অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়
সকাল থেকেই বেশ মেঘ করেছে৷
বেলা তখন আটটা হবে-আমি ঘরে বসে একমনে খবরের কাগজটা উলটেপালটে দেখছি এমন সময় বন্ধুবর মোহনলাল এসে হাজির৷
বোর্ডিংয়ের চাকর জগন্নাথকে ডেকে বললাম, 'ওরে চট করে দু-কাপ চা আর কিছু গরম জিলিপি নিয়ে আয় শিগগির৷'
মোহনলাল বলল, 'ওহে, আমি এইমাত্র চা খেয়ে আসছি, শুধু তোমার জন্যেই আনতে দাও৷'
'আরে, সে কি হতে পারে নাকি! আর এক কাপ চা খেলে কিছু মহাভারত অশুদ্ধ হবে না, দিনটা আজ বেশ ঠান্ডা আছে৷'
আমার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে মোহনলাল বলল, 'দিনটা আজ ঠান্ডা আছে বলেই তো একটা মতলব নিয়ে তোমার কাছে এলাম৷ আজ রবিবার আছে, চলো কাছাকাছি কোথাও ঘুরে আসা যাক৷'
মতলবটা আমার কাছে নেহাত মন্দ লাগল না৷ মোহনলালের সঙ্গে অনেক দিনই এরকম আমি ঘুরে বেড়িয়েছি! গত রবিবারেও আমরা ব্যারাকপুরের এক বাগানে মাছ ধরতে গেছিলাম৷
আমি বললাম, 'কোথায় যাবে মনে করেছ? এমন জায়গায় চলো যেখানে গাঁটের পয়সাও বেশি খরচ হয় না অথচ কলকাতার বাহিরেও ঘুরে আসা যায়৷'
মোহনলাল বলল, 'ডায়মন্ড হারবার লাইনে 'গড়িয়া' বলে একটা জায়গা আছে, জায়গাটা শুনেছি খুব সুন্দর৷ সেখানকার হাটও নাকি একটা দেখবার জিনিস৷ কলকাতার খুব কাছে, খরচেরও বেশি ভয় নেই৷'
আমি বললাম, 'কখন ফিরবে?'
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে মোহনলাল বলল, 'এখন সোয়া আটটা; বারোটার মধ্যে আমরা ফিরব নিশ্চয়ই৷ আজ রবিবার, তোমাদের বোর্ডিংয়ের খাওয়া-দাওয়া হতে আজ অনেক দেরি হবে; কাজেই অসুবিধার কোনো কারণ নাই৷'
ততক্ষণে চা আর জিলিপি এসে গেছে৷ দু-মিনিটের মধ্যে সেগুলির সুব্যবস্থা করে আমরা তাড়াতাড়ি উঠে পড়লাম৷
ভাগ্য ভালো৷ শিয়ালদায় এসে দেখলাম ডায়মন্ডহারবারের গাড়ি গার্ড সাহেবের সংকেতের জন্য অপেক্ষা করছে৷ আমরা গাড়িতে উঠে বসলাম, গাড়িও ছেড়ে দিল৷
বালিগঞ্জ, ঢাকুরিয়া, যাদবপুর, ট্রেন হুস হুস করে ঝড়ের মতো ছুটে চলেছে৷ যাদবপুর ছাড়িয়ে যেতেই আমাদের চোখে পড়ল দু-ধারের দিগন্তবিস্তৃত নীচু জমি৷ ধু-ধু করছে ফাঁকা মাঠ৷ শোনা যায় বর্ষাকালে এই সব জমিতে রীতিমতো বান ডাকে, তখনকার রূপ দেখলে কেউ ধারণা করতে পারে না এখানে কোনোকালে মাঠ ছিল৷ মনে হয় ট্রেন যেন কোনো সীমাহীন নদীর সেতুর উপর দিয়ে চলেছে৷
পরের স্টেশনই গড়িয়া৷ গাড়ি থেকে নেমে পড়লাম৷ ছোট্ট স্টেশন৷ ভদ্রলোকের মধ্যে আমি আর মোহনলালই নামলাম; আর যারা নামল তাদের মধ্যে ছিল কয়েকটি জেলে, কয়েকটি উড়ে, একজন ডাকহরকরা, আর কয়েকটি লুঙিপরা মুসলমান কারিগর৷
গাড়ি থেকে নামতেই হাঁপাতে হাঁপাতে একটি রোগামতো ভদ্রলোক এসে আমাদের বললেন, 'আপনারা তো কলকাতা থেকে আসছেন?' মোহনলাল আর আমি একসঙ্গে বললাম, 'হাঁ৷'
ভদ্রলোকটির গায়ে কাপড়ের খুঁট জড়ানো৷ এতক্ষণ বোধ হয় খালি গায়েই ছিলেন, হঠাৎ অপরিচিত দুটি ভদ্রলোকের ছেলেকে দেখেই বোধ হয় ভদ্রতার খাতিরে ওই কাপড়ের খুঁট গায়ে জড়িয়েছেন৷
তিনি বললেন, 'মহেন্দ্রবাবু এলেন না?' মনে মনে বুঝলাম ভদ্রলোক ভুল করেছেন৷ বেশ কৌতুক অনুভব করলাম৷ চোখের ইশারায় মোহনলালকে কোনো কথার উত্তর দিতে মানা করে আমি বললাম, 'না, বিশেষ কাজে আটকে পড়ায় তিনি আসতে পারলেন না৷'
ভদ্রলোক তখন আমাদের আপ্যায়িত করে ডেকে নিয়ে পথ দেখিয়ে তাঁর বাড়িতে চললেন৷ ভদ্রলোক একটু এগিয়ে যেতেই আমি মোহনলালকে খুব আস্তে আস্তে বললাম, 'দেখা যাক কোথাকার জল কোথায় গড়ায়, বিপদ বুঝলে সটকে পড়া যাবে৷'
মোহনলালও মুচকি হেসে আমার কথায় সায় দিল৷
মাঠের রাস্তা ধরে আমরা চলেছি৷ মাঝে মাঝে পথের দুই ধারে ঝোপড়া বাঁশের ঝাড় আর তার পাশে এঁদো পুকুর৷ জনশূন্য গ্রাম৷ দু-এক জায়গায় শুধু দেখলাম কয়েকটি ছেলে পুকুরের জলে নেমে মাছ ধরবার চেষ্টা করছে৷
অনেকখানি পথ হেঁটে আমরা একটা টিনের বাড়িতে এসে উপস্থিত হলাম৷ বাইরের ঘরে আমাদের বসিয়ে ভদ্রলোকটি ছুটে ভিতরে গেলেন৷ টের পেলাম ভিতরে বেশ সাড়া পড়ে গেল৷ দুই একটি ছোটো ছোটো ছেলে-মেয়ে এসে কৌতূহলের সঙ্গে আমাদের দেখতে লাগল৷ বোধ হল যেন আশেপাশের জানলা দিয়ে বাড়ির মেয়েরাও উঁকিঝুঁকি মারছে৷
ব্যাপারটা মন্দ নয়৷ আমি আর মোহনলাল মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলাম৷ এখন পর্যন্ত কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না! দেখা যাক শেষ পর্যন্ত কী দাঁড়ায়!
ছোট্ট একখানা বৈঠকখানা ঘর৷ বেশ ফিটফাট করে সাজানো৷ তক্তপোশের উপর একটা পরিষ্কার সাদা চাদর বিছানো৷ এক পাশে একটা টেবিল, তার উপরে অনেকদিনের পুরোনো একখানা আয়না, একধারে একটা ছোটো টাইমপিস ঘড়ি টিক টিক করছে৷ টিনের দেয়ালে কতগুলি রংচঙে ক্যালেন্ডার টানানো, ঘরের এক কোণে একটা কাপড়-জড়ানো লম্বা মতন কী জানি ঝুলছে; মনে হল বোধ হয় এস্রাজ৷
আমরা জুতো খুলে তক্তপোশের উপর উঠে বসলাম৷
ডুরে শাড়ি পরা নোলক নাকে একটি ছোট্ট মেয়ে হাঁ করে আমাদের দিকে তাকিয়েছিল৷ মোহনলাল বলল, 'খুকি, এক গ্লাস জল খাওয়াতে পার?'
আঁচল ঘুরিয়ে খুকি এক ছুটে ভিতরে চলে গেল৷
মুহূর্তের মধ্যে ভদ্রলোকটি দু-টি নেয়াপাতি ডাব কেটে এনে আমাদের সামনে ধরে বললেন, 'এখন এই ডাবের জলটুকু খান, চা হচ্ছে৷ চা খেয়ে তারপর মেয়ে দেখার ব্যবস্থা করা যাবে৷'
আমাদের দম ফেটে হাসি বেরিয়ে আসছিল, মোহনলাল হাসি চাপতে না পেরে খুক খুক করে কাশতে আরম্ভ করে দিল৷
কিছুক্ষণ পরেই চা এল, তার সঙ্গে ফুলকো ফুলকো লুচি আর আলুর দম৷ বিনা বাক্যব্যয়ে খাবারগুলো সাবাড় করে ফেললাম৷
তারপর মেয়ে দেখার পালা৷ লাল রঙের শাড়ি পরা একটি খুকির হাত ধরে ভদ্রলোক আমাদের ঘরে ঢুকলেন৷ বললেন, 'নাও মা, প্রণাম করো৷'

খুকি আমাদের পা ছুঁয়ে প্রণাম করল৷ হাসি চেপে মোহনলালের চোখ-মুখ লাল হয়ে উঠেছে৷ আমারও মারাত্মক রকমের হাসি পাচ্ছিল, কিন্তু হেসে ফেললেই সব মাটি৷
যথাসম্ভব গম্ভীর হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, 'এর নামটি কী?'
ভদ্রলোক খুকির দিকে চেয়ে বললেন, 'বলো মা, নাম বলো৷'
মুখ নীচু করে অতি অস্পষ্ট ভাষায় খুকি বলল, 'নিস্তারিণী দাসী৷'
মোহনলাল বলল, 'বাঃ, বেশ নাম৷'
আমি ভদ্রলোকটিকে বললাম, 'আচ্ছা, এখন ওকে ভিতরে নিয়ে যান৷'
ভিতরে আর নিয়ে যেতে হল না, চৌকাঠ পর্যন্ত ধীরে ধীরে গিয়ে এক লাফে খুকি অন্দরে চলে গেল৷
আমরা বললাম, 'এখন তবে উঠি৷'
ভদ্রলোকটি হাতজোড় করে বললেন, 'তা কি হতে পারে! এই ভর দুপ্পুর বেলা, ভাত না খেয়ে যেতে পারবেন না৷ আমি কিছুতেই ছাড়ব না৷ চান করে খেয়েদেয়ে খানিক বিশ্রাম করে বিকেল বেলার দিকে যাবেন৷'
মনে মনে ভাবলাম-বোর্ডিংয়ে গিয়ে তো সেই কলাইয়ের ডাল আর পুঁই শাকের ছ্যাঁচড়া খেতে হবে, এমন খাসা ভোজটা ছাড়তে যাই কেন? মোহনলালের মনেরও সেই তুরীয় অবস্থা৷
কিছুক্ষণ পর ভদ্রলোকটি একশিশি জবাকুসুম তেল আর সাদা ধবধবে দু-খানা তোয়ালে এনে বললেন, 'আমাদের বাড়ির পুকুরের জল খুব চমৎকার, চান করে বেশ আরাম পাবেন৷'
আচ্ছা করে তেল মেখে স্নান করা গেল৷ বেশ পুকুর, কিছুক্ষণ সাঁতার কেটে উঠে পড়লাম৷
স্নান সেরে আবার বাইরের ঘরে বসে আছি৷ ভদ্রলোকটি ভিতরে খাবার ব্যবস্থা করতে গেছেন, এমন সময় ডাকপিয়োন একখানা পোস্টকার্ড দিয়ে চলে গেল৷
পরের চিঠি পড়া অন্যায়, কিন্তু পোস্টকার্ডের দু-একটা কথা হঠাৎ চোখে পড়ে যেতেই বাকি সবটুকু পড়বার লোভ সামলাতে পারলাম না৷ দেখলাম চিঠিতে লেখা আছে-
বিহিত সম্মানপুঃরসর নিবেদনমিদং-
মহাশয়, রবিবার আপনার কন্যাকে দেখিতে যাইব-এইরূপ স্থির ছিল৷ কিন্তু বড়োই দুঃখের বিষয় ঘটনাচক্রে সেদিন আর যাইতে পারিব না, সোমবার সকালের গাড়িতে অবশ্যই যাইব৷ শ্রীমান হরিমোহন ও কালীচরণ আমার সাথে যাইবে৷
আমার বিনীত নমস্কার জানিবেন৷
বশংবদ
শ্রীমহেন্দ্রলাল মজুমদার
চিঠিখানি পড়ে জলের মতো সমস্ত জিনিসটা বুঝতে পারলাম৷ ভাগ্যিস চিঠিটা ভদ্রলোকের হাতে পড়ে নাই, তাহলেই হয়েছিল আর কি!
চিঠিখানা গোপনে পকেটে পুরে ফেললাম৷ মোহনলালকে বললাম, 'দেখ, যতক্ষণ এখানে আছি, তুই হরিমোহন আর আমি কালীচরণ-বুঝলি!'
বেলা অনেক হয়েছে৷ খিধের চোটে নাড়ি টনটন করছে৷ ভদ্রলোকটি বারে বারে এসে হাত জোড় করে বলে যাচ্ছেন, 'আর একটু অপেক্ষা করুন, মাংসটা প্রায় হয়ে এল৷'
যথাসময়ে খাওয়ার ডাক পড়ল৷ ভাত কই! এ যে পোলাও, সারি সারি বাটিতে ডাল, কই মাছের কালিয়া, গলদা চিংড়ির ঝোল, মাংসের কোরমা, ভাজাভুজি, অম্বল, তারপর এল দই আর সন্দেশ-৷
ভদ্রলোকটি বললেন, 'পায়েসটা আর হয়ে উঠল না কিছুতেই৷'
আমি বললাম, 'না না এই যথেষ্ট, এত আয়োজনেরও কোনো দরকার ছিল না৷'
ছাগল গেলার পর অজগর সাপের যে দশা হয় আমাদের দশাও তাই হল, একেবারে 'নট নড়নচড়ন'৷
সমস্ত দুপুরটা পড়ে নাক ডাকিয়ে ঘুমালাম৷ বিকেল পাঁচটা তেইশ মিনিটে কলকাতার গাড়ি৷ এই গাড়িতেই আমরা ফিরব৷
বিকেলেও ভদ্রলোক জলখাবার খেতে অনুরোধ করেছিলেন, কিন্তু কাঁহাতক আর খাওয়া যায়! দুই কাপ চা খেয়ে আমরা স্টেশনের দিকে হাঁটা দিলাম৷ ভদ্রলোকটিও সঙ্গে চললেন আমাদের গাড়িতে তুলে দিতে৷
যথাসময়ে গাড়ি এল, চড়ে পড়লাম৷ ভদ্রলোকটি হাত জোড় করে আবার বিনয় জানিয়ে বললেন, 'অনেক কষ্ট দিলাম, কিছু মনে করবেন না; মহেন্দ্রবাবু এলে খুবই সুখী হইতাম৷'
গাড়ি ছেড়ে দিল, আমি জানালা দিয়ে মুখ বের করে বললাম, 'ওঃ, বড্ড ভুল হয়ে গেছে, আপনার একখানা চিঠি ছিল, দিতে ভুল হয়ে গেছে৷' এই বলে হাত বাড়িয়ে সেই পোস্টকার্ড-খানি হাতে গুঁজে দিলাম৷
হুস হুস করতে করতে গাড়ি স্টেশন ছাড়িয়ে চলে গেল৷
বৈশাখ ১৩৪১

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন