ন্যাপলা

অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়

অন্য দিন আপিস থেকে সাতটার আগে বাড়ি ফিরতে পারিনে৷ সে দিন একটা কাজের জন্য একটু সকালে বেরোতে হয়েছিল৷ তাই চারটার সময়ই বাড়ি এসেছিলাম৷

বাড়িতে এসে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠেই দেখি, আমার ছেলে শ্রীমান প্রণবপ্রসন্ন বারান্দায় মুখ ভার করে বসে আছে৷

আমি তার কাছে গিয়ে আদর করে বললাম, 'হ্যাঁরে ন্যাপলা, অমন করে বসে আছ যে?'

ন্যাপলা অমনি কেঁদে উঠে বলল, 'এই দেখেছ মা!'

আমি তো একেবারে অবাক৷ গৃহিণী ঘরের ভিতর ছিলেন; বাইরে বেরিয়েই বললেন, 'এই নেও, ছেলেটাকে বুঝি আবার খেপিয়েছে?'

আমি একেবারে থ হয়ে গেলাম; কই, এমন কী বলেছি যে, ছেলে খেপে একেবারে কেঁদে ফেলল৷ আমি নিতান্ত অপরাধীর মতো বললাম, 'সে কী! আমি ওকে খেপাব কেন? আমি শুধু জিজ্ঞাসা করেছি, হ্যাঁরে নেপলা, অমন করে বসে আছ যে! এতে খেপবার তো কোনো কারণ দেখিনে৷'

গৃহিণী বললেন, 'ওকে ন্যাপলা বলে ডাকলেই ওর রাগ হয়৷ ও নাম ধরে ডাকতে পারবে না৷'

বাঃ রে বাঃ! আজ দশ বছর ওই নাম ধরে, আমি কেন, সবাই ডেকে এসেছে; কোনো দিন বাবাজীবনের রাগ হয় নাই, খেপেও নাই; আজ হঠাৎ ও নামে অরুচি হল কেন?

আমি সবিস্ময়ে বললাম, 'কেন, ও নাম ধরে ডাকলে খেপবে কেন?'

গৃহিণী উত্তর দেবার আগেই শ্রীমান বলে উঠলেন, 'কেন তোমরা অমন বিশ্রী নাম ধরে আমাকে ডাকবে?'

আমি বললাম, 'তাতে দোষ কী হয়েছে?'

ছেলে বললেন, 'তোমরা দিনরাত ন্যাপলা ন্যাপলা কর বলে, স্কুলের ছেলেরাও আমাকে ন্যাপলা ন্যাপলা করে খেপাতে থাকে৷ কোন একটা ছেলে সে দিন বাড়ি এসে শুনে গিয়েছে ওই নাম৷ আজ একেবারে ক্লাসের মধ্যে ঢোল পিটিয়ে দিয়েছে৷ আমি আর কাল থেকে ও ইশকুলে যাব না, তা বলে রাখছি৷ আর তোমরা কেউ যদি আমাকে এ নাম ধরে ডাকো, তাহলে ভালো হবে না কিন্তু বাবা!'

বাস রে! আমি ভেবেছিলাম, কী না অপরাধ হয়েছে৷ তাই আমি হেসে বললাম, 'আমি তো তোমার এমন সুন্দর আর একেবারে নূতন নাম প্রণবপ্রসন্ন রেখেছিলাম৷ তোমার মা-ই তো আদর করে সেই আঁতুড় ঘরেই তোমার নাম রাখলেন ন্যাপলা৷ কাজেই সেই নাম চলে আসছে৷ আর নামটা এমন মন্দই বা কি! কেমন সুন্দর আদুরে নাম৷ এখন যদি প্রণবপ্রসন্ন বলে ডাকি, তাহলে মনে হবে, আর কাকে যেন ডাকছি, তোমাকে ডাকছিনে৷'

শ্রীমান বললেন, 'তোমাদের যেন ভালো লাগে৷ ইশকুলে যে সবাই ঠাট্টা করে৷ মাস্টারমশাই ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেলেই শুধু শোনো-ওরে ন্যাপলা৷ আমি ও ইশকুলে যাবই না৷'

আমি বললাম, 'আচ্ছা, আমি কাল হেডমাস্টার মশাইকে একখানা চিঠি লিখে দেব; তিনি যেন সব ছেলেদের নিষেধ করে দেন, কেউ যেন তোমাকে ওই নাম ধরে না ডাকে৷'

শ্রীমান বললেন, 'ছেলেরা সে কথা শুনবে কিনা৷ ক্লাসেই নাহয় না বলবে; বাইরে বেরিয়ে আরও বেশি করে বলবে৷'

গৃহিণী বললেন, 'সে তো ঠিক কথা৷ ও যখন ওই নাম শুনলে খেপে, তখন কেন রে বাপু তোদের ও নাম বলা৷ আর তুমি যে বলছ, মাস্টারকে লিখে দেবে, তাতে ছেলেরা আরও বেশি করে খেপাবে৷ না, না, ছেলেকে ও ইশকুল থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে আর কোনো ইশকুলে দাও৷ কলকাতা শহরে অনেক ইশকুল আছে৷'

আমি বললাম, 'দেখো বাবা প্রণবপ্রসন্ন-আরে দুর ছাই, এ যেন মহামহোপাধ্যায় শ্রীযুক্ত জিমূতবাহন সাংখ্য-বেদান্ততীর্থ মহাশয়কে ডাকছি-না, না, বাবা ন্যাপলা, তুমি রাগই কর আর খেপই এতটুকু ছেলেকে আমি প্রণবপ্রসন্ন বলে যখন-তখন ডাকতে পারব না৷ দেখো দেখি ন্যাপলা নাম কেমন মিষ্টি, কেমন গালভরা৷'

গৃহিণী বললেন, 'কেন, ও নাম তো তুমিই রেখেছিলে৷' আমি বললাম, 'আরে, ও হচ্ছে পোশাকি নাম৷ যখন বড়ো হবে, পাঁচটা পাশ করবে, বড়ো চাকরি করবে, রায় বাহাদুর হবে, তখন নামটা বেশ মানাবে৷ এই শোনো না-শ্রীযুক্ত রায় প্রণবপ্রসন্ন মুখোপাধ্যায়, এম.এ., বি.এল.৷ তখন ঠিক ভালো শোনাবে৷ এখন ওই যে বলেছি, প্রণবপ্রসন্ন বলতে গেলেই মনে আসবে সাংখ্য-বেদান্ততীর্থ৷ আর তাও বলি বাবা ন্যাপলা! আঁতুড় ঘরে তোমার মা বড়ো আদর করে ওই নাম রেখেছিলেন৷ মায়ের দেওয়া ওই নাম যে অমূল্য৷ ওর সঙ্গে যে কত মধু, কত আদর, কত স্নেহ মিশানো আছে, তা তুমি বুঝতে পারছ না৷ আর পোশাকি নাম কোনো দিনই মিষ্টি হয় না, সে যেন সিল্কের পাঞ্জাবি গায়ে দিয়ে, উড়নি উড়িয়ে একটা ভালো মানুষের মতো এসে দাঁড়ায়; আর আটপৌরে নাম-সে যেন চিনি-মাখানো; কেমন সুধাভরা, কেমন মিষ্টি! না, বাবা, তোমার অমন সুন্দর নাম ন্যাপলা আমি তো কোনোদিন ছাড়তে পারব না৷ তুমি যদি হাইকোর্টের জজ হও, কি বিলেত থেকে সাহেব হয়ে এস, তাহলেও হাজার লোকের মধ্যেও আমি তোমাকে ন্যাপলা বলে ডেকে যে আনন্দ পাব, আমার যেরকম প্রাণ জুড়িয়ে যাবে, তোমার প্রণবপ্রসন্ন, বামপ্রসন্ন, শ্রীপতিপ্রসন্ন, কিছুতেই সে প্রসন্নতা দিতে পারবে না৷ অতএব, তোমার মায়ের দেওয়া এই পরম আদরের নাম তুমি তুচ্ছ করতে পার, এ নাম শুনে তোমার লজ্জা বোধ হতে পারে; কিন্তু আমি তো ও নাম ছাড়তে পারব না-মরবার দিনও ডাকব-ওরে ন্যাপলা!'

গৃহিণী বললেন, 'শুনলে তো বক্তৃতা বাবা! তোমার ওই আঁতুড় ঘরের নাম ভিন্ন তোমার আর উপায় নেই৷ ওঁর পায়ের ধুলো নিয়ে বলো, অপরাধ হয়েছে-আমি তোমাদের ন্যাপলাই থাকব৷'

ন্যাপলা তখন আমার পায়ের ধূলা লইতে আসিল; আমি তাহাকে বুকের মধ্যে জড়াইয়া ধরিয়া বলিলাম, 'এই তো আমার বালগোপাল, এই তো আমার ন্যাপলা৷'

আশ্বিন ১৩৩২

Cov59
সকল অধ্যায়
১.
চাং
২.
হাবুর বাবুগিরি
৩.
ভবম হাজাম
৪.
হুড়ুকবাজ সিং
৫.
হাতির ভয়
৬.
বোকা তাঁতি
৭.
ঝানু চোর চানু
৮.
বাঘ মামা
৯.
শ্বেতব্রাহ্মণের উপাখ্যান
১০.
এক হল দুই
১১.
রামভজনের ঘোড়া কেনা
১২.
দাশুর কীর্তি
১৩.
বুনো মোষ পোষমানা
১৪.
ষর্ণশের্ণ
১৫.
নেড়ুর ভয়
১৬.
হেঁড়ে-গর্জন দৈত্য
১৭.
চোর আর ঠগ
১৮.
আলি ভুলির দেশে
১৯.
বড়ো গদাই আর ছোটো গদাই
২০.
পুরস্কার
২১.
হেশোরাম হুঁশিয়ারের ডায়েরি
২২.
ঠেকে শেখা
২৩.
যুদ্ধের গল্প
২৪.
বন্ধুর দান
২৫.
মানুষের ইতিহাস
২৬.
সূর্যমুখীর কথা
২৭.
ন্যাপলা
২৮.
খেয়ালহারা
২৯.
পরিবর্তন
৩০.
আচ্ছা জব্দ
৩১.
সে
৩২.
মিষ্টি মুখ
৩৩.
চিচিং ফাঁক
৩৪.
অপরূপ রাজ্য
৩৫.
গরিবের দান
৩৬.
চোর ধরা
৩৭.
ময়ূরপঙ্খি
৩৮.
সম্পাদকের সমস্যা
৩৯.
তাইতো
৪০.
লাঠি-সমস্যা
৪১.
খুকির নাম
৪২.
স্বপ্নাদ্য ঔষধ
৪৩.
অজানা কুটুম
৪৪.
রায় মহাশয়ের গল্প
৪৫.
সমরের ষড়যন্ত্র
৪৬.
সুধাং-অ্যাং
৪৭.
ফাঁকিবাজের শিক্ষা
৪৮.
ঘঙ্গোপাধ্যায়
৪৯.
নিশুর বিপদ
৫০.
ফুটবল ম্যাচ
৫১.
এক ভাল্লুকের গল্প
৫২.
কৃপাময়
৫৩.
সেজমামার চন্দ্রযাত্রা
৫৪.
রূপসায়রী
৫৫.
দুই পড়শি
৫৬.
সন্দেশের চিঠি
৫৭.
সদাশিবের ঘোড়া-ঘোড়া কাণ্ড
৫৮.
ভবানন্দের কাশীযাত্রা
৫৯.
প্রথম পুরস্কার
৬০.
কালো মানিক
৬১.
চেঙ্গিস আর হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালা
৬২.
গোবিন্দ গোয়েন্দা
৬৩.
দুগ্যো সদ্দার
৬৪.
ক্যাপ্টেন মুকুন্দরাম
৬৫.
অসমঞ্জবাবুর কুকুর
৬৬.
পিপীলিকা আতঙ্ক
৬৭.
মরুপ্রাসাদের রহস্য
৬৮.
সাতজনের তিনজন
৬৯.
গোরুর বিচার
৭০.
সংস্কার
৭১.
গঙ্গোত্রীর মহাপুরুষ
৭২.
মিনিয়েচারের বোম্বাই যাত্রা
৭৩.
চিতা কাহিনি
৭৪.
বটুকেশ্বরের আবির্ভাব
৭৫.
নিবারণের সমস্যা
৭৬.
ফোর্থ টেস্ট
৭৭.
টাক এবং ছড়ি রহস্য
৭৮.
কলাবতীর ময়দান রিপোর্টিং
৭৯.
ভোটরঙ্গ
৮০.
ঢেউয়ের পরে ঢেউ
৮১.
পাগলা গণেশ
৮২.
সেতু বন্ধন
৮৩.
চিপুরি বিলের মহাশোল
৮৪.
রামেশ্বরের অসমাপ্ত কাজ
৮৫.
বলো তো কে এসেছিল ডিনারে
৮৬.
বোকা রাজার বুদ্ধিমতী রানি
৮৭.
টিপলুর ইতিহাস চর্চা
৮৮.
সোনার মেডেল উধাও
৮৯.
তুতানের বন্ধু
৯০.
ভূত মরলে কী হয়
৯১.
কথারা সব বেরিয়ে পড়েছিল
৯২.
বড়দার কবে ভালো লাগবে
৯৩.
শিবের অসাধ্যি
৯৪.
জয়রামের সিন্দুক
৯৫.
সংবাদের নেপথ্যে
৯৬.
নাড়কান্ডার নানাকাণ্ড
৯৭.
করণপুরার টাঁড়
৯৮.
সাঁঝবাতি
৯৯.
ক্রিকেট খেলার উপকারিতা
১০০.
অলক্ষ্যে হাসে মহাকাল
১০১.
লেখক-পরিচিতি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%