অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়
এই পর্যায়ের দু-টি গল্প এর আগে এই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে, একটি গত বছরের শারদীয়া সংখ্যায় এবং অন্যটি এই বছরের বৈশাখ মাসে৷ আজ এই পর্যায়ের তৃতীয় কাহিনি বলব৷
আজকের কাহিনিতে আমার মালদহ জেলায় ১৯৫৬ থেকে ১৯৫৮ সালের মধ্যে তিনবারের শিকারের ঘটনার কথা লিখছি৷ এর জন্যে প্রথমে একটু মুখবন্ধের দরকার হবে৷
মালদহ শহরের প্রায় ছয় মাইল উত্তরে কোতোয়ালি গ্রামে এক প্রাচীন এবং প্রসিদ্ধ জমিদার পরিবারের বাসস্থান৷ সে সময়ে সেই পরিবারের প্রধান খান বাহাদুর গণি খান চৌধুরী তখনও বর্তমান ছিলেন৷ (তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র আবু বরকত আতাহার গণিখান চৌধুরী বর্তমানে কেন্দ্রীয় সরকারের রেল দপ্তরের মন্ত্রী৷) খান বাহাদুর তখন বয়সে প্রবীণ হলেও বেশ সুস্থসমর্থ ছিলেন এবং তাঁর সহৃদয় বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহারের জন্য সব শ্রেণির লোকের কাছেই জনপ্রিয় ছিলেন৷
তাঁর শিকারের শখও ছিল খুব প্রবল৷ জমিদারির ভার নেবার পর থেকে প্রায় প্রত্যেক বছরই শীতকালে তাঁর উদ্যোগে কোতোয়ালিতে খুব ঘটা করে শিকারের আয়োজন করা হত এবং সেই সব শিকারে যোগ দেবার জন্যে তিনি পরিচিত বহু শিকারিকে তাঁর অতিথি হবার জন্য আমন্ত্রণ জানাতেন৷ অনেক উচ্চপদস্থ রাজ কর্মচারীও এই সব শিকারের দলে যোগ দিতেন৷ সেই সময়ে এইসব সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে অনেকেই সিভিলিয়ান বা 'ইন্ডিয়ান পুলিশ' সংস্থার (আই.পি.) কর্মী ছিলেন, তাঁদের অনেকেরই শিকারে উৎসাহ এবং দক্ষতা দুইই ছিল৷
কোতোয়ালিতে এই শিকারের আকর্ষণ ছিল দুই ধরনের৷ কোতোয়ালির আশেপাশে বড়ো বড়ো আম বাগান ছাড়াও হালকা বনজঙ্গলে ভরা অনেক পতিত জমি ছিল, সেই জায়গাগুলি ছিল প্রচুর বুনো মুরগি এবং চিতাবাঘের স্থায়ী আস্তানা৷ এই দুইরকম শিকারেরই ব্যবস্থা করা হত এবং অতিথিরা প্রায়ই হতাশ হতেন না৷ আমি খান বাহাদুরের নিজের মুখেই শুনেছি যে তাঁর শিকার জীবনের পঞ্চাশ বছরের মধ্যে সেখানে প্রায় পাঁচ-শো চিতাবাঘ শিকার করা হয়েছিল৷ এখনকার দিনে এরকম শিকার প্রায় কল্পনার বাইরে৷ কিন্তু সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় এই যে এইভাবে নিয়মিত বাৎসরিক শিকারের পরও সেখানকার শিকার নিঃশেষ হয়ে যায়নি৷ তার কারণ মনে হয় কোতোয়ালিতে চৌধুরী পরিবারের বাইরে স্থানীয় শিকারি বেশি ছিল না এবং সাধারণ লোকদের মধ্যে শিকারের শখ এবং আগ্নেয়াস্ত্র দুইয়েরই অভাব ছিল৷ বছরে দুয়েকবার করে বড়ো রকমের শিকারের ব্যবস্থা হলেও, তারপর সারাবছর চিতা বাঘ এবং বুনো মুরগিরা নিরুপদ্রবে বংশবৃদ্ধি করতে পারত বলেই তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি৷
দেশ স্বাধীন হবার পর থেকে কিন্তু কোতোয়ালিতে শিকারের উৎসাহে ভাঁটা পড়ে গিয়েছিল৷ ইংরেজ অফিসারেরা তখন সকলে বিদায় নিলেন; তাঁদের স্থলাভিষিক্ত ভারতীয়েরা অধিকাংশই শিকার সম্বন্ধে অনভিজ্ঞ এবং নিস্পৃহ ছিলেন৷ সুতরাং সাবেকি বাৎসরিক শিকারের পাটও উঠে গেল৷ ওইসব বাৎসরিক শিকারে যেভাবে বহু শিকারির জন্য ক্যাম্প পড়ত এবং ভালোভাবে জঙ্গল তাড়াবার জন্যে অনেক হাতি এবং 'বিটার' জড়ো করা হত, যথেষ্ট শিকারির অভাবে সে ব্যবস্থা আর চালু রাখা সম্ভব রইল না৷ তা ছাড়া খান বাহাদুর তখন বার্ধক্যে পৌঁছে যাওয়ায় তাঁর পক্ষে আর সক্রিয়ভাবে শিকার পরিচালনা করাও সম্ভব ছিল না৷ তাঁর পরিবারের তরুণরাও এই পরিচালনায় অনভিজ্ঞ হওয়ায় নিজেদের উৎসাহে স্বল্পতর আয়োজনের শিকারের ব্যবস্থা করতে বিশেষ আগ্রহ বজায় রাখেননি৷
আমি প্রথম যেবার মালদহে সেখানকার জেলা অফিসের কাজ দেখবার জন্যে যাই, সেটা ছিল ১৯৫৬ সাল৷ আমি সে সময়ে পশ্চিমবঙ্গের ল্যান্ড-রিফর্মস কমিশনার ছিলাম এবং ভূমি রাজস্বসংস্কার বিভাগ পরিচালনার কাজ দেখবার জন্যে নিয়মিতভাবে জেলা অফিসগুলি পরিদর্শনের কাজে মাসে ১৫-২০ দিন সফরে যেতে হত৷ মালদহে শিকারের সুবিধার কথা আমি আগে থেকেই জানতাম এবং এবিষয়ে খান বাহাদুরের উৎসাহের কথাও শুনেছিলাম৷
মালদহে পৌঁছে সেখানকার সার্কিট হাউসে থাকবার ব্যবস্থা করে আমি কোতোয়ালিতে খান বাহাদুরের সঙ্গে সৌজন্যমূলক সাক্ষাৎ করতে গেলাম এবং তিনিও আমাকে সাদর অভ্যর্থনায় আপ্যায়িত করলেন৷ একটু পরেই শিকারের প্রসঙ্গ তুলতেই তিনি উৎসাহের সঙ্গে তাঁর অতীত জীবনের অনেক আনন্দময় অভিজ্ঞতার স্মৃতিচারণা করলেন, কিন্তু সেই সঙ্গে একটু বিষাদের সুরে জানালেন সেইসব জমজমাট বাৎসরিক শিকার ক্যাম্পের ব্যবস্থা অনেকদিন থেকেই বন্ধ হয়ে গিয়েছে৷ তবু আমার উৎসাহের কথা শুনে তিনি তার পরের দিন একটি ছোটোখাটো শিকারের ব্যবস্থা করবেন বললেন, তার জন্য তাঁর নিজের হাতিটি ছাড়াও আরও দু-টি হাতি স্থানীয় জোতদারদের কাছ থেকে পাওয়া যাবে বলে জানালেন৷ তাঁর পরিবারের তরুণরাও এই শিকারে যোগ দেবার জন্য উৎসাহ দেখাল৷ যতক্ষণ এইসব আলাপ হচ্ছিল সেই সময়ে খান বাহাদুর তাঁদের বাড়ির সবগুলি আগ্নেয়াস্ত্র আনিয়ে আমাকে দেখালেন৷ আমি দেখলাম অস্ত্রগুলি যদিও অধিকাংশই দামি বিলিতি জিনিস, কিন্তু বহুদিন অব্যবহারে এবং অযত্নে সেগুলি ময়লা এবং মরচে জমে শ্রীহীন হয়ে গিয়েছে৷ অস্ত্র সম্বন্ধে আমার আজীবন প্রায় নেশার মতন আকর্ষণ৷ আমি আমাদের আলাপ চলবার মধ্যেই সেগুলিকে খুলে ভালোভাবে পরিষ্কার করে নিলাম, যাতে পরের দিন শিকারের সময় সেগুলি চালাতে কোনো অসুবিধা না ঘটে৷
তার পরের দিন সকালে প্রাতরাশ সেরেই আমি কোতোয়ালিতে গেলাম একটি জিপ নিয়ে এবং ঠিক হল যে আমরা খান বাহাদুরের বাড়ির কাছেই একটি শুকিয়ে যাওয়া জলাশয়ের নীচু জমিতে যে কাঁটাগাছ এবং ঝোপঝাড়ের জঙ্গল আছে, সেইখানে শিকারের খোঁজ করব৷ ওই জায়গাটির স্থানীয় নাম 'চৌবাচ্ছা'-বোধ হয় আগে সেখানে জল থাকত বলেই৷ কিন্তু তখন সেটি স্থানীয় চিতাবাঘদের একটি নিশ্চিন্ত আশ্রয়ের ঘাঁটি বলেই সকলের ধারণা৷
চৌবাচ্ছায় পৌঁছে হাতি তিনটি দিয়ে লাইন করে যখন আমি এবং আমার সঙ্গীরা পূর্বদিকে সেখানকার জঙ্গলে ঢুকে ঝোপঝাড়ে নাড়া দিতে দিতে পশ্চিম সীমানার কাছাকাছি পৌঁছেছি, তখন একটি মাঝারি আকারের চিতাবাঘ ঘন জঙ্গলের ভিতর থেকে তড়িদগতিতে একলাফে পুকুরের উঁচু পাড়ের উপর উঠে পড়ল এবং সঙ্গেসঙ্গেই বাঁ-দিকে ঘুরে সেই পাড়ের কিনারা বরাবর ছুটে পালাতে লাগল৷ কোনো চিতাবাঘকে দিনের বেলায় খোলা জায়গায় এভাবে ছুটতে আমি আগে কখনো দেখিনি-এরকম হালকা সাবলীল স্বচ্ছন্দ গতি বোধ হয় অন্য কোনো জন্তুরই নেই, মনে হচ্ছিল সে যেন মাটিতে পা না ফেলে প্রায় হাওয়ায় উড়েই চলেছে৷
আমি লাইনের একেবারে ডাইনে ছিলাম, চিতাবাঘ আমাকে পিছনে ফেলে যখন আমার বাঁ-দিকের হাতি দু-টিকেও পার হয়ে গেল এবং ওই দুই হাতির শিকারিরা কেউই গুলি চালালেন না, তখন শিকার চলে যায় দেখে অগত্যা আমি আন্দাজ পঞ্চাশ গজ দূর থেকেই বন্দুকের বাঁ-নল থেকে 'এস জি' ছররার গুলি চালালাম৷ আমি বাঘের কানের ঠিক পিছনে নিশানা করেছিলাম, কিন্তু 'ট্রিগার' চাপবার মুহূর্তেই সে পুকুরের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণায় পৌঁছে গিয়েছিল এবং ঠিক তখনই একটু ডান দিকে বেঁকে গিয়ে কোনাকুনি পুকুরের কোণায় উঁচু ঢালু জায়গা বেয়ে উপরে উঠে অদৃশ্য হয়ে গেল৷ আমি তখন একটু হতাশ হয়ে মনে করলাম আমার গুলি ওইভাবে দিক পরিবর্তনের জন্যে বোধ হয় লক্ষ্যভ্রষ্ট হল৷
তখন আমরা হাতি চালিয়ে বাঘ যেখান দিয়ে চলে গিয়েছিল পুকুর পাড়ের সেই জায়গায় উঠে গিয়ে চারদিকে তাকিয়ে দেখতে লাগলাম, কিন্তু বাঘকে কোথাও দেখা গেল না৷ একটু দূরে গ্রামের পথ ধরে সেই সময়ে কয়েকজন লোক পূর্বদিকে যাচ্ছিল৷ তাদের জিজ্ঞাসা করলাম কোনো বাঘকে তারা ওই পুকুর থেকে উঠে এসে পালাতে দেখেছে কি না৷ তারা কিছু দেখেনি বলে জানাল৷ প্রায় আশা ছেড়ে দিয়ে তখন আমি আমার হাতিটিকে নিয়ে, বাঘ যে লাইন ধরে উপরে উঠে গিয়েছিল, সেই লাইন ধরে আস্তে আস্তে এগোতে লাগলাম আর খুব তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চারদিক দেখতে লাগলাম৷ এমন সময়ে আমার হাতিটি হঠাৎ ভয়ে চিৎকারের সঙ্গে এমন দাপাদাপি করে গা-ঝাড়া দিতে শুরু করল যে, মনে হল আমি তার পিঠ থেকে পড়ে যাব, মাহুত তার কানে অঙ্কুশ লাগিয়ে প্রাণপণে টেনেও তাকে বাগ মানাতে পারবে না মনে হল৷ তখন হঠাৎ বাঁ-দিকে পুকুরের উঁচু পাড়ের ঠিক কিনারায় একটি ঝড়ে-পড়ে-যাওয়া গাছের উপর আমার চোখ পড়ল৷ দেখলাম সেই গাছের জটপাকানো শিকড়ের মাঝখানে বাঘটি মুখ গুঁজে পড়ে আছে, তার শরীরটি এমন অস্বাভাবিকভাবে সেখানে আটকে রয়েছে যে দেখামাত্র বুঝতে পারলাম তার দেহে আর প্রাণ নেই৷ বুঝলাম বাতাসে ওই বাঘের গন্ধ নাকে আসাতেই হাতি ভয়ে অমন চঞ্চল হয়ে উঠেছে৷ আমি ততক্ষণে দুর্ঘটনা এড়াবার জন্য হাতির পিঠ থেকে লাফিয়ে নেমে পড়েছি৷ তারপর সাবধানে বাঘের কাছে এগিয়ে গিয়ে ভালো করে লক্ষ করলাম তার নিশ্বাস পড়ছে কি না৷ সে বিষয়ে নিঃসন্দেহ হয়ে তার পাশে মাটিতে বসে তার শরীর পরীক্ষা করে দেখলাম যে আমার গুলি সে হঠাৎ ডাইনে বেঁকে যাবার জন্যে তার মাথায় না লেগে বাঁ-দিকের কাঁধের পিছনে লেগেছে এবং 'এস.জি' গুলির ন-টি ছররার মধ্যে পাঁচটিই কোনাকুনি ভাবে তার শরীর ভেদ করে হৃৎপিণ্ডকে ঝাঁঝরা করে দিয়ে ডানদিকের কাঁধের জোড়া এবং ঘাড়ের মাঝখান দিয়ে চলে গিয়ে প্রায় সঙ্গেসঙ্গেই মৃত্যু ঘটিয়েছে৷ ততক্ষণে আমার সঙ্গীরা সবাই কাছে এসে গেছেন এবং আমার সফল লক্ষ্যভেদের জন্যে অনেক তারিফ জানালেন৷ তারপর সাফল্যের আনন্দে খুশির মেজাজ নিয়ে আমরা খান বাহাদুরের বাড়িতে ফিরলাম৷
এই সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে দুপুরের খাওয়া সেরে কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর বিকেল বেলায় আমরা আরেকবার চৌবাচ্ছায় গিয়ে জঙ্গল তাড়ালাম৷ এবারেও আমি হাতির লাইনের ডানদিকে ছিলাম, অন্য হাতি দু-টির সোয়ারিরা আমার বাঁ-দিক ধরে এগোলেন৷ আর বাকি তিনজন শিকারি পুকুরের যে কোনা দিয়ে বাঘ পালাবার চেষ্টা করেছিল সেখানে পুকুরের পাড়ের কিনারায় মাটিতে পড়ে থাকা একটি প্রকাণ্ড গাছের গুঁড়ির আড়ালে দাঁড়ালেন৷
এবারেও আগের মতোই পূর্বদিক থেকে ঝোপজঙ্গল ঠেলে আমাদের হাতির লাইন এগিয়ে গেল৷ যখন চৌবাচ্ছার পশ্চিম পাড়ের কাছাকাছি প্রায় পৌঁছে গেছি, তখন পর্যন্ত কোনো জন্তুর আভাস না পাওয়ায় আমরা আর শিকার পাবার আশা ছেড়ে দিয়েছি৷ তখন হঠাৎ দেখলাম হাতির লাইনের বাঁ-দিকে পুকুরের দক্ষিণ-পশ্চিম কোনার জঙ্গলের একটু ফাঁকের ভিতর থেকে একটি প্রকাণ্ড বড়ো চিতাবাঘ একলাফে বেরিয়ে তার দ্রুত সাবলীল গতিতে পাড়ের নীচের কিনারা দিয়ে ছুটে চলেছে৷ সেইখানে ঠিক তার উপরেই পাড়ের কিনারায় গাছের গুঁড়ির আড়ালে যে তিনজন শিকারি দাঁড়িয়েছিলেন, বাঘ মনে হল তাদের দশ গজের মধ্যে দিয়েই চলে গেল, কিন্তু শিকারিরা কেউই বন্দুক ওঠালেন না দেখে আমার মন হতাশা এবং ক্ষোভে ভরে গেল, কারণ এমন সুবর্ণ সুযোগ কিঞ্চিৎ পাওয়া যায়৷ আমার পক্ষে তখন কিছুই করা সম্ভব ছিল না, কারণ বাঘকে আমি দেখেছিলাম প্রায় নব্বই গজ দূর থেকে৷ অতদূর থেকে শটগানের গুলিতে তাকে ফেলবার কোনো সম্ভাবনাই ছিল না৷ আমার বাঁ-দিকের দুই হাতির সোয়ারি শিকারিরা বাঘকে পাল্লার মধ্যে পেয়েছিলেন৷ কিন্তু তাঁরাও গুলি চালাননি- বুঝলাম ওইভাবে ছুটন্ত জন্তুর উপর সঠিক নিশানায় গুলি চালাতে তাঁরা অভ্যস্ত নন৷
বাঘ চলে যাবার পর পাড়ে দাঁড়ানো শিকারিদের কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম তাঁরা অমন সুযোগ পেয়েও তা ছেড়ে দিলেন কেন৷ তাঁরা অপ্রস্তুত ভাবে আমতা-আমতা করে যা বললেন, তাতে বুঝলাম তাঁরা মাটিতে দাঁড়িয়ে অত কাছাকাছি অমন বিপজ্জনক জন্তুকে গুলি করতে ভরসা পাননি৷ পরে আরও জানলাম যে তাঁরা এর আগে গাছের উপর বা হাতির পিঠ থেকে ছাড়া কখনো চিতাবাঘ মারবার চেষ্টা করেননি৷
এই বাঘটির মতন বিশালকায় দর্শনীয় চিতাবাঘ আমি আর কখনো দেখিনি৷ মনে মনে স্থির করলাম এরপর আবার যখন মালদহে যাব তখন তার জন্যে আবার চেষ্টা চালাব৷
তার পরের বছর, অর্থাৎ ১৯৫৭ সালে, আবার যখন মালদহে সফরে যাই সেবারেও একদিনের জন্যে কোতোয়ালিতে শিকারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল৷ সেবারে মাত্র একটি হাতিই জুটেছিল, সেটি খান বাহাদুরের নিজের৷ অন্যগুলি পাওয়া যায়নি, কারণ সে সময়ে জমিদারি অধিগ্রহণের ফলে অনেক জমিদার এবং জোতদারদের অবস্থায় মন্দা যাচ্ছিল, তাঁরা ব্যয়সংকোচের জন্যে হাতি বিক্রি করে দিচ্ছিলেন৷
সেবারে ওই একটি হাতি নিয়েই সীমিত শিকারের চেষ্টায় একটি চিতাবাঘ পাওয়া গিয়েছিল৷ আমি নিজেই ওই হাতিতে থেকে আমার নির্দেশ মতন হাতি চালিয়ে একটি টুকরো জঙ্গল থেকে সেই বাঘটিকে তাড়িয়ে একটি আম বাগানের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছিলাম৷ অন্য শিকারিরা সেই নির্দিষ্ট জায়গায় আগেই গাছে উঠে তৈরি হয়ে বসেছিলেন৷ বাঘ সেখানে পৌঁছোনোমাত্র সবাই একসঙ্গে গুলি চালিয়ে তাকে ধরাশায়ী করলেন৷ কিন্তু সেই বড়ো বাঘটির খোঁজ সেবারে পাওয়া যায়নি৷
এর পরের বছর অর্থাৎ ১৯৫৮ সালে আমি যখন আবার মালদহে যাই, আমার সেবারের শিকার একটি বিশেষ স্মরণীয় ঘটনা৷ সে দিনটি ছিল ৬ এপ্রিল, তখন ইস্টারের ছুটি ছিল বলে মনে হয়৷
সেদিন সকালে কোতোয়ালিতে পৌঁছে যে খবর পেলাম তা একই সঙ্গে উত্তেজনাময় এবং একটু নৈরাশ্যজনক৷ শুনলাম সেই বড়ো চিতাবাঘটি প্রায় একবছর ধরে কোতোয়ালি গ্রামেই স্থায়ীভাবে তার আস্তানা গেড়েছে এবং ওই সময়ের মধ্যে প্রায় আশিটি গৃহপালিত জন্তু মেরেছে৷ তার মধ্যে ছাগল, ভেড়া এবং কুকুর ছাড়াও হালের বলদ এবং গোরুও অনেক ছিল, এমনকী খান বাহাদুরের একটি প্রিয় ভুটিয়া ঘোড়াও সে মেরেছিল৷ এই সময়ে খান বাহাদুর তাঁর হাতিটিও বিক্রি করে দিয়েছিলেন এবং হাতি না থাকায় তাঁর পরিবারের তরুণ শিকারিরা এই বাঘটিকে মারবার কোনো উদ্যোগ করেননি৷ মাচায় বসে টোপ হিসাবে ছাগল বেঁধে প্রচলিত উপায়ে তাকে মারবার কোনো চেষ্টা হয়নি-বুঝলাম ওভাবে শিকার করবার জন্যে যে ধৈর্য এবং আত্মবিশ্বাস দরকার, অভিজ্ঞতার অভাবে সে প্রস্তুতি এই তরুণদের ছিল না৷ আরও শুনলাম ওই চিতাবাঘটির একটি সঙ্গিনীও তখন জুটেছে এবং তারা অবাধে সেই লোকালয়ের মধ্যেই তাদের দৌরাত্ম্য চালিয়ে যাচ্ছে৷
আমি যেদিন সেখানে গেলাম, তার আগের রাতেই বাঘটা কাছের এক গৃহস্থের বাড়ি থেকে একটি বড়ো ভেড়া টেনে নিয়ে গিয়েছে এবং সেই ভেড়াটির ভুক্তাবশিষ্ট দেহাংশ সেদিন সকালেই কাছের একটি জঙ্গলে দেখা গিয়েছে বলেও শুনলাম৷ তখন আমি প্রস্তাব করলাম হাতি না পেলেও কয়েকজন লোককে যদি জঙ্গল তাড়াবার জন্যে পাওয়া যায়, তাহলে আমি তাদের নিয়ে ওই চিতাবাঘের সন্ধানে যাব৷ তবে আমার সঙ্গে আরও কয়েকজন বন্দুকধারী থাকা দরকার তা না হলে জঙ্গল তাড়াবার সময়ে একটিমাত্র বন্দুক দিয়ে বাঘেদের পালাবার সবগুলি পথ আগলানো যাবে না৷
আমার উৎসাহ দেখে বাড়ির যুবকদের কয়েকজন আমার সঙ্গী হতে রাজি হলেন এবং বরকত তাদের নেতৃত্ব করবার ভার নিলেন৷ তখন অল্প সময়ের মধ্যেই খান বাহাদুরের প্রজা কয়েকজন সাঁওতাল যুবককে ডেকে আনা হল৷ এরা সবসময়েই শিকারে উৎসাহী৷ তির ধনুক, টাঙ্গি এবং লাঠি নিয়ে তারা আমাদের সঙ্গী হল৷
যে টুকরো জঙ্গলটিতে ভেড়ার দেহাবশিষ্ট দেখা গিয়েছিল, আমরা সেখান থেকেই আমাদের খোঁজ শুরু করলাম৷ বিটাররা জঙ্গলের একধার থেকে লাইন করে ঝোপঝাড়ে লাঠির বাড়ি মারতে মারতে এগিয়ে চলল, আর আমরা সেই জঙ্গলের অন্য কিনারায় এক-একটি ঝোপের পিছনে নিজেদের আড়াল করে জন্তু চলবার সরু পথগুলি আগলে দাঁড়ালাম৷ যে পথটি দিয়ে বাঘের চলে যাবার সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা বলে মনে হল, আমি সেই পথটি আগলিয়ে রইলাম, আর অন্য শিকারিরা পরস্পরকে যেন দরকার হলে সাহায্য করতে পারেন এমনভাবে কাছাকাছি জায়গা বেছে দাঁড়ালেন৷ এই শিকারে আমরা সবাই ছররার বন্দুক (শট গান) নিয়েছিলাম, কারণ কাছাকাছি চারদিকেই লোকের বসতি থাকায় দূরপাল্লার রাইফেল ব্যবহার করা সেখানে বিপজ্জনক হত৷
আমরা খুব সতর্কভাবে এই জঙ্গলটি তাড়িয়ে ছিলাম, কিন্তু সেখানে কোনো বাঘের দেখা মিলল না৷ তারপর একের পর এক সেদিকটার প্রত্যেকটি টুকরো জঙ্গলই ওইভাবে তাড়ানো হল, কিন্তু চিতাবাঘের কোনো সন্ধানই না পেয়ে আমরা বেশ হতাশ হয়ে পড়লাম৷ ততক্ষণে বেলা এগারোটার বেশি হয়ে গিয়েছে, প্রচণ্ড রোদের মধ্যে অতক্ষণ ঘোরাঘুরি করে আমরা একটু ক্লান্তও হয়ে পড়েছিলাম (সেদিন তাপমাত্রা ছায়ায় ১০৬ ডিগ্রি ফারেনহিট ছিল)৷ সুতরাং একটু বিশ্রাম এবং তৃষ্ণা মেটাবার জন্যে আমরা খান বাহাদুরের বৈঠকখানায় ফিরে গেলাম৷ তিনি আমাদের অসাফল্যের কথা শুনে একটু ভেবে তাঁর বাড়ি থেকে প্রায় সিকি মাইল উত্তরে একটি ছোটো হালকা জঙ্গলে শেষ চেষ্টা করতে বললেন৷
এই জঙ্গলটি সেখানকার অন্য সব ঘন জঙ্গলভরা জায়গাগুলি থেকে বিচ্ছিন্ন৷ মাঝখানে অনেকটা খোলা জায়গা৷ সেখানে আগে আম বাগান ছিল, গাছগুলি পুরোনো হয়ে যাবার পর সেগুলিকে কেটে ফেলে জমি সাফ করা হয়েছিল৷ একটি লম্বাটে চতুষ্কোণ জায়গায় একধরনের হালকা নতুন গাছের চারা লাগিয়ে এই চারা-বাড়িটি (plantation) তৈরি করা হয়েছিল৷ এটি লম্বায় প্রায় এক-শো গজ, কিন্তু চওড়ায় গজ ত্রিশের বেশি নয়৷ এই জঙ্গলের ঠিক উত্তর সীমানা বরাবর একটি লোকাল বোর্ডের রাস্তা পশ্চিম থেকে পূর্বদিকে চলে গিয়েছিল৷ আমার সঙ্গী শিকারিরা সবাই এই রাস্তায় সার বেঁধে এমনভাবে দাঁড়ালেন যাতে বাঘ সেদিক দিয়ে পালাতে না পারে এবং তাঁরা দরকার হলে পরস্পরকে সাহায্য করতে পারেন৷
এই জঙ্গলটি পূর্বদিকে যেখানে শেষ হয়েছে সেই সীমানার গজ পনেরো দক্ষিণে, খোলামাঠের মধ্যে একটি কেটে-ফেলা আম গাছের গুঁড়ির পিছনে আমি এমনভাবে বসলাম যাতে জঙ্গলের দিক থেকে আমাকে সহসা না দেখা যায়৷ আমার বসবার জন্যে একটি নীচু ভাঁজ করা 'ক্যাম্পস্টুল' (campstool) খান বাহাদুরের বুড়ো মাহুত বয়ে এনেছিল৷ এই জায়গাটিতে বসবার উদ্দেশ্য ছিল৷ যদি পশ্চিম দিক থেকে জঙ্গল তাড়িয়ে আনবার সময়ে বাঘ (সেখানে থাকলে) সোজাসুজি পূর্ব দিকের সীমানা পর্যন্ত না এসে ওই জঙ্গলের দক্ষিণ দিকের একটি সরু জন্তু চলার পথ ধরে বেরিয়ে এসে, সেখান থেকেই যে একটি ছোটো নালা সরু হয়ে দক্ষিণ দিকে চলে গিয়েছে তার ভিতরে নেমে পড়ে পালিয়ে যায়, তাহলে তাকে আর পাওয়া যাবে না৷
ওই জঙ্গলের পথটি বেরিয়েছিল আমি যেখানে বসেছিলাম সেখান থেকে প্রায় ত্রিশ গজ দূরে৷ আমি ততদূর আমার বন্দুকের পাল্লায় পাব জানতাম৷ এইভাবে বসাতে জঙ্গলের দক্ষিণ দিকের কোনাটি আমার ডানদিকে পড়ল৷ চোখের কোণ থেকে সেদিকেও দৃষ্টি রাখবার দরকার আমি খেয়ালে রেখেছিলাম৷ এই জঙ্গলটি যেখানে শেষ হয়েছিল, তার পরে প্রায় বিশ গজ একেবারে ফাঁকা মাঠ, তারপরেই আবার হালকা ঝোপে ঢাকা জমি শুরু হয়ে ক্রমেই সেই সব ঝোপঝাড় ঘন আর উঁচু হয়ে দূরের বড়ো জঙ্গলে গিয়ে মিশেছিল৷
এইভাবে বাঘের আশায় প্রতীক্ষা করবার সময়ে আমার দু-জন সঙ্গী ছিল৷ একজন স্থানীয় একটি যুবক (তার নাম এখন আমার মনে নেই), তার বন্দুক চালাবার অভিজ্ঞতা ছিল তবে বুনো মুরগির চেয়ে বড়ো কোনো শিকার সে তখনও করেনি৷ তাকে আমি আমার সামনে গজ পঁচিশেক দূরে বসিয়েছিলাম, যাতে জঙ্গলের দক্ষিণ দিকের সরু পথটি দিয়ে যদি বাঘ বেরিয়ে যাবার চেষ্টা করে তাহলে তার নজরে আসে এবং সে আমাকে জানিয়ে দিতে পারে৷ অন্যজন খান বাহাদুরের বুড়ো মাহুত৷ তাকে আমি আমার পিছনে গজ পঞ্চাশেক দূরে একটা আম গাছের গুঁড়ির আড়ালে লুকিয়ে বসে থাকতে বললাম৷
সব আয়োজন ঠিক হলে বিটাররা লাইন করে জঙ্গলের ঝোপঝাড়ে লাঠির বাড়ি মেরে এগোতে লাগল৷ আমি তাদের কোনোরকম হাঁকডাক করতে বারণ করেছিলাম, কারণ তাতে বাঘ অযথা চমকে গিয়ে এত জোরে ছুটে পালাবার চেষ্টা করতে পারে যে তাকে সময় মতন দেখা বা গুলি করবার সুযোগ পাওয়া যাবে না, কিংবা লাইন কেটে জঙ্গলের বাঁ-দিক বা পিছন দিক থেকেও বেরিয়ে যেতে পারে, তাহলে আমি তাকে দেখতেই পাব না৷
বিটাররা যখন জঙ্গলের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ পার হয়ে এগিয়েছে তখন আমার মনে হল বাঘ বোধ হয় সেখানে নেই৷ এমন সময় হঠাৎ আমার ডান চোখের কোণা থেকে এক ঝলকের মতন দেখলাম একটি প্রায় কালো রঙের জন্তু আমার ডান দিকের জঙ্গলের সীমানা থেকে প্রকাণ্ড এক লাফ দিয়ে বেরিয়ে প্রায় হাওয়ায় ভেসে উড়ে যাবার মতন গতিতে আমাকে পার হয়ে চলে যাচ্ছে৷ প্রথম লাফেই সে প্রায় কুড়ি ফুট পার হয়ে গিয়েছিল৷ আমি দাঁড়িয়ে উঠে ডানদিকে ঘুরে বন্দুক কাঁধে তোলবার আগেই সে আরেক লাফে আরও কুড়ি ফুট চলে গেল৷ যতক্ষণে আমি বন্দুকের নল ঘুরিয়ে তার মাথায় নিশানা নিতে পারলাম ততক্ষণে সে তার তৃতীয় লাফে ওই ফাঁকা জমিটুকুর শেষ প্রান্তে যে নীচু ঝোপের লাইন ছিল সেটি টপকিয়ে যখন ঝোপের ওধারে নেমে পড়েছিল ঠিক সেই সময়ে আমার গুলি ছুটল৷ কিন্তু তখনই আমি বুঝলাম আমার 'বাকশটে'র ঝাঁক তার মাথায় লাগেনি, কারণ ঠিক সেই মুহূর্তে তার মাথা সামনে বাড়ানো তার দুই পায়ের মাঝখানে আড়াল হয়ে গিয়েছিল৷ তবে গুলি যে সম্ভবত তার কাঁধেই লেগে থাকবে তাই মনে হল৷ তখনই চিতাবাঘের শরীরের আশ্চর্য নমনীয়তা এবং সাবলীল ক্ষিপ্রতার একটি অসাধারণ দৃষ্টান্ত দেখলাম৷ গুলি লেগে ঝোপের ওধারে পড়ে যাবার আগেই বাঘ শূন্যেই একমোচড়ে তার শরীরটিকে সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে দিয়ে আমার দিকেই তার মুখ ফিরিয়ে নেমে গেল৷ তার পরমুহূর্তেই দেখলাম আমাকে আক্রমণ করবার জন্যে চিতাবাঘ শূন্যে লাফিয়ে উঠে সেই ঝোপের উপর দিয়ে আমার দিকে চলে আসছে৷ আমার বন্দুক তার দিকে নিশানা করে কাঁধেই ওঠানো ছিল৷ আমার দ্বিতীয় 'বাকশটে'র ঝাঁক তার গলা এবং বুকের সন্ধিস্থানে যে নীচু জায়গাটি ছিল সেই জায়গায় লাগল৷
এই দ্বিতীয় গুলি চলবার পর এমন একটি অভাবনীয় দৃশ্য দেখলাম যা আমি জীবনে আর কখনো দেখিনি বা অন্য কারও কাছে শুনিনি এবং কোনো প্রসিদ্ধ শিকারির লেখা বইয়েও এ রকম ঘটনার বর্ণনা পড়িনি৷ এই গুলিটির সঙ্গেসঙ্গেই যেন সামনের কোনো অদৃশ্য বাধা পেয়ে বাঘের শরীর আর ঝোপ পার হতে পারল না, ঝোপের ওধারেই তার পিছনের দুই পায়ে ভর রেখে বাঘটি খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল, তারপর নৃত্যশিল্পীরা যে ভাবে পায়ের আঙুলের ডগায় ভর দিয়ে ঘুরপাক খায়, ঠিক সেই ভাবেই চার-পাঁচবার ঘুরপাক খেয়ে ঝোপের ওধারেই পড়ে গিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল৷ তারপর সব চুপচাপ৷ ঝোপের পিছনে কোনোরকম শব্দ বা নড়াচড়ার কোনো আভাসই পাওয়া গেল না৷
আমি ততক্ষণে বন্দুকে আবার গুলি ভরে নিয়েছি৷ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে খুব লক্ষ করে দেখে এবং শুনে বুঝবার চেষ্টা করতে লাগলাম গুলি লাগবার পর বাঘ সেখানেই পড়ে আছে, না অন্য কোথাও সরে গিয়েছে৷ যখন কিছুই জানতে পারলাম না তখন সাবধানে এগিয়ে গিয়ে সেই ঝোপজঙ্গলের ভিতরেই বাঘকে খুঁজে দেখা স্থির করলাম৷
বাঘ গুলি খেয়ে যেখানে পড়েছিল আমি সোজাসুজি সেদিকে এগোলাম না, কারণ সে যদি সেখানেই থাকে তাহলে একেবারে তার ঘাড়ের উপর গিয়ে পড়বার আগে তাকে দেখা যাবে না, কিন্তু বেঁচে থাকলে সে আগে থেকেই আমাকে ঝোপের তলা থেকে দেখতে পাবে এবং অত কাছ থেকে আক্রমণ করলে তাকে ঠেকানো খুবই কঠিন হবে৷ সেজন্যে আমি ডান দিক থেকে ঘুরে গিয়ে যেখানে তাকে শেষ দেখা গিয়েছিল তার অনেকটা পেছনে পৌঁছে সেখান থেকে সতর্কভাবে প্রত্যেকটি ঝোপের তলা ভালো করে দেখে নিয়ে এগিয়ে গেলাম, কিন্তু ঝোপের লাইনের শেষ সীমানা পর্যন্ত গিয়েও তাকে দেখতে পেলাম না৷ ততক্ষণে আমার সঙ্গী শিকারি যুবকটি যেখানে দাঁড়িয়ে আমি গুলি করেছিলাম সেইখানে চলে এসেছিল-সে হঠাৎ ভীষণ ভয়ার্ত চিৎকার করে উঠল, 'বাঘ আমার দিকে তাকিয়ে আছে, এখুনি চার্জ করবে৷ শিগগির গুলি করুন৷' আমি তার দৃষ্টি অনুসরণ করে আমার ডানদিকে তাকালাম, কিন্তু বাঘকে সে কোথায় দেখছে তা ঠাহর করতে পারলাম না৷ আমার সঙ্গীর চিৎকার বেড়েই চলল৷ আমি হাত নেড়ে ইশারায় তাকে থামাবার চেষ্টা করলাম, কারণ বাঘের যদি তখনও আক্রমণ করবার শক্তি থাকে তাহলে তার চেঁচানো শুনে তাকেই আক্রমণ করবার সম্ভাবনা, কিন্তু তাকে থামানো গেল না৷ সেই সঙ্গেই আরও দেখলাম, যে বুড়ো মাহুত আমার বসবার আসনটি বয়ে এনেছিল সে তার প্রায় অকর্মণ্য এবং বেঁকে-যাওয়া পা দু-খানি অবিশ্বাস্যরকম দ্রুত গতিতে চালিয়ে ফাঁকা মাঠ পার হয়ে প্রায় খান বাহাদুরের বাড়ির কাছে পৌঁছে গিয়েছে৷
এই অবস্থায় মনের উত্তেজনা খুবই বেড়ে যায়৷ আমি প্রবল চেষ্টায় মাথা ঠান্ডা রেখে শিকারি যুবককে হেঁকে জিজ্ঞাসা করলাম বাঘকে সে কোথায় দেখতে পাচ্ছে৷ সে হাত বাড়িয়ে আমার ডানদিকে ঝোপের লাইনের শেষ প্রান্তের ঠিক পরেই একটি বড়ো কুল গাছের দিকে দেখিয়ে চেঁচিয়ে বলল, 'ওই গাছের তলায়,' আমি তখন সতর্কভাবে সেই দিকে এগিয়ে গেলাম, কিন্তু কুল গাছের পনেরো গজের মধ্যে পৌঁছেও প্রথমে কিছুই ঠাহর করতে পারলাম না৷ তখন দুপুরের সূর্যের আলো কুল গাছের ডালপালার ভিতর দিয়ে যেখানে মাটিতে পড়েছিল সেখানে গাছের পাতার গোল গোল কালো ছায়া আর উজ্জ্বল রোদের আলোয় মিশে এমন একটি বিচিত্র জমাট বুটিদার নকশা তৈরি হয়েছিল যা চিতাবাঘের শরীরের হলদে চামড়ার উপর চক্রাকার কালো রঙের বুটির সঙ্গে একেবারে অভিন্ন৷ সেই পরিবেশে খোলা জায়গাতেও চিতাবাঘ গাছের ছায়ার সঙ্গে বেমালুম একাকার হয়ে মিলিয়ে গিয়ে অদৃশ্য হয়ে থাকতে পারে৷
একটুক্ষণ সেই গাছের নীচে আলোছায়ার নকশার দিকে তাকিয়ে থাকবার পর মনে হল যেন সেখানে সামান্য নড়াচড়ার একটু স্পন্দন এক মুহূর্তের জন্যে খেলে গেল৷ আর সেই সঙ্গেই সেই অবয়বহীন একটানা কালো-হলুদের নকশার একটা অংশ যেন হঠাৎ জমে গিয়ে চিতাবাঘের সমস্ত দেহটি আমার চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠল, ঠিক ভোজবাজির মতন চমক দিয়ে৷ দেখলাম চিতাবাঘটি উপুড় হয়ে আমার দিকেই মুখ করে মাটিতে সটান লম্বা হয়ে পড়ে রয়েছে৷ তার মাথাটা জমি থেকে একটুখানি ওঠানো আর তার উজ্জ্বল হলুদ রঙের চোখ দু-টি স্থির দৃষ্টিতে আমাকে দেখছে৷ আমি আবার গুলি চালাবার জন্যে বন্দুক কাঁধে ওঠাবার সঙ্গেসঙ্গেই কিন্তু তার চোখ দুটি বুঁজে এল আর তার মাথাটি তার সামনে বাড়ানো দু-পায়ের উপর নেমে এসে স্থির হয়ে গেল৷ আমি আর গুলি চালালাম না, স্থির ভাবে লক্ষ করতে লাগলাম তার শরীরে তখনও প্রাণের কোনো চিহ্ন দেখা যায় কি না৷
এমন সময় চিতাবাঘের পিছন দিক থেকে তাঁর বাঁ-দিকের রাস্তা দিয়ে কোলাহল করে আমাদের সাঁওতালি বিটারদের এগিয়ে আসবার আওয়াজ পেলাম৷ 'বাঘ পড়েছে, বাঘ পড়েছে' বলে চিৎকার করে তারা ছুটে আসছিল৷ আমি চেঁচিয়ে তাদের তখুনি কাছে আসতে বারণ করলাম, কারণ বাঘ মরেছে কি না সে বিষয়ে একেবারে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তার কাছে গেলে বিপদের সম্ভাবনা থেকে যায়৷ কিন্তু যখন দেখলাম তারা আমার নিষেধ না শুনে উৎসাহের ঝোঁকে এগিয়েই আসছে, অনিচ্ছাসত্ত্বেও বাঘের মাথায় আরেকবার গুলি করলাম৷ সেটার বোধ হয় একেবারেই দরকার ছিল না৷ তারপর নিজে এগিয়ে বাঘের পাশে দাঁড়িয়ে সবাইকে আসতে অনুমতি দিলাম৷ তখন বিটারদের সঙ্গে বরকত এবং তাঁর সঙ্গী শিকারিরাও সবাই হইহই করে এসে সেখানে জড়ো হলেন৷ বাঘটির প্রকাণ্ড আকৃতি, অসাধারণ মজবুত গড়ন এবং চামড়ার উজ্জ্বল সৌন্দর্য দেখে সবাই এই শিকারের সাফল্যে আনন্দ প্রকাশ করলেন এবং আমাকেও তারিফ জানালেন৷
তারপর বাঘটিকে একটি বাঁশে বেঁধে ঝুলিয়ে ছ-জন লোক দিয়ে তাকে বয়ে নিয়ে খান বাহাদুরের বৈঠকখানার সামনে নিয়ে যাওয়া হল৷ বাঘটিকে দেখে খান বাহাদুর বললেন বহু বছরের মধ্যে এত বড়ো চিতাবাঘ তাঁর এলাকায় শিকার হয়নি৷ মাপ নিয়ে দেখা গেল বাঘটি লম্বায় নাকের ডগা থেকে লেজের আগা পর্যন্ত সাত ফুট নয় ইঞ্চি ছিল৷ লোকালয়ের কাছের জঙ্গলের চিতাবাঘেরা সাধারণত এর চাইতে অনেক ছোটো হয় এবং তাদের গায়ের রংও অনেকটা হালকা হয়ে থাকে৷ এই বাঘের গায়ের চক্রাকার গোল ছাপগুলি উজ্জ্বল কালো রঙের এবং খুব ঘন সন্নিবিষ্ট থাকায় তার চামড়ার জৌলুস সত্যিই দেখবার মতন ছিল৷ তা দেখে বুঝতে পারলাম বাঘটি যখন বনের ভিতর থেকে বাইরে সূর্যের আলোয় বেরিয়েছিল তখন প্রথম দৃষ্টিতে হঠাৎ কেন তাকে কালো রঙের বলে মনে হয়েছিল৷ এরকম চেহারার বাঘ লোকালয় থেকে দূরে গভীর বনাঞ্চলেই সাধারণত দেখা যায়-কেমন করে যে এই গ্রামের জঙ্গলে তার দেখা মিলল তা আমার অজানা৷
এই বাঘটি পাবার পর সেদিন দুপুরের খাওয়া খান বাহাদুরের বাড়ির সবাইয়ের সঙ্গে মিলে মহা আনন্দে সারা হল৷ তারপর বিকেলে আমরা আরেকবার বেরোলাম বাঘের সঙ্গিনীটির খোঁজে, কিন্তু তাকে আর পাওয়া গেল না৷ তখন খান বাহাদুরের বৈঠকখানাতেই চায়ের পাট শেষ করে যখন জিপের বনেটের উপরে বাঘকে চড়িয়ে সার্কিট হাউসে ফিরলাম তখন সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে৷
সেখানে ফেরবার কিছুক্ষণ পরেই একজন ভদ্রলোক একটি ক্যামেরা নিয়ে উপস্থিত হলেন৷ তিনি জানালেন তিনি মালদহ শহরের একজন ফটোগ্রাফ-ব্যবসায়ী৷ যখন আমার জিপ তাঁর স্টুডিয়োর সামনে দিয়ে ফিরছিল তখন বাঘটির অমন দর্শনীয় চেহারা দেখে তার ছবি তুলে রাখবার জন্যে তাঁর বিশেষ আগ্রহ হয়েছে এবং সেই উদ্দেশ্যেই তিনি এসেছেন৷
বাঘটিকে তখন সার্কিট হাউসের সামনে বারান্দায় নামিয়ে রাখা হয়েছিল৷ ফটোগ্রাফারের পছন্দমতন সেটিকে শোয়াবার পর তিনি বললেন যে বাঘের মাথাটি যদি একটু উঁচু করে তুলে ক্যামেরার দিকে মুখ করে রাখা যায় তাহলে ছবিটি খুব ভালো উঠবে৷ দু-পাশে দু-টি কাঠি লাগিয়ে ঠেকা দিয়ে বাঘের মাথাটি তুলে রাখবার চেষ্টা করে সফল হওয়া গেল না, বারান্দার মসৃণ শানের মেঝেতে কাঠি দু-টি পিছলে পড়ে যেতে লাগল৷ তখন আমি নিজেই বাঘের পাশে বসে দু-হাত দিয়ে তার মাথাটি উঁচু করে ধরে রাখলাম এবং সেই ভঙ্গীতে খুশি হয়ে ফটোগ্রাফার তার ছবি তুললেন৷
শারদীয়া ১৩৯০
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন