অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়
ভাগ্যলক্ষ্মী আচমকা নিবারণের ওপর বিরূপ হলেন৷ এতদিন বেশ ভাগ্যের চাকা তরতর করে গড়িয়ে যাচ্ছিল৷ হঠাৎ যেন থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল৷ পাঁচ বছরের মধ্যে লোয়ার গ্রেডের কেরানি থেকে এখন বিভাগীয় বড়োকর্তা৷ অফিসে এক ডাকেতে সবাই চেনে এবং সম্মানও করে৷
সেই নিবারণ হালদার বর্তমানে ভীষণ অসুখী৷ হঠাৎ বোম্বের হেড অফিস থেকে ওর ঠিক নীচের পোস্টে বদলি হয়ে এল একজন ষণ্ডামার্কা পালোয়ানি চেহারার লোক৷ লোকটা মিষ্টভাষী, তবে কাজকর্মের ধারেকাছে যায় না৷ বাধ্য হয়ে ফাইলের বোঝা সব নিবারণের ঘাড়েই চাপে৷ দশটা-পাঁচটা ঠায় সাত ঘণ্টা নিবারণকে ফাইলের মধ্যে মুখ গুঁজে থাকতে হয়৷
ইদানিং ওর ঘাড়ে পিঠে যন্ত্রণা শুরু হয়েছে৷ ডাক্তার বলেছেন, স্পন্ডিলাইটিসের পূর্বলক্ষণ৷ নিবারণ ওর বসের কাছে আর্জি পেশ করে, 'এভাবে তো আর চাকরি করা যায় না, স্যার৷ একা আর কতদিক সামলাব? আপনি রতন সমাদ্দারকে কিছু বলুন৷ উনি তো কোনো কাজই করেন না৷'
নিবারণের কথায় এগজিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার গম্ভীরভাবে মাথা নাড়েন, 'আপনি যান, আমি দেখছি৷'
ব্যস, ওই পর্যন্ত৷ নিবারণ জানে বসের কাছে মিছিমিছি বলা৷ দু-জনের কাজ যথারীতি ওকেই একা করতে হবে৷ রতন সমাদ্দার ইউনিয়নের একজন বড়োদরের নেতা৷ ইউনিয়নের কাজ করতেই দিন কেটে যায় ওর, অফিসের কাজ আর করবে কখন? যার ফলে যত চাপ পড়ে নিবারণের ওপর৷ তা ছাড়া এগজিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার থেকে শুরু করে বেয়ারা অবধি রতনকে সমীহ করে৷ আসলে প্রত্যেকেই ভয় করে ওকে৷ এর আগেও দু-বার নালিশ করেছিল, কিন্তু কোনো কাজ হয়নি৷
মনে মনে গজরাতে থাকে নিবারণ৷ প্রোমোশনই ওর কাল হল৷ উচ্চপদে প্রোমোশন না পেয়ে বেশ ছিল এতদিন৷ অফিসে যেত আসত, নিজের কাজ করত৷ বিরাট কোনো দায়িত্ব মাথার ওপরে ছিল না৷ কিন্তু, এখন ওর অবস্থা ঠিক শাঁখের করাত৷ কাজও কর, আবার ওপরওয়ালার চোখ রাঙানিও খাও৷
অথচ ম্যানেজমেন্ট রতন সমাদ্দারকে কাজের কথা বলে চটাতে চায় না৷ পাছে কিছু করে বসে লোকটা৷ কানাঘুষায় শোনা গেছে, রতন সমাদ্দার নাকি বোম্বে অফিসের ফিল্ড সুপারভাইজারকে ঘুসি মারার অপরাধে কলকাতায় বদলি হয়ে এসেছে৷
অফিস ফেরতা কার্জন পার্কের রানি রাসমণির মূর্তির নীচে বসে আপন মনে চীনে বাদাম খাচ্ছিল নিবারণ৷ রতন সমাদ্দারের ব্যাপারে মনটা বেশ কিছুদিন যাবৎ খিঁচড়ে আছে৷ অথচ ওর কিছু করার ক্ষমতা নেই৷ আজকাল বাড়িতে তাড়াতাড়ি ঢুকতে ইচ্ছে করে না৷ সংসারের ঝুটঝামেলা ছাড়া লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণা তো লেগেই আছে৷ তবু এখানটায় যতক্ষণ থাকে ততক্ষণ একটু শান্তি৷ ময়দানের ঠান্ডা হাওয়ায় মনে বেশ আমেজ আসে ওর৷
বাদুড়ঝোলা বাসগুলো গাঁক গাঁক করে ছুটে যাচ্ছিল রাজভবনের সামনে দিয়ে৷ ওদিকে এসপ্লানেড ইস্টে একদঙ্গল ঠেলা-রিকশাওয়ালার সমাবেশ৷ সম্প্রতি কলকাতার বেশ কিছু জনবহুল রাস্তায় ঠেলা-রিকশার যাতায়াত বন্ধ করার জন্য ওদের বিক্ষোভ৷
সন্ধ্যের পর একটা ফাঁকা মিনিবাস দেখে চেপে পড়ল নিবারণ৷ ওর পেছন পেছন আরও একজন লোক ছুটতে ছুটতে বাসের পাদানিতে পা রাখল৷
লোকটা এতক্ষণ অনুসরণ করছিল ওকে৷ নিবারণ বাসের বাঁ-দিকের জানালার ধারে জায়গা পেয়ে গেল৷ লোকটা তড়িঘড়ি নিবারণের ডানপাশের ফাঁকা জায়গাটা দখল করে ধপ করে বসে পড়ল৷
নিবারণ তাকাল লোকটার দিকে৷ লোকটা মুখ টিপে হাসছিল৷ নিবারণ লোকটাকে চেনে৷ ওরই অফিসের একজন অধস্তন কর্মচারী৷ অভিরাম দত্ত৷ একটু রগচটা বলে বদনামও আছে৷
অভিরামই মুখ খুলল প্রথমে, 'কার্জন পার্কে আমরা কয়েকজন তাস খেলছিলুম৷ দূর থেকে হঠাৎ দেখলুম আপনাকে৷ খুব উদবিগ্ন দেখাচ্ছিল৷ ব্যাপার কী স্যার, শরীর খারাপ নাকি?'
নিবারণ ঘাড় নাড়ল, 'না৷' তারপর অভিরামকে অফিসের কাজের চাপের কথা বলল৷ এবং রতন সমাদ্দারের প্রতি ম্যানেজমেন্টের দুর্বলতার কথাও বলতে ছাড়ল না৷ একজন অধস্তন কর্মচারীকে এসব বলা ঠিক নয় জেনেও রাগের মাথায় গড়গড় করে বলে ফেলল সব কিছু৷ কতদিন আর মনের মধ্যে রাগ পুষে রাখা যায়?
অভিরাম সব কথা শুনে-টুনে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, 'রতন সমাদ্দারকে শেষ করে দিলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়?'
'কী বলছেন আপনি?' নিবারণ উত্তেজিত হয়ে ওঠে৷
হেঁহেঁ করে হেসে উঠল অভিরাম৷ ইনিয়েবিনিয়ে বলে, 'সিনিয়রিটি লিস্টে রতন সমাদ্দারের পরেই আমার নাম৷ অনেকদিন স্যার কোনো প্রোমোশন-ট্রোমোশন হয়নি৷ রতনের অবর্তমানে আমিই হব আপনার অ্যাসিস্ট্যান্ট৷ দেখবেন, তখন আর আপনাকে অত খাটতে হবে না৷' অভিরাম চোখ বন্ধ করে ঘাড় নাড়তে নাড়তে বলল, 'আমাদের এগজিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ারের কোনো পার্সোনালিটি নেই, বুঝলেন? রতন সমাদ্দারকে অত ভয় করার কী আছে? ও বাঘ, না ভাল×ñক? কাছে গেলেই সাহেব খালি বেড়ালের মতো মিউ মিউ করেন? ওকে ডেকে ধমকাতে কিংবা চার্জশিট ধরাতে পারেন না?'
নিবারণ কোনো উত্তর দিল না৷ জানলার বাইরে তাকিয়ে ভাবছিল, জাপানে কোনো কোনো কারখানা বা অফিসে একটা করে অ্যাংরি রুম আছে৷ সেই অ্যাংরি রুমে বিভাগীয় বসদের মূর্তি বসানো থাকে৷ যখন কোনো অধস্তন কর্মচারীর বসের সঙ্গে মনোমালিন্য বা কথা কাটাকাটি হয়, তখন সেই কর্মচারী অ্যাংরি রুমে ঢুকে সেই বসের মূর্তিকে যারপরনাই অপমান করে মনের ঝাল মেটায়৷ এমনকী পাথরের মূর্তির গালে চড়চাপড়ও চালায়৷ আমাদের দেশে সেরকম কোনো ব্যবস্থা থাকলে বসের মূর্তিতে দুটো ঘুসি মেরে মনটা খানিক হালকা করা যেত৷
'কী ভাবছেন স্যার?' অভিরাম জিজ্ঞেস করে৷
নিবারণ সাড়া দেয় না৷
অভিরাম ফের বলে, 'আমার ওপরে রতন সমাদ্দারের কেসটা ছেড়ে দিয়ে দেখুন না? একটা-না-একটা ব্যবস্থা করব৷'
নিবারণ আর চুপ থাকতে পারে না৷ কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করে, 'কী ব্যবস্থা করবেন আপনি? ও সামনে দাঁড়ালে তো পালাবার পথ খুঁজে পাবেন না৷'
'তা যা বলেছেন৷ তবে আমার প্ল্যান তো এখন বলব না৷' অভিরাম খ্যাক খ্যাক করে হাসতে লাগল, 'তা ছাড়া বাসে এই ভিড়ের মধ্যে-'
অভিরামের কথা শেষ হতে-না-হতেই কন্ডাক্টর 'মেডিকেল! মেডিকেল!' বলে চিৎকার করতেই অভিরাম তড়াক করে সিট ছেড়ে উঠে বলল, 'কালকে আর অফিস যাচ্ছি না৷ পরশু রবিবার, যদি পারেন দয়া করে সকালে আমার বাড়িতে চলে আসুন৷ গরিবের ঘরে একটু খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা থাকবে৷ আর নিভৃতে রতন সমাদ্দার সম্বন্ধে একটা জরুরি আলোচনা করব৷ ওতে আপনারই মঙ্গল হবে, স্যার৷'
নিবারণ হাঁ করে তাকিয়ে রইল অভিরামের দিকে৷ কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই, 'ওই ডানদিকের গলিটায় আমার বাড়ি৷ ৮৩/১ আরপুলি লেন,' বলে অভিরাম চলন্ত বাস থেকে নেমে পড়ল৷
বাসের দরজার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল নিবারণ৷ ওর কানে এল দূর থেকে অভিরাম যেন চিৎকার করে বলছে, 'পরশু সকালে পজিটিভলি৷'
বাড়িতে ফেরা ইস্তক নিবারণের মনে শান্তি ছিল না৷ চোখের সামনে বার বার ঘুরপাক খাচ্ছিল অভিরামের ধূর্ত চাহনি৷ কী এমন ব্যবস্থা করতে পারে অভিরাম? নিবারণ মাথামুণ্ডু কিছু ভেবে পেল না৷ তবু স্থির সিদ্ধান্তে এল, অভিরামের বাড়িতে পরশু যাবে৷ দেখবে কী করতে চায় ও৷ নাকি, সবই শুধু মুখের কথা৷
অভিরামের বাড়িতে পা দিয়েই চমকে উঠল নিবারণ৷ বাড়ির ভেতর থেকে রতন সমাদ্দারের গলা ভেসে আসছিল৷ এই সাতসকালে রতন সমাদ্দারকে অভিরামের ঘরে বসে থাকতে দেখে অবাক হল খুব৷ রতন সমাদ্দার হঠাৎ এখানে কেন? ও তো থাকে ভবানীপুরে? তবে কি রতন আর অভিরাম মিলে ওর বিরুদ্ধে কোনো ষড়যন্ত্র এঁটেছে? নাকি রতনকেও ওর মতো নেমন্তন্ন করে নিয়ে এসেছে? কী জানি বাবা, কী উদ্দেশ্য অভিরামের?
'এই যে আসুন স্যার৷' রতন সমাদ্দারই সদর দরজা থেকে ডেকে নিয়ে গেল নিবারণকে৷
নিবারণ চেয়ারে বসে ভাবছিল, আচ্ছা ধড়িবাজ লোক অভিরাম; যাকে দু-চোখে দেখতে পারে না, তাকেই এখানে এনে হাজির করেছে৷ রতনের সামনে বেইজ্জত করবে না তো?
একটু পরেই অভিরাম চা-জলখাবার নিয়ে এল৷ খেতে খেতে তিনজনের মধ্যে অনেক রকমের আলোচনা হল৷ তবে ওরা কেউই ভুলেও অফিসের কাজের কথা তুলল না৷ কথা প্রসঙ্গে যখন ইউনিয়নের কথা উঠল তখন হঠাৎ সমাদ্দার উত্তেজিত হয়ে উঠল৷ সেই সঙ্গে অভিরাম৷ নিবারণের মনে হল অভিরাম যেন পায়ে পা চাপিয়ে ঝগড়া শুরু করল৷ প্রমাদ গুণল নিবারণ৷ বিপদের আশঙ্কায় মন দুলে উঠল৷ রতন আর অভিরামের ঝগড়া এখন মুখ ছেড়ে হাতে এসেছে৷ একটু পরেই দু-জনের মধ্যে হাতাহাতি শুরু হল৷ তারপরই মারামারি৷
নিবারণ বাধা দিতে চেষ্টা করল৷ কিন্তু পারল না৷ ওদের দৈহিক শক্তির কাছে নিবারণ পরাজয় স্বীকার করল৷ হঠাৎ আর্তকন্ঠে চিৎকার করে উঠল রতন সমাদ্দার৷ বুক কেঁপে উঠল নিবারণের৷ ভয়ার্ত চোখে দেখল, রতন সমাদ্দার চিত হয়ে পড়ে আছে৷ ঘরের মেঝেতে টকটকে লাল রক্ত৷ একটা তীক্ষ্ণ ছুরি রতনের বুকে আমূল বিদ্ধ করা৷ নিবারণের হাত-পা থর থর করে কেঁপে উঠল৷ গলা শুকিয়ে কাঠ৷ দরদর করে ঘামতে শুরু করল ও৷ ভয়ে নিবারণ শিউরে উঠল৷
কিন্তু অভিরাম কোথায়? একটু আগেও তো ঘরের ভেতরে ছিল৷ হঠাৎ এরকম একটা হাড়-হিম-করা ঘটনার জন্য নিবারণ কোনোরকম প্রস্তুত ছিল না৷ অভিরাম একটা জলজ্যান্ত খুনে৷ রতন সমাদ্দারকে খুন করে চোখের নিমেষে গা ঢাকা দিয়েছে৷ অভিরামের কথায় এখানে এসে খুনের দায়ে ধরা পড়বে ভেবে নিবারণের বুক ফেটে যাচ্ছিল৷ কেন যে মরতে অভিরামকে রতন সমাদ্দারের কথা বলেছিল? পরিণতির কথা ভেবে ভয়ে কেঁদে ফেলল নিবারণ৷
অভিরাম খুন করেই নিজেই পুলিশ ডাকতে যায়নি তো? ওকে পুলিশের সামনে খুনি বলে প্রমাণ করিয়ে ধরিয়ে দেবে না তো? রতন সমাদ্দারের পোস্টে প্রোমোশনও পাবে, আর এদিকে ওর অপরাধের শাস্তি পাবে নিবারণ৷ যে লোক মানুষ খুন করতে পারে, সে যে ওকেও ধোঁকা দেবে এতে আর সন্দেহ কী? দ্রুত বুক ওঠানামা করতে লাগল ওর৷ এদিক-ওদিক তাকিয়ে যেমনি ঘর থেকে বেরোতে যাবে অমনি পেছন থেকে কে যেন হাত রাখল কাঁধে৷ ভয়ে দম বন্ধ হয়ে এল নিবারণের৷ দু-চোখের পাতা বুজে গেল ভয়ে৷ ভারী গলায় কে যেন বলল, 'এই যে স্যার?'
'এই যে স্যার?'
চোখ খুলে পেছনে তাকাতেই নিবারণের চক্ষু চড়কগাছ৷ একজন সেপাই পেছন থেকে ওকে ধাক্কা দিয়ে বলল, 'ঘুমিয়ে পড়েছিলেন?' চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিল নিবারণ৷ মার্কারি ভেপার ল্যাম্পের আলোতে ঝলমল করছে চৌরঙ্গির রাস্তা৷ হাতঘড়ির দিকে তাকাল নিবারণ, দশটা পাঁচ৷ পকেট থেকে রুমাল বের করে ঘাম মুছল৷ পুলিশটা বলল, 'দেখে নিন টাকাপয়সা খোয়া গেছে কি না৷ জায়গাটা ভালো না৷'
নিবারণ রানি রাসমণির পাথরের বেদির সিঁড়ি থেকে উঠতে উঠতে বলল, 'সত্যি ভালো না!'
আষাঢ় ১৩৯২

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন