অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়
এক যে ছিল রাজা, সে এক ভারি প্রকাণ্ড রাজা৷ তাঁর হাতিশালে প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড হাতি গোয়ালে গোরু আস্তাবলে ঘোড়া-কী? এ সব জান? এ সব তো সব রাজার আছে? তা একটু আবার শোনো না-তাঁর ভাঁড়ার ভরা ইঁদুর, পুকুর ভরা ব্যাং, আরও কত কিছু ছিল, আর মাথায় দুটো ছাগলের মতো শিং৷ বেচারা রাজার তো শিং নিয়ে মহা মুশকিল, পাছে লোকে দেখে এই ভয়েই অস্থির৷ তাঁর মাথার চুল খুব লম্বা ছিল আর তার উপর প্রকাণ্ড এক মুকুট৷ কোনো রকম করে শিংটা চাপা দিয়ে রাখতে পারলে বাঁচেন৷ কিন্তু চুল আর কত লম্বা রাখা যায়, তাতেও যে লোকে যা তা বলতে আরম্ভ করে৷ কাজেই রাজা আর কী করেন মাঝে মাঝে চুল কাটান; কিন্তু যে নাপিত যায় সে আর ফিরে আসে না; রাজামশাই কোনো একটা ছুতোনাতা করে তার মাথাটি উড়িয়ে দেন৷ কাজেই আর কোনো নাপিত আসতে চায় না, রাজার বাড়ি যাওয়ার হুকুম এলেই কোনোরকমে ক্ষুর কাঁচি পুঁটলিপাঁটলা নিয়ে তাঁর দেশ ছেড়ে পালায়৷ শেষে এক ছোকরা নাপিত টাকার লোভে রাজার বাড়ি গেল৷ নাপিতের নাম ভবম হাজাম (হিন্দুস্থানি নাপিত কিনা,-তারা নাপিতকে বলে হাজাম)৷
ভবম এসে তো বেশ করে রাজার চুল কাটছে, এমন সময় হঠাৎ দেখে কিনা রাজার মাথায়-বাপরে-এয়া বড়ো দুই শিং! সে তো তাই দেখে একেবারে হতভম্ব৷ তার পর সে কোনোরকমে রাজার চুল কাটা সারল৷ কিন্তু বেচারার এই সব দেখে মাথা ঠিক ছিল না, সে রাজার মাথায় টিকি রাখতে ভুলে গেল৷ আর যায় কোথায়? রাজা বললেন, 'তবে রে বেটা বেয়াদব, আমার মাথায় শিখা রাখিসনি যে? এক্ষুনি তোর গর্দান নেব৷'
নাপিত তো ভয়ে কাঠ৷ সে বলল, 'দোহাই হুজুর, এটা বড়োই ভুল হয়ে গেছে; তবে টিকি, বিশেষ করে রাজা লোকের টিকি, ও ফের খুব শিগগির গজাবে; কিন্তু হুজুর, আমি গরিব মানুষ, আমার মাথা গেলে আর গজাবে না'-কিন্তু সে আর কে শোনে? তার পর নাপিত অনেক হাতে পায়ে ধরল, শেষে বুঝিয়ে বলল যে তার মাথা কাটা গেলে আর কোনো নাপিত কখনো রাজবাড়িতে আসবে না৷ তখন রাজা আর কী করেন, বললেন, 'যা, কিন্তু খবরদার আমার শিঙের কথা কাউকে বলিসনে, বললেই তোর দফা শেষ করব৷'
নাপিত তো ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড় মেরে পালাল আর রাজার বাড়ির মুখোও হল না৷
এখন, নাপিতের পেটে কথা থাকে না৷ কাজেই এই রাজার শিঙের কথাও ভবম নাপিতের পেটে আর থাকতে চায় না৷ নাপিত প্রাণের দায়ে তাকে জোরজবরদস্তি করে অনেক চেপে রাখতে চেষ্টা করল কিন্তু সে কিছুতেই চাপা গেল না, মাঝে থেকে এই ঠেলাঠেলির চোটে ভবমের পেটটা ফুলতে লাগল৷ দিন যায়, নাপিতের পেটও যায় যায়৷
সেটা ফুলে ফুলে ঢোল, ক্রমে ঢাকাই জালা হয়ে উঠল৷ শেষে নাপিত তার এক নানির (দিদিমা) কাছে গেল৷ গিয়ে বলল, 'নানি, টাকার লোভে একজায়গায় গিছলাম, সেখানে একটা কথা জেনেছি; এখন তার চোটে মাথা যায় কি পেট যায়৷'
নানি বলল, 'কী হয়েছে খুলেই বল না কেন?' ভবম বলল, 'অত বলবার জো নেই আর না বললেও তো দেখছ কী হচ্ছে৷'
নানি তখন তাকে বলে দিল যে, 'শহরের মাঝে যে প্রকাণ্ড বট গাছ আছে তার কোটরে ঢুকে তোর কথাটা বলে আয়গে৷' ভবম তখন গাছের কোটরে ঢুকে চুপে চুপে বলে এল, 'আরে বাসরে, রাজার মাথায় এয়া বড়ো দুই শিং!!' আর অমনি তার পেট ফাঁপাও সেরে গেল৷
তারপর একদিন রাজার বাড়ি মহা ধুমধাম৷ রাজার মেয়ের বিয়ে৷ অনেক জায়গা থেকে কত ঢাক ঢোল কত বাজনা এসেছে৷ তার মধ্যে ছিল এক ঢোল সেটা সেই শহরের মাঝের বট গাছের কাঠ দিয়ে তৈরি৷ যখন বিয়ের আসর খুব জমেছে, বরযাত্রী এসে পড়েছে, চারিধারে লোকে লোকারণ্য, তখন সকলে শুনল, রাজার নহবতখানায় সানাই কাঁসর আর ঢোল মিলে নানান সুরে কী যেন বলছে৷ সানাই তার মিহি সুরে তান ধরেছে, 'রাজাকে দুই শিং! রাজাকে দুই শিং!' কাঁসর অমনি ক্যান ক্যান করে বলছে, 'কিন্নে কহা? কিন্নে কহা?' (কে বলেছে, কে বলেছে) আর ঢোল গুরুগম্ভীর আওয়াজ করে বলছে 'ভবম হাজাম নে, ভবম হাজাম নে' (ভবম নাপিত বলেছে)!
আর কোথা যায়! চারিধারে হুলস্থুল-লোকে যা-তা বলতে আরম্ভ করল৷ রাজা তো রেগে আগুন হয়ে নাপিতকে কাটতে হুকুম দিলেন৷ কিন্তু নাপিত কি আর সেখানে থাকে? সে সেই সর্বনেশে ঢোলের কাণ্ড দেখে আগেই কোথায় সরে পড়েছে৷ কাজেই, তাকে আর তখন ধরে কে? রাজামশায়ের লম্ফঝম্প আর শিং নাড়াই সার হল৷
শ্রাবণ ১৩২০
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন