মিনিয়েচারের বোম্বাই যাত্রা

অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়

রোববার সকালে জলখাবার শেষ করে একখানা সায়েন্স ফিকশনের বই নিয়ে সবে বসেছি, এমন সময় মেজকার ফোন এল, 'আজ বিকেলে আমি আর পুল্লা রেড্ডি একজায়গায় যাচ্ছি৷ রন্টু তুইও আসছিস তো?'

সেদিন বিকেলে টিভিতে একটা ভালো সিনেমা হবার কথা৷ ভাবলাম মানা করে দিই৷ কিন্তু তার আগেই মেজকা বলে ফেলেছেন, 'ঠিক পাঁচটায় আসব আমরা, তৈরি থাকিস৷'

মেজকা বিয়ে-থা করেননি৷ আমাদের বাড়ির কাছেই একটা ছিমছাম ফ্ল্যাট নিয়ে থাকেন৷ সংসারের ঝামেলা নেই তাই ব্যায়াম করা, খেলা দেখা, বেড়ানো এসব করেই অবসর সময় কাটান৷ আমারও এসব দিকে খুব ঝোঁক, এজন্য মেজকা আমায় খুব পছন্দ করেন৷ কোথাও যাবার সময় সঙ্গে নিয়ে যান৷ পুল্লা রেড্ডি মেজকার বন্ধু৷ এক অফিসে কাজ করেন৷ ক্ষুরধার বুদ্ধি আর জানেন শোনেনও খুব৷ কোথাও যেতে হলে মেজকা শুধু আমাকে নয়, পুল্লা রেড্ডিকেও সঙ্গে নিয়ে যান৷

বিকেলে কাঁটায় কাঁটায় পাঁচটায় গাড়ি এসে হাজির৷ গাড়ি চালাচ্ছেন মেজকা, সামনের অন্য সিটে পুল্লা রেড্ডি৷ আমি পেছনে উঠে বসলাম৷ কোথায় যাচ্ছি জানি না৷ তবে মেজকা যখন পুল্লা রেড্ডিকে সঙ্গে নিয়েছেন তখন ধরে নিলাম যে কোথাও কোনো একটা সমস্যা দেখা দিয়েছে যার সুরাহা করার জন্য পুল্লা রেড্ডির শরণাপন্ন হতে হয়েছে, কেননা সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে পুল্লা রেড্ডির মাথা খুব পরিষ্কার৷

একটু পরেই অবশ্য শুনলাম যে আমরা যাচ্ছি গণপতি ব্যানার্জির বাড়ি৷ তবে মেজকা নিজেই জানেন না ঠিক কী জন্য উনি ডেকেছেন৷

জিজ্ঞেস করলাম, 'গণপতি ব্যানার্জি কে মেজকা?'

'উনি বিরাট বড়োলোক৷ গেঞ্জি আর মোজার কারখানা করে প্রচুর টাকা করেছেন৷ তবে ব্যাবসা ছাড়াও অন্য দিকে ঝোঁক আছে ওঁর৷ আর্টের একজন বড়ো সমঝদার, অনেক মূর্তি আর ওরিজিন্যাল ছবি ওঁর কালেকশানে আছে৷'

পুল্লা রেড্ডি বললেন, 'ওঁর নামটা শোনা শোনা মনে হচ্ছে৷ ওঁর একটা মিনিয়েচার ছবির কালেকশান আছে না?'

মেজকা বললেন, 'ছবির ব্যাপারে আমার কাছে মিনি ম্যাক্সি দুই-ই সমান৷ ওনার খবর আমি রাখি না৷'

একটু পরেই গণপতিবাবুর বাড়ি পৌঁছে গেলাম৷ উঁচু পাঁচিল দেওয়া বড়ো বাড়ি, গেটে গুর্খা দরওয়ান৷ বাড়িটা পুরোনো ধাঁচের৷ বড়ো বড়ো থামওয়ালা বারান্দা৷ হল ঘরখানা বিরাট আর তেমনি সব ভারী ভারী পুরোনো আসবাবে সাজানো৷ গণপতিবাবুর চেহারাখানাও ফরসা আর দশাশই৷ আমাদের আদর করে বসালেন৷ সঙ্গেসঙ্গেই প্রায় চা জলখাবার এসে গেল৷ দেখলাম উনি বেশ অল্প কথার লোক৷ দু-এক মিনিটের মধ্যেই আসল কথায় চলে এলেন৷ বললেন, 'আপনাদের যে জন্য ডেকেছি সেটা বলছি এবার৷ আপনারা কি জানেন যে আমার একটা মিনিয়েচার ছবির কালেকশান আছে?'

'শুনেছি-' বলে মেজকা তাকালেন রেড্ডির দিকে৷

'কয়েক মাস আগে আমি একটা মুঘল মিনিয়েচার কিনেছি৷ খুব মূল্যবান ছবি ওটা৷ ছবিটা কেনার পর দু-দুবার এ-বাড়িতে চুরির চেষ্টা হয়েছে৷ কিন্তু দু-বারই আমার অ্যালসেশিয়ান কুকুর টের পেয়ে যাওয়ায় চোর ছবি না নিয়েই পালিয়ে যায়৷ তারপর আমি ছবিখানা ব্যাঙ্কের লকারে রেখেছি, ব্যাঙ্কে যাবার পথেও ক-জন লোক ধাক্কা দিয়ে আমায় মাটিতে ফেলে ছবি ছিনিয়ে নিতে চেষ্টা করেছিল, কিন্তু পারেনি৷'

পুল্লা রেড্ডি বললেন, 'এসব কারা করাচ্ছে, সে সম্বন্ধে আপনার কি কোনো ধারণা আছে?'

'সন্দেহ আছে, ধারণা নয়৷ মানে ছবিটা যখন নিলামে ওঠে তখন আরও অনেকে ছবিটা কিনতে চেয়েছিল৷ হয়তো তাদেরই কেউ-'

'এখন কী করতে চান?'

'বলছি৷ বম্বেতে মিনিয়েচার ছবির একটা একজিবিশন হচ্ছে, তাতে ছবিটা পাঠাব, কিন্তু ভয় হচ্ছে পথে না চুরি হয়ে যায় ছবিটা৷'

মেজকা বললেন, 'আপনি ছবি বম্বে পাঠাচ্ছেন তা জানবে কী করে চোরেরা?'

গণপতিবাবু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, 'বলতে লজ্জা হচ্ছে কিন্তু লুকিয়ে লাভ নেই৷ আমার আত্মীয় পোষ্য অনেক৷ কর্মচারীও৷ মনে হচ্ছে ওদের মধ্যে কেউ মিনিয়েচার সংক্রান্ত খবর অপর পক্ষকে পৌঁছে দিচ্ছে৷ কিন্তু সেটা কে তা ধরতে পারিনি৷'

পুল্লা রেড্ডি প্রশ্ন করলেন, 'আমাদের কী করতে বলছেন?'

'একজিবিশনের জন্য আমি বম্বে যাব প্লেনে৷ সবাই জানবে ছবিটা নিয়ে যাচ্ছি৷ কিন্তু তার একদিন আগে ছবিটা নিয়ে আপনারা চলে যাবেন ট্রেনে৷ ওখানে সি গ্রিন হোটেলে আপনাদের জন্য বুকিং করা থাকবে৷ আমিও থাকব৷ অর্থাৎ এখানে ব্যাঙ্কের লকার থেকে বার করে ছবিটা নিয়ে বম্বে গিয়ে আমাকে পৌঁছে দেবেন৷'

মেজকা বললেন, 'এটা আর এমন কী কঠিন কাজ?'

গণপতিবাবু মাথা নেড়ে বললেন, 'যত সহজ ভাবছেন তত সহজ নয়৷ তাহলে আপনাদের ডাকতাম না৷ অপর পক্ষ এখন পর্যন্ত ছোরা পিস্তলে হাত দেয়নি বটে, কিন্তু দেবে না এমন কোনো গ্যারান্টি নেই৷'

'সেটা ঠিক৷ প্রস্তুত হয়ে যাওয়াই ভালো,' বললেন পুল্লা রেড্ডি৷ 'কবে নাগাদ যেতে হবে আমাদের?'

'আগামী শনিবার৷'

'ট্রেনের রিজার্ভেশন?'

'লোক আছে-হয়ে যাবে৷ আপনারা তো সবাই-' বলে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকালেন গণপতিবাবু৷

আমিও ভয়ে ভয়ে তাকালাম মেজকার দিকে৷ এক যাত্রায় পৃথক ফল হবে নাকি? মেজকা বম্বে অভিযানে আমায় নেবেন তো?

মেজকাও তাকালেন আমার দিকে৷ তারপর বললেন, 'হ্যাঁ, তিনজনে গেলেই ভালো৷ মানে রন্টু ছেলেছোকরা-হাতাহাতি হলে সাহায্য করতে পারবে৷'

'নিশ্চয় নিশ্চয়৷'

কথাবার্তা সব ঠিক হয়ে গেল৷ শনিবার দিন প্রথমে ব্যাঙ্কে গিয়ে লকার থেকে ছবিটা বার করব আমরা৷ এজন্য পুল্লা রেড্ডি ও মেজকার নামে অথরিটি লেটার দিলেন গণপতিবাবু৷ তারপর ছবিটা নিয়ে বিকেলে তিনজনে ভায়া নাগপুর বম্বে মেলে চড়ে বসব৷ আমাদের টিকিট ইত্যাদি পাঠাবেন গণপতিবাবু৷

এর আগে বম্বে যাইনি৷ তাই বম্বে দেখার এই সুযোগ পেয়ে খুব ভালো লাগছিল, গাইড বুক দেখে বম্বের দ্রষ্টব্য জায়গাগুলির একটা তালিকাও করে ফেললাম৷

শনিবার সকালে মেজকার গাড়ি করে ব্যাঙ্কে এলাম আমরা৷ ছবিটা লকার থেকে নিতে হবে৷ ব্যাঙ্কের ম্যানেজারকে গণপতিবাবুর চিঠি দেখাতে উনি লকার খোলবার অনুমতি দিলেন৷ ছবিটা লকার থেকে বার করে চটপট হাতের ব্রিফকেসে পুরে ফেললেন মেজকা৷ কিন্তু বাইরে যাবার জন্য দরজায় আসামাত্র হঠাৎ দুটো লোক এসে মেজকাকে ধাক্কা মারল ও তাঁর হাতের ব্রিফকেস নিয়ে টানাটানি করতে লাগল৷ কিন্তু মেজকার ব্যায়াম করা শরীর৷ ওঁর হাতের বজ্র আঁটুনি ছাড়িয়ে কোনো কিছু কেড়ে নেওয়া অত সোজা নয়৷ তার ওপর একপাশ থেকে আরেকজন ভদ্রলোক ছুটে গিয়ে-'আরে-আরে এ কী' বলে ব্রিফকেস সমেত মেজকাকে জড়িয়ে ধরলেন৷ ভয় পেয়েই হয়তো, ধাক্কা-মারা লোক দুটো তখন পালিয়ে গেল৷

ওই ভদ্রলোকটি মেজকাকে বললেন, 'গিয়েছিল তো আরেকটু হলেই ব্রিফকেসটা৷ টাকা পয়সার ব্যাপার, সাবধানে থাকবেন৷ আমার সঙ্গে গাড়ি রয়েছে, আসুন আপনাকে পৌঁছে দি৷'

ভদ্রলোকের কালো ষণ্ডামার্কা চেহারা ও ধূর্ত চোখ দেখে আমার একটুও ভালো লাগল না৷ অথচ মেজকা দেখলাম ওঁর সঙ্গে দিব্যি গল্প জুড়ে দিলেন৷

পুল্লা রেড্ডি কিন্তু এগিয়ে এসে বললেন, 'গাড়ি তো আমাদের সঙ্গেও রয়েছে৷ অবশ্য থ্যাংকস ফর দ্য অফার৷ চলো বোস,' বলে একরকম জোর করেই মেজকাকে টেনে ওঁর গাড়ির দিকে নিয়ে গেলেন৷

গাড়িতে উঠবার আগে পেছন ফিরে দেখি সেই ভদ্রলোক খুব কটমট করে তাকিয়ে আছেন আমাদের দিকে৷ পুল্লা রেড্ডিকে বলায় উনি বললেন যে ব্যাপারটা বেশ সন্দেহজনক৷

সেটা আরও বুঝতে পারলাম যখন দেখলাম যে কালো রঙের একখানা অ্যামবাস্যাডার আমাদের গাড়ির পেছন পেছন আসছে৷ মেজকা সরে গিয়ে পথ করে দিলেও গাড়িখানা আমাদের পিছু পিছুই আসতে লাগল৷ তবে মেজকা এক্সপার্ট ড্রাইভার৷ পুল্লা রেড্ডিকে জিজ্ঞেস করে হঠাৎ একটা ইউ-টার্ন নিয়ে বাঁ-দিকের একটা গলিতে ঢুকে পড়লেন৷ ওদিকে কালো অ্যামবাস্যাডারটা পেছনের গাড়ির তাড়া খেয়ে এদিকে যেতে বাধ্য হল৷ মেজকাও এদিক-ওদিক ঘুরে বাড়ির পথ ধরলেন৷

পথে পুল্লা রেড্ডিকে ওঁর বাড়িতে নামাবার কথা৷ মেজকা বললেন, 'রেড্ডি, ছবিটা তোমার কাছেই রাখো৷'

পুল্লা রেড্ডি ব্রিফকেস খুলে ছবিটা বার করলেন৷ ছবিটা লম্বায় আট-ইঞ্চিটাক হবে, চওড়ায় ইঞ্চি পাঁচেক৷ এর জন্যই এত মারামারি! পুল্লা রেড্ডি ছবিখানা কোটের ভেতরকার পকেটে ঢুকিয়ে নিজের বাড়িতে নেমে গেলেন৷ বিকেলে হাওড়া যাবার পথে ওঁকে তুলে নিয়ে যাব আমরা৷

বিকেলে পুল্লা রেড্ডি ও তাঁর ভি.আই.পি. সুটকেস নিয়ে ভালোয় ভালোয়ই হাওড়া স্টেশনে পৌঁছে গেলাম৷ প্ল্যাটফর্মে গিয়ে রিজার্ভেশন চার্টে আমাদের নামও খুঁজে পেলাম সহজেই৷ চার বার্থের একটা কামরায় আমরা তিনজন৷ চতুর্থজন হচ্ছেন কোনো এক নিবারণ ঘোষাল৷ গাড়ি ছাড়ার একটু আগে হন্তদন্ত হয়ে এলেন৷ হাতে ছোটো একটা সুটকেস মাত্র৷ মাঝারি বয়েস, চুলে অল্প পাক ধরেছে, শুনলাম একটা ওষুধ কোম্পানির সেলস রিপ্রেজেনটেটিভ উনি৷

প্রথম রাতটা আমরা বই ম্যাগাজিন পড়েই কাটালাম৷ সহযাত্রীটিও বেশি কথাবার্তা বললেন না৷ পুল্লা রেড্ডি নিজের সুটকেসটা মাথার কাছে রেখে ওপরের বাঙ্কে ঘুমুতে গেলেন৷

পরদিন কিন্তু নিবারণ ঘোষালের সঙ্গে খুব আলাপ হয়ে গেল৷ শুনলাম ইগতপুরী যাচ্ছেন উনি৷ পশ্চিম ভারতের অনেক জায়গা ঘুরেছেন, অনেক গল্প করলেন৷ ব্রেকফাস্টে আমাদের সঙ্গে ওঁকে ডেকে নিলেন মেজকা৷ বিকেলে নাগপুরে আমাদের মিষ্টি খাওয়ালেন নিবারণবাবু, সন্ধ্যে বেলা পুল্লা রেড্ডি সবাইকে খাওয়ালেন গরম কফি৷ এ ছাড়া নিয়মমাফিক লাঞ্চ ডিনার তো ছিলই৷ আবার ডিনারের পর মি. ঘোষাল কী একটা স্টেশনে নেমে সবার জন্য গরম দুধ নিয়ে এলেন৷ আমরা তো অবাক৷ রেলওয়ে স্টেশনে যে এমন দুধ পাওয়া যায় জানতাম না৷ শুতে যাবার আগে মেজকা বললেন, 'ট্রেন জার্নিতে যদি ডানহাতের ব্যাপারটা এমন চমৎকার হয় তবে ঘন ঘন জার্নি করা চলে৷'

পরদিন ঘুম ভাঙল মেজকার ধাক্কায়৷ চোখ খুলে দেখলাম বেশ বেলা হয়ে গেছে৷ হাত ঘড়িতে দেখি সাড়ে আটটা বাজে৷ মেজকা আর পুল্লা রেড্ডি দু-জনকেই খুব গম্ভীর মনে হচ্ছিল৷ কামরায় নিবারণ ঘোষালকে দেখতে পেলাম না৷ বিরাট একটা হাই উঠছিল সেটাকে চেপে বললাম, 'নিবারণবাবু ইগতপুরীতে নেমে গেছেন বুঝি?'

পুল্লা রেড্ডি বললেন, 'শুধু নেমে যাননি৷ আমাদের সুটকেস তিনখানাও নিয়ে গেছেন৷'

'সেকী!' আমি প্রায় লাফিয়ে উঠলাম৷

Cov151

'ব্যাপারটা খুবই সোজা৷' পুল্লা রেড্ডি বললেন, 'দেখা যাচ্ছে যে নিবারণ ঘোষালও ছবি চোরদের এজেন্ট৷ গরম দুধে নির্ঘাত ঘুমের বড়ি ফেলে দিয়েছিলেন, আমরাও তাই খেয়ে অঘোরে ঘুমিয়েছি৷ কাজেই তিনখানা সুটকেস নিয়ে কোনো একটা স্টেশনে নেমে যাওয়া ও ধীরে-সুস্থে ছবিটা খোঁজা একটুও কষ্টকর ব্যাপার নয়৷'

মেজকা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, 'এখন গণপতিবাবুকে কী ভাবে মুখ দেখাই?'

পুল্লা রেড্ডি বললেন, 'অত নিরাশ হবেন না৷ কন্ডাক্টর গার্ডকে কমপ্লেন করেছি৷ ও বলেছে সামনের স্টেশনে নেমে ইগতপুরীতে টেলিগ্রাম করাবে৷' কিন্তু ওর আশ্বাসে খুব আস্থা রাখতে পারলাম না৷

যথাসময়ে ট্রেন বম্বের ভিক্টোরিয়া টারমিনাস স্টেশনে পৌঁছোল৷ দেখলাম গণপতিবাবু নিজেই আমাদের নিতে এসেছেন৷ কিন্তু সুটকেসবিহীন তিন মূর্তির ঝোড়ো কাকের মতো চেহারা দেখেই বুঝে নিলেন ব্যাপারখানা কী৷ জিজ্ঞেস করায় পুল্লা রেড্ডি সংক্ষেপে ব্যাপারটা বললেন৷

দেখলাম গণপতিবাবুর ফর্সা মুখখানাতে কে যেন এক পোঁচ কালি মাখিয়ে দিল৷ উনি শুধু বললেন, 'ইস-এত কষ্ট জলে গেল৷'

এমন সময় একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট স্টেশন মাস্টার এসে বললেন, 'আপনারাই কি নলিনাক্ষ বোস অ্যান্ড পার্টি?'

'হ্যাঁ৷'

'ইগতপুরী থেকে এইমাত্র ট্রাংকল এসেছে যে আপনাদের সুটকেস ওয়েটিং রুমে পাওয়া গেছে-অবশ্য তালা ভাঙা অবস্থায়৷ ওগুলো জামাকাপড়ে ঠাসা৷ মনে হচ্ছে কিছু খোয়া যায়নি৷ তবে মূল্যবান কিছু ছিল কি?'

গণপতিবাবু একটু তিক্ত হাসি হেসে বললেন, 'চোরেরা সুটকেসের তালা ভেঙেও মূল্যবান জিনিস ফেলে রেখে যাবে এমন কখনো শুনেছেন কী? কিন্তু ভাবছি কন্ডাক্টর গার্ডের চোখের ওপর নিয়ে একটা লোক তিন-তিনটে সুটকেস নিয়ে নেমে যায় কী করে!'

অ্যাসিস্ট্যান্ট স্টেশন মাস্টার ভুরু কুঁচকে বললেন, 'একজন লোকের তিনটে মাল থাকতে পারবে না, এমন কোনো আইন তো নেই৷'

এমন সময় ছোটো সুটকেস হাতে একটি দক্ষিণী ছেলে আমাদের দিকে এগিয়ে এল৷ পুল্লা রেড্ডি ওকে দেখে এগিয়ে গিয়ে বললেন, 'এই যে রাজেন্দ্রন-এভরি থিং ও কে?'

'হ্যাঁ আংকল-'

'ম্যাগাজিনগুলো?'

'এই যে,' বলে খানকয়েক তেলুগু ভাষার ম্যাগাজিন পুল্লা রেড্ডির হাতে দিল ছেলেটি৷ উনি একটু উলটেপালটে দেখলেন ওগুলো৷ তারপর বললেন, 'ঠিক আছে, তুমি এসো৷ মাতুংগাতে তোমার কাকার ওখানে পরে খোঁজ করব আমি৷'

আমরা চারজনে এরপর হোটেলের দিকে রওনা হলাম৷ বম্বে এই প্রথম এলাম-কিন্তু মিনিয়েচারখানা চুরি যাওয়াতে মনটা এত খারাপ হয়েছিল যে মেরিন ড্রাইভ দেখেও রোমাঞ্চিত হলাম না৷

সি গ্রিন হোটেলটা মেরিন ড্রাইভের ওপর৷ আমাদের জন্য তিন বেডের একটা কামরা রিজার্ভ করেছিলেন গণপতিবাবু৷ সামনেই ব্যালকনি-দাঁড়ালে সমুদ্র দেখা যায়৷

গণপতিবাবু বললেন, 'যা আমার কপালে ছিল হয়েছে, এ নিয়ে আর ভেবে লাভ নেই৷ আপনারা বিশ্রাম করুন৷ বিকেলে রন্টুকে জুহু বিচে নিয়ে যাব৷'

পুল্লা রেড্ডি বললেন, 'তার আগে গরম কফি আনতে বলুন দিকি, নয়তো মৌজ হচ্ছে না৷'

মেজকা বললেন, 'রেড্ডি তুমি তো বেশ লোক-অমন দামি ছবিটা চুরি গেল আর তুমি মৌজের কথা ভাবছ!'

পুল্লা রেড্ডি মিটি মিটি হেসে বললেন, 'ছবি চুরি গিয়েছে কে বলল?'

আমরা তো ছার-অমন যে ভারিক্কি গণপতিবাবু, বিস্ময়ে ওঁর কথাও আটকে গেল৷ বললেন, 'তার মানে?'

পুল্লা রেড্ডি রাজেন্দ্রনের দেওয়া একটা তেলুগু ম্যাগাজিন বার করলেন৷ নজর করে দেখলাম ফিল্মস্টারের ছবিওলা দুটো পাতা সেলোটেপ দিয়ে সাঁটা৷ ক্ষিপ্র হাতে সেলোটেপ ছিঁড়ে ফেললেন পুল্লা রেড্ডি৷ আর দুটো পাতার মাঝখান থেকে বেরিয়ে এল গণপতিবাবুর সেই মিনিয়েচার৷ পুল্লা রেড্ডি বললেন, 'ছবিখানা ছিলই না আমাদের সঙ্গে৷ কালো অ্যামবাস্যাডারের ঘটনার পর বুঝে গিয়েছিলাম যে আমাদের ওপরও নজর থাকবে চোরদের৷ রাজেন্দ্র অবশ্য বম্বে আসছিলই৷ তাই ভাবলাম এটাই সবচেয়ে নিরাপদ ব্যবস্থা৷'

পুল্লা রেড্ডির কাণ্ডকারখানা দেখে আমি আর মেজকা তখন সত্যি সত্যিই হাঁ৷ গণপতিবাবু শুধু বললেন, 'ছবিটা ওভাবে খোলা ম্যাগাজিনের ভেতর রেখে নিয়ে এল ছেলেটি, তাও সেকেন্ড ক্লাস স্লিপারে৷ খুব রিস্ক নিয়েছিলেন তো মশাই?'

পুল্লা রেড্ডি হেসে বললেন, 'আপনি তো বিজনেস ম্যান, জানেন না, নো রিস্ক নো গেইন?'

শারদীয়া ১৩৯০

সকল অধ্যায়
১.
চাং
২.
হাবুর বাবুগিরি
৩.
ভবম হাজাম
৪.
হুড়ুকবাজ সিং
৫.
হাতির ভয়
৬.
বোকা তাঁতি
৭.
ঝানু চোর চানু
৮.
বাঘ মামা
৯.
শ্বেতব্রাহ্মণের উপাখ্যান
১০.
এক হল দুই
১১.
রামভজনের ঘোড়া কেনা
১২.
দাশুর কীর্তি
১৩.
বুনো মোষ পোষমানা
১৪.
ষর্ণশের্ণ
১৫.
নেড়ুর ভয়
১৬.
হেঁড়ে-গর্জন দৈত্য
১৭.
চোর আর ঠগ
১৮.
আলি ভুলির দেশে
১৯.
বড়ো গদাই আর ছোটো গদাই
২০.
পুরস্কার
২১.
হেশোরাম হুঁশিয়ারের ডায়েরি
২২.
ঠেকে শেখা
২৩.
যুদ্ধের গল্প
২৪.
বন্ধুর দান
২৫.
মানুষের ইতিহাস
২৬.
সূর্যমুখীর কথা
২৭.
ন্যাপলা
২৮.
খেয়ালহারা
২৯.
পরিবর্তন
৩০.
আচ্ছা জব্দ
৩১.
সে
৩২.
মিষ্টি মুখ
৩৩.
চিচিং ফাঁক
৩৪.
অপরূপ রাজ্য
৩৫.
গরিবের দান
৩৬.
চোর ধরা
৩৭.
ময়ূরপঙ্খি
৩৮.
সম্পাদকের সমস্যা
৩৯.
তাইতো
৪০.
লাঠি-সমস্যা
৪১.
খুকির নাম
৪২.
স্বপ্নাদ্য ঔষধ
৪৩.
অজানা কুটুম
৪৪.
রায় মহাশয়ের গল্প
৪৫.
সমরের ষড়যন্ত্র
৪৬.
সুধাং-অ্যাং
৪৭.
ফাঁকিবাজের শিক্ষা
৪৮.
ঘঙ্গোপাধ্যায়
৪৯.
নিশুর বিপদ
৫০.
ফুটবল ম্যাচ
৫১.
এক ভাল্লুকের গল্প
৫২.
কৃপাময়
৫৩.
সেজমামার চন্দ্রযাত্রা
৫৪.
রূপসায়রী
৫৫.
দুই পড়শি
৫৬.
সন্দেশের চিঠি
৫৭.
সদাশিবের ঘোড়া-ঘোড়া কাণ্ড
৫৮.
ভবানন্দের কাশীযাত্রা
৫৯.
প্রথম পুরস্কার
৬০.
কালো মানিক
৬১.
চেঙ্গিস আর হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালা
৬২.
গোবিন্দ গোয়েন্দা
৬৩.
দুগ্যো সদ্দার
৬৪.
ক্যাপ্টেন মুকুন্দরাম
৬৫.
অসমঞ্জবাবুর কুকুর
৬৬.
পিপীলিকা আতঙ্ক
৬৭.
মরুপ্রাসাদের রহস্য
৬৮.
সাতজনের তিনজন
৬৯.
গোরুর বিচার
৭০.
সংস্কার
৭১.
গঙ্গোত্রীর মহাপুরুষ
৭২.
মিনিয়েচারের বোম্বাই যাত্রা
৭৩.
চিতা কাহিনি
৭৪.
বটুকেশ্বরের আবির্ভাব
৭৫.
নিবারণের সমস্যা
৭৬.
ফোর্থ টেস্ট
৭৭.
টাক এবং ছড়ি রহস্য
৭৮.
কলাবতীর ময়দান রিপোর্টিং
৭৯.
ভোটরঙ্গ
৮০.
ঢেউয়ের পরে ঢেউ
৮১.
পাগলা গণেশ
৮২.
সেতু বন্ধন
৮৩.
চিপুরি বিলের মহাশোল
৮৪.
রামেশ্বরের অসমাপ্ত কাজ
৮৫.
বলো তো কে এসেছিল ডিনারে
৮৬.
বোকা রাজার বুদ্ধিমতী রানি
৮৭.
টিপলুর ইতিহাস চর্চা
৮৮.
সোনার মেডেল উধাও
৮৯.
তুতানের বন্ধু
৯০.
ভূত মরলে কী হয়
৯১.
কথারা সব বেরিয়ে পড়েছিল
৯২.
বড়দার কবে ভালো লাগবে
৯৩.
শিবের অসাধ্যি
৯৪.
জয়রামের সিন্দুক
৯৫.
সংবাদের নেপথ্যে
৯৬.
নাড়কান্ডার নানাকাণ্ড
৯৭.
করণপুরার টাঁড়
৯৮.
সাঁঝবাতি
৯৯.
ক্রিকেট খেলার উপকারিতা
১০০.
অলক্ষ্যে হাসে মহাকাল
১০১.
লেখক-পরিচিতি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%