অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়
এক ছিলেন রাজা-মস্ত বড়ো রাজা! যেমন ছিল লম্বা-চওড়া তাঁর দেহ, তেমনি ছিল লম্বা-চওড়া তাঁর রাজ্য, আর তেমনি প্রচণ্ড ছিল তাঁর রাগ৷
তাঁর ছিল একটি পরমাসুন্দরী মেয়ে আর ছিল চমৎকার মিনা করা সোনার তারের বাটি৷ বাটিটা লক্ষ্মীঠাকরুনের পায়ের তলার দলমেলা পদ্মফুলের মতো দেখতে৷ রাজা সেটাকে একটা পুরু মখমলের গদির উপর বসিয়ে রাজসভার যে প্রকাণ্ড ঘর তার মাঝখানে রেখে দিয়েছিলেন৷ যে আসত সেই সে বাটিটা দেখে মুগ্ধ হয়ে যেত৷
একদিন অনেক দূরের এক দেশের রাজার কাছে থেকে এই রাগী রাজার কাছে এক দূত এল৷ দূত বাটিটা দেখে মুগ্ধ তো হলই না, বরং উলটিয়ে বলল, 'ওমা! সবেমাত্র একটা বাটি! তাও আবার এমনি করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে! আরে ছিঃ! আমাদের রাজার তো ওইরকম দুটো বাটি আছে৷ দুটো পাশাপাশি না রাখলে কি মানায়৷'
রাজামশাই তো শুনে ভয়ানক চটে গেলেন৷ তিনি চিৎকার করে বলে উঠলেন, 'কী! এত বড়ো আস্পর্ধা! দুটো বাটি? তা কিছুতেই হতে পারে না৷ দূত, তুমি মিথ্যে কথা বলছ!'
দূত হাত জোড় করে বলল, 'আজ্ঞে না; আমি সত্যি কথাই বলছি; আমাদের রাজামশায়ের এরকম দুটো বাটি আছে৷'
রাজা কিন্তু তবুও জেদ ধরে বললেন, 'তবে সে বাটি কখনো এ বাটির মতো দেখতে নয়৷'
দূত বলল, 'আজ্ঞে হাঁ, ঠিক এই বাটির মতোই দেখতে৷' তখন রাজা ভয়ংকর রেগে মন্ত্রীকে বললেন, 'মন্ত্রী, এক্ষুনি এই লোকটার রাজার বাড়ি লোক পাঠিয়ে খবর নাও যে সত্যি সত্যি সেখানে এরকম দুটো বাটি আছে কি না৷'
লোকেরা গিয়ে ফিরে এসে বলল, 'হাঁ, মহারাজ এরকম দুটো বাটিই আছে৷'
তখন রাজামশাই বললেন, 'যেমন করে হোক আমাকে আরেকটা বাটি এনে দিতেই হবে৷ যে আমাকে এরকম বাটি আরেকটা দিতে পারবে, তাকে আমি রাজকন্যার সঙ্গে অর্ধেক রাজত্ব দেব৷'
কেউ কিন্তু আরেকটা বাটি এনে দিতে পারল না৷ স্যাকরারা ওরকম বাটি আর গড়তেও পারল না৷ রাজা খুব চটতেই লাগলেন, কিন্তু কিছু ফল হল না৷
শেষে একদিন এক রাজপুত্র রাজার কাছে এসে বললেন, 'মশাই, আমি যদি আপনাকে দেখাতে পারি যে আপনার দুটো বাটি আছে, তাহলে আপনার মেয়েকে আমায় দেবেন তো?'
রাজা বললেন, 'হাঁ, নিশ্চয়ই৷'
রাজপুত্র তখন বললেন, 'তাহলে আপনার লোকজন ডাকুন, আমি সকলের সামনে প্রমাণ করে দিচ্ছি যে একটা বাটি থাকলেই দুটো বাটি থাকা হল৷'
রাজা রাজ্যের সমস্ত বড়ো বড়ো লোকদের ডেকে পাঠালেন৷ যত আমির, ওমরাহ, উজির, নাজির এসে উপস্থিত হল৷ রাজপুত্র বললেন, 'একটা বোর্ড চাই, আমি অঙ্ক কষে প্রমাণ করে দেব৷'
অমনি 'হাঁই' 'হুঁই' করতে করতে চারজন লোক প্রকাণ্ড এক বোর্ড নিয়ে উপস্থিত৷
রাজপুত্র খড়ি দিয়ে লিখলেন 'ক = গ'৷ তারপর বললেন, 'মনে করুন 'ক' 'গ'-এর সমান৷ অঙ্কশাস্ত্রে তো এরকম লেখে?'
রাজামশাই আর সভাপণ্ডিতেরা ঘাড় নেড়ে বললেন, 'হুঁ'৷ রাজপুত্র অঙ্ক কষতে লাগলেন আর বলতে লাগলেন, 'যদি ক, গ-এর সমান হয়, তাহলে কগ নিশ্চয়ই গগ (গ২)-এর সমান হবে৷'
'কগ = গগ'
লোকেরা বলল, 'হুঁ'৷
রাজপুত্র বললেন, 'এখন কগ আর গগ দুই থেকে কক বাদ দেওয়া যাক৷ তাহলে হল
কগ – কক = গগ – কক' অর্থাৎ 'গ২ – ক২
কেমন হল তো?'
পণ্ডিতেরা বললেন, 'হাঁ, হয় বই কী৷' আর সবাই অবাক হয়ে চেয়ে রইল৷
রাজপুত্র বললেন, 'তারই মানে হল
ক (গ – ক) = (গ + ক) (গ – ক)
তাই তো?'
সকলে হাঁ করে বসে রইল, শুধু পণ্ডিতেরা বলল, 'হাঁ'৷
রাজপুত্র বললেন, 'তারই মানে-
ক = গ + ক
'কেমন নয় কি? আবার তার থেকেই হল,
ক = ক + ক
'অর্থাৎ কিনা
১ক = ২ক
'অর্থাৎ কিনা এক হল দুই এর সমান৷ এই দেখুন আমার অঙ্ক-
\ ক = গ
\ কগ = গগ
\ কগ – কক = গগ – কক
\ ক (গ – ক) = (গ + ক) (গ – ক)
\ ক = গ + ক = ক + ক
অর্থাৎ, ক = ২ক
অর্থাৎ, ১ = ২'
পণ্ডিতেরা খুব খুশি হয়ে বলে উঠলেন, 'হাঁ হাঁ, তা তো ঠিকই, তা তো ঠিকই৷ আরে এ তো জলের মতো সোজা৷'
সভাসুদ্ধ লোকেরাও চেঁচিয়ে বলে উঠল, 'হাঁ, এ তো জলের মতোই সোজা৷'
রাজামশাই তো মহা আনন্দে ঘাড় নাড়তে লাগলেন৷ রাজপুত্র তখন বললেন, 'তাহলে একটা বাটি থাকাও যা দুটো বাটি থাকাও তো তাই৷'
সক্কলে বললেন, 'হাঁ, তাই৷'
তখন রাজপুত্র, রাগী রাজার অর্ধেক রাজ্য আর রাজকন্যা পুরস্কার চাইলেন-আর পেলেনও৷*
ভাদ্র ১৩২৩
* সন্দেশের পাঠক-পাঠিকাগণের মধ্যে যাঁহারা বীজগণিত (Algebra) পড়েছেন, তাঁদের কাছে রাজপুত্রের অঙ্কটা বোঝা শক্ত হবে না৷ ইংরেজিতে লিখতে গেলে অঙ্কটা লিখতে হবে-
a = b; \ ab = b2; \ ab – a2 = b2 – a2; or, a(b – a) = (b + a) (b – a)
\ a = b + a = 2a.
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন