এক ভাল্লুকের গল্প

অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়

সে অনেক বছর আগেকার কথা৷ ১৯১৪ সালে ইউরোপে মহাযুদ্ধ বেধেছিল৷ যুদ্ধ বাধবারও কয়েক মাস আগেকার একটা গল্প বলছি৷ গল্পটা বানানো নয়, একেবারে সত্যি ঘটনা৷

সেই সময় নৈনিতাল ও আলমোড়ার মাঝামাঝি রামগড় পাহাড়ে আমাদের একটা বাড়ি ছিল৷ সেখানে যাওয়া সহজ ছিল না, এত চড়াই ভাঙতে হয় যে সে রাস্তায় মোটর যেতে পারত না৷ রামগড়ে যেতে গেলে বেরিলিতে গাড়ি বদল করে ছোটো রেল লাইনে পুঁচকে ট্রেনে করে কাঠগুদাম স্টেশনে নামতে হত৷ এখান থেকেই ওই অঞ্চলের হিমালয় পাহাড় আরম্ভ হয়েছে৷ কাঠগুদাম থেকে ঘোড়ার পিঠে পাহাড়ে উঠতে হয়৷ যারা ঘোড়ায় চড়তে ভয় পায় তাদের জন্যে ডান্ডি বলে একরকম হাতলওয়ালা আরামচেয়ার পাওয়া যায়, চারজন বাহক সেটা কাঁধে করে নিয়ে যায়৷ আমাদের বাড়িটা রামগড় পাহাড়ের উপরে ৭০০০ ফিট উঁচুতে ছিল, কাঠগুদাম থেকে ১৬ মাইল পথ উঠে যেতে হত৷ আমার বাবা বাড়িটার নাম দিয়েছিলেন 'হৈমন্তী'৷ বেশ সুন্দর নাম নয় কি? হৈমন্তী নামের মধ্যেই পাহাড়ের ঠান্ডা ভাব যেন বেশ রয়েছে৷

গরমের ছুটি পড়লে বাবা আমাদের নিয়ে গেলেন রামগড়ে৷ শান্তিনিকেতনে তখন দারুণ গরম লু বইছে, জলের অভাবে গাছপালা সব মরো-মরো৷ পাহাড়ে পৌঁছে সেই গরম থেকে নিষ্কৃতি পেয়ে বড়ো আরাম বোধ হল৷ আমরা কয়েকজন হৈমন্তীতে গিয়ে গুছিয়ে বসবার পর অনেক লোক সেখানে এসে পড়লেন৷ অতিথিতে বাড়ি ভরে গেল৷ যদিও হৈমন্তী পাহাড়ের একটা নিতান্ত নিরালা জায়গায়, লোকের বসতি বা হাটবাজার থেকে দূরে, আমাদের খাওয়া-দাওয়ার অভাব হল না৷ বাড়ির সঙ্গে মস্ত বড়ো বাগান ছিল; আপেল, পেয়ারা, পিচ, চেরি প্রভৃতি ভালো ভালো ফলের গাছ ছিল বিস্তর৷ বাগানে সবজিও হত প্রচুর৷ খুব মজা করেই আমরা সেই সব ফল ও সবজি খেতুম৷

গণ্যমান্য অতিথিদের মধ্যে এলেন অতুলপ্রসাদ সেন ও সি.এফ. এন্ডরুজ৷ অতুলবাবুর নাম তোমরা নিশ্চয়ই শুনেছ৷ তিনি ছিলেন কবি-অনেক গান বেঁধেছিলেন, তাঁর গান শুনতে সকলে ভালোবাসতেন৷ আর সি. এফ. এন্ডরুজ সাহেব হলে কী হয়, তিনি আমাদের দেশকে নিজের দেশ করে নিয়েছিলেন৷ তিনি উৎপীড়িত ও গরিবদের সর্বদা সাহায্য করতেন বলে লোকে তাঁর 'দীনবন্ধু' নাম দিয়েছিল৷ আমাদের কাছে আরও এলেন আমার ভাইপো দিনেন্দ্রনাথ ও মুকুল দে৷ দিনেন্দ্রনাথ খুব ভালো গান গাইতে পারতেন, বাবার সব গান তিনি জানতেন বলে লোকে তাঁকে বলত 'রবীন্দ্রসংগীতের ভাণ্ডারী'৷ মুকুল দে তখন শান্তিনিকেতন ইশকুলের ছাত্র, তার আঁকার খুব শখ, রাতদিনই কাগজ পেনসিল নিয়ে সকলের ছবি এঁকে বেড়াত৷ পরে সে আর্টিস্ট বলে নাম করেছে৷

এতগুলি লোক এক বাড়িতে, আমাদের খুব জমেছিল সেবার৷ রোজ সকাল বেলায় পাহাড়ের গায়ে একটা গুহার সামনে আমরা সকলে বসতুম৷ সেখান থেকে যেদিকে তাকানো যায় সেদিকেই মনোরম দৃশ্য৷ কত পাহাড়-পর্বতের শ্রেণি, তাতে কত রকমের গাছ৷ পিছন দিকে পাহাড়ের মাথা পর্যন্ত গভীর বন, তার ভিতর কত বিচিত্র রকমের সুন্দর অর্কিড ফুল৷ সবচেয়ে ভালো লাগত দেখতে বরফের পাহাড়ের অপূর্ব দৃশ্য৷ সকাল বেলার রোদে বরফে ঢাকা পর্বতশিখরগুলি ঝকঝক করত আমাদের চোখের সামনে৷ রোজই সেখানে আমাদের গানের মজলিশ বসত৷ কত নতুন গান বেঁধে বাবা আমাদের শোনাতেন৷ অতুলপ্রসাদ সেনও তাঁর অনেক গান শোনাতেন৷ অতুলবাবুর ফরমাশ মতো দিনেন্দ্রনাথকে বাবার পুরোনো গান গাইতে হত৷ গানের মজলিশ চলত দুপুর পর্যন্ত৷ বনমালীর তাগিদে তখন গান বন্ধ করে খেতে যেতে হত৷

গান, গল্পগুজব, কাব্য-আলোচনা, কবিতাপাঠ নিয়ে রামগড়ের হৈমন্তী বাড়িতে আমাদের দিনগুলি খুব আনন্দে কেটেছিল৷ এর মধ্যে একটি ঘটনা হল-তারই গল্প তোমাদের বলব বলে লিখতে বসেছি৷

মুকুল কারও কাছ থেকে শুনেছিল রামগড় পাহাড়ের আশেপাশে অনেক বুনো জন্তুজানোয়ার আছে৷ সাহেবরা এখানে শিকার করতে প্রায়ই আসে৷ সেই শুনে অবধি তার শিকারের ভারি লোভ হল৷ আমাদের রাতদিন অনুরোধ করত, 'চলুন, শিকারে যাই; দাদা, আমাকে শিকারে নিয়ে চলুন৷' তাকে অনেক বুঝিয়ে বললুম, 'শিকার করতে গেলে বন্দুক লাগে, এখানে শিকার করতে আসিনি, বেড়াতে এসেছি, বন্দুক আনা হয়নি৷' এই কথা শুনে সে চুপ করে গেল, ক-দিন আর কিছু বলে না৷ আমিও নিশ্চিন্ত হলুম৷ কিন্তু শেষ পর্যন্ত রেহাই পেলুম না৷ একদিন ভোর বেলায় আমার ঘুম ভাঙিয়ে দিয়ে মুকুল আমাকে বলে, 'দাদা, উঠুন, চলুন-সব ঠিক আছে৷' দেখলুম ঠিকের মধ্যে একটি মান্ধাতা আমলের গাদা বন্দুক৷ আমাদের বাড়ি তদারক করে যে মুনশি, তার কাছ থেকে বন্দুক জোগাড় করেছে কেবল নয়, তাকে সুদ্ধু ধরে নিয়ে এসেছে৷

Cov107

মুকুল বলল, 'মুনশিকে নিয়ে এসেছি৷ সে আমাদের পথ দেখাতে পারবে, জঙ্গলে আমরা হারিয়ে যাব না৷'

মুকুল নাছোড়বান্দা৷ না গিয়ে উপায় নেই৷ পকেটে কিছু খাবার নিয়ে আমরা তিনজনে বেরিয়ে পড়লুম৷ আমাদের বাড়ি ছাড়িয়ে খানিকটা গেলেই বন৷ গভীর জঙ্গলে ঢুকে পড়লুম৷ সেখানে আদ্যিকালের বুড়ো বুড়ো ওক গাছ৷ তাদের ডালপালা শ্যাওলার মতো মস দিয়ে ঢাকা৷ গাছের তলায় এত অন্ধকার যে গা ছমছম করে৷ ওকের বন শেষ হল তো পাইনের বন আরম্ভ হয়৷ পাইনের পাতা সুতোর মতো সরু সরু লম্বা বলে ইংরেজিতে নিডলস (সুচ) বলে৷ শুকনো সেই পাতা পড়ে মাটিতে পুরু হয়ে বিছিয়ে থাকে৷ তার উপর দিয়ে হাঁটা বড়ো মুশকিল, পা হড়কে যায়৷ প্রত্যেক গাছের গায়ে একটি করে মাটির ভাঁড় বাঁধা থাকে, গাছ থেকে যে আঠা বেরোয় তাই ধরবার জন্য৷ পাইনের আঠা থেকে রজন ও তারপিন তৈরি হয়৷ তাই পাইনের বন সুগন্ধে ভরা৷

এইরকম কত বন, কত পাহাড়, কত ঝরনা পার হয়ে আমরা চললুম৷ সমস্ত দিন ঘুরে বেড়ালুম, না একটা বাঘ, না একটা ভাল্লুক, এমনকী না একটা শেয়াল দেখতে পাওয়া গেল৷ কোথাও উপরের পাহাড় থেকে ঝিরঝির করে জল নেমে আসে৷ জল দেখলেই মুকুল থমকে দাঁড়ায়৷ জলের ধারে পায়ের কোনো দাগ দেখতে পেলেই কানে কানে আমাকে বলে-

'দাদা, আছে, আছে, বাঘের পায়ের দাগ দেখেছি, চলুন দাগ ধরে এগিয়ে যাই৷'

আবার চলতে থাকি৷ কিন্তু জ্যান্ত কোনো জীবেরই সন্ধান পাওয়া গেল না৷ পেলে যে কী বিপদ হত তা আমি বুঝতে পারছিলুম৷ সঙ্গে একটিমাত্র বন্দুক, তাও সিপাহি বিদ্রোহ আমলের হবে৷ ভগবানের দয়ায় বাঘ-ভাল্লুকরা দেখা দিল না৷ সন্ধ্যা হয়ে আসে, মুনশিকে বললুম, এখন বাড়ি ফেরবার পথ দেখিয়ে দাও৷ হৈমন্তী থেকে অনতিদূরে একটা মস্ত বড়ো ওক গাছ ছিল৷ সমস্তদিন পাহাড় ওঠা-নামা করে অত্যন্ত শ্রান্ত হয়ে পড়েছিলুম৷ পা আর চলে না৷ আমরা তিনজনে বসে পড়লুম সেই গাছতলায় গাছের গুঁড়ি ঠেসান দিয়ে৷ যেই বসে একটু আরাম করছি, মাথার উপরে ডালপালার মধ্যে খড়খড় শব্দ হল, ত্রস্ত হয়ে উঠে দাঁড়ালুম৷ দাঁড়িয়েছি আর মেটে রঙের প্রকাণ্ড একটা ভাল্লুক ঝুপ করে পড়ল মাটিতে ঠিক আমাদের সামনে৷ নেমে পড়েই দু-পা তুলে আমাদের দিকে কটমট করে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল৷ আমার পিছনে একটি গোঙানির শব্দ শুনতে পেলুম৷ বন্দুক তুলতে যাব-কে আমাকে জাপটে ধরল৷ বন্দুকটা তার হাত থেকে ছাড়িয়ে নেবার জন্য টানাহেঁচড়া করছি-এমন সময় ভাল্লুকটা মুখ ফিরিয়ে হুড়হুড় করে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে পড়ল৷ আমার মনে হল চলে যাবার সময় তার মুখে যেন একটু বিদ্রূপ-হাসি দেখা গেল৷ ভাল্লুক কি হাসতে পারে? কে জানে৷ আমাদের কাণ্ডকারখানা দেখে সে কি সত্যি কৌতুক বোধ করল? কী জানি, তবে চলে গেল তাই রক্ষে৷ আমরা আর দেরি করলুম না, বিশ্রাম করা চুলোয় গেল-ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে এলুম পা চালিয়ে৷

যতদিন তারপর আমরা রামগড়ে ছিলুম, মুকুল আমার কাছে শিকারের কথা ঘুণাক্ষরেও আর তোলেনি৷

বৈশাখ ১৩৬৮

Cov108
সকল অধ্যায়
১.
চাং
২.
হাবুর বাবুগিরি
৩.
ভবম হাজাম
৪.
হুড়ুকবাজ সিং
৫.
হাতির ভয়
৬.
বোকা তাঁতি
৭.
ঝানু চোর চানু
৮.
বাঘ মামা
৯.
শ্বেতব্রাহ্মণের উপাখ্যান
১০.
এক হল দুই
১১.
রামভজনের ঘোড়া কেনা
১২.
দাশুর কীর্তি
১৩.
বুনো মোষ পোষমানা
১৪.
ষর্ণশের্ণ
১৫.
নেড়ুর ভয়
১৬.
হেঁড়ে-গর্জন দৈত্য
১৭.
চোর আর ঠগ
১৮.
আলি ভুলির দেশে
১৯.
বড়ো গদাই আর ছোটো গদাই
২০.
পুরস্কার
২১.
হেশোরাম হুঁশিয়ারের ডায়েরি
২২.
ঠেকে শেখা
২৩.
যুদ্ধের গল্প
২৪.
বন্ধুর দান
২৫.
মানুষের ইতিহাস
২৬.
সূর্যমুখীর কথা
২৭.
ন্যাপলা
২৮.
খেয়ালহারা
২৯.
পরিবর্তন
৩০.
আচ্ছা জব্দ
৩১.
সে
৩২.
মিষ্টি মুখ
৩৩.
চিচিং ফাঁক
৩৪.
অপরূপ রাজ্য
৩৫.
গরিবের দান
৩৬.
চোর ধরা
৩৭.
ময়ূরপঙ্খি
৩৮.
সম্পাদকের সমস্যা
৩৯.
তাইতো
৪০.
লাঠি-সমস্যা
৪১.
খুকির নাম
৪২.
স্বপ্নাদ্য ঔষধ
৪৩.
অজানা কুটুম
৪৪.
রায় মহাশয়ের গল্প
৪৫.
সমরের ষড়যন্ত্র
৪৬.
সুধাং-অ্যাং
৪৭.
ফাঁকিবাজের শিক্ষা
৪৮.
ঘঙ্গোপাধ্যায়
৪৯.
নিশুর বিপদ
৫০.
ফুটবল ম্যাচ
৫১.
এক ভাল্লুকের গল্প
৫২.
কৃপাময়
৫৩.
সেজমামার চন্দ্রযাত্রা
৫৪.
রূপসায়রী
৫৫.
দুই পড়শি
৫৬.
সন্দেশের চিঠি
৫৭.
সদাশিবের ঘোড়া-ঘোড়া কাণ্ড
৫৮.
ভবানন্দের কাশীযাত্রা
৫৯.
প্রথম পুরস্কার
৬০.
কালো মানিক
৬১.
চেঙ্গিস আর হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালা
৬২.
গোবিন্দ গোয়েন্দা
৬৩.
দুগ্যো সদ্দার
৬৪.
ক্যাপ্টেন মুকুন্দরাম
৬৫.
অসমঞ্জবাবুর কুকুর
৬৬.
পিপীলিকা আতঙ্ক
৬৭.
মরুপ্রাসাদের রহস্য
৬৮.
সাতজনের তিনজন
৬৯.
গোরুর বিচার
৭০.
সংস্কার
৭১.
গঙ্গোত্রীর মহাপুরুষ
৭২.
মিনিয়েচারের বোম্বাই যাত্রা
৭৩.
চিতা কাহিনি
৭৪.
বটুকেশ্বরের আবির্ভাব
৭৫.
নিবারণের সমস্যা
৭৬.
ফোর্থ টেস্ট
৭৭.
টাক এবং ছড়ি রহস্য
৭৮.
কলাবতীর ময়দান রিপোর্টিং
৭৯.
ভোটরঙ্গ
৮০.
ঢেউয়ের পরে ঢেউ
৮১.
পাগলা গণেশ
৮২.
সেতু বন্ধন
৮৩.
চিপুরি বিলের মহাশোল
৮৪.
রামেশ্বরের অসমাপ্ত কাজ
৮৫.
বলো তো কে এসেছিল ডিনারে
৮৬.
বোকা রাজার বুদ্ধিমতী রানি
৮৭.
টিপলুর ইতিহাস চর্চা
৮৮.
সোনার মেডেল উধাও
৮৯.
তুতানের বন্ধু
৯০.
ভূত মরলে কী হয়
৯১.
কথারা সব বেরিয়ে পড়েছিল
৯২.
বড়দার কবে ভালো লাগবে
৯৩.
শিবের অসাধ্যি
৯৪.
জয়রামের সিন্দুক
৯৫.
সংবাদের নেপথ্যে
৯৬.
নাড়কান্ডার নানাকাণ্ড
৯৭.
করণপুরার টাঁড়
৯৮.
সাঁঝবাতি
৯৯.
ক্রিকেট খেলার উপকারিতা
১০০.
অলক্ষ্যে হাসে মহাকাল
১০১.
লেখক-পরিচিতি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%