অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়
একজন ভদ্রলোকের একটা বদভ্যাস ছিল; তিনি রোজ আফিসে যেতে দেরি করতেন৷ সকালে ঘুম ভাঙলে বিছানা থেকে সহজে উঠতে চাইতেন না৷ এক ঘণ্টা কেবল এপাশ-ওপাশ করতেন, তারপর গা মোড়ামুড়ি দিয়ে উঠে কুড়ি মিনিট খালি হাই তুলতেন৷ কোনো কোনো দিন এত দেরিতে উঠতেন যে, স্নান করবার সময় পেতেন না, কোনোমতে চারটি ভাত মুখে গুঁজে আফিসে দৌড়োতেন৷ তার জন্য ভদ্রলোকের শরীরও খারাপ হচ্ছিল, আফিসের কাজেরও ক্ষতি হচ্ছিল, কিন্তু তিনি তবু ঘুম থেকে উঠতে দেরি করতেন৷
একদিন তিনি উঠে দেখেন যে, ভাত খাবার আর সময় নাই, আফিসে যাবার বেলা হয়েছে৷ তিনি তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পথের একটা দোকান থেকে কয়েকটা কচুরি আর একটা রসগোল্লা কিনে নিয়ে, তাই খেতে খেতে আফিসের দিকে ছুট দিলেন৷ একটু দূর যেতেই একটা চিল ছোঁ মেরে কচুরির ঠোঙাটি নিয়ে গেল; তিনি একরকম না খেয়েই আফিসে গেলেন৷ আফিসে গিয়েই তাঁর মনে হল-ওই যা! তিনি কচুরিওয়ালাকে একটা টাকা দিয়েছিলেন, খাবারের দাম তো হয়েছিল মোটে ছয় পয়সা, কিন্তু আফিসে যাওয়ার তাড়ায় বাকি পয়সা তো ফেরত নেওয়া হয়নি! সুতরাং সেদিন ভদ্রলোকের খাওয়াও হল না, অথচ টাকাও গেল- অচেনা দোকানদার টাকার কথা কিছুতেই স্বীকার করল না৷ তিনি সেদিন ঠিক করলেন যে, আর ঘুম থেকে উঠতে দেরি করবেন না৷
কিন্তু পরদিনও তিনি উঠতে এত দেরি করলেন যে, ভাত খাবার আর সময় পেলেন না, তাড়াতাড়ি শুধু একটু দই খেয়ে আফিসে ছুটলেন৷ ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়োতে দৌড়োতে রাস্তার মোড়ে হঠাৎ একটা ষাঁড়ের সঙ্গে ঠোকাঠুকি হয়ে, তিনি রাস্তায় পড়ে গেলেন৷ তাড়াতাড়ি উঠে আবার ছুটতে লাগলেন৷ খানিকদূর গিয়ে একটা ঘোড়ার গাড়ি দেখতে পেলেন৷ তিনি ভাবলেন যে, গাড়িতে গেলে অল্প সময়ের ভিতর আফিসে পৌঁছোতে পারবেন, তাই ছুটে গাড়ি ধরতে গেলেন৷ কিন্তু গাড়ি ধরবার আগেই একটা আমের খোসায় পা পড়াতে পা পিছলিয়ে গেল৷ নিজেকে সামলাবার জন্য তিনি তাড়াতাড়ি পাশের একজন কাবুলিওয়ালার জামা খামচিয়ে ধরলেন৷ হঠাৎ জামায় টান পড়াতে কাবুলিওয়ালা একপাশে কাত হয়ে পড়ল আর নিজেকে বাঁচাবার জন্য পাশের এক পুলিশের পাগড়িতে খামচিয়ে ধরল৷ পুলিশের মাথা থেকে পাগড়ি তখনই খুলে এল, তাই কাবুলিওয়ালা সেই ভদ্রলোকের উপর পড়ে গেল৷ ভদ্রলোকটি কাদা-টাদা মেখে অনেক কষ্টে উঠে, কাবুলি আর পুলিশকে অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে ঠান্ডা করে একটা গাড়ি ধরলেন৷ ততক্ষণে আফিসে যাবার সময় অনেকক্ষণ হল পার হয়ে গিয়েছে৷

গাড়ি আফিসের কাছে এসে থামবামাত্র তিনি তাড়াতাড়ি গাড়ি থেকে নামতে গিয়েছেন, আর অমনি গাড়ির দরজার এক পেরেকে জামার পকেট আটকিয়ে গিয়ে, প্রায় আধ হাত জামা ফ্যাঁস করে ছিঁড়ে গেল৷ তারপর গাড়োয়ানকে পয়সা দিতে গিয়ে দেখেন যে তাড়াতাড়িতে পয়সার ব্যাগ বাড়িতে ফেলে এসেছেন৷ তারপর আফিসে যেই ঢুকেছেন অমনি আফিসের লোকেরা তাঁকে দেখেই 'একী মশাই! এ কী করেছেন!' বলে চিৎকার করে উঠেছে৷ তিনি ব্যাপার বুঝতে না পেরে আয়নার সামনে গিয়ে দেখেন যে, বাড়ি থেকে দই খেয়ে আসবার সময় তাড়াতাড়িতে ভালো করে মুখ মুছতে পারেননি, তাই সমস্ত দাড়িতে আর গোঁফে দই লেগে রয়েছে৷ নিজেই দইমাখা চেহারা দেখে সেদিনই তিনি প্রতিজ্ঞা করলেন যে, আর কখনো ঘুম থেকে উঠতে দেরি করবেন না৷ তখন থেকে তিনি প্রতিদিন সকালে উঠতেন আর আফিসে যেতেও দেরি হত না৷
বৈশাখ ১৩৩০
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন