অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়
এদের কাকুতিমিনতি আর হাত ধরে ঝুলোঝুলির জ্বালায় সুন্দরবনের সেই ভয়ংকর কাহিনিটাই শুরু করতে হল আমায়!
সেই আমার মাছ ধরতে গিয়ে নৌকো ওলটপালট হয়ে সুন্দরবনের ধারে ছিটকে গিয়ে পড়া, আর পথ হারিয়ে গভীর জঙ্গলে ঢুকে পড়ে নরখাদক মানুষদের হাতে প্রাণ যাওয়ার কাহিনিটা৷
এতটুকু বাচ্চাদের কাছে এ গল্প আমি কখনো করি না৷ করতে সাহসই হয় না৷ দরকার কী বাবা, এসব শুনে-টুনে যদি রাত্রে স্বপ্ন দেখে আঁতকে ওঠে? উঠতেই পারে, খুবই স্বাভাবিক৷ কারণ যতই হোক-মানে, যতই গল্পখোর হোক, শিশু বই তো নয়! আর শিশুদের স্বপ্নের বিভীষিকায় আঁতকে ওঠা থেকে কত কী-ই না ঘটতে পারে!
তেমন কিছু ঘটলে ওই বাচ্চাদের মা-বাবা যে আমাকে আস্ত রাখবে, এ ভরসা রাখি না৷ কী দরকার বাবা তবে আমার অত রিস্ক নেবার?
নইলে গল্পের কিছু অভাব আছে জগতে? ছেলেবেলায় শুনিনি আমরা? বেলুমাসি আর ছোটোকাকা জগতের সমস্ত ভূত পেতনি ব্রহ্মদত্যি আর মামদো ভূতের গল্প বলেননি আমাদের?
কিন্তু সেসব গল্পও আমি ছোটোদের বলি না৷ বলি কী করে, ওর প্রতিক্রিয়া তো জানি৷ শোনবার সময় আমরা, মানে বাড়িতে যে গোটা পাঁচ-ছয় ছেলে ছিলাম আমরা, দিব্যি বেলুমাসির কি ছোটোকাকার গা ঘেঁষে বসে চোখ গুলি গুলি করে গল্পগুলো গিলতাম, গায়ে কাঁটা দিলে বা বুক ধড়ফড় করলে কি মাথা ঘুরলেও শুনতে ছাড়তাম না৷
ডালমুট কি ঝালমুড়ির নুন লঙ্কা যেমন চোখে জল নিয়েও চেটে চেটে খেতে ইচ্ছে করে, তেমনি গায়ে কাঁটা নিয়েও শুনতে ইচ্ছে করত৷
কিন্তু তারপর?
তারপর যা হত! ও বাবা!
সন্ধ্যে হতে-না-হতেই আমাদের ক-জনের অবস্থা হত ঠিক পিণ্ডিখেজুরের মতো৷ পাঁচ-ছ-জন মিলে এমন তালগোল পাকিয়ে ডেলা বেঁধে থাকতাম যে আলাদা করে চিনে বার করা যেত না৷
দালান পার হয়ে সিঁড়িতে যাচ্ছি তো ওই ছ-জনে হাত ধরাধরি করে, সিঁড়িতে উঠছি তো সবাই কাঁধ ধরাধরি করে, আর পিঁড়ি পেতে ভাত খেতে বসেছি তো প্রত্যেকে প্রত্যেকের হাঁটুতে হাঁটু ঠেকিয়ে৷
আর রাত্তিরে শুতে যাওয়া?
সে তো কেটে ফেললেও মা কি পিসিমা শোবার আগে নয়!
এসব তো জানি আমি৷
সবই জানি৷
জেনেশুনে কি আমার আদরের বাচ্চা-টাচ্চাগুলোকে সেই বিষ খেতে দিতে পারি?
তাই গল্পের বইয়ের গল্প থেকে শুরু করেছিলাম৷ কিন্তু সে গল্প এদের ভালো লাগছে না, 'গল্প বলো, ভালো গল্প', 'তোমার নিজের গল্প বলো' বলে হাত ধরে ঝুলোঝুলি করছে!
তা যে-সে তো নয় এরা যে এদের কথা অবহেলা করি! এরা হচ্ছে আমার ছোড়দির সাক্ষেত মামাতো পিসশাশুড়ির ছেলের-মেয়েরা, আর মেয়ের ছেলেরা৷
অগত্যাই আমার 'নিজের গল্প' শুরু করতে হল৷
একেবারে সাল তারিখ দিয়ে শুরু করি৷ ছোটো বলে যেমন-তেমন করে সেরে দেওয়া আমার ভালো লাগে না৷ এই ধরো যেমন নেমন্তন্ন বাড়িতে! ছোটোদের খেতে বসিয়ে ভালো ভালো জিনিসগুলো দিতেই চায় না! বাড়ির কর্তারা এসে হাঁ-হাঁ করে পরিবেশনওলাদের হুকুম দেবেন, 'কাটলেট ছোটোদের পাতে নয়, ছোটোদের পাতে নয়; ফ্রাই একখানা, স্রেফ একখানা! ছোটো খুরিগুলো কোথায় গেল বাচ্চাদের দই দিতে! মিষ্টি জিজ্ঞেস করে দেবে, ফেলাছড়া না যায়৷'
কেন বাপু? ছোটোদের বুঝি মানসম্মান নেই? চাইতে পারে তারা? একমাত্তর পান ছাড়া আর কক্ষনো কিছু তো চেয়ে খাইনি আমি৷
অবিশ্যি এখন কী হয়েছে জানি না৷
এখন বোধ হয় ছোটোদের শুধু 'ছোটো' না ভেবে মানুষই ভাবা হয়৷ কিন্তু আমাদের ছেলেবেলায় তা ভাবা হত না বাপু, এই সত্যি কথা বলছি৷
আমি কিন্তু মানুষই ভাবি৷ তাই ওদের কাছে গল্প বললে গুছিয়েই বলি৷ শুরু করলাম-
'উনিশশো উনচল্লিশ সালের আগস্ট মাসের এক রাত্তিরে ছোট্ট একখানা নৌকো নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম মাছ ধরতে-'
পিসশাশুড়ির মেয়ের বড়ো ছেলে বলে ওঠে, 'ধ্যেৎ, রাত্তিরে আবার কেউ মাছ ধরে নাকি? আমার জ্যাঠামশাই তো দিনের বেলা-'
আমি বাধা দিয়ে বলি, 'আহা সে তো ছিপ দিয়ে মাছ ধরতে৷ জাল ফেলে মাছ রাত্তিরেই ধরে৷'
'ও!' বলে কাছে ঘেঁষে এল মেয়ের ছোটো ছেলে৷ নীল কাচের মার্বেলের মতন ঝকঝকে চোখ তুলে মহোৎসাহে বলল, 'তারপর?'
ছেলেটার এই কাচের মতন চোখ আর দেবদূতের মতন মুখ দেখতে এত ভালো লাগে আমার! ওকেই সবচেয়ে ভালোবাসতে ইচ্ছে করে৷ তাই গল্প বলার সময় ওর পিঠেই হাত রাখি৷
'তারপর-' আমি বলি, 'রাত যখন বেশ গভীর হয়ে উঠেছে, আর গভীর জলের ইয়া বড়ো বড়ো মাছগুলো জলের ওপর উঠে এসেছে চাঁদের আলো খেতে-'
পিসশাশুড়ির ছেলের বড়ো মেয়ে বলে ওঠে, 'আহা, কী কথার ছিরি! চাঁদের আলো আবার খায় মানুষে?'
গম্ভীর হয়ে বলি, 'আমি মানুষের কথা বলিনি, বলেছি মাছের কথা৷'
'আহা, সে একই কথা, মাছ বলে কি মানুষ নয়?'
'মাছ যদি মানুষ হয়, আমরাও তাহলে মানুষখেগো বুনো'-আমি বলি৷
নীল কাচের মার্বেল বলে ওঠে, 'আঃ , কথা বলছিস কেন? শুনবি তো মন দিয়ে?'
'বেশ বাবা বেশ, শুনছি বাবা শুনছি-' সবাই গুছিয়ে বসে৷
আমি আবার শুরু করি-'সেই গভীর রাত, চারিদিকে 'নি-নি' অন্ধকার, আর একলা আমি সেই কালো ঢেউ-তোলা জলে জাল ফেলছি, এমন সময়-'
'নতুন মামা',-আবার ব্যাঘাত পড়ে, 'জাল বুঝি একলা ফেলে? আমরা তো পুরী গিয়ে দেখেছি দু-জন-তিনজনে মিলে জাল ফেলে৷' ছেলের বড়ো মেয়েই ফের বলে এ কথাটি৷
আমি স্নিগ্ধ হাসি হেসে বলি, 'ওরে, গভীর জলের মাছ তুলতে হলে একলাই জাল ফেলতে হয়৷ দু-জন-চারজন থাকলেই তো কথা, আর কথা কানে গেলেই ওরা ফের গভীর জলে পালায়৷'
নীল মার্বেল আবার ওদের তাড়া দেয়, 'ফের কথা বলছিস? আবোল-তাবোলের 'এক যে রাজা থাম না দাদা'র মতন করবি বুঝি? না, নতুন মামা, শুনো না ওদের কথা, তাড়াতাড়ি বলো৷'
ওর উৎসাহে চকচকে চোখ দুটোই আমাকে বিগলিত করে ফেলে, তাই আবার ওকে কাছে টানি; টেনে বলি, 'হ্যাঁ, কী বলছিলাম . . . এমন সময় ইয়া প্রকাণ্ড একটা কী যেন জলজন্তু হঠাৎ ডিঙির তলায় মারল এক ধাক্কা! মনে হল কোনো পাহাড় এসে ধাক্কা মারল৷'
'নতুন মামা,' নীল কাচের মার্বেল আগ্রহে আর উত্তেজনায় ঠিকরে ওঠে, 'জলহস্তী বুঝি?'
ওর আগ্রহ দেখে মনে হল জলহস্তী হলেই ভালো হত, কিন্তু হবার উপায় নেই৷ ওটা তিমি মাছ, কারণ তার পরের বারই যে ল্যাজের ঝাপটা দেবে ও আমায়৷ জলহস্তীর কি লেজ থাকে? থাকে না, তাই কাচের মার্বেলকে একটু মঃনক্ষুণ্ণ করেই বলতে হয়, 'না জলহস্তী নয়, তিমি মাছ!'
'তিমি মাছ! ও মা!' হাততালি দিয়ে ওঠে আর একজন, 'তিমি মাছ আমার খুব ভালো লাগে৷ তারপর কী হল?'
'তারপর? তারপর হল সেই কাণ্ড! যার জন্যে আমাকে একেবারে ছিটকে গিয়ে পড়তে হল সেই সুন্দরবনের গহন অরণ্যের ধারে৷'
'কী করে?' বলল একজন৷
'আরে বাবা, এটা জানিস না, তিমি কখনো শুধু মাথার ঘাই মেরেই থেমে যায় না! তিমিরা ঠিক যা যা করে ও-ও তাই করল৷ মাথায় ধাক্কা দিয়েই ঘুরে গিয়ে মারল লেজের এক ঝাপট!'
'মারল?' নীল মার্বেল উৎসাহে নীল বালব হয়ে ওঠে৷
আমি ওকে কাছে টেনে বলি, 'মারবে না? যার যা স্বধর্ম সে তা করবে তো? ডিঙি নৌকোর যা স্বধর্ম সেও তাই করল, ওই ধাক্কায় স্রেফ রবারের বলের মতো লাফিয়ে, উলটেপালটে ডিগবাজি খেয়ে আমাকে আছড়ে ছুড়ে দিল ডাঙায়৷ মানে সুন্দরবনে৷'
'বাঃ, সুন্দরবনের দিকেই বা তুমি মাছ ধরতে গেলে কেন?' বলল সেই পাকা মেয়েটা-পিসশাশুড়ির ছেলের বড়ো মেয়ে৷
গেলাম কেন সে কথা বুঝিয়ে বলার আগেই কাচের মার্বেল ভীষণ রেগে ওঠে, 'খালি খালি বুঝি দেরি করিয়ে দিবি তোরা? শুনতেই দিবি না? সুন্দরবনের কাছেই কি আর গিয়েছিলেন নতুন মামা? এমনি বাড়ির কাছের গঙ্গাতেই হয়তো জাল ফেলেছিলেন, তিমি মাছটাই তো এই কাণ্ড করল৷'
'বাড়ির কাছ থেকে সুন্দরবনে নিয়ে গিয়ে ফেলল?' পাকা মেয়েটা অবিশ্বাস করে৷
কাচের মার্বেল চেঁচিয়ে ওঠে, 'ফেলবে না? ওদের জোর কত তা জানিস? বিলেতে নিয়ে গিয়েও ফেলতে পারে ওরা৷'
আমি মুখ গম্ভীর করে ওদের দিকে তাকিয়ে বলি, 'বিলেতের কথা অবশ্য ঠিক জানি না আমি৷ আমাকে অন্তত ফেলেনি কখনো৷ কিন্তু সুন্দরবন আমার হাড়ে হাড়ে প্রত্যক্ষ৷ কিন্তু তোমাদের যদি শুনতে ভালো না লাগে-'
'না না, খুব ভালো লাগছে, বলো বলো৷' ঐকতান বাদন শুরু হয়ে যায়৷ 'বলো বলো' আর থামতে চায় না৷
হেসে ফেলে থামিয়ে দিয়ে বলি, 'ওই যে বলছিলাম হাড়ে হাড়ে? ওইটাই আসল কথা৷ যখন পড়েছিলাম তখন তো আর জ্ঞানগম্যি ছিল না৷ তারপর যখন সকাল হয়ে চলে গিয়ে দুপুর হয়েছে, মুখে চোখে আগুনের মতো রোদ এসে পড়েছে, তখন জ্ঞান ফিরল৷ ফিরল তো, কিন্তু আমি যে পাশ ফিরতেও পারছি না৷ হাড়গোড় সব চূর্ণ৷'
'চূর্ণ!' ওদের সকলের কন্ঠ থেকে একযোগে হতাশা আর বেদনা ঝরে পড়ে৷
আমি আশ্বাস দিয়ে বলি, 'আহা সত্যিই কি আর গুঁড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছে? তা নয়, ভেতরে ভেতরে ছাতু হয়ে গেছে আর কি৷ যেমন পাঙ্খা বরফের বরফ৷ ও, তোরা বুঝি পাঙ্খা বরফ খাসনি কখনো? তবে আর কী বুঝবি৷ যাক, ভীষণ ব্যথা গায়ে, সেই নিয়েই গড়াতে গড়াতে একটা গাছের তলায় পৌঁছে ছায়ায় পড়ে রইলাম৷ তখনও তো জানি না কী ঘটেছে কপালে, কোথায় এসে পড়েছি৷
'তখন ভাবছি একটু উঠে যেতে পারলেই এই জঙ্গলটা থেকে বেরিয়ে লোকালয়ে চলে যাব আর একটা দোকানে উঠে যত পারব পেট ভরে খেয়ে নেব৷ পয়সা? সে তো কখন পকেট থেকে হাওয়া, জলে কি জঙ্গলে৷ কিন্তু এই যে খাঁটি সোনার সিল আংটিটি, যেটা পইতের সময় পিসিমা দিয়েছিলেন-এইটা বুকের বল৷ দোকানিকে দিলে কি আর যত পারব খেতে দেবে না? পেটের মধ্যে বুঝলে কিনা-তখন একেবারে খাণ্ডবদাহন! বকরাক্ষস আর কুম্ভকর্ণের খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারগুলো মোটেই বাড়াবাড়ি মনে হচ্ছে না তখন৷
'এমনকী মনে হচ্ছে তিনি মাছটা যখন আমাকে আছড়ে দিল তখন যদি এক-আধটা জলের তলার ছোটোখাটো মাছও আছড়ে দিত, ওই রোদেই ঝলসে খেয়ে নিতাম৷
'কিন্তু হা অদৃষ্ট, মাছ তো দূরের কথা একটা মাছিও নেই সেখানে৷ শুয়ে শুয়ে মনে পড়তে থাকে এযাবৎ জীবনে কবে কোথায় কখন কী কী খাবার পাতে ফেলে উঠে গেছি! উঃ , ইস! সে কী কম! কম খাওয়ার জন্যেই পিসিমার কাছে বকুনি খেয়েছি চিরদিন৷
'আশৈশবের সেই ফেলে-দেওয়া মাছ মিষ্টি দই পায়েস লুচি রুটি ভাত খিচুড়ি মাংস মালপো এমনকী চচ্চড়ি বেগুনভাজা পর্যন্ত যেন অদৃশ্যলোক থেকে আমার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দাঁত বার করে হাসতে থাকে৷
'ভেবে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠতে থাকে৷ জিবেগজা পর্যন্ত পাতে ফেলেছি আমি একদিন৷
'হে ভগবান, কাতর প্রার্থনায় তো তুমি গলে যাও শুনেছি, ধ্রুবকে বনের মধ্যে দেখা দিয়েছিলে, আমি অত কিছু চাইছি না, তোমার দেখা পেয়ে আর আমার কী হবে, শুধু যদি তোমার ওই বৈকুন্ঠ না কোথা থেকে যেন এক ঠোঙা জিবেগজা ফেলে দিতে!
'বুঝলি কিনা, অনেকক্ষণ আশা করলাম, কিন্তু কোথায় কী?
'অবশেষে ভগবানের ওপর রেগে-টেগে গায়ের ব্যথা নিয়েই গা ঝেড়ে উঠে পড়ে লোকালয়ের উদ্দেশে হাঁটতে শুরু করলাম৷ তখনও জানি না কপালে কী ঘটছে!'
ওরা আমার কাছে ঘেঁষে আসে৷
'হাঁটছি হাঁটছি, কোথায় লোকালয়, কোথায় বা রাস্তা, আরও বন, নিবিড় বন, ভয়ংকর বন! তারপর হঠাৎ দেখি ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে গেল৷ কী রে বাবা, সন্ধ্যে হয়ে গেল নাকি!
'তা নয়, জমাট পাহাড়ের মতন, কয়লার খনির মতন, তাড়কা রাক্ষুসির চুলের মতন, গহন গভীর অরণ্যে এসে পড়েছি! সে যে কী অন্ধকার তা তোমরা ধারণা করতেও পারবে না৷ নিজের হাত-পা দেখতে পাচ্ছি না, মাথাটা ঘাড়ের ওপর আছে কি না টের পাচ্ছি না, গায়ে হাতে চিমটি কেটে মাথার চুল ছিঁড়ে ছিঁড়ে দেখছি, আছি তো-'
'ই-ইস!' কাচের মার্বেল শিউরে উঠে একেবারে আমার হাঁটু চেপে ধরে-'চিমটি কেটে! চুল ছিঁড়ে! তারপর?' ওর ছোট্ট হাঁ-টা বড়ো হয়ে যায়, বড়ো হয়েই থাকে৷ আর চোখ দুটি দু-আনার মার্বেলের সাইজ হয়ে ঠিকরে ওঠে৷ আরও কাছে টানি তাকে৷
'তারপর-? তারপরের কথা বলব? ভেবে দেখি বাপু, তোমরা রাত্রে ভয় পাবে না?'
'না না, আমরা তো মার কাছে শুই৷'
'তারপর পাগলের মতো ছুটোছুটি করতে থাকি, আর যেদিকে যাই সেদিকেই মোটা গাছের গুঁড়িতে মাথা ঠোকে৷ আরশি নেই, চোখে দেখবার নয়৷ হাত বুলিয়ে বুলিয়ে দেখি ঠুকে ঠুকে কপালটা আগে আলুর মতো, তারপর কাঁচা পেঁপের মতো, তারপর ডাবের মতো, আর শেষ অবধি প্রকাণ্ড এক বিলিতি কুমড়োর মতো হয়ে উঠল৷'
'বিলিতি কুমড়োর মতো! ওরে বাবা!' সক্কলের মুখগুলোই হাঁ হয়ে যায়৷
'গেল তো! জ্ঞানগম্যি তো নেই, সেই নিয়েই পাগলের মতন ছুটোছুটি করছি৷ হঠাৎ দেখি সেই অন্ধকারের গায়ে কোনো এক ফাঁক থেকে দপদপে আগুনের শিখা!'
'দাবানল বুঝি?' পাকা মেয়েটা বলে৷
'আরে বাবা, সে হলে তো বরং ভালো ছিল৷ এ আগুন-বলব? ভেবে দেখো?'
'হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ৷' সবাই চেঁচায়, শুধু কাচের মার্বেল একটু যেন নিভে নিভে আসে, আর প্রায় আমার কোলের ভেতর ঢুকে আসে সে৷
'বলছি কিন্তু, আমার দোষ নেই৷ এ আগুন মানুষের হাতের মশালের৷ সেই মশালের আগুনেই তাদের চেহারা দেখতে পেলাম!
'আবলুস কাঠ দেখেছ তোমরা? দেখনি! যাক কয়লার চাঁই দেখেছ তো? ঠিক যেন সেই কয়লার চাঁই দিয়ে গড়া একদল দাঁত-খিঁচোনো দৈত্য! বললে বিশ্বাস করবে না, প্রত্যেকের মুখে হাতির মুখের মতো দু-পাশে দুটো খোঁচা খোঁচা ধারালো দাঁত, কপালে সাদা সাদা কীসের যেন মোটা মোটা দাগ আঁকা, গলায় জন্তুজানোয়ারের হাড়-গাঁথা মালা, পরনে গাছের ছাল, আর নেড়া মাথার ওপর-'
পাকা মেয়েটা হঠাৎ বলে ওঠে, 'নাপিত আছে ওদের?'
নাপিত! আমি তো হতভম্ব-'নাপিত মানে?'
'বাঃ, মাথা নেড়া করতে নাপিত লাগে না?'
হো-হো করে হেসে উঠি আমি, 'আরে এত বুদ্ধি নিয়ে এই কথা বললে তুমি? কেন, সুন্দরবনের 'কুন্তলোৎপাটিনী লতিকা'র নাম শোননি কখনো? তা হয়তো শোননি, কী জানি তোমার মা-বাবাও শুনেছেন কি না, আজকাল তো আর এইসব বৃক্ষলতা নিয়ে মাথা ঘামায় না কেউ, সবাই ডাক্তারি ওষুধ ভজেছে৷ ওই লতার রস একবার মাথায় মাখালে তিন দিনের মধ্যে মাথার সমস্ত চুল উধাও৷ জীবনেও আর সে মাথায় চুল গজাবে না৷'
ওরা এবার একটু বিচলিত হল, 'জীবনেও চুল গজাবে না?'
'নাঃ!'
'কী নাম বললে, নতুন মামা? 'কুন্তলোটিকা পাতিনী' না কী?'
'কী সর্বনাশ! আরে না না, কুন্তলোৎপাটিনী লতিকা৷'
ওরা বিজবিজ করে মুখস্থ করতে থাকে৷
'তুমি বাবু বড্ড বাধা দিচ্ছ,' আমি বলি, 'আমি প্রায় ভুলেই যাচ্ছি সব৷'
'না না নতুন মামা, বলো, ভেবে ভেবে সব বলো তুমি,' দেবদূতের মতো ছেলেটি অধীর আগ্রহে আমার আঙুল টানাটানি করে-'নেড়া মাথার ওপর কী?'

'নেড়া মাথার ওপর?' আমি বলি, 'সে যা ব্যাপার, তোমরা কল্পনাও করতে পারবে না৷'
'মাথায় গাছের পাতা বুঝি?' ওরা বলে ওঠে৷
'উঁহু৷'
'তবে পাখির পালক?'
'দূর, নেড়া মাথায় পালক গুঁজবে কোথা?'
'তবে? হরিণের শিং?'
'উঁহু৷'
'তবে নিশ্চয়-তবে নিশ্চয়-'
'বলতে পারলে না তো? প্রত্যেকের মাথার মাঝখানে ইয়া বড়ো এক-একটি পা-বাঁধা বনমোরগ! অনবরত তারা তাদের হাত-দুই করে লম্বা ডানাগুলো ঝটাপট ঝটাপট ঝটপটাচ্ছে৷'
'জ্যান্ত?' কাচের গুলি দুটি বিস্ময়ে যাকে বলে একেবারে বিস্ফারিত হয়ে ওঠে!
'জ্যান্ত বলে জ্যান্ত-একেবারে জলজ্যান্ত!'
'উড়ে পালিয়ে যাচ্ছে না?'
আমি বললাম, 'বাঃ, বললাম না-পা-বাঁধা? সেই বাঁধন-দড়িগুলো যে আবার ওদের কানের সঙ্গে আটকানো৷'
'ইস, কী বুদ্ধি!' নীল কাচের মার্বেলই সত্যিকার অভিভূত হচ্ছে৷
'বুদ্ধি বলে! সেই জ্বলন্ত মশালগুলো আমার মুখের সামনে তুলে ধরে বলল, বাঃ, বেড়ে চেহারাটি তো! কাঁচা খেতেই লাগবে ভালো৷'
'তুমি ওদের ভাষা বুঝতে পারলে?' পাকা মেয়েটা আবার ফোড়ন কাটে৷
আমি অবশ্য পাকাকে বোকা বানিয়ে ছাড়ি৷ সত্যি, এত পাকা অথচ এটুকু আর জানে না সুন্দরবন বাংলাদেশেরই অন্তর্গত৷ বললামও তাই-'সুন্দরবন তো বাংলাদেশে, তাও জান না? বাংলাদেশের লোকের ভাষা বুঝতে পারব না?'
'বাঃ ওরা তো বুনো৷ মানুষের মাংস খায়৷'
'চমৎকার! তোমার যা বুদ্ধি৷' আমি বলি, 'মানুষের মাংস খায় বলে মাতৃভাষায় কথা বলবে না?'
'বলবে?'
'নিশ্চয় বলবে!'
'বাঙালির মাংস খাবে?'
'নিশ্চয় খাবে৷ বাঙালির মাংসর স্বাদ কত ভালো!'
সেই আমার দেবদূতটি, সত্যিই বড়ো সরল ছেলেটা-শুনে একেবারে কাঁদো-কাঁদো, 'কেন নতুন মামা, স্বাদ কেন ভালো?'
'বাঃ, বাঙালিরা কত ভালো ভালো খায়৷ পৃথিবীর আর কোথাও এত অদ্ভুত সুন্দর আর এত রকম-বেরকম রান্না-খাওয়া আছে? গোকুল পিঠে, চন্দরপুলি, রসমাধুরী, ছানার পায়েস, সাড়ে-ছাপ্পান্নরকম সন্দেশ চোখে দেখেছে আর কারা? তবে? এসব খেলে গায়ের মাংস তুলতুলে আর সুস্বাদু হবে না? নিজেরা নিজেরা ওই কথাই বলাবলি করে, দেখেছিস, ব্যাটার গা দিয়ে যেন খোশবু বেরোচ্ছে৷
'আমার অসহ্য লাগতে লাগল৷ চেঁচিয়ে বলে উঠলাম, যা করবার করো, আর ভালো লাগছে না৷
'আমার চেঁচানিতে দলপতিটার কী ফুর্তি৷
'লাফিয়ে নেচে বিশ্রী একটা চিৎকার করেই প্রচণ্ড এক শিস দিল৷ আর সঙ্গেসঙ্গে-উঃ , সে দৃশ্য ভাবলে এখনও আমার কালঘাম ছুটে যায়৷ সঙ্গেসঙ্গে যেন বনে আগুন ধরে গেল৷ কোথা-না-কোথা থেকে পিলপিল করে দলে দলে ঠিক ওই এক সাজের লোক মশাল হাতে ছুটে এসে আমাকে ঘিরে দাঁত খিঁচিয়ে খিঁচিয়ে নাচতে লাগল৷
'তার সঙ্গে মাথার ওপর সেই ঝটন্ত-পটন্ত বনমোরগ, আর মুখে কিম্ভূতকিমাকার গান!তখন আমার যা অবস্থা, কী গাইছিল তা মনে নেই, শুধু মনে আছে খালি খালি বলছিল-
হেচাং হেচাং হেচাং হে-
নাদুস নুদুস খাউস রে-
তাধিং তাধিং ধিংতা রে-'
'তারপর?' নীল কাচ প্রায় আমার হাতটা খামচে ধরে, 'তারপর নতুন মামা?'
ওর মুখচোখ ভয়ে পাঙাশ, মাথার চুলগুলো শজারুর কাঁটার মতো খাড়া, আর গলার স্বর বুজে আসা৷
'দেখো, আর বলব না, তুমি বড়ো ভয় পাচ্ছ৷'
'না না বলো বলো৷ তারপর কী হল বলো-' সেই বোজা গলাতেই বলে ও, কিন্তু আমার সঙ্গে একেবারে লেপটে বসে৷
অগত্যাই বলি, 'তারপর তারা নাচতে নাচতে তাদের মশালগুলো একবার করে আমার গায়ের চামড়ায় বুলিয়ে দিয়ে নাচতে নাচতে আবার সেই বনের মধ্যে মিলিয়ে গেল৷ রইল খালি আগের লোকেরা৷ একজন আমাকে টিপে টিপে বলল, ঝলসেছে মালুম হচ্ছে৷
'অর্থাৎ বুঝতেই পারছ কেন ওই মশাল বুলোনো৷ জ্যান্ত রোস্ট করে নিল আমায়৷
'আমি হাত জোড় করে চেঁচিয়ে বললাম, আমাকে তোমরা তাড়াতাড়ি শেষ করো, আর দগ্ধে মেরো না!
'ওরা আবার খ্যা খ্যা করে হেসে উঠল, তারপর না-ওরে বাবা, কী করে বলি! এদিকে তোমরাও না শুনে ছাড়বে না৷ তারপর না-দু-তিন জনে মিলে আমাকে জোর করে মাটিতে শুইয়ে ফেলল, আর দলপতি কোথা থেকে একটা চিমটে এনে-ওরে বাবা রে-'
ভয়ে চোখ বুজি আমি সেই দৃশ্য মনে পড়ায়৷
'চিমটে এনে কী? ও নতুন মামা?' ছেলেটা ভয় পেয়ে খালি আমায় খামচে ধরছে৷
'চিমটে এনে! চিমটে এনে আমার গা থেকে সমস্ত ছাল চড়চড় করে টেনে ছাড়িয়ে নিল৷'
'ছাড়িয়ে নিল!'
'নিল বই কী!'
এবার দেখলাম যতগুলো চোখ ছিল সবগুলোই গুলি গুলি হয়ে উঠেছে, এমনকী সেই পাকা মেয়েটারও৷
'লাগল না তোমার?'
'লাগল? হুঁঃ৷ আমি কি তখন আমাতে ছিলাম৷ অসাড় হয়ে ঠিক যেন সিনেমার ছবি দেখছি-ছালগুলো সব ছাড়িয়ে একটা তাল করে মাটিতে রেখে তাতে কী যেন গুঁড়ো, মশলা কি নুন তা জানি না, ছড়িয়ে ছড়িয়ে চেখে চেখে খেতে লাগল সবাই৷'
'তুমি নিজের চক্ষে দেখলে,' হঠাৎ নীল গুলি ডুকরে কেঁদে উঠল-'তোমার ছাল ছাড়িয়ে দিয়ে নুনমশলা দিয়ে খাচ্ছে তুমি দেখলে? ও নতুন মামা?'
'আরে আরে'-ব্যস্ত হয়ে উঠি আমি, 'কান্নার কী আছে? আবার তো ছাল গজিয়েছে আমার!'
'কী করে আবার গজাল?' পাকা মেয়েটা রুদ্ধশ্বাসে বলে৷
'গজাল ওদেরই গুণে,' আমি বলি, 'ওরা নিজেরা বলাবলি করল, ছালটাই ভারি মজাদার খেতে৷ ছোঁড়াটাকে এক্ষুনি শেষ করে দরকার নেই৷ ভুরাং, তুই এটাকে মশলা মাখিয়ে রোদে শুকোতে দিয়ে রাখবি, ফের ছাল গজিয়ে যাবে৷ আহা, কী খাসা রে!'
'তারপর?'
'তারপর আর জানি না, মরে গেলাম কি বেঁচে থাকলাম, তাই বা কে হিসেব রেখেছে? কবে কত দিন পরে জানি না, জ্ঞান হতে দেখি সেই জলের ধারে কাঁটাগাছের ঝোপের ওপর রোদে পড়ে আছি, সর্বাঙ্গে কীসের যেন প্রলেপ৷ ঠিক যেমনি পিসিমা নুনমশলা-মাখা আমসি রান্নাঘরের চালে তুলে রোদে দিতেন৷
'আমার যে জ্ঞান ফিরেছে সে খবর ওরা পায়নি৷ তাই নিশ্চিন্ত আছে৷ আমি আর কোনোদিকে না তাকিয়ে চোঁ চাঁ জলে ঝাঁপ! সাঁতারটা শেখা ছিল, ডুবলাম না৷ সাত দিন সতেরো রাত্তির সাঁতরে উঠলাম এসে এই আহিরীটোলার ঘাটে!'
'অ্যাঁ!'
'তবে না তো কী!'
'তারপর?'
'তারপর জীবনে আর কখনো মাছ ধরতে যাইনি, বাড়িতে কোনো চিমটে রাখতে দিইনি, আর পিসিমাকে আচার রোদে দিতে দিইনি৷ চিমটে আর আমসি দেখলেই-উঃ !'
কপালের ঘাম মুছতে থাকি আমি৷
কান্না থামিয়ে ছেলেটা আমার গায়ের ছাল টিপে টিপে বলে, 'এসব নতুন ছাল?'
'বিলকুল৷ যাক, এবার নাইতে যাওয়া যাক৷ বেলা হয়ে গেছে৷ তোমরা তো দিব্যি পেট ভরিয়ে বসে আছ৷'
নাইতে গেলাম আমি৷ গেলাম, কিন্তু চিরকালের জন্যে কেন গেলাম না! কেন আবার ফিরে এলাম! ফিরে এলাম শুধু এ ঘরে তোয়ালেটা ছিল বলে৷ কিন্তু না, ঘরে আমি আসিনি, শুধু দরজার বাইরে পর্যন্ত এসেছিলাম৷ তারপরই সেই প্রচণ্ড ধাক্কা৷ না না, কপালে নয় যাতে কপালটা আলু থেকে বিলিতি কুমড়ো হয়ে উঠতে পারে৷ ধাক্কা খেলাম প্রাণে৷
শুনতে পেলাম পাকা মেয়েটা বলছে, 'উঃ ! যাই ভাগ্যিস সাঁতার জানত নতুন মামা! তাই না-'
তার কথা থামিয়ে দেবদূতের হি-হি হাসি ঝনঝনিয়ে উঠল, 'তুই বুঝি ওই সব বিশ্বাস করেছিস? হুঁঃ৷ ও তো স্রেফ গুল!'
'গুল!'
'না তো কী? এক ঘণ্টা ধরে স্রেফ গুল মারল নতুন মামা!'
চোখে অন্ধকার দেখেও তখন পর্যন্ত দাঁড়িয়ে ছিলাম, পরের দু-লাইন শুনে আর পারলাম না, টেনে দৌড় দিয়ে সোজা চলে এলাম হাওড়া স্টেশনে৷ ছোড়দির বাড়ি থেকে নিজেদের বাড়ি৷ আহিরীটোলা থেকে উত্তরপাড়া৷
শেষ দু-লাইন? উঃ , ভাবলে সারা গায়ের ছাল ছাড়ানোর চাইতেও যন্ত্রণা হয়৷
পাকা মেয়েটা বলল, 'আহা! বড্ড যে চাল মারছিস এখন? তখন তো ভয়ে কেঁদেই ফেললি!'
দেবদূত বলল, 'দূর, ও তো বানিয়ে! নতুন মামা এত কষ্ট করে অত সব বানাল৷ আমরা একটু বানিয়ে বানিয়ে বিশ্বাসও করব না?'
আশ্বিন ১৩৬৮
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন