অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়
শম্ভুকে আমরা কেউ কোনোদিন খেলার মাঠে দেখেছি কি না সন্দেহ৷ সেই যে কবে একদিন ও ইশকুলে ভরতি হয়ে বোর্ডিঙে খাট পেতেছে, তারপর থেকে শুধু ইশকুলে যাবার পথটা ছাড়া আর কোনো পথে বোধ হয় ও বের হয় নাই৷
সব সময়ই শম্ভু গুম হয়ে ঘরে বসে থাকত; রোজ সকালে বিকেলে হাত জোড় করে আকাশের দিকে চেয়ে বিড়বিড় করে কী যেন বলত৷ আমরা বলতাম, 'শম্ভু তুই রোজ সকালে বিকেলে আসন-পিড়ি হয়ে বসে, ফিসফিস করে কী ছাই মুণ্ডু বকিস রে?' শম্ভু গম্ভীর হয়ে বলত, 'ও সব বুঝবি না রে! ও হচ্ছে ন্যাস৷'
'ন্যাস! সে আবার কী রে?' শম্ভু তার কোনো জবাব দিত না৷
সে যাক৷ শম্ভু যে 'প্ল্যানচেট' করে প্রেতাত্মা এনে পরীক্ষার প্রশ্ন জেনেছিল-সে কথা আমিও শুনেছিলাম৷ কিন্তু বিশ্বাস করিনি৷
অঙ্কে ছিলাম নেহাত কাঁচা; তাই শম্ভুকে একদিন বললাম, 'আচ্ছা শম্ভু! তুই যদি একদিন প্রেতাত্মা এনে আমাদের অঙ্কের প্রশ্নটা 'আউট' করে দিতে পারিস তো বুঝি হ্যাঁ ন্যাসের বাহাদুরি আছে৷'
শম্ভুর সাথে আমার খুব ভাব হয়ে গেছে৷ শম্ভু আমায় যতটা বিশ্বাস করে তেমন বোধ করি বোর্ডিঙের আর কাউকে করে না৷ এই অল্প কয়দিনেই ও আমায় একরকম শিষ্য করে তুলেছে৷ এবার থেকে শম্ভুর সাথে সাথে আমিও খেলাধুলা ছেড়ে দিয়েছি৷ আর বাজেও বড়ো একটা বকি না; ওতে নাকি মানসিক শক্তি হ্রাস হয়-শম্ভু তো তাই বলে৷
বোর্ডিঙের আর সব ছেলে ঘুম থেকে উঠবার আগেই শম্ভু আমায় রোজ রোজ ডেকে তোলে৷ তারপর ছাতে উঠে শম্ভু ন্যাস করতে শুরু করে দেয়, আমিও শম্ভুর সাথে থাকি৷ প্রথম কয়দিন শম্ভু আমায় কোনো মন্ত্রতন্ত্রই শেখাল না; শুধু পদ্মাসন হয়ে বসে সংযম শেখবার কতগুলো নিয়ম বলে দিল৷ রোজ রোজ সকালে-বিকেলে শম্ভুর উপদেশ মতো সংযম শিখতে লাগলাম৷ বোর্ডিঙের ছেলেরা হঠাৎ আমার এতটা পরিবর্তন দেখে ঠাট্টাবিদ্রূপ করতে লাগল৷ অনাদি অনেক গবেষণা করে আমার নাম দিল 'শম্ভু দি সেকেন্ড'৷ এক মাসের মধ্যে আমার নতুন দেওয়া নামটা ইশকুলময় রটে গেল৷ রাস্তাঘাটে সবাই আমায় 'শম্ভু দি সেকেন্ড' বলে পাগল করে তুলল৷ ওরা বকুনির চোটে আমার কান ঝালাপালা করে দিল-কিন্তু আমি কিছু বললাম না৷
রোজ রোজ পদ্মাসনে বসে বসে হয়রান হয়ে, একদিন শম্ভুকে বললাম, 'শম্ভু, পদ্মাসনে বসে বসে তো আমার হাঁটুতে আর পায়ের কবজিতে কড়া পড়ে গেল; এবার কী করতে হবে বলে দে? নইলে হাত-পা থাকতে শুধু শুধু পঙ্গু সেজে বসে থাকতে আমি আর পারব না ভাই, তা যাই বল না কেন!'
শম্ভুকে কোনোদিন হাসতে দেখিনি৷ আজ তার হাসি মুখখানা ঠিক স্বপ্নেরই মতো মনে হল৷ শম্ভু একটু মুচকি হেসে বলল, 'আরে এ তো আর বাগবাজারের 'স্পঞ্জ' রসগোল×া নয় যে মুখে ফেলে দিলেই ব্যাস . . .৷' আমি বললাম, 'নাই বা হল 'স্পঞ্জ' রসগোল্লা, তাই বলে কি আর 'রুটিন'টা একটু 'চেঞ্জ' করতে নেই?' মাথা নেড়ে মুরুব্বির মতো শম্ভু বলল, 'সাধনা করতে হয় হে মিথিল! সাধনা করতে হয়! ভেঙ্গা ছেলের ধৈর্য কম! অত ছটফট করলে চলবে না৷'
সেবার শম্ভু 'প্ল্যানচেট' করে ভূদেব চাটুজ্যের প্রেতাত্মা এনে যেসব অঙ্কের প্রশ্ন আমায় বলে দিল, পরীক্ষার আগে ঠিক একটি মাস ধরে সেগুলোকে কন্ঠস্থ তো কন্ঠস্থ একেবারে ঠোঁটস্থ করে ভাবলাম, এবারে আমার 'ফুলমার্কস' আটকায় কে? কিন্তু পরীক্ষার হলে গিয়ে প্রশ্ন হাতে পেয়েই চক্ষু একেবারে চড়ক গাছ! সে যাত্রায় সসম্মানে মস্ত বড়ো একটা গোল আলু পেয়ে শম্ভুর উপর ভক্তি চটে গেল৷ সটান গিয়ে শম্ভুকে চেপে ধরলাম; কিন্তু শম্ভু যা বলল তার আর প্রতিবাদ করতে পারলাম না৷ শম্ভু বলল যে ভূদেব চাটুজ্যের প্রেতাত্মা কখনোই মিথ্যে প্রশ্ন বলে দেয়নি; কিন্তু এর ভেতর যে সেকেন্ড মাস্টারমশাই সে খবর জানতে পেরে প্রশ্ন বদলে ফেলেছেন সে দোষ কি শম্ভুর? না ভূদেব চাটুজ্যের প্রেতাত্মার?
কথাটা নেহাত মিথ্যে নয়; হতেও পারে৷ যাক এ নিয়ে আর বকাবকি না করে শম্ভুকে বললাম, 'শম্ভু তাহলে 'হাফ ইয়ারলি' পরীক্ষার সময় কিন্তু অঙ্কের প্রশ্নটা বের করে দিতেই হবে৷' শম্ভু বলল, 'আচ্ছা সে তখন দেখা যাবে!'
বোর্ডিঙের সবাই শম্ভুকে ভয় করে চলে৷ কী জানি কবে হয়তো মন্ত্র হেঁকে ব্রহ্মদত্তি এনে ঘাড়ে চাপিয়ে দেবে৷ সেদিন নাকি অনাদি, যশো, বিষ্টু, মনি জোর গলায় বলেছে, 'হ্যাঁ শম্ভুর ভেতর কিছু আছে, নইলে বিষ্টুর বাক্স থেকে যে একটা পাঁচ টাকার নোট উধাও হয়েছিল সেটা কি আর অমনি বের করে দেয়? নিশ্চয় ও প্রেত সাধনা জানে৷' যাহোক সেই থেকে শম্ভুকে সবাই খাতির করে চলত৷
সেদিন ক্ষিতীশের টেবিল থেকে তার সোনা দিয়ে বাঁধানো ফাউন্টেন পেনটা চুরি হয়ে গেল৷ ক্ষিতীশ তো রেগে অস্থির! কিন্তু রাগলে হবে কী! পেন আর পাওয়া গেল না৷ আমি ক্ষিতীশকে বললাম, 'ক্ষিতীশ তুই এক কাজ কর শম্ভুকে গিয়ে বল৷ শম্ভু চোর ধরে দিতে না পারুক অন্তত বলে দিতে পারবে কলম কোথায় আছে৷' ক্ষিতীশ শম্ভুকে অনেক করে বলায় শম্ভু বলল, 'আচ্ছা যাও দেখবখন৷'
সাত দিন যেতে-না-যেতেই একদিন খুব ভোর বেলা শম্ভু সেই চুরি-যাওয়া কলমটা পকেট থেকে বের করে ক্ষিতীশকে বলল, 'এইটে নাকি হে ক্ষিতীশ, তোমার কলম?' ক্ষিতীশ কলমটা পেয়ে আনন্দে লাফাতে লাফাতে বলল, 'হ্যাঁ শম্ভুদা, হ্যাঁ এই তো গায়ে লেখাই রয়েছে 'কে. সেন', কিন্তু কী করে বের করলেন?'
কলমটা শম্ভু বের করতে পারবে তা আমি কখনোই ভাবিনি, মনে করেছিলুম হয়তো ন্যাস করে বলবে-ওমুক ঘরের ওমুক দিকে তোমার কলম এখন আছে৷ পাঁচ দিন পরে সেখান থেকে ওমুক দিয়ে যাবে৷ কিন্তু আমার সে ধারণা ঘুচে গেল যখন শম্ভু হাতে হাতে কলমটা বেরই করে দিল; আমি শুধুই মিথ্যে ভাবলুম, 'শম্ভুর ভেতর বাস্তবিকই কিছু আছে৷' অঙ্কে ফেল করে যে শম্ভুর ওপর চটে গিয়েছিলাম তার জন্যে আজ মনে বড়োই অনুতাপ হল- কেননা, আজকে বুঝলাম, যে শম্ভুর একটা কথাও বাজে নয়৷ কেবলই মনে হল, সে দিন নিশ্চয় ও ঠিক প্রশ্নই বলে দিয়েছিল৷ কথাট যতই মনে হল ততই শম্ভুর প্রাণায়াম, যোগ, ন্যাস প্রভৃতির উপর আমার বিশ্বাস প্রবলতর হয়ে চলল৷
যাক তার পর থেকে আমি আপ্রাণ চেষ্টায় লেগে গেলাম শম্ভুর কাছ থেকে প্রাণায়াম শিখতে৷
এত দিন বোর্ডিংটা বেশ চুপচাপ ছিল; হঠাৎ সেদিন খাবার ঘণ্টা বাজার সাথে সাথে তেতলায় ভীষণ গণ্ডগোল শুনলাম৷ গিয়ে শুনি অনাদির পেঁটরা থেকে তার ঘিয়ের বোতল উধাও হয়েছে আর অনাদি চটে লাল হয়ে হোস্টেলের ছেলেদের লক্ষ্য করে বলছে, 'যত সব চোরের আড্ডা হয়েছে বোর্ডিঙে-আজ ওর ছাতা চুরি, কাল ওর কলম চুরি, পরশু তার টেনিস র্যাকেট চুরি এ সমস্ত কী!'

আমি ঘরে ঢুকে বললাম, 'এই যাঃ! কি অনাদি থাম না!' অনাদির রাগটা এসে পড়ল আমার উপর; দাঁতমুখ খিঁচিয়ে সে বলল, 'হ্যাঁ, হ্যাঁ, দেখা গেছে, নিজের একটা কিছু চুরি গেলে বুঝতে বাপু৷' আমি বললাম, 'ঘিয়ের বোতলও আমার নেই, চুরিও যাবে না; আর চুরি গেলেও তোর মতো চেঁচিয়ে সারাটা বোর্ডিং মাথায় করতাম না৷' অনাদি ঠিক তেমনি রাগের মাথায় বলল, 'তবে কী করতে শুনিই না৷' 'কি করতাম? বোকার মতো হইহই না করে চুপসে শম্ভুকে গিয়ে বলতাম৷ তার পরে দেখতে ঘি চোরের কাঁদাকাটির বহর!'
অনাদি শম্ভুকে ধরে বসল-যে ঘিয়ের বোতলটার খোঁজ করে দিতেই হবে-সে চোর ধরা পড়ুক আর নাই পড়ুক; শম্ভু কিন্তু বেঁকে বসে বলল, 'না, না! ওসব পারব না বাবা! ন্যাসটা অমনি সহজ কিনা! যে চোখ বুজলেই ঘিয়ের বোতল এসে হাজির হবে? তোমরা তো ওর কিছু জানো না, জিজ্ঞেস করো ওই মিথিলকে৷' আমি শম্ভুর ঘরেই ছিলাম; কিন্তু কিছুই বললাম না৷
রাত্রে খেয়ে-দেয়ে শম্ভুর ঘরে গিয়ে দেখি শম্ভু তক্তপোষের উপর চিতপাত হয়ে শুয়ে কী যেন ভাবছে৷ আমি ঘরে ঢুকতেই শম্ভু বলল, 'কী রে মিথিল আয়৷' আমি ওর পাশে বসে বললাম, 'শম্ভু, ঘিয়ের বোতলটার একটা তল্লাস করে দে না ভাই৷ বেচারি অনাদি নইলে শুকিয়ে মারা যাবে যে৷ ও যেমনি ছেলে, হয়তো জলখাবারের ওপর দিয়ে ঘিয়ের দাম উসুল করে তবে ছাড়বে৷'
শম্ভু হঠাৎ উঠে বসল৷ তার মুখচোখের ভাব দেখে আমার যেন কেমন কেমন ঠেকল৷ আমার দিকে একটু ঘেঁষে বসে চোখ ইশারা করে ও আমায় দোরটা বন্ধ করে দিতে বলল৷ দোর ভেজিয়ে দিয়ে এসে যখন শম্ভুর পাশে বসলুম, শম্ভু চোরের মতো আমায় বলল, 'শোন তুই যে ঘিয়ের বোতলের কথা বলিস-সে হয় কী করে? তুই কি মনে করিস যে ন্যাস জিনিসটা এমনই সোজা যে চোখ বুজে হ্রিং ফট ওঁ ফ্যাঁচ ফ্রং বললেই ঘিয়ের বোতল এসে হাজির হবে!' হঠাৎ তার মুখে এই কথাটা শুনে আমি অবাক হয়ে বললাম, 'তুই বলছিস কী এসব! আমায় অবাক করলি যে! তবে ক্ষিতীশের ফাউন্টেন পেন, রমেশবাবুর টেনিস র্যাকেট এসব বের করলি কী করে?' শম্ভু একটু হেসে পর মুহূর্তেই আবার গম্ভীর হয়ে বলল, 'কারোর কাছে বলবি না তো? আমায় ছুঁয়ে দিব্বি কর!' কিছুই বুঝতে পারলাম না তবুও শম্ভুর গা ছুঁয়ে বললাম, 'এই তোকে ছুঁয়ে দিব্বি করছি কাউকে বলব না৷'
শম্ভু তার গলাটা আরও নামিয়ে এদিক-সেদিক চেয়ে, আমার কানের কাছে মুখ এনে ফিস ফিস করে বলল, 'আরে তাও জানিস না বোকা কোথাকার! ওসব জিনিস আমি নিজেই লুকিয়ে এনে রেখে দিই; তারপর যখন খোঁজাখুঁজি করে না পেয়ে আমায় এসে বলল, তখন আমি ন্যাস করার ছুতো করে বের করে দি৷ দেখিস না আমি কোনোদিন কারোর সাথে কথা বলি না৷ কী জন্যে জানিস? ও শুধু নিজের 'গ্র্যাভিটি' বজায় রাখবার জন্যে৷ আর তাই জন্যে তো সকালে-বিকালে ন্যাস করা৷ এসব কাজে খুব চালাক হতে হয় বুঝলি? দেখ তো শুধু এই ন্যাসের জন্যেই বোর্ডিংসুদ্ধ সব ছেলে আমায় এমন মেনে চলে!'
শম্ভুর কথাগুলো মোটেই বিশ্বাস হল না৷ বললুম, 'যাঃ! যত সব বাজে চাল দিচ্ছিস৷' শম্ভু আমার গা ছুঁয়ে বলল, 'এই তোর দিব্বি করে বলছি এর একটা কথাও যদি মিথ্যে হয়৷ ঘিয়ের বোতলটা যদি সত্যি চুরি না গিয়ে আমিই লুকিয়ে এনে থাকতাম, তবে কি আর আজ অনাদিকে ফাঁকি দিয়ে বিদায় করে দেই?'
এবারে আর শম্ভুর কথা অবিশ্বাস করতে পারলাম না৷ তার ভণ্ডামিটা যেন কিছুতেই সইতে পারছিলাম না; কিন্তু সে ভাবটা গোপন করে বললাম, 'শম্ভু! তাহলে তো বেশ মজা হয়েছে রে? আর ভাবনা কীসের? ঘিয়ের বোতল যে সেদিন আমিই লুকিয়ে অনাদির বাক্স থেকে নিয়ে রেখে দিয়েছি৷' শম্ভু কথাটা বিশ্বাস করতে পারল না৷ বলল, 'যাঃ৷' আমি শম্ভুর হাতটা ধরে বললাম, 'সত্যি বলছি ভাই! ঘিয়ের বোতল আমিই নিয়েছি৷' খুশিতে শম্ভুর মুখখানি ভরে গেল৷ তড়াক করে উঠে বলল, 'তবে আর কী, আমি ন্যাস করতে বসলে তুই ঘিয়ের বোতলটা চুপ করে এনে দিবি৷ দেখিস কেউ যেন টের না পায়, যা ওদের বল গিয়ে৷'
উপরে এসে সবাইকে ডেকে বললাম, 'শম্ভুকে রাজি করিয়েছি অনেক বলে-কয়ে৷ ও এক্ষুনি আসছে; ঘিয়ের বোতল বের করে দেবে৷' তার পর ঘরে গিয়ে আমার যে খালি একটা ঘিয়ের বোতল পড়েছিল সেটাকে র্যাপারের নীচে নিয়ে এলাম৷
শম্ভু একটা গরদের কাপড় পরে ফোঁটা কেটে ওপরে আসতেই আমরা সবাই তাকে ঘিরে ফেললাম৷ শম্ভু অনাদিকে কাছে ডেকে বলল, 'অনাদি তুমি এক কাজ করো, এই ঘরে যাদের উপর তোমার সন্দেহ হয় তাদের নাম বসে বসে ভাবো৷ দেখো অন্যমনস্ক হয়ো না কিন্তু; তাহলে কিছুই হবে না৷ আর এক কথা-আমি যখন ন্যাস করতে বসব তখন ঘরে আলো থাকবে না৷ তারপর হাতে তিন তালি দেওয়ামাত্র একজন ঘরে আসবে৷' আমরা সবাই বললাম, 'আচ্ছা তাই হবে৷'
শম্ভু ন্যাসে বসে গেল; আমরা সবাই বাইরে বারান্দায় রেলিঙের ধারে দাঁড়িয়ে রইলাম৷ আগেই ঠিক করা ছিল তিন তালি দিলেই আমি তাকে বোতল দিয়ে আসব অপর কাউকে যেতে দেব না৷ একটু পরেই 'ওঁ হ্রিং ফট স্বাহাঃ' বলে শম্ভু মন্ত্র হাঁকতে লাগল৷
ওর ভণ্ডামি দেখে আমি আর হাসি চাপতে পারলাম না৷ শুধু বোতলটা সবাইকে দেখিয়ে বললাম, 'চুপ চুপ! বাছাধনের এবারে সব ভণ্ডামি বের করব৷ এই দেখ নকল ঘিয়ের বোতল আগেই এসে হাজির হয়েছে, এখন দিয়ে এলেই হয় আর কি৷' ঠিক এমনি সময় পর পর তিন বার হাততালি বাজল৷ আমি আঁধার ঘরে ঢুকে তার হাতে সেই বোতলটা দিয়ে বললাম, 'এই নে৷' বোতলটা দিয়ে আমি চলে আসছি, আঁধারে শম্ভু আমায় ফিসফিস করে ডেকে বলল, 'সবাইকে বাইরে রাখ গিয়ে মিনিট তিনেক পর আমি কাত হয়ে পড়ে গোঁ গোঁ করে হাত-পা ছুড়তে লাগব৷ তখন তুই ওদের নিয়ে ঘরে ঢুকিস, বুঝলি? তাহলে ওরা বুঝবে যে বাস্তবিকই ন্যাস করে অজ্ঞান হয়ে পড়েছে৷' 'আচ্ছা' বলে আমি ঘর থেকে বের হয়ে এলাম৷
বাইরে এসে দেখি ওরা সব হাসতে হাসতে গড়াগড়ি যাচ্ছে৷ টপ করে আমার মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল৷ ছুটে ওদের কাছে গিয়ে বললাম, 'এই চুপ, চুপ! সব পণ্ড করে দিবি! শিগগির কলতলা থেকে মগটা নিয়ে এসে ওতে কালি গোল; আর ছুটে যা একজন দু-পয়সার বরফ কিনে নিয়ে আয়৷ ভণ্ডামিটা আজ বের করব হতভাগার!'
সব ঠিকঠাক করতে-না-করতেই শম্ভু ঘরের ভেতর গোঁ গোঁ করতে শুরু করে দিল৷ আর যাবে কোথায় সবাই হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকে আলো জ্বেলেই দেখি শম্ভু চিতপাত হয়ে পড়ে গোঁ গোঁ করছে, আর ঘিয়ের খালি বোতলটা গড়াগড়ি খাচ্ছে খাটের পায়ার কাছে৷
অনেক কষ্টে হাসি চেপে আমি কাঁদো-কাঁদো সুরে ডাক ছেড়ে বললাম, 'হায়! হায়! শম্ভুকে তোরা মেরে ফেললি রে, মেরে ফেললি!' এদিকে যশো বলে উঠল, 'ওরে কে আছিস জল জল! পাখা!' যেই না বলা বিষ্টু সেই কালি গোলা জল খানিকটা শম্ভুর মুখে চোখে ছিটিয়ে দিয়ে বাকিটা মাথায় ঢেলে দিল৷ কেউ হাওয়া করে, কেউ-বা হাত-পা ধরে টানাটানি করে- শম্ভু কিন্তু ঠিক ভণ্ডের মতো তখনও গোঁ গোঁ করে হাত-পা ছুড়তে লাগল৷
শচীন ছুটতে ছুটতে এসে বলল, 'এই যে বরফ, বরফ!' অমনি ওরা কে কে যেন দুই-তিন চাকা বরফ নিয়ে কেউ শম্ভুর মাথায় ঠাসে, কেউ হাতের তালুতে কেউ পায়ের তলায় কেউ বুকের ওপর ঠেসে ধরল৷ কিন্তু কী আশ্চর্য! তবুও শম্ভুর ভণ্ডামি যায় না৷ যশো চট করে গিয়ে একটানে শম্ভুর গায়ের নতুন গেঞ্জিটা ফেললে ছিঁড়ে৷ মনি কোথা থেকে একটা কাঁচি নিয়ে এসে খ্যাঁচ খ্যাঁচ করে শম্ভুর মাথার চুলগুলো কেটে বলল, 'লাগাও বরফ৷' হাসতে হাসতে আমি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলাম!
এদিকে হইচই শুনে সারাটা বোর্ডিঙের ছেলে সেখানে ভেঙে পড়ল৷ এমনকী সুপারিন্টেন্ডেন্টবাবুও হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বললেন, 'ব্যাপার কী হে! ব্যাপার কী?' কে একজন ঘরের ভেতর থেকে বলে উঠল, 'শম্ভু ফিট হয়েছে স্যার-ডাক্তার! ডাক্তার ডাকুন শিগগির!' সুপারিন্টেন্ডেন্টবাবু ছুটে গিয়ে তার 'স্মেলিং সল্ট'টা এনে শম্ভুর নাকের ডগায় ধরতেই শম্ভু নাক সিঁটকিয়ে এ্যাঁ এ্যাঁ করে উঠে বসল-তখন তার কাঁপুনি দেখে কে৷
আমরা কেউ আর হাসি চাপতে পারলাম না, প্রাণ খুলে হো-হো করে হেসে উঠলাম৷ মুখটা হাঁড়ির মতো করে শম্ভু উঠে টলতে টলতে ঘর থেকে বের হয়ে গেল৷ দোলের দিনে হোলির বাজার যা অবস্থা হয় বেচারি শম্ভুর ঠিক তেমনি অবস্থা দেখে সুপারিন্টেন্ডেন্টবাবুও না হেসে থাকতে পারলেন না৷
ঘিয়ের বোতল পড়ে মরুকগে ছাই-কিন্তু সেই যে শম্ভু আমাদের সঙ্গে কথা বন্ধ করল আর কোনো দিনই কথা কইল না৷ কইবেই-বা কোন মুখে?
এখনও শম্ভুর কথাটা মনে পড়লে আর হাসি চাপতে পারি না৷
ফাল্গুন ১৩৩৮
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন