অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়
সে রাতের সমস্ত ঘটনাই এখনও আমার কাছে রহস্যাবৃত৷ সত্যিই কি সেরকম ঘটেছিল? ঘটা কি সম্ভব? নাকি সবটাই সেই ভয়ংকর দুর্যোগের রাতে স্বপ্ন দেখেছিলাম৷
কিন্তু . . . কিন্তু . . . তাই বা কেমন করে হবে? আমাদের নাকি খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল বাংলো থেকে অনেক মাইল দূরে, পথের ধারে৷ সকালে কতগুলি লোক সে-পথে উটে চড়ে যাবার সময়ে, আমাদের অচৈতন্য অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে, তাদের উটের পিঠে চাপিয়ে নিয়ে এসেছিল৷ ভাগ্যিস এনেছিল! শরীরের ওই অবস্থায় দুপুরের প্রচণ্ড রোদে পথে পড়ে থাকলে আমরা সম্ভবত মারা পড়তাম৷ কিন্তু . . . কিন্তু, সেখানে আমরা গেলাম কেমন করে? সেও কি ঘুমের ঘোরে, স্বপ্নের মধ্যে?
গ্রামে ফিরিয়ে আনতেই সম্পন্ন গৃহস্থ জয়সিংহজির ছেলে বিজয়সিংহকে সবাই চিনতে পেরেছিল, সেবা-শুশ্রূষা করে, একটু সুস্থ করে তুলে, আমাদের বাড়ি পৌঁছে দিয়েছিল৷ প্রবল জ্বরে বিজয়ের তখনও অচৈতন্য অবস্থা৷ ডাক্তার এলেন, ওষুধপত্র দিলেন৷ তবু সেই জ্বরের প্রকোপ চলল বেশ কয়েক দিন৷ ইতিমধ্যে আমার মেয়াদ শেষ হল৷ দুঃখিত মনে, তাকে সম্পূর্ণ সুস্থ না দেখেই আমি দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হলাম৷
ভীষণ জ্বরের ঘোরে বিজয় ক্রমাগত প্রলাপ বকছিল, এলোমেলোভাবে বারবার কেবল তাদের সেই প্রাচীন হারানো রাজপ্রাসাদের কথাই বলেছিল৷
বিজয়ের মা কপালে করাঘাত করে বিলাপ করেছিলেন৷
'হায় বাপ! তোদের সে প্রাসাদ তো কবেই স্বয়ং ভগবান কেড়ে নিয়েছেন! এখনও তার কথা কেন?'
প্রলাপের ঘোরে বিজয় যখন বারবার তাঁর পরলোকগত ঠাকুরদার কথা বলেছিল, তখন তার বাবা-মা ভীত হয়ে পড়েছিলেন! তাঁর মা কেঁদে উঠেছিলেন, 'তুইও তাঁর পথে চলবি নাকি বাবা? ভুলে যা-ভুলে যা, মন থেকে মুছে ফেলে দে তাঁর কথা'-
চিন্তিত মুখে জয়সিংহজি বলেছিলেন, 'হারানো অতীতের কথা এত সমস্তক্ষণ চিন্তা করে করেই কি ছেলেটা অসুখে পড়ল? ওকে সেখানে যেতে দেওয়াই উচিত হয়নি দেখছি!'
আমাকে তিনি বলেছিলেন, 'তোমরা, বিজয়ের বন্ধুরা তাকে বোঝাতে পার না যে অতীতের রাজলক্ষ্মীর জন্য আক্ষেপ করে কোনো লাভ নেই! লেখাপড়া শিখে মানুষ হোক, কাজকর্ম করে আবার নতুন সৌভাগ্যলক্ষ্মীকে ঘরে আনুক!'
আমি তাঁর কথার উত্তরে মাথা নেড়ে শুধু সায় দিয়েছিলাম৷ কথা বলব কী? বিজয়ের অসংলগ্ন প্রলাপ শুনতে শুনতে আমার মাথার মধ্যে গোলমাল হয়ে গিয়েছিল৷ ছাড়া ছাড়া ভাবে বিজয় তাদের প্রাসাদের সেই দীর্ঘ অলিন্দ আর তার ধারে সারি সারি কুলঙ্গিতে রাখা অপূর্ব সুন্দর মূর্তিগুলির বর্ণনা দিচ্ছিল একে একে আর আমি আমার 'স্বপ্নে দেখা' অভিজ্ঞতার সঙ্গে তার হুবহু মিল খুঁজে পেয়ে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাচ্ছিলাম৷ বিজয় নিজেও তো সেই অলিন্দ কোনোদিন দেখেনি, আর আমি, এর আগে তো তার বর্ণনাও শুনিনি! তবে কি আমরা দু-জনে ঠিক একই স্বপ্ন দেখেছিলাম? সেটা কি সম্ভব?
অবশ্য, বিজয়ের পূর্বপুরুষদের সেই প্রাসাদের কথা আমি বহুবার তার কাছে শুনেছি৷ কিন্তু, সে হল শোনা গল্পের পুনরাবৃত্তি৷ বিজয় কেন, তার বাবা কি ঠাকুরদাও সে প্রাসাদ কোনোদিন স্বচক্ষে দেখেননি৷ কিন্তু সেদিন জ্বরের ঘোরে, বিজয় যা বলেছিল সেটা অত্যন্ত স্পষ্ট আর উজ্জ্বল বাস্তব অভিজ্ঞতার বর্ণনা, আর সেই বর্ণনা, আমার নিজের 'স্বপ্ন' বা অভিজ্ঞতার স্মৃতির সঙ্গে হুবহু এক!
তবে কি কোনো অলৌকিক উপায়ে আমরা দু-জন সে-রাত্রে কোনো এক অতীত যুগে চলে গিয়েছিলাম? আমার আধুনিক বিজ্ঞান-পড়া মন একথা মেনে নিতে প্রস্তুত নয়৷ কিন্তু, সমস্ত ব্যাপারটা যদি স্বপ্ন হয়ে থাকে, তাহলে সেই আশ্চর্য সুন্দর জিনিসটা আমার কাছে এল কী করে?
* * *
এই রহস্যের সমাধান খুঁজতে হলে সমস্ত ঘটনাটা গোড়া থেকে জানা দরকার৷
বিজয়সিংহের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় পিলানিতে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে এসে৷ আমরা দু-জনে কলেজের একই ক্লাসে ভরতি হয়েছিলাম আর স্থান পেয়েছিলাম হোস্টেলের একই ঘরে৷ 'রুমমেট' না হলে হয়তো বিজয়ের সঙ্গে আলাপই হত না৷ সে ছিল ভীষণ স্বল্পবাক আর অমিশুক, কলেজ জীবনের শেষদিন পর্যন্ত ক্লাসের অধিকাংশ ছেলের সঙ্গে তার ভালো করে পরিচয়ই হয়নি৷ ওদিকে, আমি বন্ধুবান্ধব ভালোবাসি৷ সুদূর পশ্চিমবঙ্গ থেকে এতদূরে পড়তে এসে প্রথম কিছুদিন সঙ্গীর অভাবে হাঁপিয়ে পড়েছিলাম, কতকটা গায় পড়েই বিজয়ের সঙ্গে আলাপ করেছিলাম৷
বিজয় যে দাম্ভিক বা রূঢ় ছিল তা নয়৷ তার চেহারা ছিল গল্পে বর্ণিত রাজপুতের মতো সুন্দর, তার স্বভাবের মধ্যেও কেমন একটা স্বাতন্ত্র্য আর আভিজাত্য ছিল যে তার সঙ্গে অন্তরঙ্গতা সহজ ছিল না৷ একই ঘরে থেকেও অনেকদিন পর্যন্ত আমরা পরস্পরের সঙ্গে কেবল দৈনন্দিন তুচ্ছ ঘটনা আর নৈর্ব্যক্তিক জিনিস নিয়ে কথাবার্তা বলেছি, পরস্পরের পারিবারিক বিষয়ে কোনো কথাই বলিনি৷ ক্রমে বিজয়ের বাবা-মার কথা শুনেছিলাম৷ তার কোনো ভাইবোন ছিল না সে-কথাও জেনেছিলাম৷ বলা বাহুল্য তার অনেক আগেই আমার বাবা-মা, ভাইবোনের কথা বিজয়কে বলেছিলাম৷ তাকে আমাদের বাড়ি যাবার জন্য নিমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম যদিও জানতাম যে সে নিমন্ত্রণ রক্ষা করবে না৷
বড়ো বড়ো ছুটিতে সব ছেলেরাই বাড়ি যেত৷ বিজয়ের মতো যাদের বাড়ি কাছাকাছি, সে সব ছেলেরা অনেক সময়ে দু-চারদিনের ছুটিতেও বাড়ি ঘুরে আসত৷ আমরা, দূরাগত ছেলেরা দল বেঁধে দিল্লি, আগ্রা, মথুরা, জয়পুর বা চণ্ডীগড় দেখতে যেতাম৷
এমনি একটা ছোটো ছুটির আগে বিজয় কিছুটা কুন্ঠিতভাবে আমাকে বলেছিল, 'চলো না, এবার ছুটিতে আমার সঙ্গে আমাদের বাড়ি৷'
সম্মতি জানাবার আগে আমি হয়তো একটু বিস্মিত দৃষ্টিতে তার মুখের দিকে তাকিয়েছিলাম৷ দ্বিধার সঙ্গে বিজয় বলেছিল, 'আমরা খুব সাধারণভাবে থাকি, তোমার হয়তো কষ্ট হবে, এখন তো আর-সে যাক, তুমি উর্বর দেশের ছেলে, কখনো মরুভূমি তো দেখনি'-হেসে বলেছিলাম, 'আমি তো ভাই সাধারণ ঘরেরই ছেলে, চিরদিনই সাধারণভাবে থেকেছি৷ মরুভূমির কথা কেবল বইয়ে পড়েছি, স্বচক্ষে দেখতে নিশ্চয় ভালো লাগবে৷' তিক্ত হেসে বিজয় বলেছিল, 'ভালো লাগা বা ভালোবাসার জিনিস নয়-তবু-তবু-'
উত্তেজিত হয়ে সে পায়চারি করছিল, 'তবু জানো কি-ওর ওপর আমার যেমন রাগ, তেমনি ওকে ভয় করি-আর তেমনিই ভালোবাসি-'
নিরুত্তাপ, স্বল্পভাষী ছেলেটির এই প্রগলভ উত্তেজনা দেখে খুবই অবাক হয়েছিলাম৷
পরে অবশ্য সব কিছুই বুঝেছিলাম৷
ছুটিতে বিজয়ের বাড়ি গেলাম৷ তার বাবা-মা খুব আদরযত্ন করলেন৷ ছোটোবেলা থেকেই নাকি বিজয় অমিশুক, তার বন্ধু ছিল না, তাই আমার সঙ্গে ছেলের অন্তরঙ্গতা দেখে তাঁরা আমাকেও ছেলের মতন ভালোবেসে ফেললেন৷
পরে আরও বেশ কয়েকবার বিজয়দের বাড়ি গেছি৷ তার বাবা-মার কাছেও তাঁদের পূর্বপুরুষের গল্প শুনেছি৷ কিন্তু তাঁরা কখনো বিজয়ের সামনে সেসব প্রসঙ্গ তুলতে দিতেন না৷ যদিও সেই প্রাচীন ইতিহাস সংক্রান্ত সব কিছুর প্রতি তার প্রচণ্ড আকর্ষণের কথা তাঁরা জানতেন৷ অথবা, সেই জন্যই হয়তো তার কাছে সেসব কথা বলতেন না৷
বিজয়দের পূর্বপুরুষেরা রাজা ছিলেন৷ একদিকে বীর যোদ্ধা বলে তাঁদের খ্যাতি ছিল, অপরদিকে সাহিত্য, শিল্প, সংগীত, সব কিছুরই তাঁরা চর্চা করতেন৷ যেখানে তাঁদের রাজ্য ছিল, সে সমস্ত অঞ্চলই এখন মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে, সেদিনকার জনকোলাহল মুখরিত নগরগুলির প্রাসাদ-মন্দির-গৃহ, শস্যশ্যামল খেত, মাঠ, ফলমূলের বাগান, সব কিছুই বালুকারাশির তলায় চাপা পড়েছে৷ অবশ্য এ-সব একদিনে ঘটেনি, কয়েকশত বৎসর ধরে মরুভূমি পশ্চিম থেকে পূর্বদিকে বিস্তার লাভ করছে, মানুষও একটু একটু করে পূর্বদিকে হটে আসছে; আবার যখন তাদের সেই নতুন বাসস্থান বালির স্তূপে পরিণত হচ্ছে, তখন তারা আরও পূর্বে সরে এসে নতুন জনপদ গড়ে তুলছে৷
এইভাবে বহু জনপদ ও সমৃদ্ধ নগরী সেই মরুবালুর তলায় চাপা পড়ে গেছে৷ শত সহস্র মানুষ তাদের সব ধনসম্পদ হারিয়ে, রিক্তহাতে নতুন জীবনযাত্রা শুরু করেছে৷ হয়তো সেই সব পরিবারেও পুরাতন ঐশ্বর্যের কাহিনি একটা কিংবদন্তীর মতন হয়ে দাঁড়িয়েছে, ঠাকুরদা-ঠাকুরমারা সেই হারানো সম্পদের গল্প বলে ছোটো ছোটো নাতি-নাতনিদের ভোলান৷ কিন্তু বিজয় যখন নিভৃতে আমার সঙ্গে তাদের পূর্ব ইতিহাসের কথা বলত, তার মধ্যে একটা অদ্ভুত উত্তেজনা আর গভীর আবেগ প্রকাশ পেত!
প্রথম যেবার বিজয়দের বাড়ি যাই, সে আমাকে মরুভূমি দেখাতে নিয়ে গিয়েছিল৷ তার বাবা-মা প্রথমে কিছুটা আপত্তি জানিয়ে, শেষে রাজি হয়েছিলেন৷ ওদের বাড়িও রুক্ষ অনুর্বর জমিতে, কিন্তু আসল মরুভূমি আরও অনেকটা পশ্চিমে, একদিনে দেখে ফিরে আসা কষ্টকর৷ আগের রাত্রেই আমরা মরুভূমির প্রান্তে একটা বাংলোয় গিয়ে শুয়েছিলাম৷ কথা ছিল, ভোর হলে আমরা মরুভূমি দেখতে যাব, আবার বেলা বাড়বার আগেই বাংলোতে ফিরে আসব৷
কিন্তু ঘুমোতে-না-ঘুমোতেই মাঝরাতে বিজয় আমাকে ডেকে তুলে দিল, সকাল অবধি ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে পারল না৷
সেদিন বোধ হয় কৃষ্ণপক্ষের পঞ্চমী তিথি ছিল, বেশ ফুটফুটে চাঁদের আলোয় বালির রাজ্য যেন স্বপ্নরাজ্যে পরিণত হয়েছিল৷ যেদিকে যতদূর দৃষ্টি চলে, কেবল স্তূপের পরে স্তূপ, টিলার পর টিলা, কেবল বালি, বালি, বালি আর বালি!
পশ্চিমে মুখ করে আমরা দু-জনে একটা টিলার ওপর বসেছিলাম৷ মুগ্ধ হয়ে প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখছিলাম৷ কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকার পর সে বলেছিল, 'ভাবতে পারো, এই সব টিলার তলায় চাপা পড়ে আছে মানুষের ঘরবাড়ি! কোথাও ছিল মন্দির, কোথাও রাজপ্রাসাদ- এখন সব সমান-ওপর থেকে দেখতে সব একইরকম!'
'তোমাদের প্রাসাদ ঠিক কোথায় ছিল, সেটা কি জানো?'
'একেবারে সঠিক জানি না, তবু লোকমুখে শুনে শুনে একটা মোটামুটি আন্দাজ করতে পারি-তা ছাড়া'-
'কী? তা ছাড়া, কী?'
কিন্তু সেদিন বিজয় আর কোনো কথা বলেনি৷ কথা ঘুরিয়ে অন্য প্রসঙ্গ তুলেছিল৷
পশ্চিম থেকে বয়ে আসা মৃদু হাওয়া ভারি ভালো লাগছিল, কিন্তু সেই ফুরফুরে হাওয়ার সঙ্গে সামান্য একটু মিহি বালিও ফুরফুর করে উড়ে আসছিল৷ বিজয় বলল যে, বেলা যত বাড়ে, ততই বাড়ে হাওয়ার গতি আর উড়ে আসা বালির পরিমাণ৷ দুপুরে দারুণ গরম হয় আর জোর বাতাসে প্রচুর বালি উড়ে আসে, তার মধ্যে পথ চলা বিপদজনক হয়ে পড়ে৷ আর যখন বালির ঝড় ওঠে তখন প্রচণ্ড বাতাসের সঙ্গে উড়ে আসা রাশি রাশি বালির মধ্যে পড়ে কত মানুষ ও পশু যে প্রাণ হারায় তার ঠিক নেই!
আমি বললাম, 'এইভাবে যদি দিনের পর দিন, বছরের পর বছর, ক্রমাগত পশ্চিম থেকে পুবে বালি উড়ে আসতে থাকে, তাহলে ক্রমে সমস্ত ঘরবাড়ি গাছপালা বালিতে চাপা পড়ে যাবে আর সমস্ত মরুভূমিটাই ক্রমে আরও পুবে এগিয়ে আসবে, সে আর বিচিত্র কী?'
সেদিন বিজয় আর কিছু বলেনি, কিন্তু পরে অনেকবার আমাদের মধ্যে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে৷ আরও কয়েকবার তার সঙ্গে ওই বাংলোয় থেকে মরুভূমি দেখতে গিয়েছি৷ আশ্চর্য, প্রত্যেকবারই বিজয়ের বাবা-মা প্রথমে খুব আপত্তি করেছেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত মত দিয়েছেন৷
সম্প্রতি ভারত সরকার নাকি নানা বৈজ্ঞানিক উপায়ে এই মরুভূমির অগ্রগতি রোধ করবার চেষ্টা করছেন৷ নদীর মুখ ঘুরিয়ে আর খাল কেটে জল এনে মরুভূমির পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনাও নাকি আছে৷ এই বিষয়ে যত বই পাওয়া যায়, বিজয় আর আমি সবই সংগ্রহ করে পড়ে ফেলেছিলাম৷
আমি বলতাম, 'আমরা যতদিনে পাশ করে বেরোব, চাকরি খুঁজব, ততদিনে হয়তো আরও কত নতুন উপায় ও পদ্ধতি উদ্ভাবন করা হবে, তোমাদের মরুভূমির দেশকে শস্যশ্যামল করবার কত নতুন পরিকল্পনা হবে৷ তুমি নিজেই হয়তো এইসব কাজে হাত লাগাবার সুযোগ পাবে৷'
বিজয়ের বাবা-মার কিন্তু সে বিষয়ে কোনো উৎসাহ দেখতে পেতাম না৷ তাঁরা চাইতেন যে বিজয় পাশ করে কোনো বড়ো শহরে চাকরি নিয়ে বসবাস করুক-রাজস্থান থেকে যদি অনেক দূরে যেতে হয়, সে আরও ভালো!
অবশেষে আমাদের পড়াশোনা আর পরীক্ষা শেষ হল৷ বাড়ি ফিরে যাবার আগে কয়েকদিনের জন্য বিজয়দের বাড়ি গেলাম, তার মধ্যেই একদিন মরুভূমিতে বেড়াতে গেলাম৷ যথারীতি আমাদের মধ্যে পরীক্ষার ফল বেরোনো আর চাকরি খোঁজার কথা উঠল৷
কথায় কথায় বিজয়কে জিজ্ঞেস করলাম, 'তুমি কাছাকাছি কোথাও চাকরি কর, এটা তোমার বাবা-মা চান না কেন? তুমি তো তাঁদের একমাত্র ছেলে৷ এইসব এলাকায় যদি কোনো পরিকল্পনা হয়, তার কাজে তোমারই তো অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত৷'
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বিজয় বলল, 'ওঁরা তো বোঝেন যে কেবলমাত্র মরুভূমির অগ্রগতি রোধ করেই আমি সন্তুষ্ট থাকতে পারব না, আমি চাইব আমাদের সেই লুপ্ত ধনসম্পদ আবার উদ্ধার করতে, যেমন আমার দাদু চেয়েছিলেন-'
কথা অসমাপ্ত রেখে বিজয় হঠাৎ থেমে গেল৷
আমি বললাম, 'সে তো খুব ভালো হবে৷ যখন এখানে আবার জনপদ গড়ে উঠবে, তখন প্রত্নতাত্ত্বিকের দল নিয়ে এসে সে সবও আবার পুনরুদ্ধার করা যাবে৷'
'তার জন্য তো দাদু অপেক্ষা করে থাকতে পারেননি, আমিও যদি ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে না পারি-এই হল বাবা-মার ভয়৷'
আমি আর চুপ করে থাকতে পারলাম না-জিজ্ঞেস করেই ফেললাম, 'তোমার ঠাকুরদাদাকে নিয়ে কী একটা রহস্য আছে বলো তো? তোমার বাবা-মা তাঁর নাম উচ্চারণ করলেই কথা ঘুরিয়ে নেন, আর তুমিও কথা বলতে বলতে চুপ করে যাও?'
বিজয় বলল, 'রহস্য আর কিছু নয়, আসল কথা দাদুর এই মরুভূমিতে ঘোরার এমন একটা নেশা ছিল যে সমস্ত জীবন ভালো করে বিষয়কর্মে মন দিতে পারেননি৷ তখন আমাদের খুবই আর্থিক দুরবস্থায় পড়তে হয়েছিল৷ অবশেষে, বাবা যখন বহুকষ্টে নিজের পায় দাঁড়াতে পারলেন তখন সংসারটাকেও আবার দাঁড় করালেন৷'
'তাই বুঝি তোমার বাবা-মা ভয় পান যে তুমিও তোমার দাদুর মতন হয়ে যাবে? কিন্তু, তুমি তো আর পড়াশোনা ছেড়ে কেবল মরুভূমিতে ঘুরতে যাওনি? মাঝে মাঝে এসে ঘুরে গেলে ক্ষতিটা কী?'
বিজয় একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে চুপ করে বসে রইল কিছুক্ষণ; তারপর আস্তে আস্তে বলল, 'কেন বারবার মরুভূমিতে আসি জানো? না এসে পারি না তাই আসি, আর বাবা-মা সেটা বোঝেন বলেই আসতে দিতে চান না৷ বার বার এসে আমি দেখতে চাই হাওয়া আবার ঘুরে যায় কি না৷ আমার রোজ রোজ আসতে ইচ্ছা করে!'
'হাওয়া আবার ঘুরবে কেমন করে? এখানে তো দেখছি সব সময়েই পশ্চিম থেকে পূর্বদিকে হাওয়া বয়৷'
'কিন্তু লোকে বলে যে নাকি অনেক বছর পরে একবার করে হাওয়া ঘুরে যায়, তখন পুব থেকে পশ্চিমে প্রচণ্ড বালির ঝড় ওঠে-'
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, 'সেকী? কে বলেছে?'
'দাদুর কাছে শুনেছিলাম৷ তা ছাড়া লোকেও বলে৷ বাবা-মাও বহুবার শুনেছেন সে-কথা, কিন্তু বিশ্বাস করেননি৷ আমি দাদুর কথা অবিশ্বাস করতে পারি না৷'
'তোমার দাদু কেন এরকম কথা বলতেন?'
'এরকম একটা প্রচলিত কিংবদন্তী আছে৷ কিন্তু দাদু বলতেন প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে৷'
সেই অন্ধকার রাতে, আকাশভরা তারার নীচে বসে বিজয়ের ঠাকুরদার অদ্ভুত রোমাঞ্চকর কাহিনি শুনতে শুনতে রাত গভীর হয়েছিল৷
ছোটোবেলা থেকেই নাকি বিজয়ের দাদুর অস্বাভাবিক আকর্ষণ ছিল এই মরুভূমির প্রতি৷ অন্য ছেলেরা যখন খেলে বেড়াত, তিনি একা একা মরুভূমির প্রান্তে ঘুরতেন৷ তখন অবশ্য মরুভূমি এতটা পুবে এগিয়ে আসেনি৷ এইসব অঞ্চলে দু-একটা গ্রাম ছিল, বিজয়ের দাদুরা তখন এখানেই থাকতেন৷
গ্রামে এক আধপাগলা ফকির ছিলেন, তিনিও এই মরুভূমিকে ভীষণ ভালোবাসতেন, আর হয়তো সেইজন্যই, বিজয়ের দাদুকেও খুব বেশি স্নেহ করতেন৷ একটু সুযোগ পেলেই এই দুই অসমবয়সি বন্ধু এই মরুভূমির ধারে ধারে ঘুরে বেড়াতেন৷ ফকির খুব ভালো লোক ছিলেন বলে বিজয়দের বাড়ির লোকেরা এতে কোনো আপত্তির কারণ দেখেননি৷
এই ফকিরের কাছেই বিজয়ের দাদু হাওয়া ঘুরে যাওয়ার কথা প্রথম শুনেছিলেন৷ বৃদ্ধ ফকির নাকি খুব ছোটোবেলায় একবার হাওয়া ঘুরে যাবার কথা শুনেছিলেন, যারা তখন মরুভূমির কাছে ছিল, তাদের নাকি অদ্ভুত সব অভিজ্ঞতা হয়েছিল৷ আবার হাওয়া একদিন ঘুরে যাবে সেই আশাতেই সেই বৃদ্ধ আর বালক মরুভূমির প্রান্তে বার বার আসতেন৷ মাঝে মাঝে তাঁরা ছোটোখাটো বালির ঝড়েও পড়তেন, কিন্তু অভিজ্ঞ ফকির ঝড়ের হাত থেকে রক্ষা পাবার কায়দা কৌশল জানতেন, কোনোদিন তাই তাঁদের কোনো বিপদ ঘটেনি৷
এমনিভাবে ঘুরতে ঘুরতেই একদিন তাঁরা এক প্রচণ্ড ঝড়ে পড়েন৷ ফকিরের নির্দেশ মতন, মোটা চাদরে মাথা মুখ ঢেকে একটা উঁচু টিলার পুবদিক ঘেঁষে দু-জনে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়েছিলেন যাতে পশ্চিম থেকে ঝোড়ো হাওয়ার প্রচণ্ড বেগটা সোজা ওঁদের গায়ে লাগতে না পারে৷ কিন্তু হঠাৎ তারা নির্বাক বিস্ময়ে উপলব্ধি করলেন যে ভীষণ বেগে ঝোড়ো হাওয়ার সঙ্গে অজস্র বালুকণা ছুঁচের মতন ওঁদের সর্বাঙ্গে বিঁধছে-ঝড় আসছে পুবদিক থেকে!
তখন আর কিছু চিন্তা করবার অবস্থা ছিল না৷ কোনোমতে দাঁড়িয়ে, বসে, হামাগুড়ি দিয়ে টিলা পার হয়ে তাঁরা পশ্চিম পৌঁছেছিলেন, যথারীতি মাথা মুখ ঢেকে শুয়ে পড়েছিলেন৷ ক্রমে অচৈতন্য হয়ে পড়েছিলেন৷ কতক্ষণ এই ঝড় চলেছিল তাঁরা জানেন না৷ যখন জ্ঞান হল, তাঁরা দেখলেন যে এক অপরূপ মনোহর নতুন রাজ্যে এসে পড়েছেন৷ দূরে দেখা যাচ্ছে অপূর্ব সুন্দর মন্দিরের চুড়ো, ছোটো বড়ো অট্টালিকা আর প্রাসাদের খিলান ও গম্বুজ৷ তাঁরা যেন এক স্বপ্নপুরীতে এসে পড়েছিলেন৷ আর সেই স্বপ্নের ঘোরেই দাঁড়িয়ে উঠে সেই অজানা রাজ্যের দিকে ছুটেছিলেন৷
এই পর্যন্ত বলে বিজয় থেমেছিল৷
আমি রুদ্ধশ্বাস আগ্রহে জিজ্ঞেস করেছিলাম, 'তারপর? তারপর কী হয়েছিল?'
বিজয় মৃদুস্বরে বলল, 'দাদুদের ভাগ্য নেহাতই মন্দ ছিল সেদিন, তাঁরা সেইসব প্রাসাদ মন্দিরের কাছে পৌঁছোবার আগেই আবার প্রচণ্ড বালির ঝড় শুরু হয়েছিল, এবার পশ্চিম দিক থেকে! তাঁরা আবার অজ্ঞান হয়ে গেলেন-যখন জ্ঞান হল, তখন আবার দেখেন যে মরুভূমির বুকে শুয়ে আছেন৷ যতদূর দৃষ্টি চলে, বালি, বালি আর বালি-বালির স্তূপ আর টিলা, উড়ে আসা বালি ওঁদের প্রায় কবরস্থ করে ফেলেছে-কোনোদিকে কোনো বাড়ি ঘরের চিহ্ন নেই, এমনকী কোনদিকে কোন কোন টিলার নীচে সেসব চাপা পড়েছে তাও বোঝার উপায় নেই৷'
আমি বললাম, 'কী দুঃখের কথা৷'
বিজয় কেবল মাথা নেড়ে সায় দিল৷
এই ঘটনার পরে নাকি সেই বৃদ্ধ ফকিরের মাথা একেবারেই খারাপ হয়ে গিয়েছিল, বাঁচেনওনি আর বেশিদিন৷ তাঁদের মুখে হাওয়া ঘুরে বাড়িঘর বেরিয়ে পড়া, আবার উলটোমুখো বাতাস বয়ে সব বালি চাপা পড়ার কথা শুনে বিশেষ কেউ বিশ্বাস করেনি৷ কেবল গ্রামের দু-চারজন অতিবৃদ্ধ মানুষ বলেছিলেন যে এরকম ঘটনার কথা অতীতেও আরও শোনা গেছে৷ বিজয়ের বাবা-মার মনে দৃঢ় ধারণা যে বালির ঝড়ে অজ্ঞান হয়ে তাঁরা এসব স্বপ্ন দেখেছিলেন৷ ঠাকুরদার বাবা-মাও তাই মনে করেছিলেন, তাঁকে তাই বোঝাতে চেয়েছিলেন৷ কিন্তু বিজয়ের ঠাকুরদার নাকি এমনই নেশা ধরে গিয়েছিল যে প্রতিদিন মরুভূমির প্রান্তে ঘুরে আসতেন৷ পড়াশোনা করলেন না, বড়ো হয়ে বিষয়কর্ম কিছুই দেখতেন না৷ বিজয়ের বাবাকে বহু কষ্টে অভাবের সংসারে নিজের চেষ্টায় মানুষ হতে হয়েছিল৷ কাজেই, বিজয়কে ছোটোবেলা থেকেই দাদুর সঙ্গী হয়ে মরুপ্রান্তে ঘুরতে দেখে যে তার বাবা-মা চিন্তিত হয়ে পড়বেন, সেটা আর আশ্চর্য কী?
ক্রমে যখন এইসব অঞ্চল প্রায় মরুভূমিতে পরিণত হল, তখন তাঁরা আরও অনেকটা পুবে, তাঁদের বর্তমান বাসস্থানে নতুন বাড়ি করে চলে যান৷ তখনও বিজয়ের ঠাকুরদা সুবিধা পেলেই কোনো পথযাত্রীর উটে চড়ে মরুভূমির প্রান্তে চলে আসতেন, আর বাবা-মার চোখ এড়িয়ে বিজয়ও তাঁর সঙ্গ নিত৷ তখন বিজয়ের বাবা-মা সকলকে বলে দিলেন যেন কেউ তাঁদের মরুভূমিতে নিয়ে না আসে! বৃদ্ধ বয়সে এইভাবে মরুভূমিতে ঘুরলে তিনি আর বেশিদিন বাঁচবেন না!
এত করেও তাঁকে বাঁচানো যায়নি৷ সকলকে ফাঁকি দিয়ে বিজয়ের বৃদ্ধ ঠাকুরদা একদিন পায়ে হেঁটে এতটা পথ একাই পার হয়ে মরুভূমিতে চলে এসেছিলেন৷ প্রচণ্ড ঝড়ের মধ্যে পড়ে প্রাণ হারিয়েছিলেন, বেশ কয়েকদিন অনেক খোঁজাখুঁজির পর তাঁর প্রায়-পুঁতে-যাওয়া মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল৷
এতদিনে বুঝতে পারলাম কেন বিজয়ের এই প্রচণ্ড মরুভূমির নেশা, আর কেন সে বিষয়ে তার বাবা-মার এই নিদারুণ আশঙ্কা৷
হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে বিজয় চিৎকার করে উঠল 'ঝড়! ঝড়! দারুণ ঝড় আসছে বন্ধু- তাড়াতাড়ি টিলার পুবদিকে নেমে মাথা মুখ ঢেকে শুয়ে পড়ো৷'
তার নির্দেশমতো কাজ করতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু প্রায় একসঙ্গে দু-জনেই বুঝতে পারলাম যে প্রচণ্ড বালির ঝড় উঠেছে, কিন্তু, হাওয়া পশ্চিমদিক থেকে আসছে না-বইছে পূর্বদিক থেকে!

কোনোমতে, প্রায় গড়িয়ে গড়িয়ে, টিলার পশ্চিমে নেমে আমরা নিজেদের কোট খুলে, তাই দিয়ে মাথা মুখ ঢেকে শুয়ে পড়লাম উপুড় হয়ে৷ প্রচণ্ড ঝড় বয়ে যেতে লাগল, মনে হল যেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে গেল৷ সে যে কী সাংঘাতিক অনুভূতি তা বুঝিয়ে বলার মতন ভাষা আমার নেই৷ কারও যদি জীবন্ত কবরস্থ হবার বা জলে ডোবার অভিজ্ঞতা থাকে, সেই কেবল উপলব্ধি করতে পারবে সেই নিদারুণ দম-বন্ধ-হয়ে-আসা অবস্থাটা কেমন!
কতক্ষণ যে এরকম আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলাম তা জানি না, হঠাৎ টের পেলাম যে বিজয় আমার দুই কাঁধ ধরে নাড়া দিচ্ছে, উত্তেজনায় সে ভালো করে কথা বলতে পারছে না, কেবল আঙুল বাড়িয়ে কী যেন দেখাচ্ছে! ধড়মড়িয়ে উঠে বসে চোখ মেলে তাকিয়ে আমিও বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম৷ তখনও গভীর রাত, আকাশভরা ঝলমলে তারার আলোয় অস্পষ্ট দেখতে পেলাম যে অনতিদূরে বালির উপর মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে কতগুলি প্রাসাদের গম্বুজ আর মন্দিরের চুড়ো৷
বিজয় কোনো কথা বলেনি৷ বলবার দরকারও ছিল না৷ দুইজনে ঊর্ধ্বশ্বাসে সেই অট্টালিকার দিকে ছুটলাম-মানে সেই বালির উপর দিয়ে যতটা জোরে ছোটা সম্ভব৷
একটা প্রাসাদের চুড়োগুলোই কেবল বালির ওপর জেগে উঠেছিল, বাকি প্রাসাদটা তখনও বালির তলায় চাপা ছিল৷ কাছে গিয়ে ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম যে সমস্ত জানলা মোটা মোটা সেকেলে কাঠের কারুকার্য করা পাল্লা দিয়ে শক্ত করে বন্ধ-দু-জনে প্রাণপণ শক্তিতে ঠেলেও একটা পাল্লাও একচুলও নাড়াতে পারলাম না৷
অবশেষে একটা কপাট খুলে গিয়েছিল৷ টর্চের আলোয় আমরা সেই অন্ধকার রাতে, জানলা দিয়ে অচেনা গৃহে প্রবেশ করেছিলাম৷ ভিতরেও বালি ছিল-বন্ধ কপাটের ভিতর দিয়ে গলে আসা মিহি বালি৷ কিন্তু বালিতে সব কিছু ঢাকা পড়ে যায়নি৷ একটা মস্ত লম্বা প্যাসেজের মধ্য দিয়ে আমরা কিছুদূর গিয়েছিলাম৷ দু-ধারে সারি সারি কুলঙ্গিতে সাজানো ছিল সুন্দর কারুকার্য করা সব পাথরের মূর্তি-কত দেবদেবী, যক্ষ-যক্ষিনী, কিন্নর-কিন্নরী, আর নাম-না-জানা অদ্ভুত সব কল্পিত জীবজন্তুর মূর্তি৷
খুব বেশি দূর এগোতে সাহস হয়নি আমাদের৷ বহুদিন চাপা পড়ে থাকা এই গৃহের আবহাওয়া এমন বন্ধ দম-বন্ধ-করা যে, কিছু দূর গিয়েই আমরা হাঁফিয়ে পড়েছিলাম- তাড়াতাড়ি বাইরে বেরিয়ে এসে মুক্ত বাতাসে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বাঁচতে চেয়েছিলাম৷ বেরিয়ে এসে পাল্লা দুটো আবার চেপে বন্ধ করে দিলাম, কিন্তু হাঁফ ছেড়ে বাঁচা আমাদের ভাগ্যে লেখা ছিল না৷ বাইরে আসার কিছুক্ষণের মধ্যে আবার প্রচণ্ড বালির ঝড়ের মধ্যে পড়লাম-এবার হাওয়া বইছিল পশ্চিম দিক থেকে৷
তারপর? তারপরের ঘটনাগুলো আজও আমার কাছে খুব স্পষ্ট নয়৷ ভালো করে সব কথা মনে করতে পারি না-কেমন যেন সব কিছু তালগোল পাকিয়ে গেছে৷ সেই নিদারুণ বিভীষিকার হাত থেকে বাঁচবার জন্য আমরা কি ভূতে-তাড়া-খাওয়া মানুষের মতন মাইলের পর মাইল ছুটে চলেছিলাম? যাই করে থাকি সেটা আমরা সচেতনভাবে ভেবেচিন্তে করিনি- নিজেদের অজ্ঞাতসারে জীবনরক্ষার জৈব তাগিদে করেছিলাম৷ অবশেষে দেহযন্ত্র যখন আর কাজ করতে পারেনি, তখন অচৈতন্য হয়ে পড়েছিলাম৷ তা না হলে সেই মরুভূমির ধারের বাংলো থেকে অত দূরে আমাদের পরদিন পাওয়া গিয়েছিল কেন?
কিন্তু তার আগের ঘটনাগুলো? সেগুলো কি সত্যি ঘটেছিল? সত্যিই কি মরুভূমির হাওয়া ঘুরে গিয়েছিল? বহুদিন চাপা পড়ে থাকা অট্টালিকার শিখর কি সত্যি বেরিয়ে পড়েছিল? আমরা কি সত্যিই তার মধ্যে ঢুকেছিলাম?
মন বলে, স্মৃতি বলে নিশ্চয় ঢুকেছিলাম, নাহলে এত স্পষ্ট সে সব জিনিসের কথা মনে আছে কী করে? স্বপ্ন তো এমন হয় না৷
জানি, এ সব কথা কেউ বিশ্বাস করবে না, ভাববে যে হয় আমি বানিয়ে বলছি, নয় তো বালির ঝড়ে অজ্ঞান হয়ে অসুস্থতার ঘোরে স্বপ্নের মধ্যে এসব দেখেছি৷ তাদের সন্দেহ আর অবিশ্বাস দূর করবার জন্য কোনো কিছুই প্রমাণ করতে পারব না, কারণ নিশ্চিত জানি যে পশ্চিম থেকে উড়ে আসা বালুকা রাশি সেই অট্টালিকার উচ্চতম চুড়োও ঢেকে ফেলেছে৷ এমনকী, ঠিক কোনখানে যে সেই অট্টালিকা আছে, তারও কোনো চিহ্নমাত্র নেই৷ কিন্তু সবই যদি আমার স্বপ্ন বা কল্পনা হয় তাহলে এই অপূর্ব সুন্দর কিন্নরীর মূর্তি আমার কাছে আসল কেমন করে?
স্বপ্নের মতন মনে পড়ে যে সেই রহস্যময় অলিন্দের মূর্তিগুলি মুগ্ধ চোখে দেখবার সময়ে একটি ছোট্ট মূর্তি তুলে বিজয় আমার হাতে গুঁজে দিয়েছিল৷ বলেছিল, 'নাও ভাই আমার স্মৃতি চিহ্ন! দেশে গিয়ে আমার কথা মনে রেখো৷'
সমস্ত ঘটনাটাই তাই আজও আমার কাছে রহস্যাবৃত, ভেবে ভেবে কোনো কূলকিনারা পাই না! যখনই ভাবি সযত্নে-তুলে-রাখা মূর্তিটা বার করে দেখি, সুন্দরী কিন্নরী আমার দিকে তাকিয়ে রহস্যময় হাসি হাসে!
শারদীয়া ১৩৮৫

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন