অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়
পবন দেবতার পাগলামির কথা তোমরা শুধু শোননি, নিজের চোখেই তার প্রমাণ পেয়েছ৷ ইনি দু-দণ্ড স্থির নন৷ সব দেবতাই নিয়ম মেনে চলেন, এঁরই শুধু খামখেয়াল৷ দক্ষিণে বাতাসের দিনে, হঠাৎ হু-হু করে পুবে বাতাস ঝড় তুলে ধুলো উড়িয়ে গাছপালা ভেঙেচুরে, নয়-ছয় করে বেড়ায়৷ তাইতো লোকে পাগলকে বলে, বায়ুরোগগ্রস্ত! এই তো স্বভাব তার উপর এক উপসর্গ জুটল, তিনি এক অপ্সরার ভালোবাসায় পড়লেন৷ সে কিন্তু তাঁর দিকে ভুলেও চায় না, সে শুধু আরাধনা করে তপনদেবকে! পবনদেব সদাই অন্যমনস্ক, উনপঞ্চাশ বায়ু তার শাসন মানে না৷ কখন কোথায় দিয়ে হুস করে বেরিয়ে পড়ে দশদিক তোলপাড় করে বেড়ায়৷ এতে সব চেয়ে দুঃখ হয় বরুণের৷ সাগরের জলে তাল গাছ প্রমাণ ঢেউ উঠে আপসে পড়ে৷ বারুণীর প্রাসাদে সাগর জলে এই লম্ফঝম্প দেখে সকলের জলাতঙ্ক উপস্থিত হল৷ এদিকে নদী-বধূদের প্রাণান্ত৷ তাদের তুলে তটের উপর এমনি আছাড় দেয় যে, তারা পরিত্রাহি ডাক ছেড়ে, সাগরের কাছে যখন-তখন ছুটে এসে কাঁদে আর নালিশ করে৷ বরুণ তো তিতিবিরক্ত হয়ে দেবরাজ ইন্দ্রের কাছে দরখাস্ত দিলেন৷ বিচারে ঠিক হল, পবন দেবতা কিছুকাল গিয়ে মলয়াচলে নির্বাসন দণ্ড ভোগ করুন, বৎসরান্তে স্বর্গে ফিরবেন৷ তবে বসন্তের আরম্ভে তখন হতে দু-মাসের জন্যে বৎসরে বৎসরে তাঁকে মলয় পর্বতে আসতে হবে৷ স্বর্গহারা পবন ভারতবর্ষের দক্ষিণে শ্রেষ্ঠী শোভন দাস হয়ে জন্মালেন, আর সেই অপ্সরাকেও পৃথিবী বাসে আসতে হল৷
মলয় পর্বত চির বসন্তের দেশ, শোভন দাস সেইখানে বসতি করলেন৷ সবুজ পান্না দিয়ে গড়ানো তার বাগানবাড়ি, দুধের মতো সাদা পাথরের জালিকাটা দরজা জানালা, ফুরফুর সুগন্ধ বাতাস, তারই মধ্যে দিয়ে অনবরত ঝিরঝির করে যাওয়া-আসা করত৷ চন্দনের শীতল গন্ধে চারিদিক ভরপুর, চারিদিকে রাশি রাশি ফুল৷ পথে পথে অশোক পলাশ, ঘাটে ঘাটে কমল, আর বনে বনে চাঁপা, মুচুকন্দ, কাঞ্চন, করবী, বসন্তের যত ফুল, সবাই মিলে সারা বছর ধরে সেখানে রূপের হাট বসিয়ে রাখে৷ সবুজ পাতার পোশাক পরা তাজা উঁচু গাছগুলিতে পা বেয়ে উঠে, আঙুরলতা সারা গা ছেয়ে রয়েছে৷ টলটলে মিষ্টি রসে-ভরা থোলো থোলো সুগোল নিটোল ফলের রাশি সাজানো ছোটো ছোটো আলোর ফানুসের মতো চারিদিকে ঝুলছে৷ গাছগুলিকে মনে হয়, বসন্ত ঋতু বর হয়ে আসছেন তাই পথের ধারে ধারে শোভাযাত্রার ফাটক বাঁধা হয়েছে৷ রাতদিনই পাখির গান, মৌমাছির গুণগুণ৷ শাপগ্রস্ত বায়ু দেবতার ধরন-ধারণ একেবারেই বদলে গেল৷ চঞ্চলতার আর কোনো চিহ্নই নেই, ফুলবাবুটির মতো শান্ত-শিষ্ট, আলগোছে কোঁচা তুলে ধরে ধীরে ধীরে চলেন৷ সেই যে আকাশ পৃথিবী আর সমুদ্র তোলপাড় করে বেড়াতেন, জন্মান্তরে তার স্মৃতি পর্যন্ত রইল না৷ শোভন দাস সুখী মানুষ, শৌখিন তাঁর চালচলন, কথা তাঁর মধুর, গতি অতি মৃদুমন্দ৷ সবাই তাঁকে ভালোবাসত৷ একদিন শোভন দাস বীণাটি হাতে করে আরাম আসনে আনমনে দূরে উত্তর দেশের খোলামাঠের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে বসে আছেন-দেখলেন, লম্বা দোদুল ঘাসের গুচ্ছের মাঝখানে কে একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে৷ মাথায় সে সেই ঘাসের চেয়ে উঁচু৷ এই ঘাস ছোটো বাঁশ-জাতীয়৷ ছিপছিপে মেয়েটি এত সরু হালকা বাঁশের চেয়ে মাথায় বড়ো বলে তার মুখখানি দেখা যাচ্ছে৷ মুখখানি বড়ো সুন্দর আর মনে হল চেনা মুখ কতবার যেন দেখেছেন, কেবল মনে হচ্ছে না কোথায় দেখেছিলেন৷ পরনে সবুজ ঘাঘরি, মাড়োয়াড়ি মেয়েদের মতো, একটু নড়লেই ঢেউয়ের মতো দুলে দুলে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে৷ মাথায় একখানি ফুরফুরে সোনালি ওড়না, ভোমরার মতো কালো চুল, মুখখানি প্রফুল× চোখ দু-টি আনন্দে উজ্জ্বল, সূর্যদেব যখনই যেদিকে ফিরছেন সেও সেই দিকে চেয়ে ঘুরে হাত জোড় করে দাঁড়াচ্ছে৷
মেয়েটির জমকালো সাজ আর নরম মুখখানির দিকে শোভন দাস অবাক হয়ে চেয়ে রইলেন৷ বড়ো ইচ্ছে কাছে গিয়ে ডেকে এনে, চিরসঙ্গী করে নেন, কিন্তু কী যে আয়েশি হয়ে পড়েছিলেন নড়া আর হল না, বসে বসে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলতে লাগলেন, তার উদ্দেশে গীত রচনা হতে লাগল, উঠে কাছে আর যাওয়া হল না৷ বসন্তের বাতাসে সে গান ভেসে এসে মেয়েটির কানে পৌঁছোল সত্যি কিন্তু মনোযোগ আকর্ষণ করল না৷ ঘাসের ঝুরঝুর শব্দের সঙ্গে মিশে কোথায় দূরে প্রতিধ্বনির মতো ক্ষীণ হয়ে মিলিয়ে গেল৷ দিনের পর দিন শোভন দাস দূরে বসে আকুল হয়ে চেয়ে থাকেন৷ দেখেন, ভোরের আলোর দিকে মুখ করে মেয়েটি জেগে উঠে হাত জোড় করে সেই আলোকে প্রণাম করে৷ সারাদিন তারই দিকে চেয়ে তারই আরাধনা করে৷ ভরা দুপুরে সূর্যদেব ঠিক যখন মাঝ আকাশে এসে দাঁড়ান, পৃথিবীর দিকে চেয়ে দেখেন, তখন সে তার মুখখানি একেবারে তুলে ধরে, ঘোমটা খসে যায়, কালো চুল চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে৷ বাতাসের দোল পেয়ে তার তনু দেহখানি কেঁপে কেঁপে ওঠে, মাজা রুপোর রঙের দুপুরের সাদা আলো তার মুখের উপর ছড়িয়ে পড়ে, বিজুলির মতো উজ্জ্বল দেখায়৷ এমনিভাবে দিনের পর দিন যায়, একদিন আকাশে মেঘ দেখা দিল৷ চারিদিক কালো ছায়ায় অন্ধকার করে, ধুলো ঝড় উঠে এল৷ সূর্যদেব আর দেখা দিলেন না, চোখের জলের ধারার মতো পৃথিবীর বুক ভাসিয়ে বৃষ্টি নেমে এল৷ দখিন বাতাস তখন দেশ হতে চলে গেছে৷ হু-হু করে পুবে বাতাস কোথা হতে এসে পড়ল৷ সেই যে সরু লম্বা শরের মতো বাঁশের সারি সারাদিন ধরে পিছনে পর্দার মতো দুলত, যার সমুখে সাজানো মূর্তির মতো মেয়েটিকে রোজ দেখা যেত, সেদিন দেখলে পর্দা ছিঁড়ে ভুঁয়ে পড়ে গেছে মেয়েটির ঘাঘরি আর সোনালি ওড়না ধুলোমাখা, তার টকটকে গায়ের রং ফ্যাকাশে, কালো চুলের রাশ ভিজে কুণ্ডলী পাকিয়ে গিয়েছে৷ দু-এক দিনের মধ্যে সে বিষণ্ণ মূর্তিও আর দেখা গেল না৷
দুঃখী শোভন দাস তখন আর স্থির থাকতে পারলেন না, উঠে এসে খুঁজতে লাগলেন, কিন্তু তখন সে নিরুদ্দেশ৷
শীতের চর এলোমেলো উত্তরে বাতাস কুয়াশার ডানা মেলে উড়ে এল-আলো আসার পথ রোধ হল, দশদিক অন্ধকার হয়ে গেল৷ অন্ধকারে পথহারা শোভন দাস বাতাসের ধাক্কায় লাঞ্ছিত হয়ে ঘরে এলেন৷ পাহাড়ের চূড়ায় বরফ দেখা দিল যেন সাদা পালক ছড়িয়ে পড়েছে৷ বসন্ত কোথায় অন্তর্ধান হলেন, তখন স্বর্গ দূতেরা তাঁকে দেবসভায় ফিরে নিয়ে গেল৷ সেখানে গিয়ে তাঁর স্মরণশক্তি জেগে উঠল, শোভনা অপ্সরাকে মনে পড়ল, কিন্তু তার দেখা আর পেলেন না৷ তপে তুষ্ট হয়ে সূর্যদেব তাকে তাঁর জ্যোতির্ময় প্রাসাদে স্থান দিয়েছিলেন৷ ভোরের বেলা অরুণ সারথির আলোর রথে যখন তিনি আকাশের পথে যাত্রা করেন, তখন হতে সারাদিন ধরে সে ফুলের মতো দেখতে সোনার ছাতা তাঁর মাথার উপর ধরে থাকে- কিরণের ছটা চারিদিকে দেখা যায়৷ শীত গেলে বসন্ত আবার দেখা দিল৷ মাঠে সবুজ ঘাসের বিছানা বিছানো হল, পবনের মলয়াচলে ফিরবার দিন এল, আর যেখানে শোভনা অপ্সরা তপস্যা করেছিল, সেখানে রাশি রাশি সূর্যমুখী ফুটে উঠল-এরা চিরদিন তারই মতো একাগ্র মনে ভোর হতে সন্ধ্যা পর্যন্ত সূর্যদেবের আরাধনা করে৷
(বিদেশি গল্প অবলম্বনে)
আষাঢ় ১৩৩২

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন