অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়
এক দেশে মস্ত এক পণ্ডিত ছিলেন৷ পৃথিবীর যত ভাষা সব তিনি বুঝতেন৷ যতরকম বিদ্যে আছে সব তাঁর জানা ছিল৷ স্বর্গে-মর্তে-পাতালে, আকাশে-বাতাসে-জলে-আলোয়-আঁধারে যে কেউ আছে, যত কিছু, সকলকার খবর তাঁর নখদর্পণে৷ মানুষদের তো তিনি চিনতেনই৷ ভূত-প্রেত, দৈত্য-দানব, যক্ষ-রক্ষ, কিন্নর-গন্ধর্ব এদের সকলকার সঙ্গেই তাঁর পরিচয় ছিল৷ এত জিনিস তো মনে রাখা যায় না, কাজেই কালো সিন্ধুকের মতন মস্ত একখানা খাতা তৈরি করে এইসব খবর, এদের ঠিকানা, সাটে লিখে রাখতেন৷ তবু এত লিখতে হয়েছিল যে, এত বড়ো খাতাখানা সমস্ত ভরতি হয়ে গিয়েছিল৷ আকাশের মধ্যে কিংবা বাতাসের মধ্যে যারা আছে, তাদের কাউকে ডাকতে হলে, কিংবা কিছু খবর পাঠাতে হলে, কিংবা মন্তর-টন্তর পড়ে জাদু করবার দরকার হলে অন্ধকারে তিনি এই খাতা খুলতেন৷ নইলে আর সব সময় সেটা লোহার শিকলে-বাঁধা সোনার তালা চাবি বন্ধ থাকত-পাহাড়ের গুহার মতো ঘুটঘুটে একটা ছোট্ট চোরকুটুরির মধ্যে৷ তাঁর বিদ্যার বলে তিনি লোহাকে সোনা, মানুষকে ভেড়া করতে পারতেন, যখন খুশি ভূত-প্রেত, দৈত্য-দানবদের ডেকে সৃষ্টিছাড়া কাজ করিয়ে নিতে পারতেন৷ কিন্তু কাউকে তিনি এ বিদ্যা শেখাতেন না৷ কত লোক তাঁর পায়ে ধরে সাধাসাধি করত, তবু তিনি এইসব বিদ্যার একটি ফোঁটাও কাউকে দিতেন না৷ পাছে কেউ খাতা থেকে তাঁর বিদ্যা চুরি করে নেয় এই ভয়ে খাতা কোথায় লুকোনো আছে তা অবধি কাউকে জানতে দিতেন না৷ জানত শুধু তাঁর আদরের চাকর খুদে৷
পণ্ডিত যখন সেই অন্ধকার চোর-কুটুরির মধ্যে একা বসে নানারকম অদ্ভুত কাণ্ডকারখানা করতেন, তখন ওই খুদে সেই সব দেখে অবাক হয়ে যেত৷ সে ছিল ভারি গরিব৷ তার মনিব বড়ো বড়ো, কালো কালো লোহার চাঁইগুলোকে মন্ত্রপড়া জল ছিটিয়ে দেখতে দেখতে চকচকে সোনার চাঁই করে ফেলেন৷ দেখে তার ভারি লোভ হত৷ তার মনে হত, ওই মন্তর-পড়া জল যদি একটু পাই, তাহলে-উঃ কী হয়! কিন্তু কিছুতেই তার ভাগ্যে ওই জলের একটি ফোঁটাও জোটে না৷ যখনই সে জল-পড়ার বাটির খোঁজ করত, সে দেখত, বাটির গায়ে একটি ফোঁটাও জল নেই-সেটা যেন মরুভূমির মতো শুকনো, খটখটে৷ আর এমন তাপ যে তার গায়ে হাত দেওয়াই যায় না৷ তখন তার কেবল মনে হত, যদি ওই বইখানা একবার খোলা পাই, তাহলে লোহাকে সোনা করবার মন্তরটা বার করেনি৷ কিন্তু সে-বই লোহার শিকল দিয়ে এমন আষ্টেপিষ্টে বাঁধা যে, খোলে কার সাধ্য! আর তার চাবি মনিব ফুসমন্তরে যে কোথায় উড়িয়ে দিত, খোঁজই পাওয়া যেত না৷ কাজেই খুব ইচ্ছে হলেও খুদের লোহাকে সোনা করা হয়ে উঠল না৷ তার দিন যেমন দুঃখে যাচ্ছিল, তেমনি দুঃখে যেতে লাগল৷
একদিন হল কী, না, খুদের মনিবঠাকুর তাড়াতাড়ি কী কাজে বেরিয়ে গেলেন৷ অন্যমনস্কে খাতার চাবি বন্ধ করা হল না-খোলাই পড়ে রইল৷ খুদে গিয়েছিল বাজারে৷ ফিরে এসে দেখে এই ব্যাপার৷ তার ভারি ফুর্তি! ছুটে খাতার কাছে গিয়ে যত তাড়াতাড়ি পারে তার পাতা ওলটাতে লাগল-কী জানি দেরি হলে যদি মনিব এসে পড়েন! কোথায় আছে সোনা করবার মন্তর, মহা ব্যস্ত হয়ে সে খুঁজতে লাগল৷ সোনা, সোনা, সোনা-পাতা উলটেই যাচ্ছে, কিন্তু কোনো পাতাতেই সোনার নাম-গন্ধও নেই-যা একটু আছে, কেবল অক্ষরের গায়ে সোনার কালিতে৷ খুঁজতে খুঁজতে যতই সময় যায়, ততই তার ছটফটানি বাড়ে৷ তার মনে হতে লাগল, যেন বহু কষ্টে অনেক পথ হেঁটে সে সোনার পাহাড়ের কাছে প্রায় এসে পড়েছে-কিন্তু এই বুঝি সব গেল ফসকে! এক-একবার যেই মনে হয় সিঁড়িতে ওই পায়ের শব্দ, অমনি তার বুকের রক্ত শুকিয়ে ওঠে-হায় হায়! হল না, হল না!
সে খুব তাড়াতাড়ি পাতা ওলটাতে লাগল৷ কিন্তু যতই উলটোয়, ততই যতসব বিদঘুটে কথা তার চোখে পড়ে৷ তার একটি কথাও সে জ্ঞানে শোনেনি৷ এমনি করে অনেক পাতা ওলটাবার পর হঠাৎ একজায়গায় থেমে তার মনে হল, 'এইবার বুঝি সোনার সন্ধান পেলুম৷' পাতার মাথায় বড়ো বড়ো সোনার অক্ষরে লেখা রয়েছে-'ষর্ণশের্ণ'৷ সে শুনত, পণ্ডিতমশাই, সোনাকে স্বর্ণ বলতেন৷ মনের আনন্দে সে চিৎকার করে উঠল, 'ষর্ণশের্ণ! ষর্ণশের্ণ!' যেমন এই চিৎকার করা, অমনি বাড়ি কাঁপিয়ে অন্ধকার চোরকুঠুরির লোহার দরজা মড়মড় করে ভেঙে এক ভয়ংকর কালো মূর্তি খুদের সামনে এসে হাজির হল৷ খুদে তো দেখেই প্রায় অজ্ঞান! হাত থেকে খাতার খোলা পাতাগুলো খসে গেল৷ সেই ভয়ংকর মূর্তি কটমট করে চেয়ে বিকট শব্দে চিৎকার করে উঠল, 'কী চাই? কেন আমায় ডাকলি?'

খুদে কাঁদো-কাঁদো হয়ে বিড়বিড় করে বলল, 'কখন তোমায় ডাকলুম?'
সেই ভীষণ মূর্তি দাঁত কড়মড় করে বলে উঠল, 'জানিস, আমি দৈত্যরাজ ষর্ণশের্ণ! শিগগির বল, কী চাই?'
খুদে ভয়ে কিছুই বলতে পারল না৷
দৈত্য আরও রেগে বলে উঠল, 'হুকুম দে বলছি, নইলে এখনই তোর গলা টিপে মেরে ফেলব!' খুদে ভাবল এ কীরকম হুকুম চাওয়া রে বাবা! সে এমন ভেবড়ে গেল যে, হুকুম দেবে কী, কিছু মনেই আনতে পারল না৷ দৈত্য আবার চিৎকার করে উঠল, 'হয় কাজ দে, নয় তোকে খেয়ে ফেলে আমার কাজ চুকিয়ে যাই!' বলতে বলতে তার লম্বা নখওয়ালা আঙুলগুলো খুদের গলার কাছে এগিয়ে নিয়ে এল৷ খুদের মনে হল, ব্যস গেলুম এইবার! কথা বলতে গেল, কিন্তু গলা শুকিয়ে এমন কাঠ যে, একটি কথাও বার হল না৷ ভয়ে, তেষ্টায় তার প্রাণ ছটফট করতে লাগল৷ যখন দৈত্যের আঙুল তার টুঁটি চেপে ধরে ধরে, এমন সময় তার গলা ফেটে শব্দ উঠল, 'জল দাও-জল!'
হুকুম পেয়েই দৈত্য ছুটল জল আনতে৷ জলের পর জল-ঘড়া ঘড়া জল, জালা জালা জল ঘরের মধ্যে ঢালতে লাগল৷ দেখতে দেখতে জলে ঘর ভেসে গেল৷ একহাঁটু জল, এককোমর জল, একগলা জল-তখনও জল আনা বন্ধ হয় না৷ খুদে প্রাণের দায়ে হুকুম দিয়ে ফেলেছিল; কী করে হুকুম থামাতে হয় তা সে জানে না৷ কাজেই দৈত্যের জল আনাও থামল না৷ শেষে এত জল দাঁড়াল যে খুদে প্রায় ডুবু ডুবু হয়ে এল৷ মনে মনে বলতে লাগল-হায়, হায়, কেন সোনার লোভ করলুম!
দেখতে দেখতে জল এসে খুদের নাকের ডগায় ঠেকল-দম বন্ধ হবার জোগাড়! ঠিক সেই সময় তার মনিব এলেন ফিরে৷ পথে যেতে যেতে তাঁর মনে পড়ে গিয়েছিল-ওই যাঃ, খাতাখানা বন্ধ করতে ভুলে এসেছি-যাই বাড়ি৷ এসে দেখেন এই কাণ্ড-সমস্ত বাড়িটা জলে জলময়৷ প্রথমে তিনি কিছুই বুঝতে পারলেন না৷ শেষে ধ্যানে বসে যখন সব জানতে পারলেন, তখুনি মন্ত্র পড়ে সব জল শুষে ফেলে দৈত্যকে তাড়িয়ে খুদের প্রাণ রক্ষা করলেন৷
খুদে রক্ষা পেল বটে, কিন্তু পণ্ডিতের সেই অত কষ্টে লেখা মন্ত্রতন্ত্রের খাতাখানি জলে একেবারে নষ্ট হয়ে গেল৷ সেই দুঃখে পণ্ডিত যে কোথায় কোন বনে চলে গেলেন, কোনো খবরই পাওয়া গেল না৷ খুদের সোনার লোভও সেই বানের জলে ভেসে গিয়েছিল, সেও মনিবের সঙ্গে সঙ্গে বনে চলে গেল৷
আষাঢ় ১৩২৬
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন