অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়
এবারে জন্মদিনে মামা নিলুকে একটা চার নম্বর ফুটবল দিয়েছিলেন৷ নিলু একটা ফুটবল টিম গড়ে তুলেছে৷ পাড়ার হাঁদা, গোপাল, নোদো, ক্লাসফ্রেন্ড বোকা ও অসীম সবাই মেম্বার৷ ও পাড়ার সেই ঝগড়াটে ভোম্বল তার ভুলো কুকুরকে নিয়ে এসে বলেছিল, 'ভাই, আমরাও মেম্বার হব৷' নিলু বলল, 'পথ দেখো বাপু, এখানে নয়৷' ভোম্বলটা তো একটা 'স্পাই', তাদের টিমের খবর গ্রাস-হপারদের বলে দিক আর কি!
টিমের নামকরণ নিয়ে একটু গোলমাল হয়েছিল প্রথমে৷ ক্যাপ্টেন নিলু বোস বলল, 'স্বরাজ ফুটবল ক্লাব৷' ভাইস ক্যাপ্টেন বোকা রায় বলল, 'দূর, তার চেয়ে হামিদ স্পোর্টিং ভালো৷' নোদো আর অসীম বলল, 'না, ইস্টবেঙ্গল'; তাদের ঢাকায় বাড়ি৷ তখন ক্যাপ্টেন চটেমটে বলল, 'যাও, আমার বল দেব না৷' মেম্বাররাও পেছপা নয়; তারা বলল, 'ভারি তো বল! যাও যাও একলা খেলোগে৷ চলে আয় রে তোরা!'
কিন্তু কারোর যাওয়ার লক্ষণ দেখা গেল না৷ অসীম বলল, 'আমার পিসতুতো ভাই কানাইয়ের পাঁচ নম্বর মাগগ্রেগর আছে৷ ভারি তো এ বল!'
বোকা বলল, 'কাল আর্য স্পোর্টিং আমায় সাধাসাধি করছিল, তাদের ক্লাবে খেলবার জন্য৷ তাদের কেমন লাল ইউনিফর্ম আছে৷ ভারি ইয়ে . . .'
শেষে মামা এসে থামিয়ে না দিলে ব্যাপারটা কত দূর গড়াত কে জানে? মামাই ঠিক করে দিলেন, টিমের নাম 'ছাত্রদল'; নিলু ক্যাপ্টেন আর বোকা ভাইস ক্যাপ্টেন৷
যাহোক নিলুদের বাড়ির পেছনে দেড়গজি কচুবনে 'ছাত্রদলের' খেলা চলছিল মন্দ নয়; কিন্তু দেশপ্রিয় মেমোরিয়াল চ্যালেঞ্জ শিল্ডে এন্ট্রি করে দিয়ে অবধি ক্যাপ্টেন নিলুর আর ভাবনার অন্ত নেই৷
কত টিম তো এন্ট্রি করেছে-গ্রাস-হপারস, আর্য স্পোর্টিং, বয়েজ ওন; কিন্তু তাদের প্রথম খেলা পড়ল একটা অজানা টিমের সঙ্গে৷ 'কার্ডস'-কী নাম রে বাবা! ওয়ার্ড বুকে তো লেখা আছে 'কার্ডস' মানে তাস৷ তাস আবার টিমের নাম হয়! তার উপর ভোম্বল আবার সেদিন শাসিয়ে যাওয়াতেই বেশি ভয় হয়েছে-'দেখো না কার্ডস তোমাদের দশ গোল ঠুসে দেবে৷ কী ছোটে ওদের খেলোয়াড়রা, আমার ভুলোও পারে না তাদের সঙ্গে৷ ইয়া মোটামোটা পা তাদের৷'
এরকম শুনলে ভয় হবে না ক্যাপ্টেনের?
রবিবার দিন দুপুর বেলা খেয়ে-দেয়ে নিলু বেরোবার জোগাড় করছিল৷ আজ খেলা, আজ কখনো বিকেল অবধি চুপ করে থাকা যায়!
নিলুর চালিয়াতচন্দর কাকা হাঁক দিলেন, 'নিলে, কোথায় বেরোচ্ছিস রে এখন? শিগগির গিয়ে শুয়ে পড়!'
নিলু কাঁদো-কাঁদো হয়ে জবাব দিল, 'আজ যে আমাদের ম্যাচ আছে৷'
'হঁ, ম্যাচের নিকুচি করেছে! নিয়ে আয় দেখি ওয়ার্ড বুকটা!'
সিগারেট ধরাতে ধরাতে চন্দরকাকার চিমসে বন্ধু ঘাড় নেড়ে বললেন, 'হ্যাঃ, আজকালকার ছেলেগুলো যত ইয়ে!'
ওয়ার্ড বুক নিয়ে যাওয়ার চেয়ে নিলু শুয়ে পড়াই সুবিধা মনে করল৷
চন্দরকাকা চিমসে বন্ধুর সঙ্গে একমনে দাবার ঘুঁটি টিপছেন দেখে নিলু পা টিপে টিপে বেরিয়ে পড়ল৷ বোকার বাড়ির সামনে এসে ডাকল, 'বোকা, বোকা-!' বোকাটাও যে সাড়া দেয় না! নিলু আবার ডাকল, 'বোকা-বোকা-অ বোকা-অ . . .'
দড়াম করে দরজাটা খুলে গেল৷ একজন ইয়া মোটা লোক রাঙা জবাফুলের মতো চোখ রগড়াতে রগড়াতে বাইরে এসে হেঁড়ে গলায় বলল, 'কে হে চালাক, ঠিক দুপুর বেলা বোকা বোকা করে চেল্লাতে লেগেছ? ভালোমানুষদের ঘুমোবার জো নেই! ভাগো ভাগো শিমের বিচি, হতচ্ছাড়া, টোকো আম . . .'
নিলু চোখ-কান বুজে দৌড় মারল৷ পেছনে তখনও বিশেষণ শোনা যাচ্ছিল-'কানকাটা, পায়রার ডিম, ঘোড়ার গোবর . . .!' যখন একটু হুঁশ হল নিলুর, সে দেখল খেলার মাঠের সামনে এসে হাজির হয়েছে৷ একজন লোক ডাকছে 'ছাত্রদল, কার্ডস'-ওমা! বোকা, নোদো, অসীম, হাঁদা সবাই তো হাজির!
বোকাকে দেখেই নিলুর শরীর রাগে জ্বলে গেল৷ তার জন্যেই তো এই বিপদ আজ৷
'কোথায় ছিলি রে বোকা?'
'আজ পিসেমশাই এসেছেন, তাই আগেই পালিয়ে এসেছিলাম৷ এমন বদরাগি পিসেমশাই, তার ওপর কাঁচা ঘুম ভেঙে গেলে আর জ্ঞান থাকে না৷ তোকে তাড়া লাগিয়েছেন বুঝি?'
'না, সন্দেশ খেতে ডেকেছিলেন!'

খেলার হুইসেল পড়ল৷ তারা সব সার বেঁধে দাঁড়িয়েছে৷ কার্ডস কার্ডস? কই তাদের বিপক্ষ কই? কার্ডস-কার্ডস? অবাক চোখে নিলু দেখল পিলপিল করে নামছে তাদের দল৷ বেঁটে মোটা হরতনের সাহেবটা দাড়ি নাড়তে নাড়তে কিক করে মাঠে নামল৷ চারিদিক থেকে পড়ল হাততালি৷ গোলামের দল সার বেঁধে ফরোয়ার্ডে দাঁড়িয়েছে, বেঁটে বেঁটে গুণ্ডাগোছের সব চেহারা৷ সাহেবগুলো ব্যাক আর হাফ-ব্যাক৷ গোলে দাঁড়িয়েছে হরতনের রানি৷
নিলু বলে উঠল, 'না না, এ ম্যাচ হতেই পারে না!' হরতানের সাহেব এগিয়ে এসে বলল, 'কেন হে খোকা? আমরা কি এন্ট্রি করিনি?'
থতমত খেয়ে নিলু বলল, 'তোমরা বড্ড বড়ো . . .'
'মেপে দেখো,' বলে হরতনের সাহেব নিলুর পাশে এসে দাঁড়াল৷ মোটে নিলুর কাঁধ সমান৷
'দেখেছ তো খোকা?'
চটেমটে নিলু বলল, 'খোকা খোকা বোলো না বলছি!'
'তবে কী বলব?'
'আমি ক্যাপ্টেন নিলু বোস!'
মাটির ওপর এক সামারসল্ট খেয়ে হরতনের সাহেব বলল, 'গুডমর্নিং ক্যাপ্টেন'! বলে নিলুর হাতটা কষে ঝেঁকে দিল৷
তারপর খেলা শুরু হল৷ নিলু বলটা বোকাকে পাস করে দিতে যাচ্ছে এমন সময়ে ইশকাবনের গোলামটা ছোঁ মেরে এসে হাতে করে বলটা নিয়ে ছুট মারল৷
'হ্যান্ডবল, হ্যান্ডবল!' নিলু চেঁচিয়ে উঠল৷
ইশকাবনের গোলাম বলল, 'কক্ষনো নয়!'
'আলবত হ্যান্ডবল! হাতে করেছ হ্যান্ডবল নয় কীরকম?' ইশকাবনের গোলাম বলল, 'তাহলে পায়ে ঠেকলে লেগবল, মাথায় ঠেকলে হেডবল, চোখে ঠেকলে আইবল, ব্যাটে ঠেকলে ব্যাটবল . . . তাহলে তো খেলাই হয় না!'
নিলু জিজ্ঞেস করল, 'ব্যাট আবার কোথা হতে এল?'
'তাও জানো না? খেলতে এসেছ কেন? ব্যাটদের শুধোও৷' মাঠের এক কোণ থেকে কেঠো গলায় একটা ব্যাট বলে উঠল, 'আদি নিবাস মিহিজামের শালবন, হাল সাকিন মোহনতোষ ব্রাদার্স!'
নিলু ক্রমশই বোকা বনে যাচ্ছিল৷ ইতিমধ্যে নোদো এসে ইশকাবনের গোলামের হাতের বলে এক কিক কষাল৷ বলটা নিলুর পায়ের কাছে পড়তেই নিলু সেটা নিয়ে মারল চোঁ চোঁ দৌড়, বিপক্ষের গোলের দিকে৷ পেছন থেকে শুনল ইশকাবনের গোলামটা চেঁচাচ্ছে- 'লেগবল, লেগবল . . .'
ড্রিবল করে ব্যাকেদের মধ্য দিয়ে বলটা বার করে নিলু গোলের দিকে ছুটে যাচ্ছিল৷ গোলকিপার হরতনের রানি তাই দেখে উ-উ-উ বলে চিৎকার করতে করতে একেবারে অজ্ঞান! গোলপোস্ট দুটো হঠাৎ মাটি থেকে উঠে খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসতে হাসতে উলটো দিকে দৌড় মারল৷ নিলু যতই এগোয় তারাও ততই ছোটে!
পেছনে যত দশ নয় আটা সাতা দর্শক ছিল, তারা এদিকে লাল-কালো হাত তুলে চেঁচাতে লেগেছে, 'ফাউল, ফাউল! জোচ্চোর রেফারি, মাঠ থেকে বার করে দাও৷'
গোলমাল ক্রমশ বেড়েই চলল৷
হঠাৎ কোথায় যেন কী হয়ে গেল! নিলু বুঝতেই পারল না যে মাঠ থেকে সে কী করে খাটের উপর চলে এল৷ ওধারে চন্দরকাকা আর তার চিমসে বন্ধু মহা হইচই লাগিয়েছেন৷
-কিস্তি!
-কক্ষনো নয়!
-আলবত!
দুমদাম টেবিল চাপড়ানোর শব্দ৷
এদিকে বোকা তার খাটের সামনে দাঁড়িয়ে বলছে, 'আজ পিসেমশাই এসেছেন তাই পালিয়ে এলাম৷ এমন বদরাগি পিসেমশাই . . .!'
বৈশাখ ১৩৪২
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন