অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়
সূর্যটা লাল থালার মতো সমুদ্রের উপরে যখন উঠল, লালে লাল হয়ে গেল আকাশ৷ ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘগুলো সব রং মেখে ভেসে বেড়াতে লাগল আকাশজুড়ে৷ ও মেঘে বৃষ্টি হয় না৷ কে বলবে আজ থেকে ঠিক বারোদিন আগে আকাশজুড়ে কালো মেঘের তাণ্ডব শুরু হয়েছিল, আকাশ ভেঙে পড়েছিল, সঙ্গে ঝড়-তুফান! খেপে উঠেছিল সাগর৷ দু-দিন ঘরে বসে থেকে ভোরের খেপে মাছ ধরতে যারা বার হয়েছিল তাদের দলের সকলেই একে একে ফিরে এসেছিল দু-দিন পরে৷ শুধু ফেরেনি একদল, তাদের মাঝেই পঞ্চুর বাপ হিরু জেলে, আর তার নৌকোর অন্য সকলে, গজুদাদা, ভূপেনকাকা, বিষ্টুকাকা আর মদন ভাই৷ তারাই হিরু জেলের সঙ্গী ছিল৷
সূর্য উঠলে সাগরের জলের রং বদলায় না৷ তবে দূরে আরও দূরের সবকিছু কেমন যেন পরিষ্কার হয়ে ওঠে, তখন স্পষ্ট দেখা যায় আকাশটা যেখানে বেঁকে গিয়ে সাগরে ডুব মেরেছে, সেই জায়গাটা৷ ওখানেই কোথাও আছে নতুন কোনো দেশ৷ সেখানেই ঝড়ের দাপটে ভেসে গেছে পঞ্চুর বাপ তার দলবল নিয়ে৷ আসবে তাই কোনোদিন ঠিক ফিরে, আবার তাদের নাও ভাসিয়ে৷ আসবে সামনের ওই বড়ো বড়ো ঢেউ পাড়ি দিয়ে৷ উঃ , কত ঢেউ সাগরে, ঢেউয়ের পর ঢেউ!
রোজ সকালে পঞ্চু এসে তাই দাঁড়ায় সাগর তীরে৷ চোখ বড়ো বড়ো করে তাকিয়ে থাকে সেই দূরের দিকে, যেদিকে গাঁয়ের সবাই গেছে তাদের নাও ভাসিয়ে মাছ ধরতে৷ তারা যখন ফিরবে, তখন তাদের সঙ্গেই ফিরে আসবে ওর বাপ তার দলবল নিয়ে৷ নাও ভরতি থাকবে মাছে৷
বড়ো বড়ো ঢেউগুলো এখন যতই আছাড়িপিছাড়ি করুক না, তা পাড়ি দিয়েই ফিরে আসবে ওর বাপ৷ একথা জানে পঞ্চু৷ জানে বলেই না রোজ সকালে এসে দাঁড়ায় সাগরতীরে৷
ওর মা কেন যে রাতে লুকিয়ে কাঁদে, তা বোঝে না পঞ্চু৷ ওর ঠাউরদা, যাকে পাঁচখানা গাঁয়ের জেলেরা মান্য করে, আপনি আজ্ঞে, কাকা জ্যাঠা বলে কথা বলে, সেই ঠাউরদা তো ওই সাগরের সব কথাই জানে৷ ঠাউরদাই তো ওকে বলেছে, 'আইবো, আইবো রে হিরু ফিইর্যা, দেহিস৷ তুই রোজ হক্কালে গিয়া সাগর তীরে খাড়াইয়া থাকিস৷'
ঠাউরদা ওর সবার বড়ো৷ এতদিন বসে বসে শুধু হুঁকো টানত৷ ভুড়ুক ভুড়ুক করে৷ ঝড় থামতেই ঠাউরদাও ওর বৈঠ্যা কাঁধে তুলে নিয়ে সাগরের তীরে গিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল৷ ভজনকাকাকে ডেকে বলেছিল, 'ভজইন্যারে, আজ থেইক্যা আমিও তগো লগে যামু৷'
ভজনকাকা ব্যস্ত হয়ে বলেছিল, 'কী যে কয়েন কাকা, আপনে যাইবেন ক্যান? আমরা নিচ্চয় করছি হক্কলেই কিছু কিছু হিস্যা ছাইড়া দিয়া আপনাগোরে দেখুম৷ আর আমাগো পোনচু তো দ্যাখতে দ্যাখতে বড়ো হইয়্যা যাইবো৷ তখন ও নিজেই সাগরে যাইতে পারবো৷ কয়টা দিন সবুর করেন কাকা৷'
সেকথা শোনেনি ওর ঠাউরদা৷ সেই থেকে রোজ যাবে সাগরে৷ একদিন পঞ্চু জিজ্ঞাসা করেছিল, 'ও ঠাউরদা, তুমি যে কইল্যা বাপে আমার ফিইর্যা আইবো, তা হ্যায় আয়ে না ক্যান? তুমি রোজ নাও ভাসাইয়া যাও, আরও একটু আগাইয়া গিয়া দেহ না ক্যান, কোন চড়ায় উঠছে আমার বাপ?'
বারো দিন আগে আকাশ অন্ধকার করে সাগরে তুফান উঠেছিল বিকালে৷ তুফানের মাস৷ হাঁক দিয়ে বাতাস ছেড়েছিল৷ পাহাড়প্রমাণ ঢেউ উঠেছিল সাগরে৷ তারপর দিক অন্ধকার করে নেমেছিল বৃষ্টি৷ ঠাউরদা মাথা নেড়ে বলেছিল, 'লক্ষণ ভালো বুঝি নারে হিরু, এ হইল কালাপানির তুফান, নাগাড়ে চলবো কয়টা দিন৷ আমি কই, কয়দিন আর সাগরে যাওনের কাম নাই রে৷ ঘরে বইয়া থাক৷ হগ্গলেরে খপর পাঠাইয়া দে৷'
পঞ্চুর বাবা হিরু রাগ করে বলেছিল, 'ইডা তুমি কইলা কী? জানো, গত দুই দিন কারও জালে তেমন কিছু পড়ে নাই৷ ঘরে ঘরে অরন্ধন চলতাছে৷ বইয়া থাকলে গুষ্টিসুদ্ধু না খাইয়া মরুম৷'
ঠাউরদা তবুও বলেছিল, 'মাছ মারা আপিসে গিয়া দেইখ্যা আয় তুফানের সিনগ্যাল দিছেনি? দিলে আর যাইস না বাপ৷ দু-দিন না খাইলে মানুষ মরে না৷'
দু-দিন চুপচাপ বসেছিল সকলে তারপর কারও কথা শোনেনি পঞ্চুর বাপ৷ শোনেনি অন্য কোনো জেলে৷
তুফান যখন থামল, এক-এক করে ফিরে এল সবাই৷ ফিরে এল না পঞ্চুর বাপ হিরু জেলে তার দলবল নিয়ে৷ দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঠাউরদা ওর বলেছিল, 'আইবো, ফিইর্যা আইবো, দেহিস৷'
দূর আকাশের গায়ে কালো কালো বিন্দুগুলো দেখা গেল৷ পঞ্চু এক দুই করে গুনতে থাকল৷ নয় দল ভোর রাতে নাও ভাসিয়েছিল৷ ছ-টা কালো বিন্দু ও দেখতে পেয়েছে৷ ঠিক গুনেছে তো ও! এক দুই তিন . . . পাঁচ সাত আট . . . না না, এক দুই তিন চার পাঁচ ছয়, . . . ওই, ওই আর একটা, ওই আর একটা, ওই তো তার পিছনেই আর একটা৷ তার মানে তো সবগুলোই হল৷ এইবার ও বড়ো বড়ো চোখ করে তাকিয়ে থাকবে৷ নিশ্চয়ই তাহলে ও আর একটা কালো বিন্দু দেখতে পাবে, কত দূর দেশ থেকে আসছে তারা, নাও বোঝাই মাছ নিয়ে! বিন্দুগুলো বড়ো বড়ো হয়ে উঠল৷ একসময় সেগুলো নাও বলে বোঝা গেল৷ কিন্তু ওই, মাত্র ন-টা! ভিন দেশ থেকে নাওটা ওর আজও ফিরে এল না! একটা একটা করে তো দশটা দিন গেল!
বালিতে পায়ের আওয়াজ হতেই ও ফিরে তাকাল৷ যা ভেবেছে ও তাই৷ ফুটফুটি এসে দাঁড়াল ওর পাশে৷ বলল, 'গুনছসনি ঠিক কইর্যা রে পোনচু?'
পঞ্চু বলল, 'হ, গুনছি রে, ফুদবুদি, হ্যারায় আসে নাই৷'
দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফুটফুটি বলল, 'আইবো না, হ্যারায় কেউ৷ আর ফিরবো না রে পোনচু৷ তর ঠাউরদায় মিছা কথা কইছে৷ তুফানে নাও ডুবি হইয়া সক্কলে মইর্যা গেছে৷ তর বাপ, আমার বাপ, দুলার কাকায়, আর লখার দাদায়৷ হেই সঙ্গে গজাদাও ভাইস্যা গেছে৷ তার কেউ নাইরে কান্দনের৷'
ভীষণ রাগে পঞ্চু বলল, 'মুখপুড়ি, তুই আইছস ক্যান এইহানে? কে তরে আইতে কইছে? ঘরে গিয়া তুই বইয়া বইয়া কাঁদ গিয়া৷ তরে তো আমি ডাকি নাই৷'
ফুটফুটি একথা শুনেও জায়গা ছেড়ে নড়ল না৷ হাত তুলে এক এক করে সাগরের বুকের কালো বিন্দুগুলি আপন মনে গুনতে লাগল৷ 'এক, দুই, তিন . . . তিন . . . হ্যা রে পোনচু আজ কয়খান নাও ভাসছিল রে?'
গম্ভীর ভাবে পঞ্চু বলল, 'নয়খান৷'
শুনে কেমন যেন ছটফট করে উঠল ফুটফুটি৷ শূন্যে হাত নেড়ে নেড়ে ও সাগর থেকে ফেরা কালো বিন্দুর মতো নৌকোগুলো গুনতে লাগল৷ একসময় প্রায় চেঁচিয়েই উঠল, 'পোনচুরে, আমি জ্যান দেহি দশখান নাও ফিইর্যা আইতাছে!'
কেমন যেন করে উঠল পঞ্চুর বুকের মধ্যে৷ পরক্ষণেই মনে পড়ল ওর, ও আর ফুটফুটি দু-জনেই ভালো করে গুনতেই জানে না৷ কতর পর কত হলে যে দশ হয় তা আর তাহলে ফুটফুটি জানবে কী করে! তবুও ও ওর বুদ্ধি মতো ফের গুনতে চেষ্টা করল, এক দু . . . আরে, দশখানাই তো! না, না, তিনের পর চার, কখনো কি পাঁচ হতে পারে! তাহলে . . .! ও বলল, 'তরে লইয়া আর পারুম না রে ফুদবুদি, লিখা পড়া তো শিখলি না, নয়রে তাই দশ কইতাছস! তাকাইয়া দ্যাখ ভালো কইর্যা, কয়খান নাও আইতাছে৷'
মুখটা ম্লান হয়ে গেল ফুটফুটির৷ যে আশা জেগেছিল ওর মনের কোণে, তা নিমেষে মুছে গেল৷ পঞ্চুর বাপের নৌকোতেই তো ওর বাপও ছিল৷ একজন ফিরলে তো অন্যজন ফিরবে! বলল, 'আমি তো হেই কথাডা জানিরে পোনচু৷ ত্যানেরা আর ফিইর্যা আইবো না রে৷ তর বাপ আর আমার বাপে৷ সাগরেই তাগো নিছে!'

'হ, হ, তুই না হগল কিছুই জাইন্যা বইসা আছস!' ভীষণ রাগে ভেংচি কেটে বলল পঞ্চু৷
'আমার মায়ে কইছে৷ মায়ে তো শাখা ভাইঙ্গা ফেলাইছে৷ কপালে সিঁদুর মুইছ্যা ফেলাইছে৷ দাদারে কইছে, ঝড়-তুফান হইলে তরে আর আমি সাগরে যাইতে দিমু না৷ না খাইয়া মরুম, হ্যাও বালা৷'
'আমার মায়েও রাইতে লুকাইয়া কান্দেরে ফুদবুদি৷'
'তয়?'
'কিন্তু ঠাউরদায় যে কইছে৷'
'হ্যায় তরে পোলাপান দেইখ্যা ভুলাইছে৷'
'মিথ্যা কইলে হ্যাসে পাপ অইবো না?'
'এই মিথ্যায় পাপ নাইরে পোনচু৷'
হঠাৎ আবার ভীষণ রাগে চেঁচিয়ে উঠল পঞ্চু৷ বলল, 'তুই চইল্যা যা এইহান থিক্যা৷ অলক্ষ্মী মুখপুড়ি, তুই সব জাইন্যা বইস্যা আছস! যাঃ, যাঃ গেলি, তর লগে আড়ি, আড়ি৷'
'ক্যান রাগ করস৷ আমি ঠিকই কইছিরে পোনচু৷'
'তরে না দূর হইয়া যাইতে কইলাম৷ তর লগে আড়ি কইলাম না? তর লগে আর আমি কথা কমু না৷ চইল্যা যা তুই৷'
করুণ মুখে ফুটফুটি তাকিয়ে রইল পঞ্চুর দিকে৷ চলে গেল না ও! ও তো জানে পঞ্চুর মনে কত দুঃখ৷ তা ছাড়া পঞ্চু তো ওর থেকে ছোটো৷ ছোটোরা সব কিছুই বুঝতে চায় না৷ ওর দাদা তো বলেছে, 'ঠাউরদার হগল কথাই মিছা৷ হিরুকাকার নাও তুফানে ডুবছেরে ফুদবুদি৷ সাগরের কূলকিনারা নাইরে, তার মাঝে চড়া আইবো কোথা থিক্যা? হিরুকাকার নাওয়ের লগে আমাগো বাপও ডুবছেরে, আর ফিইর্যা আইবো না রে কোনোদিন৷' ওর দাদা আরও বলেছে, 'এহন আমি যামু সাগরে মাচ মারতে, আমি ডুবলে তরা না খাইয়া মরবি৷'
ফুটফুটির তাই ভীষণ ভয়৷ রোজ ভোর রাতে ওর দাদা যখন ঘুম থেকে ওঠে, মা পান্তা আর লঙ্কা এগিয়ে দেয় তাকে, ওরও তখন ঘুম ভেঙে যায়৷ ও উঠে বসে৷ ওর দাদা পান্তা গিলতে গিলতে বলে, 'তয় উঠলি ক্যান? হুইয়্যা পর, হুইয়্যা পর৷ রাইত অনেক বাকি৷'
মা ওর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, 'অর নি বড়ো ডররে ন্যাপলা, বাপেরে সাগরে খাইছে, ভাইরে না খায়৷ আমারে কথা দে ন্যাপলা, সাগরের হাল ব্যাহাল দ্যাখলে ফিইর্যা আইবি৷ উপাস দিমু সেও বালা৷ তরে আর হারাইতে পারুম না৷'
হা-হা করে হাসে নেপাল৷ ওর মুখের ভাত ছিটকে পড়তে থাকে! ঢোক গিলে ও বলে, 'কী যে কও তার ঠিক নাই৷ হগ্গলেরই পরাণের ডর আছে না? বেহাল দ্যাখলে কে যাইবো কও সাগরে?'
পান্তা খেয়ে উঠে পড়ে নেপাল৷ ও জানে, মাছমারাদের ঘরে সব সময়ই সব কিছু বাড়ন্ত৷ ঝড়-তুফান কি আর তাদের ঘরে আটকে রাখতে পারে! বার হয়ে পড়ে ও৷
ফুটফুটি ওর দাদার যাবার পথের দিকে বড়ো বড়ো চোখ করে তাকিয়ে থাকে৷ ঠিক কিছু ও ভাবতে পারে না৷ দু-চোখে ওর তখন রাজ্যের ঘুম৷ মা কুঁড়ের দোর বন্ধ করে, লম্ফ নিবিয়ে ফের এসে ওর পাশে শুয়ে পড়ে৷ ঘুম-জড়ানো চোখে হাই তুলে আপন মনেই বলে, 'বদর বদর৷'
যেদিন পারে ফুটফুটিও বলে, 'বদর বদর৷' ওতে নাকি সাগরে যারা যায় তাদের ভালো হয়৷
ছাই হয়৷ ঝড়ের রাতে ওর বাবা যখন বার হচ্ছিল, মা কত মানা করেছিল৷ দাদা বলেছিল, 'আজ আর যাওনের কাম নাই, ঘরে যা আছে তাতেই চইল্যা যাইবো৷' বাবা তখন ওর সে কথা শোনেনি৷ তখন মা তো দু-হাত ঠেকিয়ে জোরে জোরে চেঁচিয়ে বলেছিল, 'বদর বদর৷' কিন্তু বাবা আর ওর ফিরে আসেনি!
ঘুম ভাঙলেই ফুটফুটির মনে পড়ে যায় ওর দাদার কথা৷ দাদা ওর সাগরে গেছে৷ ও ধড়মড় করে উঠে বসে৷ আকাশের দিকে তাকায়৷ আপন মনে বলে বদর বদর৷ তারপর পায়ে পায়ে এসে দাঁড়ায় সাগর তীরে৷ ও জানে, ওর আগেই পঞ্চু এসে দাঁড়িয়ে থাকবে ওখানে৷ ফুটফুটি আসে ওর দাদার জন্য, কিন্তু বোকা ছেলেটা এখনও আসে বাপের খোঁজে৷ বড়ো ছোট্ট ও তো, এখনও তাই বোঝে না কিছুই৷ আ হা রে!
নৌকোগুলো স্পষ্ট দেখা গেল৷ বড়ো বড়ো ঢেউয়ের মাথায় নাচছে৷ মানুষজন চেনা যাচ্ছে না৷ দাঁড় পড়ছে ঘন ঘন৷ একসময় রোদে জলে পোড়া কালো কালো মানুষগুলোকেও স্পষ্ট দেখা গেল৷ ফুটফুটি দেখতে পেল তার দাদাকে৷ ওর মুখে হাসি ফুটে উঠল৷ খুশিতে ও বলল, 'চল পোনচু আমরা শোচিনকত্তার কাছে গিয়ে জিগাই৷ হ্যার কাছে নি কোনো খপর আইছে৷ হ্যায় মানুষটা বালা৷ টেলিফোক কইর্যা চারিদিকে খপর লইবো অনে, চল, যাবি?'
ঠাউরদার নৌকোর দিকে বড়ো বড়ো চোখ করে তাকিয়ে থেকে পঞ্চু বলল, 'যামু৷ আগে ঠাউরদার লগে বোঝাপড়া কইর্যা লই৷ হ্যায় ক্যান মিছা কথা কয়৷'
অবাক ফুটফুটি বলল, 'কী কইলি! তর পেত্যয় অইছে!'
একথার কোনো উত্তর দিল না পঞ্চু৷ কী-ই-বা ওর বয়স৷ ও বোঝেই-বা কী৷ ওর বাবাকে ও ফিরে পেতে চায়৷ ও যে জানে, ওর বাবা ছিল বড়ো মাঝি৷ সেই কাটাকাটি মারামারির পর দেশ ছেড়ে এ দেশে এসে, ওর বাবাই তো ঠাউরদার সঙ্গে মিলে প্রথমে সাগরে নাও ভাসায়৷ তারপরই না এক-এক করে অন্য সবাই এসেছে এখানে৷ ওর বাবা ঝড়-তুফান পাড়ি দিতে না পারলে কীসের বড়ো৷
নৌকোগুলো পাড়ে ভিড়ল এক-এক করে৷ ভেড়ার আগেই গাঁয়ের সবাই ভেঙে পড়ল সেখানে৷ এগিয়ে এল পাইকার আর ব্যাপারীরা৷ এক-এক নাওয়ের বড়ো মাঝি একাই দরদাম নিয়ে মাথা গরম করে৷ অন্যরা তখন জাল গোটায়, মাছ ভাগ করে৷ শেষমেষ নৌকো ঠেলে পাড়ে তোলে৷ যাতে জোয়ারে ফের না ভেসে যেতে পারে ওগুলো৷ এসব কাজ হয়ে গেলে বিড়ি ফোঁকে৷
পঞ্চুর ঠাউরদা তো আর বড়ো মাঝি নয়৷ অন্যর নাওয়ে জন খাটা জেলে৷ বয়স অনেক, তাই কেউ আর ওকে নৌকো ঠেলতে বলে না৷ মাছ ভাগ শেষ হলেই ও বিড়ি টানতে টানতে উঠে আসে নাতির কাছে৷ নাতি কিছু বলার আগেই বলে, 'আজও পাই নাইরে পনচা৷ চড়ায় নাইম্যা এইদিক-ওইদিক কত খুজছি৷ আমি যহন এই পাশে যাই হ্যায় তহন ওই পাশে৷ বুঝলি, খপর নিচ্চয় পাইছে৷ আইয়া পড়ল বইল্যা৷ কয়ডা দিন আরও সবুর কর৷'
ঠাউরদার একটা হাত ধরে টানতে লাগল পঞ্চু৷ বলল, 'পিথিমির শ্যাষ আছে, সাগরের শ্যাষ নাই৷ বাপে আমার আর ফিরবো না৷ আমি এহন বুঝছি৷ ক্যান তুমি আমারে মিছা কইলা, কও, ক্যান এতগুলান মিছা কইলা, আমার দুস্কু হয় না?' কথাগুলো চাপা কান্নায় ভারী হয়ে গেল৷ ঠাউরদার হাত ধরে ও ঝাঁকাতে লাগল৷ দু-চোখ ওর জলে টলটল করে উঠল৷
আশেপাশের সবাই থমকে কাজ বন্ধ করে দিয়েছিল৷ এমন ঘটনা তো ওদের জীবনে কত বারই ঘটেছে৷ তবুও ওরা এমন করেই থমকে যায় প্রতিবার৷
হর্ষনাথ এগিয়ে এসে খপ করে পঞ্চুকে কাঁধে তুলে নিল৷ অবিনাশ তার পিছনে হাত তালি দিয়ে নাচের ভঙ্গিতে খেঁদি নাকি সুরে বলল, 'ছিঃ ছিঃ, এত বড়ডা হইছস, এহনও তর চক্ষুতে জল আহে! লজ্জা করে না তর! আজ বাদে কাল না সাগরে যাবি আমাগো লগে?'
ঠাউরদা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, 'কাইন্দা করবি কী? কাইন্দা ভাসাইলে আইবো নাকি হ্যায় ফিইর্যা? হইত্য মিথ্যার বুঝস কী তুই? যা কইছি, কইছি৷ পেত্যয় না অইলে আমার তো আর করনের কিছু নাই৷'
অবাক হল পঞ্চু, ঠাউরদার এমন রাগ দেখে৷ ঠাউরদা তো কখনো রাগ করে না৷
ও তড়বড় করে হর্ষনাথের কাঁধ থেকে নেমে পড়ল৷ চোখের জল মুছল না৷ ঠাউরদার দিকে মুখ করে বলল, 'এই আমি তোমারে কইত্যাছি, আমি ইহ জীবনে সাগর যামু না, যামু না, যামু না৷ না খাইয়া মইর্যা যামু, তবুও যামু না৷' টপ টপ করে দু-ফোঁটা জল ঝরে পড়ল ওর দু-চোখ থেকে৷ ওখান থেকে ছুটে চলে যাবার আগে শেষ বারের মতো চেঁচিয়ে বলে গেল, 'বুড়া হইছে, হ্যায় তবুও মিছা কয়৷ কইল ফিইর্যা আইবো৷ মিথ্যাবাদী, মিথ্যাবাদী৷' যে দিকে দু-চোখ যায় ও চলতে লাগল৷
ফুটফুটিও ছুটল ওর পিছন পিছন৷ ছুটে কাছে গিয়ে বলল, 'শোচিনকত্তার কাছে যাইবি না? হ্যায় কিন্তুক অনেক খপর রাহে৷ চল যাই গা তার কাছে৷'
পঞ্চু ভীষণ রাগে ওর দিকে ফিরে বলল, 'মুখপুড়ি, আইতাছস ক্যান আমার লগে? আমি কোথাও যামু না৷'
তবুও ফুটফুটি বলল, 'চোখের জল মুইছ্যা ফেলারে পোনচু, ওই দিকে যাইস না৷ এই দিক দিয়া গেলে না সিধা অইবো৷ শোচিনকত্তায় মানুষটা বালা৷ হ্যার মনে দয়ামায়া আছে৷ চল, তার কাছে যাই৷'
শচীন ব্যানার্জি ফিশারি অফিসার৷ পাকা রাস্তার ধারে পাকা দালানে তার অফিস৷ তারই এক পাশে তার পাকা কোয়ার্টার৷ মানুষ সত্যিই ভালো৷ জেলেদের সত্যিকারের বন্ধু৷
এ দেশের সব কিছু চলে সরকারের সুবিধার জন্য৷ আর মন্ত্রীরাই তো সরকার, কিন্তু তারা তো আর মাছ ধরা জেলে নয়৷ তাই জেলেদের যখন যা দরকার তার উলটো জিনিসের আইন পাশ হয়৷ তারই মাঝে শচীনকর্তা যা পারেন তা করেন প্রাণপণ৷ সবাই তাই ওঁকে মান্য করে, ভালোবাসে৷ বিপদে-আপদে ওঁরই কাছে ছুটে আসে বুদ্ধি পরামর্শ নিতে৷ জেলেপাড়ার ছেলে-মেয়ে বাচ্চা-বুড়ো সবাই এ কথা জানে৷ জানে, খাঁটি বেরাম্ভন মানুষটা সবার ছোঁওয়া জল খায়! ছোটো-বড়ো ভেদাভেদ জ্ঞান নেই তাঁর৷
বড়ো ফটকের পাশেই নাজির দাঁড়িয়ে ছিল৷ সে-ই হল অফিসের আর্দালি৷ পঞ্চু আর ফুটফুটিকে দেখেই বলল, 'কে তোরা রে? কী মনে করে?'
ফুটফুটি বলল, 'আমরা শোচিনকত্তার কাছে যামু নাজিরচাচা৷'
'কেন? কী তোদের দরকার?'
'তুমি তো শুনছ, অর বাপ আর আমার বাপ একই নাওয়ে ভাইস্যা গেছে৷ আর ফিরস্ত আসে নাই৷'
নাজির স্থানীয় লোক৷ একটু ঝুঁকে দেখে বলল, 'তুই ফুদবুদি, অর ওই বুঝি পোনচু?'
'হ৷ ঠিকই কইছ চাচা৷' বলল ফুটফুটি, 'শোচিনকত্তায় উঠছেন নি?'
'না রে, সাহেব এখনও ওঠেনি৷ তোরা পরে আয়৷ সাহেব তোদের অনেক খপর দেবে৷ বাড়ির লোকদের আসতে বল গিয়ে৷ বুঝলি? তোরা না এলে, আমিই যেতাম ডাকতে৷'
বড়ো বড়ো চোখ করে ফুটফুটি বলল, 'কী কইল্যা নাজিরচাচা? শোচিনকত্তায় খপর দিব নি? কীসের খপর? পোনচুর ঠাউরদায় বুঝি মিছা কয় নাই?'
নাজির বলল, 'আহা, এখনই অমন করছিস কেন? আয় আয়, কিছুক্ষণ পরে বাড়ির সবাইকে নিয়ে৷ ক-দিন ধরে সাহেব তো সারা দিন আর মাঝ রাত পর্যন্ত দূরে দূরে অনেক জায়গায় শুধু ফোনই করছেন৷ নিখোঁজ নৌকোর খোঁজে৷ দেখ, এখন কী খপ্পর দেন উনি৷'
তখনই কোয়ার্টারের বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন মাঝবয়সি একজন মানুষ৷ চেঁচিয়ে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, 'নাজির, ওখানে কে?'
নাজির খুশি হয়ে বলল, 'ওই তো সাহেব উঠেছেন৷ যা, যা, তোরা যা, দেখ কী বলেন৷'
বড়ো বড়ো পা ফেলে দু-জনে গিয়ে দাঁড়াল বারান্দার সামনে৷ শচীনকর্তা ঝুঁকে পড়ে দেখে বললেন, 'উঠে আয় উপরে৷ কী নাম, তোদের বল৷'
'আইজ্ঞা আমার নাম, ফুদবুদি৷' বলল ফুটফুটি, 'আর অ অইলো গিয়া আমাগো পোনচু৷'
'কেন এসেছিস এখানে?'
'ওই যে নাও ভাইস্যা গেছে, আপনে তো জানেন হগল কথা৷ ওই নাওয়ে ছিল অর বাপ আমার বাপে৷ আরও কয়জন, আপনে নাকি খপর দিবেন৷'
একথা শুনে করুণ হয়ে উঠল শচীনকর্তার মুখ৷ আবারও বললেন, 'আয় উঠে আয় উপরে কী খবর চাস তোরা? বাড়ির কেউ আসেনি কেন?'
পঞ্চু কথা বলতে পারে না তেমন৷ তাই ফুটফুটিই বলল, 'আইবো ক্যামনে? আমার দাদায় আর অর ঠাউরদায় তো রোজই সাগরে যায় মাছ ধরতে৷ ফিরনের পর তাগোর আর নড়নের ক্ষমতা থাকে না৷ হেই কারণেই তো আমরা দুয়োজনে আইছি৷ কী খপর আছে কন৷'
'ও গস!' কেমন করে যেন বললেন শচীনকর্তা৷ একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসে পড়লেন৷ বললেন, 'ঝড়ের দিন থেকে আমি চুপ করে বসে নেই রে৷ ফোনে রোজ সব জায়গায় যোগাযোগ করছি৷ মেদিনীপুরে ওরা পৌঁছোয়নি৷ কাল রাতে জানতে পারলাম, ওড়িশার কোস্টেও তারা পৌঁছোয়নি৷ এখন বাকি তামিলনাডু৷ সে বড়ো দূরের পথ রে৷ আমি ব্যবস্থা করেছি সমুদ্রপথে যত জাহাজ যাবে তারাও সবাই চারদিকে নজর রাখবে৷ হোম ডিপার্টমেন্টকে বলেছি শ্রীলঙ্কার সঙ্গে যোগাযোগ করতে৷ এতগুলো দিন কেটে গেল, এখনও কোনো খবর এল না, এখন দেখ শেষ পর্যন্ত কী হয়৷ দশ-দশটা দিন তো কম কথা নয়৷' এত কথা বলে শচীন কর্তার মনে হল, এত ছোট্ট ছেলে-মেয়ে দুটো এ সব কথার সঠিক মানে বুঝতে পারল তো? গভীর ভাবে নিশ্বাস ছাড়লেন উনি৷
বেশ রাগই হল পঞ্চুর৷ ও আর তাই চুপ করে থাকতে পারল না৷ বলল, 'কী যে কইলেন আপনে আমি বুঝি নাই৷ ফিরবেনি আমার বাপে আর অর বাপে? হেই কথাডা সহজ কইর্যা বলেন৷ ইনজিরি আমি বুঝি না৷'
ফুটফুটিও রাগ করেই বলল, 'এত খপর লইলেন আপনে, কিন্তুক আপনে তো তাগোর নামই জানেন না! তা অইলে বুঝবেন ক্যামন কইর্যা কে হারাইলো, কে আইলো না ফিইর্যা৷'
ভীষণ দুঃখে শচীনকর্তা বললেন, 'শোন, শোন, তোরা বাড়ি যা, গিয়ে বড়ো কাউকে পাঠিয়ে দে৷ তারা বুঝতে পারবে আমি কী বলতে চাইছি৷ তোরা তো বড্ড ছোটো রে৷'
ফুটফুটি ভীষণ রাগ করে বলল, 'আমরা আর ছোট্টো নাই৷ আমার দশ অইছে, পোনচুর সাত৷ আপনে ফের কইর্যা কয়েন কী কইলেন৷ আমরা বুঝুম৷'
ঠিক তখনই বড়ো ফটকের সামনে পঞ্চুর ঠাউরদা আর ফুটফুটির দাদাকে দেখা গেল৷ ওরা হন্তদন্ত হয়ে ভিতরে ঢুকল৷ কাছে এসে দু-জনেই ঝুঁকে হাত জোড় করে শচীনকর্তাকে প্রণাম জানাল৷
ওদের দেখে শচীনকর্তা প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন, 'কী, কী চাও তোমরা? কী করতে আর এসেছ? আমার কোন কথাটা তোমরা শোন, শুনি? যা যখন বলব, তার উলটো করবে৷ এখন এই বাচ্চা দুটোকে কী বলে বোঝাবে বল? আমি বারবার বলছিলাম না, আবহাওয়া ভীষণ হবে৷ নৌকো বার কোরো না৷ শুনেছিলে সে কথা তোমরা কেউ? তবে?'
পঞ্চুর ঠাউরদা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, 'আইজ্ঞা কর্তায় আমরা অগোরে লইয়া যাইতে আইছি৷ দুয়োজনায় রাগ কইর্যা আইছে আপনার কাছে৷ আপনেরে বুঝি জ্বালাইতে ছিল?'
শচীনকর্তা কিছু বলার আগেই ফুটফুটির দাদা বলল, 'তুই আইছস ক্যানরে ফুদবুদি? তরে তো কইছি আমি, নাও তুফানে ডুবছে৷ তারা হগ্গলে মরছে৷ আর তো ফেরনের কথা নাই৷ পোনচু না হইল পোলাপান, অবুঝ, তুই তো বড়ো হইছস৷'
পঞ্চু ভীষণ রাগ করে বলল, 'তোমরা চইল্যা যাও ঠাউরদা৷ আমি আর ফুদবুদি যামু না৷ কত্তায় আমাগো কথা বুঝাইবেন৷ না বুইঝ্যা আমি যামু না৷'
শচীনকর্তা বললেন, 'হ্যাঁ, হ্যাঁ, অনেক কথা আছে৷ তোমরা দু-দণ্ড শান্ত হয়ে বসো৷ কী যে হয়েছে তা তো বুঝতেই পারছ? তবুও আমার পক্ষে যা যা করা দরকার তা আমি করেছি৷ এখন দেখো মিরাকেল ঘটে কি না৷'
সব কথাই আবার উনি ওদের খুলে বললেন!
সব কথা শুনে পঞ্চুর ঠাউরদা আবার ঝুঁকে হাত জোড় করে প্রণাম জানাল শচীনকর্তাকে৷ বলল, 'আপনে দ্যাবতা৷ এ্যাহন আমাদের বরাত৷ দশ-দশটা দিন কাইট্যা গেছে . . . আর কি আইতে পারবো তারা?'
জোর করেই দু-জনকে টেনে নিয়ে ওরা বাড়ি ফিরল৷ সারাদিন ঝোপজঙ্গল আর বালিয়াড়িতে ঘুরে বেড়াল পঞ্চু৷ একবার কাঁকড়ার পিছনে তাড়া করল কিছুক্ষণ৷ তারপর রোদের তেজ কমতেই আবার গিয়ে বসল সমুদ্রের ধারে৷ বড়ো বড়ো ঢেউগুলো সমানে এসে আছড়ে পড়ছে তীরে৷ ঢেউয়ের পর ঢেউয়ে ফেনায় ভরে যাচ্ছে তীরে৷ ওই ঢেউগুলোর উপর দিয়েই ও তাকাল দূরের দিকে, আকাশটা ঠিক যেখানে হেলে পড়েছে সাগরের বুকে, ওখানে ওই জায়গা থেকেও অনেক অনেক দূরে কোথাও কি ডাঙা আছে? চড়া আছে? থাকলে তো ওর বাপ নাও ভাসিয়ে ফিরে আসবে৷ ফিরে আসবে অন্য সবাইকে সঙ্গে নিয়েই৷ কিন্তু যদি ডাঙা না থাকে, না থাকে কোনো চড়া, তাহলে? না, না, না, তা কখনোই হতে পারে না৷ যে যাই বলুক না কেন, ওর বাপ ঠিক ফিরে আসবে, সেই দূরের চড়া থেকে নাও ভাসিয়ে, ঢেউয়ের বুকে নাচতে নাচতে, ভেসে আসবে নাওটা তীরের দিকে! উঃ কত বড়ো বড়ো ঢেউ আজ৷ আজও কি সাগর আবার খেপে উঠবে? উঠুক, না উঠুক, আর তাকিয়ে থাকতে পারছে না পঞ্চু৷ কী হবে তাকিয়ে থেকে আর? ফুটফুটিও আসবে না আর ওর পাশে এসে দাঁড়াতে৷ আজ তো জানতে পেরেছে পঞ্চু, এই সাগরের শেষ নেই৷ দু-হাতে মুখ ঢেকে ও আপন মনেই কেঁদে ফেলল৷
পিছনে পায়ের আওয়াজ হতেই ও চোখ না মুছেই বলল, 'ফের ক্যান তুই আইলি রে ফুদবুদি? আর এইহানে খাড়াইয়া থাইক্যা কী অইবো? আমিও আর আসুম না দেহিস৷'
ফুটফুটি শান্ত ভাবে বলল, 'শোচিনকত্তায় কী কী কইলেন, বুঝছস তার কিছু? বুঝস নাই বুঝি? কয়ডা দ্যাশের নাম কন নাই ত্যানে?'
চমকে উঠল পঞ্চু৷ হ্যাঁ তাইতো কী যেন সব দেশের কথা উনি বলছিলেন! তাহলে কি সেই সব দেশ থেকেও ওর বাপ ফিরে আসতে পারে! এমন কত গল্পই না ও শুনেছে সেই ছোট্টবেলা থেকে৷ রাজপুত্তুর আর সওদাগর পুত্তুরদের কথা! মহা উৎসাহে ও প্রায় চেঁচিয়েই উঠল, 'হ: ওই হগল দ্যাশের কথা তো ভাবি নাই ফুদবুদি! তা অইলে বাপে আমার ফিইর্যা আইবোরে নাও চইড়্যা, ওই যে ওই হকল দ্যাশের থেইক্যাই আইবো দেহিস৷ শোচিন কত্তায়নি তাই কইলেন৷'
ফুটফুটি ওর পাশে বসে পড়ে বলল, 'বড়ো বড়ো ঢেউ দেখতাছস না? আজ রাইতে ফ্যার তুফান আইবোরে পোনচু! আমার মন কইতাছে!'
'না, না,' চেঁচিয়ে উঠল পঞ্চু, 'মুখপুড়ি অলক্ষুইন্যা, তুফান হইবো না৷ ককখনো হইবো না৷ তরে আমি মারুম, হ, মারুম৷'
ঢেউগুলোর দিকে তাকিয়ে থেকে ফুটফুটি বলল, 'মার, মার, আমারে তুই মার৷ তুফান আমিও চাইনারে পোনচু৷ তর বাপে আইলে তো আমার বাপেও আইবো রে৷ বড়ো বড়ো ঢেউগুলানের উপর দিয়া নাও ভাসাইয়া আইবো৷ বদর বদর হাঁক দিবো হক্কলে! তরে কোলে নিব তর বাপে, আমারে আমার! সে বড়ো মজা হইতো রে পোনচু৷ কিন্তুক শোচিনকত্তায় যে কী কইছে তাতো তুই বুঝস নাই৷'
পঞ্চু তেমনি রাগ করেই বলল, 'চুপ যা, চুপ যা৷ আমি কিছু বুঝবার চাই না৷ ফের কথা কইবি তো তরে হত্যই মারুম৷'
ফুটফুটি আর কিছুই বলল না৷ ওর মতোই সামনের ঢেউয়ের দিকে তাকিয়ে চুপ করে বসে রইল৷
তখনই পঞ্চুর মনে পড়ল, ঠাউরদা ওর শোচিনকত্তার কাছ থেকে ফিরেই মাকে যেন কী বলল! শুনে মা ওর কাঁদতে লাগল৷ ঠাউরদা তবুও বলেছিল, 'আর কেন বউমা, হাতের শাখা ভাইঙা ফেলাও৷' এ কথা শুনে আর পঞ্চু সেখানে দাঁড়ায়নি৷ যে যাই বলুক না কেন, ও মানবে না, বিশ্বাস করবে না৷ কখনো ভাববে না ওর বাপ সাগরে হারিয়ে গেছে! সেই থেকেই পঞ্চু একা একা এখানে-সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে৷ ঢেউয়ের পর ঢেউ এসে ভেঙে পড়ছে তীরে৷ বড়ো ঢেউ, ছোটো ঢেউ, কত কত ঢেউ! সেই ঢেউয়ের উপর দিয়ে দূরের দিকে বড়ো বড়ো চোখ করে তাকিয়ে রইল পঞ্চু৷ কোথাও কিছুই দেখা যাচ্ছে না৷ না দেখা যাক, পঞ্চু রোজ আসবে৷ রোজ এসে বসে থাকবে সাগর তীরে৷ যত দিনে না ওর বাপ ফিরে আসে৷ দু-চোখ জ্বালা করে বড়ো বড়ো ফোঁটায় জল ঝরে পড়ল ওর দু-চোখ থেকে৷ ও মোছার চেষ্টাও করল না৷ বাপ কি আর ওর ফিরে আসবে সত্যিই কোনোদিন!
ওর দিকে তাকিয়ে ফুটফুটি করুণ ভাবে বলল, 'পোনচু বাই, উইঠ্যা পর৷ মিছামিছি বইয়্যা থাকলে কী অইবো!'
দু-জনেই উঠে পড়ল৷ পায়ে পায়ে কুঁড়েগুলোর কাছে পৌঁছে যে যার কুঁড়ের দিকে চলে গেল৷ কারও মুখে তখন আর কোনো কথা ছিল না৷
রাতে ঠাউরদা পঞ্চুকে বুকের মাঝে জড়িয়ে শুলো৷ কথা কিছুই বলল না৷ শুধু বার কতক দীর্ঘশ্বাস ফেলল৷ কেন যেন পঞ্চুর দু-চোখ জ্বালা করে ফের জল এল৷ ও ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল৷
বুড়ো ঠাউরদাও কান্নাভরা গলায় বলল, 'কান্দে না, কান্দে না, কাইন্দা আর কী করবি রে পোনচু৷ কান্দনের কী আর আছে৷'
তারপর এক সময় ঘুমিয়ে পড়ল পঞ্চু৷ গভীর ঘুমে স্বপ্ন দেখল কি দেখল না৷ এ-পাশ ও-পাশ করল না৷ কিন্তু হঠাৎ ওর ঘুম ভেঙে গেল৷ চমকে উঠল ও৷ বাইরে বাতাস ডাকতে আরম্ভ করেছে৷ দূর সমুদ্রের বড়ো বড়ো ঢেউগুলো যে তীরে আছড়ে পড়ছে তার শব্দ শোনা যাচ্ছে৷ না তা শুধু নয়৷ সে সব শব্দ ছাপিয়ে কে যেন পাগলের মতো চেঁচাচ্ছে 'কই হে, কই হে, কেউ কোথাও আছ নাকি জেগে? আছ কেউ কোথাও? শোনো শোনো, বাইরে এসো তাড়াতাড়ি৷'
শোচিনকত্তার গলা৷ ঠাউরদা উঠে পড়ল ধড়ফড় করে৷ মা লম্ফ জ্বালল৷ কুঁড়ের ঝাঁপ খুলতেই দমকা বাতাসে লম্ফ নিভে গেল৷ দরজায় ছায়া পড়ল মানুষের৷
সে বলল, 'এটা কার ঘর গো?'
ঠাউরদা উত্তর দিল, 'আইজ্ঞা হিরু জেইল্যার, তারে সাগরে নিছে, দশ দিন আগে৷'
'না, না, না,' চেঁচিয়ে উঠলেন শচীন কর্তা৷ হুড়মুড় করে কুঁড়ের মধ্যে ঢুকে পড়ে বললেন, 'কী অন্ধকার বাপরে! হিরু মরেনি৷ ওর দলের কেউই মরেনি৷ এই তো কিছুক্ষণ আগেই আমার এক বন্ধুর ফোন এল৷ সেও ফিশারিতে কাজ করে৷ কোকোনদ জানো কোথায়? জানো না! ওরা ভাসতে ভাসতে সেখানে পৌঁছেছে নয় দিনের মাথায়৷ না জল, না খাবার ছিল সঙ্গে৷ বেজায় তাই কাহিল হয়ে পড়েছে৷ ও দেশের সরকার তাদের হাসপাতালে দিয়েছে৷ আজই সুস্থ হয়ে প্রথম কথা বলেছে৷ ডাক্তার ছাড়লেই ওরা দেশের দিকে রওনা হবে৷ ও দেশের সরকারই ওদের ট্রেনে পাঠাবার ব্যবস্থা করবে৷ ওঃ ভালো কথা, কাল ভোরে কেউ কিন্তু সাগরে যাবে না৷ আবার ডিপ্রেসন হয়েছে৷ ঝড় তো প্রায় এসেই গিয়েছে৷ কই সেই ছেলেটা আর মেয়েটা কই৷ ওরে কোথায় গেলি তোরা?'
কুঁড়ে ততক্ষণে লোক ভরে গেছে৷ কোথায় যেন কারা আবার শাঁখে ফুঁ দিল৷ লম্ফটা শাঁখে আড়াল করে জ্বালাল পঞ্চুর মা৷ আলোয় দেখা গেল বড়ো বড়ো চোখ করে সবার সামনে দাঁড়িয়ে আছে ফুটফুটি৷ সে দিকে তাকিয়ে এক গাল হেসে পঞ্চু বলল, 'আইছস লক্ষ্মীছাড়ি, তরে আমি মারুম৷ না, নারে ফুদবুদি, তর কথাই ঠিক৷ তেনেরা ঢেউ পাড়ি দিয়া আইবো না রে৷ আইবো টেরেনে চইড়্যা৷ শোচিনকত্তাই কইলেন৷'
বৈশাখ ১৩৯৬
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন