অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়
সেকালে শ্বেত নামে এক ব্রাহ্মণ গৌতমী নদীর তীরে কুটির নির্মাণ করিয়া বাস করিতেন৷ ব্রাহ্মণ শিবের পরম ভক্ত-প্রতিদিন নিষ্ঠার সহিত শিবের স্তুতি বন্দনা করিতে করিতে ক্রমে তাঁহার মৃত্যুকাল উপস্থিত হইল৷ তখন তাঁহাকে লইয়া যাইবার জন্য যমদূতেরা আসিয়া উপস্থিত; কিন্তু শিবভক্ত ব্রাহ্মণের ঘরের ভিতরে তাহারা প্রবেশই করিতে পারিল না৷
এদিকে বিলম্ব দেখিয়া যম মৃত্যুকে জিজ্ঞাসা করিলেন, 'সেই শ্বেত ব্রাহ্মণ এখনও আসিল না কেন? দূতেরাই বা কেন ফিরিয়া আসিতেছে না? বাস্তবিক তুমি মৃত্যু, তোমার কাজে এরূপ অনিয়ম হওয়া কখনোই উচিত নয়৷' একথায় মৃত্যুর বড়োই রাগ হইল এবং তিনি নিজেই ব্রাহ্মণের কুটিরে চলিলেন৷
সেখানে গিয়া দেখিলেন যমদূতেরা ভয়ে ভয়ে কুটিরের বাহিরেই দাঁড়াইয়া আছে; তিনি তাহাদিগকে বলিলেন, 'একী! তোমরা বাহিরে দাঁড়াইয়া কেন?' দূতেরা বলিল, 'স্বয়ং মহাদেব শ্বেত ব্রাহ্মণকে রক্ষা করিতেছেন কাজেই আমরা ব্রাহ্মণের দিকে চাহিতেও ভরসা পাইতেছি না৷' মৃত্যু তখন ব্রাহ্মণের নিকটে গেলেন৷
কে মৃত্যু, কাহারাই বা তাঁহার দূত, এ সম্বন্ধে ব্রাহ্মণ কিছুই জানিতেন না; সুতরাং তাঁহার ভ্রূক্ষেপও নাই-তিনি একমনে মহাদেবেরই পূজা করিতে লাগিলেন৷ এদিকে শিবের অনুচর দণ্ডী মৃত্যুকে পাশ হাতে লইয়া দণ্ডায়মান দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিল, 'তুমি এখানে কী দেখিতেছ?' মৃত্যু বলিল, 'আমি শ্বেত দ্বিজকে লইতে আসিয়াছি৷' দণ্ডী বলল, 'তুমি এখান হইতে চলিয়া যাও৷' একথায় মৃত্যু অতিশয় ক্রুদ্ধ হইয়া শ্বেত ব্রাহ্মণকে পাশ ছুড়িয়া মারিল৷ দণ্ডীও ছাড়িবার পাত্র নহে! তাহার হাতে ছিল মহাদেবের দণ্ড, সেই দণ্ড দিয়া মৃত্যুকে ধরাশায়ী করিল৷
তখন যমদূতেরা ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটিয়া গিয়া যমরাজাকে সমস্ত সংবাদ জানাইবা মাত্র তিনিও মহিষে চড়িয়া প্রস্তুত হইলেন৷ যমরাজার সৈন্যেরাও সাজিয়া গুজিয়া তাঁহার সঙ্গে চলিল৷ শ্বেত ব্রাহ্মণের বাড়িতে গিয়া সকলে উপস্থিত৷ দলবল-সহ মহিষে চড়িয়া যমকে আসিতে দেখিয়া শিবের লোকেরাও যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হইল৷ তখন সেখানে ভারি ভয়ংকর যুদ্ধ আরম্ভ হইল৷
কার্তিক তাঁহার শক্তি দিয়া যমের লোকদের কাটিয়া খণ্ড খণ্ড করিতে লাগিলেন৷ অবশেষে যমরাজাকে ও তাঁহার বাহনটিকে গুরুতর রূপে আহত করিলেন৷ তখন অবশিষ্ট যমসৈন্যেরা গিয়া সূর্যকে সমস্ত সংবাদ জানাইল৷ সূর্য ব্রহ্মার নিকটে গেলেন৷ ব্রহ্মা ও ইন্দ্র প্রভৃতি দেবতাগণকে লইয়া যমের নিকটে গিয়া উপস্থিত৷ তাঁহারা গিয়া দেখিলেন যম গঙ্গাতীরে মৃতের ন্যায় পড়িয়া আছেন৷
যমকে মৃতপ্রায় দেখিয়া দেবতাদের তো ভয় হইবার কথাই৷ তখন শিবকে সন্তুষ্ট করা ভিন্ন আর উপায় কী? সকল দেবতা মিলিয়া জোড়হস্তে মহাদেবের স্তব করিতে লাগিলেন৷ মহাদেব তাঁহাদের স্তুতিতে সন্তুষ্ট হইয়া বলিলেন, 'তোমাদের পূজায় আমি সন্তুষ্ট হইয়াছি, এখন কী বর চাও বলো৷' দেবতারা বলিলেন, 'প্রভু! এই যম ছাড়া সংসারের কাজই চলিতে পারে না৷ ইনি কোনো অপরাধ করেন নাই, ইঁহাকে বধ করা আপনার উচিত নয়৷ অতএব আপনি সৈন্যগণ এবং বাহন-সহ যমকে জীবিত করুন৷'
তখন মহাদেব বলিলেন, 'আমার ভক্তের মরণ হইবে না, একথায় যদি তোমরা রাজি হও তাহা হইলে আমি এখনই যমকে বাঁচাইয়া দিব৷' দেবগণ বলিলেন, 'তাও কি কখনো হয়? তাহা হইলে সংসারের সমস্ত লোকই যে অমর হইয়া যাইবে৷' শিব বলিলেন, 'সে কথা বলিলে চলিবে না৷ আমার ভক্তের কর্তা আমি, তাহার উপর যম কোনো দিন কর্তৃত্ব করিতে পারিবে না৷ এ কথায় যদি তোমরা সম্মত হও তাহা হইলেই যমকে বাঁচাইব৷'
দেবতারা তখন নিরুপায় দেখিয়া বলিলেন, 'আচ্ছা প্রভু, তাহাই হইবে৷' মহাদেবও তখন নন্দীকে বলিলেন, 'নন্দী! গৌতমীর জল দিয়া যমকে বাঁচাইয়া দাও৷'
মহাদেবের হুকুমে নন্দী গৌতমীর জল আনিয়া সকলের শরীরে ছিটাইয়া দিবামাত্র যম সৈন্যগণের সহিত জীবিত হইলেন৷ সে দিন হইতে সংসারে ধার্মিক এবং ভক্ত লোকদিগকে দেখিলেই যম তাঁহার শাসনদণ্ড নামাইয়া ভয়ে দূর হইতে তাঁহাদিগকে নমস্কার করিয়া সরিয়া পড়েন৷
শ্রাবণ ১৩২৩

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন