অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়
'আরে, রাজেন যে! এসো এসো-অনেক দিন পরে৷ কবে এলে কলকাতায়?' প্রফেসর নবগোপাল ঘোষ সাদর অভ্যর্থনা জানালেন তাঁর পুরোনো বন্ধুকে৷
'আজই এলাম,' বললেন রাজেন চাটুজ্যে৷
'চেঞ্জে শরীর সারল? কই, মনে তো হচ্ছে না৷ কেমন শুকনো শুকনো লাগছে যে হে৷'
নবগোপাল ঘোষের লাইব্রেরি ঘরটা মাঝারি৷ চারিদিকে দেয়াল ঘেঁষে বইয়ের তাক- অজস্র বই, নানা বিষয়ের৷ মাঝখানে বড়ো একটা টেবিল ঘিরে কয়েকখানা চেয়ার৷ তারই একখানাতে বসে রাজেনবাবু ঘাম মুছতে মুছতে বললেন, 'জায়গা তো ভালো, আর ছিলামও ভালোই . . .'
'ছিলে মানে? এখন নেই?'
'একটা ট্রাবল হচ্ছে৷ এই কিছুদিন থেকে৷ যে জন্যে তোমার কাছে আসা৷'
'কী বলো তো! কী ট্রাবল?'
'পিঁপড়ে৷'
'পিঁপড়ে!' নবগোপালবাবু প্রায় হেসেই ফেলেছিলেন৷ রাজেনকে তিনি ছেলেবেলা থেকে চেনেন৷ বড্ড নার্ভাস টাইপ৷ এমনি আরও অনেক তুচ্ছ ব্যাপারে ঘাবড়ে গিয়ে আগেও কয়েকবার এসেছে তাঁর কাছে৷ রাজেনবাবুকে গম্ভীর দেখে নবগোপালবাবু বললেন৷
'ব্যাপারটা খুলে বলো তো৷ কী করছে পিঁপড়ে?'
'আক্রমণ,' বললেন রাজেনবাবু৷
'আক্রমণ!' নবগোপালবাবু অবাক৷ 'এ কি আর্মি অ্যান্ট নাকি? ভারতবর্ষে তো আর্মি অ্যান্ট পাওয়া যায় না৷ সাউথ আমেরিকায় আছে বটে-আর আফ্রিকায়৷'
'না না, তাও নয়,' বললেন রাজেনবাবু, 'এগুলো সাধারণ লাল পিঁপড়ে৷ এই বাগানে ঘরে-টরে থাকে৷'
'খুলে বলো দিকি ব্যাপারটা৷ চা খাবে?-ও বংশী, দু-কাপ চা দিয়ো এখানে৷'
চায়ে চুমুক দিয়ে রাজেনবাবু তাঁর কাহিনি শুরু করলেন৷
'ব্যাপারটা ঘটল এই দিন সাতেক আগে সকাল বেলা৷
'যে বাড়িটাতে রয়েছি-প্রশান্তধাম-সেটা বেশ ছিমছাম, তিন দিক খোলা, ঘরের জানালা দিয়ে মাঠ আর কাঁকুরে মাটি দেখা যায়৷ এক কবিরাজের বাড়ি ছিল, তিনি মাস তিনেক হল ছেড়ে কাশীবাসী হয়ে গেছেন৷ কলকাতায় ওঁর জামাইয়ের কাছ থেকে বাড়িটা ভাড়া করি আমি মাস দুয়েকের জন্য৷ একটা মালী আছে তার বউ আর মেয়েকে নিয়ে কম্পাউন্ডেই একটা ঘরে, সেই দেখাশোনা করে, বউ রান্না করে৷ স্বাস্থ্যকর জায়গা, খাবারদাবার সস্তা, বেশ ভালো চেঞ্জ হচ্ছিল৷ দিন সাতেক আগে সকালে বারান্দায় বসে বই পড়ছি, এমন সময় এক তীব্র চিৎকার৷ ঘুরে দেখি মালীর চার বছরের মেয়েটা ওদের ঘরের সামনে ধুলোয় লুটোপুটি খাচ্ছে আর পরিত্রাহি চেঁচাচ্ছে৷
'বিছেটিছে কামড়েছে মনে করে এগিয়ে গিয়ে দেখি বেচারার সর্বাঙ্গ লাল পিঁপড়েতে ছেয়ে গেছে৷ মেয়েটি রোজ সকালে আমার কাছ থেকে একটা করে বিস্কুট খায়৷ সেটা তার হাতের মুঠোয় ধরা রয়েছে৷ পিঁপড়েগুলো বোধ হয় সেই বিস্কুটের লোভেই মেয়েটাকে আক্রমণ করেছে৷ লাল পিঁপড়ের কামড় কী সাংঘাতিক তা তো তুমি জান৷ সেই পিঁপড়ে এতগুলো একসঙ্গে কাউকে আক্রমণ করলে তার কী দশা হবে বুঝতেই পারছ৷
'আমি প্রথমেই কোনোরকমে মেয়েটির হাত থেকে বিস্কুটটা ছিনিয়ে নিয়ে সেটাকে ছুড়ে ফেলে দিলাম৷ ইতিমধ্যে মেয়ের বাপ এসে গেছে, দু-জনে মিলে কোনোরকমে গামছা ঘষে পিঁপড়েগুলোকে দূর করে মেয়েটির গায়ে ডেটল লাগিয়ে দিলাম৷ ভরতকে জিজ্ঞেস করতে সে বললে লাল পিঁপড়ের উপদ্রব ক-দিন থেকেই খুব বেড়েছে৷ আগে নাকি ছিল না৷ সবই লাল পিঁপড়ে৷ ছোটো কালো পিঁপড়ে বা ডেঁয়ো পিঁপড়ে নেই৷
'কী আর করি; ফিনাইল জলে ভালো করে ঘর-টর ধোয়ালাম৷ বাড়ির ও বাগানের আনাচে-কানাচে গ্যামাকসিন পাউডার ছড়িয়ে দিলাম৷ মনে হল তাতে কাজ হল, দুটো দিন আর লাল পিঁপড়ের দেখা পেলাম না৷ তিন দিনের দিন ভরতের বউ রান্নাঘরে ঢুকেই ছিটকে বাইরে বেরিয়ে এল৷ ঘরের মেঝেতে আমার রাতের খাওয়া এঁটো বাসন ছিল, গিয়ে দেখি অবিশ্বাস্য ব্যাপার৷ রান্নাঘরের গোটা মেঝেতে মনে হচ্ছে লাল চাদর বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে৷ লক্ষ লক্ষ পিঁপড়ে খেয়ে চলেছে সেই এঁটো৷ জালে-ঘেরা টুকরিতে একটা পাকা পেপে ছিল-স্রেফ এক টুকরো খোলা ছাড়া সবটুকু উদরসাৎ করে ফেলেছে ওই পিঁপড়ে৷
'রান্নাঘর থেকে পিঁপড়ে দূর করতে লেগে গেল ঘণ্টা খানেক৷ একবার মনে হল ছেড়ে দিই বাড়িটা, কিন্তু এত ভালো বাড়ি, এত কম ভাড়া, পিঁপড়ের কাছে হার মেনে ছেড়ে দেব? তার চেয়ে প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে দেখি৷ তাদের এই একই উপদ্রব ভোগ করতে হচ্ছে কি না জানা দরকার৷
'আমার পাশের বাড়িটা অ্যাদ্দিন বন্ধ ছিল৷ ঠিক আগের দিনই তাতে একটা পরিবার এসে উঠেছে৷ গেটের সামনে গিয়ে দেখি একটি ভদ্রলোক গেঞ্জি আর লুঙ্গি পরে একটা কাটারি হাতে দুই পাশে দুই পুত্রকে নিয়ে মহা উৎসাহে আগাছা পরিষ্কার করছে৷ আলাপ করলাম৷ ভদ্রলোকের নাম অবিনাশ ঘোষ৷ বছর চল্লিশ বয়স৷ ব্যাবসাদার৷ বাড়িটা তাঁর নিজের৷ পরিবারসুদ্ধ ইনফ্লুয়েঞ্জায় ভুগছেন, তাই দিন সাতেকের জন্য চেঞ্জে এসেছিল৷
'একটু ইতস্তত করে তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম তাঁর বাড়িতে লাল পিঁপড়ে দেখেছেন কি না৷ ভদ্রলোক অবাক হয়ে বললেন, কেন বলুন তো? বললাম, এখানে লাল পিঁপড়ের বড্ড উৎপাত৷ কিছুতে তাড়াতে পারছি না, তাই ভাবলাম-
'ভদ্রলোক একটু হেসে বললেন, ঘরদোর পরিষ্কার রাখবেন, তাহলে আর পিঁপড়ে আসবে না৷ আর যদি বাড়াবাড়ি দেখেন তো হাঁক দেবেন-ঝাঁটা নিয়ে চলে আসব৷
'ফেরার পথে মেজর চৌধুরীর সঙ্গে দেখা৷ তিনি থাকেন আমার বাড়ির উত্তর দিকের বাংলোটায়৷ কথা-টথা এমনিতে বিশেষ বলেন না৷ তাই আমাকে দেখেই যখন বললেন আমার বাড়িতে আমার খোঁজেই গিয়েছিলেন তখন বেশ আশ্চর্য লাগল৷ বললাম, কী ব্যাপার? একটা অ্যাডভাইস নিতে গেসলাম, বললেন ভদ্রলোক, আপনার কোনো ট্রাবল হচ্ছে কি না জানি না৷ আমার বাড়িতে লাল পিঁপড়ের দৌরাত্ম্যে লাইফ মিজারেবল হয়ে উঠেছে৷ এখানকার লোকেরা ইউজলেস-কেউ কোনো পরামর্শ দিতে পারল না৷ আপনি যদি কোনোরকম পন্থা বাতলাতে পারেন . . .
'তখনই আমার তোমার কথা মনে পড়ল৷ আগেই মনে হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু সত্যি বলতে কী আমার মাথার ঠিক ছিল না৷ তাও ভাবলাম দুটো দিন আরও দেখি-ফিনাইল-গ্যামাকসিন যদি কাজ হয়৷ কিন্তু পরশু রাত্রে ঘরের দরজায় প্রবল ধাক্কার আওয়াজ শুনে দরজা খুলে দেখি অবিনাশবাবু উদভ্রান্ত চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন৷ বললেন তাঁর বাড়িতে একই ব্যাপার শুরু হয়ে গেছে৷ তিনি নাকি দুই ছেলেকে নিয়ে খেতে বসেছিলেন, গিন্নি পরিবেশন করছিল, এমন সময় দেখেন দুটো পিঁপড়ের সারি ঘরের কোণে নর্দমা থেকে বেরিয়ে সোজা তাঁদেরই দিকে এগোচ্ছে৷ ঝাঁট দিয়ে তাড়াতে গিয়ে তারা সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়ে৷ থালা-বাটি উঠিয়ে শোবার ঘরে খাবার চেষ্টা করে কোনো ফল হয়নি-মুহূর্তের মধ্যে পিপীলিকা বাহিনী সেখানে গিয়ে হাজির হয়৷ তক্তপোশে উঠেও রেহাই নেই৷ পায়া বেয়ে উঠতে শুরু করে পিঁপড়ের দল৷ ফলে খাওয়া আর হয়নি কারোর-থালায় যা ছিল তা পিঁপড়ে সাবাড় করেছে৷ কাণ্ডকারখানা দেখে অবিনাশবাবুর স্ত্রী আতঙ্কে শয্যা নিয়েছেন৷'
রাজেনবাবু তাঁর বিবরণ শেষ করার পর দুই বন্ধু কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন৷ নবগোপালবাবুর ভুরু কুঞ্চিত৷ বোঝাই যাচ্ছে তিনি আর বন্ধুর কথা উড়িয়ে দিতে পারছেন না৷ শেষে বললেন, 'এই পিঁপড়ের ক্ষুধা সাধারণ লাল পিঁপড়ের চেয়ে অনেক বেশি বলে মনে হচ্ছে৷ কোনো বিশেষ কারণ না ঘটলে এটা হওয়া উচিত না৷'
'সে কারণটা কী সেটা তো আমাদের পক্ষে জানা অসম্ভব৷ তুমি যদি একবারটি আসতে পারতে তাহলে খুব . . .'
প্রফেসর নবগোপাল ঘোষ আজই সকালে রাজেনবাবুর সঙ্গে এসে তাঁর বাড়িতে উঠেছেন৷ তিনি সঙ্গে এনেছেন একটি ছোটোখাটো গবেষণাগার৷ রাজেনবাবুর অবর্তমানে ভরত মালী খুব ভালো করে ফিনাইল জলে সারা বাড়ি ধুয়েছে৷ তাই এখনও পর্যন্ত পিঁপড়ে বাহিনীর কোনো চিহ্ন দেখা যায়নি৷ কিন্তু তার ফলে যে রাজেনবাবু নিশ্চিন্ত হতে পেরেছেন তা নয়৷ সকালে চায়ের টেবিলে বসে নবগোপালবাবু লক্ষ করছিলেন যে রাজেনবাবু সন্ত্রস্ত দৃষ্টি রাখছেন এদিকে ওদিকে; মেঝেতে রুটি বিস্কুটের টুকরো পড়লেই তাড়াতাড়ি কুড়িয়ে নিচ্ছেন৷ বেলা বাড়ার সঙ্গেসঙ্গে লাল পিঁপড়ে দেখা দিতে আরম্ভ করল৷ দুই বন্ধুতে তখন বারান্দায় বসে গল্প করছিলেন৷ পিঁপড়ের লাইন দেখেই রাজেনবাবুর কথা থেমে গেল৷ বাগানের দিক থেকে এসেছে তারা; এখন বারান্দা দিয়ে সোজা চলেছে খাবার ঘরের দিকে৷
নবগোপালবাবু একমনে লক্ষ করতে লাগলেন পিঁপড়েগুলোকে৷ তারপর তিনি উঠে গিয়ে একটা কাঁচের বোতল নিয়ে এসে একটা কাগজের টুকরো দিয়ে কয়েকটা পিঁপড়ে তুলে বোতলের মধ্যে বন্দি করে ফেললেন৷ রাজেনবাবু অবিশ্যি চাইছিলেন নবগোপালবাবু এখনই তাঁর পিঁপড়ে তাড়াবার ওষুধটি প্রয়োগ করুন৷ কিন্তু প্রফেসর বললেন, 'এখন নয় পরে৷'
নবগোপালবাবুকে একখানা ঘর ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল৷ দুপুর থেকে সন্ধ্যে অবধি নিজের ঘরে বসে তিনি শিশির পিঁপড়েগুলো স্টাডি করলেন৷ রাজেনবাবু একবার উঁকি মেরে দেখলেন নবগোপালবাবু শিশির ভিতর বিস্কুটের টুকরো ফেলছেন৷
রাত্রে প্রফেসর ঘোষণা করলেন, 'বুঝলে রাজেন, তুমি ঠিক বলেছ৷ তোমাদের বাড়িতে লাল পিঁপড়ের খিদে বড্ড বেশি৷ সাইজেও বড়ো৷ এগুলিকে সাধারণ লাল পিঁপড়ের পর্যায়ে ফেলা চলে না৷'
'তার মানে এগুলো কি নতুন জাতের পিঁপড়ে?'
'জাত এক হলেও কোনো একটা কারণে এদের আয়তন আর খিদে দুইই বেড়ে গেছে৷ পিঁপড়ে দুর্ভিক্ষে ভুগে থাকলে তাদের খিদে বাড়তে পারে৷ ভালো খেতে পারেনি অনেকদিন, তাই পুষিয়ে নিচ্ছে৷ অথবা ভবিষ্যতে না খেতে পাওয়ার সম্ভাবনা আছে৷ তাই এখনই শরীরের পুষ্টি বাড়িয়ে নিচ্ছে, গর্তে খাবার মজুত করে রাখছে৷ কীটপতঙ্গ আবহাওয়ার অনেক কিছু সম্ভাবনা আগে থেকে টের পায়৷ আরেকটা আশ্চর্য জিনিস দেখছি যে তোমার ঘরে বা বাইরে কম্পাউন্ডে অন্য পোকামাকড় প্রায় নেই৷ মরা পোকামাকড় লাল পিঁপড়ের একটা প্রধান খাদ্য৷ নিশ্চয় তার অভাবেই এরা মানুষের খাবারে হাত বাড়াচ্ছে৷'
রাজেনবাবু বললেন, 'আমি অনেক পোকামাকড় দেখেছি, নবু, আমার মনে হয় এই লাল পিঁপড়ের ভয়েই সব পালিয়েছে৷'
'দেখা যাক, আরেকটু স্টাডি করে,' মৃদু হেসে বললেন নবগোপালবাবু৷
মোটকথা, প্রথম দিনের অভিজ্ঞতায় নবগোপালবাবু প্রশান্তধামের লাল পিঁপড়েদের আচরণে বিশেষ শঙ্কিত হবার কারণ দেখলেন না৷
টনক নড়ল পরদিন৷
ভোরে বেড়িয়ে ফিরে রাজেনবাবুর সঙ্গে চা খাচ্ছেন নবগোপালবাবু, হঠাৎ একটা গোলমাল শোনা গেল৷ পাখির চিঁচিঁ আর্তনাদ ও ডানা ঝাপটানোর শব্দ৷
দুই বন্ধু বাইরে বেরিয়ে দেখলেন দুটো মুরগির ছানা পাগলের মতো বাগানে ছুটে বেড়াচ্ছে, মাঝে মাঝে মাটিতে গড়াচ্ছে৷ মুখ ঘষছে মাটিতে৷ মা মুরগিটা ঘুরপাক খাচ্ছে বাচ্চা দুটোকে ঘিরে, আর সেই সঙ্গে প্রাণপণে চিৎকার৷
ভরত দৌড়ে এল৷ 'পিঁপড়েয় ধরেছে বাবু৷ বাক্সে ঢুকেছিল৷ সকালে খুব ডাকাডাকি শুনে বাক্স খুলে দিলাম৷ অমনি ছুটল সব ক-টা৷ এই দুটোকেই বেশি ধরেছে৷ ছাড়াতে পারছি না৷ যা কামড়ায়!'
মুরগির বাচ্চা দুটোকে ধরে সবাই মিলে তাদের গা থেকে পিঁপড়ে ছাড়াবার চেষ্টা করতে লাগল৷ পালকের ফাঁকে ফাঁকে ঢুকে গেছে পিঁপড়ে৷ ডেটল জলে ধুইয়ে তাদের গায়ে গ্যামাকসিন ছিটিয়ে দেওয়া হল৷ তা সত্ত্বেও একটা বাচ্চাকে বাঁচানো গেল না৷ ঘণ্টা খানেক পরেই মরে গেল৷ মাত্র দু-সপ্তাহের ছানা, যন্ত্রণা সহ্য করতে পারেনি৷ ভরতের মেয়ে লক্ষ্মী তো কেঁদে-কেটে একশা করল৷
রাজেনবাবুর মাথা ঝিমঝিম করছে; তিনি চেয়ারে এলিয়ে পড়লেন৷ নবগোপালবাবুর মুখ থমথমে৷ ভুরু কুঁচকে বসে রইলেন অনেকক্ষণ৷ তারপর উঠলেন৷
একটা লোহার খুন্তি জোগাড় করে বাড়ির আনাচেকানাচে, বাগানে খোঁড়াখুঁড়ি করতে লাগলেন৷
তিনি যখন রান্নাঘরের দেয়ালের ধারে ধারে উঁচু হয়ে বসে খুঁড়ছেন, তখন রাজেনবাবু তাঁর কাছে গিয়ে প্রশ্ন করলেন, 'কী করছ?'
'পিঁপড়ের বাসা খুঁজছি,' বললেন রাজেনবাবু৷
একটা মোটাসোটা মস্ত লাল পিঁপড়েকে সন্ধ্যায় সাবধানে তুলে শিশিতে ভরে প্রফেসর ঘোষ বললেন, 'এটা হল কুইন পিঁপড়ে৷'
তারপর আরও কয়েকটা ছোটো আকারের লাল পিঁপড়ে শিশিতে পুরলেন৷
'আর রানি নেই?' প্রশ্ন করলেন রাজেনবাবু৷
'না৷ সাধারণত একটিই থাকে একটি বাসায়৷'
'আর অন্যগুলো কি পুরুষ?'
'না৷ এগুলো স্ত্রী, তবে রানি নয়, শ্রমিক৷ কদাচিৎ দু-চারটে শ্রমিক স্ত্রী পিঁপড়ে ছাড়া এরা কেউ ডিম পাড়ে না৷'
'আর ওগুলো কী?'
প্রফেসর ঘোষ চামচে করে পিঁপড়ের বাসার ভিতর থেকে সাদা রঙের বিন্দু বিন্দু বস্তু তুলে শিশিতে রাখছিলেন৷ তিনি উত্তর দিলেন, 'ডিম, লার্ভা আর পিউপা৷ পূর্ণাঙ্গ পিঁপড়ে তৈরি হবার আগের তিনটি স্টেজ৷ এত ডিম দেখো একটা রানির৷ আশ্চর্য!-ওহে রাজেন, আরে দাঁড়াও-নইলে কামড়ে খাবে৷ বাসা ভেঙে দিতে কীরকম খেপে গেছে দেখছ তো?'
সারাদিন যতক্ষণ আলো রইল প্রফেসর ঘোষ ঘুরে ঘুরে নমুনা সংগ্রহ করলেন৷ মেজর চৌধুরীর সঙ্গে গিয়ে আলাপ করলেন৷ অবিনাশ ঘোষ সপরিবারে পালিয়েছেন৷ পিঁপড়ের আতঙ্কে তাঁর স্ত্রী নাকি দু-রাত্তির চোখের পাতা এক করতে পারেননি৷ প্রফেসর ঘোষ তাঁদের বন্ধ বাড়িটাও দেখে এলেন৷ শুধু তাই না-আরও পাশের বেশ খানিকটা জায়গা জুড়ে সব বাড়িতেই গিয়ে পিঁপড়ের সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করে এলেন৷ অনুসন্ধানের পর জানা গেল যে এই তিনটে কাছাকাছি বাড়ি ছাড়া আর কোনো বাড়িতে পিঁপড়ের উপদ্রব নেই৷ পিপীলিকা-বাহিনীর আবির্ভাবের যদি কোনো বিশেষ কারণ থাকে তাহলে সেটা এই তিনটে বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যেই থাকবে৷
পরদিন সকালে রাজেনবাবু ঘুম থেকে উঠে বারান্দায় বেরিয়ে এসে দেখেন প্রফেসর নবগোপাল ঘোষ হাতে একটা ছিপি আঁটা শিশি নিয়ে কম্পাউন্ড দিয়ে হেঁটে তাঁর দিকেই আসছেন৷
'গুড মর্নিং,' বললেন প্রফেসর ঘোষ বন্ধুর দিকে চেয়ে দিব্যি নিশ্চিন্ত হাসি হেসে৷ 'আজ একটু কলকাতায় যাচ্ছি!'
'সেকী?' রাজেনবাবু তাঁর বন্ধুর এই অপ্রত্যাশিত ঘোষণাটির জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিলেন না৷ নবগোপাল বলছে কী? সমস্যার কোনো সুরাহা না করেই সে কলকাতায় চলে যাবে?
'ভেবো না,' আশ্বাস দিয়ে বললেন নবগোপালবাবু৷ 'একটা সূত্র পেয়েছি বলে মনে হচ্ছে৷ গবেষণার দরকার৷ আমার সঙ্গে যা সরঞ্জাম আছে তা দিয়ে হবে না৷ আমি দিন তিনেকের মধ্যেই ফিরে আসব৷'
'কিন্তু এই তিনদিনে যে হুলুস্থুল হয়ে যেতে পারে নবগোপাল!'
'উপায় নেই৷ একটা ওষুধ দিয়ে যাচ্ছি তোমায়৷ এটা ফিনাইলের চেয়েও বেশি কার্যকরী৷ প্রতিদিন দু-বার করে ঘর ধোবে এই ওষুধ দিয়ে৷ আর কতকগুলো নির্দেশ তোমাকে মানতে হবে৷ যারা চিঁড়ে, মুড়ি, গুড় ইত্যাদি বিক্রি করতে আসে তাদের কাউকে এ-কদিন বাড়িতে ঢুকতে দেবে না৷ দরকার হলে বাজার থেকে কিনে আনবে৷ এ বাড়ির কোনো জিনিস বাইরে নিয়ে গেলে খেয়াল রাখবে তাতে একটাও লাল পিঁপড়ে যেন না থাকে৷ এই পিঁপড়ের ব্যাপার নিয়ে স্থানীয় কারোর সঙ্গে কোনো আলোচনা করবে না৷ মেজর চৌধুরী আর মালীকেও বলে দিয়েছি৷'
বন্ধুর এই সিদ্ধান্তে রাজেনবাবুর হাত-পা ঠান্ডা হয়ে এল৷ ধরা গলায় জিজ্ঞেস করলেন, 'পিঁপড়ের উৎপাত কমবে?'
'সেই উদ্দেশ্যেই কলকাতা যাওয়া,' বললেন প্রফেসর ঘোষ৷ 'এই তিনটে দিন একটু কষ্ট করতে হবে ভাই৷ তবে আখেরে তাতে লাভ হবে এটা আমার বিশ্বাস৷ চেষ্টা করে আমার উপর ভরসা রাখো৷'
সন্ধ্যার ট্রেনে প্রফেসর নবগোপাল ঘোষ তাঁর শিশি বোতল গবেষণার সরঞ্জাম ইত্যাদি নিয়ে বন্ধুকে মনের জোর রাখার জন্য আরেকবার বলে দিয়ে কলকাতা রওনা দিলেন৷
প্রশান্তধামের পরের তিন দিনের অভিজ্ঞতা রাজেনবাবুর জীবনে যেন একটা ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন৷
দ্বিতীয় দিনে ভরত মালী তাঁকে এসে বলল, সে চলে যাচ্ছে বউদের নিয়ে অন্য জায়গায় থাকতে৷ মাইল খানেক দূরে এক কুঁড়েতে থাকার বন্দোবস্ত করেছে সে৷ কারণ জিজ্ঞেস করে রাজেনবাবু জানলেন যে ভরতরা যে ঘরে থাকে তার পাশের রান্নাঘর লাল পিঁপড়েতে ছেয়ে গেছে৷ ভাঁড়ারে কোনো তৈরি খাবার নেই, কোনো রসালো ফলমূল নেই৷ আছে কেবল চাল ডাল আটা মশলা তেল ইত্যাদি রান্নার উপকরণ৷ সেগুলো থাকে কৌটো, মাটির হাঁড়ি, শিশি, থলি ইত্যাদিতে৷ এই সব কিছুর গায়ে থিকথিক করছে পিঁপড়ে৷ বোধ হয় রাজেনবাবুর ওষুধের গন্ধে টিঁকতে না পেরে সব লাল পিঁপড়ে এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছে৷ পিঁপড়েতে শুকনো আটা, চালের গুঁড়ো আর তেল খেয়ে সাফ করছে এ দৃশ্য অভিনব৷ কয়েকটা আলু পেঁয়াজ ও কুমড়ো ছিল, তার মধ্যে আলু আর কুমড়োটা খেয়ে শেষ করেছে, কেবল পেঁয়াজটা ছোঁয়নি৷
ভরত যাবার সময় বলে গেল যে দু-বেলা এসে সে বাবুর কাজ করে দিয়ে যাবে৷ 'কলকাতার বাবু এসে তো কিছুই করতে পারলেন না, গরিবের কথা শুনুন-পুজো-টুজো দিন, নইলে এই রাক্ষুসে পিঁপড়েরা যাবে না৷'
মেজর চৌধুরীর বাড়িতে গিয়ে রাজেনবাবু জানলেন যে তাঁর রাঁধুনি পালিয়েছে৷ ভাঁড়ার ঘরে ঢোকা যাচ্ছে না৷ তিনি সকালে পাঁউরুটি খাচ্ছেন, সঙ্গে টিনের খাবার৷ সকালে বেড়িয়ে ফেরার সময় রুটি কিনে আনেন৷ মাখন রাখেন কৌটোর জলে ডুবিয়ে৷ ছাতে বসে আহার করেন, প্রতিদিন চারবার করে ঘর ধোন৷ প্রফেসর ঘোষ তাঁকে খানিকটা ওষুধ দিয়ে গেছেন৷
সেই রাত্রে রাজেনবাবু মাইল খানেক দূরে একটা হোটেলে গিয়ে ভাত খেয়ে এলেন৷ হোটেলওয়ালা বিস্ময় প্রকাশ করতে বললেন রাঁধুনি ছুটি নিয়েছে তাই এই ব্যবস্থা৷
রাত্তিরে ঘুম হল না৷ বার বার খালি টর্চ জ্বেলে দেখেন ঘরে পিঁপড়ে এসেছে কি না৷ আর যদি বা তন্দ্রা আসে, অমনি শুরু হয়ে যায় পিপীলিকাবাহিনীর আক্রমণের বিভীষিকাময় দুঃস্বপ্ন৷ চতুর্থ দিন সকালে তাঁর কথামতো প্রফেসর নবগোপাল ঘোষ ফিরে এলেন কলকাতা থেকে৷ তাঁর বাইরের হাবভাবে কিছুই বোঝার উপায় নেই৷ এই সাংঘাতিক সমস্যার কোনো সমাধান করতে পেরেছেন কি না সেটা অন্তত রাজেনবাবুর পক্ষে বোঝা অসম্ভব৷
মালীর নতুন ঘরে বসে চা খেতে খেতে রাজেনবাবু প্রসঙ্গটা তুললেন৷ তবে সরাসরি নয়৷ বন্ধুর দিকে ফিরে সামান্য হেসে প্রথম যে প্রশ্নটা করলেন সেটা রাজেনবাবুর কাছে অবান্তর বলেই মনে হল৷ 'বলো তো রাজেন, পৃথিবীর প্রভু কোন প্রাণী৷'
রাজেনবাবু একটু অবাক হয়ে বললেন, 'কেন মানুষ৷'
'কীসের জোরে?'
'বুদ্ধি৷ বিদ্যে৷'
'কিন্তু সংখ্যায় কারা বেশি বলো তো৷ মানে, ভূমণ্ডলের স্থলবিভাগে?'
রাজেনবাবু উত্তর জানেন না৷
'কীটপতঙ্গ,' বললেন নবগোপাল ঘোষ, 'আর এদের কারও কারও স্বভাব বেশ হিংস্র৷ সর্বভুক-অর্থাৎ আমিষ-নিরামিষ দুইই চলে৷ এবং সংখ্যায় অগুণতি-যেমন, তোমার লাল পিঁপড়ে৷'
রাজেনবাবুর শিরদাঁড়া দিয়ে একটা শিহরণ খেলে গেল৷
'মনে করো হঠাৎ যদি লাল পিঁপড়ের বংশবৃদ্ধির হার অনেকগুণ বেড়ে যায়, যদি তাদের খিদেও বেড়ে যায় প্রচণ্ডরকম-তার পরিণতি কী ভাবতে পার?'
রাজেনবাবু ভাবতে চাইলেন না৷
'তখন তাদের স্বাভাবিক খাবারে আর কুলোবে না,' বলে চললেন প্রফেসর ঘোষ৷ 'তখন তারা সমস্ত পশুপাখি, এমনকী মানুষের খাবারেও ভাগ বসাবে৷ মানুষের খাবার থাকে তাদের নাগালের কাছে-সুতরাং সেটার দিকেই তাদের চোখ পড়বে আগে৷ অথচ মুশকিলটা কোথায় দেখো-অত্যাচারী জানোয়ারের মতো তাদের বন্দুক দিয়ে মারা যায় না৷ বিষ দিয়ে মারাও বিপদ আছে, কারণ সে বিষ মানুষের পক্ষেও অনিষ্টকর হতে পারে৷ ব্যাপারটা বুঝেছ?'
'বুঝেছি,' বললেন রাজেনবাবু৷ 'কিন্তু একটা জিনিস বুঝছি না হঠাৎ এ পরিবর্তনটা হবে কেন?'
'হঠাৎই হয়,' বললেন নবগোপালবাবু৷ 'প্রাণীর বিবর্তনের ইতিহাস বড়ো অদ্ভুত৷ হাজার হাজার বছর ধরে ঠিক এই ভাবে চলে এসে হঠাৎ কোনো অ্যাকসিডেন্টের ফলে তাদের দেহযন্ত্রে আশ্চর্য পরিবর্তন দেখা দেয়৷ জীবজগতে তখন নতুন ধারার সূচনা দেখা দেয়৷'
'অর্থাৎ তুমি বলতে চাও আমার বাড়ির লাল পিঁপড়ের মধ্যে এমনি কোনো পরিবর্তন দেখা দিয়েছে?'
'রাইট৷'
'কিন্তু তাহলে-?'
নবগোপাল ঘোষ চায়ের কাপ রেখে উঠে পড়লেন৷ তারপর ভরত মালীকে ডেকে প্রশ্ন করলেন, 'এখানে মাটির থালা পাওয়া যায়?'
'আজ্ঞে বাজারে পাওয়া যায়৷'
'দু-ডজন নিয়ে এসো৷ আর তিনসের টাটকা দুধ৷ এই নাও পয়সা৷'
প্রফেসর ঘোষ তাঁর ব্যাগ থেকে তিনটে সিরাপের শিশি বার করলেন৷ রাজেনবাবু তাঁর বন্ধুকে নিয়ে বাড়িতে ফিরে চলেছেন৷ ভরতও প্লেট আর দুধ এনে দিয়েছে বাজার থেকে৷ দুধের বালতিতে কিঞ্চিৎ জল মিশিয়ে চার-পাঁচটা মাটির প্লেটে আধাআধি মতন ঢাললেন৷ তারপর একটা শিশির ঢাকনা খুললেন৷ তীব্র মিষ্টি গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল বাতাসে৷ শিশি ভরতি ঘন তরল পদার্থের রং ঈষৎ হলুদ৷
'কী এটা?' জিজ্ঞেস করলেন রাজেনবাবু৷
'লাল পিঁপড়ের খুব প্রিয় খাদ্য,' বললেন নবগোপালবাবু৷
প্রতি পে×টের দুধের সঙ্গে বড়ো এক চামচ হলদে পদার্থ ঢেলে দিয়ে বেশ করে গুলে দিলেন তিনি৷ তারপর প্রত্যেক ঘর ও বারান্দার মেঝেয় একটি করে প্লেট রেখে বললেন, 'আধ ঘণ্টা থাক তারপর দেখবে৷'
'তা তো দেখব,' বললেন রাজেনবাবু, 'কিন্তু আমাদের পিঁপড়ের এরকম দশা কেন হল সেটার কিছু বুঝলে?'
'তাও বুঝেছি৷ এসো আমার সঙ্গে৷'
বন্ধুর মতিগতি কিছুই বুঝতে পারলেন না রাজেনবাবু, কিন্তু তাঁর আজ্ঞা পালন করতেই হবে৷ কারণ তাঁর উপরেই ভরসা৷
রাজেনবাবুকে নিয়ে গেট দিয়ে বেরিয়ে কম্পাউন্ডের দেয়াল ঘেঁষে নবগোপাল ঘোষ সোজা চলে গেলেন রান্নাঘরের পিছন দিকটায়৷ সেখানে একটা আমড়া গাছের নীচে একটা ভাঙা শুকনো চৌবাচ্চা৷ এটা এর আগে রাজেনবাবু কোনোদিন দেখেননি৷ কারণ এদিকে আসেননি৷ চৌবাচ্চার পাশে দাঁড়িয়ে নীচের দিকে চাইতেই রাজেনবাবু শিউরে উঠলেন৷
অজস্র লাল পিঁপড়ে ঘোরাফেরা করছে ওই শুকনো চৌবাচ্চার সিমেন্টের মেঝেতে গাছের পাতা আর খড়কুটোর মধ্যে৷
রাজেনবাবু আরও দেখলেন যে মেঝের উপর একরকম কালচে পদার্থ জমে আছে৷ আসলে কালো নয়, খুব গাঢ় লাল রঙের পাতলা আস্তরণ৷ এই পদার্থটাকে ঘিরেই পিঁপড়েগুলো ঘোরাফেরা করছে৷ প্রফেসর ঘোষ বললেন, 'এখানে লাল পিঁপড়ের বাসা খুঁড়ে আমি ঠিক ওইরকম কালচে গুঁড়ো পাই৷ আর তারপর এই চৌবাচ্চাটা আবিষ্কার করি৷ এর খানিকটা নমুনা আমি এবার কলকাতায় নিয়ে গিয়ে পরীক্ষা করি৷ ওই পদার্থটি খেয়েই এখানকার পিঁপড়ের খিদে অত বেড়ে গেছে তা তো কোনো সন্দেহ নেই৷ এতে খিদে মেটায় না, শুধু বাড়িয়ে তোলে৷ এবং সেই সঙ্গে হজমশক্তি৷ আবার এটাও দেখেছি যে এটা বারবার খেতে খেতে পিঁপড়েদের হজম শক্তিতে একটা স্থায়ী পরিবর্তন আসে৷ এই উত্তেজক পদার্থের সাহায্য ছাড়াই তখন তারা অনেক বেশি পরিমাণ খেতে থাকে৷ মনে হয় লার্ভাগুলোকে এই জিনিসই খাইয়েছিল শ্রমিক পিঁপড়ে৷ কারণ এখনকার সদ্যোজাত পিঁপড়েদের পরীক্ষা করে দেখেছি তারা ওই বয়সের অন্য জায়গাকার লাল পিঁপড়ের তুলনায় অন্তত আড়াই-তিন গুণ বেশি খাওয়ার ফলেই এখানকার লাল পিঁপড়ের আকারও বাড়তে শুরু করেছে৷ আর সেইসঙ্গে আরও একটা পরিবর্তন এসেছে-রানির ডিম পাড়ার পরিমাণ অস্বাভাবিক রকম বেড়ে গেছে৷'
রাজেনবাবু হতবাক হয়ে শুনছিলেন৷ প্রফেসর ঘোষ থামতে তিনি বললেন, 'কিন্তু ওই পদার্থটা কী?'
নবগোপালবাবু মৃদু হেসে বললেন, 'আমার নিজের একটা ধারণা আছে৷ সেটা ঠিক কি না সেটা বোধ হয় ভরতকে জিজ্ঞেস করলে বোঝা যাবে৷'
ভরতকে ডাকা হল৷ তাকে জিজ্ঞেস করতে সে বলল, 'ও জিনিস তো আমিই ফেলেছিলাম ওখানে, বাবু৷'
'সেকী!' রাজেনবাবুর চোখ কপালে উঠে গেল৷
'সেই কবরেজমশাই-যিনি এ বাড়িতে থাকতেন, আপনি আসার আগে তিনি কাশী যাবার সময় কিছু শিশি বোতল কাগজের ঠোঙা-এইসব ফেলে গেছিলেন৷ তাকের উপরে পড়ে ছিল৷ আমি ঘর সাফ করব বলে শিশি বোতল খালি করে সব কিছু এই চৌবাচ্চার মধ্যে ফেলে দিই৷ সেই সব একসঙ্গে মিশে অমনধারা চেহারা হয়েছে৷'
'বুঝলে তো!' বললেন নবগোপাল ঘোষ৷ ওইসব রাসায়নিক বস্তু আর নানান ফলমূলের নির্যাস মিশে তৈরি হয়েছে পিঁপড়ের আশ্চর্য টনিক৷ কবিরাজ মশাই কি আর জেনেশুনে ও জিনিস তৈরি করতে পারতেন? মনে তো হয় না৷'
ভরতের চোখ ছানাবড়া৷ সে ভাবতে পারেনি এই রাক্ষুসে পিঁপড়ের অত্যাচারের জন্য একরকম সেই দায়ী৷
'চলো এবার আরেকটা জিনিস দেখাই,' বাড়ির দিকে রওনা দিয়ে বললেন নবগোপাল ঘোষ৷ 'এটা আমার লেটেস্ট আবিষ্কার৷'
বাড়ি ফিরে এসে রাজেনবাবু দেখলেন আশ্চর্য ব্যাপার ঘটতে শুরু করেছে-দেয়াল আর মেঝের ফাটল থেকে বেরিয়ে আসছে লাল পিঁপড়ের দল, তাদের লক্ষ্য সেই দুধের প্লেট৷
দেখতে দেখতে লাল পিঁপড়েরা দুধের প্লেটে ঝাঁপিয়ে পড়ল, আর দেখতে দেখতে দুধের উপর লাল পিঁপড়ের সর পড়ে গেল৷ নবগোপালবাবু একটা ছাঁকনি দিয়ে পিঁপড়ের স্তর ছেঁকে ফেলে দিলেন মাটিতে, অমনি নতুন পিঁপড়ের ঝাঁক গিয়ে হুমড়ি দিয়ে পড়ল প্লেটের উপর৷ রাজেনবাবু অবাক হয়ে দেখলেন ফেলে দেওয়া পিঁপড়েগুলো সব নেতিয়ে পড়ছে৷
'ওরা মরবে,' বললেন নবগোপাল ঘোষ, 'কারণ সলিউশনে মারাত্মক বিষ মেশানো আছে৷ পিঁপড়ের যম৷'
এই পিপীলিকা-মারণ যজ্ঞ চলল দু-দিন ধরে তিন বাড়িতে৷ চারদিনের দিন নবগোপাল ঘোষ কলকাতা ফিরে যাবার জন্য তৈরি হয়ে রাজেনবাবুকে বললেন, 'আরও এক বোতল সলিউশন রয়েছে-রেখে গেলাম, তুমি আর চৌধুরী ভাগ করে পনেরো দিন পরে পরে একবার করে এই অস্ত্র প্রয়োগ করবে, তাহলে আর পিপীলিকার পুনরুভ্যুত্থানের কোনো সম্ভাবনা থাকবে না৷'
'কিন্তু তুমি ওগুলো কী নিয়ে যাচ্ছ সঙ্গে?' অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন রাজেনবাবু৷ প্রফেসর ঘোষের ব্যাগে দুটো কাঁচের শিশি দেখা যাচ্ছে-তার মধ্যে লাল পিঁপড়ে৷
নবগোপালবাবু মুখ তুললেন৷
'দেখো রাজেন, মানবজাতির স্বার্থে জীবজগতের এক আশ্চর্য বিবর্তন থামিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছি৷ কিন্তু আমার বৈজ্ঞানিক মন যে অতৃপ্ত রয়ে গেল৷ তাই এই রাক্ষুসে পিঁপড়েগুলোকে সঙ্গে নিচ্ছি৷ দেখব আরও ওদের কী কী পরিবর্তন হয় এবং কতখানি৷ ভয় নেই, রাজেন, এই পিঁপড়েরা আর কখনো স্বাধীনভাবে বাঁচবার সুযোগ পাবে না৷ ওরা চিরটাকাল ল্যাবরেটরিতে বন্দি থেকে আমার বৈজ্ঞানিক কৌতূহল মেটাবে৷'
শারদীয়া ১৩৮৫
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন