পরামর্শ করতে লাগল, কী করে এই পাখিদের আচ্ছারকম জব্দ করা যায়৷ সিংহ, বাঘ, ভাল্লুক, গণ্ডার, জিরাফ, চিতাবাঘ, হাতি, জলহাতি (হিপপপটেমাস), নেকড়ে, শেয়াল সবাই মিলে একটা মস্ত সভা করল৷ বানর সভাপতি হয়ে গাছের ডালে লেজ ঝুলিয়ে বসল৷ সকল জন্তুদের শলাপরামর্শ চলতে লাগল৷ খেকশিয়াল বুদ্ধিমান প্রাণী; হাত-পা ছেড়ে সে দাঁড়িয়ে বলল, 'এসো, সবাই মিলে লড়াই করে পাখিগুলিকে আচ্ছারকম জব্দ করি৷'
বাঘ ও সিংহ এ কথায় সায় দিল৷ কাজেই অন্য জন্তুরাও তাতেই সম্মতি জানাল৷ তখন সভায় ঠিক হল, পাখিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাই সংগত৷
ডিগবাজি খাঁ বলল, 'কে কী কাজের ভার নেবে তা এই সভায়ই ঠিক হয়ে যাক৷'
হাতি শুঁড় উঁচু করে বলল, 'আমি এই যুদ্ধের রসদ জোগাব৷ জল আর খাওয়া-দাওয়ার ভার আমার উপর রইল৷'
ভাল্লুক বলল, 'আমি গাছের ডালে চড়ে কোথায় শত্রুরা লুকিয়ে আছে, সেই খবর বলে দেব৷'
গণ্ডার বলল, 'আমি শত্রুদের সামনে দাঁড়িয়ে ঢালের মতো থেকে শত্রুদের গোলাগুলি আটকাব৷'
চিতা বলল, 'আমি জয়ঢাক ঘাড়ে করে নেব৷'
জিরাফ বলল, 'আমি বরং মাথা নেড়ে সেটা বাজাব৷'
শজারু আর খরগোশ বলল, 'আমরা ছুটে গিয়ে খবর নিয়ে আসব৷'
জলহস্তী বলল, 'আমার এই মস্ত হাঁয়ের ভিতর দশ-বিশ গণ্ডা পাখি একবারেই ভরে নিতে পারব৷'
নেকড়ে গলা হাঁকড়ে বলল, 'আমরা তির জোগাব৷'
এখন যুদ্ধ করবার বাকি রইল একমাত্র সিংহ আর বাঘ৷
দু-জনেই ঠিক করলে তারা তির মেরে পাখি শিকার করবে৷
ডিগবাজি খাঁ সবাইকে সাহস দেখিয়ে বলল, 'আমি সামনে থেকে সবাইকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাব৷ আমি লেজ উঁচু করে সবার সামনে থাকব৷ আমার এই নিশান যতক্ষণ খাড়া থাকবে, ততক্ষণ তোমরা সকলে খুব লড়বে; লেজ নীচু হলেই বুঝবে এখন সকলকে তাড়াতাড়ি পিছনে পালাতে হবে৷'
সকলে কিছুক্ষণ পা-তালি আর দাপাদাপি করে সভাপতি মহাশয়কে ধন্যবাদ দিল৷
সভা ভঙ্গ করে সবাই বাড়ি গেল৷
মাছি এই সভার খবর বোঁ করে পাখিদের কাছে এসে বলে গেল৷ এই খবর পেয়ে পাখিরা ব্যস্ত হল বটে, কিন্তু ওরা ঠিক জানত জন্তুদের কারও ওড়ার ক্ষমতা নেই৷
এদিকে কাক, চিল, ময়ূর, সারস, বাজ, কাদাখোঁচা, হাঁড়িচাঁচা, কাঠঠোকরা সবাই মিলে একটা সভা হল৷
কিছুদিন বাদে দুই দলই সৈন্যসামন্ত নিয়ে যুদ্ধে অগ্রসর হল৷
বক বলল, 'যুদ্ধে হার জিত কী হয় বলা তো যায় না৷ বরং একটা বুদ্ধি খাটিয়ে দেখা যাক৷'
কাকেরা কা কা করে চেঁচিয়ে বলল, 'বেশ তো, বেশ তো৷'
বক বলল, 'ভিমরুল ভায়াকে এই খবরটা দিলে হয়৷'
ফড়িং অমনি ভিমরুল ভায়াকে খবর দিতে ছুটল৷
ভিমরুল এসেই জিজ্ঞেস করল, 'আমায় কী করতে হবে বলো তো?'
বক বলল, 'তুমি বোঁ করে গিয়ে শেয়ালের লেজ জোরে কামড়ে দেবে৷'
ডিগবাজি খাঁ সবাইকে নিয়ে হইহই করে যুদ্ধে রওনা হল৷
পিছনে তার লেজখানা উপরের দিকে সোজা হয়েই আছে৷ যুদ্ধের গোড়াতেই ভিমরুল বোঁ করে গিয়ে ডিগবাজি খাঁর লেজে জোরে হুল ফুটিয়ে দিলে৷ ভিমরুলের হুল তো বড়ো সহজ নয়, তাতে দু-দিন সে হুলখানা পাথরে ধার দিয়ে এনেছে৷ হুল ফুটতেই শেয়াল বোঁ করে লেজখানা নাবিয়ে মাটিয়ে ঘসতে লাগল৷
ডিগবাজি খাঁর লেজের দিকে তাকিয়ে অন্য জন্তুরা বুঝল, এবার বুঝি তাদের শক্ত হার হয়েছে৷ অমনি সকল জন্তুই পিছন ফিরে ভোঁ দৌড়৷
ডিগবাজি খাঁ পিছন ফিরে যত ডাকে, অন্যেরা ততই জোরে ছুটতে থাকে৷ সবাই একসঙ্গে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে পালাল৷
ডিগবাজি খাঁ একলা ভারি বিপদে পড়ল৷ কাক আর চিল উড়ে এসে ডিগবাজি খাঁকে বেজায় ঠোকরাতে শুরু করল৷
শেয়াল 'ক্যায়া হুয়া, ক্যায়া হুয়া' বলে যতই ছুটে পালায় কাকগুলি ততই তার পিছনে তাড়া করে৷
বেগতিক দেখে ডিগবাজি খাঁ এক গর্তের ভিতর ঢুকে পড়ল৷ আজ যে তার প্রাণ বেঁচেছে-এই-ই ঢের৷ আর মনে মনে ভাবল, 'আচ্ছা জব্দটাই হলাম৷'
বৈশাখ ১৩৩৩
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন