অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়
কয়েক বছর আগের কথা৷
ছেলে পড়িয়ে খাই, মোড়ের মাথায় চারজন লোক গরম হয়ে কথা বললে উলটো পথে হাঁটি, নিজে কখনো ভোট দিইনি৷ আর সেই আমাকেই কিনা ভোট নিতে যেতে হল! আর এমন এক জায়গায় যার নাম শুনেই লোকে চমকে উঠে কেমন চুপ মেরে যেতে লাগল, আর আমার দিকে এমন করুণার চোখে তাকাতে লাগল যেন এই আমাকে শেষবারের মতো দেখছে৷
তবু বুকে সাহস আর সঙ্গে ছয় সঙ্গী, পঞ্চাশ রকমের জরুরি কাগজপত্র আর ফর্দ মিলিয়ে একাত্তরটি মালপত্র-হ্যারিকেন থেকে ছুঁচ অবধি নিয়ে বাসে চাপলাম৷ বহুদূর চলার পর বালির ওপর ঘসটে চাকা টেনে বাস চলল, সবাই বলল নাকি নদী পেরোচ্ছি৷ এখন একটু শুকিয়ে গেছে এই যা৷ তারপর আরও বহুক্ষণ চলার পর নামা গেল দুনিয়ার আর এক প্রান্তে৷ সঙ্গে দু-টি সেপাই ছিল, নেহাতই নাবালক৷ ওরা নাকি ওদের জমি চষছিল৷ এমন সময় গভর্নমেন্টের লোক এসে লাঙ্গল কেড়ে পেয়ারা গাছের খেঁটে লাঠি ধরিয়ে দিয়ে জোর করে সেপাই করে দিয়েছে৷ ভোটের পর ছেড়ে দেবে৷
সব গুনে গেঁথে, সেপাই দু-টিকে ঘুম থেকে তুলে ফর্দ খুলে চৌকিদারের নাম খুঁজতে লাগলাম৷ এ সময় তার এখানে থাকার কথা৷ নাম ধরে কয়েকবার চেঁচালাম 'পঞ্চু হালুই' 'পঞ্চু হালুই' করে৷ দূর থেকে কী একটা পাখি বারবার সাড়া দিয়ে গা পিত্তি জ্বালিয়ে দিলে৷ হাঁক ডাক শুনে সেক্টর আপিসের জিপ এসে আমাদের নিয়ে চলল৷ পঞ্চু হালুইয়ের পাত্তা মিলল না৷ অথচ ওর পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবার কথা৷ সেক্টর অফিসার গজরাতে লাগলেন, 'দাঁড়াও ব্যাটার চাকরি ঘোচাচ্ছি৷'
গাড়ি আমাদের নিয়ে তো চলল, কিন্তু কোথায়? রাস্তা কই? এ তো উঁচু-নীচু ঢিপি আর গাছের ঝোপঝাড় বিছিয়ে আছে চারদিকে৷ তবু চলল জিপ সেই সব মাড়িয়ে৷ বার চারেক উলটোতে গিয়েও সোজা হল৷ আমাকে শূন্যে তুলে লুফতে লুফতে মাইল তিনেক মাঠ পেরিয়ে, বাঁশঝাড়ের মধ্যে একটা ডোবার মধ্যে পড়তে পড়তে বেঁচে গিয়ে ইশকুল বাড়িতে হাজির হল গাড়ি৷ এখানেই কাল ভোট নেওয়া হবে৷
এই নাকি স্থানীয় ইশকুল৷ গোটা আষ্টেক খুঁটির ওপর একটা খোড়ো চাল ঝুলে আছে কোনোমতে৷ গোবর ল্যাপা নড়বড়ে মাটির দেওয়াল৷ ঝোড়ো হাওয়া বইলে কাল অবধি টিঁকবে কি না সন্দেহ৷
জিপ বিদায় নিল৷
কোত্থেকে এগিয়ে এলেন এক পুলিশ সাব-ইন্সপেক্টর৷ বললেন, 'আগেই আমরা এসে গেছি৷ ওই ওধারে একটা ঘরে আছি৷' দেখলাম বেশ বড়ো ধরনের একটা পুলিশ দল৷ এই ধু-ধু জনপ্রাণীহীন প্রান্তরে এত পুলিশ কেন রে বাবা! বেশ ঘাবড়ে গেলাম৷
আসবাব বলতে দুটো ভাঙা চেয়ার, একটা তিন ঠ্যাঙো টেবিল আর কয়েক সার লজগজে বেঞ্চি৷ ওগুলোতেই ভোট নেবার কাজ চালাতে হবে৷ এর মধ্যে জিপের আওয়াজ পেয়ে দু-চারজন স্থানীয় মানুষ এসে হাজির৷
এমনভাবে তারা আমাদের দেখতে লাগল যেন মঙ্গল গ্রহ থেকে আসছি৷ আমাদের সেনবাবুর চশমাটা দেখিয়ে একটা ছেলে বুক ফুলিয়ে আর একজনকে জানাল যে তার কোন খুড়োও নাকি চোখে ওরকম পরে৷ তারপর বিস্ময় কমলে সেই ছেলেটিই, নাম বলল ভূতনাথ, মুড়ি আর জল নিয়ে এল৷ তারপর দেখি দু-জন লোক একটা খাটিয়া ছেড়ে ঘুম থেকে উঠে হাই তুলে সামনে দাঁড়াল৷ তাদের একজন জামা তুলে পেটের তলা থেকে একটা পেতল আঁটা বেল্ট বার করে জামার ওপর পরে নিল৷ বুঝলাম এই চৌকিদার৷ বললাম, 'কী গো, তোমার না থাকার কথা ছিল বড়ো রাস্তায়? অফিসার বাবু চটেছেন৷' তাতে ওর বিকার হল না৷ আরও বড়ো একটা হাই তুলে বলল, 'কী করব বাবু, গাড়ি গেলে তো৷ বাম দিকের গোরুটি শিষ্ট৷ কিন্তুক ডানদিকেরটি মাথাগরম করল৷' তারপর ভূতনাথকে ধমকে বলল, 'কী রে, আমরা একগাল মুড়ি-টুড়ি পাব না?'
খাটিয়ার অপরজন চুল-টুল আঁচড়ে একটা ভাঙা সাইকেল তুলে ছোটো সেলাম দিয়ে বলল, 'ক্রাসিন আনতে হবে তো বলুন যাই! আমার নাম হারানিধি, লিস্টির সঙ্গে মিলিয়ে নিন৷' লিস্টে দেখলাম নাম রয়েছে, হারানিধি চৌবে, সাইকেল মেসেনজার৷ বললাম, 'এত তাড়া কীসের? একটু রোদ পড়ুক না৷' ও চমকে উঠে বলল, 'আলো পড়ে এলে স্যার কোথাও যেতে পারব না, মাপ করবেন৷' স্থানীয় একজন মুরুব্বি মতো লোক মজা দেখছিল৷ বলল, 'আলো পড়ে গেলে ওই খালপারের মাঠ কেউ পেরোই না আমরা৷ ওখানে ডাকাতির মহড়া হয়৷ দু-পাঁচ টাকা আর তেল-নুন সঙ্গে থাকলে ধড় থেকে মুণ্ডু নামিয়ে কেড়েকুড়ে নেয়৷ মানুষ মারায় হাত পাকানোও হল, কিছু পাওয়াও গেল৷' আমি জায়গাটার দিকে তাকিয়ে একটা ঢোঁক গিললাম৷ আর আমার দলের সেপাই দু-জন লাঠি হাতে আমার আড়ালে দাঁড়িয়ে ঠক ঠক করে কাঁপতে লাগল৷ এমন সময় সাব-ইন্সপেক্টর সায়েব এগিয়ে এসে ইশকুল ঘরের চেয়ারটা টেনে নিয়ে বসে পড়লেন৷
চেয়ারটা একটা সন্দেহজনক শব্দ করল৷ তারপর, 'কোনো ভয় নেই স্যার, আমি খোঁজ খবর নিয়ে এলাম, গণ্ডগোলের কোনো চান্স নেই,' বলে জাঁকিয়ে যেই হেলান দিয়েছেন অমনি সমস্ত জোড়টোড় খুলে চেয়ারটা হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে গেল৷ স্থানীয় মুরুব্বিটি অমনি ব্যস্ত হয়ে বলে উঠল, 'ঃএ হে হে, নিতাই স্যারের চেয়ার'-আকাশ থেকে ঠ্যাং নামিয়ে ধড়ফড় করে পুলিশ সায়েব উঠে দাঁড়ালেন৷ তারপর ভাঙা টুকরোগুলো লোকটির হাতে গুনে গুনে তুলে দিয়ে দাঁত কড়মড় করে বললেন, 'নিতাই স্যারকে অ্যারেস্ট করা উচিত৷'
তারপর কেরোসিন এল, হ্যারিকেন জ্বলল, কাগজপত্রের কাজ নিয়ে বসলাম৷ কাপড় টাঙিয়ে গোপন ভোটকক্ষ তৈরি হল৷ পুলিশদের সঙ্গে মুরগির ঝোলভাত খেয়ে, ব্যালট পেপারের বান্ডিল মাথায় দিয়ে ঘুম দিলাম৷ ঘরের একটা দরজাতেও খিল নেই৷ টেবিল বেঞ্চিগুলো দরজায় লাগিয়ে পুলিশদের সতর্ক থাকতে বলে তবুও নিশ্চিন্ত হওয়া গেল না৷ খালি দুঃস্বপ্ন দেখে চমকে চমকে উঠলাম-ওই বুঝি কে দোর ঠেলে ছায়ার মতো এগিয়ে এল, ওই বুঝি আমার মুণ্ডুটা বাঁ-হাতে তুলে ডান হাতে ব্যালট পেপার ছিনতাই করল৷
ভোর না হতেই, বাপরে বাপ, সে কী বিরাট লাইন! কোত্থেকে সব মেয়ে-পুরুষ, বুড়ো-বুড়ি সার সার গোরুর গাড়ি বোঝাই হয়ে এসেছে৷ সবাই আগে ভোট দেবে৷ পুলিশরা একেবারে নাস্তানাবুদ হয়ে গেল ভিড় সামলাতে৷ সারাদিন ধরে চলল ভোট দেবার জন্যে কাড়াকাড়ি৷ অতি উৎসাহী কেউ আবার টাটকা ভোটের কালি মাথায় মুছে কিংবা চেটেপুটে আঙুল থেকে তুলে ফেলছিল৷ ধান্দা ছিল পরে ফের বেনামে আর একবার ভোট দেবার ফিকির খুঁজবে৷ তাদের ধরে ধরে ভালো করে কালি মাখানো হল৷ পুলিশ দিয়ে চোখ রাঙিয়ে, জেল খাটাবার ভয় দেখিয়ে তবে কোনোমতে নিরস্ত করা গেল৷
কোথা দিয়ে যে দুপুর গড়িয়ে সাড়ে চারটে বেজে গেল টেরই পেলাম না৷ শুধু হাত-পাগুলো অবশ হয়ে এল আর মাথাটা ঝিমঝিম করতে লাগল৷ মাঝেমধ্যে একটু-আধটু উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছিল বটে, বাইরে দাঁড়িয়ে দু-পক্ষ মুখোমুখি আস্তিন গোটাচ্ছিল৷ তবে তা সামাল দিতে অসুবিধা হয়নি৷ একবার শুধু দুম করে কোথায় একটা পটকা ফাটল৷ দেখতে যাচ্ছি, ধাক্কা খেলাম সেই দুই সেপাইয়ের সঙ্গে৷ ঊর্ধ্বশ্বাসে তারা ঘরে এসে ঢুকল৷ তাদের লাঠি দুটো কুড়িয়ে হাতে গুঁজে ধমকেধামকে ফের বাইরে দাঁড় করিয়ে দিলাম৷ পুলিশ লাগাতে হয়নি৷ শুধু জোড়হাতে অনুনয় করে বললাম, 'দয়া করে নির্বিঘ্নে ভোট হতে দিন৷ হাঙ্গামা বাধালে মালপত্র তুলে নিয়ে বাক্স উলটে ভোট বাতিল করে চলে যাব৷' এই কথাতেই কাজ হচ্ছিল খুব৷
দিনের শেষে হাঁপ ছাড়লাম৷ ভোটের বাক্সপ্যাঁটরা গুণে, লোকজন নিয়ে জিপে উঠতে যাচ্ছি এমন সময় সাদা কাগজ হাতে সেই ভূতনাথ এসে হাজির৷ একগাল হেসে কাগজটা সামনে মেলে ধরে বলল, 'একটা সার্টিফিকেট দিন স্যার৷' বললাম, 'কীসের সার্টিফিকেট?' 'ওই যে কত কাজ করলুম! মুড়ি জল এনে দিলুম, পুলিশদের জামা-টুপি টাঙাবার পেরেক হাতুড়ি-'
অন্ধকার নামছিল৷ তাই আর কথা না বাড়িয়ে খসখস করে কোনোরকমে কিছু প্রশংসা লিখে দিয়ে বললাম, 'কী হবে এটা দিয়ে?' ও বলল, 'পঞ্চায়েত আফিসে চাকরি চাইব৷' আমি বললাম, 'ইশকুলে পড় না?' ভোটের ঘরটা দেখিয়ে ও বলল, 'এই তো আমাদের ইশকুল৷ চাকরি পেলেই পড়া ছেড়ে দোব৷'
আমাদের গাড়ি ফিরে চলল মাঠের ওপর দিয়ে দুলতে দুলতে৷
পৌষ ১৩৯৪

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন