অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়
বেশির ভাগ মানুষেরই কিছু-না-কিছু সংস্কার থাকে৷ আমারও আছে, তোমাদেরও হয়তো আছে৷ বিশেষত পরীক্ষার সময়৷ কলা ডিম এইসব খেয়ে পরীক্ষা দিতে যেতে অনেকেই চাইবে না৷ এমনকী রসগোল্লা খেয়েও না৷ এক-একজনকে এমনও দেখেছি যে বিশেষ একটা কলম ছাড়া পরীক্ষা দেবে না৷
এই সংস্কার খেলার জগতেও বাদ নেই৷ শুনেছি কলিন কাউড্রি একটা পুরোনো শার্ট ব্যবহার করতেন টেস্ট খেলার সময়, অন্য সময় নয়৷ কেউ বুটে, প্যাডে কালি লাগায় না, কেউ আবার ময়লা প্যান্ট পরে৷ তোমাদের কমলদা-বেতার ভাষ্যকার কমল ভট্টাচার্য-খেলার মাঠে নামত চোখের পাশে নাকে তর্জনী ও বুড়ো আঙুল চেপে, তারপর সেখান থেকে বুকে ঠেকাত এই ভাবে তিন বার৷ স্মরণ করত গুরু দুখিরাম বাবুকে৷ এরকম কত লোকের কত দেখেছি৷
আমাদের কলেজে পড়ত ইন্দ্রজিৎ রায়৷ ক্রিকেট খেলতও বেশ৷ ব্যাক-ফুটেড প্লেয়ার, অর্থাৎ মারত বেশি হুক পুল কাট ও লেট কাট৷ মাঝে মাঝে কভার ড্রাইভ৷ ডিফেন্সও ছিল ভালো৷ প্রায় প্রতি ম্যাচেই কুড়ি-তিরিশ করত৷ কখনো-বা তার বেশিও করত৷ সাধারণত নামত ছ-সাত নম্বরে৷ প্রয়োজনে ঠেকা দিয়ে ড্র-ও করত৷
এক খেলায় টস হয়ে গেছে৷ টসে জিতে আমাদের ক্যাপ্টেন বেরি-বেরি সর্বাধিকারী- ব্যাটিং অর্ডার স্কোর বুকে লিখে দেবে বলে স্কোরারের কাছে যাচ্ছে, সে সময় ইন্দ্র গিয়ে বলল, 'আজ আমি ওয়ান ডাউন খেলব!' বেরি ওর মুখের দিকে একবার তাকিয়ে বলল, 'বেশ!' পাশ থেকে পিশু, নিপু বলে উঠল, 'ব্যাটা আমার ব্র্যাডম্যান এসেছেন!' কে যেন বলল, 'বাংলার অমরনাথ৷' সেই বছরেই ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে বোম্বে টেস্টে অমরনাথ ক-দিন আগে সেঞ্চুরি করেছে ওয়ান ডাউন নেমে৷
বেরি ও সুধীর ওপেন করতে গেল৷ বোর্ডে বোধ হয় তখন কুড়ি-পঁচিশ, ঠিক মনে নেই, সুধীর আউট হয়ে গেল৷ ইন্দ্র নামল, আমাদের পাশ দিয়ে গেল৷ আমরা সবাই চুপ৷ জানি মোটামুটি খেলবে৷ সুধীরও প্যাড ছাড়তে ছাড়তে বলল, 'বল এমন কিছু নয়, স্টাম্পের ঠিক বাইরে বলটা ছিল, খোঁচা লেগে গেল, ছেড়ে দিলেই হত৷'
হঠাৎ শুনি মাঠের মাঝে বিপক্ষদের উল্লাস৷ তাকিয়ে দেখি ইন্দ্র ফিরছে৷ এক বলেই খতম৷ পিশু বলল, 'ব্র্যাডম্যানকে সংবর্ধনা জানাতে হবে৷' সবাই মিলে হাততালি শুরু করলাম৷ টেন্টের মধ্যে দৌড়ে পালিয়ে গেল ইন্দ্রনাথ৷ তখনও হাততালি চলছে৷
বেরির কাছে পরে জেনেছিলাম ওই বল খেলা কারোর পক্ষেই সম্ভব নয়৷ বল খুব লেটে প্রায় ব্যাটের গোড়ায় এসে সুয়িং করে, ব্যাটটা বিট করে সোজা হয়, এবং মিডল স্টাম্পে লাগে৷ এই বল লাখে একটা পড়ে৷ সুতরাং ইন্দ্রকে আর কিছু বলা গেল না৷
পরের ম্যাচেই ইন্দ্র আবার বলল, 'ওয়ান ডাউন খেলব৷' বেরি মুচকি হেসে ওর নামটা লিখে দিল স্কোর বুকে৷ যথারীতি ইন্দ্র মাঠে নামল, আর দ্বিতীয় বলে বোল্ড হয়ে ফিরে এল৷ আমরাও ব্র্যাডম্যানকে সংবর্ধনা জানালাম৷
এর পরের ম্যাচ হাওড়া স্পোর্টিং-এর সঙ্গে হাওড়া ময়দানে৷ সবাই মাঠে গেছি সময় মতো৷ ইন্দ্র আমাদের আগেই পৌঁছেছে৷ দেখি সে মাঠের মাঝে গিয়ে পিচ দেখছে৷ বেরি বলল, 'কিছু বলিস না ওকে৷ বেচারা!'
আজও প্রথম বলেই ইন্দ্র আউট হল৷ আমরা সবাই অবাক৷ ইন্দ্র কালেভদ্রে হাঁস মেরেছে৷ অর্থাৎ গোল×া করেছে৷
খেলার শেষে ফিরছি হেঁটে হেঁটে৷ কারণ, হাওড়া ময়দানে খেলা হলেই আমরা হেঁটে ফিরি হ্যারিসন রোড আর কলেজ স্ট্রিটের মোড় পর্যন্ত৷ পথে বড়োবাজারে সদলবলে ফুচকা খাওয়া ছিল আমাদের একটা বিলাস৷ নরেন মালী মাঠ থেকেই জিনিসপত্তর নিয়ে রিকশা চড়ে মার্কাস স্কোয়ারে চলে যেত৷
এখনকার হাওড়া ব্রিজ নয়, সেই ভাসমান কাঠের সেতু৷ তার উপর দিয়ে চলেছি৷ হঠাৎ দেখি ইন্দ্র শার্টের ভিতর হাত ঢুকিয়ে ডান হাতের গুলি থেকে কী যেন বের করে গঙ্গায় ছুড়ে ফেলল৷ নিপু আর পিশু চিৎকার করে ওকে চেপে ধরে বলছে, 'কী ফেললি? কী ফেললি?' অনেক ধস্তাধস্তির পর স্বীকার করল, পাঁজির বিজ্ঞাপন দেখে পাঞ্জাব থেকে ভিপি-তে তিন টাকা দিয়ে একটা মাদুলি আনিয়েছিল৷ বিজ্ঞাপনে ছিল, যে কাজে যাবে তাতেই অভীষ্ট সিদ্ধি৷ সব মনোবাঞ্ছাই পূর্ণ হবে৷ তাই সে ওয়ান ডাউন খেলতে চেয়েছিল৷ আর জীবনে ওই পোজিশনে সে আর খেলবে না৷ সে যেমন ছ-নম্বরি সাত নম্বরি খেলে তাইই খেলবে৷ বেরিও শুনল সেই কথা৷
এরপর খেলা রেঞ্জার্স মাঠে ডালহাউসির বিরুদ্ধে৷ সাহেব টিম৷
ডালহাউসি প্রথমে ব্যাট করে লাঞ্চের একটু পরে দু-শো কি দু-শো কুড়ি করে দান ছেড়ে দিল৷ মাঠে রোলিং চলছে৷ বেরি স্কোরের খাতায় নাম লিখে দিল৷ বেরি ও সুধীর প্যাড পরছে৷ ওয়ান ডাউন কে? তাকেও তো প্যাড পরে রেডি থাকতে হবে৷
আমাদের ফাস্ট বোলার তরুণ এসে বলল, 'ওয়ান ডাউন ইন্দর৷' ইন্দ্র চিৎকার করে প্রতিবাদ জানিয়ে বলল, 'না, না, আমি না, কখনোই না৷' বেরি একটু হেসে বলল, 'যা বলছি তাই শুনবে৷ ক্যাপ্টেনস অর্ডার৷' সুধীরকে নিয়ে সে মাঠে নেমে পড়ল৷
গোটা তিরিশেক রান উঠেছে, বেরি আউট হল৷ গজ গজ করতে করতে ইন্দ্র মাঠে নামছে-'আমাকে সং বানানো . . . খুব মজা হাততালি দিতে . . . স্রেফ ইয়ার্কি! ইডিয়টিক সব কারবার৷ খেলাই ছেড়ে দেব৷ . . .'
বেরি আর ইন্দ্র যখন ক্রস করছে, দেখলাম বেরি তার পিঠ চাপড়ে দিল৷ মনে হল তখনও সে রাগে গরগর করছে৷
ইন্দ্রর সে খেলা জীবনে ভুলব না৷ নির্ভুলভাবে পারফেক্ট টাইমিং-এ হুক পুল কাট লেট কাট কভার ড্রাইভ, মাঝে মাঝে পুল ড্রাইভ, স্কোয়ার ড্রাইভও৷ যা তাকে কখনো মারতে দেখিনি৷ এক আমাদের মধ্যে সন্তোষ গাঙ্গুলি মারত কখনো-সখনো৷ ইন্দ্রর ব্যাট থেকে যেন ফিনকি দিয়ে রান বেরোচ্ছে যেন ওর ওপর কারোর ভর হয়েছে৷
স্কোরারের কাছে গিয়ে ইন্দ্রর কত রান হচ্ছে মাঝে মাঝে দেখে আসছি৷ পঞ্চাশ হল৷ হাততালি দিলাম সবাই৷ ইন্দ্রর ভ্রূক্ষেপ নেই৷ টুপি খুলল না, ব্যাট তুলে অভিবাদনও গ্রহণ করল না৷ তার কানে যেন কিছুই পৌঁছোয়নি৷
দেখতে দেখতে আশি পেরিয়ে গেল৷ কে যেন বেরিকে বলল, 'ওকে বলে আসব একটু দেখে খেলতে?' বেরি বলল, 'না, নার্ভাস হয়ে পড়বে৷ যেমন খেলছে খেলুক, বললে আউট হয়ে যাবে৷'
সেঞ্চুরির হাততালিতে সে সংবিত ফিরে পেল৷ বিপক্ষের সাহেব ক্যাপ্টেনকে দেখলাম হ্যান্ডশেক করতে, অন্যান্যরাও ওর খেলার তারিফ করে হাততালি দিল৷ ও তখন বুঝতে পারল একটা অঘটন সে ঘটিয়ে ফেলেছে৷ অভিভূত হয়ে পড়ল৷ পরের বলেই ক্যাবলার মতো খেলে আউট হয়ে ফিরল৷
ড্রেসিং রুমে ইন্দ্র যখন জামাকাপড় ছাড়ছে৷ পিশু বলল, 'ও, তাই বল! তুই উলটো গেঞ্জি পরেছিস৷ তাই এমন খেললি! ওটা যে গুড লাক৷'
তারপর থেকে ইন্দ্র উলটো গেঞ্জি পরে খেলেছে৷ ওটাই ওর সংস্কারে পরিণত হয়েছে৷
হঠাৎ ডালহাউসি স্কোয়ারে অর্থাৎ এখনকার বি-বা-দী বাগে ইন্দ্রর সঙ্গে দেখা৷ বহু বছর পর৷ আমরা সবাই বুড়ো হয়েছি৷ সুখ-দুঃখের অনেক কথাই হল৷ জিজ্ঞেস করলাম, এখনও কি উলটো গেঞ্জি পরিস? ও কথা না বলে হাওয়াই শার্টের বুকের বোতাম খুলে দেখিয়ে দিয়েই চলন্ত ট্রামে উঠে পড়ল৷
ফাল্গুন ১৩৮৬
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন