অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়
রজতের কথা
আত্মীয়স্বজন, সহকর্মী সকলেই এ ধরনের লম্বা, উদ্দেশ্যবিহীন সফরে বেরোতে বারণ করেছিল৷ কিন্তু রজত কারও কথায় কান দেয়নি৷ রজত মিত্রের বয়স সাতাশ, একটা আধা বিদেশি কোম্পানির ফাইনান্স ম্যানেজার৷ অফিস থেকে ওকে গাড়িটা দিয়েছিল বছর দুয়েক আগে৷ গাড়ি চালানোটা ও সেই সময়েই শিখেছে৷ কিন্তু তার আগে থেকেই ওর মাথায় সেই ইচ্ছেটা ঘুরপাক খাচ্ছে৷ আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, সহকর্মী সকলকেই ও বলত ওর শখটার কথা, 'আমার ইচ্ছে করে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ি৷ একা, একদম একা, সঙ্গে কেউ থাকবে না৷ কোনো ফিক্সড ডেস্টিনেশন থাকবে না৷ মাইলের পর মাইল শুধু গাড়ি চালিয়ে যাব৷ এনজয় করব রাস্তার দু-ধারের নেচারকে৷ খিদে পেলে রাস্তার পাশের দোকানগুলোর তড়কা-রুটিতে পেট ভরাব৷ আর ঘুম? সেটা গাড়িতেই সারব৷ এই স্বপ্নটা আমি ছোটোবেলা থেকেই দেখে আসছি৷ মাঝে মাঝে মনে হয় একের পর এক ডিগ্রি হাসিল করা, ভালো চাকরি, প্রোমোশান, বাড়ি, প্রপার্টি এ সব নয়; গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়াটাই বোধ হয় আমার লাইফের এইম৷'
বন্ধুরা হাসত, 'অনেক ধরনের হবির কথাই শুনেছি৷ কেউ সিনেমা দেখে, কেউ আড্ডা মারে, কেউ দল বেঁধে হুল্লোড় করে বেড়াতে যায়, কেউ-বা নিদেনপক্ষে একা একা পাহাড়ে যায়৷ কিন্তু তোর মতো উদ্দেশ্যহীনভাবে বোধ হয় কেউ বেড়াতে চায় না, তাও আবার গাড়িতে চেপে৷'
রজত বলল, 'তোমরা হাসছ! কিন্তু আজ নাহয় কাল এভাবেই আমি বেড়াব৷ একা, একদম একা৷'
অফিস থেকে গাড়ি পাবার পর গত দু-বছরে রজত বিন্দুমাত্র ফুরসত পায়নি৷ গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারী . . . বেশিরভাগ শনি, রবিবারেও ওকে অফিসে ঢুঁ মারতে হত৷ দু-বছর পর অনেক কষ্টে চার দিনের ছুটির জোগাড় করতে পেরেছে রজত৷ বন্ধুবান্ধবরা বাধা দেবার অনেক চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে দু-একজন সঙ্গী হতে চেয়েছিল৷ কিন্তু রজত নারাজ, 'তোদের সঙ্গে দল বেঁধে একসঙ্গে বেড়াতে আমার খুবই ভালো লাগবে৷ কিন্তু সেটা অন্য সময়৷ এ বার আমার সঙ্গী আমি কাউকেই করব না৷'
ভোর ছ-টার সময় রজত বাড়ি থেকে মারুতি জেন গাড়িটায় বেরিয়ে পড়েছে৷ এখন বেলা প্রায় এগারোটা৷ মাঝে দু-একবার গাড়ি থামিয়ে দু-পাশের সবুজ ধানের খেতগুলো দু-চোখ ভরে দেখেছে৷ বুক ভরে নিয়েছে দূষণমুক্ত হাওয়া৷ এখন রজত পশ্চিমবঙ্গের কোন জেলার মধ্যে দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে তা বলতে পারব না৷ কেননা, রাস্তার ধারের পথ নির্দেশিকাগুলি থেকে ও যতটা পারে চোখ সরিয়ে নেবার চেষ্টা করছে৷
বাঁ-দিকে একটা মোড় ঘুরতেই রজতের স্নায়ুগুলো টানটান হয়ে উঠল৷ উলটো দিক থেকে একটা লরি মাঝরাস্তা ধরে তির বেগে এগিয়ে আসছে৷ রাস্তাটা তেমন চওড়া নয়৷ পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে যাবার জায়গা নেই৷ লরিটা ঘাড়ের ওপরে এসে পড়ল বলে৷ শেষ মুহূর্তে রজত গাড়িটাকে নামিয়ে দিল বাঁ-দিকের ঢালু জমিতে৷ একই সঙ্গে দ্রুত ডান হাতে দরজার লকটাও খুলে ফেলল ও৷ সামনের জমিটা যেন মনে হল উলটে যাচ্ছে . . . মাথায় একটা অসহ্য যন্ত্রণা . . . চাপ চাপ অন্ধকার রজতকে চারপাশে ঘিরে ধরল৷
রামেশ্বরের কথা
চোখ খুলতেই সূর্যের আলোয় ওর চোখ ধাঁধিয়ে গেল৷ চোখ বন্ধ করে ফেলল ও৷ মাথাটা দপ দপ করছে৷ পিঠের নীচে শক্ত অসমান কোনো জিনিসের অস্তিত্ব টের পেল৷ ও কোথায় শুয়ে আছে? এখানে এলই বা কী করে? আস্তে আস্তে ওর সব মনে পড়ল৷ নরহরির জমিটা কেনার জন্য ও শহরে গিয়েছিল৷ রেজিস্ট্রি অফিসে সই-সাবুদের পর কাঁধের ঝোলায় দলিলটা ভরে ও আর নরহরি বাইরে বেরিয়ে এসেছিল৷ শুকনো হেসে নরহরি বলেছিল, 'খুব সস্তায় দাঁওটা মারলে রামেশ্বরদা৷ নেহাত একটু অসুবিধেয় পড়ে গেছি, টাকাটার খুব দরকার, তাই তো জমিটা বেচে দিলাম৷ না হলে এমন সোনা-ফলানো জমি কেউ বেচে?'
ভুরু কুঁচকে ও বলেছিল, 'এখন এ সব কথা তুলছ কেন? তোমাকে তো আমি ঠকাইনি৷ তুমি যা দাম চেয়েছিলে আমি তাই দিয়েছি৷ টাকাপয়সাও সব মিটিয়ে দিয়েছি৷ এখন আর ও সব কথা বলে লাভ কী?'
নরহরি কিছু বলার আগেই হঠাৎ ওর মাথাটা কেমন ঘুরে উঠেছিল৷ বুকে একটা ব্যথা . . . আস্তে আস্তে ব্যথাটা ছড়িয়ে পড়েছিল৷ হাঁটু ভেঙে রাস্তায় বসে পড়েছিল ও৷ অন্ধকারে তলিয়ে যেতে যেতে কানে ভেসে এসেছিল নরহরির ডাক, 'কী হল রামেশ্বরদা, কী হল, . . . ও রামেশ্বরদা . . . রামেশ্ব . . .'
এ বার ধড়মড়িয়ে উঠে বসল রামেশ্বর৷ না, দলিল দস্তাবেজ সমেত ঝোলাটা ওর কাঁধে নেই৷ আশেপাশেও পড়ে নেই৷ এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখল ও বসে আছে খোলা মাঠের মধ্যে৷ তার পরেই নিজের শরীরের দিকে তাকিয়ে ও চমকে উঠল . . . একী, ওর শরীরে এ সব কী? ও তো জীবনে ধুতি আর লুঙ্গি ছাড়া আর কিছু পরেনি৷ কিন্তু এখন ওর পরনে শহুরে বাবুদের মতো শার্ট, প্যান্ট, পায়ে জুতো! নিজের হাত দুটোর দিকে তাকিয়ে ও ভয়ংকর ভাবে চমকে উঠল . . . ওর হাত দুটো এত ফর্সা হয়ে গেল কী করে? নিজের অজান্তে হাত দুটো উঠে এল মুখে . . . আবার চমক! ওর গাল-ভরতি লম্বা দাড়িগুলো গেল কোথায়? মসৃণ গালের ওপর ওর হাত দুটো পিছলে গেল৷
আস্তে আস্তে রামেশ্বর উঠে বসল৷ পেছন ফিরতেই গাড়িটা ওর নজরে পড়ল৷ সাদা রঙের গাড়িটা উলটে পড়ে আছে৷ গাড়িটার দিকে ও অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল৷ রামেশ্বর বার কয়েক শহরে গেছে, কিন্তু এ ধরনের গাড়ি তো ও কখনো দেখেনি৷ গাড়িটার দিকে ভালো করে চোখ রেখে ও চিনতে পারল৷ বছর খানেক আগে হরিহরপুরের মেলায় বায়োস্কোপে ও এরকম গাড়ি দেখেছে৷ কিন্তু ও তো শুনেছিল এ ধরনের গাড়ি অনেক দূরের বড়ো বড়ো শহরে পাওয়া যায়৷ এ গাড়ি এখানে এল কোত্থেকে! গাড়ির ভেতরে বা চারপাশে কোনো মানুষজন তো নেই৷ আস্তে আস্তে গাড়িটার দিকে দু-পা এগোতেই সূর্যের আলোয় মাটিতে কী যেন একটা চকচক করে উঠল৷ একটা ছোট্ট আয়না৷ হাত বাড়িয়ে আয়নাটা তুলে নিল ও৷ আয়নাটা মুখের সামনে আনতেই ভয়ংকর রকম চমকে উঠল রামেশ্বর৷ শিথিল হাত থেকে আয়নাটা মাটিতে পড়ে গেল৷ আয়নায় ওটা কার মুখ? ভয়ে ভয়ে রামেশ্বর আবার আয়নাটা হাতে তুলল৷ নিজের মুখের সামনে আয়নাটা নিয়ে ও হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে রইল৷ ওর পঁয়ষট্টি বছরের একমাথা সাদা চুল আর গাল-ভরতি দাড়ি-সহ মুখটা বেমালুম বদলে গেছে! আয়নায় ভাসছে বছর তিরিশের এক ছোকরার মুখ!
ওলটানো গাড়িটার গায়ে হাত দিয়ে রামেশ্বর ঘুরে-ওঠা মাথাটা সামলাল৷ ঘটনাটা কী ঘটছে ও আদৌ বুঝতে পারছে না৷ ও কি পাগল হয়ে গেল নাকি? এ সব কী উলটোপালটা ঘটনা ঘটছে! এই জায়গাটাই বা কোথায়? এদিক-ওদিক তাকাতেই হাত কয়েক দূরে লম্বা টানা বাঁধটা ওর নজরে পড়ল৷ আস্তে আস্তে বাঁধের ওপরে উঠে আসার পর ওর ভুল ভাঙল৷ এটা বাঁধ নয়৷ একটা পাকা রাস্তা৷ রাস্তার ওপরে দাঁড়িয়ে এদিক-ওদিক তাকিয়ে ও থমকে গেল৷ ওই দূরের মন্দিরটা তো ওদের সোনাঝুরি গ্রামে ঢোকার মুখের সেই বুড়ো শিবের মন্দির৷ তার পাশের জঙ্গলমতো জায়গাটা তো বাঁশঝাড়৷ ও তো ওর গ্রামের কাছেই দাঁড়িয়ে আছে৷ কিন্তু এই পাকা রাস্তাটা এল কোথা থেকে? দু-দিন আগে শহরে যাবার সময়েও তো এই রাস্তাটা ছিল না৷ আর এদিক-ওদিকের জায়গাজমিগুলোও তো খুব একটা চেনা ঠেকছে না৷ তবে কি ও অসুস্থ হয়ে অনেকদিন কোথাও পড়ে ছিল? ও নিজেই নিজেকে চিনতে পারছে না, তবে ওর বাড়ির লোকেরাই বা ওকে কী করে চিনবে? ও যদি গ্রামে গিয়ে বলে ওর নাম রামেশ্বর দাস, তবে তো গ্রামবাসীরা ওকে বুজরুক বলে পিটিয়েই মেরে ফেলবে৷ কিন্তু একটা ধন্দ ওর কাটছে না৷ ও যদি অনেকদিন অসুস্থ হয়েই পড়ে থাকে তবে ওর ছেলে সুবোধ ওর খোঁজ করেনি কেন এতদিন? ওকে এই মাঠের মাঝখানেই বা কে ফেলে রেখে গেল?
কিছুক্ষণ ভাবনাচিন্তার পর ও হাঁটা দিল সোনাঝুরি গ্রামের দিকে৷ ওর ধন্দগুলো গ্রামে না গেলে কিছুতেই পরিষ্কার হবে না৷
বুড়ো শিবের মন্দিরকে পাশ কাটিয়ে বাঁশঝাড়টাকে ডাইনে রেখে কয়েক পা এগোতেই পরিচিত দৃশ্যগুলো চোখের সামনে ফুটে উঠল৷ কিন্তু সব চেনা চেনা জায়গাগুলোও যেন কেমন পালটে গেছে৷ নন্দীপুকুরের পাশের ঘোষালদের দোতলা দালানবাড়িটা যে তিনতলা হয়ে গেছে . . . মনসা তলার মাঠটাতে এত বাড়িঘর হল কবে! ফিঙের ডাক শুনে সে দিকে তাকিয়ে অবাক . . . বিজলির তার! গ্রামে কারেন্ট এসে গেছে৷ আশেপাশের লোকজন ওর দিকে তাকাচ্ছে৷ কাউকেই চিনতে পারল না রামেশ্বর৷ গ্রামের পরিচিত লোকেরা সব গেল কোথায়? জিজ্ঞাসু চোখগুলোকে এড়িয়ে ও দ্রুত পা চালাল বাড়ির দিকে৷
দূর থেকে বাড়ির চেহারা দেখে চমকে উঠল রামেশ্বর৷ এ কী হতশ্রী অবস্থা হয়েছে বাড়িটার! দেওয়ালের বাঁশের বেড়া জায়গায় জায়গায় ভেঙে গেছে, ছাদের অবস্থাও একই রকম৷ তুলসী মঞ্চটা অর্ধেক ভাঙা অবস্থায় পড়ে আছে৷ সামনের দাওয়ায় বাঁশের খুটিতে মাথা ঠেকিয়ে বসে আছে সুবোধ৷ খালি গা, পরনে ময়লা ধুতি৷ সুবোধ বলে চেঁচিয়ে ডাকতে গিয়েও থেমে গেল রামেশ্বর৷ না, না, এ তো সুবোধ নয়৷ চেহারায় মিল থাকলেও এ তো অন্য লোক৷ তা ছাড়া ও নিজের পরিচয়ই বা কী দেবে?
আস্তে আস্তে রামেশ্বর সামনে গিয়ে দাঁড়াতে লোকটা ধড়মড়িয়ে উঠে দাঁড়াল৷ অবাক চোখে তাকাল রামেশ্বরের দিকে৷ একটু দ্বিধাগ্রস্ত স্বরে রামেশ্বর বলল, 'ইয়ে সুবোধ . . . সুবোধ বাড়ি আছে?'
'বাবা তো বাড়ি নেই৷ শক্তিনগরে গেছে৷ কাল ফিরবে৷'
বাবা! ভীষণরকম চমকে উঠল রামেশ্বর! এ তাহলে সুবোধের ছেলে-তপন কিংবা রতন৷ কিন্তু দু-দিন আগে শহরে যাবার সময় ওদের বয়স ছিল ছয় আর চার৷ কিন্তু এই ছোকরার বয়স তো তিরিশ-পঁয়ত্রিশের কম নয়৷ তাহলে মাঝখানের এই তিরিশটা বছর গেল কোথায়?
ছেলেটি আবার বলল, 'কিন্তু আপনাকে তো ঠিক চিনতে পারলাম না৷'
সংবিৎ ফেরে রামেশ্বরের৷ দ্রুত চিন্তা করে নেয় ও৷ সুবোধ কালকের আগে ফিরছে না৷ পরিচয়ের ঝামেলাটা এড়ানো যাবে৷ কিন্তু তিরিশ বছরের হিসেবটা মেলাতে গেলে ওকে কিছুক্ষণ তো এখানে থাকতেই হবে, 'না, না, তুমি আমাকে চিনবে না৷ তোমার বাবা অবশ্য আমাকে খুব ভালো করে চেনে৷ তা তোমার নামটা কী? মানে তুমি তপন না রতন?'

অবিশ্বাসী দৃষ্টি নিয়ে তাকাল ছেলেটি, 'আমি তপন৷ কিন্তু বাবা আপনাকে . . . মানে . . .'
'হ্যাঁ হ্যাঁ৷ কয়েক বছর আগে আলাপ হয়েছিল৷ আমাদের খুব ঘনিষ্ঠ পরিচয় আছে৷'
'ও আচ্ছা৷' দোনোমনোভাবে একটা পিঁড়ি এগিয়ে দিয়ে তপন বলল, 'আপনি বসুন৷ আমি আসছি৷'
রামেশ্বর বসতে তপন ঘরের ভেতরে চলে গেল৷ এদিক-ওদিক তাকাল রামেশ্বর৷ সব চেনা দৃশ্য৷ দাওয়ার দিকে নজর ফেরাতে চোখে পড়ল ওর ঠিক হাতখানেক দূরে বেশ কিছু অদরকারি ভাঙা জিনিসপত্র ডাঁই করে রাখা৷ ওগুলোর ফাঁকে একটা চেনা জিনিসের একটুকরো চোখে পড়তেই দ্রুত হাতে ও সেটা টেনে নিল৷ এই তো সেই ছবিটা৷ হরিহরপুরের মেলাতে করকরে দুটো টাকা দিয়ে ছবিটা তুলিয়েছিল রামেশ্বর৷ তপন আর রতনকে দু-হাতে জড়িয়ে বসে আছে ও৷ এই তো ওর ধবধবে সাদা চুল, এক মুখ সাদাকালো গোঁফদাড়ি৷ এটাই তো ওর নিজের মুখ৷ তাহলে ওর মুখটা এভাবে পালটে গেল কীভাবে? ঘরের ভেতর থেকে মানুষজনের এদিকে আসার আওয়াজ পেয়েই রামেশ্বর দ্রুত ছবিটা শার্টের পকেটে ঢুকিয়ে ফেলল৷
ঘরের ভেতর থেকে তপন বেরিয়ে এল৷ ওর পেছনে আরেকটি ওরই বয়সি ছেলে৷ মুখের আদলে মনে হয় এ রতন৷ রতন তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে রামেশ্বরের দিকে তাকিয়ে বলল, 'বাবার কাছে কি আপনার কোনো দরকার আছে?'
'আরে না না, এই এদিক দিয়ে যাচ্ছিলাম, ভাবলাম একবার দেখা করে যাই৷ কিন্তু তোমাদের বাড়ি ঘরদোরের এ কী অবস্থা? তোমার ঠাকুরদার আমলে তো তোমাদের অবস্থা ভালোই ছিল৷'
রতন ছেলেটা বোধ হয় রামেশ্বরকে ঠিক বিশ্বাস করতে পারছে না, 'ঠাকুরদার সময়ের কথা আপনি জানলেন কী করে?'
'আরে তোমার বাবার কাছে কত গল্প শুনেছি৷ তোমার বাবা ঘরের বেড়া একটু ভাঙলেই সঙ্গেসঙ্গে ঠিক করে দিত৷ ঘরের ভেতরে নাকি কোনোদিন একফোঁটা জল পড়লেই পরের দিন চালের খড় পালটে দিত৷ চাষ করে যা পেত তাতে তো সংসার বেশ ভালোভাবেই চলত৷ তা ছাড়া আমি . . . ইয়ে মানে রামেশ্বরবাবু যে জমিটা কিনেছিলেন তাতে করে তো এতদিনে তোমাদের দালান তৈরি করা উচিত ছিল৷'
হো-হো করে হেসে উঠল রতন, 'কীসব উলটোপালটা বকছেন৷ ঠাকুরদা আবার কবে জমি কিনলেন৷ এ সব খবরও কি বাবা আপনাকে দিয়েছিল৷ নাঃ, বাবার দেখছি ভীমরতি ধরেছিল৷ শুনুন বাবু, আমাদের নিজের এক ছটাকও চাষের জমি নেই৷ অন্যের জমিতে জন খাটি৷ এ বছর কাজকর্মও তেমন নেই৷ তাই বাড়ি ঘরদোরের এই হাল হয়েছে৷'
'কেন?' অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল রামেশ্বর, 'বোসপুকুরের পশ্চিম দিকের সেই তিরিশ বিঘে জমিটার কী হল?'
'ওখানে তো আমাদের কোনো জমি নেই,' এ বার মুখ খুলল তপন, 'ওটা তো সুবলের জমি৷'
সেকী! চমকে উঠল রামেশ্বর৷ সুবল মানে তো নরহরির ছেলে৷ ও এতদিন কোথায় ছিল কে জানে? এই সুযোগে নরহরি জমি বিক্রির কথাটা বেমালুম চেপে গেছে৷ অথচ ও ওর সমস্ত জমানো টাকা দিয়ে জমিটা কিনেছিল৷ ভুল একটাই করেছিল, ও শহরে যাবার আগে কাউকেই জমি কেনার কথা বলে যায়নি৷
রতন বলল, 'ঠাকুরদা মারা গেছেন প্রায় তিরিশ বছর হল৷ কখনো তো শুনিনি ঠাকুরদা কোনো জমি কিনেছেন৷'
মারা গেছে! থরথর করে কেঁপে উঠল রামেশ্বর৷ বলছে কী এরা! ত্রিশ বছর আগে রামেশ্বর মারা গেছে! তাহলে ও কে? সংবিৎ ফিরতে ওর মনে হল রামেশ্বরের তো বেঁচে থাকারও কথা নয়৷ শহরে যাবার সময় ওর বয়স পঁয়ষট্টি পেরিয়ে গিয়েছিল৷ তার পরে তিরিশ বছরে তো ওর বয়স এক-শো ছুঁইছুঁই করবে৷ একটু আগে আয়নায় ও যে মুখ দেখেছে সেটা তো বছর পঁচিশ-তিরিশের এক ছোকরার মুখ৷ মাথা ঠান্ডা করে রামেশ্বর ভাবল, নিজেকে নিয়ে চিন্তাটা পরে করলেও চলবে৷ আগে জমির ব্যাপারটা ফয়সালা করতে হবে৷ উঠে দাঁড়িয়ে রামেশ্বর বলল, 'এখনই সুবলের বাড়ি চলো৷ ওই জমিটা তোমাদের৷ রামেশ্বর ওই জমিটা কিনেছিলেন নরহরির কাছ থেকে৷ চলো এখনই চলো৷'
অবাক হয়ে দু-ভাই ওর দিকে তাকাল৷ আমতা-আমতা করে রতন বলল, 'কিন্তু আপনি কী করে . . . মানে . . .'
ওকে থামিয়ে রামেশ্বর বলল, 'এখন আর কোনো কথা নয়৷ এসো আমার সঙ্গে৷ আচ্ছা দাঁড়াও৷ গ্রামের মাতব্বরদের ডাকো৷ দলবল বেঁধে না গেলে ও স্বীকার করতে চাইবে না৷'
রামেশ্বর যখন নরহরির বাড়ির সামনে দাঁড়াল তখন ওর সঙ্গে তপন আর রতন ছাড়াও আরও বেশ কিছু লোক ওর সঙ্গী হয়েছে৷ ঘটনাটা শুনে সকলেই দোটানার মধ্যে রয়েছে৷ কিন্তু রামেশ্বরের চেহারা, চালচলনে পুরো ব্যাপারটা কেউ উড়িয়েও দিতে পারছে না৷ রামেশ্বর নরহরির বাড়ির দিকে তাকাল৷ ভোল পালটে গেছে বাড়িটার৷ ছিল কুঁড়েঘর৷ এখন হয়েছে দোতলা দালান৷ পথে আসতে আসতে ও নরহরির মৃত্যু সংবাদও শুনে নিয়েছে৷ ঘাড় ফিরিয়ে রামেশ্বর বলল, 'ডাকো সুবলকে৷'
তপন ডাকল, 'সুবলদা, ও সুবলদা৷ বাড়ি আছ নাকি? একবার বাইরে এসো তো৷'
সুবল বাইরে আসতে তপন বলল, 'সুবলদা, এই শহরের বাবু কী যেন বলছে৷ ওই বোসপুকুরের পাশের জমিটার ব্যাপারে৷ ওটা নাকি ইয়ে মানে . . .'
ওকে থামিয়ে রামেশ্বর সরাসরি সুবলের দিকে তাকাল, 'ওই জমির দলিলটা নিয়ে এসো৷'
'মানে?' ভুরু কোঁচকাল সুবল৷
'মানে আর কিছুই নয়৷ তোমার বাবা আজ থেকে বছর ত্রিশেক আগে রামেশ্বরকে যে জমিটা বিক্রি করেছিলেন তার কাগজপত্র নিয়ে এসো৷'
কিছুক্ষণ হাঁ করে তাকিয়ে মুচকি হেসে সুবল বলল, 'কত্তা কি ওই বিক্রির সাক্ষী ছিলেন নাকি? কিন্তু কত্তা ত্রিশ বছর আগে কি আপনি জন্মেছিলেন?'
'থামো৷' ধমকে উঠল রামেশ্বর, 'ভালোয় ভালোয় কাগজপত্র দিয়ে দাও৷'
মুখের চেহারা পালটে গেল সুবলের৷ হিংস্র মুখে ও বলল, 'কীসের কাগজপত্র? জমি কি বিক্রি হয়েছিল নাকি? যান যান৷ শহরে থাকেন ওখানেই যান৷ গেরামের মামলায় নাক গলাতে আসবেন না৷'
'ও আচ্ছা,' ঘুরে দাঁড়িয়ে রামেশ্বর গ্রামের মাতব্বরদের দিকে তাকাল, 'এ সোজা রাস্তায় দলিল দেবে না৷ তবে তপন চিন্তা কোরো না৷ শহরে উকিল বীরু রায়ের কাছে এই জমির দলিলপত্র আছে৷ ওর কাছে চলে যাও৷ উনি যদি বেঁচে নাও থাকেন ওর ছেলেও তো উকিল৷ বাপের কাজকর্ম ওই দেখত৷ ওর কাছে সব পাবে৷ তবে হ্যাঁ' . . . এ বার গলা চড়িয়ে রামেশ্বর বলল, 'এতদিন সুবল জমি বিক্রির কথা চেপে গিয়েছিল৷ জঘন্য অপরাধ করেছে ও৷ কাগজপত্র নিয়ে আসার পর ওকে আমি চোদ্দো বছর জেলের ঘানি ঘুরিয়ে ছাড়ব৷ তবে এখনও সময় আছে, সুবল যদি কাগজপত্র দিয়ে দেয় তবে সব অভিযোগ আমরা তুলে নেব৷ কী বল তপন? আপনারা গ্রামের বিজ্ঞজনেরা আছেন৷ আপনারা দেখুন বুঝিয়ে কিছু করতে পারেন কি না৷'
মৃদু গুঞ্জন শুরু হল৷ রামেশ্বরের গলার স্বরে কিছু একটা ছিল যাতে গ্রামবাসীরা সকলেই ব্যাপারটা সত্যি বলে ধরে নিল৷ জেলের ঘানি টানার হুমকিটাও সুবলকে কিছুটা ঘায়েল করেছে৷ রামেশ্বর চুপ করে একপাশে দাঁড়িয়ে আছে৷ বেশ কিছুক্ষণ দু-পক্ষের কথাবার্তার পরে সুবল ভেঙে পড়ল৷ স্বীকার করল জমি বিক্রির কথা৷ মাথা নীচু করে ঘর থেকে নিয়ে এল দলিলটা৷
বেলা পড়ে এসেছে৷ অনেক কষ্টে তপন-রতনের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে রামেশ্বর আস্তে আস্তে গ্রামের বাইরে বেরিয়ে এল৷ দুপুর থেকেই তপনরা ওকে নিয়ে উচ্ছ্বাসে মেতে রয়েছে৷ ওদের কাছে রামেশ্বর যেন আকাশ থেকে নেমে আসা এক দেবদূত৷ কিন্তু রামেশ্বর নিজে কিছুতেই শান্ত হতে পারছে না৷ নিজের পরিচয় নিয়ে ওর ধন্দটা কাটছে না৷ হাঁটতে হাঁটতে ওলটানো গাড়িটার সামনে এসে ও থমকে দাঁড়াল৷ ও কে? কোথা থেকে এসেছে? এখন যাবেই বা কোথায়? এই গাড়িটার সঙ্গে কি ওর কোনো সম্পর্ক আছে?
পিছনে একটা পায়ের শব্দে ঘুরে দাঁড়িয়ে চমকে উঠল রামেশ্বর৷ কয়েক হাত দূরে একটা লাঠি হাতে এগিয়ে আসছে সুবল৷ রামেশ্বর তাকাতেই একটা অশ্রাব্য গালাগাল দিয়ে ও ছুটে এল৷ ধারেকাছে কেউ নেই৷ প্রাণ বাঁচাতে রামেশ্বরও ছুট দিল৷
পাকা রাস্তাটার ওপরে উঠে রামেশ্বর আর রেহাই পেল না৷ সুবলের লাঠিটা সজোরে আঘাত করল ওর মাথায়৷ হাঁটু ভেঙে আস্তে আস্তে ওর শরীরটা শুয়ে পড়ল রাস্তার ওপরে৷
রজতের কথা
চোখের সামনে ঝাপসা কয়েকটা মুখ৷ আস্তে আস্তে দৃশ্যগুলি সব পরিষ্কার হয়ে এল৷ উদবিগ্ন দৃষ্টিতে রজতের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন ওর বাবা, মা, দুই বন্ধু দীপক আর সুহাস৷ রজত চোখ খুলতেই দীপক বলল, 'থ্যাংক গড৷ তা অ্যাকসিডেন্ট করলি কী করে?'
এদিক-ওদিক তাকিয়ে রজত বলল, 'আমি কোথায়?'
রজতের বাবা বললেন, 'তোকে নার্সিংহোমে ভরতি করা হয়েছে৷ সোনাঝুরি বলে একটা গ্রামের কাছে তোর গাড়িটা উলটে গিয়েছিল৷ গাড়িটা রাস্তা থেকে নীচে পড়েছিল৷ তুই ঠিক রাস্তার ওপরে৷ তোর মাথায় চোট লেগেছে শরীরের আর কোথাও বিশেষ কিছু হয়নি৷ এক ট্রাক ড্রাইভার তোকে রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখে তুলে এনেছিল৷'
আস্তে আস্তে রজতের সব মনে পড়ল৷ একটা মোড় . . . লরি ছুটে আসছে . . . সরু রাস্তা . . . গাড়িটা নামিয়ে দিল ঢালু জমিতে . . . তার পর, তার পর . . . তার পর সব অন্ধকার৷ ও বলল, 'হ্যাঁ, মনে পড়েছে সব৷'
ওর মা দু-হাতে ওকে জড়িয়ে ধরে বললেন, 'কতবার তোকে নিষেধ করেছিলাম এভাবে একা লং ড্রাইভে না যাবার জন্য, তুই তো শুনলি না কোনো কথা৷'
মৃদু হেসে রজত বলল, 'যা বলেছ৷ শখ আমার মিটে গেছে৷ সত্যি ব্যাপারটাতে বড্ড রিস্ক থেকে যায়৷ এবার বেরোলে দলবল নিয়েই বেরোব৷'
অন্যরা কেউ কোনো কথা বলার আগেই ঘরে ঢুকল একজন নার্স, 'আপনারা এখন যান৷ ওঁকে রেস্ট নিতে দিন৷'
ঘর ফাঁকা৷ পাশ ফিরতে রজতের নজরে পড়ল বেডের পাশের ছোট্ট টেবিলে ওর মানিব্যাগ৷ কিন্তু মানিব্যাগের নীচে ওটা কী? হাত বাড়িয়ে টেনে নিল রজত৷ একটা বহু পুরোনো ছবি৷ ধবধবে সাদা চুল, এক মুখ সাদাকালো দাড়ি-সহ এক বৃদ্ধ দুটো বাচ্চা ছেলেকে জড়িয়ে ধরে হাসিহাসি মুখে বসে আছে৷
অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল রজত৷ এ কার ছবি? ওর মানিব্যাগের সঙ্গেই বা এই ছবিটা কেন রয়েছে?
শারদীয়া ১৪০৩
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন