সন্দেশের চিঠি

অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়

সেদিন বিকেল বেলা 'সন্দেশ' এসে বলে গেল, ওর নামে আজকাল এত চিঠি আসছে যে সেগুলো শুনতে শুনতে ওর কান ঝালাপালা৷ সে চিঠিগুলোতে কী নেই! তাতে কত রকমের কথা, কত জিনিস নিয়ে আলোচনা, যেমন-দুঃখকষ্ট, ভাব-ঝগড়া, মামলামোকদ্দমা, জন্মদিন-দুর্গাপুজো, পরীক্ষা-রেজাল্ট, ঘুড়ি-লাটাই . . . এমনি সব জিনিস৷ 'সন্দেশ' বলল, 'দেখো তো মজা! এই চিঠিগুলোর হাঁকডাক শুনে আমি কি পাগল হয়ে যাব? তারপর বলল, 'এরা নাকি একটার পর একটা চিঠি লিখে যায়, উত্তর না দিলে আরও বড়ো চিঠি লেখে, তারও উত্তর না দিলে নিজেরাই চলে আসে৷' আমি বললাম, 'সন্দেশ', তুমি একা অত ঝক্কি নিতে যাও কেন, দাও না বন্ধুদের পাঠিয়ে৷ তারা পড়ে দেখুক৷'

তাই শুনে 'সন্দেশ' তার ঝোলা থেকে এক বান্ডিল চিঠি বের করে আমার সামনে রাখল৷ আমি তো দেখে অবাক! খামের চিঠি, পোস্টকার্ডের চিঠি, বুক-পোস্টের চিঠি, বেয়ারিং চিঠি-আমি একটার পর একটা পড়ে যেতে লাগলাম৷ তার থেকে তিনটে চিঠি 'সন্দেশ'-এর বন্ধুদের দিচ্ছি৷ তার একটাতে ইতিহাস উলটে যাচ্ছে, আর দুটোতে দু-জনের দুঃখের কাহিনি মুক্তোর মতো হরফে লেখা হচ্ছে৷

প্রথম চিঠি-

'হস্তিনাপুর৷

আমার সহিত মহাভারত-রচয়িতা বেদব্যাসের সৌহার্দ্যের কথা ইতিহাস বর্ণিত না থাকিলেও তৎকালীন বিখ্যাত সংবাদপত্রে প্রচারিত হইয়াছে৷ তাঁহার মহাভারতের মূল উপকরণ বস্তুত আমার নিকট হইতেই সংগ্রহ করিয়াছিলেন৷ অদ্যাপি তিনি আমার এই মহৎ দান ভাঙাইয়া খাইতেছেন৷ আমি এবিষয়ে পাঠকবৃন্দকে অবগত করা আবশ্যক মনে করি নাই, যদি না কিছুদিন পূর্বে তিনি আমার সহিত ফুচকা-ভক্ষণ ব্যাপারে বৈতরিণীতীরে এক তুমুল কাণ্ড বাধাইতেন৷ আহা! কী মহৎ প্রবৃত্তি! মাত্র দুইখানি ফুচকা! ইতি-'

চিঠির নীচে কোনো নাম ছিল না৷ তাই 'সন্দেশ'কে বললাম, এসব বেনামি চিঠিতে কান দিয়ো না৷ বড়োলোকদের নামে ওরকম অনেক উড়ো চিঠি আসে৷ ব্যাসদেবের সঙ্গে দেখা হলে নাহয় এসব সমস্যার সমাধান হত৷

Cov119

দ্বিতীয় চিঠি৷ একজন পবননন্দনের উক্তি :

'ভাই 'সন্দেশ',

আমি পা স্লিপ করে এই অভদ্র জগতে এসে পড়েছি৷ নয়তো পুরাণে লেখা রামরাজ্যেই আমি বাস করতাম-এ কথা আশাকরি তোমার অজানা নয়৷ আমি এ জগতের অবনতির উচ্চশিখর দেখে হাঁ হয়ে যাচ্ছি, আর বসবার জায়গার অভাবে পার্কে পার্কে ঘুরে চীনেবাদাম চিবোচ্ছি (এতে অনেক পয়সা নষ্ট হচ্ছে, তবে পয়সা আমার নয়, পয়সা বাদামওয়ালার)৷ কোথায় বসব?-সমস্ত গাছ উৎপাটিত, সেখানে চিরহরিৎ ঘাসের চাষ৷ রোদে ঘুরে আমার মাথা ধরেছে৷ একপাটি হাওয়াই স্যান্ডেল ছিঁড়েছে৷ একটা সাত আনা তিনপয়সা দামের কলম পকেটমার হয়েছে (এর আগে জানতাম না যে পার্কে মুক্তসেবন করতে এসে লোকে কলম ভক্ষণ করে৷ এটাই বোধকরি এ জগতের বিধি-হাওয়া খেতে এসে কলম হাওয়া হয়ে যায়)৷ গায়ের অমন ধোঁয়াটে রং তামাটে আভা ধারণ করেছে, মাথার খুলিতে ফাটল ধরেছে আর কানের গোড়ায় কনসার্ট বাজছে৷ এদের মাশুলস্বরূপ কয়েক ডজন 'এনাসিন', একছটাক সিমেন্ট ও একটি পেন্টিং বক্স লেগেছে৷ এ ছাড়া নাইলন-শার্টের ফুটো দিয়ে নগদ পাঁচ নয়া পয়সা রাস্তার ধুলোয় মিলিয়ে গেছে (লোকে কুড়িয়ে নিতেও পারে, যা হ্যাংলা স্বভাব হয়েছে)৷

যা হোক এখন আমার মেজাজ গরম৷ একটা আইসক্রিম খেয়েছি৷ আরেকটা খেতে চাই৷ কিন্তু পয়সা নেই৷ একটা কালো চশমা কিনতাম, তাও হবে না (চক্ষুরত্ন দু-টি রক্ষা পেত তা কে বুঝবে?)৷ পয়সার অভাবে পৃথিবী অন্ধকার৷ কালো চশমার আর কী দরকার?'

আমরা ওকে সান্ত্বনা দিয়ে একটা কলম, নগদ পাঁচ নয়া পয়সা আর একটা কালো চশমা কিনে পাঠিয়েছি৷ হাজার হোক ছেলেমানুষ তো, খুশি হবে৷

শেষের চিঠিটা লিখেছে একটা সাদা দাঁড়কাক৷ চিঠিটা ইংরেজিতে লিখেছিল৷ তার বাংলা করলে এইরকম দাঁড়ায়:

'ওস্ট্রেলিয়াসে ইখানে আসার পর থেকেই হামার মন খুব খারাপ আছে৷ একজনভি বন্ধু আছে না৷ হামার যত জাতভাই আছে তারা কুছ বাংলা জানে না৷ ইশকুলে পোড়ে না, তাই অংরেজি জানে না৷ হামার কোথা বুঝে না৷ বোড় দুঃখ হয় যে বুঝার চেষ্টাভি কোরে না৷ হামার সামনে সামনে দেখিয়ে চপ-কাটলেট আচ্ছাসে খায়৷ হামি কুছু খাবে জানলে বুঝবে না, বুঝবে তো এক গেলাস পানি আনবে৷ বহুত মোজার আছে যে কুনো গালাগালি করলে ঠিক ঠিক বুঝতে পারবে৷ হে 'সন্দেশ' ভাই, হামি কী কোরবে? তুমি একটা কুনো বুদ্ধি বাতলে দিবে৷'

আমি ওকে বাংলা শিখতে বলেছি৷ কোথায় শিখবে সেটাও এক সমস্যা! দাঁড়কাকদের জন্যে তো কোনো ইশকুল নেই৷ তা 'সন্দেশ'-এর বন্ধুরা কেউ রাজি থাকলে জানিয়ো৷ আমরা ওর সঙ্গে যোগাযোগ করে দেব৷

কার্তিক ১৩৬৮

সকল অধ্যায়
১.
চাং
২.
হাবুর বাবুগিরি
৩.
ভবম হাজাম
৪.
হুড়ুকবাজ সিং
৫.
হাতির ভয়
৬.
বোকা তাঁতি
৭.
ঝানু চোর চানু
৮.
বাঘ মামা
৯.
শ্বেতব্রাহ্মণের উপাখ্যান
১০.
এক হল দুই
১১.
রামভজনের ঘোড়া কেনা
১২.
দাশুর কীর্তি
১৩.
বুনো মোষ পোষমানা
১৪.
ষর্ণশের্ণ
১৫.
নেড়ুর ভয়
১৬.
হেঁড়ে-গর্জন দৈত্য
১৭.
চোর আর ঠগ
১৮.
আলি ভুলির দেশে
১৯.
বড়ো গদাই আর ছোটো গদাই
২০.
পুরস্কার
২১.
হেশোরাম হুঁশিয়ারের ডায়েরি
২২.
ঠেকে শেখা
২৩.
যুদ্ধের গল্প
২৪.
বন্ধুর দান
২৫.
মানুষের ইতিহাস
২৬.
সূর্যমুখীর কথা
২৭.
ন্যাপলা
২৮.
খেয়ালহারা
২৯.
পরিবর্তন
৩০.
আচ্ছা জব্দ
৩১.
সে
৩২.
মিষ্টি মুখ
৩৩.
চিচিং ফাঁক
৩৪.
অপরূপ রাজ্য
৩৫.
গরিবের দান
৩৬.
চোর ধরা
৩৭.
ময়ূরপঙ্খি
৩৮.
সম্পাদকের সমস্যা
৩৯.
তাইতো
৪০.
লাঠি-সমস্যা
৪১.
খুকির নাম
৪২.
স্বপ্নাদ্য ঔষধ
৪৩.
অজানা কুটুম
৪৪.
রায় মহাশয়ের গল্প
৪৫.
সমরের ষড়যন্ত্র
৪৬.
সুধাং-অ্যাং
৪৭.
ফাঁকিবাজের শিক্ষা
৪৮.
ঘঙ্গোপাধ্যায়
৪৯.
নিশুর বিপদ
৫০.
ফুটবল ম্যাচ
৫১.
এক ভাল্লুকের গল্প
৫২.
কৃপাময়
৫৩.
সেজমামার চন্দ্রযাত্রা
৫৪.
রূপসায়রী
৫৫.
দুই পড়শি
৫৬.
সন্দেশের চিঠি
৫৭.
সদাশিবের ঘোড়া-ঘোড়া কাণ্ড
৫৮.
ভবানন্দের কাশীযাত্রা
৫৯.
প্রথম পুরস্কার
৬০.
কালো মানিক
৬১.
চেঙ্গিস আর হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালা
৬২.
গোবিন্দ গোয়েন্দা
৬৩.
দুগ্যো সদ্দার
৬৪.
ক্যাপ্টেন মুকুন্দরাম
৬৫.
অসমঞ্জবাবুর কুকুর
৬৬.
পিপীলিকা আতঙ্ক
৬৭.
মরুপ্রাসাদের রহস্য
৬৮.
সাতজনের তিনজন
৬৯.
গোরুর বিচার
৭০.
সংস্কার
৭১.
গঙ্গোত্রীর মহাপুরুষ
৭২.
মিনিয়েচারের বোম্বাই যাত্রা
৭৩.
চিতা কাহিনি
৭৪.
বটুকেশ্বরের আবির্ভাব
৭৫.
নিবারণের সমস্যা
৭৬.
ফোর্থ টেস্ট
৭৭.
টাক এবং ছড়ি রহস্য
৭৮.
কলাবতীর ময়দান রিপোর্টিং
৭৯.
ভোটরঙ্গ
৮০.
ঢেউয়ের পরে ঢেউ
৮১.
পাগলা গণেশ
৮২.
সেতু বন্ধন
৮৩.
চিপুরি বিলের মহাশোল
৮৪.
রামেশ্বরের অসমাপ্ত কাজ
৮৫.
বলো তো কে এসেছিল ডিনারে
৮৬.
বোকা রাজার বুদ্ধিমতী রানি
৮৭.
টিপলুর ইতিহাস চর্চা
৮৮.
সোনার মেডেল উধাও
৮৯.
তুতানের বন্ধু
৯০.
ভূত মরলে কী হয়
৯১.
কথারা সব বেরিয়ে পড়েছিল
৯২.
বড়দার কবে ভালো লাগবে
৯৩.
শিবের অসাধ্যি
৯৪.
জয়রামের সিন্দুক
৯৫.
সংবাদের নেপথ্যে
৯৬.
নাড়কান্ডার নানাকাণ্ড
৯৭.
করণপুরার টাঁড়
৯৮.
সাঁঝবাতি
৯৯.
ক্রিকেট খেলার উপকারিতা
১০০.
অলক্ষ্যে হাসে মহাকাল
১০১.
লেখক-পরিচিতি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%