বটুকেশ্বরের আবির্ভাব

অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়

সকাল থেকেই দিনটা ছাইরঙা স্যাঁতসেতে একটা চাদর জড়িয়ে যেন ঢুলছে৷ চৈত্র মাসের মাঝামাঝিতেই মনে হচ্ছে আষাঢ়ে বর্ষা৷ সন্ধ্যের দিকে আকাশে মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকাতেও শুরু করেছে৷ আর তার সঙ্গে ভারসাম্য রাখতেই হয়তো মানুষের তৈরি বিদ্যুৎ ঝপ করে বিদায় নিয়ে সারা বাড়ি একেবারে অন্ধকারে ভরিয়ে দিল৷

মাথা থেকে পা পর্যন্ত বিরক্তি নিয়ে সৈকত নন্দী কপালটা টিপে ধরে ইজি চেয়ারে গা এলিয়ে শুয়ে থাকেন৷ সকালে একটু ভেজার দরুন মাথাটা টিপটিপ করছে৷ এসময় একটু চা খেতে পারলে ভালো হত৷ তাঁর স্ত্রী ছেলেকে নিয়ে ভবানীপুরে বাপের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছেন৷ কাল ফিরবেন৷ বাড়িতে কাজের লোক নিবারণ আছে, অবশ্য নামে মাত্র৷ তাল বুঝে সেও অনেকক্ষণ আগে বেরিয়েছে, কাকার সঙ্গে একটু দেখা করেই চলে আসবে বলে৷ বলেছে, এক ঘণ্টার মধ্যেই ফিরবে৷ অবশ্য তার সময়ের সঙ্গে সব সময়ই দু-তিন ঘণ্টা যোগ করে রেখে দেন সৈকত নন্দী-বিশেষত তার বউদিমণি বাড়ি না থাকলে৷ জানে, দাদাবাবু একটু ধমকালে, চা করবে কি না জিজ্ঞেস করলেই দাদাবাবুর রাগ জল৷ এখন নিজে উঠে চা তৈরি করা যায়৷ কিন্তু তাতে চা খাওয়ার মেজাজটাই নষ্ট হয়ে যায়৷ তা ছাড়া এই অন্ধকারে খুটখুট করে ওসব করার চেয়ে চুপচাপ শুয়ে কোনো গল্পের প্লট ভাবা অনেক ভালো৷ 'মিহিদানা' পত্রিকার সম্পাদক দু-সপ্তাহের মধ্যে একটা ভিন্ন স্বাদের গল্প দিতে বলেছেন৷ সৈকত নন্দী অবাক হয়ে ভাবেন, সম্পাদকরা কি গল্পগুলো চেটে চেটে দেখেন?

ভিন্ন স্বাদ কেন, অভিন্ন স্বাদের কোনো গল্পও মনে আসছে না৷ অথচ খুব কাজের ভিড়েও এমনকী ভিড়-ভরতি বাসে চলতে চলতেও কত গল্পের বীজ শিমুলের বীজের মতো বাতাসে ভাসতে ভাসতে তার মাথায় এসে আটকে যায়৷ এখন শুধু কাগজের জমির ওপর তাকে বুনে গোড়ায় কালি ঢাললেই গল্পের গাছ গজিয়ে ওঠে শাখাপাতা নিয়ে অথচ আজ মাথাটা যেন সাহারা মরুভূমি৷

সৈকত নন্দী ভাবেন, এসময় হঠাৎ কোনো বন্ধু যদি এসে হাজির হয়, মন্দ হয় না৷ কিছুক্ষণ আড্ডা দিলেও শরীর আর মনের এই ম্যাজমেজে ভাবটা দূর হয়ে যায়৷ তা তো আসবে না৷ যখন লেখা নিয়ে বসেছি, তখন ওরা কেউ-না-কেউ এসে হাজির হবে৷ আর ওঠারও নাম করবে না৷ বন্ধুদের ওপর তার মনটা বিরক্তিতে ভরে যায়৷

চুপচাপ অন্ধকারে বসে থাকার একঘেয়েমিটা কাটানোর জন্যেই সৈকত নন্দী মোমবাতি জ্বাললেন৷ কলমের ডগায় একটা লাইনও আসবে না জেনেও কাগজ আর কলম নিয়ে বসলেন৷ ঠিক এই সময়ে দরজায় টোকা পড়ল৷

অচেনা করাঘাত৷ চেনাজানা সকলেরই টোকা দেওয়ার শব্দ সৈকত নন্দীর চেনা৷ ঠিক তাদের পায়ের শব্দের মতন৷ তাই তিনি একটু ইতস্তত করলেন দরজা খুলতে৷ দিনকাল ভালো যাচ্ছে না, তায় আবার লোডশেডিং-এর অন্ধকার৷ দরজায় বসানো পরকলায় চোখ রেখে বাইরেটা দেখার চেষ্টা করলেন৷ আবছা আলোয় যে চেহারাটা দেখলেন, সেটা নেহাত গোবেচারা এক বৃদ্ধের৷ ধুতির ওপর ফুলহাতা সাদা শার্ট পরা, ডান হাতে প্রয়োজনহীন একটা বেতের হাতলওয়ালা সেকেলে পুরোনো ছাতা৷ সৈকত নন্দী দরজা খুললেন৷

এবার কাছের থেকে ভদ্রলোককে দেখে তাঁর একটু চেনা চেনা মনে হল৷ কোথায় দেখেছেন যেন এঁকে৷ শীর্ণ চেহারা, নাকের নীচে টুথব্রাশের মতন কাঁচাপাকা গোঁফ৷ হয়তো পাড়াতেই দেখেছেন৷ কিংবা ট্রামে বাসে, কি বাজারে৷ দরজা খুলে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে দাঁড়াতেই ভদ্রলোক ছাতাসুদ্ধ হাত তুলে নমস্কার করে বললেন, 'আমি সৈকতবাবুর সঙ্গে একটু দেখা করতে এসেছি৷ তিনি কি-'

সৈকত নন্দী একটু অবাক হয়ে ভদ্রলোকের দিকে চাইলেন৷ কী উদ্দেশ্যে এসেছেন আন্দাজ করার চেষ্টা করলেন৷ আশা করেছিলেন, কোনো বন্ধুবান্ধব এলে একটু হালকা গল্পগুজব করে অন্ধকার সন্ধ্যেটা কাটিয়ে দেবেন-তা না-ইনি আবার কী জন্যে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চান, কে জানে! মাথাটা যেন আবার দপদপ করতে লাগল তাঁর৷ তিনি অপ্রসন্নভাবেই বললেন, 'আমি সৈকত নন্দী৷ কিন্তু আপনাকে তো-'

'আমার নাম বটুকেশ্বর বটব্যাল৷ আপনি 'মিহিদানা' পত্রিকায় একটা গল্প লিখেছেন-'

সৈকত নন্দী চমকে উঠলেন৷ এও কি বাস্তবে সম্ভব! তিনি তো স্বপ্ন দেখছেন না! এখন তিনি কিছুটা আন্দাজ করতে পারলেন, ভদ্রলোকের চেহারাটা এত চেনা চেনা লাগছে কেন৷ গত সংখ্যার 'মিহিদানা' পত্রিকায় তাঁর একটা গল্প বেরিয়েছিল-'বটুকেশ্বর বটব্যালের ব্যাবসা৷' তাতে আর্টিস্ট দেবল দেবের আঁকা যে ছবি ছিল, তার সঙ্গে ভদ্রলোকের চেহারায় আশ্চর্য মিল৷ কিন্তু গল্পের চরিত্র এরকম জ্যান্ত চেহারা নিয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, এটা বিশ্বাস করা অসম্ভব৷ তাই বোধ হয় তিনি ফ্যালফ্যাল করে চেয়েই থাকেন ভদ্রলোকের দিকে৷

Cov154

বটুকেশ্বরবাবু তাঁর অবস্থাটা বোধ হয় বুঝতে পারলেন৷ বললেন, 'আপনার গল্পের চরিত্রের সঙ্গে আমার নামের মিল হওয়াতে আমার অবস্থাটা কী হয়েছে, সেটা জানাতেই আমি এসেছি৷ একটু যদি বসতে-'

যন্ত্রচালিতের মতো সৈকত নন্দী বটুকেশ্বরবাবুকে ভেতরে ডেকে নিয়ে এলেন৷ বিবর্ণ ছাতাটাকে কোলের ওপর তুলে বটুকেশ্বরবাবু চেয়ারে বসলেন৷ তারপর বললেন, 'আমাকে নিয়ে কেন এরকম গল্প লিখলেন, বলুন তো? তার ওপরে আবার আমার ছবিটা৷ জানেন কি আপনি, এর জন্যে আমার জীবনটা কীরকম অসহনীয় হয়ে উঠেছে! পাড়ার ছোটো ছোটো ছেলেরা পর্যন্ত রাস্তায় আমাকে দেখলে 'তেলাপোকা' 'তেলাপোকা' বলে চেঁচিয়ে ওঠে৷ বড়োরা পাশ দিয়ে যেতে যেতে আমাকে শুনিয়ে সরষের তেলের দামের আলোচনা করে৷ আমি প্রথমে বুঝতে পারতাম না৷ পরে একজন 'মিহিদানা' পত্রিকাটি আমাকে দেখায়৷ তখন আমি সব জানতে পারি৷ বলুন, আমি আপনার কাছে কী এমন অপরাধ করেছি যে আপনি আমাকে এভাবে-'

কান্নায় যেন ভদ্রলোকের গলা রুদ্ধ হয়ে আসে৷ জামার হাতাটা দু-চোখের ওপর বুলিয়ে নেন তিনি৷

সৈকত নন্দী হতভম্ব হয়ে বটুকেশ্বরবাবুর দিকে তাকিয়ে থাকেন৷ সত্যিই তিনি 'মিহিদানা' পত্রিকায় এরকম একটা গল্প লিখেছেন৷ আজগুবি ধরনের গল্প৷ বটুকেশ্বর বটব্যাল নামে একজন লোভী ব্যাবসাদারের গল্প৷ তার একটা কোক কয়লার দোকান ছিল৷ কিন্তু সে নানা জিনিস মজুত করত৷ যখন জিনিসটা বাজারে পাওয়া যেত না, সেই সময় বেশি দামে বিক্রি করে মুনাফা করত৷ কিছুকালের মধ্যে সরষের তেলের সংকট দেখা দেবে, এরকম কথা শুনে সে সরষের তেল জমা করছিল৷ যে ঘরে সরষের তেলের টিনগুলো জমিয়ে রাখত, যখের ধনের মতো পাহারা দিতে সেই ঘরেই সে রাত্তিরে শুত৷ একদিন রাত্তিরে তেলের টিনগুলো হুড়মুড় করে বটুকেশ্বরের ওপর পড়ে গিয়ে তাকে তেলে চুবিয়ে দিল ঘুমন্ত অবস্থায়৷ পরদিন ঘরের দরজা খুলতে না দেখে পাড়ার লোক তার সেই ভাঁড়ার ঘরের দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকল৷ কিন্তু বটুকেশ্বরকে দেখতে পেল না৷ শুধু দেখল, একটা বড়ো সাইজের আরশোলা তেলের ওপর সাঁতার কাঁটছে৷ আরশোলাটা একটু অদ্ভুত ধরনের৷ তার দুটো শুঁড় ছাড়াও খোঁচাখোঁচা সাদাকালো ছোটো ছোটো শুঁড়ও ছিল-ঠিক যেন গোঁফ৷

সেই বটুকেশ্বর বটব্যাল নামে সত্যিই যে কোনো লোক থাকতে পারে, সেটা সৈকত নন্দীর কল্পনাতেও আসেনি৷ অস্ফুটস্বরে সেই কথাটাই বললেন তিনি৷

বটুকেশ্বরবাবু ক্ষোভের সঙ্গে বললেন, 'অন্য কোনো সাধারণ নামও তো আপনি দিতে পারতেন৷ যেমন, এই ধরুন, বিশ্বনাথ দত্ত৷ অথবা সুনীল দাশ৷ কিংবা অনিল ব্যানার্জি৷ এরকম নামে অনেক লোক থাকতে পারে৷ কিন্তু এত থাকতে আমার নামটাই আপনি ব্যবহার করলেন কেন? তার ওপর আমারই চেহারার ছবি?'

সৈকত নন্দী এবার মরিয়া হয়ে বলে উঠলেন, 'দেখুন, বটুকেশ্বর বটব্যাল নামে যে সত্যিই কেউ আছে, আমিও তা জানতাম না৷ আপনাকে আমি চিনতামই না৷ তাহলে নিশ্চয়ই গল্পে এ নাম ব্যবহার করতাম না৷ আমরা লেখকরা অনেক সময় এমন নাম ব্যবহার করতে চাই, যাতে সত্যিকারের কোনো লোকের সঙ্গে নাম না মিলে যায়৷ অবশ্য পদবিসুদ্ধ নাম ব্যবহার করার সময়৷ কিন্তু এরকম উলটো বিপত্তি যে হবে, কেমন করে জানব৷ অবশ্য হওয়া অসম্ভব নয়৷ এই দেখুন না, আমার নাম সৈকত নন্দী৷ খুব কমন নাম নয়৷ তবুও সম্প্রতি এই নামেই একজন তরুণ গায়ক উঠেছেন৷ তার ফলে, গান না গেয়েই আমাকে চেনা অচেনা লোকের কাছে আমার অনুষ্ঠান সম্বন্ধে নানা কৈফিয়ত দিতে হচ্ছে৷ আমি জানি না, সেই গায়ক সৈকত নন্দীর কাছে কেউ গল্প চেয়েছে কি না৷ আর গল্পের ছবিটার জন্যে আমি তো দায়ী নই৷ যে শিল্পী এঁকেছেন, তিনি বোধ হয় নিজের মন থেকেই এঁকেছেন৷ নামটা শুনে হয়তো তাঁর মনে এরকম চেহারা ভেসে উঠেছিল৷ এরকম হয় অনেক সময়৷ যেমন, ভোম্বল বা হাবুল নাম শুনলেই একটা মোটাসোটা ছেলের চেহারা মনে ভেসে ওঠে৷ যাই হোক, আমার গল্পগুলো যখন বই করে প্রকাশ করব, তখন নামটা নিশ্চয়ই বদলে দেব৷'

প্রসঙ্গটা যথাসম্ভব হালকা করার চেষ্টা করলেন সৈকত নন্দী৷ কিন্তু বটুকেশ্বর ভুলবার নন৷ খিঁচিয়ে উঠে বললেন, 'আপনার বই ক-টা বিক্রি হয় মশাই? কিন্তু 'মিহিদানা' পত্রিকা যে ছোটো-বড়ো সবাই পড়ে৷ আপনি আমার বারোটা বাজিয়ে দিয়ে এখন বলছেন, নাম পালটাবেন৷ এ যে সেই ডি.এল. রায়ের নাটকের মতন আমাকে হত্যা করে তারপর আমার মূর্তি গড়িয়ে পুজো করতে চাইছেন৷ যদি খবরের কাগজে বটুকেশ্বর বটব্যাল নামে কারও আত্মহত্যার খবর পড়েন, তবে জানবেন তার মৃত্যুর জন্যে আপনিই দায়ী৷ আমি উঠলাম-'

সৈকত নন্দী আরও কিছু বলার জন্যে হাত বাড়িয়ে বটুকেশ্বরকে আটকাতে চাইলেন৷ কিন্তু তাঁর মুখ দিয়ে একটা কথাও বেরোল না৷ তার আগেই বটুকেশ্বর ছাতাটা বগলে করে হনহন করে বেরিয়ে গেলেন৷

কিছুক্ষণ মাথায় হাত দিয়ে চুপচাপ বসে থাকলেন সৈকত নন্দী৷ ভয়, বিস্ময় আর অস্বস্তি তাঁকে ঘিরে থাকে৷ কপালের দপদপানিটা যেন সরে মাথার মধ্যে গিয়ে ঝিঁঝিঁ পোকার মতন শব্দ করে চলেছে৷ এমন সময় ঝপ করে আলো চলে এল৷

তাঁর মনে হল, হয়তো তিনি তন্দ্রার মধ্যে কোনো অদ্ভুত স্বপ্ন দেখে উঠলেন৷ এরকম আজগুবি ব্যাপার কোনো লেখকের ভাগ্যে ঘটেছে বলে তাঁর জানা নেই৷ কিন্তু ওই তো, বটুকেশ্বরের ভিজে চটি রাখার ছাপটা দরজার কোণে৷ এখনও শুকোয়নি৷

কিছুক্ষণের মধ্যে নিবারণ ফিরে এল৷ একগাল হেসে তার দেরিতে আসার কৈফিয়ত দিতে বসল৷ কিন্তু দাদাবাবুর কাছ থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে একটু অবাক হল৷ একটু ইতস্তত করে বলল, 'দাদাবাবু, চায়ের জল চাপিয়ে দিয়েছি৷ আর-বাড়ির সামনের দোকানে বেগুনি ভাজছে৷ গোটা কয়েক নিয়ে আসব কি?'

অস্বস্তির মধ্যেও সৈকত নন্দী হেসে ফেলেন৷ লেখাপড়া শিখলে নিবারণ যে বড়ো মনস্তত্ববিদ হত, এবিষয়ে সন্দেহ নেই৷

গরম গরম বেগুনির সঙ্গে চা খেতে খেতে তিনি কিছুক্ষণের জন্যে বটুকেশ্বর প্রসঙ্গ মন থেকে দূরে সরিয়ে দিলেন৷ টেবিলের ওপরেই বেগুনির ঠোঙাটা পড়ে ছিল৷ সেদিকে নজর পড়তেই আরেক চমক খেলেন সৈকত নন্দী৷ 'মিহিদানা' পত্রিকার যে পাতাটা ছিঁড়ে ঠোঙা বানানো হয়েছে, তাতে তাঁরই গল্প-বটুকেশ্বর বটব্যালের ব্যাবসা৷ তিনি তুলে নিয়ে পড়তে লাগলেন-'এদিককার ফ্ল্যাটগুলোর মেন সুইচ এক জায়গায় পাশাপাশি৷ বটুকেশ্বর চুপিচুপি গিয়ে সবগুলো অফ করে দিল৷ সবাই ভাবল, লোড শেডিং৷ তখন বটুকেশ্বর সেই অন্ধকারের মধ্যে তেলের টিন-ভরতি বস্তাগুলো রিকশা থেকে নামাতে লাগল৷ যারা দেখল, তারা ভাবল, কোক কয়লার বস্তা৷ বটুকেশ্বরের ধূম্রহীন কয়লার গুলের ব্যাবসা আছে, সেটা তো কারও অজানা নয়৷'

নিজের লেখার এরকম ঠোঙা পরিণতি লাভ, এটা যেকোনো লেখকের পক্ষেই মনোকষ্টের কারণ৷ কিন্তু সৈকত নন্দীর মনকে যা অধিকার করল, সেটা সেই ভীতি, বিস্ময় আর অস্বস্তি মেশানো এক অসহ্য অবস্থা৷ তিনি আরও অবাক হলেন, যখন দেখলেন, দেবল দেবের আঁকা বটুকেশ্বর ছবিটা বেগুনির তেলে জবজবে হয়ে গিয়েছে৷

সারাটা রাত সেই অস্বস্তির মধ্যে কাটালেন সৈকত নন্দী৷ ঘুম এলেই একই দুঃস্বপ্ন যেন বারবার দেখে জেগে ওঠেন৷ ছাতাবগলে সেই লোকটা তাঁর দিকে আঙুল উঁচিয়ে বলছে, 'তুমিই-তুমিই দায়ী!'

সকালে সেই ম্যাজমেজে অবসাদে ভরা শরীরটা নিয়েই তিনি বিছানা থেকে উঠলেন৷ নিবারণ চা করে এনে দিল৷ চায়ের কাপ হাতে নিয়ে তিনি বারবার জানলার দিকে তাকাতে লাগলেন৷ ওই জানলা দিয়েই সকালের কাগজটা ধপাস করে ফেলে দিয়ে যায়৷

কোন খবরের জন্যে তিনি এমন করে কাগজের জন্যে অপেক্ষা করছেন? নিজের ওপরেই রেগে যান সৈকত নন্দী৷ কে না কে এক বটুকেশ্বর বটব্যাল কবে আত্মহত্যা করবে-তার জন্যে তাঁর নিজের ঘুম থাকবে না! ভাবলেন, কাগজ এলেও অনেকক্ষণ তিনি সেটা দেখবেনই না৷ এভাবে মনের জোর বাড়াতে তিনি নিজেই শিখেছিলেন৷ একবার তিনি বাজি রেখে সাত দিন তাঁর পরমপ্রিয় পানীয় চা না খেয়ে ছিলেন৷ ধূমায়িত সুরভিত চায়ের পেয়ালা সামনে রেখেও বন্ধুরা তাঁকে বাজি হারাতে পারেনি৷ এই জোর নিয়ে আজ তিনি বটুকেশ্বরকে মন থেকে তাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলেন৷ আর তাঁর অস্বস্তির কারণই বা কী? বটুকেশ্বর তার আত্মহত্যার কারণ লিখে যাবে তাঁর নাম জড়িয়ে? লোকে জিনিসটা কাকতালীয় বলেই বিশ্বাস করবে৷ আর তা ছাড়া ছবিটা এঁকেছে আরেকজন৷ নামের মিলের কথা ভাবলে আর গল্প লেখা যায় না৷

আবার মনে হল, এতই যখন মিল হয়েছে লোকটার সঙ্গে তখন লোকটাও যে গল্পের বটুকেশ্বরের মতন পাজি নয়, তার ঠিক কী? ওরকম লোকের এমনিতেই আত্মহত্যা করা উচিত৷ এসব ভেবে হঠাৎ তাঁর মনটা বেশ হালকা মনে হল৷

নিবারণ দুধের ডিপো থেকে দুধ আনতে গিয়েছিল৷ দুধের সঙ্গে একটা খামও দিয়ে গেল৷ বলল, 'দাদাবাবু, আপনার চিঠি৷ বিশুদা দিলেন৷'

'বিশুদা কে?' তাঁর প্রশ্নে অবাক হয়ে নিবারণ বলল, 'বিশুদাকে চেনেন না? ওই যে ওপারের গোলাপি বাড়িতে থাকেন৷ কত বইয়ে পাট করেন৷ 'বর হেসে কয় ঠাট্টা' বইয়ে পুরুত ঠাকুর সেজেছিলেন৷'

'বই' মানে সিনেমা, 'পাট করা' মানে অভিনয় করা৷ নিবারণ ওভাবেই কথা বলে৷

নিবারণ আবার হেসে বলল, 'বাঃ, উনিই তো কাল আপনার জন্যে বেগুনি ভাজা কিনে নিয়ে আসতে বলেছিলেন৷ নিজের হাতে ঠোঙাতে ভরে দিলেন৷ এত নাম, তবুও কেমন মিশুকে৷ একটুও দেমাক নেই৷ আপনাকেও খুব শ্রদ্ধা করেন৷ আপনার গল্প পড়েন৷'

তাঁর ঢাকটা নিবারণই পিটিয়েছে তার বিশুদার কাছে, সৈকত নন্দী সেটা বুঝতে পারলেন৷ চিঠিটা নিশ্চয় কোনো সভা-সমিতি-সম্মেলন-সভাপতি সংক্রান্ত৷ এরকম চিঠি পেতে সৈকত নন্দী অভ্যস্থ৷ তিনি নিরুৎসাহের সঙ্গে খামটা খুললেন৷

কিন্তু সম্বোধনটা দেখেই অবাক হলেন৷ সেই বিস্ময় নিয়েই পড়ে চলেন চিঠিটা-

ভাই সৈকত,

চিনতে পারছিস না বোধ হয়৷ রাস্তাঘাটে কত দেখা হয়, তবু চিনতে পারিস না, বুঝতে পারি৷ কাছ থেকে অনেকক্ষণ দেখেও যে চিনতে পারবি না, সেটা বুঝতে পারিনি৷

হরচন্দ্র হাইস্কুলের বিশেকে মনে পড়ে? নিশ্চয় মনে মনে পড়বে৷ আমার সেই অঙ্ক না করে আনা-তারপরে শাস্তি পাওয়ার ভয়ে পেটের ব্যথায় বেঞ্চের ওপর ছটফট করা৷ হেডমাস্টার মশাই পর্যন্ত ভয় পেয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন অঙ্কের ক্লাসের আগেই৷ তোর ওপরেই ভার পড়েছিল আমাকে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার৷ অর্ধেক রাস্তায় এসেই আমাকে তড়াক করে সোজা হয়ে হি-হি করে হাসতে দেখে তোর কী রাগ! ভয় দেখিয়েছিলি, বলে দিবি৷ বলিসনি৷ সেজন্যে সেদিন তোকে ধন্যবাদ দিয়েছিলাম৷ আজ মনে হয়, বললেই ভালো করতিস৷ তাহলে তখনকার মতন শত্রু হলেও আজ তুই আমার সত্যিকারের বন্ধু হতিস৷ আমি তাহলে মানুষ হতে পারতাম৷ অভিনয় ছোটোবেলা থেকে জানি৷ কিন্তু তার সঙ্গে শিক্ষা যোগ হলে হয়তো আমি অভিনয় জগতে বড়ো হতে পারতাম৷

তোর নাম শুনেই খটকা লেগেছিল৷ দেখে নিশ্চিত হলাম৷ তোর কপালের মাঝামাঝি যে আঁচিলটা ছিল সেটা তো আর সামনের চুলের মতো ঝরে যায়নি৷

একটা ব্যাপার লক্ষ করলাম৷ তুই বড়ো অসামাজিক৷ দু-বছর এ-পাড়ায় এসে অবধি শুধু ঘর আর অফিস, অফিস আর ঘর৷ একদিন রাস্তায় তোর পথ আগলে দাঁড়ালেও তুই আমার দিকে না তাকিয়েই পাশ কাটিয়ে চলে গেলি৷ আমিও কাঁকড়া বিছে৷ একটা মতলব ভাঁজলাম৷

গতকালের তারিখটা এ কাজে খুবই শুভ দিন৷ তোর লেখক জীবনের গল্প নিবারণের কাছে আগেই শুনেছিলাম৷ তার আগেও অবশ্য তোর গল্প অনেক পড়েছি৷ তবে জানতাম না, তুই-ই এই সৈকত নন্দী কি না৷

দেবলের সঙ্গে আমার আলাপ আছে৷ ওর হাতে তোর গল্পের পাণ্ডুলিপি দেখে জিজ্ঞেস করতেই শুনলাম, 'মিহিদানা' পত্রিকার জন্যে গল্পটার ইলাসট্রেশন দেবলই করবে৷ ব্যাস, একটা বুদ্ধি এল মাথায়৷ আমার সামনে বসে দেবল স্কেচ করল৷ তবে তোকে এ ব্যাপারে একটু আঁচও দিতে দেবলকে বারণ করেছিলাম৷

তোর চাকর নিবারণ আমাকে খুব ভক্তিছেদ্দা করে৷ ওর কাছেই জানলাম এপ্রিলস্য প্রথম দিবসের এই শুভ দিনটিতে বউঠান বাপের বাড়ি থাকবেন৷ নিবারণও কোথায় বেরোবে৷ আর ও তো অভিমন্যুর উলটো৷ বেরোতেই জানে, বাড়িতে ঢুকতে জানে না৷ কাজেই আমার সুবিধা হল৷

আমি বটুকেশ্বর সাজলাম৷ মেকআপ অবশ্য বেশি নিতে হয়নি৷ চুলে একটু সাদা ক্রীম, নাকের নীচে গোঁফ, হাতে ছাতা৷ দেবল তো আর সব কাজ করেই রেখেছিল৷

তোর সঙ্গে বটুকেশ্বরের সাক্ষাতের পরে বেগুনিটি আমিই নিবারণকে ঠোঙাতে ভরে দিই৷ আমার বাড়ি থেকে আনা ঠোঙা৷ কিন্তু এমনভাবে ওটা বের করলাম, যে নিবারণ বা তেলে ভাজাওয়ালা কেউ বুঝতে পারেনি৷ ভাবল, দোকানের ঠোঙাই আমি নিয়েছি৷ ঠোঙাটা তোর টেবিলের ওপর রাখতে আমিই নিবারণকে বলেছিলাম৷ বলেছিলাম, প্লেটে তেলেভাজা রাখলে তাড়াতাড়ি ঠান্ডা হয়ে যায়! আর আমার কথা নিবারণের কাছে তো বেদবাক্য৷

আশাকরি, ঠোঙাটা তোর নজরে পড়েছিল৷ যাতে পড়ে সেভাবেই ঠোঙাটা তৈরি করা হয়েছিল৷

যাই হোক, আমার 'মিহিদানা' পত্রিকাটি ছিঁড়ে নষ্ট করতে হয়েছে৷ যদি পারিস, সংখ্যাটা জোগাড় করে রাখিস আমার জন্যে৷

এইবার স্বরূপেই তোর কাছে যাব৷ কালকে যদি কোনো মনে কষ্ট দিয়ে থাকি, তার জন্যে ক্ষমা করিস ভাই৷ ছোটোবেলার কথা ভেবে৷ ইতি-

তোরই বিশে৷

চিঠিটা পড়ে একটা আনন্দ আর কপট রাগ-মেশানো গলায় সৈকত নন্দী নিজের মনে বলে উঠলেন, 'হুঁ, এই ব্যাপার! ওরে বিশে, তুই সেই কাঁকড়া বিছেই আছিস৷'

তারপরে নিবারণকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, 'হ্যাঁ রে, তোদের বিশুদার পুরো নাম জানিস?'

একগাল হেসে নিবারণ জবাব দিল, 'জানব না কেন, দাদাবাবু? বিশ্বনাথ দত্ত৷'

আষাঢ় ১৩৯০

সকল অধ্যায়
১.
চাং
২.
হাবুর বাবুগিরি
৩.
ভবম হাজাম
৪.
হুড়ুকবাজ সিং
৫.
হাতির ভয়
৬.
বোকা তাঁতি
৭.
ঝানু চোর চানু
৮.
বাঘ মামা
৯.
শ্বেতব্রাহ্মণের উপাখ্যান
১০.
এক হল দুই
১১.
রামভজনের ঘোড়া কেনা
১২.
দাশুর কীর্তি
১৩.
বুনো মোষ পোষমানা
১৪.
ষর্ণশের্ণ
১৫.
নেড়ুর ভয়
১৬.
হেঁড়ে-গর্জন দৈত্য
১৭.
চোর আর ঠগ
১৮.
আলি ভুলির দেশে
১৯.
বড়ো গদাই আর ছোটো গদাই
২০.
পুরস্কার
২১.
হেশোরাম হুঁশিয়ারের ডায়েরি
২২.
ঠেকে শেখা
২৩.
যুদ্ধের গল্প
২৪.
বন্ধুর দান
২৫.
মানুষের ইতিহাস
২৬.
সূর্যমুখীর কথা
২৭.
ন্যাপলা
২৮.
খেয়ালহারা
২৯.
পরিবর্তন
৩০.
আচ্ছা জব্দ
৩১.
সে
৩২.
মিষ্টি মুখ
৩৩.
চিচিং ফাঁক
৩৪.
অপরূপ রাজ্য
৩৫.
গরিবের দান
৩৬.
চোর ধরা
৩৭.
ময়ূরপঙ্খি
৩৮.
সম্পাদকের সমস্যা
৩৯.
তাইতো
৪০.
লাঠি-সমস্যা
৪১.
খুকির নাম
৪২.
স্বপ্নাদ্য ঔষধ
৪৩.
অজানা কুটুম
৪৪.
রায় মহাশয়ের গল্প
৪৫.
সমরের ষড়যন্ত্র
৪৬.
সুধাং-অ্যাং
৪৭.
ফাঁকিবাজের শিক্ষা
৪৮.
ঘঙ্গোপাধ্যায়
৪৯.
নিশুর বিপদ
৫০.
ফুটবল ম্যাচ
৫১.
এক ভাল্লুকের গল্প
৫২.
কৃপাময়
৫৩.
সেজমামার চন্দ্রযাত্রা
৫৪.
রূপসায়রী
৫৫.
দুই পড়শি
৫৬.
সন্দেশের চিঠি
৫৭.
সদাশিবের ঘোড়া-ঘোড়া কাণ্ড
৫৮.
ভবানন্দের কাশীযাত্রা
৫৯.
প্রথম পুরস্কার
৬০.
কালো মানিক
৬১.
চেঙ্গিস আর হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালা
৬২.
গোবিন্দ গোয়েন্দা
৬৩.
দুগ্যো সদ্দার
৬৪.
ক্যাপ্টেন মুকুন্দরাম
৬৫.
অসমঞ্জবাবুর কুকুর
৬৬.
পিপীলিকা আতঙ্ক
৬৭.
মরুপ্রাসাদের রহস্য
৬৮.
সাতজনের তিনজন
৬৯.
গোরুর বিচার
৭০.
সংস্কার
৭১.
গঙ্গোত্রীর মহাপুরুষ
৭২.
মিনিয়েচারের বোম্বাই যাত্রা
৭৩.
চিতা কাহিনি
৭৪.
বটুকেশ্বরের আবির্ভাব
৭৫.
নিবারণের সমস্যা
৭৬.
ফোর্থ টেস্ট
৭৭.
টাক এবং ছড়ি রহস্য
৭৮.
কলাবতীর ময়দান রিপোর্টিং
৭৯.
ভোটরঙ্গ
৮০.
ঢেউয়ের পরে ঢেউ
৮১.
পাগলা গণেশ
৮২.
সেতু বন্ধন
৮৩.
চিপুরি বিলের মহাশোল
৮৪.
রামেশ্বরের অসমাপ্ত কাজ
৮৫.
বলো তো কে এসেছিল ডিনারে
৮৬.
বোকা রাজার বুদ্ধিমতী রানি
৮৭.
টিপলুর ইতিহাস চর্চা
৮৮.
সোনার মেডেল উধাও
৮৯.
তুতানের বন্ধু
৯০.
ভূত মরলে কী হয়
৯১.
কথারা সব বেরিয়ে পড়েছিল
৯২.
বড়দার কবে ভালো লাগবে
৯৩.
শিবের অসাধ্যি
৯৪.
জয়রামের সিন্দুক
৯৫.
সংবাদের নেপথ্যে
৯৬.
নাড়কান্ডার নানাকাণ্ড
৯৭.
করণপুরার টাঁড়
৯৮.
সাঁঝবাতি
৯৯.
ক্রিকেট খেলার উপকারিতা
১০০.
অলক্ষ্যে হাসে মহাকাল
১০১.
লেখক-পরিচিতি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%