অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়
নাথু কিন্তু কোনো কথাই কানে তোলে না; বলে-'তা ভূতই হোক আর দত্যিই হোক, আমি একবার ভালোরকম পরখ না করে ছাড়ছি না৷'
মা কত মাথার দিব্যি দিলেন, কত কান্নাকাটি করলেন-'আরে নাথঅ, তুমহে যদি সেঠাকু যাও তাহেলে মু নিশ্চয় মথাকুটি মরিবি৷'
নাথু তার মাকে বুঝিয়ে বলল, 'কিচ্ছি ভয় নাহি মা, ভূতঅ মনুষ্যকু কামুড়ি ন পারে; আউ যদি বদমাস লোক হুয়ে তাহেলে-' বলতে বলতে নাথু তার জংলি লতার লাঠিটা বোঁ করে নিজের চার দিকেই একবার ঘুরিয়ে নিল৷
নাথুকে কোনোরকমেই আটকানো গেল না৷ সে সন্ধ্যে পার না হতেই আঠারোনালার খালের উপর ডিঙিটা ভাসিয়ে দিয়ে ওপারের ঘন বনের ধারে ধারে বৈঠা বেয়ে চলল৷ বনের মাঝে পোড়ো মন্দিরটাই তার লক্ষ্য৷ কয়েকদিন থেকেই সে শুনে আসছে, ওই ভাঙা মন্দিরটার ভেতর নাকি হঠাৎ হঠাৎ আগুন জ্বলে উঠে আর নানারকম বিটকেল বিটকেল শব্দ হয়৷ সবাই বলে ভূত, কিন্তু নাথুর তা বিশ্বাস হয় না৷ সে ভাবে ব্যাপারটা কী দেখতেই হবে৷
নাথুর গায়ে ছিল অসুরের মতো শক্তি আর মনে ছিল দুর্জয় সাহস-উড়িয়াদের মধ্যে এমনটা খুব কমই দেখা যেত৷ তাহলেও বনের ভেতর ঢুকতেই তার গাটা কেমন ছমছম করে উঠল৷ কী ভয়ানক অন্ধকার৷ লাঠিটাকে খুব শক্ত করে ধরে সে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল৷ সে যখন মন্দিরটার প্রায় কাছাকাছি এসে গেছে, এমনি সময় দুরুস দুরুস করে তার চারদিকে এমনি ভয়ানক আওয়াজ হতে লাগল যে নাথু ভয়ে একেবারে মাটির ওপর টলে পড়ল৷
আস্তে আস্তে একটু সাহস সঞ্চয় করে আবার সে উঠে বসল৷ তার চারদিকটায় তখন বিশ্রী রকমের ধোঁয়ায় ভরে গেছে, কিচ্ছু দেখবার উপায় নাই৷ ধোঁয়ার গন্ধটা নাকে যেতেই নাথুর মনে হল, এ ধোঁয়াটা যেন তার চেনা চেনা৷ এই তো সেদিন যখন তার বন্ধু বরজর বিয়েতে সে বোমপটকা ছুড়েছিল সে ধোঁয়াতেও যেন এরকম গন্ধই ছিল৷ নাথুর কেমন সন্দেহ হতে লাগল, হয়তো কেউ তাকে পটকা ছুড়ে ভয় দেখাচ্ছে৷
নাথু আবার তার লাঠিগাছটা খুব শক্ত করে বাগিয়ে মন্দিরের দিকে এগিয়ে চলল৷ মন্দিরের প্রথম সিঁড়িতে পা দিয়েছে কি দেয়নি এমনি সময় মন্দিরের ভিতর একটা ছোটো কুঠুরিতে হঠাৎ এমন ভয়ানক আগুন জ্বলে উঠল যে তার দুটো-চারটা হলকা ছুটে এসে নাথুর বাঁ-হাতটাকে রীতিমতো ঝলসে দিয়ে গেল৷ নাথু তাড়াতাড়ি দু-পা পিছিয়ে এল৷
যেন ভেলকি৷
আগুনটা যেমন হঠাৎ জ্বলে উঠেছিল আবার তেমনি হঠাৎ নিভেও গেল৷ অন্ধকারটা আরও কী ভয়ানক বিশ্রী হয়ে উঠল৷ নাথুর নিশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছিল এমনি জমাট অন্ধকার৷ ভয়ে তার সমস্ত শরীরটা থরথর করে কাঁপছে৷ সে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল, তবু পিছু হঠল না৷ নানারকমে নিজের মনকে সাহস দিয়ে সে চাঙ্গা করে তুলল৷ তার চারদিকে রাতজাগা পশুপাখি চিৎকার করে করে পালাতে লাগল৷ বাদুড়ের ঝটপটানি, ভুতুমপাখির ভুতুম-ত্থুমো নাথুকে খুব বেশি ভয় দেখাতে পারল না বটে কিন্তু ওর পাশেই যখন ঝুপ ঝুপ করে কতগুলো ঢিল পড়তে লাগল তখন নাথু একদিকে যেমন পেল ভয়, আরেক দিকে তেমনি ওর সাহসটাও গেল বেড়ে৷ সে দুই লাফে চত্বরের ওপর উঠে মন্দিরের ভেতর ঢুকে পড়ল৷
তারপর!
তারপর নাথুর চোখ দুটো যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইল৷ লাঠিটা কাঁপতে কাঁপতে তার হাত থেকে মেঝের উপর পড়ে গেল৷ সঙ্গেসঙ্গেই হাত-পা অবশ হয়ে নাথুও সেখানে ধপ করে বসে পড়ল৷ কিন্তু তার চোখ দুটোকে সে কোনোমতেই ফেরাতে পারল না৷ মোহাবিষ্টের মতো অপলক চোখে সে দেখতে লাগল একটা মস্ত বড়ো মাথা৷ কেবল একটা মাথা, আর কিছু নয়৷ তিন-চার হাত বড়ো একটা বিকট বিভৎস মাথা আর মস্ত মস্ত হাঁড়ির মতো জ্বলজ্বলে দুটো চোখ তার দিকে একটু একটু করে এগিয়ে আসছে৷ নাথু চিৎকার করে উঠল, কিন্তু তার মুখ দিয়ে একটুখানি চিঁ চিঁ শব্দ ছাড়া আর কিছুই বেরোল না৷
নাথু ভাবল-মরেছি তো মরেছি, একবার শেষ চেষ্টা করে দেখি৷ সে ধীরে ধীরে তার লাঠিটাকে তুলেই ধাঁ করে দিল সেই মাথাটার উপর বসিয়ে৷
অমনি এক অবাক কাণ্ড! মাথাটা ভুস করে চুপসে গিয়ে গড়াতে গড়াতে হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে গেল৷
ছুট ছুট! কিন্তু নাথুর মনে হল কে যেন তাকে দূর থেকে বলছে-'গেলাম গেলাম, রক্ষা করো, আমায় একা ফেলে যেয়ো না-বাঁচাও বাঁচাও!'
নিজে বাঁচলে তবে তো পরের কথা-নাথু একেবার টেনে দৌড়৷
মন্দিরের বাইরে পা দিতেই একটা তীব্র চকচকে আলো নাথুর চোখ দুটো একেবারে ধাঁধিয়ে দিল৷ নাথু ভাবল-না! আজকে আর সত্যি সত্যিই রক্ষে নেই দেখছি৷ এমনি সময় কে যেন ক্যাঁক করে তাকে পেছন থেকে জাপটে ধরেই চেঁচিয়ে উঠল, 'মিলগিয়া, শালা ডাকুকে পাকড়েছি সাব৷'
কিন্তু বাঙালি দারোগা সাহেব টর্চের বাতিতে নাথুকে দেখেই চিনতে পারলেন৷ তিনি বেশ একটু আশ্চর্য হয়েই জিজ্ঞেস করলেন, 'কী রে নাথু, তুই এখানে কেন?'
নাথুও দারোগা সাহেবের গলা শুনে অনেকটা সাহস ফিরে পেল৷ সে তখন সকল কথাই দারোগা সাহেবের কাছে খুলে বলল৷
দারোগা সাহেব তো সব শুনে নাথুর পিঠ চাপড়ে বলে উঠলেন, 'সাবাস নাথু, তুই একটা মস্ত কাজ করেছিস৷ যে ভূতটাকে তুই লাঠি মেরেছিলি সেটা মোটেই ভূত নয়, একটা বিষম দজ্জালে ডাকাত৷ পনেরো-ষোলো দিন আগে হঠাৎ জেল টপকে পালিয়ে যায়৷ তারপর খোঁজ খোঁজ, সমস্ত তল্লাটটা ওলট-পালট করেও ওকে পাওয়া যায়নি৷ আজকে সন্ধ্যার একটু আগে আমাদের গুপ্তচর খবর দিল যে এই ভাঙা মন্দিরটার ভেতর লুকিয়ে আছে-তাই ধরতে এসেছিলাম৷ যাক, তুই কাজটা অনেক এগিয়ে রেখেছিস, চল এখন ওকে ধরে নিয়ে আসি৷'
নাথু বলল, 'কিন্তু মাথাটা যে হঠাৎ মিলিয়ে গেল; ডাকাত হলে তো . . .'
তার কথা শেষ না হতেই দারোগা সাহেব বলে উঠলেন, 'মিলিয়ে যায়নি রে, মিলিয়ে যায়নি৷ মন্দিরটার ভেতর অনেক কালের পুরোনো একটা শুকনো ভাঙা কুয়ো আছে৷ ডাকাতটা গড়াতে গড়াতে সেই কুয়োর মধ্যেই পড়ে গেছে বোধ হয়৷ কুয়োর ভেতর থেকে উঠবার আর কোনো উপায় নেই তাই 'বাঁচাও বাঁচাও' বলে তোকে ডেকেছিল৷'
তিন-চার দিন পরের কথা৷ নাথু তার শখের বুলবুলিটির সাথে খেলা করছিল আর তাকে গান শেখাচ্ছিল-
'মো সম পাতকি হেলা, মু কন করমু জগরনাথ-অ-অ-রে-'
এমনি সময় হঠাৎ দারোগা সাহেব এসে উপস্থিত৷ দারোগা সাহেব নাথুর হাতে একটি থলে দিয়ে বললেন, 'নে নাথু, ডাকাত ধরার জন্য সরকার থেকে তোকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে৷'
নাথু থলের মুখ খুলে দেখে-
তাই তো!-এক, দুই, তিন, চার!-এ যে কড়কড়ে দু-শো টাকা!
জ্যৈষ্ঠ ১৩৪০

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন