অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়
শোঁ শোঁ করে এল পশ্চিমের কালো মেঘের দেশ থেকে ভীষণ ঝড়৷ গাছপালাদের ঘাড় ধরে ধরে সে তাদের মাথা নুইয়ে দিতে লাগল মাটির ওপর৷ নারকেল গাছ বুঝি বেঁকে বেঁকে ভেঙেই পড়ে৷
নিশু ভারি বিপদে পড়ল! এমন দিনে কাউকে না জানিয়ে সে ছোটো বোন হাসিকে নিয়ে চিড়িয়াখানা দেখতে এসেছে৷ বাড়ি থেকে বেরিয়ে যখন সে বাসে চড়ল তখন তো আকাশ-ভরা আলো আর শরতের দুপুর বেলার দিব্যি ফুরফুরে হাওয়া৷ ওঃ সে কী মজা! অন্যদিন সে বাবার হাত ধরে বাসে ওঠে, যেন সে কতই ভীতু! একলা রাস্তা পার হয়ে বাসে ওঠবার ক্ষমতাটুকু যেন তার নেই! আজ বাবার মতো সে হাসিকে হাত ধরে বাসে তুলেছে! হাসির কী ভয়! ওর যত দাপাদাপি তো সেই চিলের ছাতের কোণটাতে, যেখানে আছে তার নীল পুতুল আর লাল পুতুল৷ রাস্তায় বেরিয়ে বেচারা যেন ভয়ে একেবারে পাঁপড়-ভাজা হয়ে গিয়েছে! বাসের এক কোণে দাদার গা ঘেঁষে বসে হাসি বলল, 'উঃ , দাদা তোমার কী সাহস!' গর্বে মাথা তুলে নিশু হাসির মুখপানে চেয়ে রইল-ভয়ে তখনও হাসির ঠোঁট দুটো কাঁপছে!
'হ্যাঁ খোকাখুকি, তোমরা যাবে কোথা?'
নিশু মুখ ফিরিয়ে দেখে, বাসের ভিতর আর কেউ নেই; তারা যেদিকে বসেছে তার অপর দিকের কোণে বসে আছে, এক দাড়িওয়ালা বুড়ো৷ ফুরফুরে সাদা দাড়ি নুইয়ে পড়ছে তার বুকের নীচে৷ বুড়ো ফোঁকলা দাঁতে হেসে বলল, 'বুঝেছি বুঝেছি, তোরা চিড়িয়াখানা দেখতে যাবি! আজ কিন্তু ভারি খারাপ দিন৷ তোরা যদি কোনো বিপদে পড়িস তাহলে আমার নাম ধরে ডাকিস; আমি তোদের বাঁচাব সব বিপদ থেকে৷ আমার নাম পিন্টুবুড়ো৷-
'পিন্টুবুড়ো পিন্টুবুড়ো
ঘণ্টারামের মেজো খুড়ো
'এই নামেতে ডাকলেই আমি তখুনি তোমাদের সামনে এসে হাজির হব৷' বলেই দাড়ি দোলাতে দোলাতে পিন্টুবুড়ো তড়াক করে এক লাফ দিয়ে বাস থেকে নেমে গেল৷ হাসির মুখের দিকে চেয়ে নিশু দেখে সে ভয়ে থরথর করে কাঁপছে! ওর হাতখানা নিজের মুঠোর ভেতর নিয়ে নিশু বলল, 'ভয় কীরে হাসি? আমি থাকতে বিপদ এসে কী করবে!'
চিড়িয়াখানার দরজায় এসে ওরা দেখল সেখানে মানুষের চিহ্নও নেই! কেউ বাইরে থেকে ভিতরে যাচ্ছে না, ভিতর থেকেও কেউ বাইরে আসছে না৷ দরজা খোলা, কেউ সেখানে নেই! হাসির হাত ধরে নিশু সোজা বড়ো ফটক পার হয়ে চিড়িয়াখানার ভেতরে চলে গেল৷ কেউ তাদের বারণ করল না৷ বাবার সঙ্গে নিশু আরও অনেকবার এখানে এসেছে, কিন্তু তখন দেখেছে কত ছেলে-মেয়ে কত লোকজন চারিদিকে ঘুরছে! আজ কেউ কোথাও নেই! আকাশ থেকে দুপুর বেলায় রোদ ঠিকরে পড়ছে, ঝলমল করছে গাছপালায়; চিড়িয়াখানার চারিদিক খাঁ-খাঁ করছে৷ মাঝে মাঝে শুধু শোনা যাচ্ছে সিংহের গর্জন আর বানরের উকু উকু শব্দ৷
নিশুর বুকটাও কেমন ভয়ে গুরগুর করে উঠল৷ তার মনে হতে লাগল কেবলই পিন্টুবুড়োর কথা৷ ওই অপয়া বুড়োটার সঙ্গে কেন তাদের দেখা হল৷ ওটা নিশ্চয়ই একটা শয়তান, না জানি কী বিপদই আজ ঘটবে!
যেখানে কুমির থাকে সেখানে নিশু উঁকি দিয়ে দেখল, চারদিক উঁচু রেলিং দিয়ে ঘেরা; তার মাঝে নিশু অবাক হয়ে দেখল, দিব্যি টেবিল চেয়ার পাতা রয়েছে আর কুমির মামা সপরিবারে তার ওপর বসে দিব্যি নূতন গুড়ের পায়েস খাচ্ছে৷ নিশুর মনে পড়ল সেদিন তার মা এইরকম সুন্দর পায়েস রেঁধেছিলেন৷ কী ভালোই তার লেগেছিল সে পায়েস, তিন-চার বার সে চেয়ে নিয়ে খেয়েছিল৷ হঠাৎ কুমিরের চোখ পড়ল পায়েসের বাটি থেকে ওপরের দিকে৷ সে একটা বিকট গর্জন করে উঠল! কুমিরকে এরকম করে ডাকতে নিশু কখনো শোনেনি! হাসির হাত ধরে সে দৌড় দিল৷ হাসি ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে বলল, 'চলো দাদা বাড়ি ফিরে যাই!' নিশু জোর করে হেসে বলল, 'দূর, একটুও সাহস নেই তোর!'
পেছনেই বাঁদরের খাঁচা৷ হাসি সেদিকে চেয়ে বলে উঠল, 'দাদা দাদা, ওই দেখো৷' খাঁচার ভেতরে মাচার ওপর বসে একদল দাড়িওয়ালা হনুমান একটা হাঁড়ি থেকে কী বার করছে আর খাচ্ছে! হাসি বলল, 'দাদা, ওই যে আমাদের কাসুন্দির হাঁড়ি৷ মা বললেন সেদিন ভাঁড়ার থেকে কে চুরি করে নিয়ে গেছে! সেই যে একটা কালো বেঁটে হনুমান মিনুদের ছাদের ওপর এসে রোজ বসত, আর তার দিকে তাকালেই মুখ ভেঙাত, এ তারই কাজ৷ সেই নিশ্চয় হাঁড়িটা চুরি করে নিয়ে এসেছে৷'
নিশু খাঁচার কাছে এসে দেখল সত্যিই তো! ওই তো তাদের ভাঁড়ার থেকে চুরি-যাওয়া কাসুন্দির হাঁড়ি৷ যশোর থেকে তার দিদিমা পাঠিয়েছিলেন সেবার রথের সময়! কিন্তু বেঁটে হনুমানটা সেটা চুরি করল কী করে আর এখানে আনলই বা কেন? কী মজা করেই না ওরা কাসুন্দি খাচ্ছে! টক খেয়ে ওদের চোখ বুজে আসছে! দেয়ালের ওপর টাঙানো রয়েছে একখানা আরশি, তাইতে ওরা মাঝে মাঝে গিয়ে মুখ দেখে আসছে, আর দাঁতভাঙা একখানি চিরুনি দিয়ে আঁচড়াচ্ছে দাড়ি আর মাথার চুল৷
হুম-হুম-হুম!
শব্দ শুনে ওরা দু-জনে চমকে উঠল৷ মস্ত একটা পাখির মতো জানোয়ার এসে নামল আকাশ থেকে মাটির উপর, যেখানে মাদি হাতিটা তার দুটো বাচ্চার সঙ্গে বাঁধা থাকে বাদামতলায়৷ নিশু জানত হাতির চারটে পা, কিন্তু এখন যেন মনে হল চারটি পায়ের মাঝে তার আরও দুটো পা বেরিয়েছে, আর পাগুলো যেন হয়ে গেছে আগের চেয়ে আরও বেঁটে, আর শরীরটা হয়ে গেছে লম্বা-এত বড়ো হাতির শুঁড় সে দেখেনি আগে! শুঁড় দিয়ে তারা দিব্যি আগডাল থেকে বাদাম পেড়ে খাচ্ছে!
কী অবাক কাণ্ড! যেটা নামল আকাশ থেকে, ওটা যে নিশুদের বাড়ির পাশে মিনুদের ছাতের ওপর যে বেঁটে হনুমানটা এসে বসে থাকে, সেইটারই মতো৷ কিন্তু এ আবার কী হল? হনুমানের মুণ্ডুটা কেটে তার জায়গায় কে কাকাতুয়ার মাথা বসিয়ে দিয়েছে! নিশুদের বারান্দায় দাওয়ার ওপর মস্ত কাকাতুয়াটা বসে থাকত; এটা যে তারই মাথা৷ নিশুর মামা সেটাকে সিঙ্গাপুরের রবারের বাগান থেকে ধরে এনেছিলেন৷ নিশু আর হাসিকে দেখলেই কাকাতুয়াটা বিকট সুরে ডাকতে আরম্ভ করত৷ একদিন পায়ের শিকল কেটে কাকাতুয়াটা উড়ে পালিয়ে যায়! তার সেই বাঁকানো ঠোঁটওয়ালা মস্ত মুখখানা আজও নিশুর মনে আছে৷
তারপর হনুমানটার আবার অমন ডানা কোথা থেকে এল? এ যে দেখছি খিড়কির পুকুরে যে রাজহাঁসটা জলে মাথা ডুবিয়ে ডুবিয়ে গুগলি খেয়ে বেড়ায়, তার সাদা সাদা ডানা দুটো কেটে কে হনুমানটার দু-পায়ে আটকে দিয়েছে! সেই ডানায় ভর দিয়ে উড়তে উড়তে এসে হনুমানটা হাতির পাশে দাঁড়াল৷
তাই তো, এরূপ অদ্ভুত জানোয়ারকে কী বলে ডাকবে? কাকাতুয়ার মতো মাথা, হনুমানের মতো শরীর, হাঁসের মতো ডানা-এর নাম নিশ্চয় কাহামান৷
হাতিটা কাহামানের দিকে একবার তাকিয়ে গোটা কতক বাদাম পেড়ে তাকে খেতে দিল৷ বাদাম পেয়ে কাহামান ভারি খুশি, কচ কচ করে চিবিয়ে খেয়ে ফেলল৷ তারপর তার চটের জামার পকেট থেকে একটা কলা পাতার পুঁথি বের করে পড়তে লাগল৷ নিশু জানতে পেল, কাহামান স্পষ্ট তাদের মতোই সুর করে কবিতা পড়ছে-
'বদ্দিবাটির পদ্ম এনে
বিক্রি করে নন্দ বেনে৷
নন্দ বেনের গন্ধগোকুল
খায় চিবিয়ে আমের মুকুল৷
নেংটি ইঁদুর আংটি পরে
বেড়াচ্ছে হিং বিক্রি করে৷
ওই এল রে পিন্টু বুড়ো,
ঘণ্টারামের মেজো খুড়ো৷
কন্ঠি গলায় ঘণ্টারাম
খাচ্ছে খাজা দিবস যাম!'
কাহামান সুর করে করে পড়তে লাগল৷ ছড়া শুনে বাচ্চা হাতি দুটোর কী স্ফূর্তি! তারা চার পা তুলে দাঁড়িয়ে, দু-পায়ের ওপর ভর দিয়ে, ছড়ার তালে তালে নাচতে আরম্ভ করল৷ খানিক পরে ধাড়ি হাতিটাও গুনগুনিয়ে গান ধরল৷ নিশু তো অবাক! পিসিমা, দিদিমার কাছে সে অনেক উপকথা রূপকথা শুনেছে, কিন্তু হাতিতে গান গায় তা কখনো শোনেনি! সে হাসির কানে কানে বলল, 'কী অবাক কাণ্ড দেখছিস হাসি! হাতিটাও কেমন গান গাইছে!'
হাতি মিহি সুরে গাইতে লাগল-
'বাবরি কাটা গুবরে পোকা রাবড়ি খেতে চায়,
আলতা পরে সন্ধ্যা বেলা পলতা বনে যায়৷
সিঁদুর খেয়ে তেলাকুচো টুক টুক টুক দোলে
শাকচুন্নি কাঁদছে বসে, হালুম বুড়োর কোলে!'
কাহামান আনন্দে লাফিয়ে উঠল, 'বাহবা হাতি মাসি, তুমি এমন সুন্দর ছড়া কাটতে পার!' হাতির মুখে ছড়া শুনে হাসির কী আনন্দ! সে তো হেসেই কুটি কুটি! নিশুর হাত চেপে ধরে বলল, 'দাদা একটা হাতির বাচ্চাকে নিয়ে চলো বাড়ি, আমাদের সঙ্গে পড়াশোনা করবে, ইশকুল যাবে৷ ওরা যে এমন সুন্দর কথা কইতে পারে তা তো আগে জানতাম না!'
ছড়া শুনতে শুনতে নিশু ও হাসির অন্যদিকে খেয়াল ছিল না৷ হঠাৎ তাকিয়ে দেখে পশ্চিম দিক থেকে এক কালো মেঘ উঠে দেখতে দেখতে সমস্ত আকাশখানা ছেয়ে ফেলেছে৷ গাছপালা দুলিয়ে হঠাৎ ঝড় উঠল! কড় কড় কড় বাজের আওয়াজে আকাশ কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগল৷ নিশু ছুটতে লাগল হাসির হাত ধরে৷ বাঘের খাঁচার কাছাকাছি এসে সে ভয়ে কেঁপে উঠল৷ দেখল বাঘ খাঁচা ভেঙে বেরিয়ে এসেছে; খাঁচার সামনে মাঠের ওপর থাবা পেতে বসে তার দুটো বাচ্চার সঙ্গে খেলা করছে৷
চোখে হাত চাপা দিয়ে সেদিক থেকে নিশু ফিরল৷
যাবে কোথায়! চিড়িয়াখানার সব জানোয়ারই আজ খাঁচা ভেঙে বেরিয়ে পড়েছে৷ বাঘ, ভালুক, সিংহ, হাতি, উট, বাঁদর সব চারদিকে লাফালাফি ছুটোছুটি করছে৷ কোথায় গিয়ে তারা প্রাণ বাঁচায়! নিশু হাসিকে নিয়ে একবার গাছের আড়ালে লুকোয়, একবার থামের পাশে বসে৷ চারিদিকে জন্তুজানোয়ারের ভীষণ গর্জন, আর তাদের ছুটোছুটির আওয়াজ! হাসি বুঝি ভয়ে অজ্ঞান হয়েই পড়ল৷
নিশুর হঠাৎ মনে পড়ে গেল পিন্টুবুড়োর কথা৷ বাসে আসবার সময় সে তো বলেছিল আজ তারা বিপদে পড়বে৷ সে সময়ে সে তার কথা বিশ্বাস করেনি, এখন পিন্টুবুড়োর ওপর কৃতজ্ঞতায় তার মন ভরে গেল৷ পিন্টুবুড়ো বলেছিল কোনো বিপদে পড়লে তার নাম ধরে ডাকলেই সে এসে তাদের বাঁচাবে৷ আশায় নিশুর বুক ভরে উঠল, নতুন সাহস এল৷
মস্ত একটা সাদা ভাল্লুক তাদের গা ঘেঁষে ঘোঁৎঘোঁৎ করতে করতে ছুটে গিয়ে লাফিয়ে পড়ল একটা নেকড়ে বাঘের ওপর৷ নিশু ভয়ে আকাশের দিকে চেয়ে প্রাণপণে চেঁচিয়ে বলতে লাগল-
'পিন্টুবুড়ো, পিন্টুবুড়ো,
ঘণ্টারামের মেজো খুড়ো,
দু-ভাই বোনে তোমায় ডাকি
এই বিপদে আসবে না কি!'
হঠাৎ একটা শব্দ হল! কালো মেঘ চিরে এক ঝলক আলো বেরিয়ে এল, ধারালো তরোয়ালের ফলার মতো৷ নিশু দেখল মস্ত একটা সিংহ দৌড়োতে দৌড়োতে এসে তাদের পাশে হাঁটু গেড়ে বসল৷ যেন সে তাদের পিঠে চড়িয়ে নিতে চাইছে৷ নিশু ভয়ে দু-পা পেছিয়ে গেল! সিংহটা তার কাছে এসে তার পায়ে মাথা ঘষতে লাগল-যেন সে বলতে চায়, আমার পিঠে ওঠো, আমি তোমাদের বাড়ি রেখে আসব৷ নিশু হাসির কানে কানে বলল, 'হাসি, আমরা পিন্টুবুড়োকে ডেকেছি, সে নিশ্চয়ই এই সিংহকে পাঠিয়ে দিয়েছে আমাদের কাছে৷ ভয় পাসনি, ওর পিঠে চড়ে বোস৷' দু-ভায়ে বোনে সিংহের পিঠে চড়ে বসল৷ নিশু প্রাণপণে জড়িয়ে ধরল সিংহের কেশর, হাসি জড়িয়ে ধরল নিশুকে; সিংহ ছুটে চলল ঝোড়ো হাওয়ার মতো৷
চারিদিকে কিছু দেখা যায় না৷ মেঘে ঢাকা আকাশ অন্ধকার৷ ঝম ঝমাঝম দ্বিগুণ বেগে বৃষ্টি এল৷ তারই মধ্য দিয়ে সিংহ দৌড়োচ্ছে, ওদের দু-জনকে পিঠে নিয়ে৷ চিড়িয়াখানা থেকে বেরিয়ে রাস্তা, তারপরে মাঠ, তারপরে গঙ্গার তীর, সব পেরিয়ে এসে সিংহটা পাখির মতন পাখনা মেলে উড়ল আকাশে৷ আর বুঝি বাঁচবার উপায় নেই! নিশু কেঁদে উঠল-নিজের জন্যে নয়, তার মনে হতে লাগল কেবল হাসির কথা৷ কেন সে তাকে নিয়ে চিড়িয়াখানায় এসেছিল, সেই তো তাকে এই বিপদে ফেলেছে! নিশুর কান্না শুনে সিংহ মুখ ঘুরিয়ে তাকাল; নিশু দেখল, এ তো সিংহের মুখ নয়, এ যে সেই বাসের পিন্টু বুড়ো-সেই চোখ সেই মুখ, সেই দাড়ি! পিন্টুবুড়ো সিংহ হয়ে এসেছে তাদের বাঁচাতে৷ নিশুর তবুও ভয় গেল না৷ সে চেঁচিয়ে বলল, 'পিন্টুবুড়ো, পিন্টুবুড়ো, আকাশ থেকে তুমি আমাদের মাটিতে নামিয়ে নিয়ে চলো; হাসি ভয়ে কাঁদছে!'
নীচের দিকে চেয়ে নিশু দেখল, কূল নেই, কিনারা নেই, অগাধ নীল জল দুলছে ঢেউয়ে, ঢেউয়ে! এ যে সমুদ্র! মাটি ছেড়ে কখন তারা সমুদ্রে এসে পড়েছে! হঠাৎ কোথা হতে একটা শোঁ শোঁ শব্দ আসতে লাগল৷ নিশু মাথা ফিরিয়ে দেখল একটা এরোপ্লেন আসছে তাদের দিকে!
'পালাও পালাও পিন্টুবুড়ো, এরোপ্লেনে তোমার ডানা কেটে যাবে-' বলতে বলতেই এরোপ্লেনটা এসে পড়ল তাদের ওপর; তার ধাক্কা লেগে পিন্টুবুড়োর দুটো ডানাই গেল কেটে৷ বিষম চিৎকার করে নিশু জড়িয়ে ধরল হাসিকে, এই বুঝি তারা পড়ল গিয়ে কূল-হারানো ঢেউ-দোলানো নীলসাগরের বুকে!
'হ্যাঁরে, ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে অমন চেঁচিয়ে উঠলি কেন?' জেগে ওঠে নিশু দেখে, মা তার মাথার কাছে দাঁড়িয়ে পাখা নিয়ে বাতাস করছেন আর নতুন একজন লোক হাসির পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছেন৷ নিশু 'চিড়িয়াখানা' বইটা পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়েছিল, সেখানা তখনও তার বুকের উপর খোলা পড়ে রয়েছে৷
নতুন ভদ্রলোকটির দিকে চেয়ে মা বললেন, 'ওঠ নিশু, দেখ দিল্লি থেকে তোদের নতুন খুড়ো এসেছেন৷ উনি খুব বড়ো শিকারি৷ তোরা শিকারের গল্প ভালোবাসিস, উনি তোদের অনেক গল্প বলবেন৷' এই সময় হাসি চোখ রগড়াতে রগড়াতে জেগে উঠল, নতুন খুড়ো তাকে কোলে নিয়ে আদর করতে লাগলেন৷
নিশু অবাক হয়ে বারবার নতুন খুড়োর মুখের দিকে চাইতে লাগল, ঠিক যেন স্বপ্নের সেই পিন্টুবুড়ো, তেমনি চোখ, তেমনি ফুরফুরে সাদা দাড়ি৷ ওদিকে বাইরের আকাশও মেঘে অন্ধকার, ঝম ঝম করে বৃষ্টি পড়ছে৷ নতুন খুড়ো বললেন, 'বৃষ্টি থামলেই আমরা বেড়াতে যাব, ততক্ষণ তোমাদের তিনপেয়ে বাঘের গল্প বলি৷' তিনি বিছানায় উঠে বসলেন, নিশু আর হাসি দু-জনে তাঁর দু-দিক ঘেঁষে গল্প শুনতে বসল৷
নিশুর চোখে কিন্তু তখনও কেবল ভাসছে তার সেই স্বপ্নে দেখা পিন্টুবুড়োর মুখ!
চৈত্র ১৩৪১

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন