তুতানের বন্ধু

অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়

'এই যে ক্যাপ্টেন!' বাজখাঁই গলায় এক হুংকার-আর একটু হলেই কার্নিশ থেকে হুড়মুড় করে পড়ে যাচ্ছিল ফন্টে৷ কোনোমতে গোঁফ আর লেজ ব্যালান্স করে সামলে নিল নিজেকে-না হলে নির্ঘাত চারতলা থেকে সোজা পপাত ধরণীতলে৷

চারতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল তুতান৷ দেখছিল আর নানারকম চিন্তা করছিল৷ প্রথম চিন্তা হল পড়ে গেলেও বেড়ালদের কিছু হয় না কেন? ওদের কি শরীরে হাড় বলে কিছু নেই? দ্বিতীয় চিন্তা নেড়ুকাকু হঠাৎ হঠাৎ একা বসে 'এই যে ক্যাপ্টেন' বলে চেঁচান কেন? চেঁচানো বলে চেঁচানো-একেবারে আকাশ ফাটিয়ে৷ সেই আওয়াজে ছোটো বাচ্চারা ভয় পেয়ে কেঁদে ওঠে, বড়োদের হাত থেকে জিনিসপত্র ছিটকে যায়, রাস্তার কুকুরগুলো ঘেউ ঘেউ করে ডাকতে থাকে, আরও কতরকম কাণ্ড হয়-তুতান কি তার সব খবর রাখে? সকাল বেলা খালি গায়ে লুঙি পরে খবরের কাগজ হাতে হঠাৎ খেপে উঠে হাঁক পাড়েন, 'এই যে ক্যাপ্টেন!' দুপুরে ভাত খেয়ে পান চিবোতে চিবোতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আবার সেই পেল্লায় হাঁক, 'এই যে ক্যাপ্টেন!' সারা দিনে থেকে থেকেই পাড়া-কাঁপানো এই হুংকার!

কে এই ক্যাপ্টেন! তুতান যতদূর জানে পাইলটদের বলে ক্যাপ্টেন, ক্রিকেট টিমেও একজন ক্যাপ্টেন থাকে, আর্মিতে থাকে, আর থাকে নেভিতে৷ তেমন তো কেউ ধারে কাছেও নেই৷ তাহলে উনি ডাকছেন কাকে? মা বলেন, 'উনি আসলে ভগবানকে ডাকেন৷' ভগবানকে ডাকেন এই নামে! এটা বিশ্বাস করা একটু শক্ত৷ মা নাকি ছোটোবেলায় একজন বুড়োমানুষকে চিনতেন, যিনি হঠাৎ হঠাৎ ডেকে উঠতেন-'হরি হে মাধব'৷ তার তবু একটা মানে বোঝা যায়৷ ধরা যাক ভগবানের সঙ্গে ওঁর একটা কোড ল্যাঙ্গুয়েজে কথাবার্তা হয়, তাহলে 'এই যে ক্যাপ্টেন' বলে ডাকলে ভগবান কেমন ভাবে সাড়া দেন? দেন কি? যখন-তখন ডাকলেই কি ভগবান শুনতে পাবেন? ভেবে কিছুরই কুল পায় না তুতান৷ তখন তার মাথার মধ্যে অন্য সব ভাবনারা এসে ভিড় জমায়৷

তার মধ্যে প্রধান হল আম গাছ৷ তুতানের একটা নিজস্ব আম গাছ আছে৷ নিজের হাতে আঁটি পুঁতে একটা এক্সপেরিমেন্ট করছিল সে-সত্যিই গাছ গজায় কি না দেখবার জন্য৷ শেষ অবধি কচি কচি পাতা উঁকি দিল৷ প্রথমে দুটো এরপর আস্তে আস্তে আরও মাথা চাড়া দিয়ে তৈরি হল আমের চারা গাছ৷ ঘুম থেকে উঠেই দৌড়ে নীচে চলে আসে তুতান, গাছটা কেমন আছে দেখবার জন্য৷ গাছ বেশ ভালোই বড়ো হতে লাগল, কিন্তু তুতানের হাঁটু অবধি লম্বা হয়ে এখন কেবল মোটা হচ্ছে৷ মনে হয় বাড়বার খুব একটা ইচ্ছে নেই৷ দেখা যাক সামনের বছর বর্ষাকালে কী হয়!

অন্য অনেকরকম গাছও আছে এপাশে-ওপাশে৷ যেমন পাশের ফাঁকা জমিটায় একটা পেল্লায় বেল গাছ৷ পুজোর সময় লাঠি নিয়ে অনেকে এই গাছের পাতা পাড়ার জন্যে লাফালাফি লাগায়৷ ভাগ্যিস বেল গাছে ফুল হয় না, না হলে রোজই ফুলই পাড়বার জন্য লাইন লেগে যেত৷ টগর গাছটায় যেমন হয়৷ এ ছাড়া আছে শিউলি-একটু ঝাঁকালেই ঝরঝর করে ফুলের বৃষ্টি নামে শিউলি গাছ থেকে, তবে সারা বছর নয়৷

তুতানের সঙ্গে এই সব গাছেদের সম্পর্ক খারাপ নয়-মোটামুটি ভালোই বলা চলে, যদিও এরা কেউ তার হাতে-পোঁতা আঁটি থেকে গজায়নি৷ তা ছাড়া টগর কিংবা শিউলি গাছের তো আর আঁটি বলে কোনো ব্যাপার নেই৷ বেল গাছটা এত বড়ো যে তার জন্ম খুব সম্ভব আজ থেকে কুড়ি-তিরিশ বছর আগে, সে সময় এ দিকটায় খুব বেশি বাড়িঘর ছিল না৷ হোগলা বন ছিল নাকি৷ বলা যায় না বেল গাছের বয়স হয়তো আরও বেশি-পঞ্চাশ কিংবা ষাট! তা না হলে এত মোটাসোটা ডালপালা আর শক্ত শক্ত গাঁট হল কী করে!

বেল গাছের তলায় একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছিল৷ তারপর থেকে অনেকের ধারণা ওই গাছে নাকি ভূতের বাসা৷ ঘটনাটা হয়েছিল এইরকম-একদিন গভীর রাত্রে কয়েকজন চোর বেল গাছতলায় বসে চোরাই মালের ভাগ-বাঁটোয়ারা করছিল৷ হঠাৎ কথা নেই, বার্তা নেই এক ঝাপটায় তাদের জিনিসপত্র সব কোথায় হাওয়া হয়ে গেল! চোরেরা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যে যেদিকে পেরেছে দৌড় দিয়েছে৷ পরে পুলিশের হাতে একজন ধরা পড়ে কবুল করেছিল সব৷ মানে চুরির কথা কবুল করেছিল৷ কেননা, পরের দিন সকালে সব চোরাই জিনিসপত্র দেখা যায় গাছের ডালে আটকে আছে৷ পাড়ার লোকেরা কিছু বুঝতে না পেরে পুলিশকে খবর দেয়৷ যাদের জিনিস খোওয়া গেছে তারা এসে প্রমাণ দিয়ে যে যার জিনিস ফেরত পায়৷ ধরা পড়া চোরটা যা বলেছিল তা খুবই আশ্চর্য! তারা নাকি খুব মন দিয়ে হিসেব-নিকেশ করছে- মাঝখানে জিনিসপত্র ডাঁই করে রাখা-এমন সময় বেল গাছের একটা ডাল নাকি দুলতে দুলতে নেমে তাদের পিঠে সপাসপ সে কী মার! কাঁটা ফুটে রক্তারক্তি কাণ্ড৷ হঠাৎ বেল গাছের ডাল ধরে কে নাড়া দিল! ঘাবড়ে গিয়ে তারা দিশেহারা হয়ে পিঠটান দিয়েছিল৷ ওদের মনে হয়েছিল বেল গাছ যখন, তখন নির্ঘাত তার মধ্যে বেহ্মদত্যির বাস৷ দ্বিতীয় বার আর ফিরে তাকাবার সাহস হয়নি তাদের৷ প্রাণ নিয়ে পালিয়েছে সকলে-থাক পড়ে বাবা জিনিসপত্র- শেষে লোভে পড়ে দত্যির হাতে প্রাণটা যাবে নাকি!

গল্পটা শুনে পুলিশদের 'হো-হো' করে সে কী হাসি৷ পাড়ায় কিন্তু অনেকে বিশ্বাস করেছিল গল্পটা৷ নেড়ুকাকার সব জিনিসে মাতব্বরি করা স্বভাব৷ তিনি বলেছিলেন, 'হুঁহুঁ বাবা, বোঝো ব্যাপারখানা৷' তাতে অবশ্য তিনি বেহ্মদত্যির কথা বিশ্বাস করলেন কি করলেন না বোঝা যায়নি৷ একটু পরেই নিজের বাড়ির বারান্দায় পৌঁছে আবার একখান হাঁক ছেড়েছিলেন 'এই যে ক্যাপ্টেন'৷ বোধ হয় পরীক্ষা করে দেখছিলেন বেহ্মদত্যি এই ডাকে সাড়া দেয় কি না৷ তুতানের মনে হয়েছিল গাছে বেহ্মদত্যি থাকলেও তাকে কেউ 'ক্যাপ্টেন' বলে সম্বোধন করবে, সম্ভবত এটা সে কোনোমতেই ভাবতে পারেনি৷ বিশেষ করে খালি গা, লুঙিপরা নেড়ুকাকুও৷ তবে ভূতপ্রেত বলে কিছু নেই-এ বিষয়ে তুতান নিশ্চিত৷ সুতরাং বেল গাছেও কেউ নেই৷ থাকতেই পারে না৷

বেল গাছের পাশ দিয়ে যাবার সময় অনেকবার ওপরে তাকিয়ে সে কাউকে দেখতে পায়নি-কেবল গাছের দু-চারটে ডাল একটু নড়েচড়ে উঠছে৷ ঠিক যেন মানুষের হাতনাড়া৷ ওরা কি আমাকে দেখে হাত নাড়ছে? তুতান প্রশ্নটা করতে গিয়ে দেখে পিছন পিছন খুকুমাসির পেয়ারের বেড়াল ফন্টে কখন এসে হাজির৷ তুতানের প্রশ্ন শুনে ফন্টে পিচ করে কেমন শব্দ করল৷ 'তুই কী বলিস রে ফন্টে?' এবার সরাসরি ওকেই জিজ্ঞেস করাতে ফন্টে দারুণ ব্যস্ত হয়ে কতকগুলো শালিখের দিকে দৌড় দিল৷ 'ধুত্তোর!' বলে তুতান যেই না চলে যেতে গেছে অমনি ধুম-ধপাস৷ কী একটা ভারী মতো জিনিস পায়ের কাছে এসে পড়ল৷ প্রথম মনে হল বল৷ কিন্তু ফুটবলের চেয়ে ছোট্ট ক্রিকেট বলের চেয়ে বড়ো এ কোন দেশি বল? ভালো করে কাছে গিয়ে দেখি-আরে সর্বনাশ! এ তো একটা পাকা বেল৷ হলদে রং৷ বেদম শক্ত খোলা৷ কিছু একটা পড়তে দেখলেই ফন্টের স্বভাব সেখানে হাজির হওয়া৷ বেলটাকে শুঁকে-টুঁকে দেখে বুঝল কামড়ে সুবিধে হবে না-সুতরাং ফন্টেচরণ আবার চড়াই ধরতে ছুটল৷ আমার এখন কী করা উচিত? তুতান চিন্তায় পড়ে গিয়ে অন্যমনস্কভাবে তুলে নিল বেলটা৷ ভালো করেছিল৷ কেননা বাড়ি নিয়ে যাবার পর ঠাকুমা মহা খুশি৷ পাকা বেল নাকি স্বাস্থ্যের পক্ষে খুব ভালো৷

এইরকম ভাবে চলছিল৷ থেকে থেকেই ওদিকের বাড়ির দোতলার বারান্দা থেকে হুংকার ওঠে, 'এই যে ক্যাপ্টেন!' সেই শুনে চমকে গিয়ে দুটো-চারটা দুর্ঘটনা ঘটে-কারও হাত থেকে চায়ের কাপ ছিটকে যায়, চমকে জেগে ওঠে কেউ কেউ-তারপর পাশ ফিরে আবার ঘুমিয়ে পড়ে৷ বেলতলা দিয়ে তুতান যখন স্কুলের দিকে রওনা হয় দু-চারটি ডাল তাকে হাত নাড়ে, তখন বাধ্য হয়ে তুতানকে হাত নাড়তে হয়৷ এইভাবে আস্তে আস্তে তার সঙ্গে বেলগাছের বন্ধুত্ব বেশ জমে উঠেছিল৷

ভালোই হল একদিক দিয়ে৷ ছোট্ট আমগাছের চারার বড়ো হয়ে উঠতে এখন অনেক দেরি৷ মা বলেন, 'যতদিনে ওতে আম ফলবে ততদিনে তোর গোঁফ-দাড়ি গজিয়ে যাবে৷' তাই কি? হবেও বা৷ ভালো করে গাছের গোড়ায় সার দিলে যদি তাড়াতাড়ি করে বড়ো হয়৷

বাবা বলেন, 'দরকারই নেই৷ কড়া রোদ পায় না-সেটাই তো ওর খাবার৷ বড়ো হবে কী করে? ওইরকমই থাকবে চিমসেপানা৷ বেল গাছটা তিনতলা সমান উঁচু হল কী করে? ওই রোদ পাবার জন্যেই তো!' সালোকসংশ্লেষ কাকে বলে, পড়ার বইতে আছে-তাই ওসব জানে তুতান৷ মানুষও যদি ওইভাবে খাদ্য সংগ্রহ করতে পারত তাহলে কেমন হত? এ বিষয়ে মাঝে মাঝে মাথা ঘামায় সে৷ বড়ো হয়ে তুতান যখন একজন ডাকসাইটে বিজ্ঞানী হবে তখন ওরকম একটা আবিষ্কার করার জন্য জোরদার চেষ্টা চালাবার ইচ্ছে আছে তার৷

বেল গাছের সঙ্গে তুতানের কথার আদানপ্রদান ক্রমেই বাড়ছিল৷ ফন্টের সঙ্গে মানুষের ভাষায় কথা বললে ও ঠিক বুঝে নেয়-বেড়াল হলে কী হবে, মানুষের কাছাকাছি ঘুরঘুর করা অভ্যেস তো! বেল গাছের ডালে কতরকম পাখির আসা-যাওয়া৷ সত্যি বলতে কী বেল গাছের পক্ষে বরং পাখির ভাষা বোঝা সম্ভব কিন্তু মানুষের ভাষা একেবারেই নয়৷ কোনো লোক তো ওর ডালে চড়ে না৷ সেই চোরেদের ঘটনার পর থেকে লোকজনেরা বেল গাছতলা একটু এড়িয়ে এড়িয়েই চলে৷

তবে তুতান তাদের দলে নেই৷ তার ইচ্ছে করে রাত গভীর হলে চুপচাপ গাছটার তলায় গিয়ে হাজির হয়, সেখানে আরও কী ঘটনা ঘটে দেখবার জন্য৷ সত্যি যদি কেউ গাছের ডালে থাকে সে এখনও কি পা ঝুলিয়ে বসে দোল খায়, না নাক ডাকিয়ে ঘুমায়? এই কাজে ফন্টেকে সঙ্গে নেওয়া যেতে পারে-ফন্টের তো সর্বত্র অবাধ গতি৷ ইচ্ছে হলেই সাঁ করে মগডালে চড়ে যেতে পারে৷ কখনো সেরকম ইচ্ছে ওর হয়নি অবশ্য৷

আর ফন্টেটা বেজায় ছটফটে৷ তার সঙ্গে বসে খানিক শলা-পরামর্শ করবে তুতান, সে রকম পাত্রই নন তিনি৷ এই এখানে দাঁড়িয়ে, তারপরেই ভোঁ দৌড়-কোথায় কোন পাখি উড়ল, না পোকা নড়ল, তাদের ধরতে৷ নাঃ, ওকে দিয়ে কোনো সুবিধে হবে না৷ ইস, তুতানের যদি একটা কুকুর থাকত৷ কুকুরেরা খুব চালাক৷ তাকালেই মনের কথা ধরে ফেলে৷

তুতানের দৃঢ় বিশ্বাস বেল গাছটারও এই ক্ষমতা আছে৷ তা না হলে তুতানকে দেখে মাথা দুলিয়ে মিটিমিটি হাসে কেন? ও কী করে বুঝতে পারে, তুতান এখন মনে মনে কী ভাবছে? সে সব কথা জোরে জোরে বলা যায় না৷ কিন্তু বেল গাছ তার আশ্চর্য ক্ষমতার জোরে ঠিক বুঝে ফেলে৷ তুতান মনে মনে ভাবে যদি বুঝতেই পেরেছ তাহলে কিছু করে দেখালে তো পার বাবা৷ যখন-তখন কেউ যদি আকাশ ফাটিয়ে 'এই যে ক্যাপ্টেন' বলে হুমকি দিয়ে ওঠে তাহলে কারও পক্ষে কোনো কাজ করা সম্ভব? হোমওয়ার্ক করার কথা তো বাদই দাও, এমনি ঘুড়ি ওড়াতে গিয়েও চমকে গিয়ে ঘুড়ি কেটে যায়৷ খুব কষ্ট হয়েছিল সেবার-কত সাধের চাঁদিয়াল!

যাক গে ভেবেই বা কী হবে-এই মনে করে অন্য কিছু ভাবার চেষ্টা করে তুতান৷ তবু বেল গাছ তাকে দেখলে এমন করে চোখ মটকায় যেন দু-জনে একটা গভীর ষড়যন্ত্রের শরিক! তুতানের খুব ইচ্ছে এই বিষয়ে কারও সঙ্গে একটু আলোচনা করার৷ কিন্তু করবে কার সঙ্গে? ফন্টে? নাঃ, ওকে বিশ্বাস নেই৷ বেল গাছকে বিশ্বাস করা যায়৷ কেন যেন তুতানের খুবই মনে হয় বেল গাছের স্বভাব শান্ত ধীর-স্থির৷ সে হঠাৎ করে এখানে-ওখানে দৌড়ে পালায় না৷ যেখানে আছে সেখানে গম্ভীর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে আর মাঝে মাঝে ডাল নাড়িয়ে হাওয়া খায়৷

Cov182

সেদিন বিকেল বেলা তুতান পষ্ট দেখল গাছটা হাতছানি দিয়ে তাকে ডাকছে৷ ব্যাপার কী? সাইকেল থামিয়ে গুটিগুটি গাছটার কাছে এল সে৷ জিজ্ঞেস করল, 'কেন ডাকছ?' বেল গাছের ডালগুলো একবার এদিক হল একবার ওদিক হল৷ তারপর গাছ বলল, 'বুঝেছ৷' কিছুই বুঝল না তুতান৷ সে বোকার মতো খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে যেই সাইকেল চড়তে যাবে সাঁই করে একটা পাতলা ডাল নেমে এল, তারপর আলতো করে ওর পিঠে হাত বুলিয়েই আবার নিজের জায়গায় গিয়ে ঝুলতে লাগল৷ কিছু বুঝলাম না-ভাবতে ভাবতে সাইকেলে স্পিড নিল তুতান৷ একবার পিছন ফিরে দেখে লুটোপুটি করে ডালগুলো নিজেদের মধ্যে খুব হাসাহাসি করছে৷

হাসির মানেটা বোঝা গেল ক-দিন পর৷ তুতান স্কুল থেকে ফিরে অভ্যাসমতো বারান্দায় গিয়ে চারদিকে দেখছে, এমন সময় দেখে সামনের বাড়ির বারান্দা খালি৷ চেয়ারে খালি গায়ে লুঙিপরা কেউ বসে নেই৷ এখনও দুপুরের ঘুম ভাঙেনি বোধ হয়৷ মা ডাকলেন জামাকাপড় ছেড়ে খেয়ে যেতে! খেতে খেতে তুতান শুনল-একটা অবাক কাণ্ড ঘটে গেছে এর মধ্যে৷

'জানিস তো কী কাণ্ড!' মা বললেন টোস্ট করতে করতে৷

টেবিলে তুতানের প্রিয় খাবার আলুর দম৷ একসঙ্গে তিনটে আলু মুখে পুরে সে জিজ্ঞেস করতে গেল 'কী কাণ্ড?' কিন্তু মুখ দিয়ে যে আওয়াজটা বেরোল সেটা শোনাল এইরকম- 'চকম চকম চকম'৷ মা ভাবলেন তুতান লুচি চাইছে৷

তিনি বললেন, 'কালই তো লুচি হয়েছিল-আবার আজকেও?'

'না না,' ততক্ষণে আলুগুলো পেটে চালান হয়ে গেছে-কাজেই কথা বলতে কোনো অসুবিধে হল না, 'তুমি বললে কী কাণ্ড, তাই জিজ্ঞেস করছি৷'

'সামনের বাড়ির নেড়ুকাকু কথা বলতে বলতে ঢিব করে চেয়ার থেকে গড়িয়ে অজ্ঞান৷ সবাই ধরাধরি করে শুইয়ে দিল, মাথায় জল-টল ছিটে দিতে জ্ঞান ফিরল৷ উনি বলছেন-কেউ ওঁকে ঢিল মেরেছে অথচ বারান্দায় কোনো ঢিল-পাটকেল কিছুই পাওয়া গেল না৷'

তুতান খাওয়া বন্ধ করে কান খাড়া করল, 'কিছুই পাওয়া গেল না? ভালো করে দেখেছে সবাই?'

'ও হ্যাঁ, একটা আজব জিনিস-বেশ মোটাসোটা একটা বেল মেঝেতে গড়াগড়ি যাচ্ছে! কোথা থেকে এল কে জানে?'

'কেন?' তুতান খাওয়ার দিকে মন দিল, 'ওই তো ওখানে একটা বেল গাছ আছে৷ সেখান থেকে আসতেই পারে৷'

'তুই কি পাগল হলি, ওই গাছ থেকে নেড়ুকাকুর বারান্দা অত দূর? তাহলে বলতে হয়, গাছের মধ্যে একটা ভূত আছে৷'

তুতান প্লেটের দিকে চোখ নামিয়ে বলল, 'ভূত কেন? অত বড়ো গাছ, তার গায়ে কী কম জোর৷ গাছটাই ছুড়েছে৷'

'হ্যাঁ, গাছের আর খেয়ে দেয়ে কাজ নেই৷ তোর জন্য আরও টোস্ট করব?'

ততক্ষণে তুতানের খাওয়া হয়ে গেছে, আঙুল চাটতে চাটতে সে উঠে পড়ল৷

'ও কী, হাত না ধুয়ে কোথায় চললি?'

এক সেকেন্ডের জন্যে বাথরুমে কল খোলার ভান করে পর মুহূর্তেই হুড়মুড় দুদ্দাড় করে তুতান ছুটল নীচে৷ ওকে ঢুকতে দেখে ফন্টে বুঝল কিছু একটা ব্যাপার আছে৷ সেও ছুট লাগাল সঙ্গে সঙ্গে৷

হাঁপাতে হাঁপাতে তুতান একেবারে বেল গাছতলায়৷ পিছন পিছন ফন্টে৷

কিছু বলতে হল না৷ একবার বেল গাছের দিকে তাকিয়ে মুচকে হাসল তুতান- 'শাবাশ! একেই বলে বন্ধু৷ কিন্তু আবার তো শুরু হবে সেই হেঁড়ে গলায় হুংকার-তখন কী হবে?'

হুশ করে একটা বেল উড়ে গেল তুতানের মাথার ওপর দিয়ে৷ ঘাবড়ে গিয়ে ফন্টে লাফাতেও ভুলে গেল৷ বেলটা একটা টার্ন মেরে তিনটে বাড়ি পার হয়ে সোজা গিয়ে ল্যান্ড করল নেড়ুকাকুর বারান্দায়৷ শব্দ হল-ঝন-ঝন-ঝনাৎ! জানলার শার্সি চুরমার৷

'বুঝলাম!' বলল তুতান৷ তারপর অ্যাবাউট টার্ন করে চলল খেলার মাঠের দিকে, পিছনে কিন্তু ফেউয়ের মতো লেগে আছে ফন্টে-একবার ডানদিকে যায়, একবার বাঁ-দিকে৷ আর কেবলই তুতানের পায়ের কাছে ঘেঁষে আসে৷

'কিছু বুঝতে পারলি না তো?' জিজ্ঞেস করল তুতান৷

ফন্টে মাথা নাড়ল৷

'বলিস কী রে ক্যাপ্টেন?' বলে হো-হো করে হেসে উঠল তুতান৷ গোঁফের ফাঁক দিয়ে হাসল ফন্টেও৷

'আর ডাকতে হবে না৷ এই যে ক্যাপ-বলার সঙ্গেসঙ্গে যদি দমাস করে বেল পড়ে- আর কাচ ভাঙে তাহলে?'

তাহলে? ফন্টের শুধু দু-চোখে নয় মাথা থেকে লেজের ডগা অবধি জিজ্ঞাসার চিহ্ন৷

'ন্যাড়া বেলতলায় যায় ক-বার?' প্রশ্ন করে তুতান৷

'কাকতালীয়,' জবাব দিল ফন্টে৷

গল্পসংখ্যা ১৪০৭

Cov183
সকল অধ্যায়
১.
চাং
২.
হাবুর বাবুগিরি
৩.
ভবম হাজাম
৪.
হুড়ুকবাজ সিং
৫.
হাতির ভয়
৬.
বোকা তাঁতি
৭.
ঝানু চোর চানু
৮.
বাঘ মামা
৯.
শ্বেতব্রাহ্মণের উপাখ্যান
১০.
এক হল দুই
১১.
রামভজনের ঘোড়া কেনা
১২.
দাশুর কীর্তি
১৩.
বুনো মোষ পোষমানা
১৪.
ষর্ণশের্ণ
১৫.
নেড়ুর ভয়
১৬.
হেঁড়ে-গর্জন দৈত্য
১৭.
চোর আর ঠগ
১৮.
আলি ভুলির দেশে
১৯.
বড়ো গদাই আর ছোটো গদাই
২০.
পুরস্কার
২১.
হেশোরাম হুঁশিয়ারের ডায়েরি
২২.
ঠেকে শেখা
২৩.
যুদ্ধের গল্প
২৪.
বন্ধুর দান
২৫.
মানুষের ইতিহাস
২৬.
সূর্যমুখীর কথা
২৭.
ন্যাপলা
২৮.
খেয়ালহারা
২৯.
পরিবর্তন
৩০.
আচ্ছা জব্দ
৩১.
সে
৩২.
মিষ্টি মুখ
৩৩.
চিচিং ফাঁক
৩৪.
অপরূপ রাজ্য
৩৫.
গরিবের দান
৩৬.
চোর ধরা
৩৭.
ময়ূরপঙ্খি
৩৮.
সম্পাদকের সমস্যা
৩৯.
তাইতো
৪০.
লাঠি-সমস্যা
৪১.
খুকির নাম
৪২.
স্বপ্নাদ্য ঔষধ
৪৩.
অজানা কুটুম
৪৪.
রায় মহাশয়ের গল্প
৪৫.
সমরের ষড়যন্ত্র
৪৬.
সুধাং-অ্যাং
৪৭.
ফাঁকিবাজের শিক্ষা
৪৮.
ঘঙ্গোপাধ্যায়
৪৯.
নিশুর বিপদ
৫০.
ফুটবল ম্যাচ
৫১.
এক ভাল্লুকের গল্প
৫২.
কৃপাময়
৫৩.
সেজমামার চন্দ্রযাত্রা
৫৪.
রূপসায়রী
৫৫.
দুই পড়শি
৫৬.
সন্দেশের চিঠি
৫৭.
সদাশিবের ঘোড়া-ঘোড়া কাণ্ড
৫৮.
ভবানন্দের কাশীযাত্রা
৫৯.
প্রথম পুরস্কার
৬০.
কালো মানিক
৬১.
চেঙ্গিস আর হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালা
৬২.
গোবিন্দ গোয়েন্দা
৬৩.
দুগ্যো সদ্দার
৬৪.
ক্যাপ্টেন মুকুন্দরাম
৬৫.
অসমঞ্জবাবুর কুকুর
৬৬.
পিপীলিকা আতঙ্ক
৬৭.
মরুপ্রাসাদের রহস্য
৬৮.
সাতজনের তিনজন
৬৯.
গোরুর বিচার
৭০.
সংস্কার
৭১.
গঙ্গোত্রীর মহাপুরুষ
৭২.
মিনিয়েচারের বোম্বাই যাত্রা
৭৩.
চিতা কাহিনি
৭৪.
বটুকেশ্বরের আবির্ভাব
৭৫.
নিবারণের সমস্যা
৭৬.
ফোর্থ টেস্ট
৭৭.
টাক এবং ছড়ি রহস্য
৭৮.
কলাবতীর ময়দান রিপোর্টিং
৭৯.
ভোটরঙ্গ
৮০.
ঢেউয়ের পরে ঢেউ
৮১.
পাগলা গণেশ
৮২.
সেতু বন্ধন
৮৩.
চিপুরি বিলের মহাশোল
৮৪.
রামেশ্বরের অসমাপ্ত কাজ
৮৫.
বলো তো কে এসেছিল ডিনারে
৮৬.
বোকা রাজার বুদ্ধিমতী রানি
৮৭.
টিপলুর ইতিহাস চর্চা
৮৮.
সোনার মেডেল উধাও
৮৯.
তুতানের বন্ধু
৯০.
ভূত মরলে কী হয়
৯১.
কথারা সব বেরিয়ে পড়েছিল
৯২.
বড়দার কবে ভালো লাগবে
৯৩.
শিবের অসাধ্যি
৯৪.
জয়রামের সিন্দুক
৯৫.
সংবাদের নেপথ্যে
৯৬.
নাড়কান্ডার নানাকাণ্ড
৯৭.
করণপুরার টাঁড়
৯৮.
সাঁঝবাতি
৯৯.
ক্রিকেট খেলার উপকারিতা
১০০.
অলক্ষ্যে হাসে মহাকাল
১০১.
লেখক-পরিচিতি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%